সূরা হুদঃ ৯ম রুকুঃ (৯৬-১০৯)আয়াত

কোন কোন তফসীরবিদের মতে নিদর্শনাবলী থেকে উদ্দেশ্য হল তাওরাত এবং সুষ্পষ্ট প্রমাণ হল মু’জিযাসমূহ। আর অনেকে বলেন যে, ‘নিদর্শনাবলী’ হল নয়টি মু’জিযা এবং সুষ্পষ্ট প্রমাণ হল লাঠি। যদিও লাঠি উক্ত নয় নিদর্শনেরই অন্তর্ভুক্ত; কিন্তু এ মু’জিযা যেহেতু খুবই গুরুতত্ত্বপূর্ণ ছিল, সেহেতু তাকে বিশেষভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।

সমস্ত প্রশংসা মহান রাব্বুল আলামীনের , যিনি প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে -কুরআন প্রদানের সাথে সাথে, তার সকল বিষয়ের সুস্পষ্ট বর্ণনাও প্রদান করেছেন।

এ বিষয়ে স্বয়ং মহান রাব্বুল আলামীন বলেন!

وَ نَزَّلۡنَا عَلَیۡكَ الۡكِتٰبَ تِبۡیَانًا لِّكُلِّ شَیۡءٍ وَّ هُدًی وَّ رَحۡمَۃً وَّ بُشۡرٰی لِلۡمُسۡلِمِیۡنَ ﴿۸۹﴾

আর আমি আপনার প্রতি এ কিতাব নাযিল করেছি প্রত্যেক বিষয়ের সুস্পষ্ট বর্ণনা দেওয়ার জন্য এবং সঠিক পথের দিশা ও রহমত এবং সুসংবাদ মুসলমানদেরকে দেওয়ার জন্য। সূরা আন-নাহ্‌ল[৮৯]

তিনি বলেন! قَدۡ جَآءَكُمۡ مِّنَ اللّٰهِ نُوۡرٌ وَّ كِتٰبٌ مُّبِیۡنٌ ﴿ۙ۱۵﴾

তোমাদের নিকট এসেছে আল্লাহর পক্ষ হতে একটি আলো ও কিতাবুম মুবীন। সূরা আল-মা’ইদাহ[১৫]

চারজন রসূলের মাঝে সর্বপ্রথম মূসা (আঃ) এর উপর তাওরাত নামক কিতাব অবতীর্ণ হয়,

অর্থাৎ কিতাব মানে লিখিত বিষয় , আর মুবীন মানে প্রকাশ্য বর্ণনাকৃত ও সুস্পষ্ট।

অর্থাৎ কিতাবুম মুবীন হল এমন এক ভার্চুয়াল কিতাব (বা সহীফাহ) যার ভিতর সুস্পষ্টরূপে প্রতিটি জিনিসের বর্ণনা রয়েছে ভার্চুয়ালীভাবে।

আর আমি দাঊদ ও সুলাইমানকে (এই কিতাবুম মুবীন থেকে) জ্ঞান দান করেছিলাম। সূরা আন-নাম্‌ল[১৫]

(সুলাইমানের সভাসদে) যার কাছে (এই মুবীন) কিতাবের জ্ঞান ছিল সে বলল- ‘আপনার দৃষ্টি আপনার দিকে ফিরে আসার পূর্বেই আমি তা (রাণী বিলকিসের সিংহাসন) আপনার কাছে এনে দেব।’ সূরা আন-নাম্‌ল[৪০]

পাঁচ জিনিসের জ্ঞান ছাড়া আসমান জমিনের সকল জ্ঞান আল্লাহ কিতাবুম মুবীনে রেখে দিয়েছেন।

যেমন আল্লাহ বলেন!আকাশে আর যমীনে এমন কোন অদৃশ্য বিষয় নেই যার বর্ণনা কিতাবুম মুবীনে নেই। সূরা আন-নাম্‌ল[৭৫]

কেবল আল্লাহর নিকটই রয়েছে কিয়ামতের জ্ঞান, আর তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন, জরায়ুতে কী আছে তা তিনিই জানেন। কেউ জানে না আগামীকাল সে কী অর্জন করবে, কেউ জানে না কোন্ জায়গায় সে মরবে। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সর্বাধিক অবহিত। সূরা লুক্বমান[৩৪]

মূসা (আঃ)-এর পরিচয়

موسى بن عمران بن قاهث بن عازر بن لاوى بن يعقوب بن اسحاق بن ابراهيم عليهم السلام-

মূসা ইবনে ইমরান বিন ক্বাহেছ বিন ‘আযের বিন লাভী বিন ইয়াকূব বিন ইসহাক্ব বিন ইবরাহীম (আঃ)।ইবনু কাছীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ১/২২২।

 অর্থাৎ মূসা হ’লেন ইবরাহীম (আঃ)-এর ৮ম অধঃস্তন পুরুষ। মূসা (আঃ)-এর পিতার নাম ছিল ‘ইমরান’ ও মাতার নাম ছিল ‘ইউহানিব’। তবে মায়ের নামের ব্যাপারে মতভেদ আছে। তাফসীর মা‘আরেফুল কুরআন, ত্বোয়াহা ৩৮-৩৯, পৃঃ ৮৫১।

উল্লেখ্য যে, মারিয়াম (আঃ)-এর পিতার নামও ছিল ‘ইমরান’। যিনি ছিলেন হযরত ঈসা (আঃ)-এর নানা।

মূসা ও ঈসা উভয় নবীই ছিলেন বনু ইস্রাঈল বংশীয় এবং উভয়ে বনু ইস্রাঈলের প্রতি প্রেরিত হয়েছিলেন। ইরশাদ হয়েছে–

 এর আগে আমি মূসাকে কিতাব দিয়েছি , কাজেই সেই জিনিসই পাওয়ার ব্যাপারে তোমাদের কোন সন্দেহ থাকা উচিত নয়৷এ কিতাবকে আমি বনী ইসরাঈলের জন্য পথনিদের্শক করেছিলাম৷ সাজদাহ ৩২/২৩

প্রথম ৩০ বছর মিসরে, তারপর ১০ বছর মাদিয়ানে, তারপর মিসরে ফেরার পথে তূর পাহাড়ের নিকটে ‘তুবা’ (طُوَى) উপত্যকায় ৪০ বছর বয়সে নবুঅত লাভ। অতঃপর ২০ বছর মিসরে অবস্থান করে সেখানকার অধিবাসীদেরকে তাওহীদের দাওয়াত প্রদান। তারপর ৬০ বছর বয়সে বনু ইস্রাঈলদের নিয়ে মিসর হ’তে প্রস্থান এবং ফেরাঊনের সলিল সমাধি। অতঃপর আদি বাসস্থান কেন‘আন অধিকারী আমালেক্বাদের বিরুদ্ধে জিহাদের হুকুম অমান্য করায় অবাধ্য ইস্রাঈলীদের নিয়ে ৪০ বছর যাবত তীহ্ প্রান্তরে উন্মুক্ত কারাগারে অবস্থান ও বায়তুল মুক্বাদ্দাসের সন্নিকটে মৃত্যু সম্ভবতঃ ৮০ থেকে ১০০ বছর বয়সের মধ্যে।

কুর’আনে এসেছে-

তোমার হাত বগলে রাখো উজ্জল হয়ে বের হয়ে আসবে কোন প্রকার কষ্ট ছাড়াই৷এবং ভীতিমুক্ত হবার জন্য নিজের হাত দু’টি চেপে ধরো৷ এ দু’টি উজ্জল নিদর্শন তোমার রবের পক্ষ থেকে ফেরাউন ও তার সভাসদদের সামনে পেশ করার জন্য, তারা বড়ই নাফরমান। ক্বাছাছঃ৩২

ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী ফেরাঊনের জাদুকরদের সাথে শক্তি পরীক্ষার ঘটনার পর মূসা (আঃ) অন্যূন বিশ বছর যাবত মিসরে অবস্থান করে সেখানকার অধিবাসীদেরকে আল্লাহর বাণী শোনান এবং সত্য ও সরল পথের দিকে দাওয়াত দিতে থাকেন। এ সময়কালের মধ্যে আল্লাহ মূসা (আঃ)-কে প্রধান ৯টি মু‘জেযা দান করেন। তবে প্লেগ মহামারী সহ (আ‘রাফ ৭/১৩৪)। মোট নিদর্শনের সংখ্যা দাঁড়ায় ১০টি।

যার মধ্যে প্রথম দু’টি শ্রেষ্ঠ মু‘জেযা ছিল অলৌকিক লাঠি ও আলোকময় হস্ততালু। যার পরীক্ষা শুরুতেই ফেরাঊনের দরবারে এবং পরে জাদুকরদের সম্মুখে হয়ে গিয়েছিল।

এরপর বাকীগুলি এসেছিল ফেরাঊনী কওমের হেদায়াতের উদ্দেশ্যে তাদেরকে সাবধান করার জন্য। মূলতঃ দুনিয়াতে প্রেরিত সকল এলাহী গযবের মূল উদ্দেশ্য থাকে মানুষের হেদায়াত।

 যেমন আল্লাহ বলেন, وَلَنُذِيقَنَّهُمْ مِنَ الْعَذَابِ الْأَدْنَى دُونَ الْعَذَابِ الْأَكْبَرِ لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ- (السجدة ২১)- ‘কাফির ও ফাসিকদেরকে (জাহান্নামের) কঠিন শাস্তির পূর্বে (দুনিয়াতে) আমরা অবশ্যই লঘু শাস্তি আস্বাদন করাব, যাতে তারা (আমার দিকে) ফিরে আসে’ (সাজদাহ ৩২/২১)।

মোট নিদর্শন সমূহ, যা মিসরে প্রদর্শিত হয়-

(১) লাঠি (২) প্রদীপ্ত হস্ততালু (৩) দুর্ভিক্ষ (৪) তূফান (৫) পঙ্গপাল (৬) উকুন (৭) ব্যাঙ (৮) রক্ত (৯) প্লেগ (১০) সাগরডুবি।

ملاء  (পারিষদবর্গ, প্রধানবর্গ) জাতির সম্মানিত ও সর্বোচ্চ পর্যায়ের লোকদেরকে বলা হয়। (এর ব্যাখ্যা পূর্বে আলোচনা হয়েছে।) ফিরাউনের সাথে তার দরবারের সম্মানিত লোকদের নাম এই জন্য নেওয়া হয়েছে যে, জাতির উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরাই সর্ববিষয়ে দায়িতত্ত্বশীল হয়ে থাকে এবং জাতির মানুষ তাদেরই অনুসরণ করে চলে। যদি তারা মূসা (আঃ)-এর উপর ঈমান আনত, তবে অবশ্যই ফিরাউনের সমস্ত জাতি ঈমান আনত।

 رشيد শব্দের অর্থ হল, সঠিক, বিবেকসম্মত, যুক্তিসঙ্গত, জ্ঞানসম্পন্ন ইত্যাদি। অর্থাৎ, মূসা (আঃ)-এর কথাই সঠিক ও যুক্তিসঙ্গত ছিল, কিন্তু তারা তা প্রত্যাখ্যান করল। আর ফিরআউনের কথা, যা সঠিক ও যুক্তিসঙ্গত ছিল না, তারা তার অনুসরণ করল।

আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ  ৭৩ : ১৬ فَعَصٰی فِرۡعَوۡنُ الرَّسُوۡلَ فَاَخَذۡنٰهُ اَخۡذًا وَّبِیۡلًا

অর্থাৎ “ফির’আউন সেই রাসূলের কথা অমান্য করলো, সুতরাং আমি তাকে কঠোরভাবে পাকড়াও করলাম। আল-মুযযাম্মিল: ১৬

সে অবিশ্বাস করলো এবং কথা মানলো না। অনন্তর সে পৃথক হয়ে (মূসার (আঃ) বিরুদ্ধে) প্রচেষ্টা চালাতে লাগলো। অতঃপর সে (লোকদের) সমবেত করলো, তৎপর সে উচ্চৈঃ স্বরে আহ্‌বান করলো। অতঃপর বললো: আমি তোমাদের শ্রেষ্ঠ প্রতিপালক। অনন্তর আল্লাহ তাকে আখেরাতের ও দুনিয়ার আযাবে পাকড়াও করলেন। নিশ্চয় এতে সেই ব্যক্তির জন্যে বড় শিক্ষণীয় রয়েছে যে (আল্লাহকে) ভয় করে। (নাযিয়াত:২১-২৬)

অর্থাৎ ফিরআউন, যেমন দুনিয়াতে তাদের পথপ্রদর্শনকারী ও অগ্রবর্তী ছিল, কিয়ামতের দিনও সে তাদের অগ্রবর্তীই থাকবে এবং নিজ জাতিকে নিজের নেতৃত্যে জাহান্নামে নিয়ে যাবে।

অসৎ লোকদের অনুসারীদেরকেও কিয়ামতের দিন জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করানো হবে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ  তোমাদের আগে যে জিন ও মানবদল গত হয়েছে তাদের সাথে তোমরা আগুনে প্রবেশ কর। যখনই কোন দল তাতে প্রবেশ করবে তখনই অন্য দলকে তারা অভিসম্পাত করবে।(১) অবশেষে যখন সবাই তাতে একত্র হবে তখন তাদের পরবর্তীরা পূর্ববর্তীদের সম্পর্কে বলবে, হে আমাদের রব! এরাই আমাদেরকে বিভ্রান্ত করেছিল; কাজেই এদেরকে দ্বিগুণ আগুনের শাস্তি দিন। আল্লাহ বলবেন, প্রত্যেকের জন্য দ্বিগুণ রয়েছে, কিন্তু তোমরা জান না। (আরাফ:৩৮)

এবার আল্লাহ তাআ’লা কাফিরদের ব্যাপারে সংবাদ দিচ্ছেন যে, জাহান্নামে তারা বলবেঃ

অর্থাৎ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আমাদের নেতৃবৃন্দ এবং আমাদের মাতব্বরদের কথা মান্য করেছিলাম, সুতরাং তারা আমাদেরকে (সোজা) পথ হতে বিভ্রান্ত করেছিল। হে আমাদের রব! তাদেরকে আপনি দ্বিগুণ শাস্তি প্রদান করুন এবং তাদের প্রতি লা’নত বর্ষণ করুন গুরুতর ভাবে। (আহযাব:৬৭-৬৮)

وِرْدٌ পানির ঘাটকে বলা হয়, যেখানে পিপাসিতরা আপন পিপাসা নিবৃত্ত করে। কিন্তু এখানে জাহান্নামকে وِرْد বলা হয়েছে।مورود  সেই স্থান বা ঘাট অর্থাৎ জাহান্নাম; যেখানে মানুষকে নিয়ে যাওয়া হবে। অর্থাৎ স্থানও নিকৃষ্ট এবং যারা যাবে তারাও নিকৃষ্ট। আল্লাহ আমাদেরকে পানাহ দিন।

এ আয়াত ও কুরআনের অন্য কিছু বক্তব্য থেকে জানা যায়, যারা দুনিয়ায় কোন জাতির বা দলের নেতৃত্ব দেয় কিয়ামতের দিনও তারাই তাদের নেতা হবে। যদি তারা দুনিয়ায় নেকী, সততা ও সত্যের পথে নেতৃত্ব দিয়ে থাকে তাহলে এখানে যারা তাদের অনুসরণ করেছে তারা কিয়ামতের দিনও তাদেরই পতাকাতলে সমবেত হবে এবং তাদের নেতৃত্বে জান্নাতের দিকে এগিয়ে যাবে। আর যদি তারা দুনিয়ায় কোন ভ্রষ্টতা, নৈতিকতা বিরোধী কার্যকলাপ ও এমন কোন পথের দিকে মানুষকে আহবান জানিয়ে থাকে যা সত্য দ্বীনের পথ নয়, তাহলে যারা এখানে তাদের পথে চলেছে তারা সেখানেও তাদেরই পেছনে থাকবে এবং তাদের নেতৃত্বে জাহান্নামের দিকে এগিয়ে যাবে,

হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ (কিয়ামতের দিন) ইমরুল কায়েস অজ্ঞতার যুগের কবিদের পতাকা বহন করবে এবং তাদেরকে নিয়ে সে জাহান্নামের দিকে যাবে।” (এই হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) স্বীয় ‘মসনাদ’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন) জাহান্নামের শাস্তির উপর এটা আরো অতিরিক্ত শাস্তি যে, জাহান্নামীরা ইহকালে এবং পরকালে উভয় স্থানেই চিরস্থায়ী লা’নতের শিকার হবে। এটা আলী ইবনু আবি তালহা হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন। অনুরূপ ভাবে যহ্‌হাক (রঃ) এবং কাতাদা’ (রঃ) বলেছেন যে, (আরবি) দ্বারা দুনিয়া এবং আখেরাতের লা’নতকেই বুঝানো হয়েছে। এটা আল্লাহ পাকের নিম্নের উক্তির মতইঃ (আরবি)

অর্থাৎ “আমি তাদেরকে এমন নেতা বানিয়ে ছিলাম যারা (লোকদেরকে) দুযখের প্রতি আহ্‌বান করছিল এবং কিয়ামত দিবসে তাদের কেউ সহায় হবে না। আর পৃথিবীতেও আমি তাদের পশ্চাতে লা’নত লাগিয়ে দিয়েছি, আর কিয়ামত দিবসেও তারা দুর্দশাগ্রস্ত লোকদের অন্তর্ভূক্ত থাকবে।” (কাসাস:৪১)

আল্লাহ তাআ’লা আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তাদেরকে (প্রত্যহ) সকালে ও সন্ধায় অগ্নির সম্মুখে আনয়ন করা হয়, আর যেই দিন কিয়ামত কায়েম হবে (সেই দিন আদেশ করা হবে যে,) ফিরআউনী লোকদেরকে কঠোরতর আযাবে দাখিল কর।” (সূরা মুমিন:৪৬)

ফির‘আউনের সম্প্রদায়েরা যেহেতু দুনিয়াতে তার অনুসরণ করেছে আখিরাতেও তারা ফির‘আউনের অনুসারী হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

(وَجَعَلْنٰھُمْ اَئِمَّةً یَّدْعُوْنَ اِلَی النَّارِﺆ وَیَوْمَ الْقِیٰمَةِ لَا یُنْصَرُوْنَﭸوَاَتْبَعْنٰھُمْ فِیْ ھٰذِھِ الدُّنْیَا لَعْنَةًﺆ وَیَوْمَ الْقِیٰمَةِ ھُمْ مِّنَ الْمَقْبُوْحِیْنَﭹﺟ)‏

“তাদেরকে আমি নেতা করেছিলাম; তারা লোকদেরকে জাহান্নামের দিকে আহ্বান করত; কিয়ামতের দিন তাদেরকে সাহায্য করা হবে না। এ পৃথিবীতে আমি তাদের ওপর লাগিয়ে দিয়েছি অভিসম্পাত এবং কিয়ামতের দিন তারা হবে ঘৃণিত” (সূরা কাসাস ২৮:৪১-৪২)

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,

(وَقَالُوْا رَبَّنَآ إِنَّآ أَطَعْنَا سَادَتَنَا وَكُبَرَا۬ءَنَا فَأَضَلُّوْنَا السَّبِيْلَا ﮒ ‏ رَبَّنَآ اٰتِهِمْ ضِعْفَيْنِ مِنَ الْعَذَابِ وَالْعَنْهُمْ لَعْنًا كَبِيْرًا)

“তারা আরো বলবে- হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা তো অনুসরণ করেছিলাম আমাদের নেতাদের এবং আমাদের প্রধানদের। অতএব তারাই আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল। হে আমাদের প্রতিপালক! তাদেরকে দ্বিগুণ শাস্তি দিন এবং মহা অভিশাপ দিন।” (সূরা আহযাব ৩৩:৬৭-৬৮)

এ দু’ধরনের শোভাযাত্রা কোন্ ধরনের জৌলুম ও জাঁক জমকের সাথে তাদের গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাবে তার চিত্র এখন প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের চিন্তা ও কল্পনার পটে এঁকে নিতে পারে। যেসব নেতা দুনিয়ায় লোকদেরকে গোমরাহ করেছে এবং সত্য বিরোধী পথে চালিয়েছে তাদের অনুসারীরা যখন নিজেদের চোখে দেখে নেবে এ জালেমরা কী ভয়াবহ পরিণতির দিকে তাদেরকে টেনে এনেছে তখন তারা নিজেদের সমস্ত বিপদ-মুসীবতের জন্য তাদেরকে দায়ী মনে করবে এবং তাদের শোভাযাত্রা তাদেরকে নিয়ে এমন অবস্থায় জাহান্নামের দিকে রওয়ানা দেবে যে, আগে আগে তাদের নেতারা চলবে এবং তারা পেছনে পেছনে তাদেরকে গালি দিতে দিতে এবং তাদের প্রতি লানত বর্ষণ করতে করতে চলতে থাকবে। অন্যদিকে যাদের নেতৃত্ব মানুষকে নিয়ামতপূর্ণ জান্নাতের অধিকারী করবে তাদের অনুসারীরা নিজেদের শুভ পরিণাম দেখে তাদের নেতাদের জন্য দোয়া করতে থাকবে এবং তাদের ওপর প্রশংসা ও শুভেচ্ছার পুষ্প বর্ষণ করতে করতে এগিয়ে যাবে।

‘লানত’ (অভিশাপ) আল্লাহর রহমত থেকে দূর ও বঞ্চিত হওয়া। সুতরাং দুনিয়াতেও তারা আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত এবং যদি তারা ঈমান না আনে, তবে আখেরাতেও রহমত থেকে বঞ্চিত থাকবে।

رفدٌ কোন পুরস্কার বা দানকে বলা হয়। এখানে অভিশাপকে পুরস্কার বলা হয়েছে। তাই তাকে অতি নিকৃষ্ট পুরস্কার বলা হয়েছে।مرفود  সেই পুরস্কার বা দানকে বলা হয়, যা কাউকে প্রদান করা হয়। এটি الرفد এর তা’কীদ স্বরূপ ব্যবহার হয়েছে।

قائم (বিদ্যমান) দ্বারা ঐ সকল শহর বা জনপদকে বুঝানো হয়েছে, যার ধংসাবশেষ এখনও ছাদসহ বিদ্যমান রয়েছে। আর حصيد ,محصود حَصِیۡدٌ এর অর্থে; সেই শহর বা জনপদকে বুঝানো হয়েছে, যা কাটা ফসলের মত নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। অর্থাৎ পূর্ববর্তী যুগের যে কতিপয় শহর ও জনপদের কাহিনী আমি বর্ণনা করছি, তার মধ্যে কোন কোন শহরের ধংসাবশেষ এখনও বর্তমান আছে, যা শিক্ষামূলক স্মৃতি। আর কোন কোন জনপদকে এমনভাবে নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে, যা একেবারে দুনিয়া থেকে মিটে গেছে এবং শুধু ইতিহাসের পাতায় তা বাকি রয়ে গেছে।

তাদেরকে শাস্তি দিয়ে ও ধ্বংস করে।(বরং তারাই) কুফরী ও অবাধ্যতা করে (নিজেদের উপর অত্যাচার করেছে।) অথচ তাদের বিশ্বাস এই ছিল যে, এরা তাদেরকে ক্ষতি থেকে রক্ষা করবে এবং মঙ্গল এনে দেবে। কিন্তু যখন আল্লাহর আযাব উপস্থিত হল, তখন স্পষ্ট হয়ে গেল যে, তাদের উক্ত বিশ্বাস ভ্রান্ত ছিল এবং এ কথা প্রমাণ হয়ে গেল যে, আল্লাহ ব্যতীত কেউ কারোর মঙ্গল বা অমঙ্গল করার ক্ষমতা রাখে না।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ অত্যাচারীকে পৃথিবীতে সুযোগ ও অবকাশ দিয়ে থাকেন। আবার যখন তাকে ধরেন তখন আর ছাড়েন না।

হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, নবী (সাঃ) বলেছেন, ‘‘আল্লাহ তাআলা অবশ্যই অত্যাচারীদেরকে ঢিল দেন। কিন্তু যখন তাদেরকে পাকড়াও করেন, তখন কোন সুযোগ দেন না। অতঃপর তিনি উক্ত আয়াত পাঠ করেছেন। (বুখারী, মুসলিম)

বর্ণনাকার সাহাবী আবু মূসা আশ’আরী বলেনঃ তারপর তিনি এ আয়াত পাঠ করলেনঃ “এরূপই আপনার প্রতিপালকের শাস্তি! তিনি শাস্তি দান করেন জনপদসমূহকে যখন ওরা যুলুম করে থাকে। নিশ্চয়ই তার শাস্তি মর্মম্ভদ, কঠিন।” [বুখারীঃ ৪৬৮৬, মুসলিমঃ ২৫৮৩]

আর আপনি কখনো মনে করবেন না যে, যালিমরা যা করে সে বিষয়ে আল্লাহ গাফিল, তবে তিনি তাদেরকে সেদিন পর্যন্ত অবকাশ দেন যেদিন তাদের চক্ষু হবে স্থির। ভীত-বিহ্বল চিত্তে উপরের দিকে তাকিয়ে তারা ছুটোছুটি করবে, নিজেদের প্রতি তাদের দৃষ্টি ফিরবে না এবং তাদের অন্তর হবে উদাস। আর যেদিন তাদের শাস্তি আসবে সেদিন সম্পর্কে আপনি মানুষকে সতর্ক করুন, তখন যারা যুলুম করেছে তারা বলবে, হে আমাদের রব! আপনি আমাদেরকে কিছু কালের জন্য অবকাশ দিন, আমরা আপনার ডাকে সাড়া দেব এবং রাসূলগণের অনুসরণ করব। তোমরা কি আগে শপথ করে বলতে না যে, তোমাদের পতন নেই। ইবরাহীমঃ ৪২-৪৪

মহান আল্লাহ (সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা) তাই কুরআনে বলেছেন:

“আমি তাদেরকে এ জন্যে সুযোগ দিয়েছি যেন তাদের পাপ বৃদ্ধি পায়। আর তাদের জন্যে রয়েছে লাঞ্ছনাকর শাস্তি।”[সূরা আলে-ইমরান; আয়াত: ৩:১৭৮]

অর্থাৎ ইতিহাসের এ ঘটনাবলীর মধ্যে এমন একটি নিশানী রয়েছে যে সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করলে মানুষের মনে নিশ্চিত বিশ্বাস জন্মাবে যে, আখেরাতের আযাব অবশ্যই আসবে এবং এ সম্পর্কিত নবীদের দেয়া খবর সত্য। তাছাড়া এ নিশানী থেকে সেই আখেরাতের আযাব কেমন কঠিন ও ভয়াবহ হবে সেকথাও জানতে পারবে। ফলে এ জ্ঞান তার মনে ভীতির সঞ্চার করে তাকে সঠিক পথে এনে দাঁড় করিয়ে দেবে।

 অর্থাৎ সেদিন আগের পরের সবাইকে একত্রিত করা হবে। কেউই বাকি থাকবে না। অন্য আয়াতে আল্লাহ্‌ বলেনঃ “আর আমি তাদের সবাইকে জমায়েত করেছি, তাদের কাউকেই ছাড়িনি।” [সূরা আল-কাহাফঃ ৪৭]

এখন প্রশ্ন থেকে যায়, ইতিহাসের সেই জিনিসটি কি, যাকে আখেরাত ও তার আযাবের আলামত বলা যেতে পারে?

 এর জবাবে বলা যায়, যে ব্যক্তি ইতিহাসকে শুধুমাত্র ঘটনার সমষ্টি মনে করে না বরং এ ঘটনার যুক্তি প্রমাণ নিয়েও মাথা ঘামায় এবং তা থেকে ফলাফল গ্রহণ করতেও অভ্যস্ত হয় সে সহজেই তা অনুধাবন করতে পারে। মানবজাতির হাজার হাজার বছরের ইতিহাসে যে ধারাবাহিকতা ও নিয়মতান্ত্রিকতার সাথে জাতি, সম্প্রদায় ও দলের উত্থান ও পতন ঘটতে থেকেছে এবং এ উত্থান ও পতনে যেমন সুস্পষ্টভাবে কিছু নৈতিক কার্যকারণ সক্রিয় থেকেছে আর পতনশীল জাতিগুলো যে ধরনের মারাত্মক ও শিক্ষণীয় অবস্থার মধ্য দিয়ে পতন ও ধ্বংসের দিকে এগিয়ে গেছে এসব কিছুই এ অকাট্য সত্যের প্রতি সুস্পষ্ট ইঙ্গিতবহ যে, মানুষ এ বিশ্ব-জাহানে এমন একটি রাষ্ট্র শক্তির অধীন যে নিছক অন্ধ প্রাকৃতিক আইনের ওপর রাজত্ব করছে না বরং তার নিজের এমন একটি ন্যায়সঙ্গত নৈতিক বিধান আছে, যার পরিপ্রেক্ষিতে সে নৈতিকতার একটি বিশেষ সীমানার ওপরে অবস্থানকারীদেরকে পুরস্কৃত করে, যারা এ সীমানার নীচে নেমে আসে তাদেরকে কিছুকালের জন্য ঢিল দিতে থাকে এবং যখন তারা এর অনেক নীচে নেমে যায় তখন তাদেরকে এমনভাবে ঠেলে ফেলে দেয় যে, তারা ভবিষ্যত বংশধরদের জন্য একটি শিক্ষণীয় ইতিহাস হয়ে যায়। একটি ধারাবাহিক বিন্যাস সহকারে সবসময় এ ঘটনাবলীর প্রকাশ হতে থাকার ফলে এ ব্যাপারে সামান্যতম সন্দেহেরও অবকাশ থাকে না যে, পুরস্কার ও শাস্তি এবং প্রতিদান ও প্রতিবিধান এ বিশ্ব-জাহানের রাষ্ট্র ব্যবস্থার একটি স্থায়ী আইন।

তারপর বিভিন্ন জাতির ওপর যেসব আযাব এসেছে সেগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে অনুমান করা যায় যে আইনের দৃষ্টিতে পুরস্কার ও শাস্তির নৈতিক দাবী এ আযাবগুলোর মাধ্যমে কিছুটা অবশ্যি পূর্ণ হয়েছে কিন্তু এখনো এ দাবীর বিরাট অংশ অপূর্ণ রয়েছে গেছে। কারণ দুনিয়ায় যে আযাব এসেছে তা কেবলমাত্র সমকালে দুনিয়ার বুকে যে প্রজন্ম বর্তমান ছিল তাদেরকেই পাকড়াও করেছে। কিন্তু যে প্রজন্ম অসৎকাজের বীজ বপন করে জুলুম-নির্যাতন ও অসৎকাজের ফসল তৈরী করে তা কাটার আগেই দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছিল এবং যাদের কৃতকর্মের ফল ভোগ করতে হলো পরবর্তী প্রজন্মকে, তারা যেন প্রতিদান ও প্রতিশোধের আইনের কার্যকারিতা থেকে পরিষ্কার গা বাঁচিয়ে চলে গেছে। এখন যদি আমরা ইতিহাস অধ্যয়নের মাধ্যমে বিশ্ব-জাহানের রাষ্ট্র ব্যবস্থার মেজাজ সঠিকভাবে বুঝতে পেরে থাকি। তাহলে আমাদের এ অধ্যয়নই একথার সাক্ষ্য দেবার জন্য যথেষ্ট যে, ইনসাফ ও বুদ্ধিবৃত্তির দৃষ্টিতে প্রতিদান ও প্রতিশোধের আইনের যে নৈতিক চাহিদাগুলো এখনো অপূর্ণ রয়ে গেছে সেগুলো পূর্ণ করার জন্য এ ভারসাম্যপূর্ণ ন্যায়নিষ্ঠ রাষ্ট্র ব্যবস্থা নিশ্চয়ই আবার একটি দ্বিতীয় বিশ্বের জন্ম দেবে এবং সেখানে দুনিয়ার সমস্ত জালেমকে তাদের কৃতকর্মের পুরোপুরি বদলা দেয়া হবে। সেই বদলা দুনিয়ার এ আযাবগুলো থেকে হবে অনেক বেশী কঠিন ও কঠোর। (দেখুন সূরা আ’রাফ ৩০ এবং সূরা ইউনূস ১০ টীকা।)

কিয়ামত সংঘটিত হওয়াতে দেরী হওয়ার একমাত্র কারণ হল যে, আল্লাহ তাআলা তার জন্য একটি সময় নির্ধারিত করে রেখেছেন। অতঃপর যখন সেই নির্ধারিত সময় এসে যাবে, তখন এক মুহূর্তের জন্যও বিলম্ব করা হবে না।

অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেছেনঃ “সেদিন রূহ ও ফিরিশতাগণ সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াবে; দয়াময় যাকে অনুমতি দেবেন সে ছাড়া অন্যরা কথা বলবে না এবং সে সঠিক বলবে।” [সূরা আন-নাবাঃ ৩৮]

 অর্থাৎ সেদিনের সেই আড়ম্বরপূর্ণ মহিমাম্বিত আদালতে অতি বড় কোন গৌরবান্বিত ব্যক্তি এবং মর্যাদা সম্পন্ন ফেরেশতাও টুঁ শব্দটি করতে পারবে না। আর যদি কেউ সেখানে কিছু বলতে পারে তাহলে একমাত্র বিশ্ব-জাহানের সর্বময় ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের মহান অধিকারীর নিজের প্রদত্ত অনুমতি সাপেক্ষেই বলতে পারবে।

 উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ যখন এ আয়াত “তাদের মধ্যে কেউ হবে হতভাগ্য আর কেউ হবে ভাগ্যবান” নাযিল হলো তখন আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর নবী! তা হলে কি জন্য আমল করব? যে ব্যাপারে চুড়ান্ত ফয়সালা হয়ে গেছে সেটার জন্য আমল করব নাকি চুড়ান্ত ফয়সালা হয়নি এমন বস্তুর জন্য আমল করব? তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ “হে উমর! বরং যে ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে এবং কলম দিয়ে লিখা হয়ে গেছে এমন বিষয়ের জন্য আমল করবে। তবে যাকে যে জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে তার জন্য সেটাকে সহজ করে দেয়া হবে।” [তিরমিযীঃ ৩১১১] অর্থাৎ তাকদীরের খবর আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। যদি সে ঈমানদার হিসেবে লিখা হয়ে থাকে তবে তার জন্য সৎকাজ করা সহজ করে দেয়া হবে। আর যদি বদকার ও কাফের হিসেবে লেখা হয়ে থাকে তবে সে ভাল কাজ করতে চাইবে না, ভাল কাজ করা তার দ্বারা সহজ হবে না। তাই প্রত্যেকের উচিত ভাল কাজ করতে সচেষ্ট হওয়া। কারণ ভাল কাজের প্রতি প্রচেষ্টাই তার ভাগ্য ভাল কি মন্দ হয়েছে তার প্রতি প্রমাণবহ। তা না করে নিছক তাকদীরের উপর নির্ভর করে বসে থাকলে বুঝতে হবে যে, সে অবশ্যই হতভাগা, তার তাকদীরে ভালো লিখা হয়নি। যা অধিকাংশ দুর্ভাগা মানুষ সবসময় করে থাকে। তারা ভাগ্যকে অযথা টেনে এনে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকে এবং ভাগ্য নিয়ে অযথা বাদানুবাদ করে।

অপরপক্ষে, যাদের ভাগ্য ভাল, তারা তাকদীরের উপর ঈমান রাখে কিন্তু সেটাকে টেনে এনে হাত-পা গুটিয়ে বসে না থেকে ভাল কাজ করতে সদা সচেষ্ট থাকে। তারপর যদি ভাল কিছু পায় তবে বুঝতে হবে যে, প্রচেষ্টা করার কথাও তার তাকদীরে লিখা আছে। আর যারা সৎ কাজের চেষ্টা না করে অযথা তাকদীর নিয়ে বাড়াবাড়ি করে তাদের সম্পর্কে বুঝতে হবে যে, তারা সৎকাজের প্রচেষ্টা করবে না এটাই লিখা হয়েছিল সে জন্য তারা দুর্ভাগা। তাকদীর সম্পর্কে এটাই হচ্ছে মূল কথা। [দেখুন, শাইখ মুহাম্মাদ ইবন সালেহ আল-উসাইমীনঃ আলকাওলুল মুফীদ আলা কিতাবিত তাওহীদ ২/৪১৩-৪১৪]

হাদীসে এসেছে,

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মৃত্যুকে হাশরের মাঠে একটি সাদা-কালো ছাগলের সূরতে নিয়ে আসা হবে তারপর একজন আহবানকারী আহবান করবেন, হে জান্নাতবাসী। ফলে তারা ঘাড় উঁচু করবে এবং তাকাবে। তারপর তাদেরকে বলা হবে, তোমরা কি এটাকে চিন? তারা বলবেঃ হ্যাঁ, এটা হলো, মৃত্যু৷ তাদের প্রত্যেকেই তা দেখেছে। তারপর আহবানকারী আহবান করে ডাকবেন, হে জাহান্নামবাসী! তখন তারা ঘাড় উঁচু করে তাকাবে। তখন তাদের বলা হবে, তোমরা কি এটাকে চিন? তারা বলবে, হ্যাঁ, আর তারা প্রত্যেকে তা দেখেছে, তারপর সেটাকে জবেহ করা হবে। তারপর বলবেনঃ হে জান্নাতবাসী! স্থায়ীভাবে তোমরা এখানে থাকবে সুতরাং কোন মৃত্যু নেই। আর হে জাহান্নামবাসী! স্থায়ীভাবে এখানে থাকবে সুতরাং কোন মৃত্যু নেই। তারপর তিনি এ আয়াত পাঠ করলেনঃ তাদেরকে সতর্ক করে দিন পরিতাপের দিন সম্বন্ধে, যখন সব সিদ্ধান্ত হয়ে যাবে। এখন তারা গাফিল এবং তারা বিশ্বাস করে না। (সূরা মারইয়ামঃ ৩৯) [বুখারীঃ ৪৭৩০]

 এ শব্দগুলোর অর্থ আখেরাতের আসমান ও যমীন হতে পারে। এ জন্যই হাসান বসরী বলেন, সেদিন আসমান ও যমীন তো পরিবর্তিত হবে। আর সে আসমান ও যমীন স্থায়ী হবে। তাই তাদের অবস্থারও পরিবর্তন হবে না। [ইবন কাসীর] অথবা এমনও হতে পারে যে, প্রতিটি জান্নাত ও জাহান্নামেরই আলাদা আসমান ও যমীন রয়েছে সে অনুসারে এটা বলা হয়েছে। এটি ইবন আব্বাস থেকে বর্ণিত। [ইবন কাসীর] অথবা এর অর্থ যতক্ষণ আসমান আসমান থাকবে আর যতক্ষণ যমীন যমীন থাকবে। আর আখেরাতে সেটা অপরিবর্তনীয়। এটি আব্দুর রহমান ইবন যায়দ বলেছেন। [ইবন কাসীর] অথবা নিছক সাধারণ বাকধারা হিসেবে একে চিরকালীন স্থায়িত্ব অর্থে বর্ণনা করা হয়েছে। [ইবন কাসীর]

এই বাক্য দ্বারা কিছু মানুষ এই বিভ্রান্তির শিকার হয়েছে যে, জাহান্নামের আযাব কাফেরদের জন্যও চিরস্থায়ী নয়; বরং সাময়িক। অর্থাৎ, ততদিন থাকবে, যতদিন আকাশ ও পৃথিবী থাকবে। (তারপর শেষ হয়ে যাবে।) কিন্তু এই কথা ঠিক নয়। কারণ এখানে مَا دَامَتِ السَّمَوَاتُ وَالأرضُ কথাটি আরববাসীদের দৈনন্দিন কথাবার্তা ও পরিভাষা অনুযায়ী অবতীর্ণ হয়েছে। আরববাসীদের অভ্যাস ছিল যে, যখন তারা কোন বস্তুর চিরস্থায়িতত্ত্ব প্রমাণ করার উদ্দেশ্য হত, তখন তারা বলত,(هذا دائمٌ دوام السموات والأرض) ‘‘এই বস্তু আকাশ ও পৃথিবীর মত চিরস্থায়ী।

 সেই পরিভাষাকে কুরআনে বর্ণনা করা হয়েছে, যার অর্থ কাফের ও মুশরিকরা চিরকালব্যাপী জাহান্নামে থাকবে, যা কুরআন বিভিন্ন স্থানে, خَالِدِينَ فِيهَآ أَبَدًا শব্দ দ্বারা বর্ণনা করেছে। তার দ্বিতীয় এক অর্থ এও করা হয়েছে যে, আকাশ ও পৃথিবী থেকে উদ্দেশ্য হল ‘জিনস’ (শ্রেণী)। অর্থাৎ, ইহলৌকিক আকাশ ও পৃথিবী; যা ধ্বংস হয়ে যাবে। কিন্তু এ ছাড়া পারলৌকিক আকাশ ও পৃথিবী পৃথক হবে।

 যেমন কুরআনে তার পরিষ্কার বর্ণনা এসেছে।

 يوم تبدل الأرض غير الأرض والسموات

অর্থাৎ, (স্মরণ কর,) যেদিন এই পৃথিবী পরিবর্তিত হয়ে অন্য পৃথিবী হবে এবং আকাশমন্ডলীও। আর মানুষ (কবর থেকে) বের হবে একক প্রতাপশালী আল্লাহর জন্য (সূরা ইবরাহীম ৪৮)

ওরা তোমাকে পর্বতসমূহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বল, ‘আমার প্রতিপালক সে সবকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে উড়িয়ে দেবেন। অতঃপর তিনি ভূমিকে মসৃণ সমতল ভূমিতে পরিণত করবেন। যাতে তুমি উঁচু-নীচু দেখবে না।’ সেই দিন ওরা আহবানকারীর অনুসরণ করবে, এই ব্যাপারে (তাদের) কোন বক্রতা থাকবে না। আর পরম দয়াময়ের নিকট সকল শব্দ স্তব্ধ হয়ে যাবে। সুতরাং মৃদু পদধ্বনি ব্যতীত তুমি কিছুই শুনবে না। [সূরা ত্বাহাঃ১০৫ -১০৮}

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ কেয়ামতের দিন ময়দার রুটির মত পরিস্কার ও সাদা পৃথিবীর বুকে মানবজাতিকে পুনরুত্থিত করা হবে। এতে কারো কোন চিহ্ন (গৃহ, উদ্যান, বৃক্ষ, পাহাড়, টিলা ইত্যাদি) থাকবে না। [বুখারীঃ ৬৫২১, মুসলিমঃ ২৭৯০]

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট এক ইয়াহুদী এসে প্রশ্ন করলঃ যেদিন পৃথিবী পরিবর্তন করা হবে, সেদিন মানুষ কোথায় থাকবে? তিনি বললেনঃ পুলসিরাতের নিকটে অন্ধকারে থাকবে। [মুসলিমঃ ৩১৫]

 আর পারলৌকিক উক্ত আকাশ ও পৃথিবী, জান্নাত ও জাহান্নামের মত চিরস্থায়ী হবে। এই আয়াতে সেই পারলৌকিক আকাশ-পৃথিবীর কথা বলা হয়েছে, ইহলৌকিক আকাশ-পৃথিবীর কথা নয়, যা ধ্বংস হয়ে যাবে। (ইবনে কাসীর) এই উভয় অর্থের যে কোন অর্থ নেওয়া হলে আয়াতের উদ্দেশ্য পরিষফুটিত হয়ে যাবে এবং উপস্থাপিত সমস্যা দূর হয়ে যাবে। ইমাম শওকানী (রঃ) এর আরো কয়েকটি অর্থ বর্ণনা করেছেন, যা জ্ঞানীরা দেখতে পারেন। (ফাতহুল কাদীর)

অর্থাৎ তাদেরকে এ চিরন্তন আযাব থেকে বাঁচাবার মতো আর কোন শক্তিই তো নেই। তবে আল্লাহ নিজেই কিছু ইচ্ছে করেন সেটা ভিন্ন। এখান প্রশ্ন হচ্ছে, কাফেরের আযাব তো কখনো শেষ হবে না, তা হলে এখানে ব্যতিক্রম কি হতে পারে? এ ব্যাপারে আলেমগণ বিভিন্ন মত দিয়েছেন। তবে সবেচেয়ে গ্রহণযোগ্য মত হচ্ছে তাই যা ইমাম ইবন জারীর তাবারীসহ অধিকাংশ সত্যনিষ্ঠ আলেম গ্রহণ করেছেন। আর তা হচ্ছে, এখানে গোনাহগার ঈমানদারদের কথা বলা হয়েছে। যাদেরকে আল্লাহর অনুমতিক্রমে নবী-রাসূল, ফিরিশতা ও মুমিনদের সুপারিশের মাধ্যমে আল্লাহ্ তাআলা জাহান্নাম থেকে বের করবেন। তারপর রহমতের মালিক আল্লাহ তা’আলা নিজ হাতে এমন লোকদেরকে বের করবেন, যাদের অন্তরে সামান্যতম ঈমানও অবশিষ্ট ছিল। এ ব্যাপারে বিভিন্ন হাদীসে বিস্তারিত এসেছে। [ইবন কাসীর]

এই ব্যতিক্রমও পাপী মু’মিনদের জন্য। অর্থাৎ, অন্য মু’মিনদের মত এই গোনাহগার মু’মিনরা প্রথম থেকে শেষ অবধি জান্নাতে থাকবে না। বরং শুরুতে কিছু দিন তাদেরকে জাহান্নামে থাকতে হবে, পরে আল্লাহর ইচ্ছায় আম্বিয়া ও মু’মিনদের সুপারিশে তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, যেমন সহীহ হাদীস দ্বারা এ কথা প্রমাণিত।

غير مجذوذ এর অর্থ হল غير مقطوع অর্থাৎ, এমন অফুরন্ত অনুদান যা শেষ হওয়ার নয়। এই বাক্য দ্বারা এই কথা পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে যে, যে সকল পাপী মু’মিনদেরকে জাহান্নাম থেকে বে’র করে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, তারা ক্ষণস্থায়ী নয়, বরং চিরস্থায়ী হবে এবং সকল জান্নাতীগণ আল্লাহ প্রদত্ত অনুদান ও তাঁর নিয়ামত দ্বারা উপকৃত হতে থাকবে, তা কোন কালে কখনও শেষ হবে না।

এর অর্থ এ নয় যে, এ মাবুদদের ব্যাপারে সত্যিই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মনে কোন প্রকার সন্দেহ ছিল। বরং আসলে একথাগুলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করে সাধারণ মানুষকে শুনানো হচ্ছে। [কুরতুবী] এর অর্থ হচ্ছে, এরা যে এসব মাবুদের ইবাদত করছে এবং এদের কাছে প্রার্থনা করছে ও ভিক্ষা চাচ্ছে, নিশ্চয়ই এরা কিছু দেখে থাকবে যে কারণে এরা এদের থেকে উপকৃত হবার আকাংখা পোষণ করে-কোন বিবেক বুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তির মনে এ ধরনের কোন সংশয় থাকা উচিত নয়। সত্যি কথা হচ্ছে এই যে, এদের যাবতীয় ইবাদত, নযরানা ও প্রার্থনা আসলে কোন অভিজ্ঞতা ও সত্যিকার পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে নয় বরং এসব কিছু করা হচ্ছে নিছক অন্ধ অনুসৃতির ভিত্তিতে। এসব বেদী ও আস্তানা পূর্ববর্তী জাতিদেরও ছিল। কিন্তু যখন আল্লাহর আযাব এলো তখন তারা ধ্বংস হয়ে গেলো এবং বেদী ও আস্তানাগুলো কোন কাজে লাগলো না।