সূরা ইউসুফঃ ৯ম রুকু(৬৯-৭৯) আয়াত

মিসরে পৌছার পর যখন সব ভাই ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর দরবারে উপস্থিত হল এবং তিনি দেখলেন যে, ওয়াদা অনুযায়ী তারা তার সহোদর ছোট ভাইকেও নিয়ে এসেছে, তখন ইউসুফ আলাইহিস সালাম ছোট ভাই বিনইয়ামীনকে বিশেষভাবে নিজের সাথে রাখলেন।

ইউসুফ আ যখন পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হোন অর্থাৎ যখন ভাইরা কূপে ফেলে দিয়েছিলো তখন তিনি ছিলেন একজন বালক, বাইবেলের ভাষায় ১৪-১৫ বছর কিন্তু কুর’আনের ভাষায় যা বলা হয় তা হলো ১০ বছরের নীচে কারন যখন কাফেলা কূপ থেকে তাকে উদ্ধার করেছিলো ব্যক্তি বলেছিলো- قَالَ يَٰبُشْرَىٰ هَٰذَا غُلَٰمٌ

“কী সুখবর! এখানে তো দেখছি একটি বালক।(সূরা ইউসুফ আয়াত ১৯)।

গোলাম বলা হয় তাদের যার বয়স ১০ এর নীচে।

সেই সময় থেকে তিনি কতদিন মিসরে আযিযের বাসায় ছিলেন, কতদিন জেলখানায় ছিলেন, মিসরের ক্ষমতায় আসার পর ৭বছর উত্তম ফসল ফলেছিলো,এরপর দূর্ভিক্ষের সময় এসেছে, এই সময় ভাইদের সাথে সাক্ষাত। দীর্ঘ এতো বছর পরেও এখন ইউসুফ আ এর ছোট ভাই এর বয়স কুর’আনের ভাষায় যা মুফাসসীর উল্লেখ করেছেন যে যেহেতু ইয়াকুব আ নিজেই ছোট ছেলের নিরাপত্তার কথা বলেছেন, বিনইয়ামীনের কোনো বক্তব্য আসেনি, তাহলে বিনইয়ামীনের বয়স তখনও নাবালক।

একুশ বাইশ বছরের ব্যবধানে দু’ভাইয়ের পুনর্মিলনের পর যে অবস্থার সৃষ্টি হয়ে থাকবে এ বাক্যে তার সম্পূর্ণ চেহারাটাই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। হযরত ইউসূফ (আ) নিজের অবস্থা বর্ণনা করে কোন্ কোন্ অবস্থার মধ্য দিয়ে তিনি আজকের এ মর্যাদায় পৌঁছেছেন তা বলে থাকবেন। বিন ইয়ামীন বর্ণনা করে থাকবেন তাঁর অন্তর্ধানের পর বৈমাত্রেয় ভাইয়েরা তার সাথে কেমনতর দুর্ব্যবহার করেছে। হযরত ইউসুফ (আ) ভাইকে এই বলে সান্ত্বনা দিয়ে থাকবেন, এখন থেকে তুমি আমার কাছেই থাকবে, এ জালেমদের খপ্পরে তোমাকে আর দ্বিতীয়বার পড়তে দেবো না।

কতিপয় মুফাসসিরীন(ইমাম রাযী রহ) বলেন যে, এক একটি রুমে দু’জন করে ভাইকে থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছিল, এমনিভাবে বিনয়্যামীন যখন একাই অবশিষ্ট রয়ে গেলেন, তখন ইউসুফ (আঃ) তাঁকে একটি পৃথক রুমে থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন। অতঃপর নির্জনে তাঁর সাথে আলাপ-আলোচনা করলেন এবং পূর্বের ঘটনা উল্লেখ করে বললেন যে, এই ভায়েরা আমার সাথে যে আচরণ করেছে তার জন্য দুঃখ করো না। আর কতিপয় মুফাসসিরীন বলেন যে, বিনয়্যামীনকে আটকানোর জন্য যে ফন্দি বা বাহানা করার ছিল, সে সম্পর্কেও তাঁকে জানিয়ে দিয়েছিলেন, যাতে তিনি পেরেশান না হন। (ইবনে কাসীর)

কুরআনুল কারীম এ পাত্রটিকে এক জায়গায় السِّقَايَةَ শব্দের দ্বারা এবং অন্যত্র (صُوَاعَ الْمَلِكِ) [সূরা ইউসুফঃ ৭০ ও ৭২] শব্দের দ্বারা ব্যক্ত করেছে। السِّقَايَةَ শব্দের অর্থ পানি পান করার পাত্র এবং صُوَاعَ শব্দটিও এমনি ধরনের পাত্রের অর্থে ব্যবহৃত হয়। [ইবন কাসীর] একে مَلِكٌ তথা বাদশাহর দিকে নির্দেশিত করার ফলে আরো জানা গেল যে, এ পাত্রটি বিশেষ মূল্যবান ও মর্যাদাবান ছিল। এ পাত্রটি যথেষ্ট মূল্যবান ও মর্যাদাবান হওয়া ছাড়াও বাদশাহর সাথে এর বিশেষ সম্পর্কও ছিল। বাদশাহ নিজে তা দ্বারা পান করতেন। [বাগভী]

—– আলোচ্য আয়াতসমূহে বর্ণিত হয়েছে যে, সহোদর ভাই বিনইয়ামীনকে রেখে দেয়ার জন্য ইউসুফ আলাইহিস সালাম একটি কৌশল ও তদবীর অবলম্বন করলেন। যখন সব ভাইকে নিয়ম মাফিক খাদ্যশস্য দেয়া হল, তখন প্রত্যেক ভাইয়ের খাদ্যশস্য পৃথক পৃথক উটের পিঠে পৃথক পৃথক নামে চাপানো হল। বিনইয়ামীনের খাদ্যশস্য যে উটের পিঠে চাপানো হল, তাতে একটি পাত্র গোপনে রেখে দেয়া হল।

কোন কোন মুফাসসির মনে করেন, সম্ভবত পেয়ালা রেখে দেবার কাজটা ইউসুফ আলাইহিস সালাম নিজের ভাইয়ের সম্মতি নিয়ে তার জ্ঞাতসারেই করেছিলেন। [বাগভী] আগের আয়াতে এদিকে প্রচ্ছন্ন ইংগিত রয়েছে। ইউসুফ আলাইহিস সালাম ভাইকে রক্ষা করতে চাচ্ছিলেন। ভাই নিজেও এ যালেমদের সাথে ফিরে না যেতে চেয়ে থাকবেন। কিন্তু ইউসুফের নিজের পরিচয় প্রকাশ না করে তাকে আটকে রাখা এবং তার মিসরে থেকে যাওয়া সম্ভব ছিল না। আর এ অবস্থায় এ পরিচয় প্রকাশ করাটা কল্যাণকর ছিল না। তাই বিনইয়ামীনকে আটকে রাখার জন্য দু’ভাইয়ের মধ্যে এ পরামর্শ হয়ে থাকবে। যদিও এর মধ্যে কিছুক্ষণের জন্য ভাইয়ের অপমান অনিবার্য ছিল, কারণ তার বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ আনা হচ্ছিল, কিন্তু পরে উভয় ভাই মিলে আসল ব্যাপারটি জনসমক্ষে প্রকাশ করে দিলেই এ কলংকের দাগ অতি সহজেই মুছে ফেলা যেতে পারবে। [দেখুন, বাগভী]

 —–অর্থাৎ কিছুক্ষণ পর জনৈক ঘোষক ডেকে বললঃ হে কাফেলার লোকজন তোমরা চোর। এখানে ثم দ্বারা জানা যায় যে, এ ঘোষণা তৎক্ষণাৎ করা হয়নি; বরং কাফেলা রওয়ানা হয়ে যাওয়ার পর করা হয়েছে- যাতে কেউ জালিয়াতির সন্দেহ না করতে পারে। [বাগভী] মোটকথা, ঘোষক ইউসুফ-ভ্রাতাদের কাফেলাকে চোর আখ্যা দিল। তাদের এ ঘোষণার যৌক্তিক কারণ ছিল। কেননা, ঘটনার যে সরল আকৃতিটি সহজেই চোখে ধরা পড়ে তা হচ্ছে এই যে, পেয়ালাটি হয়তো নীরবে রেখে দেয়া হয়েছিল, পরে সরকারী কর্মচারীরা সেটি খুঁজে না পেলে অনুমান করা হয়েছিল, এটা নিশ্চয়ই সেই কাফেলার অন্তর্ভুক্ত কোন লোকের কাজ যারা এখানে অবস্থান করেছিল। সুতরাং কর্মচারীরা সেটা না জেনেই তাদেরকে চোর বলেছিল। [ফাতহুল কাদীর]

ইউসুফ-ভ্রাতাগণ ঘোষণাকারীদের দিকে মুখ ফিরিয়ে বললঃ তোমরা আমাদেরকে চোর বলছ। প্রথমে একথা আমাদের বল যে, তোমাদের কি বস্তু চুরি হয়েছে? এখানে যেহেতু সর্বশেষ খাদ্যগ্রহনকারীদের মধ্যে ছিলো ইউসুফ আ এর ভাইরা। তারা নিজেরাই আগে ভাগেই নিজেদের নির্দোষ রাখার জন্য জিজ্ঞেস করে ঘোষকসহ অন্য কর্মচারীদের।

এখানে তারা বলতে ত্রান বিতরনে আরো যে কর্মচারীরা ছিলো তাদের বুঝানো হয়েছে। রাজার পানপাত্র হারিয়েছে তারা জানালো।

এরপরের অংশ অনেক মুফাসসির উল্লেখ করেছেন যে ইউসুফ আ অর্থাৎ খাদ্য ভান্ডারের যিনি মালিক তিনি ঘোষনা দিয়ে বলেছেন যে, যে ব্যক্তি তা বের করে দেবে সে এক উটের বোঝাই পরিমাণ খাদ্যশস্য পুরস্কার পাবে এবং আমি এর জামিন।

আমি এই কথার যামানত দিচ্ছি যে, তল্লাশি চালানোর পূর্বে যে ব্যক্তি এই শাহী পানপাত্র আমাদেরকে ফেরত বা খুঁজে দেবে, তাকে পুরস্কার অথবা পারিশ্রমিক স্বরূপ এতটা পরিমাণ শস্য প্রদান করা হবে, যা একটি উট বহন করতে পারে।

শাহী ঘোষক যখন ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর ভ্রাতাদেরকে চোর বলল, তখন তারা উত্তরে বললঃ তোমরা আমাদের অবস্থা সম্পর্কে ওয়াকিফহাল আছ যে আমরা এখানে অশান্তি সৃষ্টি করতে আসিনি এবং আমরা চোর নই। কেননা, তারা তাদের ভাল দিকগুলো দেখেছে, যাতে বোঝা যায় যে, আমরা এ খারাপ গুণের উপযুক্ত /৯লোক নই। [ইবন কাসীর]

স্বাভাবিকভাবে আরবরা ওয়াল্লাহি বলে থাকে শপথ করার ক্ষেত্রে। কিন্তু

এখানে তাল্লাহী বলে জোড়াল দৃঢ়  শপথ বা অবস্থান বুঝায় যেমন ইবরাহীম আ বলেছিলেন

 ২১ : ৫৭ وَ تَاللّٰهِ لَاَكِیۡدَنَّ اَصۡنَامَكُمۡ بَعۡدَ اَنۡ تُوَلُّوۡا مُدۡبِرِیۡنَ

আর আল্লাহর শপথ, তোমরা পিছন ফিরে চলে গেলে আমি তোমাদের মূর্তিগুলো সম্বন্ধে অবশ্যই কৌশল অবলম্বন করব। আম্বিয়াঃ ৫৭

১২ : ৭৪ قَالُوۡا فَمَا جَزَآؤُهٗۤ اِنۡ كُنۡتُمۡ كٰذِبِیۡنَ

৭৪. তারা বলল, যদি তোমরা মিথ্যাবাদী হও তবে তার শাস্তি কী?

তোমাদের মালপত্রে উক্ত শাহী পানপাত্র পাওয়া গেলে তার শাস্তি কি হবে?

ইউসুফ ভ্রাতাগণ বললঃ যার আসবাবপত্র থেকে চোরাই মাল বের হবে; সে নিজেই দাসত্ব বরণ করবে। আমরা চোরকে এমনি ধরণের সাজা দেই। উল্লেখ্য, এ ভাইয়েরা ছিল ইবরাহিমী পরিবারের সন্তান। কাজেই চুরির ব্যাপারে তারা যে আইনের কথা বলে তা ছিল ইবরাহিমী শরীয়াতের আইন। এ আইন অনুযায়ী চোরের শাস্তি ছিল, যে ব্যক্তির সম্পদ সে চুরি করেছে তাকে তার দাসত্ব করতে হবে। উদ্দেশ্য, ইয়াকুব আলাইহিস সালাম-এর শরীআতেও চোরের শাস্তি এই যে, যার মাল চুরি করে সে চোরকে গোলাম করে রাখবে। [কুরতুবী; ইবন কাসীর]

সরকারী তল্লাশীকারীরা প্রকৃত ষড়যন্ত্র ঢেকে রাখার জন্য প্রথমেই অন্য ভাইদের আসবাবপত্র তালাশ করল। প্রথমেই বিনইয়ামীনের আসবাবপত্র খুলল না, যাতে তাদের সন্দেহ না হয়। [কুরতুবী; ইবন কাসীর]

—– অর্থাৎ সব শেষে বিনইয়ামীনের আসবাবপত্র খোলা হলে তা থেকে শাহী পাত্রটি বের হয়ে এল। তখন ভাইদের অবস্থা দেখে কে? লজ্জায় সবার মাথা হেট হয়ে গেল। তারা বিনইয়ামীনকে খারাপ কথা বলতে লাগল। [কুরতুবী; ইবন কাসীর]

—- অর্থাৎ এমনিভাবে আমি ইউসুফের খাতিরে কৌশল করেছি। এ সমগ্র ধারাবাহিক ঘটনাবলীতে আল্লাহর পক্ষ থেকে ইউসুফের সমর্থনে সরাসরি কোন কৌশলটি অবলম্বন করা হয়েছিল তা অবশ্যি এখানে ভেবে দেখার মতো বিষয়।

একথা সুস্পষ্ট যে, পেয়ালা রাখার কৌশলটি ইউসুফ নিজেই করেছিলেন। এটাও সুস্পষ্ট, সরকারী কর্মচারীদের চুরির সন্দেহে কাফেলাকে আটকানোও একটি নিয়ম মাফিক কাজ ছিল, যা এ ধরনের অবস্থায় সব সরকারী কর্মচারীই করে থাকে।

অর্থাৎ, আমি ইউসুফকে অহীর মাধ্যমে এই কৌশলটি বুঝিয়ে দিলাম। এ থেকে জানা গেল যে, কোন সঠিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য এ ধরনের কৌশল-পথ অবলম্বন করা বৈধ; যার বাহ্যিক রূপ বাহানা ও ফন্দি, এই শর্তে যে উক্ত পথ যেন কোন শরয়ী নিয়মের পরিপন্থী না হয়। (ফাতহুল কাদীর)

তাহলে আল্লাহর সেই কৌশল কোনটি? উপরের আয়াতের মধ্যে অনুসন্ধান চালালে এ ছাড়া আর দ্বিতীয় কোন জিনিসই এর ক্ষেত্র হিসেবে পাওয়া যেতে পারে না যে, সরকারী কর্মচারীরা নিয়ম বিরোধীভাবে নিজেরাই সন্দেহপূর্ণ অপরাধীদের কাছে চুরির শাস্তি জিজ্ঞেস করলো এবং জবাবে তারাও এমন শাস্তির কথা বললো যা ইবরাহিমী শরীয়াতের দৃষ্টিতে চোরকে দেয়া হতো। এর ফলে দুটি লাভ হলো।

প্রথমত ইউসুফ ইবরাহিমী শরীআতকে কার্যকর করার সুযোগ পেলেন এবং দ্বিতীয়ত নিজের ভাইকে হাজতে পাঠাবার পরিবর্তে তিনি নিজের কাছে রাখতে পারলেন। তিনি বাদশাহর আইনানুযায়ী ভাইকে গ্রেফতার করতে পারতেন না। কেননা, মিসরের আইনে চোরের এই শাস্তি ছিল না। কিন্তু তারা এখানে ইউসুফভ্রাতাদের কাছ থেকেই ইয়াকুব আলাইহিস সালাম-এর শরীআতানুযায়ী চোরের বিধান জেনে নিয়েছিল। এ বিধান দৃষ্টে বিনইয়ামীনকে আটকে রাখা বৈধ হয়ে গেল। এমনিভাবে আল্লাহ তা’আলার ইচ্ছায় ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হল।

—- অর্থাৎ আমি যাকে ইচ্ছা, উচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করে দেই, যেমন এ ঘটনায় ইউসুফের মর্যাদা তার ভাইদের তুলনায় উচ্চ করে দেয়া হয়েছে। প্রত্যেক জ্ঞানীর উপরেই তদপেক্ষা অধিক জ্ঞানী বিদ্যমান রয়েছে। উদ্দেশ্য এই যে, আমরা জ্ঞান ও ঈমানের দিক দিয়ে সৃষ্টজীবের মধ্যে একজনকে অন্যজনের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করে থাকি। [কুরতুবী] মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন-

বলুন, ‘হে সার্বভৌম শক্তির মালিক আল্লাহ! আপনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমতা প্রদান করেন এবং যার থেকে ইচ্ছা ক্ষমতা কেড়ে নেন; যাকে ইচ্ছা আপনি সম্মানিত করেন আর যাকে ইচ্ছা আপনি হীন করেন। কল্যাণ আপনারই হাতে। নিশ্চয়ই আপনি সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান। আলে ইমরানঃ ২৬

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক হাদীসে বলেছেনঃ অকল্যাণ আপনার পক্ষ থেকে নয়। [মুসলিমঃ ৭৭১] কেননা, আল্লাহ্ তা’আলা বান্দার জন্য অকল্যাণ চান না। মানুষের যাবতীয় অকল্যাণ মানুষের হাতের কামাই করা।

 হাসান বসরী বলেন, একজন যত বড় জ্ঞানীই হোক, তার তুলনায় আরো অধিক জ্ঞানী থাকে। মানবজাতির মধ্যে যদি কেউ এমন হয় যে, তার চাইতে অধিক জ্ঞানী আর নেই, তবে এ অবস্থায়ও আল্লাহ রাব্বুল আলামীন-এর জ্ঞান সবারই ঊর্ধ্বে। [ইবন কাসীর]

اِنَّ اللّٰهَ وَاسِعٌ عَلِیۡمٌ– নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বদিক পরিবেষ্টনকারী, সর্বজ্ঞ। বাকারাঃ১১৫

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

« الْكَيِّسُ مَنْ دَانَ نَفْسَهُ وَعَمِلَ لِمَا بَعْدَ الْمَوْتِ ، وَالْعَاجِزُ مَنْ أَتْبَعَ نَفْسَهُ هَوَاهَا وَتَمَنَّى عَلَى اللَّهِ ».

‘প্রকৃত জ্ঞানী সেই ব্যক্তি, যে নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং মৃত্যু পরবর্তী জীবনের জন্য নেক কাজ করেছে। আর অক্ষম সেই যে নিজের নফসকে প্রবৃত্তির পেছনে পরিচালিত করে এবং আল্লাহর কাছে কেবল প্রত্যাশা করে।’

হাদীসে নফসকে নিয়ন্ত্রণের অর্থ হলো, কিয়ামতের দিন হিসাব নেয়ার আগে দুনিয়ায় নিজেই নিজের হিসেব নেয়া তথা মুহাসাবা করা।

উক্ত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘প্রকৃত জ্ঞানী’র পরিচয় দিয়েছেন।

আসলে নিজেদের অপমান স্খলন করার জন্য তারা একথা বলে। প্রথমে তারা বলে এসেছে, আমরা চোর নই। আর এখন দেখছে, তাদের ভাইয়ের থলের মধ্যে থেকে হারানো জিনিসটি বের হচ্ছে। কাজেই এখন সঙ্গে সঙ্গেই একটি মিথ্যা কথা বলে সেই ভাই থেকে নিজেদেরকে আলাদা করে নিয়েছে এবং তার সাথে তার আগের ভাইকেও জড়িয়ে ফেলেছে। এ থেকে অনুমান করা যায়, হযরত ইউসুফের অবর্তমানে বিন ইয়ামিনের সাথে এ ভাইয়েরা কোন্ ধরনের ব্যবহার করে আসছে এবং কি কারণে তার ও হযরত ইউসুফের মনে এ আকাঙ্ক্ষা জেগেছে যে, সে তাদের সাথে ফিরে না গিয়ে ওখানে থেকে যাক।

কতিপয় ব্যাখ্যাকারী ইউসুফ (আঃ)-এর চুরির ব্যাপারে দুটি রহস্যময় কথা উল্লেখ করেছেন, যা কোন নির্ভরযোগ্য প্রমাণের উপর ভিত্তিশীল নয়।

 বিশুদ্ধ কথা এটাই মনে হচ্ছে যে, তাঁরা নিজেদেরকে তো নেহাত সাধুতা ও সচ্চরিত্রের অধিকারী প্রমাণ করলেন। আর ইউসুফ (আঃ) ও বিনয়্যামীনকে হীন চরিত্রের সাব্যস্ত করলেন এবং মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে তাঁদেরকে চোর ও বেঈমান প্রতিপন্ন করার অপচেষ্টা করলেন।

ইউসুফ আলাইহিস সালাম মনে মনে বললেনঃ তোমাদের স্তর ও অবস্থাই মন্দ যে, জেনেশুনে ভাইদের প্রতি চুরির দোষারোপ করছ। আরও বললেনঃ তোমাদের কথা সত্য কি মিথ্যা সে সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলাই অধিক জানেন। [তাবারী; ইবন কাসীর] কুরতুবী বলেন, প্রথম বাক্যটি মনে মনে বলেছেন এবং দ্বিতীয় বাক্যটি সম্ভবতঃ জোরেই বলেছেন। [কুরতুবী]

তাঁরা ইউসুফ (আঃ)-কে ‘আযীয’ (মিসরের রাজা) এ জন্য বলেছিলেন যে, সেই সময় সমস্ত মৌলিক এখতিয়ার ও শক্তি ইউসুফ (আঃ)-এর হাতেই ছিল। আর মিসরের আসল রাজা শুধু নামমাত্র রাজা ছিলেন।

আযীয” শব্দটি, মিসরে এটি কোন বিশেষ পদবী হিসেবে চিহ্নিত ছিল না বরং ছিক “কর্তৃত্বশালী” অর্থে শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। সম্ভবত মিসরে বড় বড় লোকদের জন্য এ ধরনের কিছু শব্দ পারিভাষিক অর্থে প্রচলিত ছিল, যেমন আমাদের দেশে “সরকার” শব্দটির প্রচলন দেখা যায়। এরই অনুবাদ কুরআনে “আযীয” শব্দের মাধ্যমে করা হয়েছে।

ইউসুফ ভ্রাতারা যখন দেখল যে, কোন চেষ্টাই সফল হচ্ছে না এবং বিনইয়ামীনকে এখানে ছেড়ে যাওয়া ব্যতীত গত্যন্তর নেই; তখন তারা প্রার্থনা জানাল যে, এর পিতা নিরতিশয় বয়োবৃদ্ধ ও দুর্বল। এর বিচ্ছেদের যাতনা সহ্য করা তার পক্ষে সম্ভবপর নয়। তাই আপনি এর পরিবর্তে আমাদের কাউকে গ্রেফতার করে নিন। আমরা দেখছি, আপনি খুবই অনুগ্রহশীল। এ ভরসায়ই আমরা এ প্রার্থনা জানাচ্ছি। অথবা অর্থ এই যে, আপনি পূর্বেও আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। অথবা এ অনুগ্রহ আমাদের উপর আপনার থাকবে। [কুরতুবী]

এখানে কতদূর সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে একবার তলিয়ে দেখুন। এখানে “চোর” বলা হচ্ছে না বরং কেবল এতটুকু বলা হচ্ছে, “যার কাছে আমরা আমাদের জিনিস পেয়েছি।” শরীয়াতী পরিভায়ায় একেই বলা হয় “তাওরীয়া” অর্থাৎ “সত্যকে সুকৌশলে গোপন করা।” যখন কোন মজলুমকে জালেমের হাত থেকে বাঁচাবার অথবা কোন বড় আকারের জুলুমের প্রতিরোধ করার জন্য প্রকৃত ঘটনার বিপরীত কথা বলা বা সত্য বিরোধী বাহানাবাজী করা ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না তখন এ অবস্থায় একজন আল্লাহভীরু ব্যক্তি সুস্পষ্ট মিথ্যা এড়িয়ে এমন কথা বলবে বা এমন কৌশল অবলম্বন করার চেষ্টা করবে যার ফলে প্রকৃত সত্যকে গোপন করে দুষ্কৃতিকে রোধ করা যেতে পারে। এমনটি করা শরীয়াত ও নৈতিকতার দৃষ্টিতে বৈধ, তবে এখানে শর্ত থাকবে যে, নিছক কার্যোদ্ধার করার জন্য এমনটি করা যাবে না বরং কোন বড় আকারের দুষ্কৃতি দূর করাই হবে উদ্দেশ্য। এখন এ সমগ্র ব্যাপারটিতে হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম কেমন ধরনের বৈধ তাওরীয়ার শর্ত পূরণ করেছেন দেখুনঃ ভাইয়ের সম্মতিক্রমে তার মালপত্রের মধ্যে নিজের পেয়ালাটি রেখে দিয়েছেন। কিন্তু কর্মচারীদেরকে একথা বলেননি যে, এর বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ দায়ের করো। তারপর সরকারী কর্মচারীরা যখন চুরির অভিযোগে তাদেরকে ধরে এনেছে তখন কোন প্রকার হৈ চৈ না করে নীরবে তাদের মালপত্র তল্লাশী করতে শুরু করেছেন। এরপর যখন এ ভাইয়েরা বললো, বিন ইয়ামীনের জায়গায় আমাদের কাউকে রাখুন তখন এর জবাবে তাদেরই কথা তাদের দিকে ফিরিয়ে দিয়েছেন এই বলে যে, তোমরাই তো ফতোয়া দিয়েছিলে, যার মালপত্রের মধ্য থেকে পেয়ালা বের হবে তাকেই রেখে দেয়া হবে। কাজেই এখন তোমাদের সামনে বিন ইয়ামীনের মালপত্রের মধ্য থেকে আমাদের জিনিস বের হয়েছে এবং তাকেই আমরা রেখে দিচ্ছি। অন্যকে তার জায়গায় আমরা কেমন করে রাখতে পারি? এ ধরনের তাওরীয়ার দৃষ্টান্ত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুদ্ধবিগ্রহের ইতিহাসেও পাওয়া যাবে। কোন যুক্তি দিয়ে নৈতিক দৃষ্টিতে একে দোষণীয়ও বলা যেতে পারে না।