أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
৪১ : ৯ قُلۡ اَئِنَّكُمۡ لَتَكۡفُرُوۡنَ بِالَّذِیۡ خَلَقَ الۡاَرۡضَ فِیۡ یَوۡمَیۡنِ وَ تَجۡعَلُوۡنَ لَهٗۤ اَنۡدَادًا ؕ ذٰلِكَ رَبُّ الۡعٰلَمِیۡنَ
৯. বলুন, তোমরা কি তাঁর সাথেই কুফারী করবে। যিনি যমীন সৃষ্টি করেছেন দু’দিনে এবং তোমরা কি তাঁর সমকক্ষ তৈরী করছ? তিনি সৃষ্টিকুলের রব্ব্!
কুরআন কারীমের একাধিক স্থানে উল্লেখ করা হয়েছে যে,
‘‘আল্লাহ আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন।
এখানে তার কিছু বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বলেছেন, পৃথিবীকে দু’দিনে বানিয়েছেন। আর এ থেকে রবি ও সোমবার বুঝানো হয়েছে। (তবে সে দিনের পরিমাণ কত, তা আল্লাহই ভালো জানেন।) সূরা নাযিআত (৩০নং আয়াতে) বলা হয়েছে, وَالْأَرْضَ بَعْدَ ذَلِكَ دَحَاهَا এ থেকে বাহ্যিকভাবে বুঝা যায় যে, পৃথিবীকে আসমানের পর বানানো হয়েছে। অথচ এখানে পৃথিবী সৃষ্টির উল্লেখ আকাশ সৃষ্টির পূর্বে করা হয়েছে।
ইবনে আব্বাস (রাঃ) এর ব্যাখ্যা এইভাবে করেছেন যে, সৃষ্টি করা এক জিনিস এবং دَحَى যার মূল হল, دَحْوٌ (বিস্তৃত করা বা বিছানো) আর এক জিনিস। অর্থাৎ, পৃথিবী সৃষ্টি আসমানের পূর্বে হয়েছে। যেমন, এখানেও বলা হয়েছে এবং دَحْوٌ অর্থাৎ, পৃথিবীকে বসবাসের যোগ্য বানানোর জন্য এর মধ্যে পানির ভান্ডার রাখা হয়, তাকে প্রয়োজনীয় জিনিস উৎপাদনের ক্ষেত্র বানানো হয়। اَخْرَجَ مِنْهَا مَآءَهَا وَمَرْعَاهَا এতে পাহাড়, নদ-নদী এবং নানা প্রকার ধাতু ও খনিজ পদার্থ রাখা হয়। এ সব কাজ সুসম্পন্ন হয় আকাশ সৃষ্টির পর অন্য দুই দিনে। এইভাবে পৃথিবী ও তার সংশ্লিষ্ট সমস্ত জিনিসের সৃষ্টি চার দিনে পরিপূর্ণ হয়। (বুখারীঃ তাফসীর সূরা হা-মীম সাজদাহ)
৪১ : ১০ وَ جَعَلَ فِیۡهَا رَوَاسِیَ مِنۡ فَوۡقِهَا وَ بٰرَكَ فِیۡهَا وَ قَدَّرَ فِیۡهَاۤ اَقۡوَاتَهَا فِیۡۤ اَرۡبَعَۃِ اَیَّامٍ ؕ سَوَآءً لِّلسَّآئِلِیۡنَ
১০. আর তিনি স্থাপন করেছেন অটল পর্বতমালা ভূপৃষ্ঠে এবং তাতে দিয়েছেন বরকত এবং চার দিনের মধ্যে এতে খাদ্যের ব্যবস্থা করেছেন সমভাবে যাচ্ঞাকারীদের জন্য।
আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টির বিষয় পবিত্র কুরআনে সংক্ষেপে ও বিস্তারিতভাবে বহু জায়গায় বিবৃত হয়েছে, কিন্তু কোনটির পরে কোনটি সৃজিত হয়েছে, এর উল্লেখ সম্ভবত: মাত্র তিন আয়াতে করা হয়েছে-
(এক) হা-মীম সাজদার আলোচ্য আয়াত,
(দুই) সূরা বাকারার ২৯ নং আয়াত (هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُمْ مَا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا ثُمَّ اسْتَوَىٰ إِلَى السَّمَاءِ فَسَوَّاهُنَّ سَبْعَ سَمَاوَاتٍ ۚ وَهُوَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ)
এবং (তিন) সূরা আন-নাযি’আতের নিম্নোক্ত আয়াতঃ
(أَأَنْتُمْ أَشَدُّ خَلْقًا أَمِ السَّمَاءُ بَنَاهَا ٭ رَفَعَ سَمْكَهَا فَسَوَّاهَا ٭ وَأَغْطَشَ لَيْلَهَا وَأَخْرَجَ ضُحَاهَا ٭ وَالْأَرْضَ بَعْدَ ذَٰلِكَ دَحَاهَا ٭ أَخْرَجَ مِنْهَا مَاءَهَا وَمَرْعَاهَا ٭ وَالْجِبَالَ أَرْسَاهَا)
বাহ্যদৃষ্টিতে এসব বিষয়বস্তুর মধ্যে কিছু বিরোধও দেখা যায়। কেননা, সূরা বাকারাহ ও সূরা হা-মীম সেজদার আয়াত থেকে জানা যায় যে, আকাশের পূর্বে পৃথিবী সৃজিত হয়েছে এবং সূরা আন-নাযি আতের আয়াত থেকে এর বিপরীতে জানা যায় যে, আকাশ সৃজিত হওয়ার পরে পৃথিবী সৃজিত হয়েছে।
সবগুলো আয়াত নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করলে মনে হয় যে, প্রথমে পৃথিবীর উপকরণ সৃজিত হয়েছে। এমতাবস্থায়ই ধুম্রকুঞ্জের আকারে আকাশের উপকরণ নির্মিত হয়েছে। এরপর পৃথিবীকে বর্তমান আকারে বিস্তৃত করা হয়েছে এবং এতে পর্বতমালা, বৃক্ষ ইত্যাদি সৃষ্টি করা হয়েছে। এরপর আকাশের তরল ধূম্রকুঞ্জের উপকরণকে সপ্ত আকাশে পরিণত করা হয়েছে। আশা করি সবগুলো আয়াতই এই বক্তব্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। বাকী প্রকৃত অবস্থা আল্লাহ্ তা’আলাই জানেন। সহীহ বুখারীতে এ আয়াতের অধীনে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে কতিপয় প্রশ্ন ও উত্তর বর্ণিত হয়েছে। তাতে ইবন আব্বাস এ আয়াতের উপযুক্তরূপ ব্যাখ্যা করেছেন। [বুখারী কিতাবুত তাফসীর, বাব হা-মীম-আস-সাজদাহ]
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে এক বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার হাত ধরে বললেন, “আল্লাহ্ মাটি সৃষ্টি করেছেন শনিবার, আর তাতে পাহাড় সৃষ্টি করেছেন রবিবার, গাছ-গাছালি সোমবার, অপছন্দনীয় সবকিছু মঙ্গলবার, আলো সৃষ্টি করেছেন বুধবার, আর যমীনে জীবজন্তু ছড়িয়ে দিয়েছেন বৃহস্পতিবার। আর আদমকে শুক্রবার আছরের পরে সর্বশেষ সৃষ্টি হিসেবে দিনের সর্বশেষ প্রহরে আসর থেকে রাত পর্যন্ত সময়ে সৃষ্টি করেছেন।” [মুসলিম: ২৭৮৯]
এই হিসাব মতে আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি সাত দিনে হয়েছে বলে জানা যায়। কিন্তু কুরআনের আয়াত থেকে পরিস্কারভাবে জানা যায় যে, এই সৃষ্টিকাজ ছয় দিনে হয়েছে। এক আয়াতে আছেঃ “আমি আকাশ পৃথিবী ও এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সবকিছু ছয় দিনে সৃষ্টি করেছি এবং আমাকে কোন ক্লান্তি স্পর্শ করেনি।” [সূরা কাফ: ৩৮]
এ কারণে হাদীসবিদগণ উপরোক্ত বিশুদ্ধ বর্ণনাটির বিভিন্ন ব্যাখ্যা প্ৰদান করেছেন। কেউ কেউ হাদীসটিকে অগ্রাহ্য বলে মনে করেছেন। আবার কেউ কেউ বর্ণনাটিকে কাব আহবারের উক্তি বলেও অভিহিত করেছেন। [ইবনে কাসীর] কিন্তু যেহেতু হাদীসটি সহীহ সনদে বর্ণিত হয়েছে, তাই এটাকে অগ্রাহ্য করার কোন সুযোগ নেই। আল্লামা মুহাম্মাদ নাসেরুদ্দিন আল-আলবানী বলেন, এ হাদীসের সনদে কোন সমস্যা নেই। আর এ বর্ণনাটি কোনভাবেই কুরআনের বিরোধিতা করে না। যেমনটি কেউ কেউ মনে করে থাকে। কেননা, হাদীসটি শুধুমাত্র যমীন কিভাবে সৃষ্টি হয়েছে তা বর্ণনা করে। আর তা ছিল সাতদিনে। আর কুরআনে এসেছে যে, আসমান ও যমীন সৃষ্টি হয়েছিল ছয় দিনে। আর যমীন সৃষ্টি হয়েছিল দুই দিনে। আসমান ও যমীন সৃষ্টির ছয়দিন এবং এ হাদীসে বর্ণিত সাতদিন ভিন্ন ভিন্ন সময় হতে পারে। আসমান ও যমীন ছয়দিনে সৃষ্টি হওয়ার পর যমীনকে আবার বসবাসের উপযোগী করার জন্য সাতদিন লেগেছিল। সুতরাং আয়াত ও সহীহ হাদীসের মধ্যে কোন বিরোধ নেই। সারকথা এই যে, পবিত্র কুরআনের আয়াতসমূহকে একত্রিত করার ফলে কয়েকটি বিষয় নিশ্চিতরূপে জনা যায়, প্রথমত: আকাশ, পৃথিবী ও এতদূভয়ের মধ্যবর্তী সবকিছু মাত্র ছয় দিনে সৃজিত হয়েছে। সূরা হা-মীম সেজদার আয়াত থেকে দ্বিতীয়ত: জানা যায় যে, পৃথিবী, পর্বতমালা, বৃক্ষরাজি ইত্যাদি সৃষ্টিতে পূর্ণ চার দিন লেগেছে। তৃতীয়ত: জানা যায় যে, আকাশমন্ডলীর সৃজনে দুদিন লেগেছিল। চতুর্থত: আসমান, যমীন ও এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সৃষ্টির পর যমীনকে বসবাসের উপযোগী করতে সাতদিন লেগেছিল। এ সাতদিনের সর্বশেষ দিন শুক্রবারের কিছু অংশ বেঁচে গিয়েছিল, যাতে আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছিল।
কোন কোন মুফাসসির উপরোক্ত হাদীস অগ্রহণযোগ্য বিবেচনা করে আসমান ও যমীন সৃষ্টির ক্ষেত্রে শুধু কুরআনের ভাষ্যের উপর নির্ভর করেছেন। তাদের মতে, এসব আয়াতের বাহ্যিক অর্থ এই যে, আকাশ সৃষ্টির পরে পৃথিবীকে বিস্তৃত ও সম্পূর্ণ করা হয়েছে। তাই এটা অবান্তর নয় যে, পৃথিবী সৃষ্টির কাজ দু’ভাগে বিভক্ত। প্রথম দু’দিনে পৃথিবী ও তার উপরিভাগের পর্বতমালা ইত্যাদির উপকরণ সৃষ্টি করা হয়েছে। এরপর দু’দিনে সপ্ত আকাশ সৃজিত হয়েছে। এরপর দু’দিনে পৃথিবীর বিস্তৃতি ও তৎমধ্যবর্তী পর্বতমালা, বৃক্ষরাজি, নদনদী, ঝর্ণা ইত্যাদির সৃষ্টি সম্পন্ন করা হয়েছে। এভাবে পৃথিবী সৃষ্টির চার দিন উপর্যুপরি রইল না। সূরা হা-মীম সেজদার আয়াতে প্রথমে (خَلَقَ الْأَرْضَ فِي يَوْمَيْنِ) দুদিনে পৃথিবী সৃষ্টির কথা বলে মুশরিকদেরকে হুশিয়ার করা হয়েছে। অতঃপর আলাদা করে বলা হয়েছে- (وَجَعَلَ فِيهَا رَوَاسِيَ مِن فَوْقِهَا وَبَارَكَ فِيهَا وَقَدَّرَ فِيهَا أَقْوَاتَهَا فِي أَرْبَعَةِ) “আর তিনি স্থাপন করেছেন অটল পর্বতমালা ভূপৃষ্ঠে এবং তাতে দিয়েছেন বরকত এবং চার দিনের মধ্যে এতে খাদ্যের ব্যবস্থা করেছেন”।
এতে তফসীরবিদগণ একমত যে, এই চার দিন প্রথমোক্ত দুদিনসহঃ পৃথক চার দিন নয়। নতুবা তা সর্বমোট আট দিন হয়ে যাবে, যা কুরআনের বর্ণনার বিপরীত। এখন চিন্তা করলে জানা যায় যে, (خَلَقَ الْأَرْضَ فِي يَوْمَيْنِ) বলার পর যদি পবর্তমালা ইত্যাদির সৃষ্টিও দুদিনে বলা হত, তবে মোট চারদিন আপনা-আপনিই জানা যেত, কিন্তু পবিত্র কুরআন পৃথিবী সৃষ্টির অবশিষ্টাংশ উল্লেখ করে বলেছে, এ হল মোট চার দিন। এতে বাহ্যত: ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, এই চার দিন উপর্যুপরি ছিল না; বরং দু’ভাগে বিভক্ত ছিল। দুদিন আকাশ সৃষ্টির পূর্বে এবং দুদিন তার পরে। আয়াতে (وَجَعَلَ فِيهَا رَوَاسِيَ مِنْ فَوْقِهَا) বাক্যে আকাশ সৃষ্টির পরবর্তী অবস্থা বর্ণিত হয়েছে। [ইবন কাসীর]
অর্থাৎ, তাতে বরকত স্থাপন করেছেন। এ থেকে ইঙ্গিত করা হয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি, বহু প্রকারের খাদ্যসামগ্রী, খনিজ পদার্থ এবং এই ধরনের আরো অনেক প্রকারের আসবাব-পত্রের প্রতি, যা পৃথিবীর বরকত বা কল্যাণ। আর প্রভূত কল্যাণের নামই হল বরকত।
أَقْوَاتٌ (খাদ্য, জীবিকা) হল قُوْتٌ এর বহুবচন। অর্থাৎ, পৃথিবীতে বসবাসকারী সমস্ত সৃষ্টির খোরাক তাতে নির্ধারিত বা তার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। আর প্রতিপালকের এই নির্ধারণ বা ব্যবস্থাপনা এত বিস্তর ও ব্যাপক যে, কোন জিহ্বা তা বর্ণনা করতে পারবে না, কোন কলম তা লিপিবদ্ধ করতে পারবে না এবং কোন ক্যালকুলেটর তার হিসাব করতে পারবে না। কেউ কেউ নির্ধারিত করার অর্থ করেছেন, প্রত্যেক ভূখন্ডের জন্য পৃথক পৃথক ফল-ফসল নির্দিষ্ট করেছেন, যা অন্য অংশে তা উৎপন্ন হতে পারে না। যাতে প্রত্যেক অঞ্চলের বিশেষ এই উৎপন্ন দ্রব্য সেখানকার স্থানীয় লোকেদের ব্যবসা-বাণিজ্যের বুনিয়াদ হয়ে যায় (এবং অন্য অঞ্চলের সাথে পণ্য বিনিময়ের মাধ্যমে সকলে লাভবান হয়। এ অর্থও সঠিক এবং একেবারে বাস্তব।
অর্থাৎ, সৃষ্টির দু’দিন এবং বিস্তৃত করণের দু’দিন। সব দিনগুলো মিলিয়ে হল মোট চার দিন। যাতে এই সমস্ত কাজ সুসম্পন্ন হয়। (তবে সে দিন কত লম্বা তা আল্লাহই জানেন।)
سَوَاءً এর অর্থ হল ঠিক বা পূর্ণ চার দিনে। অর্থাৎ, জিজ্ঞাসাকারীদের বলে দাও যে, সৃষ্টি ও বিস্তৃত করণের এ কাজ ঠিক বা পূর্ণ চার দিনে সম্পন্ন হয়। অথবা পূর্ণ কিংবা সঠিক উত্তর হল জিজ্ঞাসুদের জন্যে। অথবা খাদ্যের ব্যবস্থা করেছেন, সমানভাবে সকল অভাবী ও অনুসন্ধানীদের জন্য।
৪১ : ১১ ثُمَّ اسۡتَوٰۤی اِلَی السَّمَآءِ وَ هِیَ دُخَانٌ فَقَالَ لَهَا وَ لِلۡاَرۡضِ ائۡتِیَا طَوۡعًا اَوۡ كَرۡهًا ؕ قَالَتَاۤ اَتَیۡنَا طَآئِعِیۡنَ
১১. তারপর তিনি আসমানের প্রতি ইচ্ছে করলেন, যা (পূর্বে) ছিল ধোঁয়া। অতঃপর তিনি ওটাকে (আসমান) ও যমীনকে বললেন, তোমরা উভয়ে আস ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়। তারা বলল, আমরা আসলাম অনুগত হয়ে।
এখানে তিনটি বিষয় স্পষ্ট করে দেয়া প্রয়োজন। এক, এখানে আসমান অর্থ সমগ্র বিশ্ব-জাহান। পরবর্তী আয়াতাংশ থেকে তা সুস্পষ্ট বুঝা যায়। অন্য কথায় আসমানের দিকে মনোনিবেশ করার অর্থ হচ্ছে আল্লাহ বিশ্ব-জাহান সৃষ্টির দিকে মনোনিবেশ করলেন।
দুই, বিশ্ব-জাহানকে আকৃতি দানের পূর্বে তা আকৃতিহীন ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত গোধূলির মতো মহাশূন্যে বস্তুর প্রাথমিক অবস্থায় ছড়ানো ছিল। ধোঁয়া বলতে বস্তুর এই প্রাথমিক অবস্থাকে বুঝানো হয়েছে। বর্তমান যুগের বৈজ্ঞানিকগণ এ জিনিসকেই নীহারিকা (Nebula) বলে ব্যাখ্যা করেন। বিশ্ব-জাহান সৃষ্টির প্রারম্ভিক পর্যায় সম্পর্কে তাদের ধ্যান-ধারণাও হচ্ছে, যে বস্তু থেকে বিশ্ব-জাহান সৃষ্টি হয়েছে সৃষ্টির পূর্বে তা এই ধোঁয়া অথবা নীহারিকার আকারে ছড়ানো ছিল।
তিন, “তারপর তিনি আসমানের দিকে মনোনিবেশ করলেন” বাক্য দ্বারা এ কথা বুঝা ঠিক নয় যে, প্রথমে তিনি পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন তারপর তার ওপরে পাহাড় স্থাপন, বরকত দান এবং খাদ্য উপকরণ সরবরাহের কাজ সম্পন্ন করেছেন। এসব করার পর তিনি বিশ্ব-জাহান সৃষ্টির প্রতি মনোনিবেশ করেছেন। পরবর্তী বাক্যাংশ “তিনি আসমান ও যমীনকে বললেনঃ তোমরা অস্তিত্ব ধারণ করো। উভয়ে বললো, আমরা অনুগতদের মতই অস্তিত্ব গ্রহণ করলাম” এই ভুল ধারণা নিরসন করে দেয়া এ থেকে এ কথা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, এটি এবং পরবর্তী আয়াতসমূহে সেই সময়ের কথা বলা হচ্ছে যখন আসমান ও যমীন কিছুই ছিল না, বরং বিশ্ব-জাহান সৃষ্টির সূচনা করা হচ্ছিলো শুধু ثم(তারপর, অতঃপর বা পরে) শব্দটিকে এ বিষয়ের প্রমাণ হিসেবে পেশ করা যায় না যে আসমান সৃষ্টির পূর্বেই পৃথিবী সৃষ্টি করা হয়েছিলো। ثم শব্দটি যে অনিবার্যরূপে সময়-ক্রম বুঝাতে ব্যবহৃত হয় না বর্ণনা-ক্রম বুঝাতেও ব্যবহৃত হয় কুরআন মজীদে তার বেশ কিছু উদাহরণ বিদ্যমান। (দেখুন, তাফহীমুল কুরআন, সূরা যুমার, টীকা নম্বর ১২)
কুরআন মজীদের ভাষ্য অনুসারে প্রথমে যমীন না আসমান সৃষ্টি হয়েছে প্রাচীন যুগের মুফাসসিরদের মধ্যে এ নিয়ে দীর্ঘদিন পর্যন্ত বিতর্ক চলেছে। একদল এ আয়াত এবং সূরা বাকারার ২৯ আয়াতের মাধ্যমে যুক্তি পেশ করেন যে পৃথিবীই প্রথমে সৃষ্টি হয়েছে। অপর দল সূরা নাযিয়াতের ২৭ থেকে ৩৩ পর্যন্ত আয়াত হতে দলীল পেশ করে বলেন, আসমান প্রথমে সৃষ্টি হয়েছে। কেননা, সেখানে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে আসমানের পরে যমীন সৃষ্টি হয়েছে। তবে প্রকৃত ব্যাপার এই যে, পদার্থ বিজ্ঞান বা জ্যোতির্বিদ্যা শেখানোর জন্য কুরআন মজীদের কোথাও বিশ্ব-জাহান সৃষ্টির বিষয় উল্লেখ করা হয়নি, বরং তাওহীদ ও আখেরাতের আকীদার প্রতি ঈমানের দাওয়াত দিতে গিয়ে আরো অসংখ্য নিদর্শনের মতো যমীন ও আসমানের সৃষ্টির বিষয়টিও চিন্তা-ভাবনা করে দেখার জন্য পেশ করা হয়েছে। এ উদ্দেশ্যে আসমান ও যমীন সৃষ্টির সময়-ক্রম বর্ণনা করে যমীন আগে সৃষ্টি হয়েছে না আসমান আগে সৃষ্টি হয়েছে তার উল্লেখ একেবারেই অপ্রয়োজনীয় ছিল। দু’টি বস্তুর মধ্যে এটি বা সেটি যেটিই প্রথমে সৃষ্টি হয়ে থাকুক সর্বাবস্থায় দু’টিই আল্লাহর একমাত্র ইলাহ্ হওয়ার প্রমাণ। তা এ কথাও প্রমাণ করে যে, তাদের সৃষ্টিকর্তা এ সমগ্র কারখানা কোন খেলোয়াড়ের খেলনা হিসেবে সৃষ্টি করেননি। এ কারণেই কুরআন কোন জায়গায় পৃথিবী সৃষ্টির কথা প্রথমে উল্লেখ করে আবার কোন জায়গায় প্রথমে উল্লেখ করে আসমান সৃষ্টির কথা যেক্ষেত্রে মানুষের মনে আল্লাহর নিয়ামতসমূহের অনুভূতি সৃষ্টি উদ্দেশ্য হয় সেক্ষেত্রে সাধারণত যমীন সৃষ্টির উল্লেখ প্রথমে করেন। কারণ, তা মানুষের সবচেয়ে কাছে। আর যেক্ষেত্রে আল্লাহর মহত্ব এবং তাঁর কুদরতের পূর্ণতার ধারণা দেয়া উদ্দেশ্য হয় সেক্ষেত্রে সাধারণত আসমানের উল্লেখ প্রথমে করেন। কারণ, সুদূরবর্তী আসমান চিরদিনই মানুষের মনের ওপর বিরাট প্রভাব বিস্তার করে আছে।
এই আসা কিভাবে ছিল? আসার ধরন বর্ণনা করা যেতে পারে না। উভয়ে আল্লাহর কাছে ঐভাবেই এসেছে, যেভাবে তিনি চেয়েছেন। কেউ কেউ এর অর্থ করেছেন, আমার নির্দেশের আনুগত্য কর। তারা (আকাশ ও পৃথিবী) বলল, আমরা (তোমার) আনুগত্যের জন্য উপস্থিত আছি। সুতরাং আল্লাহ আকাশকে নির্দেশ দিলেন যে, সূর্য, চাঁদ এবং তারকারাজি বের কর এবং পৃথিবীকে বললেন যে, নদ-নদী প্রবাহিত এবং ফল-মূল উৎপন্ন কর। (ইবনে কাসীর) অথবা অর্থ হল, তোমরা উভয়েই অস্তিত্বে চলে এস।
আল্লাহ্ এ আয়াতাংশে তাঁর সৃষ্টি পদ্ধতির অবস্থা এমন ভঙ্গিতে বর্ণনা করেছেন যার মাধ্যমে আল্লাহর সৃষ্টি ও মানবীয় সৃষ্টি ক্ষমতার পার্থক্য পুরোপুরি স্পষ্ট হয়ে যায়। মানুষ যখন কোন জিনিস বানাতে চায় তখন প্রথমেই নিজের মন-মগজে তার একটা নকশা ফুটিয়ে তোলে এবং সেজন্য পরে প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ করে। তারপর ঐ সব উপকরণকে নিজের পরিকল্পিত নকশা ও কাঠামো অনুসারে বাস্তব রূপ দেয়ার জন্য পরিশ্রম করে ও নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা চালায়। যেসব উপকরণকে সে নিজের মগজে অঙ্কিত নকশায় রূপদানের চেষ্টা করে, চেষ্টার সময় তা একের পর এক বিঘ্ন সৃষ্টি করতে থাকে। কখনো উপকরণের বাঁধা সফল হয় এবং কাঙ্খিত বস্তু পরিকল্পিত নকশা অনুসারে ঠিকমত তৈরী হয় না। আবার কখনো ব্যক্তির প্রচেষ্টা প্রবল হয় এবং সে উপকরণসমূহকে কাঙ্খিত রূপদানে সফল হয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ কোন দর্জি একটি জামা তৈরী করতে চায়। এজন্য সে প্রথমে তার মন-মগজে জামার নকশা ও আকৃতি কল্পনা করে। তারপর কাপড় সংগ্রহ করে নিজের পরিকল্পিত জামার নকশা অনুসারে কাপড় কাটতে ও সেলাই করতে চেষ্টা করে এবং এই চেষ্টার সময় তাকে উপর্যুপরি কাপড়ের প্রতিবন্ধকতার মোকাবিলা করতে হয়। এমনকি এক্ষেত্রে কখনো দর্জির প্রচেষ্টা সফল হয় এবং সে কাপড়কে তার পরিকল্পিত নকশায় রূপদান করে। এবার আল্লাহর সৃষ্টি পদ্ধতির দিকে লক্ষ্য করুন। বিশ্ব-জাহান সৃষ্টির উপকরণ ধূঁয়ার আকারে ছড়িয়ে ছিলো। বিশ্ব-জাহানের বর্তমান যে রূপ আল্লাহ তাকে সেই রূপ দিতে চাইলেন। এ উদ্দেশ্যে তাকে বসে বসে কোন মানুষ কারিগরের মত পৃথিবী, চাঁদ, সূর্য এবং অন্যান্য তারকা ও গ্রহ-উপগ্রহ বানাতে হয়নি। বরং তাঁর পরিকল্পনায় বিশ্ব-জাহানের যে নকশা ছিল সে অনুসারে তাকে অস্তিত্ব গ্রহণ করতে নির্দেশ দিলেন। অর্থাৎ তিনি যে ছায়াপথ, তারকারাজি এবং গ্রহ-উপগ্রহ সৃষ্টি করতে চাচ্ছিলেন ঐ সব উপকরণ যেন সেই আকৃতি ধারণ করে সেই নির্দেশ দান করলেন। আল্লাহর আদেশের পথে প্রতিবন্ধক হওয়ার ক্ষমতা ঐ সব উপকরণের ছিল না। ঐ উপকরণসমূহকে বিশ্ব-জাহানের আকৃতি দান করতে আল্লাহকে কোন পরিশ্রম করতে ও প্রচেষ্টা চালাতে হয়নি। একদিকে আদেশ হয়েছে আরেকদিকে ঐ সব উপকরণ সংকুচিত ও একত্রিত হয়ে অনুগতদের মত প্রভুর পরিকল্পিত নকশা অনুযায়ী তৈরী হতে শুরু করেছে এবং ৪৮ ঘণ্টায় পৃথিবীসহ সমস্ত বিশ্ব-জাহান সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত হয়ে গিয়েছে।
আল্লাহর সৃষ্টি পদ্ধতির এই অবস্থাকে কুরআন মজীদের আরো কতিপয় স্থানে এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহ যখন কোন কাজ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন তখন শুধু এই নির্দেশ দেন, ‘হয়ে যাও’ আর তখনি তা হয়ে যায়। (দেখুন তাফহীমুল কুরআন, আল বাকারা, টীকা ১১৫; আল ইমরান, টীকা ৪৪ ও ৫৩; আন নাহল, টীকা ৩৫ ও ৩৬; মারয়াম, টীকা ২২; ইয়াসীন, আয়াত ৮২ এবং আল মু’মিন, আয়াত ৬৮)।
৪১ : ১২ فَقَضٰهُنَّ سَبۡعَ سَمٰوَاتٍ فِیۡ یَوۡمَیۡنِ وَ اَوۡحٰی فِیۡ كُلِّ سَمَآءٍ اَمۡرَهَا ؕ وَ زَیَّنَّا السَّمَآءَ الدُّنۡیَا بِمَصَابِیۡحَ ٭ۖ وَ حِفۡظًا ؕ ذٰلِكَ تَقۡدِیۡرُ الۡعَزِیۡزِ الۡعَلِیۡمِ
১২. অত:পর তিনি সেগুলোকে সাত আসমানে পরিণত করলেন দু’দিনে এবং প্রত্যেক আসমানে তার নির্দেশ ওহী করে পাঠালেন এবং আমরা নিকটবর্তী আসমানকে সুশোভিত করলাম প্রদীপমালা দ্বারা এবং করলাম সুরক্ষিত। এটা পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞের ব্যবস্থাপনা।
অর্থাৎ, স্বয়ং আকাশমন্ডলীকে অথবা সেখানে বসবাসকারী ফিরিশতামন্ডলীকে বিশেষ বিশেষ কাজের এবং যিকর-আযকারের দায়িত্বে লাগিয়ে দিলেন।
অর্থাৎ, শয়তান থেকে সুরক্ষিত। যেমন, অন্যত্র এ কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। তারকারাজি সৃষ্টির তৃতীয় আর একটি উদ্দেশ্য অন্যত্র اهتِدَاءٌ (পথ পাওয়া বা দিক নির্ণয় করা)ও বলা হয়েছে। (সূরা নাহল ১৬)
সাত আকাশের তাৎপর্য কি? সাত আকাশ বলতে কি বুঝায়? এ সম্পর্কে সঠিক ধারণা দেয়া কঠিন। মানুষ প্রতি যুগে আকাশ বা অন্য কথায় পৃথিবীর বাইরের জগত সম্পর্কে নিজের পর্যবেক্ষণ ও ধারণা-বিশ্লেষণ অনুযায়ী বিভিন্ন চিন্তা ও মতবাদের অনুসারী হয়েছে। এ চিন্তা ও মতবাদগুলো বিভিন্ন সময় বার বার পরিবর্তিত হয়েছে। কাজেই এর মধ্য থেকে কোন একটি মতবাদ নির্দেশ করে তার ভিত্তিতে কুরআনের এই শব্দগুলোর অর্থ নির্ণয় করা ঠিক হবে না। তবে সংক্ষেপে এতটুকু বুঝে নিতে হবে যে, সম্ভবত পৃথিবীর বাইরে যতগুলো জগত আছে সবগুলোকেই আল্লাহ সাতটি সুদৃঢ় স্তরে বিভক্ত করে রেখেছেন অথবা এই বিশ্ব-জাহানের যে স্তরে পৃথিবীর অবস্থিতি সেটি সাতটি স্তর সমন্বিত। যেমনঃ
তিনিই পৃথিবীতে তোমাদের জন্য সমস্ত জিনিস সৃষ্টি করলেন। তারপর ওপরের দিকে লক্ষ করলেন এবং সাত আকাশ বিন্যস্ত করলেন, তিনি সব জিনিসের জ্ঞান রাখেন। আল বাকারা:২৯
আকাশসমূহকে অদৃশ্য ও অননুভূত স্তম্ভসমূহের ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আপাতদৃষ্টে মহাশূন্যে এমন কোন জিনিস নেই, যা এ সীমাহীন মহাকাশ ও নক্ষত্র জগতকে ধরে রেখেছে। কিন্তু একটি অননুভূত শক্তি তাদের প্রত্যেককে তার নিজের স্থানে ও আবর্তন পথের ওপর আটকে রেখেছে এবং মহাকাশের এ বিশাল বিশাল নক্ষত্রগুলোকে পৃথিবীপৃষ্ঠে বা তাদের পরস্পরের ওপর পড়ে যেতে দিচ্ছে না। যেমনঃ
আল্লাহই আকাশসমূহ স্থাপন করেছেন এমন কোন স্তম্ভ ছাড়াই যা তোমরা দেখতে পাও। সূরা রাদঃ২
এসব আয়াত বুঝার জন্য তাফহীমুল কুরআনের নিম্ন বর্ণিত স্থানসমুহ অধ্যয়ন করা সহায়ক হবেঃ আল বাকারা, টীকা ৩৪; আর রা’আদ, টীকা ২; আল-হিজর, টীকা ৮ থেকে ১২; আল আম্বিয়া, টীকা ৩৪ ও ৩৫ ; আল-মু’মিনুন, টীকা ১৫;ইয়াসীন, টীকা ৩৭ এবং আস সাফফাত, টীকা ৫ ও ৬।
৪১ : ১৩ فَاِنۡ اَعۡرَضُوۡا فَقُلۡ اَنۡذَرۡتُكُمۡ صٰعِقَۃً مِّثۡلَ صٰعِقَۃِ عَادٍ وَّ ثَمُوۡدَ
১৩. অতঃপর তারা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে বলুন, আমি তো তোমাদেরকে সতর্ক করছি এক ধ্বংসকর শাস্তি সম্পর্কে, আদ ও সামূদের শাস্তির অনুরূপ।
যিনি এই পৃথিবী ও সারা বিশ্ব-জাহান সৃষ্টি করেছেন তিনি একাই আল্লাহ ও উপাস্য এ কথা মানে না এবং বাস্তবে যারা তাঁর সৃষ্টি ও দাস তাদেরকে উপাস্য বানাবার এবং আল্লাহর সত্ত্বা, গুণাবলী, অধিকার ও ক্ষমতা-ইখতিয়ারে শরীক করার জন্য জিদ করে যেতে থাকে।
৪১ : ১৪ اِذۡ جَآءَتۡهُمُ الرُّسُلُ مِنۡۢ بَیۡنِ اَیۡدِیۡهِمۡ وَ مِنۡ خَلۡفِهِمۡ اَلَّا تَعۡبُدُوۡۤا اِلَّا اللّٰهَ ؕ قَالُوۡا لَوۡ شَآءَ رَبُّنَا لَاَنۡزَلَ مَلٰٓئِكَۃً فَاِنَّا بِمَاۤ اُرۡسِلۡتُمۡ بِهٖ كٰفِرُوۡنَ
১৪. যখন তাদের কাছে তাদের সামনে ও পিছন থেকে রাসূলগণ এসে বলেছিলেন যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া কারো ইবাদাত করো না। তারা বলেছিল, যদি আমাদের রব ইচ্ছে করতেন তবে তিনি অবশ্যই ফেরেশতা নাযিল করতেন। অতএব তোমরা যা সহ প্রেরিত হয়েছ, নিশ্চয় আমরা তার সাথে কুফরী করলাম।
যেহেতু তুমি আমাদের মতনই মানুষ, তাই আমরা তোমাকে নবী মানতে পারি না। আল্লাহর নবী প্রেরণ করার প্রয়োজন হলে ফিরিশতা প্রেরণ করতেন; মানুষ নয়।
৪১ : ১৫ فَاَمَّا عَادٌ فَاسۡتَكۡبَرُوۡا فِی الۡاَرۡضِ بِغَیۡرِ الۡحَقِّ وَ قَالُوۡا مَنۡ اَشَدُّ مِنَّا قُوَّۃً ؕ اَوَ لَمۡ یَرَوۡا اَنَّ اللّٰهَ الَّذِیۡ خَلَقَهُمۡ هُوَ اَشَدُّ مِنۡهُمۡ قُوَّۃً ؕ وَ كَانُوۡا بِاٰیٰتِنَا یَجۡحَدُوۡنَ
১৫. অতঃপর আদ সম্প্রদায়, তারা যমীনে অযথা অহংকার করেছিল এবং বলেছিল, আমাদের চেয়ে অধিক শক্তিশালী কে আছে? তবে কি তারা লক্ষ্য করেনি যে, নিশ্চয় আল্লাহ, যিনি তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, তিনি তাদের চেয়ে অধিক শক্তিশালী? আর তারা আমাদের নিদর্শনাবলীকে অস্বীকার করত।
এই উক্তি থেকে তাদের উদ্দেশ্য এই ছিল যে, তারা আল্লাহর আযাব রোধ করার ক্ষমতা রাখে। কেননা, তারা অতি দীর্ঘকায় এবং প্রচন্ড শক্তিশালী ছিল। আর এ কথা তারা তখন বলেছিল, যখন হূদ (আঃ) তাদেরকে ভয় দেখিয়েছিলেন এবং আল্লাহর আযাবের ব্যাপারে সতর্ক করেছিলেন।
অর্থাৎ, তারা কি সেই আল্লাহর চেয়েও অধিক শক্তিশালী, যিনি তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাদেরকে শক্তি ও সামর্থ্য দানে ধন্য করেছেন। তাদেরকে সৃষ্টি করার পর তাঁর নিজস্ব শক্তি ও সামর্থ্য শেষ হয়ে গেছে নাকি? এখানে জিজ্ঞাসা অস্বীকৃতিসূচক এবং ধমকের জন্য।
সেই মু’জিযাগুলোকে যা আমি নবীদেরকে দান করেছিলাম অথবা সেই দলীলগুলোকে, যা আমি নবীদের সাথে অবতীর্ণ করেছিলাম কিংবা অসংখ্য সেই সৃষ্টিগত নিদর্শনাবলীকে, যা বিশ্বজাহানে ছড়িয়ে আছে।
৪১ : ১৬ فَاَرۡسَلۡنَا عَلَیۡهِمۡ رِیۡحًا صَرۡصَرًا فِیۡۤ اَیَّامٍ نَّحِسَاتٍ لِّنُذِیۡقَهُمۡ عَذَابَ الۡخِزۡیِ فِی الۡحَیٰوۃِ الدُّنۡیَا ؕ وَ لَعَذَابُ الۡاٰخِرَۃِ اَخۡزٰی وَ هُمۡ لَا یُنۡصَرُوۡنَ
১৬. তারপর আমরা তাদের উপর প্রেরণ করলাম ঝঞ্ঝাবায়ু অশুভ দিনগুলোতে; যাতে আমরা তাদের আস্বাদন করাতে পারি। দুনিয়ার জীবনের লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি। আর আখিরাতের শাস্তি তো তার চেয়ে বেশী লাঞ্ছনাদায়ক এবং তাদেরকে সাহায্য করা হবে না।
এটা صاعقة এরই ব্যাখ্যা, যা পূর্বের ১৩ নং আয়াতে আদ ও সামুদের صاعقة বলে বর্ণিত হয়েছে। صاعقة শব্দের আসল অর্থ অচেতন ও বেহুশকারী বস্তু। এ কারণেই বজ্রকেও صاعقة বলা হয়। আকস্মিক বিপদ অর্থেও শব্দটি ব্যবহৃত হয়। আদি সম্প্রদায়ের উপর চাপানো ঝড়ও একটি صاعقة ছিল। একেই এখানে (رِيحًا صَرْصَرًا) নামে বর্ণনা করা হয়েছে। প্রচণ্ড ঝড়ো বাতাস বুঝাতে এ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। কেউ কেউ বলেনঃ এর অর্থ মারাত্মক “লু” প্রবাহ; কেউ কেউ বলেন, এর অর্থ প্রচণ্ড ঠাণ্ডা বাতাস এবং কারো কারো মতে এর অর্থ এমন বাতাস যা প্রবাহিত হওয়ার সময় প্রচণ্ড শব্দ সৃষ্টি হয়। তবে এ অর্থে সবাই একমত যে, শব্দটি প্রচণ্ড ঝড়ো হাওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়। [দেখুন: তবারী]
কুরআন মজীদের অন্যান্য স্থানে এ আযাব সম্পর্কে যেসব বিস্তারিত বর্ণনা আছে তা হচ্ছে, এ বাতাস উপর্যুপরি সাত দিন এবং আট রাত পর্যন্ত প্রবাহিত হয়েছিলো। এর প্রচণ্ডতায় মানুষ পড়ে গিয়ে এমনভাবে মৃত্যুবরণ করে এবং মরে মরে পড়ে থাকে যেমন খেজুরের ফাঁপা কাণ্ড পড়ে থাকে [আল-হাক্কাহ: ৭]। এ বাতাস যে জিনিসের ওপর দিয়েই প্রবাহিত হয়েছে তাকেই জরাজীর্ণ করে ফেলেছে [আয-যারিয়াত: ৪২]। যে সময় এ বাতাস
এগিয়ে আসছিলো তখন আদ জাতির লোকেরা এই ভেবে আনন্দে মেতে উঠেছিলো যে মেঘ চারদিক থেকে ঘিরে আসছে। এখন বৃষ্টি হবে এবং তাদের আশা পূর্ণ হবে। কিন্তু তা এমনভাবে আসলো যে গোটা এলাকাই ধ্বংস করে রেখে গেল। [আল-আহকাফ: ২৪, ২৫]
দাহ্হাক বলেন, আল্লাহ তা’আলা তাদের উপর তিন বছর পর্যন্ত বৃষ্টিপাত সম্পূর্ণ বন্ধ রাখেন। কেবল প্রবল শুষ্ক বাতাস প্রবাহিত হত। অবশেষে আট দিন ও সাত রাত্রি পর্যন্ত উপর্যুপরি তুফান চলতে থাকে। [দেখুন: বাগভী, ফাতহুল কাদীর]
نَحِسَاتٌ এর অনুবাদ কেউ করেছেন ধারাবাহিক ও লাগাতার। কেননা, এ হাওয়া সাত দিন আট রাত পর্যন্ত লাগাতার চলেছে। আবার কেউ এর অর্থ কঠিন, কেউ ধূলা-বালি মিশ্রিত হাওয়া এবং কেউ অশুভও করেছেন। শেষোক্ত অনুবাদের সারমর্ম হবে, যে দিনগুলোতে তাদের উপর কঠিন তুফান চলেছে, সেগুলো তাদের জন্য বড়ই অকল্যাণকর ও অশুভ প্রমাণিত হয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, দিনগুলোই অশুভ। কারণ কোন সময় বা দিন অশুভ হয় না।
صَرْصَرٌ এর উৎপত্তি হল, صُرَّةٌ থেকে; যার অর্থঃ শব্দ। অর্থাৎ, এমন বাতাস যাতে বিকট শব্দ ছিল। অর্থাৎ, অতি প্রবল ও জোরদার ঝড়, যাতে ভীষণ শব্দও ছিল। কেউ কেউ বলেছেন, এটা صر থেকে গঠিত যার অর্থ, ঠান্ডা। অর্থাৎ, ঠান্ডা, শীতল বা হিমশীতল বাতাস। ইমাম ইবনে কাসীর বলেন, সঠিক এই যে, উক্ত হাওয়ার মধ্যে বর্ণিত সব গুণগুলোই বর্তমান ছিল।
৪১ : ১৭ وَ اَمَّا ثَمُوۡدُ فَهَدَیۡنٰهُمۡ فَاسۡتَحَبُّوا الۡعَمٰی عَلَی الۡهُدٰی فَاَخَذَتۡهُمۡ صٰعِقَۃُ الۡعَذَابِ الۡهُوۡنِ بِمَا كَانُوۡا یَكۡسِبُوۡنَ
১৭. আর সামূদ সম্প্রদায়, আমরা তাদেরকে পথনির্দেশ করেছিলাম, কিন্তু তারা সৎপথের পরিবর্তে অন্ধপথে চলা পছন্দ করেছিল। ফলে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তির বজ্রাঘাত তাদের পাকড়াও করল; তারা যা অর্জন করেছিল তার জন্য।
অর্থাৎ, তাদেরকে তাওহীদের দাওয়াত দিয়েছিলাম, তার প্রমাণাদি তাদের সামনে স্পষ্ট করেছিলাম এবং তাদের নবী সালেহ-এর মাধ্যমে তাদের উপর হুজ্জত কায়েম করেছিলাম।
অর্থাৎ, তারা বিরোধিতা করে ও মিথ্যা ভাবে। এমনকি শেষ পর্যন্ত তারা সেই উটনীকেও যবাই করে দেয়, যাকে মু’জিযা স্বরূপ তাদের দাবী অনুযায়ী পাহাড় থেকে বের করা হয়েছিল এবং তা ছিল নবীর সত্যতার দলীল।
صَاعِقَةٌ বলা হয় কঠিন আযাবকে। এই কঠিন আযাব তাদের উপর বিকট শব্দ এবং ভূমিকম্প আকারে আসে। যাতে তাদেরকে লাঞ্ছনা ও অপমান সহ ধ্বংস করে দেওয়া হয়।
৪১ : ১৮ وَ نَجَّیۡنَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَ كَانُوۡا یَتَّقُوۡنَ
১৮. আর আমরা রক্ষা করলাম তাদেরকে, যারা ঈমান এনেছিল এবং যারা তাকওয়া অবলম্বন করত।
সামূদ জাতির বিস্তারিত কাহিনী জানার জন্য দেখুন, তাফহীমুল কুরআন, আল আ’রাফ, টীকা ৫৭ থেকে ৫৯; হূদ, ৬৯ থেকে ৭৪; আল হিজর, ৪২ থেকে ৪৬; বনী ইসরাইল, টীকা ৬৮; আশ শুআরা, টীকা ৯৫ থেকে ১০৬; আন নামল, টীকা ৫৮ থেকে ৬৬।