সূরা হুদঃ ভূমিকা ও ১ম রুকু (১-৮)আয়াত

সূরা নং ১১, মোট রুকুঃ ১০, আয়াত সংখ্যাঃ ১২৩

ভূমিকা

নামকরনঃ অন্যান্য সূরার মতোই শুধুমাত্র পরিচিতির জন্যই সূরার নামকরন হুদ করা হয়েছে, যেখানে হুদ আ সম্পর্কেও আলোচনা করা হয়েছে।

নাযিল হওয়ার সময়-কাল

এ সূরার আলোচ্য বিষয় সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করলে একথা উপলব্ধি করা যায় যে, এটা সূরা ইউনূসের সমসময়ে নাযিল হয়েছিল। এমনকি তার অব্যবহিত পরেই যদি নাযিল হয়ে থাকে তবে তাও বিচিত্র নয়। কারণ ভাষণের মূল বক্তব্য একই। তবে সতর্ক করে দেয়ার ধরনটা তার চেয়ে বেশী কড়া।

হাদীসে আছে হযরত আবু বকর (রা.) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলেনঃ “আমি দেখছি আপনি বুড়ো হয়ে যাচ্ছেন, এর কারণ কি?” জবাবে তিনি বলেন, شَيَّبَتْنِى هُودٌ وَاَخوَاتُهَا“সূরা হূদ ও তারই মতো বিষয়বস্তু সম্বলিত সূরাগুলো আমাকে বুড়ো করে দিয়েছে।” এ থেকে অনুমান করা যাবে, যখন একদিকে কুরাইশ বংশীয় কাফেররা নিজেদের সমস্ত অস্ত্র নিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সত্যের দাওয়াতকে স্তব্ধ করে দিতে চাচ্ছিল এবং অন্যদিকে আল্লাহর পক্ষ থেকে একের পর এক এসব সতর্কবাণী নাযিল হচ্ছিল, তখনকার সময়টা তাঁর কাছে কত কঠিন ছিল। সম্ভবত এহেন অবস্থায় সর্বক্ষণ এ আশংকা তাঁকে অস্থির করে তুলছিল যে, আল্লাহর দেয়া অবকাশ কখন না জানি খতম হয়ে যায় এবং সেই শেষ সময়টি এসে যায় যখন আল্লাহ কোন জাতির ওপর আযাব নাযিল করে তাকে পাকড়াও করার সিদ্ধান্ত নেন। আসলে এ সূরাটি পড়ার সময় মনে হতে থাকে যেন একটি বন্যার বাঁধ ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়েছে এবং যে অসতর্ক জনবসতিটি এ বন্যার গ্রাস হতে যাচ্ছে তাকে শেষ সাবধান বাণী শুনানো হচ্ছে।

বিষয়বস্তু ও আলোচ্য বিষয়

 ভাষণের বিষয়বস্তু সূরা ইউনূসের অনুরূপ। অর্থাৎ দাওয়াত, উপদেশ ও সতর্কবাণী। তবে পার্থক্য হচ্ছে, সূরা ইউনূসের তুলনায় দাওয়াতের অংশ এখানে সংক্ষিপ্ত, উপদেশের মধ্যে যুক্তির পরিমাণ কম ও ওয়াজ-নসীহত বেশী এবং সতর্কবাণীগুলো বিস্তারিত ও বলিষ্ঠ।

এখানে দাওয়াত এভাবে দেয়া হয়েছেঃ নবীর কথা মেনে নাও, শিরক থেকে বিরত হও অন্য সবার বন্দেগী ত্যাগ করে একমাত্র আল্লাহর বান্দা হয়ে যাও এবং নিজেদের দুনিয়ার জীবনের সমস্ত ব্যবস্থা আখেরাতে জবাবদিহির অনুভূতির ভিত্তিতে গড়ে তোল।

উপদেশ দেয়া হয়েছেঃ

দুনিয়ার জীবনের বাহ্যিক দিকের ওপর ভরসা করে যেসব জাতি আল্লাহর নবীদের দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করেছে ইতিপূর্বেই তারা অত্যন্ত ভয়াবহ পরিণতির সম্মুখীন হয়েছে। এমতাবস্থায় ইতিহাসের ধারাবাহিক অভিজ্ঞতায় যে পথটি ধ্বংসের পথ হিসেবে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছে, সেই একই পথে তোমাদেরও চলতেই হবে, এমন কোন বাধ্যবাধকতা আছে নাকি?

সতর্কবাণী উচ্চারিত হয়েছেঃ

আযাব আসতে যে দেরী হচ্ছে, তা আসলে একটা অবকাশ মাত্র।

আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তোমাদের এ অবকাশ দান করছেন। এ অবকাশকালে যদি তোমরা সংযত ও সংশোধিত না হও তাহলে এমন আযাব আসবে যাকে হটিয়ে দেবার সাধ্য কারোর নেই এবং যা ঈমানদারদের ক্ষুদ্রতম দলটি ছাড়া বাকি সমগ্র জাতিকে দুনিয়ার বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেবে।

এ বিষয়বস্তুটি উপলব্ধি করাবার জন্য সরাসরি সম্বোধন করার তুলনায় নূহের জাতি, আদ, সামুদ, লূতের জাতি, মাদ্য়ানবাসী ও ফেরাউনের সম্প্রদায়ের ঘটনাবলীর সাহায্য গ্রহণ করা হয়েছে বেশী করে। এ ঘটনাবলী বর্ণনা করার ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলো সবচেয়ে বেশী স্পষ্ট করে তুলে ধরা হয়েছে সেগুলো হচ্ছেঃ

আল্লাহ যখন কোন বিষয়ের চূড়ান্ত মীমাংসা করতে উদ্যত হন তখন সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ পদ্ধতিতেই মীমাংসা করেন। সেখানে কাউকে সামান্যতমও ছাড় দেয়া হয় না। তখন দেখা হয় না কে কার সন্তান ও কার আত্মীয়। কোন নবীপুত্র বা নবী পত্নী কেউই বাঁচতে পারে না। শুধু এখানেই শেষ নয়, বরং যখন ঈমান ও কুফরীর চূড়ান্ত ফায়সালার সময় এসে পড়ে তখন দ্বীনের প্রকৃতির এ দাবীই জানাতে থাকে যে, মু’মিন নিজেও যেন পিতা-পুত্র ও স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ভুলে যায় এবং আল্লাহর ইনসাফের তরবারির মতো পূর্ণ নিরপেক্ষতার সাথে একমাত্র সত্যের সম্বন্ধ ছাড়া অন্য সব সম্বন্ধ কেটে ছিঁড়ে দূরে নিক্ষেপ করে। এহেন অবস্থায় বংশ ও রক্ত সম্বন্ধের প্রতি সামান্যতম পক্ষপাতিত্বও হবে ইসলামের প্রাণসত্তার সম্পর্ক বিরোধী। তিন চার বছর পরে বদরের ময়দানে মক্কার মুসলমানরা এ শিক্ষারই প্রদর্শনী করেছিলেন।

১ম রুকুঃ (১-৮)আয়াত

أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَـٰنِ الرَّحِيمِ

১১ : ১ الٓرٰ ۟ كِتٰبٌ اُحۡكِمَتۡ اٰیٰتُهٗ ثُمَّ فُصِّلَتۡ مِنۡ لَّدُنۡ حَكِیۡمٍ خَبِیۡرٍ ۙ﴿۱﴾

(১) আলিফ লা-ম রা। এ (কুরআন) এমন গ্রন্থ যার আয়াতগুলি মজবুত (সুবিন্যস্ত) করা হয়েছে, অতঃপর বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে প্রজ্ঞাময়, মহাজ্ঞাতা (আল্লাহ)র পক্ষ হতে।

পবিত্র কুরআনের আয়াতগুলো দুই ধরনের।

১. محكم স্পষ্ট অর্থবোধক আয়াত,

২. متشابه অস্পষ্ট অর্ধবোধক আয়াত (যার অর্থ মানুষ বোঝে না)।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘তিনি সে সত্ত্বা যিনি আপনার উপর কিতাব নাযিল করেছেন। (এ কিতাবে দু ধরনের আয়াত রয়েছে), এর কিছু হচ্ছে (সুস্পষ্ট) দ্ব্যর্থহীন আয়াত, সেগুলো কিতাবের মৌলিক অংশ, বাকি আয়াতগুলো হলো অস্পষ্ট… (আলে ইমরান, ৩/১)।

যে আয়াতের ব্যাখ্যা এবং অর্থ স্পষ্ট তাকে আয়াতে মুহকাম বলে। আর যে আয়াতের জ্ঞান কারো জানার উপায় থাকে না তাকে আয়াতে মুতাশাবেহ বলা হয়। যেমন: কিয়ামত কবে হবে, ইয়াযুয-মাযুয ও দাজ্জাল কবে আত্মপ্রকাশ করবে, ঈসা আলাইহিস সালাম কবে দুনিয়ায় অবতরণ করবে, হরফে মুকাত্বআতের অর্থ ইত্যাদী বিষয়গুলো অস্পষ্ট (তাফসীরে কুরতুবী, আলে ইমরান, ৩/৭ নং আয়াতের তাফসীর দ্রষ্টব্য)।

 এ কিতাবে যেসব কথা বলা হয়েছে সেগুলো পাকা ও অকাট্য কথা এবং সেগুলোর কোন নড়চড় নেই। ভালোভাবে যাচাই পর্যালোচনা করে সে কথাগুলো বলা হয়েছে।

সুতরাং কুরআন পাকের আয়াতসমূহ সামগ্রিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত, অপরিবর্তিত। বাতিল এর কাছে প্রবেশের কোন সুযোগ পায় না। [তাবারী] তাওরাত, ইঞ্জীল ইত্যাদি পূর্ববর্তী কিতাবসমূহ পবিত্র কুরআন নাযিলের ফলে যেভাবে মানসূখ বা রহিত হয়েছে কুরআন পাক নাযিল হওয়ার পর যেহেতু নবীর আগমন এবং ওহীর ধারাবাহিকতা সমাপ্ত হয়ে গেছে সুতরাং কেয়ামত পর্যন্ত এ কিতাব আর রহিত হবে না। [কুরতুবী] এর আয়াতসমূহ শব্দের দিক থেকে মুহকাম বা সুপ্রতিষ্ঠিত ও অপরিবর্তিত। হাসান ও আবুল আলীয়া বলেন, নির্দেশ ও নিষেধ দ্বারা এটাকে মজবুত করা হয়েছে। [তাবারী; কুরতুবী]

আল্লাহ বলেন, لاَ يَأْتِيهِ الْبَاطِلُ مِنْ بَيْنِ يَدَيْهِ وَلاَ مِنْ خَلْفِهِ تَنْزِيلٌ مِنْ حَكِيمٍ حَمِيدٍ ‘সম্মুখ থেকে বা পিছন থেকে এর মধ্যে মিথ্যার কোন প্রবেশাধিকার নেই। এটি ক্রমান্বয়ে অবতীর্ণ হয়েছে প্রজ্ঞাময় ও প্রশংসিত সত্তার পক্ষ হ’তে’ (হামীম সাজদাহ ৪১/৪২)।

এ আয়াতগুলো বিস্তারিতও। এর মধ্যে প্রত্যেকটি কথা খুলে খুলে ও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। বক্তব্য জটিল, বক্র ও অস্পষ্ট নয়। প্রত্যেকটি কথা আলাদা আলাদা করে পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে বলা হয়েছে। এর অর্থ, ওয়াদা, ধমক, সাওয়াব ও শাস্তির বিষয়াদি এতে বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে। [তাবারী; কুরতুবী]

 কাতাদা বলেন, আল্লাহ এটাকে বাতিলের জন্য অপ্রতিরোধ করেছেন, তারপর হালাল ও হারাম সংক্রান্ত বিষয়াদি বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন [তাবারী]

মুজাহিদ বলেন, সামগ্রিকভাবে এটাকে মজবুত করেছেন। তারপর তাওহীদ, নবুওয়াত ও আখেরাতের পুনরুত্থানের বর্ণনা এক একটি আয়াত করে প্রদান করা হয়েছে। [কুরতুবী]

সুতরাং এতে আকায়েদ, ইবাদত, লেন-দেন আচার ব্যবহার ও নীতি নৈতিকতার বিষয়বস্তুগুলোকে ভিন্ন ভিন্ন আয়াতে পৃথক পৃথক ভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।

এর আরেক অর্থ এও হতে পারে যে, আল্লাহ তা’আলার পক্ষ হতে তো পূর্ণ কুরআন মজীদ একসাথে লাওহে মাহফুজে উৎকীর্ণ করা হয়েছে, কিন্তু তারপর স্থান কাল পাত্র পরিস্থিতি ও পারিপার্শ্বিকতার প্রেক্ষিতে প্রয়োজনানুসারে অল্প অল্প করে নাযিল হয়েছে, যাতে এর স্মরণ রাখা, মর্ম অনুধাবণ ক্রমানুসারে তদনুযায়ী আমল করা সহজ হয়। [কুরতুবী] অথবা এক এক আয়াত করে পর্যায়ক্রমে নাযিল করা হয়েছে যাতে এর মধ্যে চিন্তা-গবেষণা করা যায়। [কুরতুবী]

কুরআনে দুনিয়া ও আখিরাতের প্রয়োজনীয় ও মৌলিক সব তথ্য আছে। বর্ণিত হয়েছে,

‘আমি তোমার ওপর এমন কিতাব অবতীর্ণ করেছি, যা সব বিষয়ে সুস্পষ্ট বর্ণনাকারী আর মুসলমানদের জন্য হিদায়াত, রহমত ও সুসংবাদ।’(সুরা নাহল: ৮৯)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে বলেছেন, জেনে রাখ! আমাকে কুরআন দেয়া হয়েছে এবং কুরআনের অনুরূপও দেয়া হয়েছে। [মুসনাদে আহমাদ ৪/১৩০]

  এসব আয়াত এমন এক মহান সত্তার পক্ষ হতে আগত হয়েছে, যিনি তার বাণীসমূহ ও বিধানসমূহে মহা প্রজ্ঞাময় ও সর্বজ্ঞ। [ইবন কাসীর]

৩:৫৮ ذٰلِكَ نَتۡلُوۡهُ عَلَیۡكَ مِنَ الۡاٰیٰتِ وَ الذِّكۡرِ الۡحَكِیۡمِ

যা আমি তোমার কাছে পাঠ করছি, তা হল আয়াত (নিদর্শনাবলী) ও বিজ্ঞানময় উপদেশ।

১১ : ২ اَلَّا تَعۡبُدُوۡۤا اِلَّا اللّٰهَ ؕ اِنَّنِیۡ لَكُمۡ مِّنۡهُ نَذِیۡرٌ وَّ بَشِیۡرٌ ۙ﴿۲﴾

২. যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া অন্যের ইবাদাত করো না, নিশ্চয় আমি তার পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা।

এখানে কুরআনের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অর্থাৎ তাওহীদের নির্দেশ দেয়া হচ্ছে। বলা হয়েছে, একমাত্র আল্লাহ তা’আলা ছাড়া অন্য কারো বন্দেগী করবে না। অর্থাৎ এ কুরআন মজবুত ও বিস্তারিতভাবে এজন্যই নাযিল করা হয়েছে যাতে তোমরা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কারও ইবাদত না কর। [ইবন কাসীর] আয়াতের এটাও অর্থ হতে পারে যে, কুরআনকে এভাবে নাযিল করেছি যাতে আপনি মানুষকে নির্দেশ দেন যে, তোমরা এক আল্লাহ ব্যতীত আর কারও ইবাদত করবে না। [কুরতুবী]

মোটকথা: আয়াতে কুরআনের বিষয়বস্তুর মধ্যে সর্বাধিক অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, একমাত্র আল্লাহ তা’আলা ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত করা যাবে না, যাকে তাওহীদুল উলুহিয়াহ বলা হয়। এটাকে প্রতিষ্ঠিত করতে বলা হয়েছে। মূলতঃ এটাই সমস্ত নবী-রাসূলদের প্রেরণের উদ্দেশ্য। এ কথা আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনের অন্যান্য আয়াতেও বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন। [যেমন,

— আর আপনার পূর্বে আমরা যে রাসূলই প্রেরণ করেছি তার কাছে এ ওহীই পাঠিয়েছি যে, আমি ব্যতীত অন্য কোন সত্য ইলাহ নেই, সুতরাং তোমরা আমারই ইবাদাত কর।সূরা আল-আম্বিয়াঃ ২৫,

— নিশ্চয়ই আমি প্রত্যেক উম্মতের ভেতর কোনও না কোনও রাসূল পাঠিয়েছি এই পথনির্দেশ দিয়ে যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাগূতকে পরিহার কর। তারপর তাদের মধ্যে কতক তো এমন ছিল, যাদেরকে আল্লাহ হিদায়াত দান করেছেন আর কতক ছিল এমন, যাদের উপর বিপথগামিতা অবধারিত হয়ে গেছে। সুতরাং তোমরা পৃথিবীতে একটু পরিভ্রমণ করে দেখ, (নবীদেরকে) অস্বীকারকারীদের পরিণতি কী হয়েছে? সূরা আন-নাহলঃ ৩৬]

 এখানে কুরআনের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করা হচ্ছে, আর তা হচ্ছেঃ রিসালাত। ইরশাদ হচ্ছে, “নিশ্চয় আমি তোমাদেরকে আল্লাহর পক্ষ হতে সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা।” এ আয়াতে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালামকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, তিনি সারা বিশ্ববাসীকে যেন জানিয়ে দেন যে, আমি আল্লাহ তা’আলার তরফ থেকে ভীতি প্রদর্শনকারী ও সুসংবাদ প্রদানকারী। যে আমার অনুসরণ করবে সে আল্লাহর শাস্তি থেকে মুক্তি পাবে এবং জান্নাতে যাবে, আর যে আমার বিরোধিতা করবে সে কঠোর শাস্তিতে নিপতিত হবে। হাদীসে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাফা পাহাড়ে আরোহণ করে কুরাইশদের সমস্ত শাখা গোত্রকে ডেকে বললেনঃ “হে কুরাইশ সম্প্রদায়! আমি যদি তোমাদেরকে এ সংবাদ দেই যে, এক আক্রমণকারী সেনাদল তোমাদেরকে আক্রমণ করতে যাচ্ছে তাহলে কি তোমরা আমার কথায় বিশ্বাস করতে পারবে?” তারা বললঃ আমরা তো আপনাকে কখনো মিথ্যা বলতে শুনিনি। তখন তিনি বললেনঃ “তাহলে আমি তোমাদের জন্য এক কঠোর শাস্তির ভীতিপ্রদর্শনকারী।” [বুখারীঃ ১৩৯৪, মুসলিমঃ ২০৮]

اَوَ لَمۡ یَتَفَكَّرُوۡا ٜ مَا بِصَاحِبِهِمۡ مِّنۡ جِنَّۃٍ ؕ اِنۡ هُوَ اِلَّا نَذِیۡرٌ مُّبِیۡنٌ ﴿

— তারা কি চিন্তা করে না যে, তাদের সঙ্গী (নবী) উন্মাদ নয়, সে তো এক স্পষ্ট সতর্ককারী। আরাফঃ১৮৪

— আর আমি রাসূলদেরকে কেবল সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে প্রেরণ করি। অতএব যারা ঈমান এনেছে ও শুধরে নিয়েছে, তাদের উপর কোন ভয় নেই এবং তারা চি‎‎ন্তিত হবে না। আনয়ামঃ ৪৮

— তুমি তো একজন সতর্ককারী বৈ কিছু নও। আমি তোমাকে সত্যসহ পাঠিয়েছি সুসংবাদ দাতা ও সতর্ককারীরূপে; আর এমন কোন জাতি নেই যার কাছে সতর্ককারী আসেনি।ফাতিরঃ২৩-২৪

১১ : ৩ وَّ اَنِ اسۡتَغۡفِرُوۡا رَبَّكُمۡ ثُمَّ تُوۡبُوۡۤا اِلَیۡهِ یُمَتِّعۡكُمۡ مَّتَاعًا حَسَنًا اِلٰۤی اَجَلٍ مُّسَمًّی وَّ یُؤۡتِ كُلَّ ذِیۡ فَضۡلٍ فَضۡلَهٗ ؕ وَ اِنۡ تَوَلَّوۡا فَاِنِّیۡۤ اَخَافُ عَلَیۡكُمۡ عَذَابَ یَوۡمٍ كَبِیۡرٍ ﴿۳﴾

৩. আরো যে, তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর, তারপর তার দিকে ফিরে আস, তিনি তোমাদেরকে এক নির্দিষ্ট কালের এক উত্তম জীবন উপভোগ করতে দেবেন এবং তিনি প্রত্যেক গুণীজনকে তার প্রাপ্য মর্যাদা দান করবেন। আর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে নিশ্চয় আমি তোমাদের উপর মহাদিনের শাস্তির আশংকা করি।

১১ : ৪ اِلَی اللّٰهِ مَرۡجِعُكُمۡ ۚ وَ هُوَ عَلٰی كُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ ﴿۴﴾

৪. আল্লাহরই কাছে তোমাদের ফিরে যাওয়া এবং তিনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান।

হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, হে লোকসকল! তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবা করো, কারণ আমি দিনে একশত বার তার কাছে তাওবা করি। [মুসলিম: ২৭০২]

আমি তোমাদেরকে পূর্ববর্তী যাবতীয় গুণাহ হতে ক্ষমা চেয়ে আল্লাহর দরবারে ফিরে আসার আহবান জানাই। এবং ভবিষ্যতে একমাত্র আল্লাহর সান্নিধ্যে থাকার প্রচেষ্টা চালাতে বলি।

তাওবা ও ইস্তিগফার মুমিনের জীবনের এক অপরিহার্য বিষয়। তাকওয়াপূর্ণ ও গুনাহমুক্ত জীবন লাভ করতে যা একান্ত জরুরি। আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজীদে মুত্তাকীদের গুণাবলির বর্ণনা দিয়ে বলেন—

وَ الَّذِیْنَ اِذَا فَعَلُوْا فَاحِشَةً اَوْ ظَلَمُوْۤا اَنْفُسَهُمْ ذَكَرُوا اللهَ فَاسْتَغْفَرُوا لِذُنُوْبِهِمْ  وَ مَنْ یَّغْفِرُ الذُّنُوْبَ اِلَّا اللهُ  وَ لَمْ یُصِرُّوْا عَلٰی مَا فَعَلُوْا وَ هُمْ یَعْلَمُوْنَ.

এবং তারা সেই সকল লোক, যারা কখনও কোনো অশ্লীল কাজ করে ফেললে বা (অন্য কোনোভাবে) নিজেদের প্রতি যুলুম করলে সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তার ফলে নিজেদের গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে— আর আল্লাহ ছাড়া কেইবা আছে, যে গুনাহ ক্ষমা করতে পারে। আর তারা জেনেশুনে তাদের কৃতকর্মে অবিচল থাকে না। —সূরা আলে ইমরান (০৩) : ১৩৫

 দুনিয়ায় তোমাদের অবস্থান করার জন্য যে সময় নির্ধারিত রয়েছে সেই সময় পর্যন্ত তিনি তোমাদের খারাপভাবে নয় বরং ভালোভাবেই রাখবেন। তাঁর নিয়ামতসমূহ তোমাদের ওপর বর্ষিত হবে। তাঁর বরকত ও প্রাচূর্যলাভে তোমরা ধন্য হবে। তোমরা সচ্ছল ও সুখী-সমৃদ্ধ থাকবে। তোমাদের জীবন শান্তিময় ও নিরাপদ হবে। তোমরা লাঞ্ছনা, হীনতা ও দীনতার সাথে নয় বরং সম্মান ও মর্যাদার সাথে জীবন যাপন করবে। এ বক্তব্যটিই সূরা নাহলের ৯৭ আয়াতে এভাবে বলা হয়েছেঃ

مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً (النحل: 97)

“যে ব্যক্তিই ঈমান সহকারে সৎকাজ করবে, সে পুরুষ হোক বা নারী, আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করবো

লোকদের মধ্যে সাধারণভাবে ছড়িয়ে থাকা একটি বিভ্রান্তি দূর করাই এর উদ্দেশ্য। বিভ্রান্তিটি হচ্ছে, আল্লাহ ভীতি, সততা, সাধুতা ও দায়িত্বানুভূতির পথ অবলম্বন করলে মানুষ আখেরাতে লাভবান হলেও হতে পারে কিন্তু এর ফলে তার দুনিয়া একদম বরবাদ হয়ে যায়। এ মন্ত্র শয়তান প্রত্যেক দুনিয়ার মোহে মুগ্ধ অজ্ঞ-নির্বোধের কানে ফুঁকে দেয়। এ সঙ্গে তাকে এ প্ররোচনাও দেয়া যে, এ ধরনের আল্লাহ ভীরু ও সৎলোকদের জীবনে দারিদ্র, অভাব ও অনাহার ছাড়া আর কিছুই নেই। আল্লাহ এ ধারণার প্রতিবাদ করে বলেন, এ সঠিক পথ অবলম্বন করলে তোমাদের শুধুমাত্র আখেরাতই নয়, দুনিয়াও সমৃদ্ধ হবে। আখেরাতের মতো ও এ দুনিয়ায় যথার্থ মর্যাদা ও সাফল্যও এমনসব লোকের জন্য নির্ধারিত, যারা আল্লাহর প্রতি যথার্থ আনুগত্য সহকারে সৎ জীবন যাপন করে, যারা পবিত্র ও ত্রুটিমুক্ত চরিত্রের অধিকারী হয়, যাদের ব্যবহারিক জীবনে ও লেনদেনে কোন ক্লেদ ও গ্লানি নেই, যাদের ওপর প্রত্যেকটি বিষয়ে ভরসা করা যেতে পারে, যাদের থেকে প্রত্যেক ব্যক্তি কল্যাণের আশা পোষণ করে এবং কোন ব্যক্তি বা জাতি যাদের থেকে অকল্যাণের আশঙ্কা করে না।

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: ঐ ব্যক্তি সফলকাম হয়েছে যে ইসলাম গ্রহণ করেছে, তাকে যথেষ্ট পরিমাণ রিযিক দান করা হয়েছে এবং আল্লাহ তা‘আলা তাকে যা দিয়েছেন তাই নিয়ে সন্তুষ্ট থেকেছে। (তিরমিযী হা: ২৩৪৮, সহীহ)

এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে যাই খরচ করবে তাতেই আল্লাহর কাছ থেকে এর জন্য সওয়াব পাবে। এমনকি যা তোমার স্ত্রীর মুখে তুলে দাও তাতেও”। [বুখারীঃ ৫৬, মুসলিমঃ ১৬২৮]

তাওবা ও ইস্তিগফারকারীদের প্রতি আল্লাহ শাস্তি প্রেরণ করেন না

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন

وَ مَا كَانَ اللهُ لِیُعَذِّبَهُمْ وَ اَنْتَ فِیْهِمْ  وَ مَا كَانَ اللهُ مُعَذِّبَهُمْ وَ هُمْ یَسْتَغْفِرُوْنَ

আপনি তাদের মাঝে থাকা অবস্থায় কিছুতেই আল্লাহ তাদেরকে শাস্তি দেবেন না। আর তারা ক্ষমা প্রার্থনা করা অবস্থায়ও তাদেরকে শাস্তি দেবেন না। —সূরা আনফাল (০৮) : ৩৩

তাওবা ও ইস্তিগফার মুমিনের পার্থিব নিআমত, শক্তি সামর্থ্য ও যাবতীয় সমৃদ্ধি লাভে সাহায্য করে

কুরআনে ইরশাদ হয়েছে—

فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوْا رَبَّكُمْ  اِنَّهٗ كَانَ غَفَّارًا، یُّرْسِلِ السَّمَآءَ عَلَیْكُمْ مِّدْرَارًا، وَّ یُمْدِدْكُمْ بِاَمْوَالٍ وَّ بَنِیْنَ وَ یَجْعَلْ لَّكُمْ جَنّٰتٍ وَّ یَجْعَلْ لَّكُم اَنْهٰرًا

আমি বললাম, তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল। তাহলে তিনি তোমাদের প্রতি মুষলধারে বৃষ্টি প্রেরণ করবেন। আর তিনি তোমাদেরকে সম্পদ ও সন্তানাদি বৃদ্ধি করে দেবেন। তিনি তোমাদের জন্য বিভিন্ন উদ্যান ও নদ-নদী সৃষ্টি করে দেবেন। —সূরা নূহ (৭১) : ১০-১২

অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে—

وَ یٰقَوْمِ اسْتَغْفِرُوْا رَبَّكُمْ ثُمَّ تُوْبُوْۤا اِلَیْهِ یُرْسِلِ السَّمَآءَ عَلَیْكُمْ مِّدْرَارًا وَّ یَزِدْكُمْ قُوَّةً اِلٰی قُوَّتِكُمْ وَ لَا تَتَوَلَّوْا مُجْرِمِیْنَ.

হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর। অতঃপর তাঁর কাছে তাওবা কর। তিনি তোমাদের প্রতি মুষলধারে বৃষ্টি প্রেরণ করবেন। তোমাদের শক্তিকে আরও বাড়িয়ে দেবেন। আর তোমরা অপরাধী হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিও না। —সূরা হুদ (১১) : ৫২

এভাবে কুরআন মাজীদ তাওবা ও ইস্তিগফারের অনেক ফায়দা ও উপকারের কথা তুলে ধরেছে। তাই আল্লাহ তাআলার ক্ষমা, দয়া এবং দুনিয়া ও আখিরাতে সব দিক থেকে তাঁর সাহায্য লাভ করার জন্য তাওবা ও ইস্তিগফারের বিকল্প নেই।

তাওবা ও ইস্তিগফারের উপকারিতায় রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন—

عن ابن عباس، رضي الله عنهما قال: قال رسولُ الله صلَّى الله عليه وسلم: مَنْ لَزِمَ الاستغفارَ جَعَلَ الله له من كل ضيق مَخرَجاً، ومن كل هم فرَجاً، ورزقَه من حيث لا يحتسب.

যে ব্যক্তি বেশি বেশি ইস্তিগফার করবে আল্লাহ তাআলা তার সকল সংকট থেকে উত্তরণের ব্যবস্থা করে দেন, তার সকল পেরেশানী দূর করে দেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিযিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না। —সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১৫১৮

তবে কোন আমল সৎ আমল হিসেবে গণ্য হবার জন্য দুটি শর্ত রয়েছে

১. একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টির জন্য করতে হবে।

 আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (وَمَآ أُمِرُوْآ إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللهَ مُخْلِصِيْنَ لَهُ الدِّيْنَ حُنَفَا۬ءَ وَيُقِيْمُوا الصَّلٰوةَ وَيُؤْتُوا الزَّكٰوةَ وَذٰلِكَ دِيْنُ الْقَيِّمَةِ) “তাদেরকে এছাড়া কোন নির্দেশ করা হয়নি যে, তারা বিশুদ্ধচিত্তে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে, সালাত কায়েম করবে এবং যাকাত দেবে। এটাই সঠিক ধর্ম। ” (সূরা বাইয়্যেনাহ ৯৮:৫)

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ যদি কেউ গুণাহর কাজ করে তখন তার জন্য একটি গুণাহ লিখা হয়। পক্ষান্তরে যদি সওয়াবের কাজ করে তবে তার জন্য দশটি সওয়াব লিখা হয়। তারপর যদি দুনিয়াতে তার গুণাহের শাস্তি পেয়ে যায় তবে তার জন্য আখেরাতে দশটি সওয়াবই বাকী থাকে, কিন্তু যদি দুনিয়াতে শাস্তি না পায় তবে আখেরাতে একটি গুণাহের বিনিময়ে একটি সওয়াব চলে গেলেও তার আরও নয়টি সওয়াব অবশিষ্ট থাকে। সুতরাং যার একক দশকের উপর প্রাধান্য পায় তার তো ধ্বংসই অনিবার্য। [তাবারী] এরপর আয়াতে বলা হয়েছে, তাদেরকে আল্লাহ উত্তম জীবন সামগ্রী প্রদান করবেন। এ হচ্ছে ইস্তেগফার ও তাওবার ফল। [কুরতুবী]

এছাড়া متاع حسن (উত্তম জীবন সামগ্রী) শব্দের মধ্যে আর একটি দিকও রয়েছে। এ দিকটি দৃষ্টির অগোচরে চলে যাওয়া উচিত নয়। কুরআন মজীদের দৃষ্টিতে দুনিয়ার জীবন সামগ্রী দুপ্রকারের।

এক প্রকারের জীবন সামগ্রী আল্লাহ বিমুখ লোকদেরকে ফিত্নার মধ্যে নিক্ষেপ করার জন্য দেয়া হয়ে থাকে। এর মাধ্যমে প্রতারিত হয়ে তারা নিজেদেরকে দুনিয়া পূজা ও আল্লাহ বিস্মৃতির মধ্যে আরো বেশী করে হারিয়ে যায়। আপাতদৃষ্টিতে এটি নিয়ামত ঠিকই কিন্তু গভীরভাবে নিরীক্ষণ করলে দেখা যাবে এটি আল্লাহর লানত ও আযাবের পটভূমিই রচনা করে। কুরআন মজীদ (আরবী) তথা প্রতারণার সামগ্রী নামেও একে স্মরণ করে।

 দ্বিতীয় প্রকারের জীবন সামগ্রী মানুষকে আরো বেশী সচ্ছল, সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী করে তাকে তার আল্লাহর আরো বেশী কৃতজ্ঞ বান্দায় পরিণত করে। এভাবে সে আল্লাহর, তাঁর বান্দাদের এবং নিজের অধিকার আরো বেশী করে আদায় করতে সক্ষম হয়। আল্লাহর দেয়া উপকরণাদির সাহায্যে শক্তি সঞ্চয় করে সে দুনিয়ায় ভালো, ন্যায় ও কল্যাণের উন্নয়ন এবং মন্দ, বিপর্যয় ও অকল্যাণের পথ রোধ করার জন্য এর বেশী প্রভাবশালী ও কার্যকর প্রচেষ্টা চালাতে থাকে। এ হচ্ছে কুরআনের ভাষায় উত্তম জীবন সামগ্রী। অর্থাৎ এমন উন্নত পর্যায়ের জীবন সামগ্রী যা নিছক দুনিয়ার আয়েশ-আরামের মধ্যেই খতম হয়ে যায় না বরং পরিণামে আখেরাতেরও শান্তির উপকরণে পরিণত হয়।

আল্লামা শানকীতী বলেন, আয়াতে ‘উত্তম জীবন সামগ্রী’ বলে প্রশস্ত রিযক, জীবিকার উন্নত অবস্থা, দুনিয়াতে সার্বিক নিরাপত্তা বোঝানো হয়েছে। আর ‘নির্দিষ্ট সময়’ বলে মৃত্যুকে বোঝানো হয়েছে।

অন্য আয়াতেও সেটা বলা হয়েছে, যেমন হুদ আলাইহিস সালাম তার কাওমকে বলেছিলেন, “হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর, তারপর তার দিকেই ফিরে আস। তিনি তোমাদের উপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষাবেন। আর তিনি তোমাদেরকে আরো শক্তি দিয়ে তোমাদের শক্তি বৃদ্ধি করবেন এবং তোমরা অপরাধী হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিও না” [সূরা হুদঃ ৫২]

অনুরূপ নূহ আলাইহিস সালামের সাথে তার কাওমের কথোপকথন সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “অতঃপর বলেছি, তোমাদের রবের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর, নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, তিনি তোমাদের জন্য প্রচুর বৃষ্টিপাত করবেন, এবং তিনি তোমাদেরকে সমৃদ্ধ করবেন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে এবং তোমাদের জন্য স্থাপন করবেন উদ্যান ও প্রবাহিত করবেন নদীনালা। [সূরা নূহঃ ১০–১২]

মুখ ফিরিয়ে নিলে——-

নিশ্চয় যারা নিজেদের কাছে সৎপথ স্পষ্ট হওয়ার পর তা থেকে পৃষ্ঠপ্ৰদৰ্শন করে, শয়তান তাদের কাজকে শোভন করে দেখায় এবং তাদেরকে মিথ্যা আশা দেয়। সূরা মুহাম্মদঃ ২৫

যে সৎকাজ করে সে তার নিজের কল্যাণের জন্যই তা করে এবং কেউ মন্দ কাজ করলে তার প্রতিফল সে-ই ভোগ করবে। আর আপনার রব তার বান্দাদের প্রতি মোটেই যুলুমকারী নন। হামীম আস সাজদাহঃ ৪৬

আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:

﴿ وَلِلَّذِينَ كَفَرُواْ بِرَبِّهِمۡ عَذَابُ جَهَنَّمَۖ وَبِئۡسَ ٱلۡمَصِيرُ ٦ إِذَآ أُلۡقُواْ فِيهَا سَمِعُواْ لَهَا شَهِيقٗا وَهِيَ تَفُورُ ٧ تَكَادُ تَمَيَّزُ مِنَ ٱلۡغَيۡظِۖ﴾ [الملك: ٦، ٨]

‘আর যারা তাদের রবকে অস্বীকার করে, তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের আযাব। আর কতইনা নিকৃষ্ট সেই প্রত্যাবর্তনস্থল! যখন তাদেরকে তাতে নিক্ষেপ করা হবে, তখন তারা তার বিকট শব্দ শুনতে পাবে। আর তা উথলিয়ে উঠবে। ক্রোধে তা ছিন্নভিন্ন হবার উপক্রম হবে।’ (সূরা আল-মুলক, আয়াত: ৬-৮)

‘নিশ্চয় যারা আমার নিদর্শনসমূহ অস্বীকার করবে, আমি তাদের আগুনে নিক্ষেপ করব। তাদের চামড়াগুলো যখন জ্বলে পুড়ে যাবে তখন আবার আমি অন্য চামড়া দিয়ে তা পাল্টে দেব। যাতে তারা আযাব ভোগ করবে পারে।’ (সূরা আন-নিসা: ৫৬)

১১ : ৫ اَلَاۤ اِنَّهُمۡ یَثۡنُوۡنَ صُدُوۡرَهُمۡ لِیَسۡتَخۡفُوۡا مِنۡهُ ؕ اَلَا حِیۡنَ یَسۡتَغۡشُوۡنَ ثِیَابَهُمۡ ۙ یَعۡلَمُ مَا یُسِرُّوۡنَ وَ مَا یُعۡلِنُوۡنَ ۚ اِنَّهٗ عَلِیۡمٌۢ بِذَاتِ الصُّدُوۡرِ ﴿۵﴾

৫. জেনে রাখ! নিশ্চয় তারা তার কাছে গোপন রাখার জন্য তাদের বক্ষ দ্বিভাঁজ করে। জেনে রাখ! তারা যখন নিজেদেরকে বস্ত্রে আচ্ছাদিত করে তখন তারা যা গোপন করে ও প্রকাশ করে, তিনি তা জানেন। অন্তরে যা আছে, নিশ্চয় তিনি তা সবিশেষ অবগত।

আলোচ্য আয়াতে বলা হয়েছে যে, কাফেরগণ সন্দেহ সংশয় করে মুখ লুকিয়ে থাকে আর মনে করে যে, এর মাধ্যমে তারা নিজেদেরকে আড়াল করতে পারবে। তারা মূলতঃ আল্লাহ থেকে কখনো আড়াল করতে পারবে না। কেননা, আল্লাহ্ তাআলা থেকে কোন কিছুই আড়াল নেই। তাই যত চেষ্টাই করুক না কেন তারা নিজেদের আড়াল করতে পারবে না।

অন্য আয়াতে আল্লাহ্ তা’আলা বলেনঃ “আমরাই মানুষকে সৃষ্টি করেছি এবং তার প্রবৃত্তি তাকে যে কুমন্ত্রণা দেয় তা আমি জানি।” [সূরা কাফঃ ১৬]

অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেনঃ “আর জেনে রাখ যে, তোমাদের অন্তরে যা গোপন আছে আল্লাহ তা জানেন সুতরাং তোমরা তাকে ভয় কর।” [সূরা আল-বাকারাহঃ ২৩৫]

অন্য আয়াতে বলেনঃ “তারপর আমরা অবশ্যই জ্ঞানসহ তাদের কাছে তা ব্যক্ত করব, আর আমরা তো অনুপস্থিত ছিলাম না।” [সূরা আল-আরাফঃ ৭]

আরও বলেনঃ “আপনি যে কোন অবস্থায় থাকেন এবং আপনি সে সম্পর্কে কুরআন থেকে যা তিলাওয়াত করেন এবং তোমরা যে কোনো কাজ কর, আমি তোমাদের পরিদর্শক—যখন তোমরা তাতে প্রবৃত্ত হও। আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর অণু পরিমাণও আপনার প্রতিপালকের দৃষ্টির বাইরে নয় এবং তার চেয়ে ক্ষুদ্রতর বা বৃহত্তর কিছুই নেই যা সুস্পষ্ট কিতাবে নেই।” [সূরা ইউনুসঃ ৬১]

তবে তারা যে শুধু হক শোনা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিত তাই নয়। বরং তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর যে বাণী শোনাত তাও না শোনার ভান করত। আর মনে করত যে, এভাবে তারা আল্লাহ থেকে গোপন করছে। কারণ, মক্কায় যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হলো তখন সেখানে এমন বহু লোক যারা বিরোধিতায় প্রকাশ্যে তেমন একটা তৎপর ছিল না কিন্তু মনে মনে তার দাওয়াতের প্রতি ছিল চরমভাবে ক্ষুব্ধ ও বিরূপভাবাপন্ন। তারা তাঁকে পাশ কাটিয়ে চলতো। তাঁর কোন কথা শুনতে চাইতো না। কোথাও তাঁকে বসে থাকতে দেখলে পেছন ফিরে চলে যেতো। দূর থেকে তাঁকে আসতে দেখলে মুখ ফিরিয়ে নিতো অথবা কাপড়ের আড়ালে মুখ লুকিয়ে ফেলতো, যাতে তাঁর মুখোমুখি হতে না হয় এবং তিনি তাদেরকে সম্বোধন করে কথা বলতে শুরু করে না দেন। এখানে এ ধরনের লোকদের প্রতি ইংগিত করা হয়েছে। [তাবারী; বাগভী; সাদী; ফাতহুল কাদীর]

আয়াতের অপর অনুবাদ হচ্ছে, তারা আল্লাহর কাছ থেকে বা রাসূলের কাছ থেকে নিজেদের লুকানোর জন্য মাথা নীচু করে সামনের দিকে ঝুঁকে কাপড় দিয়ে ঢেকে চলে যেত। অথচ যত কাপড় দিয়েই তারা নিজদেরকে ঢাকুক না কেন আল্লাহ্ তা’আলা ঠিকই তাদের দেখছেন। [ইবন কাসীর] তাই আয়াতে বলা হয়েছে, এরা সত্যের মুখোমুখি হতে ভয় পায় এবং উটপাখির মত বালির মধ্যে মুখ গুঁজে রেখে মনে করে, যে সত্যকে দেখে তারা মুখ লুকিয়েছে তা অন্তর্হিত হয়ে গেছে। অথচ সত্য নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে এবং এ তামাশাও দেখছে যে, এ নির্বোধরা তার থেকে বাঁচার জন্য মুখ লুকাচ্ছে। অথবা আয়াতের অর্থ, তারা তাদের কুফর তাদের অন্তরে গোপন করে রাখে আর মনে করে যে, আল্লাহ থেকে গোপন করছে। অথচ তারা যত কাপড় দিয়েই নিজেদেরকে আড়াল করুক না কেন আল্লাহ তো তাদের অবস্থা জানেন। [মুয়াসসার]

আবার তাদের মধ্যে এমন কতিপয় লোকও ছিল যারা তাদের প্রাত্যহিক গোপনীয় কাজসমূহ যেমন স্ত্রী-সহবাস, পায়খানা ব্যবহার করার সময়ও নিজেদের কাপড় খুলতে লজ্জাবোধ করত এবং তা আকাশের দিকে হয়ে যাওয়ার ভয় করত। কিন্তু অন্যান্য সময় আল্লাহর কোন খেয়াল রাখত না। তাই আল্লাহ তা’আলা তাদের এ অদ্ভুত কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে এ আয়াত নাযিল করেন। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেনঃ ‘তারা (কাফেরগণ) স্ত্রী-সহবাসের সময় বা পায়খানা ব্যবহার করার সময় আকাশের দিকে মুখ করতে লজ্জাবোধ করত এবং কাপড় দিয়ে নিজেদের মাথা ঢেকে রাখত। তখন আল্লাহ এ আয়াত নাযিল করেন। [বুখারীঃ ৪৬৮১, ৪৬৮২, ৪৬৮৩]

১১ : ৬ وَ مَا مِنۡ دَآبَّۃٍ فِی الۡاَرۡضِ اِلَّا عَلَی اللّٰهِ رِزۡقُهَا وَ یَعۡلَمُ مُسۡتَقَرَّهَا وَ مُسۡتَوۡدَعَهَا ؕ كُلٌّ فِیۡ كِتٰبٍ مُّبِیۡنٍ ﴿۶﴾

(৬) আর ভূপৃষ্ঠে বিচরণকারী কোন এমন প্রাণী নেই যে, তার রুযী আল্লাহর দায়িত্বে নেই। আর তিনি প্রত্যেকের স্থায়ী ও অস্থায়ী অবস্থানক্ষেত্র সম্বন্ধে জ্ঞান রাখেন; সবই সুস্পষ্ট গ্রন্থে (লাওহে মাহ্ফুযে লিপিবদ্ধ) রয়েছে।

রিযিকের আভিধানিক অর্থ এমন বস্তু যা কোন প্রাণী আহার্যরূপে গ্রহণ করে, যার দ্বারা সে দৈহিক শক্তি সঞ্চয়, প্রবৃদ্ধি সাধন এবং জীবন রক্ষা করে থাকে। রিযিকের জন্য মালিকানা স্বত্ব শর্ত নয়। সকল জীব জন্তু রিযিক ভোগ করে থাকে কিন্তু তারা তার মালিক হয় না। কারণ, মালিক হওয়ার যোগ্যতাই ওদের নেই। অনুরূপভাবে ছোট শিশুরাও মালিক নয়, কিন্তু ওদের রিযিক অব্যাহতভাবে তাদের কাছে পৌছতে থাকে। [কুরতুবী]

 এমন সব প্রাণীকে دابة )دَآبَّۃٍ বলে যা ভূপৃষ্ঠে বিচরণ করে। [কুরতুবী] পক্ষীকুলও এর অন্তর্ভুক্ত। কারণ, খাদ্য গ্রহনের জন্য তারা ভূপৃষ্ঠে অবতরণ করে থাকে এবং তাদের বাসস্থান ভূ-পৃষ্ঠ সংলগ্ন হয়ে থাকে সামুদ্রিক প্রাণীসমূহ ও পৃথিবীর বুকে বিচরণশীল। কেননা, সাগর-মহাসাগরের তলদেশেও মাটির অস্তিত্ব রয়েছে। মোটকথা, সমুদয় প্রাণীকুলের রিযিকের দায়িত্ব তিনি নিজেই গ্রহন করছেন। এবং একথা এমনভাবে ব্যক্ত করেছেন যদ্বারা দায়িত্ব ও কর্তব্য নির্দেশ করা যায়।

ইরশাদ হয়েছে, “তাদের রিযিকের দায়িত্ব আল্লাহর উপর ন্যস্ত”। একথা সুস্পষ্ট যে, আল্লাহ তা’আলার উপর এহেন গুরুদায়িত্ব চাপিয়ে দেয়ার মত কোন ব্যক্তি বা শক্তি নেই, বরং তিনি নিজেই অনুগ্রহ করে গ্রহন করে আমাদেরকে আশ্বস্ত করেছেন।

আর এক পরম সত্য, দাতা ও সর্বশক্তিমান সত্তার ওয়াদা যাতে নড়চড় হওয়ার অবকাশ নেই। সুতরাং নিশ্চয়তা বিধান করণার্থে এখানে على শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে যা ফরয বা অবশ্যকরণীয় ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। অথচ আল্লাহর উপর কোন কাজ ফরয বা ওয়াজিব হতে পারে না, তিনি কারো হুকুমের তোয়াক্কা করেন না। বরং এটি সম্পূর্ণ তার অনুগ্রহ। [কুরতুবী] কোন কোন মুফাসসির অবশ্য বলেছেন যে, এখানে على বা উপরে বলে من বা হতে বলা উদ্দেশ্য। অর্থাৎ সবার রিযক আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে। [কুরতুবী]

 আয়াতে উল্লেখিত مستقر এবং مستودع এর অর্থ,

(مُسۡتَقَرَّهَا) مستقر শব্দটির কয়েকটি অর্থ করা হয়েছে,

 ১. যমীনের বুকে অবস্থান স্থল। বা পিতার পিঠে অবস্থানকে।

 ২. দিন বা রাতে আশ্রয় নেয়ার স্থান।

আর (مُسۡتَوۡدَعَهَا) مستودع শব্দটিরও কয়েকটি অর্থ বর্ণনা করা হয়েছে,

১. মায়ের রেহেমে অবস্থান বা ডিমের মধ্যে অবস্থানকে।

 ২ মৃত্যু হওয়ার স্থানকে। [দেখুন, তাবারী; কুরতুবী; ইবন কাসীর; সা’দী]

এ ব্যাপারে এক হাদীসে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “যখন কারো মৃত্যু কোন যমীনে লিখা থাকে তখন সে সেখানে যাওয়ার জন্য কোন না কোন প্রয়োজন অনুভব করবে। তারপর সে যখন সেখানে পৌছবে তখন তাকে মৃত্যু দেয়া হয়। আর কিয়ামতের দিন যমীন তাকে বের করে দিয়ে বলবে, هٰذَا مَا اسْتَوْدَعْتَنِيْ অর্থাৎ এটা আমার কাছে আপনি আমানত রেখেছিলেন। [মুস্তাদরাকে হাকিমঃ ১/৪২, সুনানুল কুবরা লিল বাইহাকীঃ ৯৮৮৯] কালেমাদ্বয়ের আরো বিস্তারিত তাফসীর সূরা আল আন’আমের ৯৮ নং আয়াতে করা হয়েছে।

وَہُوَ الَّذِیۡۤ اَنۡشَاَکُمۡ مِّنۡ نَّفۡسٍ وَّاحِدَۃٍ فَمُسۡتَقَرٌّ وَّمُسۡتَوۡدَعٌ ؕ قَدۡ فَصَّلۡنَا الۡاٰیٰتِ لِقَوۡمٍ یَّفۡقَہُوۡنَ

তিনিই সেই সত্তা, যিনি তোমাদের সকলকে একই ব্যক্তি হতে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর (প্রত্যেকের রয়েছে) এক অবস্থানস্থল ও এক আমানত স্থল। আমি নিদর্শনসমূহ স্পষ্ট করে দিয়েছি, সেই সকল লোকের জন্য, যারা বুঝ-সমঝ রাখে। সূরা আল আন’আমঃ ৯৮

مستقر (অবস্থানস্থল) বলে সেই জায়গাকে, যাকে মানুষ যথারীতি ঠিকানা বানিয়ে নেয়। পক্ষান্তরে আমানত রাখার স্থানে সাময়িক অবস্থান হয়ে থাকে। সেখানে বসবাসের যথারীতি ব্যবস্থা করা হয় না। এ বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য করে এ আয়াতের বিভিন্ন তাফসীর করা হয়েছে।

হযরত হাসান বসরী (রহ.) থেকে বর্ণিত আছে যে, مستقر দ্বারা বোঝানো উদ্দেশ্য দুনিয়া, যেখানে মানুষ দস্তুরমত তার বসবাসের ঠিকানা বানিয়ে নেয়। আর আমানতস্থল দ্বারা বোঝানো হয়েছে কবর, যেখানে মানুষ মৃত্যুর পর সাময়িকভাবে অবস্থান করে। অতঃপর তাকে সেখান থেকে জান্নাত বা জাহান্নামে নিয়ে যাওয়া হবে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযি.) এর ব্যাখ্যা করেছেন যে, مستقر হলো মায়ের গর্ভ, যেখানে বাচ্চা কয়েক মাস অবস্থান করে। আর مستودع হল পিতার ঔরস, যেখানে শুক্রবিন্দু সাময়িকভাবে অবস্থান করে, তারপর মাতৃগর্ভে স্থানান্তরিত হয়। কতক মুফাসসির এর বিপরীতে مستقر অর্থ বলেছেন পিতার ঔরস ও مستودع অর্থ করেছেন মাতৃগর্ভ, যেহেতু বাচ্চা সেখানে সাময়িকভাবে থাকে (রুহুল মাআনী)।

 আয়াতে বর্ণিত সুস্পষ্ট কিতাব বলতে লাওহে মাহফুজকে বুঝানো হয়েছে। আল্লাহ তা’আলা বান্দার সমস্ত কর্মকাণ্ড সুস্পষ্ট কিতাবে লিখে নিয়েছেন এবং তার জ্ঞান থেকে এর সামান্যও গোপন থাকে না, এটা তিনি পবিত্র কুরআনে বারবার ঘোষণা করেছেন। [দেখুন, সূরা আল-আনআমঃ ৩৮, ৫৯, সূরা ইউনুসঃ ৬১]

১১ : ৭ وَ هُوَ الَّذِیۡ خَلَقَ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضَ فِیۡ سِتَّۃِ اَیَّامٍ وَّ كَانَ عَرۡشُهٗ عَلَی الۡمَآءِ لِیَبۡلُوَكُمۡ اَیُّكُمۡ اَحۡسَنُ عَمَلًا ؕ وَ لَئِنۡ قُلۡتَ اِنَّكُمۡ مَّبۡعُوۡثُوۡنَ مِنۡۢ بَعۡدِ الۡمَوۡتِ لَیَقُوۡلَنَّ الَّذِیۡنَ كَفَرُوۡۤا اِنۡ هٰذَاۤ اِلَّا سِحۡرٌ مُّبِیۡنٌ ﴿۷﴾

৭. আর তিনিই আসমানসমূহ ও যমীনকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেন, আর তাঁর আরশ ছিল পানির উপর, তোমাদের মধ্যে কে আমলে শ্রেষ্ঠ তা পরীক্ষা করার জন্য। আর আপনি যদি বলেন, নিশ্চয় মৃত্যুর পর তোমাদেরকে উত্থিত করা হবে, তবে কাফেররা অবশ্যই বলবে, এ তো সুস্পষ্ট জাদু।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আল্লাহর ডান হাত পরিপূর্ণ, দিন-রাত খরচ করলেও তা কমে না। তোমরা কি দেখ না যে, আসমান ও যমীনের সৃষ্টি সময় থেকে আজ পর্যন্ত তিনি কত বিপুল পরিমাণে খরচ করেছেন? তবুও তার ডান হাতের কিছুই কমেনি। আর তার আরশ পানির উপর অবস্থিত ছিল। তাঁর অন্য হাতের রয়েছে ইনসাফের দাঁড়িপাল্লা, সে অনুসারে বৃদ্ধি-ঘাটতি বা উন্নতি অবনতি ঘটান। [বুখারীঃ ৭৪১৯]

 অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, ইমরান ইবনে হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “শুধু আল্লাহই ছিলেন, তাঁর পূর্বে কেউ ছিল না। আর তাঁর আরশ ছিল পানির উপর এবং তিনি যিকর বা ভাগ্যফলে সবকিছু লিখে নেন এবং আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেন। [বুখারীঃ ৩১৯১]

অন্য হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আল্লাহ আসমান ও যমীন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বে সমস্ত সৃষ্টি জগতের তাকদীর লিখে রেখেছেন। আর তাঁর আরশ ছিল পানির উপর।” [মুসলিমঃ ২৬৫৩]

মোটকথা, কুরআনের ২১টি আয়াতে আরশের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

 অনুরূপভাবে সহীহ হাদীসেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরশের বিভিন্ন বর্ণনা দিয়েছেন। সেসমস্ত হাদীস মুতাওয়াতির পর্যায়ে পৌছে গেছে। মূলতঃ আরশ হলো আল্লাহর প্রথম সৃষ্টি। সেটা প্রকাণ্ড ও সর্ববৃহৎ সৃষ্টি। আরশের সামনে কুরসী একটি রিং এর মতো, যেমনিভাবে আসমান ও যমীন কুরসীর সামনে রিং এর মতো। আরশের গঠন গম্বুজের মত। যা সমস্ত সৃষ্টি জগতের উপরে রয়েছে। এমনকি জান্নাতুল ফেরদাউসও আরশের নীচে অবস্থিত। আরশের কয়েকটি পা রয়েছে। মূসা আলাইহিস সালাম হাশরের মাঠে তার একটি ধরে থাকবেন। এ আরশের বহনকারী কিছু ফিরিশতা রয়েছেন। তাদের ব্যাপারে পবিত্র কুরআন ঘোষণা দিচ্ছেন যে, কিয়ামতের দিন তারা হবেন আট। ইরশাদ হয়েছে—এবং ফেরেশতাগণ থাকবে তার কিনারায় এবং তোমার প্রতিপালকের আরশ সে দিন আটজন ফেরেশতা তাদের উপরে বহন করে রাখবে।[সূরা আল-হাক্কাহঃ ১৭]

তবে এ ব্যাপারে ভিন্ন মত রয়েছে যে, আরশের বহনকারী ফিরিশতাগণ কি আট জন নাকি আট শ্রেণী নাকি আট কাতার। এ আয়াতে বর্ণিত পানির উপর আরশ থাকার অর্থ হচ্ছে, আল্লাহ্ তা’আলার আরশ কোন কিছু সৃষ্টি করার আগে পানির উপর ছিল। এর দ্বারা পানি আগে সৃষ্টি করা বুঝায় না। তবে এখানে পানি দ্বারা দুনিয়ার কোন সমুদ্রের পানি বুঝানো হয়নি। কেননা, তা আরো অনেক পরে সৃষ্ট। বরং এখানে আল্লাহর সৃষ্ট সুনির্দিষ্ট কোন পানি উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন, [ইবনে কাসীর প্রণীত আল- বিদায়া ওয়ান-নিহায়া ১ম খণ্ড]। ইরশাদ হয়েছে—–

বলুন, তোমরা কি তাঁর সাথেই কুফারী করবে। যিনি যমীন সৃষ্টি করেছেন দু’দিনে এবং তোমরা কি তাঁর সমকক্ষ তৈরী করছ? তিনি সৃষ্টিকুলের রব্ব্! আর তিনি স্থাপন করেছেন অটল পর্বতমালা ভূপৃষ্ঠে এবং তাতে দিয়েছেন বরকত এবং চার দিনের মধ্যে এতে খাদ্যের ব্যবস্থা করেছেন সমভাবে যাচ্ঞাকারীদের জন্য। তারপর তিনি আসমানের প্রতি ইচ্ছে করলেন, যা (পূর্বে) ছিল ধোঁয়া। অতঃপর তিনি ওটাকে (আসমান) ও যমীনকে বললেন, তোমরা উভয়ে আস ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়। তারা বলল, আমরা আসলাম অনুগত হয়ে। অত:পর তিনি সেগুলোকে সাত আসমানে পরিণত করলেন দু’দিনে এবং প্রত্যেক আসমানে তার নির্দেশ ওহী করে পাঠালেন এবং আমরা নিকটবর্তী আসমানকে সুশোভিত করলাম প্ৰদীপমালা দ্বারা এবং করলাম সুরক্ষিত। এটা পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞের ব্যবস্থাপনা। সূরা ফুসসিলাতঃ১০-১২

আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টির বিষয় পবিত্র কুরআনে সংক্ষেপে ও বিস্তারিতভাবে বহু জায়গায় বিবৃত হয়েছে, কিন্তু কোনটির পরে কোনটি সৃজিত হয়েছে, এর উল্লেখ সম্ভবত: মাত্র তিন আয়াতে করা হয়েছে- (এক) হা-মীম সাজদার আলোচ্য আয়াত, (দুই) সূরা বাকারার ২৯ নং আয়াত (তিন)  সূরা আন-নাযি’আতের ২৮-৩২

সবগুলো আয়াত নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করলে মনে হয় যে, প্রথমে পৃথিবীর উপকরণ সৃজিত হয়েছে। এমতাবস্থায়ই ধুম্রকুঞ্জের আকারে আকাশের উপকরণ নির্মিত হয়েছে। এরপর পৃথিবীকে বর্তমান আকারে বিস্তৃত করা হয়েছে এবং এতে পর্বতমালা, বৃক্ষ ইত্যাদি সৃষ্টি করা হয়েছে। এরপর আকাশের তরল ধূম্রকুঞ্জের উপকরণকে সপ্ত আকাশে পরিণত করা হয়েছে। আশা করি সবগুলো আয়াতই এই বক্তব্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। বাকী প্রকৃত অবস্থা আল্লাহ্ তা’আলাই জানেন। সহীহ বুখারীতে এ আয়াতের অধীনে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে কতিপয় প্রশ্ন ও উত্তর বর্ণিত হয়েছে। তাতে ইবন আব্বাস এ আয়াতের উপযুক্তরূপ ব্যাখ্যা করেছেন। [বুখারী কিতাবুত তাফসীর, বাব হা-মীম-আস-সাজদাহ]

সারকথা এই যে, পবিত্র কুরআনের আয়াতসমূহকে একত্রিত করার ফলে কয়েকটি বিষয় নিশ্চিতরূপে জনা যায়, প্রথমত: আকাশ, পৃথিবী ও এতদূভয়ের মধ্যবর্তী সবকিছু মাত্র ছয় দিনে সৃজিত হয়েছে।

সূরা হা-মীম সেজদার আয়াত থেকে দ্বিতীয়ত: জানা যায় যে, পৃথিবী, পর্বতমালা, বৃক্ষরাজি ইত্যাদি সৃষ্টিতে পূর্ণ চার দিন লেগেছে।

তৃতীয়ত: জানা যায় যে, আকাশমন্ডলীর সৃজনে দুদিন লেগেছিল।

 চতুর্থত: আসমান, যমীন ও এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সৃষ্টির পর যমীনকে বসবাসের উপযোগী করতে সাতদিন লেগেছিল। এ সাতদিনের সর্বশেষ দিন শুক্রবারের কিছু অংশ বেঁচে গিয়েছিল, যাতে আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছিল।

If Allah intends a thing, his only word is “BE” and it is. can you please explain why he took 6 days to create the heavens and earth?.

আল্লাহর প্রশংসা।

গভীর বিশ্বাস এবং পূর্ণ তাওহীদের অধিকারী ব্যক্তিদের দৃঢ় বিশ্বাসের মধ্যে একটি হল যে, প্রভু, তিনি সকল কিছু করতে সক্ষম এবং তাঁর ক্ষমতার কোন সীমা নেই। তাঁর রয়েছে পরম ক্ষমতা, নিখুঁত ইচ্ছাশক্তি এবং সকল বিষয়ের উপর চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ। তিনি যদি কোন কিছু চান, তবে তা তিনি যেমন ইচ্ছা করেন, ঠিক তেমনই ঘটে যখন তিনি চান, যেভাবে চান।

আমাদের প্রভুর কিতাবে এবং তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাতে অনেক সুনির্দিষ্ট আয়াত রয়েছে যা এটিকে সমর্থন করে এবং স্পষ্টভাবে বর্ণনা করে, কোন অস্পষ্টতা ছাড়াই। এখানে আমাদের জন্য কিছু আয়াত উদ্ধৃত করা যথেষ্ট যা এটি নির্দেশ করে, যেমন আয়াত (অর্থের ব্যাখ্যা):

“আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর স্রষ্টা। যখন তিনি কোন বিষয়ের সিদ্ধান্ত নেন, তখন তিনি কেবল এটিকে বলেন: ‘হও!’ — এবং তা হয়ে যায় [আল-বাক্বারাহ ২:১১৭]

আল-হাফজ ইবনে কাছীর এই আয়াতের তাফসীরে (তাফসীর ১/১৭৫) বলেন: “এখানে আল্লাহ তাঁর ক্ষমতার পূর্ণতা এবং তাঁর কর্তৃত্বের মহত্ত্ব ব্যাখ্যা করেছেন, এবং যদি তিনি কিছু ইচ্ছা করেন এবং নির্ধারণ করেন, তবে তিনি কেবল তাকে বলেন, ‘হও!’ – মাত্র একবার – এবং তা হয়ে যায়, অর্থাৎ, তিনি যেমন ইচ্ছা তেমনভাবে অস্তিত্বে আসে। এটি সেই আয়াতের মতো যেখানে আল্লাহ বলেন (অর্থের ব্যাখ্যা):

‘নিশ্চয়ই, তাঁর আদেশ, যখন তিনি কোন কিছুর ইচ্ছা করেন, তখন কেবল তাকে বলেন, ‘হও!’ – এবং তা হয়ে যায়!'[ইয়া-সীন ৩৬:৮২]।” আর আল্লাহ বলেন (অর্থের ব্যাখ্যা): “যখন তিনি কোন কিছু নির্ধারণ করেন, তখন তিনি কেবল তাকে বলেন: ‘হও!’ — আর তা হয়ে যায়” আলে ‘ইমরান ৩:৪৭

“তিনিই জীবন দান করেন এবং মৃত্যু ঘটান। আর যখন তিনি কোন কিছু নির্ধারণ করেন তখন তিনি কেবল তাকে বলেন: ‘হও’ — আর তা হয়ে যায়” [গাফির ৪০:৬৮]

“আর আমাদের আদেশ কেবল চোখের পলকের মতো” [আল-ক্বামার ৫৪:৫০]

আল-হাফিজ ইবনে কাছীর এই আয়াতের (৪/২৬১) ব্যাখ্যায় বলেছেন: “এখানে আল্লাহ আমাদের বলেন যে তাঁর সৃষ্টিতে তাঁর ইচ্ছা কীভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং তাঁর আদেশ কীভাবে বাস্তবায়িত হয়। ‘আর আমাদের আদেশ কেবল একটি’ এর অর্থ, আমরা কেবল একবারই একটি আদেশ প্রদান করি, এবং আমাদের এটি দ্বিতীয়বার পুনরাবৃত্তি করার প্রয়োজন হয় না, এবং আমরা যা আদেশ করি তা চোখের পলকের মধ্যেই ঘটে, তা এক মুহূর্তের জন্যও বিলম্বিত হয় না। কবি কত সুন্দরভাবে বলেছেন:

যখন আল্লাহ কোন কিছু ইচ্ছা করেন, তখন তিনি কেবল একবারই বলেন “হও!”, আর তা হয়ে যায়।”

আরও অনেক আয়াত আছে যা এই বিষয়টি নিয়ে কথা বলে এবং ব্যাখ্যা করে।

একবার এটি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে, কেন আল্লাহ আসমান ও জমিন ছয় দিনে সৃষ্টি করলেন?

প্রথমত:

আমাদের প্রতিপালকের কিতাবের একাধিক আয়াতে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ আসমান ও জমিন ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, আল্লাহ বলেন (অর্থের ব্যাখ্যা):

“নিশ্চয়ই, তোমাদের প্রতিপালক হলেন আল্লাহ, যিনি আসমান ও জমিন ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তিনি (সত্যিই তাঁর মহিমার উপযুক্ত পদ্ধতিতে) আরশের উপর (ইস্তাওয়া) উঠেছেন” [আল-আ’রাফ ৭:৫৪]

দ্বিতীয়ত:

আল্লাহ যা করেন তার মধ্যে মহা প্রজ্ঞা নেই। এটি আল্লাহর আল-হাকিম (সর্বজ্ঞানী) নামের একটি অর্থ। আল্লাহ আমাদের এই প্রজ্ঞা দেখাতে পারেন বা নাও দেখাতে পারেন, এবং যাদের গভীর জ্ঞান আছে তারা এটি বুঝতে পারে, অন্যদের বাদ দিয়ে।

কিন্তু আমরা এই প্রজ্ঞা জানি না বা বুঝতে পারি না, তাই আমাদের এটি অস্বীকার করা উচিত নয়, আল্লাহর বিধানের প্রতি আপত্তি জানানো উচিত নয়, অথবা আল্লাহ আমাদের কাছ থেকে গোপন রেখেছেন এমন প্রজ্ঞা সম্পর্কে খুব বেশি জিজ্ঞাসা করার চেষ্টা করা উচিত নয়। আল্লাহ বলেন (অর্থের ব্যাখ্যা):

“তাঁকে [আল্লাহকে] তিনি যা করেন সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা যাবে না, আর তাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হবে [আল-আম্বিয়া ২১:২৩]

কিছু পণ্ডিত কেন আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী ছয় দিনে সৃষ্টি করা হয়েছিল তার কারণ ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন:

১ – ইমাম আল-কুরতুবী (রহঃ) আল-জামি’ লি আহকাম আল কুরআনে আল-আ’রাফ ৭:৫৪ (৪/৭/১৪০) এর মন্তব্যে বলেছেন:

“আল্লাহ এই সময়ের কথা উল্লেখ করেছেন – অর্থাৎ ছয় দিন – যদিও তিনি যদি এটিকে এক মুহূর্তের মধ্যে সৃষ্টি করতে চাইতেন, তবে তিনি তা করতে পারতেন, কারণ তিনি এটিকে ‘হও’ বলতে সক্ষম এবং হয়ে যায়। কিন্তু তিনি চেয়েছিলেন:

তাঁর বান্দাদের তাদের কাজে দয়া এবং বিবেচনা শেখান।

– ধাপে ধাপে ফেরেশতাদের কাছে তাঁর ক্ষমতা প্রকাশ করুন।

-আরও একটি কারণ আছে: তিনি ছয় দিনের মধ্যে এটি তৈরি করতে চেয়েছিলেন কারণ আল্লাহ সবকিছুর জন্য একটি পথ নির্ধারণ করেছেন, যার কারণে তিনি পাপীদের শাস্তি বিলম্বিত করেন, কারণ সবকিছুরই তাঁর কাছে একটি নির্দিষ্ট সময় রয়েছে।”

2 – ইবনে আল-জাওযী তার তাফসীরে জাদ আল-মাসির (3/162) বলেছেন, সূরা আল-আ’রাফের আয়াতের উপর মন্তব্য করে:

“যদি বলা হয়, তবে তিনি কেন তা মুহূর্তের মধ্যে তৈরি করেননি যখন তিনি তা করতে সক্ষম? এই প্রশ্নের পাঁচটি উত্তর রয়েছে:

(i) তিনি প্রতিদিন এমন কিছু তৈরি করতে চেয়েছিলেন যাতে ফেরেশতাদের এবং যারা এটি প্রত্যক্ষ করেছে তাদের কাছে তাঁর শক্তি প্রদর্শন করা যায়। ইবনে আল-আনবারী এটি পরামর্শ দিয়েছিলেন।

(ii) তিনি আদমের অস্তিত্বের আগে আদম এবং তার বংশধরদের জন্য জিনিসপত্র প্রস্তুত করছিলেন, যাতে ফেরেশতাদের সামনে আদমের উচ্চ মর্যাদার উপর জোর দেওয়া যায়।

(iii) অল্প সময়ের মধ্যে কাজ করা শক্তির পরিচায়ক, এবং চিন্তাভাবনা প্রজ্ঞার পরিচায়ক। আল্লাহ এতে তাঁর প্রজ্ঞা প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন, ঠিক যেমন তিনি তাঁর শক্তি প্রকাশ করেছিলেন যখন তিনি বলেছিলেন, ‘হও!’ এবং তা হয়ে যায়।

(iv) তিনি তাঁর বান্দাদের চিন্তাভাবনা শিখিয়েছিলেন, কারণ যিনি ভুল করেন না তিনি যদি মহাবিশ্বকে ইচ্ছাকৃতভাবে সৃষ্টি করেন, তাহলে যারা ভুল করার ঝুঁকিতে আছেন তাদের জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে কাজ করা আরও উপযুক্ত।

(v) সৃষ্টি ধাপে ধাপে সম্পন্ন হয়েছিল, যাতে কেউ মনে না করে যে এটি প্রকৃতির দুর্ঘটনার ফলে ঘটেছে।

3 আল-কাদি আবুল-সৌদ আল-আ’রাফ (3/232) এর আয়াতের তার ভাষ্যে বলেছেন:

“আল্লাহ সবকিছু পর্যায়ক্রমে সৃষ্টি করেছেন যদিও তিনি একবারে সবকিছু সৃষ্টি করতে সক্ষম, এটি ঐশ্বরিক ইচ্ছার পরিচায়ক এবং যারা বোঝেন তাদের জন্য তাঁর শক্তির নিদর্শন, এবং এটি সমস্ত কিছুতে চিন্তাভাবনাকে উৎসাহিত করে।” এবং তিনি আল-ফুরকান ২৫:৫৯ (৬/২২৬) এর তার ভাষ্যে বলেছেন:

“যিনি এই মহান নক্ষত্রগুলিকে এই সুনির্দিষ্ট বিন্যাসে পর্যায়ক্রমে সৃষ্টি করেছেন, যদিও তিনি তাদের একবারে সৃষ্টি করতে সক্ষম, (এটি ছিল) একটি মহান কারণ এবং মহৎ উদ্দেশ্যে, যা মানুষের মন সম্পূর্ণরূপে বুঝতে পারে না।”

উপরোক্ত বিষয়গুলোর উপর ভিত্তি করে, এটা স্পষ্ট যে আল্লাহর পরম ক্ষমতা, চূড়ান্ত ইচ্ছাশক্তি এবং নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এবং তিনি যা কিছু সৃষ্টি করেন তার জন্য তাঁর কাছে বিজ্ঞ কারণ রয়েছে, যা তিনি ছাড়া আর কেউ জানে না, তিনি মহিমান্বিত হোন। এখন আপনি বুঝতে পারবেন কেন আল্লাহ আকাশ ও পৃথিবী ছয় দিনে সৃষ্টি করেছিলেন, যখন তিনি কেবল “হও!” বলার মাধ্যমেই এগুলো সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন।

আল্লাহ আমাদের নবী মুহাম্মদ এবং তাঁর পরিবার এবং সাহাবীদের উপর রহমত ও শান্তি বর্ষণ করুন।

——————————————

— লক্ষ্য করুন, আল্লাহ্ তা’আলা বলেছেনঃ “কে কাজে শ্রেষ্ঠ” তা তিনি পরীক্ষা করবেন। তিনি কে বেশী কাজ করেছে পরীক্ষা করবেন তা কিন্তু বলেননি। কেননা, আল্লাহর দরবারে পরিমানের চেয়ে মান-সম্মত হওয়াই গ্রহণযোগ্য। আর আল্লাহর দরবারে কোন কাজ মান-সম্মত সে সময়ই হতে পারে যখন তা আল্লাহর নির্দেশ মত এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রদর্শিত পন্থায় হবে। নতুবা তা গ্রহণযোগ্যতাই হারাবে।

— এ বক্তব্যের অর্থ হচ্ছে, মহান আল্লাহ আকাশ ও পৃথিবী এজন্য সৃষ্টি করেছেন যা মূলত তোমাদের (অর্থাৎ মানুষ) সৃষ্টি করাই তাঁর উদ্দেশ্য ছিল। অর্থাৎ এর মাধ্যমে সৃষ্টিকুলকে পরীক্ষা করা। তিনি সেটাকে অকারণে বা অনাহুত তৈরী করেননি। তিনি নিজেকে এ ধরনের অনাহুত ও বেহুদা সৃষ্টি করা থেকে পবিত্র ঘোষণা করেছেন। তাছাড়া এটাও বলেছেন যে, কাফেররাই শুধু আসমান ও যমীনকে বেহুদা সৃষ্টি করেছেন বলে মনে করে থাকে। তাদের এ ধারণার জন্য তিনি তাদের উপর কঠোর সাবধানবাণী উচ্চারণ করেছেন।

তিনি বলেন, “আমি আকাশ, পৃথিবী এবং এ দুয়ের মধ্যবর্তী কোন কিছুই অনর্থক সৃষ্টি করিনি। অনর্থক সৃষ্টি করার ধারণা তাদের যারা কাফির, কাজেই কাফিরদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের দুর্ভোগ। [সূরা সোয়াদঃ ২৭]

আরো বলেনঃ “তোমরা কি মনে করেছিলে যে, আমি তোমাদেরকে অনর্থক সৃষ্টি করেছি এবং তোমরা আমার কাছে ফিরে আসবে না? মহিমান্বিত আল্লাহ্ যিনি প্রকৃত মালিক, তিনি ছাড়া কোন ইলাহ নেই; সম্মানিত আৱশের তিনি অধিপতি। [সূরা আল-মুমিনুনঃ ১১৫–১১৬]

 তিনি আরো বলেনঃ “আমি সৃষ্টি করেছি জিন এবং মানুষকে এজন্যেই যে, তারা একমাত্র আমারই ইবাদাত করবে। [সূরা আয-যারিয়াতঃ ৫৬]

হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, মহান আল্লাহ বলেন, তুমি ব্যয় কর, তোমার উপর ব্যয় করা হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন, আল্লাহর হাত পরিপূর্ণ। কোন প্রকার ব্যয় তাতে কোন কিছুর ঘাটতি করে না। দিন-রাত তা প্রচুর পরিমানে দান করে। তোমরা আমাকে জানাও, আসমান ও যমীনের সৃষ্টিলগ্ন থেকে যত কিছু ব্যয় হয়েছে সেসব কিছু তার হাতে যা আছে তাতে সামান্যও ঘাটতি করে না। আর তার আরশ হচ্ছে পানির উপর এবং তার হাতেই রয়েছে মীযান, তিনি সেটাকে উপর-নীচু করেন। [বুখারী ৪৬৮৪; মুসলিম: ৩৭]

 অন্য হাদীসে ইমরান ইবন হুসাইন বলেন, “আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে প্রবেশ করলাম আর আমার উটটি দরজার কাছে বেঁধে রাখলাম। তখন তার কাছে বনু তামীম প্রবেশ করলে তিনি বললেন, বনু তামীম তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ কর। তারা বলল, সুসংবাদ তো দিলেন, এবার আমাদেরকে কিছু দিন (সম্পদ)।

এটা তারা দু’বার বললেন। তখন রাসূলের কাছে ইয়ামেনের কিছু লোক প্রবেশ করল। তিনি বললেন, হে ইয়ামেনবাসী তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ কর, যখন বনু তামীম সেটা গ্রহণ করল না। তারা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা তা গ্রহণ করলাম। তারা আরও বলল, আমরা এ বিষয়ে প্রথম কি তা জানতে চাই। তিনি বললেন, আল্লাহই ছিলেন, তিনি ছাড়া আর কিছু ছিল না। আর তাঁর আরশ ছিল পানির উপর। আর তিনি সবকিছু যিকর (লাওহে মাহফুযে) লিখে রেখেছিলেন। আর তিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেন। বর্ণনাকারী ইমরান ইবন হুসাইন বলেন, তখন একজন আহবানকারী ডেকে বলল, হে ইবনুল হুসাইন! তোমার উষ্ট্রীটি চলে গেছে। তখন আমি বেরিয়ে পড়ে দেখলাম, উটটি এতদুর চলে গেছে যে, যেদিকে তাকাই শুধু মরিচিকা দেখতে পাই। আল্লাহর শপথ আমার ইচ্ছা হচ্ছিল আমি যেন সেটাকে একেবারেই ছেড়ে দেই (অর্থাৎ রাসূলের মাজলিস থেকে বের হতে তার ইচ্ছা হচ্ছিল না) [বুখারী: ৩১৯১]

ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করা আর পরীক্ষা করার জন্য সৃষ্টি এ দুটোর মাঝে কোন স্ববিরোধিতা নেই; কারণ ইবাদতটাই আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে বান্দার জন্য একটা পরীক্ষা। এর মাধ্যমে জানা যায়— কে ঈমানদার, আর কে কাফের; কে অবাধ্য, আর কে বাধ্য। এরপর তিনি নেককারকে তার নেক অনুযায়ী প্রতিদান দিবেন এবং পাপীকে তার পাপ অনুযায়ী শাস্তি দিবেন।

পরীক্ষা: বালা-মুসিবতের মাধ্যমে পরীক্ষার হেকমত হচ্ছে বালা-মুসিবতে পড়লে বান্দার কি অবস্থা হয় সেটা যাচাই করা: বান্দা কি সবর করে; নাকি হতাশ হয়ে পড়ে। আর নেয়ামত দেয়ার মাধ্যমে পরীক্ষা করার হেকমত হচ্ছে বান্দার অবস্থা ফুটিয়ে তোলা; বান্দা কি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে; নাকি কৃতঘ্ন হয়ে যায়?

প্রশ্নকারী ভাই এ দুটো বিষয়ের মাঝে স্ববিরোধিতা রয়েছে মর্মে দ্বিধাদন্দ্বে পড়ার কারণ বোধ হয় তিনি ধারণা করেছেন যে,

 ابتلاء (পরীক্ষা) শুধুমাত্র বিপদ-মুসিবতের মাধ্যমে হয়ে থাকে; এতে যে ব্যক্তি ধৈর্য ধরে সে সওয়াব পায়, আর যে ব্যক্তি অধৈর্য হয়ে যায় ও অকৃতজ্ঞ হয় সে গুনাহ কামাই করে ও শাস্তি পায় এটি ابتلاء (পরীক্ষা) অর্থ সম্পর্কে খণ্ডিত দৃষ্টিভঙ্গি।

সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে এখানে ابتلاء দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে اختبار (পরীক্ষা)। এটি বালা-মুসিবত এর চেয়ে ব্যাপক। বনী আদমের সকল কর্মকাণ্ড, তার সকল বিষয়, জীবনের খুঁটিনাটি সবকিছু পরীক্ষার আওতাভুক্ত। তার জীবনটাই পরীক্ষা। তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা। তার অসুস্থতা পরীক্ষা। তার সুখ-শান্তি পরীক্ষা। তার সম্পদ পরীক্ষা। তার রিযিক পরীক্ষা। তাকে ঘিরে যা কিছু আছে সবকিছু তার জন্য পরীক্ষা। তার ইলম পরীক্ষা। এ সবকিছু আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে বান্দার জন্য তার চলার পথ নির্বাচন করার পরীক্ষা। বান্দা কি ডান পথ গ্রহণ করে; নাকি বাম পথ। বান্দা কি রহমানের বাধ্য হয়ে চলে; নাকি শয়তানের বাধ্য হয়ে চলে। এ কারণে আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন:

 “যিনি সৃষ্টি করেছেন মৃত্যু ও জীবন, তোমাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য-  কে তোমাদের মধ্যে আমলের দিক থেকে উত্তম? তিনি পরাক্রমশালী, ক্ষমাশীল।”[সূরা মুলক, আয়াত: ২]

আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন: “আর তিনিই আসমানসমূহ ও যমীনকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেন, আর তাঁর আর্‌শ ছিল পানির উপর, তোমাদের মধ্যে কে আমলে শ্রেষ্ঠ তা পরীক্ষা করার জন্য।”[সূরা হুদ, আয়াত: ০৭]

 আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন: “আর আল্লাহ্‌ ইচ্ছে করলে তোমাদেরকে এক উম্মত করতে পারতেন, কিন্তু তিনি তোমাদেরকে যা দিয়েছেন তা দিয়ে তোমাদেরকে পরীক্ষা করতে চান। কাজেই সৎকাজে তোমরা প্রতিযোগিতা কর। আল্লাহ্‌র দিকেই তোমাদের সবার প্রত্যাবর্তনস্থল। অতঃপর তোমরা যে বিষয়ে মতভেদ করছিলে, সে সম্বন্ধে তিনি তোমাদেরকে অবহিত করবেন।”[সূরা মায়িদা, আয়াত: ৪৮]

 আল্লাহ্‌ তাআলা আরও বলেন: “তিনিই তোমাদেরকে যমীনের খলীফা বানিয়েছেন এবং যা তিনি তোমাদেরকে দিয়েছেন সে সম্বন্ধে পরীক্ষার উদ্দেশ্যে তোমাদের কিছু সংখ্যককে কিছু সংখ্যকের উপর মর্যাদায় উন্নীত করেছেন। নিশ্চয় আপনার রব দ্রুত শাস্তিপ্রদানকারী এবং নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, দয়াময়।”[সূরা আনআম, আয়াত: ১৬৫]

এ আয়াতগুলো প্রমাণ করে যে, মানুষকে সৃষ্টি করার পেছনে উদ্দেশ্য হচ্ছে ‘পরীক্ষা’। এ পরীক্ষা মধ্যে রয়েছে ইবাদতের দায়িত্বগুলো অর্পণ। সুতরাং যে ব্যক্তি যথাযথভাবে ইবাদত আদায় করবে – সকল কল্যাণকে অন্তর্ভুক্তকারী ইবাদতের ব্যাপকার্থক যে সংজ্ঞা তার ভিত্তিতে – সে সফলকাম। আর যে ব্যক্তি এতে কসুর করবে সে তার কসুর অনুপাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে

ইবনুল কাইয়্যেম (রহঃ) বলেন:

আল্লাহ্‌ তাআলা জানাচ্ছেন যে, তিনি বিশ্বজগৎ, মৃত্যু, জীবন এবং পৃথিবীকে এর ভূপৃষ্ঠে যা কিছু আছে তা দিয়ে সুশোভিত করেছেন পরীক্ষার উদ্দেশ্যে। তিনি যেন পরীক্ষা করে নিতে পারেন তাঁর মাখলুকের মধ্যে কে কর্মে উত্তম। যার কর্ম হবে তার রবের পছন্দ অনুযায়ী। এর মাধ্যমে মাখলুক তাকে যে উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা হয়েছে, বিশ্বজগৎকে যে লক্ষ্যে সৃজন করা হয়েছে সে বাস্তবায়ন করবে। সে উদ্দেশ্য হচ্ছে- রবের বন্দেগী করা; যে বন্দেগীর মধ্যে নিহিত রয়েছে রবের ভালবাসা ও আনুগত্য। এটাই হচ্ছে- উত্তম আমল। যে আমল তাঁর ভালবাসা ও সন্তুষ্টি অনুযায়ী পালিত হয়।[‘রওযাতুল মুহিব্বীন’ পৃষ্ঠা- ৬১ থেকে সমাপ্ত]

আল্লামা মুহাম্মদ আল-আমীন আল-শানক্বিতী (রহঃ) সূরা যারিয়াত এর ৫৬ নং আয়াত “আমি মানুষ ও জ্বিন জাতিকে একমাত্র আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি” এর তাফসির করতে গিয়ে বলেন: এ আয়াতে কারীমার গবেষণালব্ধ অর্থ হচ্ছে -ইনশাআল্লাহ্‌-: ‘শুধু আমার ইবাদতের জন্য’ অর্থাৎ তাদেরকে শুধু আমার ইবাদত করার নির্দেশ দেয়ার জন্য এবং দায়িত্ব অর্পণের মাধ্যমে তাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য। অতঃপর কর্ম অনুযায়ী আমি তাদেরকে প্রতিদান দিব: ভাল আমল করলে ভাল; খারাপ আমল করলে খারাপ।

আমরা গবেষণালব্ধ এজন্য বললাম যেহেতু আল্লাহ্‌র কিতাবের অনেক মুহকাম আয়াত এ অর্থটি নির্দেশ করে। আল্লাহ্‌ তাআলা তাঁর কিতাবের অনেক স্থানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, তিনি তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন যাতে করে তাদেরকে পরীক্ষা করতে পারেন যে, কে কর্মে উত্তম এবং তিনি তাদেরকে সৃজন করেছেন যাতে করে তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের প্রতিদান দিতে পারেন।

আল্লাহ্‌ তাআলা সূরা কাহাফের প্রথমদিকে বলেন:

“নিশ্চয় যমীনের উপর যা কিছু আছে আমরা সেগুলোকে তার শোভা করেছি, মানুষকে এ পরীক্ষা করার জন্য যে, তাদের মধ্যে কর্মে কে শ্রেষ্ঠ।”[সূরা কাহাফ, আয়াত: ৭]

এ আয়াতগুলোতে পরিস্কার করে দেয়া হয়েছে যে, সৃষ্টিকুলকে সৃষ্টি করার উদ্দেশ্য হচ্ছে তাদেরকে এ পরীক্ষা করা যে, তাদের মধ্যে কর্মে কে উত্তম। এটি আল্লাহ্‌র ‘আমার ইবাদতের জন্য…’ আয়াতকে ব্যাখ্যা করে দিচ্ছে। কুরআন দিয়ে কুরআন ব্যাখ্যা করা হচ্ছে কুরআন ব্যাখ্যার সর্বোত্তম পদ্ধতি।

এ কথা সুবিদিত যে, আমলের ফলাফল পরিপূর্ণ হবে না নেককারের নেকের প্রতিফল ও পাপীর পাপের প্রতিদান দেয়া ব্যতিরেকে। তাই, আল্লাহ্‌ তাআলা প্রথমে তাদেরকে সৃষ্টি করার গূঢ় রহস্য উল্লেখ করেছেন। এরপর তাদেরকে পুনরুত্থানের কথা উল্লেখ করেছেন: আর পুনরুত্থান হচ্ছে ভালো লোকের ভাল কাজের ও মন্দ লোকের মন্দ কাজের প্রতিদান দেয়া।

সূরা ইউনুসের সূচনাতে আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন: “সৃষ্টিকে তিনিই প্রথম অস্তিত্বে আনেন, তারপর সেটার পুনরাবৃত্তি ঘটাবেন যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে তাদেরকে ইনসাফপূর্ণ প্রতিফল প্রদানের জন্য। আর যারা কুফরী করেছে তাদের জন্য রয়েছে অত্যন্ত গরম পানীয় ও অতীব কষ্টদায়ক শাস্তি। কারণ তারা কুফরী করত।”[সূরা ইউনুস, আয়াত: ০৪]

আল্লাহ্‌ তাআলা আরও বলেন: “আর আসমানসমূহে যা কিছু আছে ও যমীনে যা কিছু আছে তা আল্লাহ্‌রই। যাতে তিনি তাদের কাজের প্রতিফল দিতে পারেন যারা মন্দ কাজ করে এবং তাদেরকে তিনি উত্তম পুরস্কার দিতে পারেন যারা সৎকাজ করে।”[সূরা নাজম, আয়াত: ৩১]

আল্লাহ্‌ তাআলা মানুষের এমন ধারণাকে নাকচ করে দিয়েছেন যে, তাকে অহেতুক ছেড়ে দেয়া হয়েছে; তাকে কোন আদেশ বা নিষেধ করা হয়নি। তিনি আরও বর্ণনা করেছেন যে, তিনি ধাপে ধাপে স্থানান্তরিত করে তাকে অস্তিত্বে এনেছেন; যাতে মৃত্যুর পর তাকে পুনর্জীবিত করতে পারেন অর্থাৎ তার কর্মের প্রতিদান দিতে পারেন। আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন: “মানুষ কি মনে করে যে, তাকে এমনি ছেড়ে দেয়া হবে? সে কি বীর্যের স্খলিত শুক্রবিন্দু ছিল না? তারপর সে ‘আলাকায়’ পরিণত হয়। অতঃপর আল্লাহ্‌ তাকে সৃষ্টি করেন এবং সুঠাম করেন। অতঃপর তিনি তা থেকে সৃষ্টি করেন যুগল নর ও নারী। তবুও কি সে স্রষ্টা মৃতকে পুনর্জীবিত করতে সক্ষম নন?” [

[আয-ওয়াউল বায়ান ফি ইযাহিল কুরআনি বিল কুরআন (৭/৪৪৫) থেকে সমাপ্ত] আল্লাহ্‌ই ভাল জানেন। সূত্র: ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব

 – যখন আপনি তাদেরকে পুনরুত্থানের কথা বুঝাতে থাকেন তখন তারা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে এবং আপনাকে এ বলে বিদ্রুপ করতে থাকে যে, আপনি তো জাদুকরের মতো কথা বলছেন। এভাবে তারা আখেরাতের দাবী ও যৌক্তিকতাকে বুঝা সত্বেও মেনে নিতে পারেনি। অথচ যিনি একবার সৃষ্টি করেছেন তারপক্ষে পূনর্বার সৃষ্টি করা কোন ব্যাপারই নয়। আল্লাহ বলেনঃ “আর তিনিই সৃষ্টিজগতকে প্রথম সৃষ্টি করেছেন তারপর তিনিই তা পূনর্বার করবেন, এটা তার জন্য অত্যন্ত সহজ।” [সূরা আর রূমঃ ২৭] আল্লাহ আরো বলেনঃ “তোমাদের সৃষ্টি ও পূনঃসৃষ্টি তো একজনের মতই।” [সূরা লুকমানঃ ২৮]

১১ : ৮ وَ لَئِنۡ اَخَّرۡنَا عَنۡهُمُ الۡعَذَابَ اِلٰۤی اُمَّۃٍ مَّعۡدُوۡدَۃٍ لَّیَقُوۡلُنَّ مَا یَحۡبِسُهٗ ؕ اَلَا یَوۡمَ یَاۡتِیۡهِمۡ لَیۡسَ مَصۡرُوۡفًا عَنۡهُمۡ وَ حَاقَ بِهِمۡ مَّا كَانُوۡا بِهٖ یَسۡتَهۡزِءُوۡنَ ﴿۸﴾

৮. নির্দিষ্ট কালের জন্য আমরা যদি তাদের থেকে শাস্তি স্থগিত রাখি তবে তারা অবশ্যই বলবে, কিসে সেটা নিবারণ করছে? সাবধান! যেদিন তাদের কাছে এটা আসবে সেদিন তাদের কাছ থেকে সেটাকে নিবৃত্ত করা হবে না এবং যা নিয়ে তারা ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে তা তাদেরকে পরিবেষ্টন করবে।

(উম্মাহ বা উম্মত) শব্দটি কুরআন মাজীদের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন অর্থে ব্যবহার হয়েছে। শব্দটি أم থেকে উৎপত্তি, যার অর্থ হল উদ্দেশ্য। এখানে এর অর্থ হল সেই মেয়াদ ও সময়, যা সময় আযাব অবতীর্ণ করার জন্য উদ্দিষ্ট। (ফাতহুল কাদীর) সূরা ইউসুফের ৪৫নং (وَادَّكَرَ بَعْدَ أُمَّةٍ) আয়াতেও একই অর্থ পাওয়া যায়।

 এ ছাড়া আরো যে অর্থে শব্দটি ব্যবহার হয়েছে, তার মধ্যে একটি অর্থ হল, ইমাম বা নেতাঃ যেমন (إِنَّ إِبْرَاهِيمَ كَانَ أُمَّةً) অর্থাৎ, নিশ্চয় ইবরাহীম ছিল একজন ইমাম। (সূরা নাহল ১২০) মিল্লাত, দ্বীন বা মতাদর্শঃ যেমন (إِنَّا وَجَدْنَا آبَاءَنَا عَلَى أُمَّةٍ) অর্থাৎ, আমরা তো আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে এক মতাদর্শের অনুসারী পেয়েছি। (যুখরুফ ২৩)

জামাআত বা দলঃ যেমন (وَلَمَّا وَرَدَ مَاءَ مَدْيَنَ وَجَدَ عَلَيْهِ أُمَّةً مِنَ النَّاسِ) অর্থাৎ, যখন সে মাদয়্যানের কূপের নিকট পৌঁছল, দেখল একদল লোক তাদের পশুগুলিকে পানি পান করাচ্ছে। (ক্বাস্বাস ২৩) (وَمِن قَوْمِ مُوسَى أُمَّةٌ) অর্থাৎ, মূসার সম্প্রদায়ের মধ্যে এমন একদল রয়েছে যারা (অন্যকে) ন্যায় পথ দেখায় ও ন্যায় বিচার করে। (আ’রাফ ১৫৯) ইত্যাদি।

আরো একটি অর্থ হল সেই বিশেষ সম্প্রদায় বা জাতি যাদের নিকট কোন রসূল প্রেরিত হয়েছিলেনঃ (وَلِكُلِّ أُمَّةٍ رَسُولٌ) অর্থাৎ, প্রত্যেক জাতির জন্য এক একজন রসূল ছিল। (ইউনুস ৪৭) একে উম্মতে দাওয়াতও বলা হয়। অনুরূপ নবীদের প্রতি ঈমান আনয়নকারী জাতিকে উম্মত বা উম্মতে ইত্তিবা’ বা উম্মতে ইজাবাহ বলা হয়। (ইবনে কাসীর)

–এখানে তাড়াতাড়ি চাওয়াকে ঠাট্টা-উপহাস করা বলা হয়েছে। কারণ তাদের সেই তাড়াতাড়ি ঠাট্টা-উপহাস স্বরূপই হত। সুতরাং উদ্দেশ্য তাদেরকে এই কথা বুঝানো যে, আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে আযাবে দেরী হওয়াতে মানুষের উদাসীন হওয়া উচিত নয়। যেহেতু তাঁর আযাব যে কোন সময় আসতে পারে।

সহায়ক ও সংগৃহিতঃ তাফহিমুল কুর’আন, ইবন কাসীর, আহসানুল বায়ান,তাফসিরে যাকারিয়া ও বিভিন্ন আর্টিক্যাল