সূরা যুখরুফঃ ২য় রুকু (১৬-২৫)আয়াত

এতে তাদের মূর্খতা ও নির্বুদ্ধিতার কথা উল্লেখ হয়েছে যে, তারা আল্লাহর জন্য এমন সন্তান-সন্ততি সাব্যস্ত করেছে যা তাদের নিজেদেরও পছন্দ নয়। অথচ আল্লাহর যদি সন্তান-সন্ততি হত, তাহলে কি এ রকম হত যে, তিনি নিজের জন্য কন্যা-সন্তান নিতেন, আর তোমাদেরকে পুত্র-সন্তান দিয়ে ধন্য করতেন?

এখানে আরবের মুশরিকদের বক্তব্যের অযৌক্তিকতাকে একেবারে উলংগ করে দেয়া হয়েছে। তারা বলতোঃ ফেরেশতারা আল্লাহর মেয়ে। তারা মেয়েদের আকৃতি দিয়ে ফেরেশতাদের মূর্তি বানিয়ে রেখেছিলো। এগুলোই ছিলো তাদের দেবী। তাদের পূজা করা হতো। এ কারণে আল্লাহ‌ বলছেনঃ প্রথমত, যমীন ও আসমানের স্রষ্টা আল্লাহ। তিনিই তোমাদের জন্য এ যমীনকে দোলনা বানিয়েছেন। তিনিই আসমান থেকে পানি বর্ষণ করেন এবং তোমাদের উপকারার্থে তিনিই এসব জীব-জন্তু সৃষ্টি করেছেন, একথা জানা এবং মানা সত্ত্বেও তোমরা তাঁর সাথে অন্যদের উপাস্য বানিয়ে নিয়েছো। অথচ তোমরা যাদের উপাস্য বানাচ্ছো তারা আল্লাহ‌ নয়, বান্দা। এছাড়াও আরো সর্বনাশ করেছে এভাবে যে, কোন কোন বান্দাকে শুধু গুণাবলীতে নয়, আল্লাহর আপন সত্তায়ও শরীক করে ফেলেছে এবং এই আকীদা তৈরী করে নিয়েছে যে, তারা আল্লাহর সন্তান। তোমরা এ পর্যন্ত এসেই থেমে থাকোনি, বরং আল্লাহর জন্য এমন সন্তান স্থির করেছো যাকে তোমরা নিজেদের জন্য অপমান ও লাঞ্চনা মনে করো। কন্যা সন্তান জন্মলাভ করলে তোমাদের মুখ কালো হয়ে যায়। বড় দুঃখভারাক্রান্ত মনে তা মেনে নাও। এমন কি কোন কোন সময় জীবিত কন্যা সন্তনকে মাটিতে পুতে ফেলো। এ ধরনের সন্তান রেখেছো আল্লাহর ভাগে। আর তোমাদের কাছে যে পুত্র সন্তান অহংকারের বস্তু তা তোমাদের জন্য নির্দিষ্ট হয়ে গিয়েছে? এরপরও তোমরা দাবী করো, ‘আমরা আল্লাহকে মেনে চলি’।

يُنَشَّؤُ শব্দ نُشُوءٌ থেকে গঠিত। অর্থ, তরবিয়ত ও লালন-পালন। মহিলাদের দু’টি গুণ বিশেষ করে এখানে উল্লেখ করা হয়েছে।(ক) এদের লালন-পালন হয় অলংকারে ও সাজ-সজ্জায়। (খ) যদি কারো সাথে তর্ক-বিতর্ক হয়ে যায়, তবে তারা না তাদের কথা (প্রকৃতিগত পর্দা; কোমলতা ও লজ্জাশীলতার কারণে) ভালভাবে ব্যক্ত করতে পারে, আর না বিপক্ষের দলীলাদির খন্ডন করতে পারে।

 যারা কোমল, নাজুক ও দুর্বল সন্তান তাদের রেখেছো আল্লাহর অংশে। আর যারা বুক টান করে ময়দানে ঝাপিয়ে পড়ার মত সন্তান তাদের রেখেছো নিজের অংশে। এ আয়াত থেকে নারীদের গহনা ও অলংকারাদি ব্যবহারের বৈধতা প্রমাণিত হয়। কারণ আল্লাহ‌ তাদের জন্য গহনা ও অলংকারকে একটি প্রকৃতিগত জিনিস বলে আখ্যায়িত করেছেন। হাদীসসমূহ থেকেও একথাটিই প্রমাণিত হয়। ইমাম আহমদ, আবু দাউদ ও নাসায়ী হযরত আলী থেকে বর্ণনা করেছেন যে, নবী ﷺ এক হাতে রেশম ও অপর হাতে স্বর্ণ নিয়ে বললেনঃ এ দু’টি জিনিসকে পোশাক হিসেবে ব্যবহার করা আমার উম্মতের পুরুষদের জন্য হারাম। তিরমিযী ও নাসায়ী হযরত আবু মূসা আশআরীর বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন যে, নবী (সা.) বলেছেনঃ রেশম ও স্বর্ণের ব্যবহার আমার উম্মতের নারীদের জন্য হালাল এবং পুরুষদের জন্য হারাম করা হয়েছে। আল্লামা আবু বকর জাসসাস আহকামূল কুরআন গ্রন্থে এ মাসয়ালা সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে নীচের বর্ণনাসমূহ উদ্ধৃত করেছেন।

হযরত আয়েশা বলেন, একবার যায়েদ ইবনে হারেসার ছেলে উসামা ইবনে যায়েদ আঘাত প্রাপ্ত হন এবং রক্ত ঝরাতে থাকে। রসূলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসতেন। তিনি তার রক্ত চুষে থুথু করে ফেলছিলেন এবং তাকে এই বলে সোহাগ করছিলেন যে, উসামা যদি মেয়ে হতো আমি তাকে অলংকার পরাতাম। উসামা যদি মেয়ে হতো আমি তাকে ভালভাল কাপড় পরাতাম।

হযরত আবু মূসা আশআরী বর্ণনা করেছেন, নবী (সা.) বলেছেনঃ

لَيْسَ الْحَرِيرُ وَالذَّهَبُ حَرَامٌ عَلَى ذُكُورِ أُمَّتِى وَحِلال لإِنَاثِهِمْ

“রেশমী কাপড় এবং স্বর্ণের অলংকার পরিধান আমার উম্মতের পুরুষদের জন্য হারাম এবং নারীদের জন্য হালাল।”

হযরত আমর ইবনে আস বর্ণনা করেছেন, একবার দু’জন মহিলা নবীর ﷺ খেদমতে হাজির হলো। তারা স্বর্ণের গহনা পরিহিত ছিল। তিনি তাদের বললেনঃ এর কারণে আল্লাহ‌ তোমাদের আগুনের চুড়ি পরিধান করান তা কি তোমরা চাও? তারা বললো, না। নবী (সা.) বললেন, তাহলে এগুলোর হক আদায় করো অর্থাৎ এর যাকাত দাও।

হযরত আয়শার উক্তি হচ্ছে, যাকাত আদায় করা হলে অলংকার পরিধানে কোন দোষ নেই।

হযরত উমর (রা.) হযরত আবু মূসা আশআরীকে লিখেছিলেন তোমার শাসন কর্তৃত্বাধীন অঞ্চলে যেসব মুসলিম মহিলা আছে তাদেরকে তাদের অলংকারাদির যাকাত দেবার নির্দেশ দাও।

আমর ইবনে দীনারের বরাত দিয়ে ইমাম আবু হানিফা বর্ণনা করেছেন যে, হযরত আয়েশা তাঁর বোনদের এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) তাঁর মেয়েদেরকে স্বর্ণের অলংকার পরিয়েছিলেন।

এসব বর্ণনা উদ্ধৃত করার পর আল্লামা জাসসাস লিখছেনঃ নারীদের জন্য স্বর্ণ ও রেশম হালাল হওয়ার সপক্ষে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যেসব হাদীস আছে সেগুলো নাজায়েয হওয়া সম্পর্কিত হাদীসসমূহ থেকে অধিক মশহুর ও সুস্পষ্ট। উপরোল্লেখিত আয়াতও জায়েয হওয়াই প্রমাণ করছে। তাছাড়া নবী ﷺ এবং সাহাবাদের যুগ থেকে আমাদের যুগ (অর্থাৎ চতুর্দশ শতাব্দীর শেষ যুগ) পর্যন্ত গোটা উম্মতের কার্যধারাও তাই আছে। এ ব্যাপারে কেউ কোন আপত্তি উত্থাপন করেনি। এ ধরনের মাসয়ালা সম্পর্কে “আখবারে আহাদের” ভিত্তিতে কোন আপত্তি গ্রহণ করা যেতে পারে না।

নিজেদের গোমরাহীর ব্যাপারে এটা ছিল তাদের “তাকদীর” থেকে প্রমাণ পেশ। এটা অন্যায়কারীদের চিরকালীন অভ্যাস। নিজেদের কার্যকলাপের উপর আল্লাহর ইচ্ছার দোহাই দেয়। এটাই তাদের সব থেকে বড় দলীল। কেননা, বাহ্যিকভাবে এ কথা ঠিক যে, আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতীত কোন কাজ না হয়, আর না হতে পারে। কিন্তু তারা এ ব্যাপারে অজ্ঞ যে, তাঁর ইচ্ছা তাঁর সন্তুষ্টি থেকে পৃথক জিনিস। অবশ্যই প্রতিটি কাজ তাঁর ইচ্ছায় হয়, কিন্তু তিনি সন্তুষ্ট সেই কাজগুলোতেই হন, যার তিনি নির্দেশ দিয়েছেন; প্রত্যেক সেই কাজেই তিনি সন্তুষ্ট নন, যা মানুষ তাঁর (আল্লাহর) ইচ্ছার আওতায় করে থাকে। মানুষ চুরি, ব্যভিচার এবং অত্যাচার ও বড় বড় পাপ করে। আল্লাহ তাআলা ইচ্ছা করলে কাউকেই এ সব করার সামর্থ্য দেবেন না। সত্বর তার হাত ধরে নিবেন, পায়ের চলা বন্ধ করে দিবেন এবং চোখের দৃষ্টি কেড়ে নিবেন। কিন্তু এটা হবে বাধ্য করার ব্যাপার। অথচ তিনি মানুষকে ইচ্ছা ও এখতিয়ারের স্বাধীনতা দিয়ে রেখেছেন। যাতে তাকে পরীক্ষা করা যায়। আর এরই কারণে তিনি দুই প্রকারের কাজগুলোকে সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করে দিয়েছেন; যেগুলোতে তিনি সন্তুষ্ট হন, সেগুলোও এবং যেগুলোতে তিনি সন্তুষ্ট নন, সেগুলোও। এই উভয় প্রকার কাজগুলোর মধ্য থেকে মানুষ যে কাজই করবে, আল্লাহ তার হাত ধরবেন না। হ্যাঁ, সে কাজ যদি অন্যায় ও পাপাচার হয়, তবে তিনি অবশ্যই অসন্তুষ্ট হবেন। কেননা, সে আল্লাহ প্রদত্ত স্বাধীনতার অপব্যবহার করেছে। আর দুনিয়াতে এই এখতিয়ার তার কাছ থেকে ছিনিয়েও নেবেন না। তবে কিয়ামতে এর শাস্তি অবশ্যই দেবেন।

অর্থাৎ নিজেদের অজ্ঞতার কারণে এসব লোক মনে করে পৃথিবীতে যা হচ্ছে তা যেহেতু আল্লাহর অনুমোদনের অধীনে হচ্ছে, তাই এতে আল্লাহর সম্মতি বা স্বীকৃতি আছে। অথচ এ ধরনের যুক্তি যদি সঠিক হয় তাহলে পৃথিবীতে তো শুধু শিরকই হচ্ছে না, চুরি, ডাকাতি, খুন, ব্যভিচার, ঘুষ, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ এবং এ ধরনের আরো অসংখ্য অপরাধও সংঘটিত হচ্ছে যেগুলোকে কোন ব্যক্তি নেকী ও কল্যাণ মনে করে না। তাছাড়া এ ধরনের যুক্তি প্রমাণের ভিত্তিতে কি একথাও বলা যাবে যে, এ কাজ সবই হালাল ও পবিত্র। কারণ, আল্লাহ‌ তাঁর পৃথিবীতে এসব কাজ হতে দিচ্ছেন। আর তিনি যখন এসব হতে দিচ্ছেন তখন অবশ্যই তিনি এসব পছন্দ করেন? পৃথিবীতে যেসব ঘটনা ঘটছে সেগুলো আল্লাহর পছন্দ-অপছন্দ জানার মাধ্যম নয়। বরং এ মাধ্যম হচ্ছে আল্লাহর কিতাব, যা তাঁর রসূলের মাধ্যমে আসে। আল্লাহ‌ কোন্ ধরনের আকীদা-বিশ্বাস, কাজকর্ম ও চরিত্র পছন্দ করেন এবং কোন্ ধরনের পছন্দ করেন না তা এই কিতাবে তিনি নিজেই বলে দিয়েছেন। অতএব, এসব লোকের কাছে কুরআনের পূর্বে আগত এমন কোন কিতাব যদি বর্তমান থাকে যেখানে আল্লাহ‌ বলেছেন, আমার সাথে ফেরেশতারাও তোমাদের উপাস্য, তাদের ইবাদাত করাও তোমাদের উচিত, তাহলে এরা তার প্রমাণ দিক।

অর্থাৎ আল্লাহর কিতাবের কোন সনদ তাদের কাছে নেই। শুধু এই সনদই আছে যে বাপ-দাদা থেকে এরূপই হয়ে আসছে। তাই তাদের অন্ধ অনুসরণ করতে গিয়ে তারাও ফেরেশতাদের দেবী বানিয়ে নিয়েছে।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যখন মক্কার কাফিরদেরকে দেবদেবীর উপাসনা ছেড়ে এক আল্লাহর দাসত্বের দিকে আহবান করতেন, তখন তারা তাদের বাপ-দাদার দোহাই দিয়ে বলত, আমরা তারই অনুসরণ করব, যার উপর আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদেরকে পেয়েছি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘আর যখন তাদেরকে বলা হয় যে, আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তোমরা তারই অনুসরণ কর। তখন তারা বলে, না, বরং আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদেরকে যার উপর পেয়েছি তার অনুসরণ করব। যদিও তাদের পিতৃপুরুষগণ কিছুই বুঝত না এবং তারা সৎপথেও পরিচালিত ছিল না, তথাপিও? যারা কুফরী করে তাদের উদাহরণ হ’ল, যেমন কোন ব্যক্তি এমন কিছুকে ডাকে যা হাঁক ডাক ছাড়া আর কিছুই শ্রবণ করে না- বধির, মূক, অন্ধ, সুতরাং তারা বুঝবে না’ (বাক্বারাহ ২/১৭০-১৭১)।

এটি অত্যন্ত গভীরভাবে ভেবে দেখার বিষয় যে, প্রত্যেক যুগে জাতির সচ্ছল শ্রেণীর লোকেরাই শুধু নবী-রসূলদের বিরুদ্ধে বাপ-দাদার অন্ধ অনুকরণের ঝাণ্ডাবাহী কেন হয়েছে? ন্যায় ও সত্যের বিরোধিতায় এরাই অগ্রগামী হয়েছে, এরাই প্রতিষ্ঠিত জাহেলিয়াতকে টিকিয়ে রাখার প্রচেষ্টায় তৎপর থেকেছে এবং জনগনকে বিভ্রান্ত ও উত্তেজিত করে নবী-রসূলদের বিরুদ্ধে ফিতনা সৃষ্টি এরাই করে এসেছে এর কারণ কি? এর মূল কারণ ছিল দু’টি। একটি হচ্ছে, সুখী ও সচ্ছল শ্রেণী আপন স্বার্থ উদ্ধার ও তা ভোগ করার নেশায় এমনই ডুবে থাকে যে, তাদের মতে তারা হক ও বাতিলের এই অপ্রাসঙ্গিক বিতর্কে মাথা ঘামানোর জন্য প্রস্তুত থাকে না। তাদের আরাম প্রিয়তা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিলাসিতা দ্বীনের ব্যাপারে তাদেরকে অত্যন্ত নির্লিপ্ত ও নিষ্পৃহ এবং সাথে সাথে কার্যত রক্ষনশীল (Conservative) বানিয়ে দেয় যাতে প্রতিষ্ঠিত যে অবস্থা পূর্ব থেকেই চলে আসছে হক হোক বা বাতিল হোক— তাই যেন হুবহু প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং কোন নতুন আদর্শ সম্পর্কে চিন্তা করার কষ্ট না করতে হয়।

অপরটি হচ্ছে, প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার সাথে তাদের স্বার্থ ওতপ্রোতোভাবে জড়িত থাকে। নবী-রসূল আলাইহিমুস সালামদের পেশকৃত আদর্শ দেখে প্রথম দৃষ্টিতেই তারা বুঝে নেয় যে, এটা প্রতিষ্ঠিত হলে তাদের মাতব্বরির পার্টও চুকিয়ে দেবে এবং তাদের হারামখুরী ও হারাম কর্ম করার স্বাধীনতা থাকবে না। ইরশাদ হয়েছে-

তারা জবাব দিলোঃ “তুমি কি আমাদের কাছে এ জন্য এসেছো যে, আমরা একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করবো এবং আমাদের বাপ-দাদারা যাদের ইবাদত করে এসেছে তাদেরকে পরিহার করবো? বেশ, যদি তুমি সত্যবাদী হও, তাহলে আমাদের যে আযাবের হুমকি দিচ্ছো, তা নিয়ে এসো।”আরাফঃ৭০

তার সম্প্রদায়ের যেসব সরদার ঈমান আনতে অস্বীকার করেছিল এবং আখেরাতের সাক্ষাতকারকে মিথ্যা বলেছিল, যাদেরকে আমি দুনিয়ার জীবনে প্রাচুর্য দান করেছিলাম, তারাবলতে লাগলো, “এ ব্যক্তি তোমাদেরই মতো একজন মানুষ ছাড়া আর কিছুই নয়। তোমরা যা কিছু খাও তা-ই সে খায় এবং তোমরা যা কিছু পান করো তা-ই সে পান করে। মুমিনূনঃ৩৩

অবশেষে যখন আমি তাদের বিলাসপ্রিয়দেরকে আযাবের মাধ্যমে পাকড়াও করবো তখন তারা আবার চিৎকার করতে থাকবে। মুমিনূনঃ ৬৪

এখানে করা হয়েছে “বিলাসপ্রিয়”। “মুতরফীন” আসলে এমনসব লোককে বলা হয় যারা পার্থিব ধন-সম্পদ লাভ করে ভোগ বিলাসে লিপ্ত হয়েছে এবং আল্লাহ‌ ও তাঁর সৃষ্টির অধিকার থেকে গাফিল হয়ে হয়ে গেছে। “বিলাসপ্রিয়” শব্দটির মাধ্যমে এ শব্দটির সঠিক মর্মকথাপ্রকাশ হয়ে যায়, তবে এ ক্ষেত্র শর্ত হচ্ছে একে শুধুমাত্র প্রবৃত্তির খায়েশ পূর্ণ করার অর্থে গ্রহণ করা যাবে না বরং বিলাস প্রিয়তার ব্যাপকতার অর্থে গ্রহণ করতে হবে।

আযাব বলতে এখানে সম্ভবত আখেরাতের আযাব নয় বরং দুনিয়ার আযাবের কথা বলা হয়েছে। জালেমরা দুনিয়ায়ই এ আযাবের মুখোমুখী হয়।

তারা তাদের পূর্বপুরুষদের অন্ধ অনুকরণে এত শক্ত ছিল যে, পয়গম্বরের (সুপথের জন্য) আলোকপাত ও দলীল তাদেরকে তা থেকে ফিরাতে পারেনি। এই আয়াত অন্ধ অনুকরণ বাতিল হওয়ার এবং তার নিন্দাবাদের অনেক বড় দলীল। (বিস্তারিত জানার জন্য দ্রষ্টব্যঃ ইমাম শাওকানীর ফাতহুল ক্বাদীর)

আল্লাহ তা’আলা বলেন : এদেরকে বলো, পৃথিবীর বুকে একটু চলাফেরা করো. তারপর দেখো মিথ্যারোপকারীদের পরিণতি কেমন ছিল। (সুরা আন’আম : ১১)

আল্লাহ বলেন : তাদের প্রত্যেককে আমি দৃষ্টান্ত দিয়ে বুঝিয়েছি এবং শেষ পর্যন্ত প্রত্যেককে ধ্বংস করে দিয়েছি। আর সেই জনপদের ওপর দিয়ে তো তারা যাতায়াত করেছে যার ওপর নিকৃষ্টতম বৃষ্টি বর্ষণ করা হয়েছিল। তারা কি তার অবস্থা দেখে থাকেনি? প্রকৃতপক্ষে এরা পরকালে ফিরে যেতে হবে তা চিন্তা করে না। (সুরা ফুরকান : ৩৯-৪০ )।

আমরা আল কুরআন থেকে ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতিদের ইতিহাস বিস্তারিত জানতে পারি। ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতিগুলোর মধ্যে আদ, সামুদ, লুত আ. এর জাতি, আহলে মাদইয়ান, সাবা জাতি, তুব্বা জাতি, বনী ইসরাইল জাতি, আসহাবুল উখদুদ, আসহাবুল কারিয়াহ, আসহাবুস সাবত, আসহাবু রাস ও আসহাবে ফীল উল্লেখযোগ্য। এদের অধিকাংশের ধ্বংসের কারণ হিসাবে জানা যায় যে, তারা তাদের নবীদের অস্বীকার ও তাঁদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে। যেমন : আদ জাতিতে প্রেরিত হয়েছিলেন হযরত হুদ আ.। তার সম্প্রদায়ের লোকেরা বললো, ‘আমরা তো তোমাকে নির্বুদ্ধিতায় লিপ্ত মনে করি এবং আমাদের ধারণা তুমি মিথ্যুক।’ (সুরা আরাফ : ৬৬)