أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
৪৩ : ১ حٰمٓ ۚ
১. হা-মীম।
৪৩ : ২ وَ الۡكِتٰبِ الۡمُبِیۡنِ ۙ
২. সুস্পষ্ট কিতাবের শপথ;
পবিত্র কোরআনে শপথের বিবরণ(মদিনা শরিফের খুতবা থেকে )
শায়খ ড. আবদুল মুহসিন বিন মুহাম্মাদ আল-কাসেম
আল্লাহ মহান কোরআনকে চিরন্তন নিদর্শন ও উচ্চস্তরের বিশুদ্ধতম উপদেশ বানিয়েছেন। তাতে তিনি দিকনির্দেশনার নানা বৈচিত্র্যময় শৈলী নিয়ে এসেছেন ও বৈশিষ্ট্যময় করছেন। শপথ বা কসম হলো ঈমান ও হেদায়েতের একটি অন্যতম বড় দ্বার। আল্লাহ ১৫টি সুরা শপথ করে শুরু করেছেন। তার সবগুলোই মক্কায় অবতীর্ণ। আল্লাহ তাঁর কিতাবের বহু জায়গায় শপথ করেছেন, শপথকারী যার নামে শপথ করা হয় ও যে বিষয়ের জন্য শপথ করা হয় সেগুলোর গুরুত্ব ও মহত্ত্বের প্রতি বান্দাকে সজাগ ও সতর্ক করার জন্য। আল্লাহ তাঁর কিতাবে সবচেয়ে বড় শপথ করেছেন মহান সত্তার নামে। আর তা হলো তাঁর নিজের পবিত্র সত্তা, যিনি পরিপূর্ণতা ও শ্রেষ্ঠত্বের যাবতীয় গুণে ভূষিত। তাঁর নামের শপথই হলো সবচেয়ে বড় ও মহান শপথ। তা ঈমানের গোড়ার বিষয়। দ্বীনের মূল ভিত্তি। তিনি বলেন,
‘আসমান ও জমিনের শপথ, নিশ্চয় তা মহাসত্য, ঠিক সেরকম যেরকম তোমরা কথা বলার শক্তি রাখ।’ (সুরা যারিয়াত : ২৩)।
তিনি কেয়ামতের বিচার দিবসে বান্দাদের সমবেত করার কথা বলতে গিয়ে তাঁর নিজের প্রভুত্বের শপথ করেছেন। ‘তোমার রবের কসম, আমি অবশ্যই তাদের সমবেত করব।’ (সুরা মারইয়াম : ৬৮)।
বান্দা পরকালে তার আমলের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। আল্লাহর কাছেই তাকে ফিরতে হবে, এছাড়া কোনো উপায় নেই। আল্লাহ বলেন, ‘তোমার রবের কসম, আমি অবশ্যই তাদের সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করব, তারা যা করত সে বিষয়ে।’ (সুরা হিজর : ৯২-৯৩)।
তিনি তাঁর উলুহিয়্যত তথা মাবুদ হওয়ার শপথ করে মুশরেকদের জবাবদিহি করা প্রসঙ্গে বলেন, ‘আল্লাহর শপথ! তোমরা যেসব মিথ্যাচরণ করতে তা নিয়ে তোমাদের অবশ্যই জিজ্ঞেসাবাদ করা হবে।(নাহল : ৫৬)। তিনি কোরআন নাজিল করা প্রসঙ্গে শপথ করে বলেন, ‘সুস্পষ্ট কিতাবের কসম! নিশ্চয় আমি বরকতময় রাতে তা নাজিল করেছি।’ (সুরা দুখান : ২-৩)।
আল্লাহ রাসুলুল্লাহ (সা.) এর জীবনের শপথ করেছেন, কারণ আদম সন্তানের মাঝে তাঁর জীবনের মূল্য সবচেয়ে বেশি। তিনি বলেন, ‘আপনার জীবনের শপথ! নিশ্চয় তারা তাদের ভ্রষ্টাচারে দ্বিধাগ্রস্ত।’ (সুরা হিজর : ৭২)।
আল্লাহ ফেরেশতাদের নামে শপথ করে বলেন, ‘শপথ সুন্দর করে সারিবদ্ধভাবে বিরাজমান ফেরেশতাদের! শপথ আল্লাহর কালাম পাঠকারী ফেরেশতাদের!’ (সুরা সাফফাত : ১ ও ৩)।
মহাবিশ্ব এক বিস্ময়কর সৃষ্টি। তাতে যেসব নিখুঁত কীর্তি রয়েছে তা সৃষ্টিকে তার স্রষ্টার মহিমা ও তার সৃষ্টিকর্তার শক্তিমত্তার কথা পরিচয় করিয়ে দেয়। মহাকাশ তার পরিধি, উচ্চতা, বিস্তৃতি, রং ও উজ্জ্বলতায় আল্লাহর অন্যতম বৃহৎ নিদর্শন। আল্লাহ আসমানের ঊর্ধ্বে বিরাজমান। আসমান ফেরেশতাদের মহল। সেখান থেকেই রিজিক নাজিল হয়। রুহ ও আমল আসমানের দিকেই ওঠে যায়। তাই আল্লাহ আসমান, আসমানের স্রষ্টা ও তাতে তিনি যা বানিয়েছেন সেসবের নামে শপথ করেছেন।
‘শপথ আকাশের এবং যিনি তা নির্মাণ করেছেন।(শামস : ৫)।
আকাশের উচ্চতার বিববরণ দিয়ে তিনি শপথ করেছেন। ‘শপথ সমুন্নত আকাশের।’(সুরা তুর : ৫)। আকাশে যে সৌন্দর্য, শোভা, নিপুণতা রয়েছে সেটার শপথ করে আল্লাহ বলেন, ‘শপথ বহু পথবিশিষ্ট আকাশের। (সুরা যারিয়াত : ৭)।
আল্লাহ নক্ষত্রের অস্তাচলের শপথ করেছেন, যেগুলোর দ্বারা দিনরাত, বর্ষ, মাস ও দিনের ভিত্তি স্থাপিত হয়। ‘আমি শপথ করছি নক্ষত্ররাজির অস্তাচলের।’ (সুরা ওয়াকিআ : ৭৫)। নক্ষত্ররাজির রয়েছে বিভিন্ন পরিস্থিতি, আল্লাহ সেগুলো গঠন করেছেন। তার আছে উদয়স্থল, সেখান থেকে উদিত হয়ে তা চলতে থাকে অনুগত ও নিয়ন্ত্রিত হয়ে তার অস্তমিত হওয়া পর্যন্ত। তিনি এর কসম করে বলেন, ‘শপথ স্বচ্ছন্দগতির নক্ষত্ররাজির।’ (সুরা যারিয়াত : ৩)।
সূর্য ও চন্দ্র নিকটতম আকাশে দৃশ্যমান অন্যতম বিশাল সৃষ্টি। এদের পথপরিক্রমায় মানুষের উপকারিতা ও প্রয়োজন সম্পন্ন হয়। সৃষ্টজীবের জীবন-জীবিকার ক্ষেত্রে এ দুটোর অস্তিত্বের বিকল্প নেই। আল্লাহ চন্দ্র-সূর্যের বিষয়টির গুরুত্ব প্রকাশ করতে এ দুটির নামে শপথ করেছেন। তিনি বলেন, ‘সূর্য ও তার কিরণের শপথ! চন্দ্রের শপথ! যখন তা সূর্যের পরে আবির্ভূত হয়।’ (সুরা শামস : ১-২)।
পৃথিবী সমতলভূমি ও বিস্তীর্ণ বিছানার মতো। আল্লাহ সৃষ্টির জন্য তা সুগম করেছেন, সমতল বানিয়েছেন, বিস্তৃত করেছেন এবং তাতে সমৃদ্ধি দান করেছেন। সেখানে চতুষ্পদ জন্তু ও প্রাণী সৃষ্টি করেছেন। তাতে বিভিন্ন ঝরনা ও নদনদী প্রবাহিত করেছেন। তিনি পৃথিবী ও তার প্রশস্ততার ও যিনি তা সম্প্রসারিত ও প্রলম্বিত করেছেন তার নামে কসম খেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘শপথ পৃথিবীর এবং যিনি তাকে বিস্তৃত করেছেন তাঁর।’ (সুরা শামস : ৬)। পৃথিবী থেকে যেসব উদ্ভিদ উদ্গত হয়, যার দ্বারা তার প্রাণ সঞ্চার হয় ও পৃথিবীতে যারা আছে তার কসম করেছেন। ‘শপথ জমিনের, যা বিদীর্ণ হয়।’ (সুরা তারিক : ১২)। বাতাস অবাক করা এক সৃষ্টি, যা দেখা যায় না। আল্লাহ সাহায্য কিংবা শাস্তি অথবা জীবন-জীবিকার জন্য বাতাসের গতিপথ ও কর্মকা- নিয়ন্ত্রণ করেন। তিনি বাতাসের পরিক্রমার শপথ করেছেন, আল্লাহ যা নির্দেশ করেছেন বাতাস তা মেনে চলার কারণে। ‘শপথ কল্যাণস্বরূপ প্রেরিত বাতাসের!’ (সুরা মুরসালাত : ১)। ঝড় ও দমকা হাওয়ার শপথ করেছেন, তার দ্বারা আল্লাহ যাকে ইচ্ছা উড়িয়ে নেন, সেই বাতাস যা কিছু তছনছ করে দেয়, তা পানি ও মাটি দিয়ে যা ডুবিয়ে দেয় তার নামে কসম করেছেন, যখন তা চূর্ণ করে। তিনি বলেন, ‘শপথ ধূলি-ঝঞ্ঝার।’ (সুরা যারিয়াত : ১)। সেই বাতাসের নামে কসম করেছেন, যা পানির ভারী মেঘমালা বহন করে। ‘শপথ বোঝা বহনকারী মেঘপুঞ্জের।’ (সুরা যারিয়াত : ২)।
সমুদ্র আল্লাহর অন্যতম বড় নিদর্শনের একটি। জলে পরিপূর্ণ। আল্লাহর আদেশের অধীন। তা আধিপত্য করে মাটির ওপর। তাতে যার আছে তাদের নিমজ্জিত করে দিতে পারে। সমুদ্রে চলাচল করে আল্লাহর রিজিক বোঝাই জাহাজ। সমুদ্রে আছে স্থলভাগের চেয়ে বহুগুণ বেশি বিভিন্ন সৃষ্টজীব। সমুদ্র ও তার বিস্ময়কর নানা বিষয়ের কসম খেয়েছেন আল্লাহ। তিনি বলেন, ‘শপথ উদ্বেলিত সমুদ্রের!’ (সুরা তুর : ৬)। আল্লাহ মানুষকে তাঁর অনেক সৃষ্টজীবের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। তিনি মানুষের আদিনিবাস ও আদিজনপদের কেন্দ্রস্থলের শপথ করেছেন, আর তা হলো আদিজনপদ মক্কা। তিনি বলেন, ‘আমি এ নগরের শপথ করছি। আপনি তো এ নগরেরই বাসিন্দা।’ (সুরা বালাদ : ১-২)। তিনি মানুষের মূল উৎস তার আদিপিতা আদম (আ.) এর শপথ করেছেন। তিনি বলেন, ‘শপথ জন্মদাতার।’ (সুরা বালাদ : ৩)। তার যে বংশধরের উদ্ভব হয়েছে তার শপথ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আর যা সে জন্ম দিয়েছে তার কসম।’ (সুরা বালাদ : ৩)।
লিখন ও লেখার কলম মানুষের কাছে বিশাল বড় নেয়ামত ও দান। তা দ্বীন সংরক্ষণ ও ইসলাম বুঝার মাধ্যম। এর দ্বারা মানুষের নানা উপকার সাধিত হয়। আল্লাহ এ দুটির নামে কসম করে বলেন, তাঁর নবী শত্রুদের আঘাত ও অভিযোগ থেকে পবিত্র। তিনি সম্মানিত নবী, তাঁকে তাঁর রব মহান চরিত্রে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। কেউ তাঁর সমতুল্য হতে পারবে না। ‘শপথ কলমের এবং তারা যা লিপিবদ্ধ করে তার। আপনার রবের অনুগ্রহে আপনি উন্মাদ নন। আপনার জন্য আছে নিরবচ্ছিন্ন পুরস্কার। আপনি মহান চরিত্রে অধিষ্ঠিত।’ (সুরা কলম : ১-৪)। ঘোড়া বাহন ও শোভা। তার উপকারিতা অবধারিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কেয়ামত পর্যন্ত ঘোড়ার মাথায় কল্যাণ যুক্ত থাকবে।’ (বোখারি ও মুসলিম)।
আল্লাহ ঘোড়ার নামে এমন অবস্থার শপথ করেছেন, সেখানে অন্য প্রাণীকে বিশেষভাবে উল্লেখ করেননি। ঘোড়ার তীব্র শক্তিশালী গতির শপথ করেছেন, যার থেকে তার বক্ষে নিজের নিঃশ্বাসের শব্দ বের হতে থাকে। তিনি বলেন, ‘শপথ ঊর্ধ্বশ্বাসে ধাবমান অশ্বরাজির।’ (সুরা আদিয়াত : ১)। সবচেয়ে সেরা ও শ্রেষ্ঠতম গৃহ হলো আসমানের বায়তুল মামুর আর সবচেয়ে সেরা পর্বত হলো তুর পর্বত, যেখানে আল্লাহ নিজের নবী মুসা (আ.) এর সঙ্গে কথা বলেছেন। আর সর্বশ্রেষ্ঠ কিতাব হচ্ছে পবিত্র কোরআন। আল্লাহ এ সবগুলোকে শপথে যুক্ত করে বলেন, ‘শপথ তুর পর্বতের, শপথ কিতাবের, যা লিখিত আছে উন্মুক্ত পত্রে। শপথ বায়তুল মামুরের।’ (সুরা তুর : ১-৪)। আল্লাহ মক্কা নগরীকে অন্যান্য সব জায়গা থেকে উচ্চ মর্যাদায় বিশেষিত করেছেন। তিনি তার নামে শপথ করে তাকে নিরাপদ নগর বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন, ‘শপথ ত্বিন ও জয়তুন ফলের। শপথ সিনাই পর্বতের। শপথ এই নিরাপদ নগরীর।’ (সুরা ত্বিন : ১-৩)।
রাত্রি হলো প্রশান্তি ও ইবাদতের সময়। আমাদের রব রাতের তৃতীয় প্রহরে দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করের। নিজ অনুগ্রহে ও দয়ায় তাঁর রহমতের ফল্গুধারা বান্দার ওপর দান করেন। মহাবিশ্বের নিদর্শনগুলোর মধ্যে আল্লাহ সবচেয়ে বেশি রাতেরই শপথ করেছেন। রাতের সব ধরনের পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন পন্থায় শপথ করেছেন। তিনি কসম করে বলেন, ‘শপথ নিশার যখন তার অবসান হয়।’ (সুরা তাকভির : ১৭)। রাতের চলমানতার কসম করেন, ‘শপথ রাত্রির যখন তা চলমান থাকে।’ (সুরা ফজর : ৪)। রাত যখন তার অন্ধকার দিয়ে সব ঢেকে ফেলে তখন তিনি কসম করে বলেন, ‘শপথ রাতের যখন তা আঁধারে গভীর হয়।’ (সুরা দোহা : ২)।
দিবস হচ্ছে ইবাদত ও জীবিকা উপার্জনের সময়। দিনের সবগুলো স্তর ভোর, প্রভাত, বিকাল নিয়ে তিনি শপথ করেছেন। রাত ও দিন জীবনের সময়। এ দুই সময়ের আমল দ্বারাই চিরস্থায়ী সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য অর্জন হয়। রাতদিনের সর্বত্রই বড় বড় নিদর্শন বিদ্যমান। রাতদিনের পরিক্রমায় রয়েছে এ দুটির পরিচালনাকারীর বড়ত্ব ও মহিমার প্রমাণ। আল্লাহ কসম করে তাই বলেন, ‘শপথ রাতের যখন তা অপসৃত হয়। শপথ সকালের যখন তা পরিস্ফুটিত হয়।’ (সুরা মুদ্দাসসির : ৩৩-৩৪)। তিনি অস্তরাগের শপথ করেন, যা রাতের আগমন ও দিবসের অবসানের চিহ্ন। ‘আমি শপথ করি অস্তরাগের।’ (সুরা ইনশিকাক : ১৬)। জিলহজ মাসের রাতগুলো শ্রেষ্ঠ রাত। তাই তিনি শপথ করে বলেন, ‘শপথ ১০ রজনীর।’ (সুরা ফজর : ২)। সর্বশেষ দিবস কেয়ামতের শপথ করে আল্লাহ বলেন, ‘শপথ প্রতিশ্রুত দিবসের।’ (সুরা বুরুজ : ২)।
আল্লাহ যেমনিভাবে নির্দিষ্ট বড় বড় জিনিসের শপথ করেছেন, তেমনিভাবে আমরা তাঁর সৃষ্টির যা দেখি আর যা দেখি না, তার সবকিছুর নামেই কসম করেছেন, তাতে কোনো কিছুর কথা কসম করে আলাদা করেননি। তিনি বলেন, ‘আমি শপথ করি সেসব জিনিসের যা তোমরা দেখ এবং যা তোমরা দেখতে পাও না।’ (সুরা হাক্কাহ : ৩৮-৩৯)। আর এটা আল্লাহর কিতাবের সবচেয়ে ব্যাপকতম শপথ।
আল্লাহ সব মাখলুক সৃষ্টি করেছেন। তাকে সুন্দর করে গড়েছেন। তিনি সৃষ্টিকে চ্যালেঞ্জ করেছেন, তারা যেন একটি অণু কিংবা দানা বা একটি যব সৃষ্টি করে দেখায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ বলেন, ‘তার চেয়ে বড় জালেম কে আছে যে আমার সৃষ্টির মতো কিছু সৃষ্টি করতে যায়, তাহলে তারা একটি অণু বানিয়ে দেখাক অথবা একটি দানা সৃষ্টি করুক কিংবা একটি যব।’ (বোখারি ও মুসলিম)। আল্লাহ তাঁর যাবতীয় নিপুণ সৃষ্টির নামে কসম করেন। তার মধ্য থেকে বড় বড় কিছু সৃষ্টিকে বিশেষভাবে আলাদা করেছেন সেগুলোর নামে বিশেষভাবে কসম খেয়ে। সেগুলোকে নিজের একত্ব, শক্তি ও ক্ষমতার নিদর্শনরূপে বর্ণনা করেছেন, যাতে মানুষ তাঁর ইবাদত করে, তাঁর মহিমা গায়, তাঁর আদেশ পালন করে এবং তাঁর নিষেধ করা বিষয় থেকে বিরত থাকে।
আল্লাহ সব সৃষ্টির স্রষ্টা। তিনি তাঁর সৃষ্টির যা ইচ্ছা তার নামে শপথ করেন। বান্দাকে তিনি একমাত্র তাঁর নামেই শপথ করার আদেশ দিয়েছেন, তাঁর বড়ত্ব ও মহিমা প্রকাশ করতে। বান্দাকে অন্য কিছুর নামে শপথ করতে নিষেধ করেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে শপথ করবে সে যেন আল্লাহর নামে শপথ করে, অন্যথায় যেন চুপ থাকে।’ (বোখারি ও মুসলিম)। আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর নামে কসম খাওয়া এক ধরনের শিরক। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্যকিছুর নামে কসম খেয়েছে সে কুফরি করেছে অথবা শিরক করেছে।’ (তিরমিজি)। যে আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর নামে শপথ করেছে নবী করিম (সা.) তাকে আল্লাহর একত্ব ঘোষণা করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘যে লোক লাত বা উজ্জার নামে কসম খেয়েছে সে যেন বলে, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু।’ (বোখারি ও মুসলিম)। প্রয়োজনের সময় একমাত্র আল্লাহর নামে নিষ্ঠাবান ও সত্যনিষ্ঠ হয়ে, আল্লাহর বড়ত্ব প্রকাশ করে কসম করবে, অতিরঞ্জন করবে না। যে বিষয়ের কসম খাবে তা সব সময় রক্ষা করবে। কেননা আল্লাহ আদেশ দিয়েছেন, ‘তোমরা তোমাদের শপথ রক্ষা করো।’ (সুরা মায়েদা : ৮৯)। আল্লাহই একমাত্র বড়ত্ব ও মহিমান্বিত হওয়ার যোগ্য।
৪৩ : ৩ اِنَّا جَعَلۡنٰهُ قُرۡءٰنًا عَرَبِیًّا لَّعَلَّكُمۡ تَعۡقِلُوۡنَ ۚ
৩. নিশ্চয় আমরা এটাকে (অবতীর্ণ) করেছি আরবী (ভাষায়) কুরআন, যাতে তোমরা বুঝতে পার।
যে বিষয়টির জন্য কুরআন মজীদের শপথ করা হয়েছে তা হচ্ছে এ গ্রন্থের রচয়িতা মুহাম্মাদ ﷺ নন, “আমি।” আর শপথ করার জন্য কুরআনের যে বৈশিষ্ট্যটি বেছে নেয়া হয়েছে তা হচ্ছে, ‘কিতাবুম মুবীন’। কুরআন যে আল্লাহর বাণী এ বৈশিষ্ট্যের জন্য কুরআনেরই শপথ করা স্বতই এ অর্থ প্রকাশ করে যে, হে লোকজন, এই সুস্পষ্ট কিতাব তোমাদের সামনে বিদ্যমান। চোখ মেলে তা দেখো; এর সুস্পষ্ট দ্ব্যর্থহীন বিষয়বস্তু, এর ভাষা, এর সাহিত্য, এর সত্য ও মিথ্যার মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য সূচনাকারী শিক্ষা, সব কিছুই এ সত্যের সাক্ষ্য পেশ করছে যে, আল্লাহ ছাড়া এর রচয়িতা আর কেউ হতে পারে না।
অতঃপর বলা হয়েছে, ‘আমি একে আরবী ভাষার কুরআন বানিয়েছি যাতে তোমরা তা উপলব্ধি করো। এর দু’টি অর্থ হতে পারে।
এক- এ কুরআন অন্য কোন ভাষায় নয়, বরং তোমাদের নিজেদের ভাষায় রচিত হয়েছে। তাই এর যাচাই বাছাই এবং মর্যাদা ও মূল্য নির্ণয় করতে তোমাদের কোন কষ্ট হওয়ার কথা নয়। এটা যদি আরবী ছাড়া অন্য কোন ভাষায় হতো তাহলে এই বলে তোমরা ওজর পেশ করতে পারতে যে, এটা আল্লাহর বাণী কিনা তা আমরা কিভাবে পরখ করবো। কারণ, এ বাণী বুঝতেই আমরা অক্ষম। কিন্তু আরবী ভাষার এই কুরআন সম্পর্কে তোমরা এ যুক্তি কি করে পেশ করবে? এর প্রতিটি শব্দ তোমাদের কাছে পরিষ্কার। ভাষা ও বিষয়বস্তু উভয় দিক থেকে এর প্রতিটি বাক্য তোমাদের কাছে সুস্পষ্ট। এটা মুহাম্মাদ ﷺ কিংবা অন্য কোন আরবী ভাষাভাষীর বাণী হতে পারে কিনা তা নিজেরা বিচার করে দেখো।
এই বাণীর দ্বিতীয় অর্থটি হচ্ছে, আমি এই কিতাবের ভাষা আরবী রেখেছি এই জন্য যে, আমি আরব জাতিকে সম্বোধন করে কথা বলছি। আর তারা কেবল আরবী ভাষার কুরআনই বুঝতে সক্ষম। আরবী ভাষায় কুরআন নাযিল করার এই সুস্পষ্ট যুক্তিসঙ্গত কারণ উপেক্ষা করে শুধু মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাতৃভাষা আরবী হওয়ার কারণে একে আল্লাহর বাণী না বলে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী বলে যারা আখ্যায়িত করে তারা বড়ই জুলুম করে। ।
وَ لَوۡ جَعَلۡنٰهُ قُرۡاٰنًا اَعۡجَمِیًّا لَّقَالُوۡا لَوۡ لَا فُصِّلَتۡ اٰیٰتُهٗ ؕ ءَؔاَعۡجَمِیٌّ وَّ عَرَبِیٌّ ؕ قُلۡ هُوَ لِلَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا هُدًی وَّ شِفَآءٌ ؕ وَ الَّذِیۡنَ لَا یُؤۡمِنُوۡنَ فِیۡۤ اٰذَانِهِمۡ وَقۡرٌ وَّ هُوَ عَلَیۡهِمۡ عَمًی ؕ اُولٰٓئِكَ یُنَادَوۡنَ مِنۡ مَّكَانٍۭ بَعِیۡدٍ
আর যদি আমরা এটাকে করতাম অনারবী ভাষার কুরআন তবে তারা অবশ্যই বলত, এর আয়াতগুলো বিশদভাবে বিবৃত হয়নি কেন? ভাষা অনারবীয়, অথচ রাসূল আরবীয়! বলুন, এটি মুমিনদের জন্য হেদায়াত ও আরোগ্য। আর যারা ঈমান আনে না তাদের কানে রয়েছে বধিরতা এবং কুরআন এদের (অন্তরের) উপর অন্ধত্ব তৈরী করবে। তাদেরকেই ডাকা হবে দূরবর্তী স্থান থেকে। হামীম আস সাজদাহঃ ৪৪
যেসব হঠকারিতার মাধ্যমে নবী ﷺ এর মোকাবিলা করা হচ্ছিলো এটা তার আরেকটি নমুনা। কাফেররা বলতো, মুহাম্মাদ ﷺ আরব। আরবী তাঁর মাতৃভাষা। তিনি যখন আরবীতে কুরআন পেশ করছেন তখন কি করে বিশ্বাস করা যায়, একথা তিনি নিজে রচনা করেননি, বরং আল্লাহ তাঁর ওপর নাযিল করেছেন। তাঁর একথাকে আল্লাহর নাযিলকৃত বাণী হিসেবে কেবল তখনই মেনে নেয়া যেতো যদি তিনি এমন কোন ভাষায় অনর্গল বক্তৃতা করতে শুরু করতেন যা জানেন না। যেমন ফারসী, রোমান বা গ্রীক ভাষা। এর জবাবে আল্লাহ বলছেনঃ এদের নিজের ভাষায় কুরআন পাঠানো হয়েছে যা এরা বুঝতে সক্ষম। কিন্তু এদের আপত্তি হচ্ছে, একজন আরবের মাধ্যমে আরবদের জন্য আরবী ভাষায় এ বাণী নাযিল করা হলো কেন? কিন্তু অন্য কোন ভাষায় যদি নাযিল করা হতো তাহলে তখনও এই সব লোকই আপত্তি তুলে বলতো—আজব ব্যাপার তো! আরব জাতির কাছে একজন আরবকে রসূল বানিয়ে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু তাঁর কাছে এমন এক ভাষায় বাণী নাযিল করা হয়েছে যা রসূল বা গোটা জাতি কেউই বুঝে না।
কুরআনকে আরবী ভাষায় অবতীর্ণ করে সর্বপ্রথম যাদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে সেই আরবদের জন্য কোন ওজর-আপত্তি অবশিষ্ট রাখা হয়নি। এটা যদি অন্য ভাষায় হত, তাহলে তারা ওজর-আপত্তি করতে পারত।
৪৩ : ৪ وَ اِنَّهٗ فِیۡۤ اُمِّ الۡكِتٰبِ لَدَیۡنَا لَعَلِیٌّ حَكِیۡمٌ ؕ
৪. আর নিশ্চয় তা আমাদের কাছে উম্মুল কিতাবে উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন, হিকমতপূর্ণ।
এখানে কুরআন কারীমের সেই মাহাত্ম্য ও মর্যাদা বর্ণিত হয়েছে, যা ঊর্ধ্ব জগতে (মহান আল্লাহর) নিকট রয়েছে। যাতে নিম্ন জগদ্বাসীরাও এর মর্যাদা ও মাহাত্ম্যের প্রতি খেয়াল রেখে প্রকৃতার্থে যেন তার প্রতি গুরুত্ব দেয় এবং তা থেকে হিদায়াতের সেই উদ্দেশ্য সাধন করে, যার জন্য তাকে দুনিয়াতে অবতীর্ণ করা হয়েছে। أُمُّ الْكِتَابِ বলতে ‘লাওহে মাহফূয’কে বুঝানো হয়েছে।
৮৫: ২১ بَلۡ هُوَ قُرۡاٰنٌ مَّجِیۡدٌ
৮৫: ২২ فِیۡ لَوۡحٍ مَّحۡفُوۡظٍ
বস্তুত এটা সম্মানিত কুরআন, সংরক্ষিত ফলকে লিপিবদ্ধ। সূরা বুরুজঃ ২১-২২
أُمِّ الْكِتَابِ অর্থ اصل الكتاب অর্থাৎ সেই কিতাব যেখান থেকে সমস্ত নবী-রসূলদের প্রতি নাযিলকৃত কিতাবসমূহও গৃহীত হয়েছে।
সূরা ওয়াকিয়ায় এ কিতাবকেই كِتَابٍ مَكْنُونٍ (গোপন ও সুরক্ষিত কিতাব) বলা হয়েছে এবং সূরা বুরুজে এজন্য ‘লওহে মাহফুজ’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ এমন ফলক যার লেখা মুছে যেতে পারে না এবং যা সব রকম প্রক্ষেপন ও হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত। কুরআন সম্পর্কে أُمِّ الْكِتَابِ এ লিপিবদ্ধ আছে একথা বলে একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ সত্য সম্পর্কে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে।
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। দুরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর
ইবনে মানযুর বলেন:لوح (লাওহ): “কাঠের প্রশস্ত যে কোন পৃষ্ঠকে লাওহ বলে।” আযহারি বলেন: কাঠের পৃষ্ঠকে লাওহ বলা হয়। কাঁধের হাড়ের ওপর যদি কিছু লেখা হয় সেটাকেও লাওহ বলা হয়। যেটার উপর কিছু লেখা হয় সেটাই লাওহ।
اللوح দ্বারা উদ্দেশ্য- اللوح المحفوظ (সুরক্ষিত ফলক)। যেমনটি আয়াতে কারীমাতে এসেছে فِي لَوْحٍ مَحْفُوظ (অর্থ- সুরক্ষিত ফলকে রয়েছে)। অর্থাৎ আল্লাহ্ তাআলার ইচ্ছাসমূহের সংরক্ষণাগার।
প্রত্যেক প্রশস্ত হাড্ডিকে লাওহ বলা হয়।
শব্দটির বহুবচন হচ্ছে- ألواح
আর ألاويح হচ্ছে-جمع الجمع (বহুবচনের বহুবচন)।
দুই:
ইবনে কাছির (রহঃ) বলেন:
فِي لَوْحٍ مَحْفُوظ (অর্থ-লাওহে মাহফুযে তথা সুরক্ষিত ফলকে রয়েছে): অর্থাৎ এটি উচ্চ পরিষদ কর্তৃক সংযোজন, বিয়োজন, বিকৃতি ও পরিবর্তন থেকে সংরক্ষিত।[তাফসিরে ইবনে কাছির (৪/৪৯৭, ৪৯৮]
তিন:
ইবনুল কাইয়্যেম (রহঃ) বলেন:
আল্লাহ্র বাণী: مَحْفُوظ (সংরক্ষিত): অধিকাংশ ক্বারীগণ শব্দটিকে لوح শব্দের صفة হিসেবে جَرّ দিয়ে পড়েছেন। এর মধ্যে ইঙ্গিত রয়েছে যে, শয়তানদের পক্ষে কুরআন নিয়ে অবতীর্ণ হওয়া সম্ভব নয়। কারণ কুরআন যে স্থানে রয়েছে সে স্থানটি শয়তান সেখানে পৌঁছা থেকে সংরক্ষিত। এবং কুরআন নিজেও সংরক্ষিত; কোন শয়তান এতে সংযোজন-বিয়োজন করার ক্ষমতা রাখে না।
তাইতো আল্লাহ্ তাআলা তাঁর বাণীতে কুরআনকে সংরক্ষিত উল্লেখ করেছেন: “নিশ্চয় আমরা স্মরণিকাটি নাযিল করেছি। নিশ্চয় আমরা এর হেফাযতকারী”।[সূরা হিজর, আয়াত: ০৯] আর এ সূরাতে আল্লাহ্ তাআলা কুরআনে কারীম যে স্থানে রয়েছে সে স্থানকেও সংরক্ষিত উল্লেখ করেছেন।
এভাবে আল্লাহ্ তাআলা কুরআন যে আধারে রয়েছে সে আধার সংরক্ষণ করেছেন এবং কুরআনকেও যাবতীয় সংযোজন, বিয়োজন ও পরিবর্তন থেকে হেফাযত করেছেন। কুরআনের শব্দাবলি যেভাবে হেফাযত করেছেন অনুরূপভাবে কুরআনের অর্থকেও বিকৃতি থেকে হেফাযত করেছেন। কুরআনের কল্যাণে এমন কিছু ব্যক্তিকে নিয়োজিত করেছেন যারা কোন প্রকার বাড়তি বা কমতি ছাড়া কুরআনের হরফগুলো মুখস্ত রাখে এবং এমন কিছু ব্যক্তি নিয়োজিত করেছেন যারা কুরআনের অর্থকে বিকৃতি ও পরিবর্তন থেকে হেফাযত করে।”[দেখুন: আত-তিবইয়ান ফি আকসামিল কুরআন, পৃষ্ঠা-৬২]
চার:
কিছু কিছু তাফসিরে এসেছে যে, ‘লওহে মাহফুয’ হচ্ছে- ইস্রাফিলের কপালে; অথবা সবুজ রঙের মণি দিয়ে তৈরী এক প্রকার সৃষ্টি; কিংবা এ জাতীয় অন্যান্য ব্যাখ্যা— এসব বক্তব্য সাব্যস্ত নয়। এটি অদৃশ্যের বিষয়। যার কাছে ওহী আসত তিনি ছাড়া অন্য কারো কাছ থেকে গায়েব বা অদৃশ্যের ব্যাপারে কোন তথ্য গ্রহণ করা যাবে না। আল্লাহ্ই ভাল জানেন।
সূত্র শাইখ মুহাম্মদ সালেহ আল-মুনাজ্জিদ
আল্লাহর পক্ষ থেকে বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন দেশ ও জাতিকে হিদায়াতের জন্য নবী-রসূলদের কাছে বিভিন্ন ভাষায় কিতাব নাযিল করা হয়েছে। কিন্তু সব কিতাবে একই আকীদা-বিশ্বাসের প্রতি দাওয়াত দেয়া হয়েছে, একই সত্যকে ন্যায় ও সত্য বলা হয়েছে, ভাল ও মন্দের একই মানদণ্ড পেশ করা হয়েছে, নৈতিকতা ও সভ্যতার একই নীতি বর্ণনা করা হয়েছে এবং এসব কিতাব যে দ্বীন পেশ করেছে তা সবদিক দিয়ে একই দ্বীন। কারণ, এ দ্বীনের মূল ও উৎস এক, শুধু ভাষা ও বর্ণনা ভংগি ভিন্ন। একই অর্থ যা আল্লাহর কাছে একটি মূল গ্রন্থে লিপিবদ্ধ আছে। যখনই প্রয়োজন দেখা দিয়েছে তিনি কোন নবী পাঠিয়েছেন এবং পরিবেশ ও অবস্থা অনুসারে সেই অর্থ একটি বিশেষ বাক্যে ও বিশেষ ভাষায় পাঠিয়ে দিয়েছেন। ধরা যাক, আল্লাহ যদি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আরব ছাড়া অন্য কোন জাতির মধ্যে পয়দা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন তাহলে তিনি এই কুরআনকে সেই জাতির ভাষায় মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর নাযিল করতেন। সেই জাতি এবং দেশের পরিবেশ পরিস্থিতি অনুসারেই তাতে বক্তব্য পেশ করা হতো। বাক্যসমূহ ভিন্ন ধাঁচের হতো ভাষাও ভিন্ন হতো, কিন্তু শিক্ষা ও নির্দেশনা মৌলিকভাবে এটাই থাকতো। সেটাও এই কুরআনের মতই কুরআন হতো, যদিও আরবী কুরআন হতো না। সূরা শু’আরাতে এই এ বিষয়টিই এভাবে বলা হয়েছেঃ
وَإِنَّهُ لَتَنْزِيلُ رَبِّ الْعَالَمِينَ ……………………………… بِلِسَانٍ عَرَبِيٍّ مُبِينٍ – وَإِنَّهُ لَفِي زُبُرِ الْأَوَّلِينَ
“এটা রব্বূল আলামীনের নাযিলকৃত কিতাব……… পরিষ্কার আরবী ভাষায়। আর এটি পূর্ববর্তী লোকদের কিতাবসমূহেও বিদ্যমান।” (সূরা শু’আরা, টীকা ১১৯-১২১)
قُرۡاٰنًا عَرَبِیًّا غَیۡرَ ذِیۡ عِوَجٍ لَّعَلَّهُمۡ یَتَّقُوۡنَ
আরবী ভাষায় এ কুরআন বক্রতামুক্ত, যাতে তারা তাকওয়া অবলম্বন করে। যুমারঃ২৮
এ আয়াতাংশের সম্পর্ক كِتَابٍ مُبِينٍ ও اُمُّ الْكِتَابউভয়ের সাথে। অর্থাৎ এটি এক দিকে কুরআনের পরিচয় এবং অন্যদিকে উম্মুল কিতাবেরও পরিচয় যেখান থেকে কুরআন গৃহীত বা উদ্ধৃত হয়েছে। কুরআনের এই পরিচিতি দানের মাধ্যমে মন-মগজে একথাই বদ্ধমূল করে দেয়া উদ্দেশ্য যে, কেউ যদি তার অজ্ঞতার কারণে এ কিতাবের মূল্য ও মর্যাদা উপলব্ধি না করে এবং এর জ্ঞান গর্ভ শিক্ষা দ্বারা উপকৃত না হয় তাহলে সেটা তার নিজের দুর্ভাগ্য। কেউ যদি এর মর্যাদা খাটো করার প্রয়াস পায় এবং এর বক্তব্যের মধ্যে ত্রুটি অন্বেষণ করে তাহলে সেটা তার নিজের হীনমন্যতা। কেউ একে মর্যাদা না দিলেই এটা মূল্যহীন হতে পারে না এবং কেউ গোপন করতে চাইলেই এর জ্ঞান ও যুক্তি গোপন হতে পারে না। এটা স্বস্থানে একটি উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন কিতাব যাকে এর অতুলনীয় শিক্ষা, মু’জিযাপূর্ণ বাগ্মিতা, নিষ্কলুষ জ্ঞান এবং এর রচিয়তার আকাশচুম্বী ব্যক্তিত্ব উচ্চে তুলে ধরেছে। তাই কেউ এর অবমূল্যায়ণ করলে তা কি করে মূল্যহীন হতে পারে। পরে ৪৪ আয়াতে কুরাইশদের বিশেষভাবে এবং আরববাসীদের সাধারণভাবে বলা হয়েছে যে, এভাবে তোমরা যে কিতাবের বিরোধিতা করছো তার নাযিল হওয়াটা তোমাদের মর্যাদা লাভের একটি বড় সুযোগ এনে দিয়েছে। তোমরা যদি এই সুযোগ হাতছাড়া করো তাহলে তোমাদের আল্লাহর কাছে কঠোর জবাবদিহি করতে হবে। (দেখুন, টীকা ৩৯)
৪৩ : ৫ اَفَنَضۡرِبُ عَنۡكُمُ الذِّكۡرَ صَفۡحًا اَنۡ كُنۡتُمۡ قَوۡمًا مُّسۡرِفِیۡنَ
৫. আমরা কি তোমাদের থেকে এ উপদেশবাণী সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহার করে নেব এ কারণে যে, তোমরা সীমালঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়?
মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াত ঘোষণার সময় থেকে এ আয়াতগুলো নাযিল হওয়া পর্যন্ত বিগত কয়েক বছরে যেসব ঘটনা সংঘটিত হয়েছে তার পুরো কাহিনী এই আয়াতাংশে একত্রে বিবৃত করা হয়েছে। আয়াতাংশটি আমাদের সামনে এই চিত্রই ফুটিয়ে তোলে যে, একটি জাতি শত শত বছর ধরে চরম অজ্ঞতা, অধঃপতন ও দুরবস্থার মধ্যে নিমজ্জিত। আল্লাহর পক্ষ থেকে হঠাৎ তার ওপর করুণার দৃষ্টি পড়ছে। তিনি তাদের মধ্যে একজন সর্বশ্রেষ্ট নেতার জন্ম দিচ্ছেন এবং তাদেরকে অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে উদ্ধার করার জন্য তাঁর নিজের বাণী পাঠাচ্ছেন। যাতে তারা অলসতা ঝেড়ে জেগে ওঠে, জাহেলী কুসংস্কারের আবর্ত থেকে বেরিয়ে আসে এবং পরম সত্য সম্পর্কে অবহিত হয়ে জীবনে চলার সঠিক পথ অবলম্বন করে। কিন্তু সেই জাতির নির্বোধ লোকেরা এবং তার স্বার্থপর গোত্রপতিরা সেই নেতার বিরুদ্ধে উঠে পড়ে লাগছে এবং তাঁকে ব্যর্থ করে দেয়ার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করছে। যতই বছরের পর বছর অতিক্রান্ত হচ্ছে তাদের দুষ্কর্ম ততই বেড়ে যাচ্ছে। এমনকি তারা তাঁকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে।
ঠিক এই পরিস্থিতিতে বলা হচ্ছে, তোমাদের এই অযোগ্যতার কারণে কি আমি তোমাদের সংস্কার ও সংশোধনের প্রচেষ্টা পরিত্যাগ করবো? উপদেশ দানের এই ধারাবাহিকতা বন্ধ করবো? এবং শত শত বছর ধরে তোমরা যে অধঃপতনের মধ্যে পড়ে আছ সেই অধঃপতনের মধ্যেই পড়ে থাকতে দেব? তোমাদের কাছে আমার রহমতের দাবী কি এটাই হওয়া উচিত? তোমরা কি কখনো ভেবে দেখেছো, আল্লাহর অনুগ্রহ প্রত্যাখ্যান করা এবং ন্যায় ও সত্য সামনে এসে যাওয়ার পর বাতিলকে আঁকড়ে থাকা তোমাদের কেমন পরিণতির সম্মুখীন করবে?
৪৩ : ৬ وَ كَمۡ اَرۡسَلۡنَا مِنۡ نَّبِیٍّ فِی الۡاَوَّلِیۡنَ
৬. আর পূর্ববর্তীদের কাছে আমরা বহু নবী প্রেরণ করেছিলাম।
৪৩ : ৭ وَ مَا یَاۡتِیۡهِمۡ مِّنۡ نَّبِیٍّ اِلَّا كَانُوۡا بِهٖ یَسۡتَهۡزِءُوۡنَ
৭. আর যখনই তাদের কাছে কোন নবী এসেছে তারা তাকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করেছে।
৪৩ : ৮ فَاَهۡلَكۡنَاۤ اَشَدَّ مِنۡهُمۡ بَطۡشًا وَّ مَضٰی مَثَلُ الۡاَوَّلِیۡنَ
(৮) ওদের মধ্যে যারা এদের অপেক্ষা শক্তিতে প্রবল ছিল তাদেরকে আমি ধ্বংস করেছিলাম; আর পূর্ববর্তীদের দৃষ্টান্ত ঘটে গেছে।
বিশিষ্ট লোকদের অযৌক্তিক আচরণের ফলে গোটা মানবজাতিকে নবুওয়াত ও কিতাবের পথ নির্দেশনা থেকে বঞ্চিত করা হবে এমন ঘটনা কখনো ঘটেনি। বরং সর্বদাই এর ফলাফল দাঁড়িয়েছে এই যে, যারাই বাতিল পরস্তির নেশায় এবং নিজেদের শক্তির গর্বে উম্মত্ত হয়ে নবী-রসূলদের বিদ্রূপ ও হেয় প্রতিপন্ন করা থেকে বিরত হয়নি, শেষ পর্যন্ত তাদেরকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে।
মক্কাবাসীদের থেকেও বেশী শক্তিশালী ছিল। যেমন, অন্যত্র বলেছেন,
{كَانُوْا أَكْثَرَ مِنْهُمْ وَأَشَدَّ قُوَّةً} ‘‘তারা এদের চেয়েও সংখ্যায় ও শক্তিতে অনেক বেশী ছিল। (সূরা মুমিন ৮২)
কুরআন মাজীদে সেই সম্প্রদায়দের কথা অথবা তাদের গুণাবলী একাধিকবার উল্লিখিত হয়েছে। এতে মক্কাবাসীদের জন্য এইভাবে ধমক দেওয়া হয়েছে যে, পূর্বের জাতিরা রসূলদেরকে মিথ্যাজ্ঞান করার কারণে বিনাশপ্রাপ্ত হয়েছে। এরাও যদি মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর রিসালাতকে মিথ্যা মনে করাতে অটল থাকে, তবে তাদের ন্যায় এরাও ধ্বংস হয়ে যাবে।
৪৩ : ৯ وَ لَئِنۡ سَاَلۡتَهُمۡ مَّنۡ خَلَقَ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضَ لَیَقُوۡلُنَّ خَلَقَهُنَّ الۡعَزِیۡزُ الۡعَلِیۡمُ
(৯) তুমি যদি ওদেরকে জিজ্ঞাসা কর, ‘কে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছে? ওরা অবশ্যই বলবে, এগুলিকে সৃষ্টি করেছেন পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞ (আল্লাহ)।
কিন্তু এই স্বীকারোক্তির পরেও ঐ সৃষ্ট ব্যক্তি-বস্তুরই মধ্য হতে অনেককেই এই মূর্খরা আল্লাহর অংশীদার বানিয়ে নিয়েছে। এতে তাদের অপরাধ যে বড়ই সাংঘাতিক ও জঘন্য ছিল সে কথা বর্ণিত হয়েছে এবং তাদের নির্বুদ্ধিতা ও মুর্খতার কথাও প্রকাশ হয়েছে।
আর যদি আপনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, কে আসমানসমূহ ও যমীনকে সৃষ্টি করেছেন এবং চন্দ্ৰ-সূৰ্যকে নিয়ন্ত্রিত করেছেন? তারা অবশ্যই বলবে, আল্লাহ। তাহলে কোথায় তাদের ফিরানো হচ্ছে! আনকাবুতঃ ৬১
ঐ সকল মুশরিকরা, যারা শুধু তাওহীদের কারণে মুসলিমগণকে কষ্ট দেয়, তাদেরকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় যে, আকাশ ও পৃথিবী কে সৃষ্টি করেছে এবং চাঁদ ও সূর্যকে নিজ নিজ কক্ষপথে কে পরিচালনা করে? তবে ঐ স্থানে তাদের এ কথা স্বীকার করা ছাড়া কোন উপায় থাকবে না যে, এ সবের পরিচালক একমাত্র আল্লাহ তাআলা।
৪৩ : ১০ الَّذِیۡ جَعَلَ لَكُمُ الۡاَرۡضَ مَهۡدًا وَّ جَعَلَ لَكُمۡ فِیۡهَا سُبُلًا لَّعَلَّكُمۡ تَهۡتَدُوۡنَ
১০. যিনি তোমাদের জন্য যমীনকে বানিয়েছেন শয্যা এবং তাতে বানিয়েছেন তোমাদের চলার পথ, যাতে তোমরা সঠিক পথ পেতে পার;
পৃথিবীর বাহ্যিক আকার শয্যা বা বিছানার মত এবং এতে বিছানার অনুরূপ আরাম পাওয়া যায়। সুতরাং এটা গোলাকার হওয়ার পরিপন্থী নয়। অন্যান্য স্থানেও পৃথিবীকে বিছানা বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। [সূরা ত্বা-হা: ৫৩, সূরা আন নাবা: ৬] লক্ষণীয় যে, যে শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে তা হচ্ছে, مهد শব্দটির এক অর্থ হচ্ছে, সুস্থির বিছানা বা শয্যা। অপর অর্থ হচ্ছে, দোলনা। অর্থাৎ একটি শিশু যেভাবে তার দোলনার মধ্যে আরামে শুয়ে থাকে মহাশূন্যে ভাসমান এই বিশাল গ্রহকে তোমাদের জন্য তেমনি আরামের জায়গা বানিয়ে দিয়েছেন। [ইবনে কাসীর, জালালাইন, আয়সার আত-তাফসির]
একটি শিশু যেভাবে তার দোলনার মধ্যে আরামে শুয়ে থাকে মহাশূন্যে ভাসমান এই বিশাল গ্রহকে তোমাদের জন্য তেমনি আরামের জায়গা বানিয়ে দিয়েছেন। এটি তার অক্ষের ওপর প্রতি ঘণ্টায় এক হাজার মাইল গতিতে ঘুরছে এবং প্রতি ঘণ্টায় ৬৬, ৬০০ মাইল গতিতে ছুটে চলছে। এর অভ্যন্তরে রয়েছে এমন আগুন যা পাথরকেও গলিয়ে দেয় এবং আগ্নেয়গিরির আকারে লাভা উদগীরণ করে কখনো কখনো তোমাদেরও তার ভয়াবহতা টের পাইয়ে দেয়। কিন্তু এসব সত্ত্বেও তোমাদের স্রষ্টা তাকে এতটা সুশান্ত বানিয়ে দিয়েছেন যে, তোমরা আরামে তার ওপর ঘুমাও অথচ ঝাকুনি পর্যন্ত অনুভব করো না। তোমরা তার ওপরে বসবাস করো কিন্তু অনুভব পর্যন্ত করতে পার না এটি মহাশূন্যে ঝুলন্ত গ্রহ আর তোমরা তাতে পা ওপরে ও মাথা নীচের দিকে দিয়ে ঝুলছো। তোমরা এর পিঠের ওপরে আরামে ও নিরাপদে চলাফেরা করছো অথচ এ ধারণা পর্যন্ত তোমাদের নেই যে, তোমরা বন্দুকের গুলীর চেয়ে দ্রুতগতি সম্পন্ন গাড়ীতে সওয়ার হয়ে আছো। বিনা দ্বিধায় তাকে খনন করছো, তার বুক চিরছো এবং নানাভাবে তার পেট থেকে রিযিক হাসিল করছো অথচ কখনো কখনো ভূমিকম্পের আকারে তার অতি সাধারণ কম্পনও তোমাদের জানিয়ে দেয় এটা কত ভয়ংকর দৈত্য যাকে আল্লাহ তোমাদের জন্য অনুগত করে রেখেছেন
“আর যদি আপনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, আকাশ হতে বারি বর্ষণ করে কে ভূমিকে সঞ্জীবিত করেন তার মৃত্যুর পর? তারা অবশ্যই বলবে, আল্লাহ। বলুন, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই। কিন্তু তাদের অধিকাংশই এটা অনুধাবন করে না”। আনকাবুতঃ৬৩
বলুন, কে তোমাদেরকে আসমান ও যমীন থেকে জীবনোপকরুণ সরবরাহ করেন অথবা শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি কার কর্তৃত্বাধীন, জীবিতকে মৃত থেকে কে বের করেন এবং মৃতকে জীবিত হতে কে বের করেন এবং সব বিষয় কে নিয়ন্ত্রণ করেন? তখন তারা অবশ্যই বলবে, আল্লাহ। সুতরাং বলুন, ‘তবুও কি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করবে না? সূরা ইউনুসঃ ৩১
ভূ-পৃষ্ঠে পাহাড়ের মাঝে গিরিপথ এবং পাহাড়ী ও সমতল ভূমি অঞ্চলে নদী হচ্ছে সেই সব প্রাকৃতিক পথ যা আল্লাহ তৈরী করেছেন। [তাবারী, সা’দী]
পর্বত শ্রেনীকে যদি কোন ফাঁক ছাড়া একেবারে নিশ্ছিদ্র প্রাচীরের মত করে দাঁড় করানো হতো এবং ভূ-পৃষ্ঠের কোথাও কোন সমুদ্র, নদী-নালা না থাকতো তাহলে মানুষ যেখানে জন্ম গ্রহণ করেছিলো সেখানেই আবদ্ধ হয়ে পড়তো। আল্লাহ আরো অনুগ্রহ করেছেন এই যে, তিনি গোটা ভূ-ভাগকে একই রকম করে সৃষ্টি করেননি, বরং তাতে নানা রকমের এমন সব পার্থক্যসূচক চিহ্ন (Land marks) রেখে দিয়েছেন যার সাহায্যে মানুষ বিভিন্ন এলাকা চিনতে পারে এবং এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলের পার্থক্য উপলব্ধি করতে পারে। এটা আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় যার সাহায্যে পৃথিবীতে মানুষের চলাচল সহজ সাধ্য হয়েছে। মানুষের যখন বিশাল কোন মরুভূমিতে যাওয়ার সুযোগ হয়, যেখানে মাইলের পর মাইল এলাকায় কোন পার্থক্যসূচক চিহ্ন থাকে না এবং মানুষ বুঝতে পারে না সে কোথা থেকে কোথায় এসে পৌঁছেছে এবং সামনে কোন্ দিকে যেতে হবে তখন সে এই নিয়ামতের মর্যাদা বুঝতে পারে।
এ আয়াতাংশ একই সাথে দু’টি অর্থ প্রকাশ করছে।
একটি হচ্ছে, এসব প্রাকৃতিক রাস্তা ও রাস্তার চিহ্নসমূহের সাহায্যে তোমরা তোমাদের পথ চিনে নিতে পার এবং যেখানে যেতে চাও সেখানে পৌঁছতে পার।
আরেকটি অর্থ হচ্ছে, মহিমান্বিত আল্লাহর এসব কারিগরি দেখে হিদায়াত লাভ করতে পার। প্রকৃত সত্য লাভ করতে পার এবং বুঝতে পার যে, পৃথিবীতে আপনা থেকেই এ ব্যবস্থা হয়ে যায়নি, বহু সংখ্যক খোদা মিলেও এ ব্যবস্থা করেনি, বরং মহাজ্ঞানী এক পালনকর্তা আছেন যিনি তার বান্দাদের প্রয়োজনের প্রতি লক্ষ্য রেখে পাহাড় ও সমতল ভূমিতে এসব রাস্তা বানিয়েছেন এবং পৃথিবীর একেকটি অঞ্চলকে অসংখ্য পন্থায় ভিন্ন ভিন্ন আকৃতি দান করেছেন যার সাহায্যে মানুষ এক অঞ্চলকে আরেক অঞ্চল থেকে আলাদা করে চিনতে পারে।
৪৩ : ১১ وَ الَّذِیۡ نَزَّلَ مِنَ السَّمَآءِ مَآءًۢ بِقَدَرٍ ۚ فَاَنۡشَرۡنَا بِهٖ بَلۡدَۃً مَّیۡتًا ۚ كَذٰلِكَ تُخۡرَجُوۡنَ
১১. আর যিনি আসমান থেকে বারি বর্ষণ করেন পরিমিতভাবে। অতঃপর তা দ্বারা আমরা সঞ্জীবিত করি নির্জীব জনপদকে। এভাবেই তোমাদেরকে বের করা হবে।
প্রত্যেক অঞ্চলের জন্য বৃষ্টির একটা গড় পরিমাণ নির্ধারণ করেছেন যা দীর্ঘকাল প্রতি বছর একই ভাবে চলতে থাকে। এক্ষেত্রে এমন কোন অনিয়ম নেই যে কখনো বছরে দুই ইঞ্চি বৃষ্টিপাত হবে আবার কখনো দুইশ’ ইঞ্চি হবে। তাছাড়াও তিনি বিভিন্ন মওসুমের বিভিন্ন সময়ে বৃষ্টিকে বিক্ষিপ্ত করে এমনভাবে বর্ষণ করেন সাধারণত তা ব্যাপক মাত্রায় ভূমির উৎপাদন ক্ষমতার জন্য উপকারী হয়।
এটাও তাঁর জ্ঞান ও কৌশলেরই অংশ যে, তিনি ভূ-পৃষ্ঠের কিছু অংশকে প্রায় পুরোপুরিই বৃষ্টি থেকে বঞ্চিত করে পানি ও লতাগুল্ম শূন্য মরুভূমি বানিয়ে দিয়েছেন এবং অপর কিছু অঞ্চলে কখনো দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করেন আবার কখনো ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি বর্ষণ করেন, যাতে ব্যক্তি বুঝতে পারে যে, পৃথিবীর বিভিন্ন বসতি এলাকার জন্য বৃষ্টিপাত ও তা নিয়মিত হওয়া কত বড় নিয়ামত।
তাছাড়া একথাও যেন তার স্মরণ থাকে যে, এই ব্যবস্থা অন্য কোন শক্তির নির্দেশনা মোতাবেক চলছে যার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোন কিছুই কার্যকরী হয় না। একটি দেশে বৃষ্টিপাতের যে সাধারণ গড় তা পরিবর্তন কিংবা পৃথিবীর ব্যাপক এলাকায় তার বণ্টন হারে কোন পার্থক্য সৃষ্টি করা, অথবা কোন আগমনোদ্যত তুফানকে রোধ করতে পারা বা কোন বিমুখ বৃষ্টিকে খাতির তোয়াজ করে নিজ দেশের দিকে টেনে আনা এবং বর্ষনে বাধ্য করার সাধ্য কারোর নেই।
এখানে পানির সাহায্যে ভূমির উৎপাদন ক্ষমতা সৃষ্টিকে এক সাথে দু’টি জিনিসের প্রমাণ হিসেবে পেশ করা হয়েছে।
এক-এ কাজটি যিনি এক মাত্র আল্লাহ তাঁর জ্ঞান ও কুদরত দ্বারা হচ্ছে। আল্লাহর এই সার্বভৌম কর্তৃত্বে অন্য কেহ তাঁর শরীক নয়।
দুই-মৃত্যুর পরে পুনরায় জীবন হতে পারে এবং হবে। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন—
(তুমি দেখছো প্রত্যেক বর্ষাকালে) আল্লাহ আকাশ থেকে বারি বর্ষণ করেন এবং তার বদৌলতে তিনি সহসাই মৃত জমিতে প্রাণ সঞ্চার করেন। নিশ্চয়ই এর মধ্যে একটি নিদর্শন রয়েছে যারা শোনে তাদের জন্য। সূরা নহলঃ৬৫
কে তিনি যিনি আকাশসমূহ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের জন্য আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেছেন তারপর তার সাহায্যে সুদৃশ্য বাগান উৎপাদন করেছেন, যার গাছপালা উৎপন্ন করাও তোমাদের আয়াত্বধীন ছিল না? আল্লাহর সাথে কি (এসব কাজে অংশীদার) অন্য ইলাহও আছে? (না, ) বরং এরাই সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে এগিয়ে চলছে। সূরা নমলঃ৬০
৪৩ : ১২ وَ الَّذِیۡ خَلَقَ الۡاَزۡوَاجَ كُلَّهَا وَ جَعَلَ لَكُمۡ مِّنَ الۡفُلۡكِ وَ الۡاَنۡعَامِ مَا تَرۡكَبُوۡنَ
১২. আর যিনি সকল প্রকারের জোড়া যুগল সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন এমন নৌযান ও গৃহপালিত জন্তু যাতে তোমরা আরোহণ কর;
জোড়া অর্থ শুধু মানবজাতির নারী ও পুরুষ এবং জীব-জন্তু ও উদ্ভিদরাজির নারী-পুরুষে জোড়াই বুঝানো হয়নি, বরং আল্লাহর সৃষ্ট আরো অসংখ্য জিনিসের জোড়া সৃষ্টির বিষয়ও বুঝানো হয়েছে যাদের পারস্পরিক সংমিশ্রনে পৃথিবীতে নতুন নতুন জিনিসের উৎপত্তি হয়। যেমনঃ উপাদানসমূহের মধ্যে কোনটি কোনটির সাথে খাপ খায় এবং কোনটি কোনটির সাথে খাপ খায় না। যেগুলো পরস্পর সংযোজন ও সংমিশ্রণ ঘটে সেগুলোর মিশ্রনে নানা রকম বস্তুর উদ্ভব ঘটছে। যেমন বিদ্যুৎ শক্তির মধ্যে ইতিবাচক ও নেতিবাচক বিদ্যুৎ একটি আরেকটির জোড়া। এ দু’টির পারস্পরিক আকর্ষণ পৃথিবীতে বিস্ময়কর ও অদ্ভূত সব ক্রিয়াকাণ্ডের কারণ হচ্ছে। এটি এবং এ ধরনের আরো অগণিত জোড়া যা আল্লাহ নানা ধরনের সৃষ্টির মধ্যে পয়দা করেছেন, এদের আকৃতি কাঠামো, এদের পারস্পরিক যোগ্যতা, এদের পারস্পরিক আচরণের বিচিত্র রূপ এবং এদের পারস্পারিক সংযুক্তি থেকে সৃষ্ট ফলাফল নিয়ে যদি মানুষ চিন্তা-ভাবনা করে তাহলে তার মন এ সাক্ষ্য না দিয়ে পারবে না যে, এ গোটা বিশ্ব কারখানা কোন একজন মহাপরাক্রমশালী মহাজ্ঞানবান কারিগরের তৈরী এবং তাঁরই ব্যবস্থাপনায় এটি চলছে। এর মধ্যে একাধিক খোদার অধিকার থাকার কোন সম্ভাবনাই নেই।
وَمِن كُلِّ شَىْءٍ خَلَقْنَا زَوْجَيْنِ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ
আমি প্রত্যেক জিনিসের জোড়া বানিয়েছি।হয়তো তোমরা এ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবে। যারিয়াতঃ৪৯
وَخَلَقْنَٰكُمْ أَزْوَٰجًا আমি কি তোমাদেরকে জোড়ায়-জোড়ায় সৃষ্টি করিনি? — আন-নাবা ৮
আল্লাহ বলেছেন: “সকল মহিমা তারঁ যিনি জোড়া সৃষ্টি করেছেন—পৃথিবী যা উৎপন্ন করে তার মধ্য হতে সব কিছুর,আর তাদের নিজেদের মধ্যেও এবং তারা(মানুষ)যার কথা জানে না তাদের মধ্য হতেও।” (ইয়াসীন:৩৬)
এই প্রশ্নে দেওয়া আয়াতগুলোতে যে আরবি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে তা হলো أزواج, যার বহুবচন হলো زواج.যার অর্থ: জোড়া,মিল,সঙ্গী অথবা এ أزواج বলতে দুইটি বস্তুর বৈপরিত্য যেমন: ধণাত্মকতা-ঋণাত্মকতা এবং এক সৃষ্টির বিভিন্নতার বিষয়ও এখানে চলে আসে।
আয়াতের এই أزواج হতে তিনটি বিষয় লক্ষ্যনীয়:
১.জোড়া যা পৃথিবীতে সৃষ্টি হয়।
২.মানব জোড়া এবং মানব চরিত্রের বৈপরিত্য জোড় যেমন:সাহসী-ভীরু,ভালো-মন্দ ইত্যাদি।
৩.এমন অজানা জোড় যা মানুষ জানে না।
৪৩ : ১৩ لِتَسۡتَوٗا عَلٰی ظُهُوۡرِهٖ ثُمَّ تَذۡكُرُوۡا نِعۡمَۃَ رَبِّكُمۡ اِذَا اسۡتَوَیۡتُمۡ عَلَیۡهِ وَ تَقُوۡلُوۡا سُبۡحٰنَ الَّذِیۡ سَخَّرَ لَنَا هٰذَا وَ مَا كُنَّا لَهٗ مُقۡرِنِیۡنَ
(১৩) যাতে তোমরা ওর পিঠে স্থির হয়ে বসতে পার অতঃপর তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের সম্পদ স্মরণ কর ও বল, ‘পবিত্র ও মহান তিনি যিনি একে আমাদের বশীভূত করে দিয়েছেন; যদিও আমরা একে বশীভূত করতে সমর্থ ছিলাম না।
সওয়ারীর পিঠে বসার সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখ থেকে যেসব কথা উচ্চারিত হতো সেগুলোই এ আয়াতের উদ্দেশ্য ও অভিপ্ৰায়ের সর্বোত্তম বাস্তব ব্যাখ্যা। আব্দুল্লাহ ইবন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, সফরে রওয়ানা হওয়ার সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সওয়ারীর জন্তুর উপর সওয়ার হওয়ার পর তিনবার ‘আল্লাহু আকবর’ বলতেন। তারপর (سُبْحَانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هَٰذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ وَإِنَّا إِلَىٰ رَبِّنَا لَمُنْقَلِبُونَ) পাঠ করতেন। তারপর এই বলে দো’আ করতেনঃ
اللَّهُمَّ إِنَّا نَسْأَلُكَ فِي سَفَرِنَا هَذَا الْبِرَّ وَالتَّقْوَى، وَمِنَ الْعَمَلِ مَا تَرْضَى، اللَّهُمَّ هَوِّنْ عَلَيْنَا سَفَرَنَا هَذَا، وَاطْوِ عَنَّا بُعْدَهُ، اللَّهُمَّ أَنْتَ الصَّاحِبُ فِي السَّفَرِ، وَالْخَلِيفَةُ فِي الأَهْلِ، اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ وَعَثَاءِ السَّفَرِ وَكَآبَةِ الْمَنْظَرِ وَسُوءِ الْمُنْقَلَبِ فِي الْمَالِ وَالأَهْلِ
আল্লাহুম্মা ইন্না নাসআলুকা ফী সাফারিনা হাযাল বিররা ওয়াত তাকওয়া ওয়া মিনাল আমালে মা তারদা। আল্লাহুম্মা হাওয়িন আলাইনা সাফারানা হাযা ওয়াতওয়ে আন্না বু’দাহ। আল্লাহুম্মা আনতাস সাহিবু ফিস সাফারে ওয়াল খালিফাতু ফিল আহলে। আল্লাহুম্মা ইন্নি ‘আউযু বিকা মিন ওয়া’সা-ইস সাফারে ওয়া কাআবাতিল মানযারে ওয়া সুয়িল মুনকালাবে ফিল মালে ওয়াল আহিল। [মুসলিম: ২৩৯২]
আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিসমিল্লাহ বলে রিকাবে পা রাখলেন এবং সওয়ার হওয়ার পর ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বললেন। তারপর এ আয়াত অর্থাৎ (سُبْحَانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا) থেকে শুরু করে (لَمُنْقَلِبُونَ) পর্যন্ত বললেন, তারপর ‘আলহামদুলিল্লাহ’ তিনবার ও ‘আল্লাহু আকবার’ তিনবার বললেন এবং তারপর বললেনঃ “আপনি অতি পবিত্র। আপনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। আমি নিজের প্রতি যুলুম করেছি। আমাকে ক্ষমা করে দিন।” এরপর তিনি হেসে ফেললেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল, আপনি কি কারণে হাসলেন। তিনি বললেন, বান্দা (হে রব, আমাকে ক্ষমা করে দিন) বললে আল্লাহর কাছে তা বড়ই পছন্দনীয় হয়। তিনি বলেনঃ আমার এই বান্দা জানে যে, আমি ছাড়া ক্ষমাশীল আর কেউ নেই। [মুসনাদে আহমদ: ১/৯৭, আবু দাউদ: ২৬০২, তিরমিযী: ৩৪৪৬]
৪৩ : ১৪ وَ اِنَّاۤ اِلٰی رَبِّنَا لَمُنۡقَلِبُوۡنَ
১৪. আর নিশ্চয় আমরা আমাদের রবের কাছেই প্রত্যাবর্তনকারী।
প্রতিটি সফরে যাওয়ার সময় স্মরণ করো যে, সামনে আরো একটি বড় সফর আছে এবং সেটিই শেষ সফর। তাছাড়া প্রত্যেকটি সওয়ারী ব্যবহার করার ক্ষেত্রে এ সম্ভাবনাও যেহেতু থাকে যে, হয়তো বা কোন দুর্ঘটনা এ সফরকেই তার শেষ সফর বানিয়ে দেবে। তাই উত্তম হচ্ছে, প্রত্যেকবারই সে তার রবের কাছে ফিরে যাওয়ার বিষয়টিকে স্মরণ করে যাত্রা করবে। যাতে মরতে হলেও একেবারে অবচেতনার মৃত্যু যেন না হয়।
এখানে কিছুক্ষণ থেমে এই শিক্ষার নৈতিক ফলাফল ও কিছুটা অনুমান করুন। আপনি কি কল্পনা করতে পারেন যে, ব্যক্তি কোন সওয়ারীতে আরোহণের সময় জেনে বুঝে পূর্ণ অনুভূতির সাথে এভাবে আল্লাহকে এবং তাঁর কাছে নিজের ফিরে যাওয়া ও জবাবদিহি করার কথা স্মরণ করে যাত্রা করে সে কি অগ্রসর হয়ে কোন পাপাচার অথবা জুলুম নির্যাতনে জড়িত হবে? কোন চরিত্রহীনার সাথে সাক্ষাতের জন্য, কিংবা কোন ক্লাবে মদ্য পান বা জুয়াখেলার উদ্দেশ্যে যাওয়ার সময়ও কি কোন মানুষের মুখ থেকে একথা উচ্চারিত হতে পারে অথবা সে তা ভাবতে পারে? কোন শাসক কিংবা কোন সরকারী কর্মচারী অথবা ব্যবসায়ী যে মনে মনে এসব কথা ভেবে এবং মুখে উচ্চারণ করে বাড়ী থেকে বের হলো সেকি তার গন্তব্যস্থলে পৌঁছে মানুষের হক নষ্ট করতে পারে? কোন সৈনিক নিরপরাধ মানুষের রক্তপাত ঘটানো এবং দুর্বলদের স্বাধীনতা নস্যাত করার উদ্দেশ্যে যাত্রার সময়ও কি তার বিমানে আরোহণ কিংবা ট্যাংকে পা রাখতে গিয়ে মুখে একথা উচ্চারণ করতে পারে? যদি না পারে, তাহলে এই একটি মাত্র জিনিস গোনাহর কাজের প্রতিটি তৎপরতায় বাঁধা সৃষ্টি করার জন্য যথেষ্ট।
নিশ্চয় তোমার রবের দিকেই ফিরে যেতে হবে। — সূরা আলাক : ০৮
আর তোমরা সেই দিনের তাকওয়া অবলম্বন কর যেদিন তোমাদেরকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে নেয়া হবে। তারপর প্রত্যেককে সে যা অর্জন করেছে তা পুরোপুরি প্রদান করা হবে। আর তাদের যুলুম করা হবে না। বাকারাঃ ২৮১
الَّذِیۡنَ اِذَاۤ اَصَابَتۡهُمۡ مُّصِیۡبَۃٌ ۙ قَالُوۡۤا اِنَّا لِلّٰهِ وَ اِنَّاۤ اِلَیۡهِ رٰجِعُوۡنَ
যারা তাদের উপর কোন বিপদ এলে বলে, ‘নিশ্চয় আমরা আল্লাহর এবং নিশ্চিতভাবে তারই দিকে ফিরে যাব।’সূরা বাকারাঃ ১৫৬
৪৩ : ১৫ وَ جَعَلُوۡا لَهٗ مِنۡ عِبَادِهٖ جُزۡءًا ؕ اِنَّ الۡاِنۡسَانَ لَكَفُوۡرٌ مُّبِیۡنٌ
১৫. আর তারা তাঁর বান্দাদের মধ্য থেকে তার অংশ সাব্যস্ত করেছে। নিশ্চয়ই মানুষ স্পষ্ট অকৃতজ্ঞ।
عِبَادٌ বলতে ফিরিশতাগণ। আর جُزْءٌ বলতে কন্যাগণ; অর্থাৎ, ফিরিশতাগণ যাঁদেরকে মুশরিকরা আল্লাহর কন্যা সাব্যস্ত করে তাঁদের ইবাদত করত। এইভাবে তারা সৃষ্টিকে আল্লাহর শরীক এবং তাঁর অংশ মনে করত। অথচ তিনি এ সব থেকে পাক ও পবিত্র। কেউ কেউ جزء বলতে সেই সব পশুকে বুঝিয়েছেন, যার এক অংশকে নযর-নিয়ায স্বরূপ মুশিরকরা আল্লাহর নামে এবং আর এক অংশকে মূর্তিদের নামে বের করত। এর উল্লেখ সূরা আনআমের ১৩৬নং আয়াতে হয়েছে।
“আল্লাহ যে শস্য ও গবাদি পশু সৃষ্টি করেছেন, তার মধ্য হতে তারা আল্লাহর জন্য এক অংশ নির্দিষ্ট করে এবং নিজেদের ধারণানুযায়ী বলে, ‘এ আল্লাহর জন্য এবং এ আমাদের দেবতাদের জন্য। যা তাদের দেবতাদের অংশ তা আল্লাহর কাছে পৌঁছে না এবং যা আল্লাহর অংশ তা তাদের দেবতাদের কাছে পৌঁছে। তারা যা মীমাংসা করে তা কত নিকৃষ্ট! (সূরা আনআমের ১৩৬)
এছাড়াও কোন সৃষ্টিকে আল্লাহর অংশ বানানোর আরেকটি রূপ হচ্ছে, যেসব গুণাবলী ও ক্ষমতা ইখতিয়ার শুধু আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট সেই সব গুণাবলী ও ক্ষমতা-ইখতিয়ারে তাকেও শরীক করা এবং এই ধারণার বশবর্তী হয়ে তার কাছে প্রার্থনা করা, কিংবা তার সামনে ইবাদাত-বন্দেগীর অনুষ্ঠানাদি সম্পন্ন করা, অথবা তার ঘোষিত হালাল ও হারামকে অবশ্য পালনীয় শরীয়ত মনে করে নেয়া। কারণ, ব্যক্তি এক্ষেত্রে ‘উলুহিয়াত’ ও ‘রবুবিয়াত’ কে আল্লাহ এবং বান্দার মধ্যে ভাগ করে দেয় এবং তার একটা অংশ বান্দার হাতে তুলে দেয়।
اِنَّ الۡاِنۡسَانَ لِرَبِّهٖ لَكَنُوۡدٌ ۚ﴿۶
নিশ্চয় মানুষ তার রবের প্রতি বড়ই অকৃতজ্ঞ। সূরা আদিয়াতঃ৬
আর সাগরে যখন তোমাদেরকে বিপদ স্পর্শ করে তখন শুধু তিনি ছাড়া অন্য যাদেরকে তোমরা ডেকে থাক তারা হারিয়ে যায়; অতঃপর তিনি যখন তোমাদেরকে উদ্ধার করে স্থলে আনেন তখন তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও। আর মানুষ খুবই অকৃতজ্ঞ। মানুষ বড়ই অকৃতজ্ঞ।[সূরা আল-ইসরাঃ ৬৭
তোমরা অকৃতজ্ঞ হলে জেনে রাখ, আল্লাহ তোমাদের মুখাপেক্ষী নন। তিনি তাঁর দাসদের অকৃতজ্ঞতা পছন্দ করেন না। যদি তোমরা কৃতজ্ঞ হও, তাহলে তিনি তোমাদের কৃতজ্ঞতা পছন্দ করেন। আর একের ভার অন্যে বহন করবে না। অতঃপর তোমাদের প্রতিপালকের নিকট তোমাদের প্রত্যাবর্তন হবে এবং তোমরা যা করতে, তিনি তোমাদেরকে তা অবগত করাবেন। নিশ্চয়ই তিনি অন্তরে যা আছে তা সম্যক অবগত। সূরা যুমারঃ৭
