أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
১২ : ৩০ وَ قَالَ نِسۡوَۃٌ فِی الۡمَدِیۡنَۃِ امۡرَاَتُ الۡعَزِیۡزِ تُرَاوِدُ فَتٰىهَا عَنۡ نَّفۡسِهٖ ۚ قَدۡ شَغَفَهَا حُبًّا ؕ اِنَّا لَنَرٰىهَا فِیۡ ضَلٰلٍ مُّبِیۡنٍ
৩০. আর নগরের কিছু সংখ্যক নারী বলল, আযীযের স্ত্রী তার যুবক দাস হতে অসৎকাজ কামনা করছে, প্রেম তাকে উন্মত্ত করেছে, আমরা তো তাকে স্পষ্ট ভ্রষ্টতার মধ্যেই নিপতিত দেখছি।
কোন ঘটনা যা সত্য তা লুকিয়ে রাখা যায় না,এটা প্রকাশ পায়,বিশেষ করে সম্ভ্রান্ত বা ধনী পরিবারের হলে আরো বেশী দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। মিসরের সামাজিক নৈতিক অবক্ষয়ের চিত্র উঠে এসেছে , ধনী পরিবারের নারীদের অবস্থাও এখানে বুঝা যায়। নারী যদি শরিয়তের বাইরে নিজেদের সৌন্দর্যকে প্রকাশ এবং যৌন চাহিদা পূরনের জন্য পরিবারের সীমা লংঘন করতেও দ্বিধা করে না তখন পরিবার ও সমাজ ভয়ংকর এক ফিতনার মধ্যে পড়ে যায়।
(২৬১৯) উসামা বিন যায়দ (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমার গত হওয়ার পরে পুরুষের পক্ষে নারীর চেয়ে অধিকতর ক্ষতিকর কোন ফিতনা অন্য কিছু ছেড়ে যাচ্ছি না।আহমাদ, বুখারী ৫০৯৬, মুসলিম ৭১২২, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ)
(২৬২০) আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, দুনিয়া হল সুমিষ্ট ও শ্যামল। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে তাতে খলীফা বানিয়েছেন, যাতে তিনি দেখে নেন যে, তোমরা কেমন আমল কর। অতএব তোমরা দুনিয়া ও নারীর ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন কর। আর জেনে রেখো যে, বনী ইসরাঈলের প্রথম ফিতনা যা ছিল, তা ছিল নারীকে কেন্দ্র করে।(আহমাদ, মুসলিম ২৭৪২, তিরমিযী ২১৯১, ইবনে মাজাহ ৪০০০)
নারীর ফেৎনা বৃদ্ধির কারণ :
১. ফিতনা বা সম্মোহন : কারণ, নারী যখন তার চেহারা খুলে ফেলবে, তখন তার কারণে পুরুষগণ ফিতনার শিকার হবে, বিশেষ করে যদি সে যুবতী বা রূপসী হয় অথবা সে যদি এমন কিছু করে, যা তার চেহারাকে সুন্দর ও লাবণ্যময়ী এবং উজ্জ্বল ও আকর্ষণীয়ভাবে দৃশ্যমান করে তুলে। আর এটা অনিষ্টতা, খারাপ পরিবেশ ও ফাসাদ সৃষ্টি অন্যতম বড় একটি কারণ।
২. নারীর লজ্জাহীনতা : নারী অবলা লাজুক প্রকৃতির। কিন্তু তাদের যখন লজ্জা-শরমের অবসান ঘটে তখন তারা ঈমানের এবং তার স্বভাব-প্রকৃতির শুধুমাত্র দাবিদার। কারণ, নারী হলো লজ্জা-শরমের ব্যাপারে দৃষ্টান্ত পেশ করার জায়গা। যেমন বলা হয়: ‘আমি অন্তঃপুরে অবস্থানরত কুমারী থেকে লজ্জা অনুভব করি।’ আর নারীর লজ্জা চলে যাওয়া মানে তার ঈমানের ব্যাপারে ঘাটতি হওয়া এবং এমন স্বভাব-প্রকৃতির গণ্ডি থেকে বের হয়ে যাওয়া, যে স্বভাব-প্রকৃতির ওপর তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে।
৩. নারীর সাথে পুরুষের অবৈধ সম্পর্ক : নারীর সাথে পুরুষদের গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠা এবং তাদের কর্তৃক তার পিছনে লাগা। বিশেষ করে সে যখন সুন্দরী হয় এবং তার পক্ষ থেকে যখন তোষামোদ, হাসাহাসি ও রসিকতা জাতীয় আচরণের বহিঃপ্রকাশ ঘটে, যেমনটি সাধারণত অধিকাংশ বেপর্দা নারীর ক্ষেত্রে হয়ে থাকে, আর বলা হয়ে থাকে, প্রথমে দেখা, তারপর সালাম বিনিময়, তারপর কথা, তারপর প্রতিশ্রুতি, তারপর একান্ত সাক্ষাৎ। আর শয়তান তো আদম সন্তানের শিরা-উপশিরায় চলমান। সুতরাং অনেক কথা, হাসি ও আনন্দ আছে, যা নারীর সাথে পুরুষের মনের সম্পর্ক এবং পুরুষের সাথে নারীর মনের সম্পর্ক গড়ে ওঠাকে আবশ্যক করে তুলে, অতঃপর এর ফলে এমন খারাপী ও নষ্টামীর সূচনা হয়, যা প্রতিরোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। আমরা আল্লাহ তা‘আলার নিকট এর থেকে নিরাপত্তা চাই।
৪. পুরুষদের সাথে নারীদের অবাধ মেলামেশা: কারণ, চেহারা খুলে রাখা এবং বেপর্দা অবস্থায় চলাফেরা করার ব্যাপারে নারী যখন নিজেকে পুরুষদের সমান মনে করে, তখন সে পুরুষদের সাথে ধাক্কাধাক্কি ও ঘষাঘষি করা থেকে লজ্জা ও অপমান বোধ করে না, আর এর মধ্যে বড় ধরনের ফিতনা ও প্রচুর পরিমাণে পাপের ব্যাপার রয়েছে
বালআম বাঊরার ঘটনা :
ফিলিস্তীন দখলকারী জাববারীন’ তথা আমালেক্বা সম্প্রদায়ের শক্তিশালী নেতারা মূসা (আঃ) প্রেরিত ১২ জন প্রতিনিধিকে ফেরৎ পাঠিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারেনি। কারণ তারা মূসা (আঃ)-এর মু‘জেযার কারণে ফেরাঊনের সসৈন্যে সাগরডুবির খবর আগেই জেনেছিল। অতএব মূসা (আঃ)-এর বায়তুল মুক্বাদ্দাস অভিযান বন্ধ করার জন্য তারা বাঁকা পথ তালাশ করল। তারা অত্যন্ত গোপনে বনু ইস্রাঈলের ঐ সময়কার একজন নামকরা সাধক ও দরবেশ আলেম বাল‘আম ইবনে বা‘ঊরার (بلعم بن باعوراء) কাছে বহু মূল্যবান উপঢৌকনাদিসহ লোক পাঠাল। বাল‘আম তার স্ত্রীর অনুরোধে তা গ্রহণ করল। অতঃপর তার নিকটে আসল কথা পাড়া হ’ল যে, কিভাবে আমরা মূসার অভিযান ঠেকাতে পারি। আপনি পথ বাৎলে দিলে আমরা আরও মহামূল্যবান উপঢৌকনাদি আপনাকে প্রদান করব। বাল‘আম উঁচুদরের আলেম ছিল। যে সম্পর্কে তার নাম না নিয়েই আল্লাহ বলেন, وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَأَ الَّذِي آتَيْنَاهُ آيَاتِنَا فَانسَلَخَ مِنْهَا فَأَتْبَعَهُ الشَّيْطَانُ فَكَانَ مِنَ الْغَاوِيْنَ- (الأعراف)- আপনি তাদেরকে শুনিয়ে দিন সেই লোকটির অবস্থা, যাকে আমরা আমাদের নিদর্শন সমূহ দান করেছিলাম। অথচ সে তা পরিত্যাগ করে বেরিয়ে গেল। আর তার পিছনে লাগল শয়তান। ফলে সে পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল’ (আ‘রাফ ৭/১৭৫)।
কথিত আছে যে, বাল‘আম ‘ইসমে আযম’ জানত। সে যা দো‘আ করত, তা সাথে সাথে কবুল হয়ে যেত। আমালেক্বাদের অনুরোধ ও পীড়াপীড়িতে সে অবশেষে মূসার বিরুদ্ধে দো‘আ করল। কিন্তু তার জিহবা দিয়ে উল্টা দো‘আ বের হ’তে লাগল যা আমালেক্বাদের বিরুদ্ধে যেতে লাগল। তখন সে দো‘আ বন্ধ করল। কিন্তু অন্য এক পৈশাচিক রাস্তা সে তাদের বাৎলে দিল। সে বলল, বনু ইস্রাঈলগণের মধ্যে ব্যভিচার ছড়িয়ে দিতে পারলে আল্লাহ তাদের উপরে নারায হবেন এবং তাতে মূসার অভিযান বন্ধ হয়ে যাবে’। আমালেক্বারা তার পরামর্শ গ্রহণ করল এবং তাদের সুন্দরী মেয়েদেরকে বনু ইস্রাঈলের নেতাদের সেবাদাসী হিসাবে অতি গোপনে পাঠিয়ে দিল। বড় একজন নেতা এফাঁদে পা দিল। আস্তে আস্তে তা অন্যদের মধ্যেও সংক্রমিত হ’ল। ফলে আল্লাহর গযব নেমে এল। বনু ইস্রাঈলীদের মধ্যে প্লেগ মহামারী দেখা দিল। কথিত আছে যে, একদিনেই সত্তর হাযার লোক মারা গেল। এ ঘটনায় বাকী সবাই তওবা করল এবং প্রথম পথভ্রষ্ট নেতাকে প্রকাশ্যে হত্যা করে রাস্তার উপরে ঝুলিয়ে রাখা হ’ল। অতঃপর আল্লাহর গযব উঠে গেল। এগুলি ইস্রাঈলী বর্ণনা।=(কুরতুবী ও ইবনু কাছীর উভয়ে এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন উক্ত আয়াতের শানে নুযূল হিসাবে। আয়াতের মর্মে বুঝা যায় যে, ঘটনার কিছু সারবত্তা রয়েছে। যদিও সত্য বা মিথ্যা আল্লাহই ভালো জানেন। (উক্ত ঘটনা ইবনে কাসীর 8-11 খণ্ড, 447-456 পৃষ্ঠাতে বিশদভাবে রয়েছে)
যাইফা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, মানুষের হৃদয়ে চাটাইয়ের পাতা (বা ছিলকার) মত একটির পর একটি করে ক্রমান্বয়ে ফিতনা প্রাদুর্ভূত হবে। সুতরাং যে হৃদয়ে সে ফিতনা সঞ্চারিত হবে সে হৃদয়ে একটি কালো দাগ পড়ে যাবে এবং যে হৃদয় তার নিন্দা ও প্রতিবাদ করবে সে হৃদয়ে একটি সাদা দাগ অঙ্কিত হবে। পরিশেষে (সকল মানুষের) হৃদয়গুলি দুই শ্রেণীর হৃদয়ে পরিণত হবে। প্রথম শ্রেণীর হৃদয় হবে মসৃণ পাথরের ন্যায় সাদা; এমন হৃদয় আকাশ-পৃথিবী অবশিষ্ট থাকা অবধি-কাল পর্যন্ত কোন ফিতনা দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। আর দ্বিতীয় শ্রেণীর হৃদয় হবে উবুড় করা কলসীর মত ছাই রঙের; এমন হৃদয় তার সঞ্চারিত ধারণা ছাড়া কোন ভালোকে ভালো বলে জানবে না এবং মন্দকে মন্দ মনে করবে না (তার প্রতিবাদও করবে না)।(মুসলিম হা/১৪৪; মিশকাত হা/৫৩৮০)।
আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, একদা রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা আল্লাহ্ তা’আলাকে যথাযথভাবে লজ্জা কর। আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আমরা তো নিশ্চয়ই লজ্জা করি, সকল প্রশংসা আল্লাহ্ তা’আলার জন্য। তিনি বললেন,
” لَيْسَ ذَاكَ وَلَكِنَّ الاِسْتِحْيَاءَ مِنَ اللَّهِ حَقَّ الْحَيَاءِ أَنْ تَحْفَظَ الرَّأْسَ وَمَا وَعَى وَتَحْفَظَ الْبَطْنَ وَمَا حَوَى وَتَتَذَكَّرَ الْمَوْتَ وَالْبِلَى وَمَنْ أَرَادَ الآخِرَةَ تَرَكَ زِينَةَ الدُّنْيَا فَمَنْ فَعَلَ ذَلِكَ فَقَدِ اسْتَحْيَا مِنَ اللَّهِ حَقَّ الْحَيَاءِ ” ‘তা নয়, বরং আল্লাহ্ তা’আলাকে যথাযথভাবে লজ্জা করার অর্থ এই যে, তুমি তোমার মাথা এবং এর মধ্যে যা কিছু রয়েছে তা সংরক্ষণ করবে এবং পেট ও এর মধ্যে যা কিছু রয়েছে তা হিফাযাত করবে, মৃত্যুকে এবং এরপর পচে-গলে যাবার কথা স্মরণ করবে। আর যে লোক পরকালের আশা করে, সে যেন দুনিয়াবী চাকচিক্যতা পরিহার করে। যে লোক এইসকল কাজ করতে পারে সে-ই আল্লাহ্ তা’আলাকে যথাযথভাবে লজ্জা করে। (আহমাদ হা/৩৬৭১, তিরমিযী হা/২৪৫৮)
পরিবারে একটি ঘটনা ঘটে যাওয়ার পূর্বেই সতর্ক হওয়া প্রয়োজন যেনো নৈতিকতাহীন পরিবেশ সৃষ্টির সুযোগ না আসে। তাই আমাদের শিক্ষা নেয়া প্রয়োজন ইসলামী শরিয়াতে পর্দার যে বিধান দেয়া আছে তার পূর্ন অনুশীলন পরিবারের সকল স্তরের সদস্য ও সদস্যার গুরুত্ব সহকারে যেনো পালন করে।
১২ : ৩১ فَلَمَّا سَمِعَتۡ بِمَكۡرِهِنَّ اَرۡسَلَتۡ اِلَیۡهِنَّ وَ اَعۡتَدَتۡ لَهُنَّ مُتَّكَاً وَّ اٰتَتۡ كُلَّ وَاحِدَۃٍ مِّنۡهُنَّ سِكِّیۡنًا وَّ قَالَتِ اخۡرُجۡ عَلَیۡهِنَّ ۚ فَلَمَّا رَاَیۡنَهٗۤ اَكۡبَرۡنَهٗ وَ قَطَّعۡنَ اَیۡدِیَهُنَّ وَ قُلۡنَ حَاشَ لِلّٰهِ مَا هٰذَا بَشَرًا ؕ اِنۡ هٰذَاۤ اِلَّا مَلَكٌ كَرِیۡمٌ
৩১. অতঃপর স্ত্রীলোকটি যখন তাদের ষড়যন্ত্রের কথা শুনল, তখন সে তাদেরকে ডেকে পাঠাল এবং তাদের জন্য আসন প্রস্তুত করল। আর তাদের সবাইকে একটি করে ছুরি দিল এবং ইউসুফকে বলল, তাদের সামনে বের হও। অতঃপর তারা যখন তাকে দেখল তখন তারা তার সৌন্দর্যে অভিভূত হল ও নিজেদের হাত কেটে ফেলল এবং তারা বলল, অদ্ভুত আল্লাহর মাহাত্ম্য! এ তো মানুষ নয়, এ তো এক মহিমান্বিত ফেরেশতা
এমন মজলিস যে মজলিসে মেহমানদের হেলান দিয়ে বসার জন্য বালিশ সাজানো ছিল। মিসরের প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ ও প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার থেকেও এর সত্যতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। দেখা গেছে তাদের মজলিসে মাহফিলে বালিশের ব্যাপক ব্যবহার ছিল।
মিসরের মহিলাদের পশ্চাতে সমালোচনা এবং নিন্দা ও ভৎর্সনাকে ‘চক্রান্ত’ বলা হয়েছে। যার ফলে কোন কোন তফসীরবিদ বলেছেন যে, শহরের সেই নারীদের নিকটেও ইউসুফ (আঃ)-এর অপরূপ সৌন্দর্যের সংবাদ পৌঁছে গিয়েছিল এবং তারাও কোনক্রমে সেই সৌন্দর্যের অধিকারী (ইউসুফ)-কে দেখতে চাচ্ছিল। সুতরাং তারা তাদের সেই চক্রান্ত (গুপ্ত কৌশলে) কৃতকার্য হয়ে গেল। যেহেতু আযীয-পত্নী এই কথা প্রমাণ করার জন্য সেই মহিলাদেরকে যিয়াফত করল এবং তাদের ভোজনের ব্যবস্থা করল যে, আমি যার প্রতি আসক্তা হয়ে পড়েছি, সে শুধু একজন দাস বা সাধারণ ব্যক্তি নয়; বরং সে বাহ্যিক ও আভ্যন্তরিক এমন অসাধারণ সৌন্দর্যের অধিকারী যে, তাকে দেখে মন মুগ্ধ ও প্রাণ লুণ্ঠিত হওয়া কোন আশ্চর্যের বিষয় নয়।
অর্থাৎ, এমন বসার স্থান নির্দিষ্ট করল, যেখানে হেলান-বালিশ রাখা হয়ে ছিল। যেমন বর্তমানে আরবদের মাঝে এরূপ মজলিস প্রসিদ্ধ আছে, এমনকি হোটেল ও রেস্তরাঁতেও তা রাখা হয়।অর্থাৎ, ইউসুফ (আঃ)-কে প্রথমে আড়ালে রাখা হয়েছিল। অতঃপর যখন উপস্থিত সব মহিলারা (ফল বা অন্য কিছু কেটে খাওয়ার জন্য) ছুরি হাতে নিল, তখন আযীয-পত্নী (যুলাইখা) ইউসুফ (আঃ)-কে উক্ত মজলিসে আসার আদেশ দিল।
অর্থাৎ, ইউসুফের মনোমুগ্ধকর রূপ দেখে প্রথমতঃ তাঁর মাহাত্ম্য ও মর্যাদার কথা স্বীকার করল এবং
দ্বিতীয়তঃ তারা নিজেরা এমন দিশেহারা হয়ে পড়ল যে, (ফল কাটার জায়গায়) নিজ নিজ হাতেই ছুরি চালিয়ে বসল, ফলে তাদের হাত কেটে রক্তাক্ত হয়ে গেল। হাদীসে এসেছে যে, ইউসুফকে (সৃষ্টির) অর্ধেক রূপ দান করা হয়েছিল। (মুসলিমঃ ঈমান অধ্যায়)
এর অর্থ এ নয় যে, ফিরিশতাগণ আকার-আকৃতিতে মানুষ থেকে অধিক সুন্দর। কারণ, ফিরিশতাদেরকে তো মানুষ দেখেইনি। তাছাড়া আল্লাহ তাআলা মানুষ সম্পর্কে নিজেই কুরআন মাজীদে বর্ণনা দিয়েছেন যে, আমি তাদেরকে সুন্দরতম অবয়বে সৃষ্টি করেছি। (সূরা তীন) সেই মহিলাগণ ইউসুফ (আঃ)-কে ‘মানুষ নয়’ এই জন্য বলেছিল যে, তারা তখন যেরূপ সৌন্দর্যের অধিকারী ব্যক্তিকে দেখেছিল, সেরূপ সৌন্দর্যের অধিকারী কোন মানুষকে কখনো দেখেনি এবং তারা এই জন্য তাঁকে ফিরিশতা বলেছিল যে, সাধারণতঃ মানুষ মনে করে যে, ফিরিশতাগণ রূপ ও গুণের দিক থেকে এমন হন, যা মানুষ থেকে ঊর্ধ্বে। এ থেকে বুঝা গেল যে, নবীগণের অসাধারণ বৈশিষ্ট্য ও স্বতন্ত্র গুণাবলীর কারণে তাঁদেরকে মানব-বংশ থেকে বের করে ‘নূরের সৃষ্টি’ বলা সর্বযুগের এমন মানুষদের স্বভাব ছিল, যারা নবুঅত ও তাঁর মর্যাদার ব্যাপারে অজ্ঞ।
১২ : ৩২ قَالَتۡ فَذٰلِكُنَّ الَّذِیۡ لُمۡتُنَّنِیۡ فِیۡهِ ؕ وَ لَقَدۡ رَاوَدۡتُّهٗ عَنۡ نَّفۡسِهٖ فَاسۡتَعۡصَمَ ؕ وَ لَئِنۡ لَّمۡ یَفۡعَلۡ مَاۤ اٰمُرُهٗ لَیُسۡجَنَنَّ وَ لَیَكُوۡنًا مِّنَ الصّٰغِرِیۡنَ
৩২. সে বলল, এ-ই সে যার সম্বন্ধে তোমরা আমার নিন্দা করেছ। আমি তো তার থেকে অসৎকাজ কামনা করেছি। কিন্তু সে নিজেকে পবিত্র রেখেছে; আর আমি তাকে যা আদেশ করেছি সে যদি তা না করে, তবে সে অবশ্যই অবশ্যই কারারুদ্ধ হবে এবং অবশ্যই সে হীনদের অন্তর্ভুক্ত হবে।
আযীয-পত্নী বললঃ দেখে নাও, এ ঐ ব্যক্তি, যার সম্পর্কে তোমরা আমাকে ভর্ৎসনা করতে। বাস্তবিকই আমি তার কাছে নিজেকে সমর্পন করতে চেয়েছিলাম; কিন্তু সে নিষ্পাপ রয়েছে। ভবিষ্যতে সে আমার আদেশ পালন না করলে অবশ্যই কারাগারে প্রেরিত হবে এবং লাঞ্ছিত হবে। কোন কোন মুফাসসির বলেনঃ আযীয-পত্নী এখানে “কিন্তু সে নিজেকে পবিত্র রেখেছে” একথা বলে প্রমাণ করতে চেয়েছে যে, সে বাহ্যিক সৌন্দর্যের সাথে সাথে তার আরো একটি মহা সৌন্দর্য রয়েছে, আর তা হল, আত্মিক পবিত্রতা। যা তোমরা দেখতে পাওনি। [ইবন কাসীর]
আযীয-পত্নী যখন দেখল যে, সমাগত মহিলাদের সামনে তার গোপন ভেদ ফাঁস হয়ে গেছে, তখন সে তাদের সামনেই ইউসুফ আলাইহিস সালাম-কে ভীতি প্রদর্শন করতে লাগল। কোন কোন তাফসীরবিদ বর্ণনা করেছেন যে, তখন আমন্ত্রিত মহিলারা ইউসুফ আলাইহিস সালাম-কে বলতে লাগলঃ তুমি আযীযপত্নীর কাছে ঋণী। কাজেই তার ইচ্ছার অবমাননা করা উচিত নয়। পরবর্তী আয়াতের কোন কোন শব্দ দ্বারাও মহিলাদের উপরোক্ত বক্তব্য সম্পর্কে আভাস পাওয়া যায়; যেমন, يَدْعُونَنِي এবং كَيْدَهُنَّ এগুলোতে বহুবচনে কয়েকজনের কথা বলা হয়েছে। [দেখুন: কুরতুবী]
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এক হাদীস থেকেও আমরা বুঝতে পারি যে, এ আমন্ত্রিত মহিলাগুলো ইউসুফ আলাইহিস সালামকে তার সঙ্কল্প থেকে টলাতে চেষ্টা করেছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মৃত্যু শয্যায় আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে সালাতের ইমামতি করার নির্দেশ দেন। কিন্তু কয়েকজন এ মন্তব্য করল যে, আবু বকর নরম দিল মানুষ। তিনি আপনার জায়গায় দাঁড়ালে কান্না চেপে রাখতে পারবেন না। সুতরাং উমর বা অন্য কাউকে সালাতের ইমামতির জন্য নির্দেশ দেয়া হোক। এভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনবার নির্দেশ দিলেন আর তিনবারই তাকে একথা জানানো হলো। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাগাম্বিত হয়ে বললেনঃ “তোমরা তো দেখছি ইউসুফের সেসব সঙ্গীনিদের মতই। আবু বকরকে বল যেন মানুষদের নিয়ে সালাতে ইমামতি করে।” [বুখারীঃ ৬৪৬, মুসলিমঃ ৪২০]
এ থেকে তদানীন্তন মিসরের উচ্চ ও অভিজাত সমাজে নৈতিকতার অবস্থা কোথায় গিয়ে ঠেকেছিল তা অনুমান করা যায়। একথা সুস্পষ্ট, আযীযের স্ত্রী যেসব মহিলাকে দাওয়াত দিয়েছিল তারা নিশ্চয়ই নগরের আমীর-উমরাহ ও বড় বড় সরকারী কর্মকর্তাদের বেগমই ছিল। এসব উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন ভদ্র মহিলার সামনে সে নিজের প্রিয় যুবককে পেশ করলো। তার সুদর্শন যৌবনোদ্ভিন্ন দেহ সুষমা দেখিয়ে সে তাদের কাছ থেকে এ স্বীকৃতি আদায় করতে চাইলো যে, এমন সুন্দর যুবকের জন্য যদি আমি পাগল না হয়ে যাই তাহলে আর কী হবো! তারপর এসব পদস্থ ব্যক্তিবর্গের স্ত্রী-কন্যারা নিজেদের কাজের মাধ্যমে যেন একথার সত্যতা প্রমাণ করলো যে, সত্যিই এ ধরনের অবস্থায় তাদের প্রত্যেকেই ঠিক তাই করতো যা আযীযের স্ত্রী করেছে। আবার অভিজাত মহিলাদের এ ভরা মজলিসে মেজবান সাহেবা প্রকাশ্যে এ সংকল্প ঘোষণা করতে একটুও লজ্জা অনুভব করলো না যে, যদি এ সুন্দর যুবক তার কামনার ক্রীড়নক হতে রাজি না হয় তাহলে সে তাঁকে কারাগারে পাঠিয়ে দেবে। এ সবকিছুই একথা প্রমাণ করে যে ইউরোপ ও আমেরিকা এবং তাদের প্রাচ্যদেশীয় অন্ধ অনুসারীরা আজ যে নারী স্বাধীনতা এবং নারীদের অবাধ বিচরণ ও মেলামেশাকে বিংশ শতাব্দীর প্রগতিশীলতার অবদান মনে করে থাকে তা আসলে কোন নতুন জিনিস নয়, অনেক পুরাতন, প্রাচীন জিনিস। অতি প্রাচীনকালে দাকিয়ানুসের শাসনেরও বহুশত বছর আগে মিসরে ঠিক একই রকম শান-শওকতের সাথে এর প্রচলন ছিল যেমন আজকের এ “প্রগতিশীলতার” যুগে আছে।
১২ : ৩৩ قَالَ رَبِّ السِّجۡنُ اَحَبُّ اِلَیَّ مِمَّا یَدۡعُوۡنَنِیۡۤ اِلَیۡهِ ۚ وَ اِلَّا تَصۡرِفۡ عَنِّیۡ كَیۡدَهُنَّ اَصۡبُ اِلَیۡهِنَّ وَ اَكُنۡ مِّنَ الۡجٰهِلِیۡنَ
৩৩. ইউসুফ বললেন, হে আমার রব! এ নারীরা আমাকে যার দিকে ডাকছে তার চেয়ে কারাগার আমার কাছে বেশী প্রিয়। আপনি যদি তাদের ছলনা হতে আমাকে রক্ষা না করেন তবে আমি তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ব এবং অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হব।
সে সময় হযরত ইউসুফ যেসব অবস্থার সম্মুখীন হয়েছিলেন এ আয়াতগুলো আমাদের সামনে তার একটি অদ্ভূত চিত্র তুলে ধরেছে। উনিশ বিশ বছরের একটি সুন্দর যুবক। বেদুইন জীবনের উদ্দামতায় লালিত বলিষ্ঠ ও সুঠামদেহী। আত্মীয়-স্বজন থেকে বিচ্ছিন্ন প্রবাস জীবন, দেশান্তর ও বলপূর্বক দাসত্বের পর্যায় অতিক্রম করার পর ভাগ্য তাঁকে দুনিয়ার বৃহত্তম সুসভ্য রাষ্ট্রের রাজধানীতে একজন উচ্চ রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তির বাড়িতে টেনে এনেছে। এখানে এ বাড়ির যে বেগম সাহেবার সাথে সকাল-বিকাল তাঁকে ওঠাবসা করতে হয় সে-ই প্রথমে তাঁর পেছনে লাগে। তারপর তাঁর সৌন্দর্যের আলোচনা ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র রাষ্ট্রে। সারা শহরের অভিজাত পরিবারের মেয়েরা তাঁর প্রেমে হাবুডুবু খেতে থাকে। এখন তাঁর চতুর্দিকে সবসময় শত শত সুন্দর জাল বিছানো থাকে তাঁকে আটকাবার জন্য। তাঁর ভাবাবেগকে উসকিয়ে দেবার এবং তাঁর ধার্মিকতাকে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করার জন্য সব ধরনের কৌশল ও ফন্দি আঁটা হতে থাকে। তিনি যেদিকে যান সেদিকেই দেখতে পান পাপ তার সমস্ত চাকচিক্য ও মোহনীয়তা নিয়ে দরজা উন্মুক্ত করে তাঁর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। অনেকে অসৎ ও অশালীন করার জন্য সুযোগ খুঁজতে থাকে।
কিন্তু এখানে সুযোগই তাঁকে খুঁজে ফিরছে এবং সবসময় ওঁৎ পেতে আছে যখনই তাঁর মনে অসৎকাজের প্রতি সামান্যতম ঝোঁকপ্রবণতা দেখা দেবে তখনই সে তাঁর সামনে নিজেকে পেশ করে দেবে। দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা তিনি এক মহা আতংকের মধ্যে জীবন যাপন করছেন। কখনো মাত্র এক লহমার জন্য যদি তাঁর ইচ্ছা ও সংকল্পের বাঁধন সামান্যতম ঢিলে হয়ে যায় তাহলে পাপের যে অসংখ্য দরজা তাঁর অপেক্ষায় হরহামেশা খোলা আছে তার যে কোন একটির মধ্য দিয়ে তিনি ভেতরে প্রবেশ করে যেতে পারেন।
এ অবস্থায় এ আল্লাহ বিশ্বাসী যুবক যে সাফল্যের সাথে এসব শয়তানী প্ররোচণার মোকাবিলা করেছেন তা এমনিতেই কম প্রশংসনীয় নয়। কিন্তু এ সর্বোচ্চ মানের আত্মসংযমের পরিচয় দেবার পর আত্মোপলব্ধি ও চিন্তার বিশুদ্ধতারও তিনি চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন। এমন নজীরবিহীন পরহেজগারীর দৃষ্টান্ত স্থাপনের পরও তাঁর মনে কখনো এ মর্মে অহমিকা জাগেনি যে, “বাহ! কত মজবুত আমার চরিত্র! এতো সুন্দরী ও যুবতী মেয়েরা আমার প্রেমে পাগলপারা কিন্তু এরপরও আমার পদস্খলন হয়নি।” বরং এর পরিবর্তে তিনি নিজের মানবিক দুর্বলতার কথা চিন্তা করে ভয়ে কেঁপে উঠেছেন এবং অত্যন্ত দ্বীনতার সাথে আল্লাহর কাছে সাহায্যের জন্য আবেদন জানিয়ে বলেছেন, হে আমার রব! আমি একজন দুর্বল মানুষ। এ অসংখ্য অগণিত প্ররোচণার মোকাবিলা করার শক্তি আমার কোথায়! তুমি আমাকে সহায়তা দান করো এবং আমাকে বাঁচাও। আমি ভয় করছি আমার পা পিছলে না যায়— আসলে এটি হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের নৈতিক প্রশিক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সংকটময় অধ্যায় ছিল। বিশ্বস্ততা, আমানতদারী, চারিত্রিক নিষ্কলুষতা, সত্যনিষ্ঠা, অকপটতা, সংযম ও চিন্তার ভারসাম্যের অসাধারণ গুণাবলী এ পর্যন্ত তাঁর মধ্যে সুপ্ত ছিল এবং এ সম্পর্কে তিনি নিজেও বেখবর ছিলেন। এ কঠোর পরীক্ষার যুগে এ গুণগুলো সবই তাঁর মধ্যে বিকশিত হয়ে উঠলো। এগুলো পূর্ণ শক্তিতে কাজ করতে থাকলো। তিনি নিজেও জানতে পারলেন তাঁর মধ্যে কোন্ কোন্ শক্তি আছে এবং তাদেরকে তিনি কোন্ কোন্ কাজে লাগাতে পারেন।
ইউসুফ আলাইহিস সালাম দেখলেন যে, আযীয-পত্নীর চক্রান্তের জাল ছিন্ন করার বাহ্যিক কোন উপায় নেই। এমতাবস্থায় তিনি আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করলেন এবং তার দরবারে আরয করলেনঃ হে আমার পালনকর্তা! এই মহিলারা আমাকে যে কাজের দিকে আহবান করছে, এর চাইতে জেলখানাই আমার অধিক পছন্দনীয়। যদি আপনি আমার থেকে ওদের চক্রান্ত প্রতিহত না করেন, তবে সম্ভবতঃ আমি তাদের দিকে ঝুঁকে পড়ব এবং নির্বুদ্ধিতার কাজ করে ফেলব। এ থেকে আরো জানা গেল যে, আল্লাহ্ তা’আলার সাহায্য ব্যতিরেকে কোন ব্যক্তিই গোনাহ থেকে বাঁচতে পারে না। আরো জানা গেল যে, প্রত্যেক গোনাহর কাজ মূর্খতাবশতঃ হয়ে থাকে। জ্ঞান মানুষকে গোনাহর কাজ থেকে বিরত রাখে। সুতরাং মূর্খতা ও মূর্খ ব্যক্তি নিন্দনীয় [কুরতুবী]
ইউসুফ (আঃ) মনে মনে উক্ত দু’আ করেছিলেন। কারণ মুমিনের জন্য দু’আ একটি হাতিয়ার। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, ‘‘কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা সাত ব্যক্তিকে তাঁর আরশের ছায়ায় স্থান দেবেন। তাদের মধ্যে একজন হল সেই ব্যক্তি, যাকে একজন সুন্দরী ও সম্ভ্রান্ত নারী কুকর্ম করার জন্য আহবান করে। কিন্তু সে তাকে এই বলে উত্তর দেয় যে, আমি আল্লাহকে ভয় করি।’’(বুখারী ও মুসলিম)
রাসূল (ছাঃ) বলেন, যে ব্যক্তি অসৎকর্মের সংকল্প করে, কিন্তু বাস্তবে তা না করে, আল্লাহ তার জন্য একে একটি পূর্ণ নেকীর কাজ হিসাবে লিখে নেন। আর যদি অসৎ কর্মের সংকল্প করার পর তা বাস্তবায়ন করে, তাহ’লে আল্লাহ এর জন্য তার একটি গুনাহ লিখেন (বুখারী হা/৬৪৯১; মিশকাত হা/২৩৭৪)।
১২ : ৩৪ فَاسۡتَجَابَ لَهٗ رَبُّهٗ فَصَرَفَ عَنۡهُ كَیۡدَهُنَّ ؕ اِنَّهٗ هُوَ السَّمِیۡعُ الۡعَلِیۡمُ
৩৪. সুতরাং তার রব তার ডাকে সাড়া দিলেন এবং তাকে তাদের ছলনা হতে রক্ষা করলেন। তিনি তো সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।
রক্ষা করা এ অর্থে যে, ইউসুফ আলাইহিস সালামের সৎচরিত্রকে এমন শক্তিমত্তা ও দৃঢ়তা দান করা হয় যার ফলে তার মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট নারী সমাজের সমস্ত অপকৌশলই ব্যর্থ হয়ে গেছে। তাছাড়া এ অর্থেও রক্ষা করা যে, আল্লাহর ইচ্ছায় কারাগারের দরজা তাঁর জন্য খুলে দেয়া হয়।
আল্লাহ তা‘আলা বলেছেনঃ
﴿وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ فَلْيَسْتَجِيبُواْ لِى وَلْيُؤْمِنُواْ بِى لَعَلَّهُمْ يَرْشُدُونَ﴾
আর যখন বান্দা আমার সম্পর্কে আপনাকে (হে মুহাম্মাদ সাঃ) জিজ্ঞাসা করে, তখন (তাদেরকে বলুন), আমি সত্যিই নিকটে। আমি দু‘আকারীর দু‘আর জবাব দেই যখন সে আমাকে ডাকে। কাজেই তারা আমার ডাকে সাড়া দিক এবং আমার প্রতি ঈমান আনুক যাতে তারা সঠিক পথে পরিচালিত হতে পারে।সুরাহ আল-বাকারাহ ২:১৮৬
আল্লাহ তাআলা অন্যত্র আরও বলেছেন, (তরজমা) তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব। —সূরা মুমিন (৪০) : ৬০
তোমাদের যে নিআমতই অর্জিত হয়, আল্লাহরই পক্ষ হতে হয়। আবার যখন কোনো দুঃখ-কষ্ট তোমাদেরকে স্পর্শ করে তখন তোমরা তাঁরই কাছে সাহায্য চাও। তারপর তিনি যখন তোমাদের কষ্ট দূর করেন, অমনি তোমাদের মধ্য হতে একটি দল নিজ প্রতিপালকের সাথে শিরক শুরু করে দেয়। —সূরা নাহল (১৬) : ৫৩-৫৪
১২ : ৩৫ ثُمَّ بَدَا لَهُمۡ مِّنۡۢ بَعۡدِ مَا رَاَوُا الۡاٰیٰتِ لَیَسۡجُنُنَّهٗ حَتّٰی حِیۡنٍ
৩৫. তারপর বিভিন্ন নিদর্শনাবলী দেখার পর তাদের মনে হল যে, তাকে অবশ্যই কিছু কালের জন্য কারারুদ্ধ করতে হবে।
নির্দোষিতা ও পবিত্রতা প্রকাশ হওয়ার পরেও ইউসুফ (আঃ)-কে জেলখানায় পাঠানোতে আযীযের দৃষ্টিতে এই যুক্তি ও কল্যাণ থাকতে পারে যে, তিনি ইউসুফ (আঃ)-কে তাঁর স্ত্রী থেকে দূরে রাখতে চাচ্ছিলেন, যাতে সে পুনরায় ইউসুফ (আঃ)-কে নিজ প্রেম-জালে ফাঁসানোর চেষ্টা না করতে পারে, যেমন তার ইচ্ছা তাই ছিল।
এভাবে হযরত ইউসুফকে কারাগারে নিক্ষেপ করা আসলে তাঁর নৈতিক বিজয় এবং মিসরের সমগ্র অভিজাত ও শাসক সমাজের চূড়ান্ত নৈতিক পরাজয়ের ঘোষণা ছিল। হযরত ইউসুফ তখন কোন অজ্ঞাতনামা ও অপরিচিত লোক ছিলেন না। সারাদেশে এবং কমপক্ষে তো রাজধানী নগরীতে বিশেষ ও সাধারণ সব মহলেই তিনি পরিচিতি লাভ করেছিলেন। যে ব্যক্তির আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের প্রতি দু’-একটি নয়, অধিকাংশ অভিজাত পরিবারের মহিলা প্রণয়াসক্ত এবং যার মনমাতানো ও চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্যের তীব্র আকর্ষণে নিজেদের দাম্পত্য জীবন ধ্বংস হতে দেখে মিসরের শাসকরা তাঁকে কারাগারে নিক্ষেপ করেই নিজেদের ঘর-দোর সামলাবার ব্যবস্থা করেছিল। এহেন ব্যক্তিত্ব কখনো লোকচক্ষুর অন্তরালে লুকিয়ে থাকতে পারে না, একথা সহজেই অনুমান করা যায়।
নিশ্চয়ই প্রতি ঘরে তাঁর কথা আলোচিত হতো। সাধারণভাবেও লোকেরা নিশ্চয়ই তাঁর অসাধারণ উন্নত, শক্তিশালী ও পবিত্র চরিত্রের কথা জেনে গিয়েছিল। তারা জেনেছিল, এ ব্যক্তিকে তাঁর কোন অপরাধের কারণে কারাগারে পাঠানো হয়নি বরং মিসরের অভিজাত লোকেদের জন্য নিজেদের স্ত্রী-কন্যাদেরকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখার পরিবর্তে এ নিরাপরাধকে কারাগারে পাঠানো সহজ ছিল বলেই তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
এ থেকে একথাও জানা গেলো, কোন ব্যক্তিকে ইনসাফের শর্ত অনুযায়ী আদালতে অপরাধী প্রমাণ না করেই খেয়াল খুশীমত গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া বেঈমান শাসকদের পুরাতন রীতি। এ ব্যাপারেও আজকের শয়তানরা চার হাজার বছর আগের শয়তানদের থেকে খুব বেশী ভিন্নতর নয়। ফারাক কেবল এতটুকুই, তারা “গণতন্ত্রের” নাম নিতো না আর এরা নিজেদের কার্যকলাপের সাথে গণতন্ত্রের নাম নেয়। তারা কোন আইন ছাড়াই বেআইনী কার্যকলাপ করতো। আর এরা প্রত্যেকটি অবৈধ অন্যায় কাজের জন্য প্রথমে একটি “আইন” তৈরী করে নেয়। তারা পরিষ্কারভাবে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য মানুষের ওপর জুলুম অত্যাচার করতো আর এরা যার ওপর জুলুম নির্যাতন চালায় তার সম্পর্কে দুনিয়াবাসীকে বুঝাবার চেষ্টা করে যে, তার কারণে তার নিজের নয় বরং দেশ ও জাতির জন্য আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। মোটকথা, তারা শুধু জালেম ছিল কিন্তু এরা সেই সাথে মিথ্যুক এবং নির্লজ্জও।
কুরআনের সেই অমোঘ বাণীও স্মরণ করা যেতে পারে-
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْۤا اِنْ تَتَّقُوا اللهَ یَجْعَلْ لَّكُمْ فُرْقَانًا وَّ یُكَفِّرْ عَنْكُمْ سَیِّاٰتِكُمْ وَ یَغْفِرْ لَكُمْ وَ اللهُ ذُو الْفَضْلِ الْعَظِیْمِ .
হে ঈমানদারগণ! তোমরা যদি আল্লাহকে ভয় কর, তবে তিনি তোমাদের দান করবেন (সত্য-মিথ্যার মধ্যে) পার্থক্যকারী বস্তু। তোমাদের থেকে তোমাদের গোনাহ দূর করে দেবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করবেন। আর আল্লাহ মহা অনুগ্রহশীল। -সূরা আনফাল (৮) : ২৯
“আল্লাহ যাকে সৎপথ দেখাতে চান, তার অন্তরকে ইসলামের জন্য খুলে দেন, আর যাকে পথভ্রষ্ট করতে চান তার অন্তরকে সংকীর্ণ সংকুচিত করে দেন, (তার জন্য ইসলাম মান্য করা এমনি কঠিন) যেন সে আকাশে আরোহণ করছে। যারা ঈমান আনে না তাদের উপর আল্লাহ এভাবে লাঞ্ছনা চাপিয়ে দেন।” সূরাহ আল-আন‘আম : ১২৫
মুহাম্মাদ ﷺ এর উম্মাতের ৭০ হাজার লোক বিনা হিসাবে জান্নাতে যাবে। তাদের বৈশিষ্ট হলো – তারা সর্বাবস্থায় কেবল আল্লাহর উপরই ভরসা করে। সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৫৭০৫। সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২২০।
.