সূরা আল-জাসিয়া ৪র্থ রুকুঃ (২৭-৩৭)আয়াত

পূর্বাপর প্রসঙ্গ সামনে রেখে বিচার করলে আপনা থেকেই এ আয়াতের যে অর্থ প্রকাশ পায় তা হচ্ছে, যে আল্লাহ এই বিশাল বিশ্বজাহান শাসন করছেন তিনি যে মানুষদেরকে প্রথম বার সৃষ্টি করেছেন পুনরায় তাদেরকে সৃষ্টি করা তাঁর ক্ষমতার অসাধ্য মোটেই নয়।

৩ : ১৮৯ وَ لِلّٰهِ مُلۡكُ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضِ ؕ وَ اللّٰهُ عَلٰی كُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ

 আর আসমান ও যমীনের সার্বভৌম মালিকানা একমাত্র আল্লাহরই; আর আল্লাহ্ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান। আলে ইমরানঃ ১৮৯

جَاثِيَة এর অর্থ নতজানু হয়ে বসা। ভয়ের কারণে এভাবে বসবে। (كُلَّ أُمَّةٍ) (প্রত্যেক দল) শব্দ থেকে বাহ্যতঃ বোঝা যায় যে, মুমিন, কাফের, সৎ ও অসৎ নির্বিশেষে সকলেই হাশরের ময়দানে ভয়ে নতজানু হয়ে বসবে। সেখানে হাশরের ময়দানের এবং আল্লাহর আদালতের এমন ভীতি সৃষ্টি হবে যে, বড় বড় অহংকারীদের অহংকারও উবে যাবে। সেখানে সবাই অত্যন্ত বিনয়ের সাথে নতজানু হবে। কোন কোন আয়াত ও বর্ণনায় রয়েছে যে, হাশরের ময়দানে নবী-রাসূল ও সৎকর্মপরায়ণ ব্যক্তিগণ ভীত হবেন না। এটা আলোচ্য আয়াতের পরিপন্থী নয়; কেননা, অল্প কিছুক্ষণের জন্যে এই ভয় ও ত্রাস নবী-রাসূল ও সৎ লোকদের মধ্যেও দেখা দেয়া সম্ভবপর। কিন্তু যেহেতু খুব অল্প সময়ের জন্যে এই ভয় দেখা দেবে, তাই একে না হওয়ার পর্যায়ে রেখে দেয়া হয়েছে। আবার এটাও সম্ভবপর যে, প্রত্যেক দল বলে অধিকাংশ হাশরবাসী বোঝানো হয়েছে। তাছাড়া كل শব্দটি মাঝে মাঝে অধিকাংশের অর্থেও ব্যবহৃত হয়। [দেখুন: ইবনে কাসীর, কুরতুবী সা’দী]

كتاب বলতে সেই আমলনামা (রেজিষ্টার)-কে বুঝানো হয়েছে, যাতে মানুষের সমস্ত আমল লেখা থাকবে।

 وَوُضِعَ الْكِتَابُ وَجِآئَي بِالنَّبِيِّنَ وَالشُّهَدَاءُ ‘‘আমলনামা সামনে উপস্থিত করা হবে এবং আম্বিয়া ও সাক্ষীগণকে আনা হবে।(যুমারঃ ৬৯)

 এ­­ই আমলনামা মানুষের জীবনের এমন পরিপূর্ণ লিখিত বিবরণ হবে, যাতে কোন প্রকারের কমবেশী হবে না। মানুষ তা দেখে বলে উঠবে,

 مَالِ هَذَا الْكِتَابِ لاَيُغَادِرُ صَغِيْرَةً وَلاَ كَبِيْرَةً اِلاَّ أَحْصَاهَا (الكهف: ৪৯) ‘‘এ কেমন গ্রন্থ! এ তো ছোট-বড় কিছুই বাদ দেয়নি; বরং এ সমস্ত কিছুর হিসাব রেখেছে!’’ (কাহ্ফঃ ৪৯)

 অর্থাৎ, তোমাদের আমল সম্বন্ধে আমার তো জানা আছেই। এ ছাড়াও আমার ফিরিশতাগণ আমার নির্দেশে তোমাদের প্রত্যেকটি কর্মাকর্ম লিপিবদ্ধ করত এবং সুরক্ষিত রাখত।

কুরআন মজীদে বান্দার আমলনামা প্রদান সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ

وَكُلَّ إِنْسَانٍ أَلْزَمْنَاهُ طَائِرَهُ فِي عُنُقِهِ وَنُخْرِجُ لَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ كِتَابًا يَلْقَاهُ مَنْشُورًا * اقْرَأْ كِتَابَكَ كَفَى بِنَفْسِكَ الْيَوْمَ عَلَيْكَ حَسِيبًا

‘প্রত্যেক মানুষের কৃতকর্ম আমি তার গলায় লাগিয়ে দিয়েছি এবং কিয়ামতের দিন আমি তার জন্য বের করব এক কিতাব, যা সে পাবে উন্মুক্ত। আমি বলবঃ তুমি তোমার আমলনামা পাঠ কর। আজ তুমি নিজেই তোমার হিসাব-নিকাশের জন্য যথেষ্ট। ( বনী ইসরাঈলঃ ১৩-১৪) আল্লাহ্ তা’আলা আরও বলেনঃ

وَإِذَا الصُّحُفُ نُشِرَتْ

‘যখন আমলনামাসমূহ প্রকাশ করা হবে। (সূরা তাকভীরঃ ১০) আল্লাহ্ তা’আলা বলেনঃ

وَوُضِعَ الْكِتَابُ فَتَرَى الْمُجْرِمِينَ مُشْفِقِينَ مِمَّا فِيهِ وَيَقُولُونَ يَا وَيْلَتَنَا مَالِ هَذَا الْكِتَابِ لاَ يُغَادِرُ صَغِيرَةً وَلاَ كَبِيرَةً إِلاَّ أَحْصَاهَا وَوَجَدُوا مَا عَمِلُوا حَاضِرًا وَلاَ يَظْلِمُ رَبُّكَ أَحَدًا

‘আর সেদিন আমলনামা উপস্থিত করা হবে। তাতে যা আছে, তার কারণে আপনি অপরাধীদেরকে ভীত-সন্ত্রস্ত দেখবেন। তারা বলবেঃ হায় আফসোস, এ কেমন আমলনামা! এ যে ছোট বড় কোন কিছুই বাদ দেয় নি; সবই এতে রয়েছে। তারা তাদের কৃতকর্মকে সামনে উপস্থিত পাবে। আপনার পালনকর্তা কারো প্রতি যুলুম করবেন না। (সূরা কাহ্ফঃ ৪৯) আল্লাহ তালা আরও বলেনঃ

‘‘অতঃপর যার আমলনামা ডান হাতে দেয়া হবে সে বলবেঃ এসো! তোমরাও আমার আমলনামা পড়ে দেখ। আমি জানতাম যে, আমাকে হিসাবের সম্মুখীন হতে হবে। অতঃপর সে সুখী জীবন যাপন করবে সুউচ্চ জান্নাতে। তার ফলসমূহ অবনমিত থাকবে। বিগত দিনে তোমরা যা প্রেরণ করেছিলে তার প্রতিদান স্বরূপ তোমরা খাও এবং পান কর তৃপ্তি সহকারে। আর যার আমলনামা বাম হাতে দেয়া হবে, সে বলবে হায় আমায় যদি আমলনামা না দেয়া হতো! আমি যদি না জানতাম আমার হিসাব! হায় আমার মৃত্যুই যদি শেষ পরিণতি হত! আমার ধন-সম্পদ আমার কোন উপকারে আসলনা। আমার ক্ষমতাও বরবাদ হয়ে গেল। ফেরেশতাদেরকে বলা হবেঃ একে ধর। অতঃপর গলায় বেড়ি পরিয়ে দাও। অতঃপর নিক্ষেপ কর জাহান্নামে। অতঃপর তাকে এমন শিকল দিয়ে বাঁধ যার দৈর্ঘ হবে সত্তর গজ। নিশ্চয়ই সে মহান আল্লাহতে বিশ্বাসী ছিল না এবং মিসকীনকে খাদ্য দিতে উৎসাহিত করত না। অতএব আজকের দিনে এখানে তার কোন অন্তরঙ্গ বন্ধু থাকবে না এবং কোন খাদ্য নেই ক্ষতমিশ্রিত পুঁজ ব্যতীত। গুনাহগার ব্যতীত কেউ এটা খাবে না। (সূরা আল-হাক্কাহঃ ১৯- ৩৭)

فَأَمَّا مَنْ أُوتِيَ كِتَابَهُ بِيَمِينِهِ

অনন্তর যাকে তার আমলনামা ডান হাতে দেয়া হবে। (সূরা ইনশিকাকঃ ৭)

وَأَمَّا مَنْ أُوتِيَ كِتَابَهُ وَرَاءَ ظَهْرِهِ

‘এবং যাকে তার আমলনামা পিঠের পিছন দিক থেকে দেয়া হবে। (সূরা ইনশিকাকঃ ১০) এখান থেকে বুঝা গেল যে, যার আমলনামা ডান হাতে দেয়া হবে, তাকে সামনের দিক থেকে আমলনামা প্রদান করা হবে। আর যাকে বাম হাতে আমলনামা দেয়া হবে, তাকে পিছনের দিক থেকে আমলনামা দেয়া হবে। আমরা আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।

এখানেও বিশ্বাস ও ঈমানের সাথে সৎকাজ ও নেক আমলের কথা উল্লেখ করে তার গুরুত্বকে স্পষ্ট করা হয়েছে। আর নেক আমল বলা হয় সেই সব সৎকর্মসমূহকে যা (একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে) সুন্নত (নবী (সাঃ)-এর তরীকা) অনুযায়ী সম্পাদন করা হয়। সেই সব কর্মসমূহকে নেক আমল বলা হয় না, যা মানুষ তার নিজের বিবেকে ভাল মনে করে অতি যত্নসহকারে ও বড়ই উদ্দীপনার সাথে সম্পাদন করে। যেমন, অনেক বিদআতী কার্যকলাপ বহু মযহাবপন্থী জামাআতগুলোর মধ্যে প্রচলিত আছে। আর এ কাজগুলোর গুরুত্ব এ জামাআতের মধ্যে ওয়াজিব ও ফরয কাজের থেকেও অনেক বেশী। এই জন্য এরা বহু ফরয ও সুন্নত কাজকে ব্যাপকহারে ত্যাগ করে, কিন্তু বিদআতী কার্যকলাপ করার প্রতি এমন যত্ন নেয় যে, এতে কোন প্রকারের শৈথিল্য ও উদাসীনতার কথা ভাবাই যায় না। অথচ নবী (সাঃ) বিদআতকে شَرُّ الأمُور (সবচেয়ে নিকৃষ্টতম কাজ) গণ্য করেছেন।

 ‘রহমত’ বা করুণা বলতে জান্নাত বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। যেমন, হাদীসে আছে যে, মহান আল্লাহ জান্নাতকে বলবেন, أَنْتِ رَحْمَتِيْ أَرْحَمُ بِكِ مَنْ أَشَاءُ ‘‘তুমি আমার রহমত। তোমার মাধ্যমে (অর্থাৎ, তোমার মধ্যে স্থান দিয়ে) আমি যাকে চাইব রহম করব। (বুখারী, তাফসীর সূরা ক্বাফ)

অহংকার বশতঃ তোমরা মনে করেছিলে আল্লাহর আয়াতসমূহ মেনে নিয়ে অনুগত হয়ে যাওয়া তোমাদের মর্যাদার পরিপন্থী এবং তোমাদের দাসত্ব মর্যাদার অনেক ওপরে।

ইতিপূর্বে ২৪ আয়াতে যাদের কথা বলা হয়েছে তারা ছিল খোলাখুলি ও অকাট্যরূপে আখেরাত অস্বীকারকারী। কিন্তু এখানে যাদের কথা বলা হচ্ছে, তারা আখেরাত সম্পর্কে দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করে না, শুধু একটা ধারণা পোষণ করে এবং এর সম্ভাব্যতা অস্বীকার করে না। বাহ্যত এই দুই গোষ্ঠীর মধ্যে বিরাট পার্থক্য বিদ্যমান। কারণ, একটি গোষ্ঠী আখেরাতকে সম্পর্ণরূপে অস্বীকার করে এবং অপরটি তা সম্ভব বলে ধারণা পোষণ করে। কিন্তু ফলাফল ও পরিণামের দিক দিয়ে এদের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। কেননা, আখেরাত অস্বীকৃতি এবং তার প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস না থাকার নৈতিক ফলাফল প্রায় পুরোপুরি এক। কোন ব্যক্তি, যে আখেরাত মানে না বা বিশ্বাস করে না উভয় অবস্থায় অনিবার্যরূপে তার মধ্যে আল্লাহর সামনে জবাবদিহির অনুভূতি থাকবে না এবং এই অনুভূতিহীনতা অবশ্য তাকে চিন্তা ও কর্মের গোমরাহীর মধ্যে নিক্ষেপ করে ছাড়বে। কেবলমাত্র আখেরাতের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাসই পৃথিবীতে মানুষের ভূমিকা আচার-আচরণ ঠিক রাখতে পারে। এই বিশ্বাস না থাকলে সন্দেহ-সংশয় ও অস্বীকৃতি এ দু’টি তাকে এক প্রকার দায়িত্বহীন আচরণ ও তৎপরতার দিকে ঠেলে দেয়। এই দায়িত্বহীন আচরণ ও তৎপরতাই যেহেতু আখেরাতে মন্দ পরিণামের মূল কারণ তাই না অস্বীকারকারী দোজখ থেকে রক্ষা পাবে, না সন্দেহ পোষণকারী।

দুনিয়াতে যেসব নিয়ম-পদ্ধতি, আচার-আচরণ এবং কাজ-কর্ম ও তৎপরতাকে তারা খুব ভাল বলে মনে করতো তা যে ভাল ছিল না সেখানে তারা তা জানতে পারবে। নিজেদেরকে দায়িত্বহীন মনে করে যে মৌলিক ভুল তারা করেছে, যার কারণে তাদের জীবনের সমস্ত কর্মকাণ্ডই ভ্রান্ত হয়ে গিয়েছে তারা সেখানে তা উপলব্ধি করতে পারবে।

হাদীসে আছে যে, আল্লাহ তাঁর কোন কোন বান্দাকে বলবেন, ‘‘আমি কি তোমাকে স্ত্রী দান করিনি? আমি কি তোমাকে সম্মান দান করিনি? আমি কি ঘোড়া এবং উট ইত্যাদিকে তোমার বশীভূত করে দিইনি? তুমি সর্দারীও করতে এবং করও সংগ্রহ করতে।’’ সে বলবে, ‘হ্যাঁ, এসব ঠিকই তুমি দিয়েছিলে হে আমার প্রতিপালক!’ মহান আল্লাহ তাকে জিজ্ঞাসা করবেন, ‘‘আমার সাথে সাক্ষাৎ করার বিশ্বাস কি তোমার ছিল?’’ সে বলবে, ‘না।’ তখন মহান আল্লাহ বলবেন, (فَالْيَوْمَ أَنْسَاكَ كَمَا نَسِيْتَنِيْ) ‘‘আজ আমি তোমাকে (জাহান্নামে নিক্ষেপ করে) ভুলে যাব, যেমন তুমি আমাকে ভুলে ছিলে। (মুসলিম, কিতাবুয্ যুহদ)

আল্লাহর আয়াতসমূহ ও তাঁর বিধানাদি নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা এবং পার্থিব প্রতারণা ও ধোঁকায় পড়ে থাকা, এ দু’টি এমন অপরাধ যে, এই অপরাধই তোমাদেরকে জাহান্নামের আযাবের উপযুক্ত বানিয়েছে। এখন আর না এখান থেকে বের হওয়া সম্ভব, আর না এই আশা আছে যে, কোন সময়ে তোমাদেরকে তওবা করার সুযোগ দেওয়া হবে এবং তোমরা তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা করে আল্লাহকে রাযী করে নিতে পারবে। আল্লাহ ইরশাদ করেছেন-

৩০ : ১০ ثُمَّ كَانَ عَاقِبَۃَ الَّذِیۡنَ اَسَآءُوا السُّوۡٓاٰۤی اَنۡ كَذَّبُوۡا بِاٰیٰتِ اللّٰهِ وَ كَانُوۡا بِهَا یَسۡتَهۡزِءُوۡنَ

. তারপর যারা মন্দ কাজ করেছিল তাদের পরিণাম হয়েছে মন্দ; কারণ তারা আল্লাহর আয়াতসমূহে মিথ্যা আরোপ করত এবং তা নিয়ে ঠাট্টাবিদ্রুপ করত। সূরা রুমঃ১০

 যেমন, হাদীসে কুদসীতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘‘আল্লাহ আয্যা অজাল্ল্ বলেন, ‘‘গৌরব ও গর্ব খাস আমার গুণ। সুতরাং যে তাতে আমার অংশী হতে চাইবে আমি তাকে শাস্তি দেব। (মুসলিম ২৬২০নং)