أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
اَللّٰهُ الَّذِیۡ سَخَّرَ لَكُمُ الۡبَحۡرَ لِتَجۡرِیَ الۡفُلۡكُ فِیۡهِ بِاَمۡرِهٖ وَ لِتَبۡتَغُوۡا مِنۡ فَضۡلِهٖ وَ لَعَلَّكُمۡ تَشۡكُرُوۡنَ ﴿ۚ۱۲
১২. আল্লাহ, যিনি সাগরকে তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন, যেন তাঁর আদেশে তাতে নৌযানসমূহ চলাচল করতে পারে। আর যেন তোমরা তাঁর অনুগ্রহ তালাশ করতে পার এবং যেন তোমরা (তাঁর প্রতি) কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।
অর্থাৎ, তাকে এমন বানিয়ে দিয়েছেন যেন তার উপর দিয়ে তোমরা নৌকা ও জল-জাহাজের মাধ্যমে সফর করতে পার।
অর্থাৎ, সমুদ্রে নৌকা ও জাহাজসমূহের গমনাগমন তোমাদের কৃতিত্ব ও দক্ষতার ফল নয়, বরং এটা চলে আল্লাহর নির্দেশ ও তাঁর ইচ্ছায়। তা নাহলে তিনি ইচ্ছা করলে সমুদ্র-তরঙ্গে এমন উত্তাল অবস্থা সৃষ্টি করে দেবেন যে, কোন নৌকা ও জাহাজ তার পৃষ্ঠে স্থির থাকতে পারবে না। যেমন কখনো কখনো তিনি তাঁর মহাশক্তির (কিঞ্চিৎ) বিকাশ ঘটানোর জন্য এ রকম করে থাকেন। যদি অব্যাহতভাবে তরঙ্গ উত্তাল অবস্থায় থাকে, তবে তোমরা কখনোও সমুদ্রে সফর করার সুযোগই পাবে না।
অর্থাৎ, সমুদ্র-পথে ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে, সমুদ্রে ডুব মেরে মুক্তা-প্রবালাদি ও অন্যান্য মূল্যবান জিনিস বের করে এবং সমুদ্রস্থিত প্রাণী (মাছ ইত্যাদি) শিকার করে।
এ সব কিছুই এই জন্য করেছেন যে, যাতে তোমরা এই নিয়ামতসমূহের উপর আল্লাহর শুকরিয়া আদায় কর, যে নিয়ামতসমূহ সমুদ্রকে তোমাদের আয়ত্তে করে দেওয়ার ফলে অর্জিত হয়।
পবিত্র কুরআনে ‘অনুগ্রহ তালাশ করা’ এর অর্থ সাধারণত জীবিকা উপার্জনের চেষ্টা প্রচেষ্টা হয়ে থাকে। এখানে এরূপ অর্থ হতে পারে যে, তোমাদেরকে সমুদ্রে জাহাজ চালনার শক্তি দেয়া হয়েছে, যাতে তোমরা ব্যবসা বাণিজ্য করতে পার। এরূপ অর্থও সম্ভবপর যে, সমুদ্রে আমি অনেক উপকারী বস্তু সৃষ্টি করে সমুদ্রকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছি, যাতে তোমরা সেগুলো খোজ করে উপকৃত হও। [দেখুন: তাবারী, সাদী]
فَكُلُوۡا مِمَّا رَزَقَكُمُ اللّٰهُ حَلٰلًا طَيِّبًا وَّاشۡكُرُوۡا نِعۡمَتَ اللّٰهِ اِنۡ كُنۡـتُمۡ اِيَّاهُ تَعۡبُدُوۡنَ
কাজেই আল্লাহ তোমাদেরকে যে সকল বৈধ পবিত্র রিযক দিয়েছেন তা তোমরা খাও আর আল্লাহর অনুগ্রহের শুকরিয়া আদায় কর যদি তোমরা প্রকৃতই তাঁর বন্দেগী করতে ইচ্ছুক হও। নহলঃ১১৪
আল্লাহ তাআলার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়ার নির্দেশ:
فَٱذۡكُرُونِيٓ أَذۡكُرۡكُمۡ وَٱشۡكُرُواْ لِي وَلَا تَكۡفُرُونِ
কাজেই তোমরা আমাকে স্মরণ কর, আমিও তোমাদেরকে স্মরণ করব। আর তোমরা আমার প্রতি কৃতজ্ঞ হও এবং অকৃতজ্ঞ হয়ো না।আল বাক্বারাহ (আয়াত: ১৫২)
আর তোমরা যা চেয়েছ, তার প্রত্যেকটি থেকে তিনি তোমাদের দিয়েছেন এবং যদি তোমরা আল্লাহর নিআমত গণনা কর, তবে তার সংখ্যা নিরূপণ করতে পারবে না। নিশ্চয় মানুষ অধিক অত্যাচারী ও অকৃতজ্ঞ।ইব্রাহীম (আয়াত: ৩৪)
তুমি কি তাদের ব্যাপারে চিন্তা কর না যারা আল্লাহর অনুগ্রহের বিনিময়ে অকৃতজ্ঞতার নীতি অবলম্বন করে আর তাদের জাতিকে ধ্বংসের ঘরে নামিয়ে আনে। জাহান্নামে, যাতে তারা দগ্ধ হবে, আর তা কতইনা নিকৃষ্ট অবস্থান! ইব্রাহীম (আয়াত: ২৮-২৯)
মু‘আয ইবনু জাবাল (রা.) সূত্রে বর্ণিত। একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার হাত ধরে বললেন, হে মু‘আয! আল্লাহর শপথ! আমি অবশ্যই তোমাকে ভালবাসি, আল্লাহর শপথ! আমি অবশ্যই তোমাকে ভালবাসি। তিনি বললেন, হে মু‘আয! আমি তোমাকে ওয়াসিয়াত করছি, তুমি প্রত্যেক সালাতের পর এ দু‘আটি কখনো পরিহার করবে নাঃ ‘‘আল্লাহুম্মা ঈন্নী ‘আলা যিকরিকা ওয়া শুকরিকা ওয়া হুসনি ‘ইবাদাতিকা’’ (অর্থঃ হে আল্লাহ! আপনার স্মরণে, আপনার কৃতজ্ঞতা প্রকাশে এবং আপনার উত্তম ‘ইবাদাতে আমাকে সাহায্য করুন)। অতঃপর মু‘আয (রা.) আস-সুনাবিহী (রহ.)- কে এবং আস-সুনাবিহী ‘আবদুর রহমানকে এরূপ দু‘আ করার ওয়াসিয়াত করেন। (আবু দাউদ ১৫২২)
وَ سَخَّرَ لَكُمۡ مَّا فِی السَّمٰوٰتِ وَ مَا فِی الۡاَرۡضِ جَمِیۡعًا مِّنۡهُ ؕ اِنَّ فِیۡ ذٰلِكَ لَاٰیٰتٍ لِّقَوۡمٍ یَّتَفَكَّرُوۡنَ ﴿۱۳
১৩. আর তিনি তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন আসমানসমূহ ও যমীনের সমস্ত কিছু নিজ অনুগ্রহে, নিশ্চয় এতে অনেক নিদর্শনাবলী রয়েছে, এমন সম্প্রদায়ের জন্য যারা চিন্তা করে।
এ আয়াতাংশের দু’টি অর্থ। একটি অর্থ হচ্ছে, আল্লাহর এই দান দুনিয়ার বাদশাহদের দানের মত নয়। কেননা, তারা প্রজার নিকট থেকে নেয়া সম্পদ প্রজাদেরই কিছু লোককে দান করে থাকে। বিশ্বজাহানের সমস্ত সম্পদ আল্লাহর নিজের সৃষ্টি। তিনি নিজের পক্ষ থেকে তা মানুষকে দান করেছেন।
আরেকটি অর্থ হচ্ছে, এসব নিয়ামত সৃষ্টি করার ব্যাপারে যেমন কেউ আল্লাহর শরীক নয়, তেমনি মানুষের জন্য এগুলোকে অনুগত করার ব্যাপারেও অন্য কোন সত্তার কোনো প্রকার দখল বা কর্তৃত্ব নেই। আল্লাহ একাই এ সবের স্রষ্টা এবং তিনিই নিজের পক্ষ থেকে তা মানুষকে দান করেছেন।
অনুগতকরণে এবং এসব জিনিসকে মানুষের জন্য কল্যাণকর বানানোর মধ্যে চিন্তাশীল লোকদের জন্য বড় বড় নিদর্শন রয়েছে। এসব নিদর্শন পরিষ্কারভাবে এ সত্যের প্রতি ইঙ্গিত দান করছে যে, পৃথিবী থেকে আসমান পর্যন্ত বিশ্বজাহানের সমস্ত বস্তু এবং শক্তির স্রষ্টা, মালিক, প্রশাসক ও ব্যবস্থাপক একমাত্র আল্লাহ, যিনি সব কিছুকেই একটি নিয়ম-বিধির অনুগত করে রেখেছেন এবং সেই আল্লাহই মানুষের রব-যিনি তাঁর অসীম ক্ষমতা, জ্ঞান ও কৌশল এবং রহমতে এসব বস্তু ও শক্তিসমূহকে মানুষের জীবন, জীবিকা, আয়েশ-আরাম, উন্নতি ও তাহযীব-তমদ্দুনের উপযোগী ও সহায়ক বানিয়েছেন এবং একা তিনিই মানুষের দাসত্ব, কৃতজ্ঞতা ও আনুগত্য লাভের অধিকারী। অন্য সত্তাসমূহ এসব বস্তু ও শক্তি সৃষ্টিতে যাদের কোন অংশ নেই কিংবা এসব বস্তু ও শক্তি মানুষের অনুগত করা ও কল্যাণকর বানানোর ক্ষেত্রে যাদের কোন কর্তৃত্ব নেই, মানুষের দাসত্ব, কৃতজ্ঞতা ও আনুগত্য লাভের অধিকারও তাদের নেই।
قُلۡ لِّلَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا یَغۡفِرُوۡا لِلَّذِیۡنَ لَا یَرۡجُوۡنَ اَیَّامَ اللّٰهِ لِیَجۡزِیَ قَوۡمًۢا بِمَا كَانُوۡا یَكۡسِبُوۡنَ ﴿۱۴
১৪. যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে বলুন, তারা যেন ক্ষমা করে ওদেরকে, যারা আল্লাহর দিনগুলোর প্রত্যাশা করে না। যাতে আল্লাহ প্রত্যেক সম্প্রদায়কে তাদের কৃতকর্মের জন্য প্রতিদান দিতে পারেন।
মূল আয়াতাংশ হচ্ছে لِلَّذِينَ لَا يَرْجُونَ أَيَّامَ اللَّهِ। এর শাব্দিক অনুবাদ হবে, “যেসব মানুষ আল্লাহর দিনসমূহের আশা রাখে না।” কিন্তু আরবী বাকরীতিতে এ রকম ক্ষেত্রে اَيَّامঅর্থ শুধু দিন নয়, বরং এমন সব স্মরনীয় দিন যখন গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনাসমূহ সংঘটিত হয়েছে। যেমন اَيَّامُ الْعَرَبْ শব্দ আরব ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলী এবং আরব গোত্রসমূহের এমন সব বড় বড় যুদ্ধ-বিগ্রহ বুঝানোর জন্য বলা হয় যা পরবর্তী বংশধররা শত শত বছর ধরে স্মরণ করে আসছে। এখানে اَيَّامُ الله অর্থ কোন জাতির জীবনের সর্বাধিক অকল্যাণকর দিন, যেদিন তাদের ওপর আল্লাহর গযব নেমে আসে এবং নিজ কৃতকর্মের পরিণামে তাদের ধ্বংস করে দেয়া হয়। এই অর্থ অনুসারে আমরা এই আয়াতাংশের অনুবাদ করেছি, ‘যারা আল্লাহর পক্ষে থেকে ভয়াবহ দিন আসারআশঙ্কা করে না। অর্থাৎ যাদের এ চিন্তা নেই যে, কখনো এমন দিনও আসতে পারে যখন আমাদের এসব কাজ-কর্মের ফলশ্রুতিতে আমাদের জন্য দুর্ভাগ্য নেমে আসবে। এই উদাসীনতাই তাদেরকে জুলুম-অত্যাচারের ব্যাপারে দুঃসাহস যুগিয়েছে।
মুফাসসিরগণ এ আয়াতের দু’টি অর্থ বর্ণনা করেছেন। আয়াতের শব্দাবলী থেকে এ দু’টি অর্থ গ্রহণেরই অবকাশ আছে। একটি অর্থ হচ্ছে, মু’মিনদেরকে এ জালেম গোষ্ঠীর অত্যাচার উপেক্ষা করতে হবে যাতে আল্লাহ তাদেরকে নিজের পক্ষ থেকে তাদের ধৈর্য ও মহানুভবতা এবং শিষ্টাচারের প্রতিদান দেন এবং তারা আল্লাহর পথে যে দুঃখ-কষ্ট বরদাশত করেছে তার পুরস্কার দান করেন।
আরেকটি অর্থ হচ্ছে, মু’মিনগণ যেন, এই গোষ্ঠীকে উপেক্ষা করে যাতে আল্লাহ নিজেই তাদের অত্যাচারের প্রতিফল দান করেন।
কতিপয় মুফাসসির এ আয়াতকে ‘মনসূখ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তারা বলেনঃ যতদিন মুসলমানদের যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হয়নি ততদিন এ আদেশ বহাল ছিল। কিন্তু যুদ্ধের অনুমতি দেয়ার পর এ হুকুম ‘মনসূখ’ হয়ে গিয়েছে। তবে আয়াতের শব্দসমূহ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করলে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, মনসুখ হওয়ার এ দাবী ঠিক নয়। ব্যক্তি যখন কারো জুলুমের প্রতিশোধ গ্রহণ করতে সক্ষম নয় তখন তাকে ক্ষমা করে দেয়া অর্থে এই ‘মাফ’ শব্দটি কখনো ব্যবহৃত হয় না। বরং এক্ষেত্রে ধৈর্য, সহ্য ও বরদাশত শব্দগুলো প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। এ শব্দগুলো বাদ দিয়ে এখানে যখন ‘মাফ’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে তখন আপনা থেকেই তার অর্থ দাঁড়ায় এই যে, প্রতিশোধ গ্রহণের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ঈমানদারগণ সেই সব লোকের জুলুম ও বাড়াবাড়ির জবাব দেয়া থেকে বিরত থাকবে আল্লাহর ব্যাপারে নির্ভীক হওয়া যাদেরকে নৈতিকতা ও মনুষ্যত্বের সীমালংঘনের দুঃসাহস যুগিয়েছে। যেসব আয়াতে মুসলমানদেরকে যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হয়েছে তার সাথে এ নির্দেশের কোন অমিল বা বৈপরীত্য নেই। যুদ্ধের অনুমতি দানের প্রশ্নটি এমন অবস্থার সাথে সম্পর্কিত যখন কোন কাফের কওমের বিরুদ্ধে যথারীতি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মুসলিম সরকারের কাছে যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকে। আর ক্ষমার নির্দেশ এমন সাধারণ পরিস্থিতির সাথে সম্পর্কিত যখন কোন না কোনভাবে মু’মিনদের সম্মুখীন হতে হয় আল্লাহর ভয়ে ভীত নয় এমন সব লোকদের এবং তারা তাদের বক্তব্য, লেখনী ও আচার-আচরণ দ্বারা মু’মিনদেরক নানাভাবে কষ্ট দেয়। এ নির্দেশের উদ্দেশ্য হলো, মুসলমানরা যেন তাদের উচ্চতর আসন থেকে নেমে এসব হীন চরিত্র লোকদের সাথে ঝগড়া-বিবাদে জড়িয়ে পড়ে এবং তাদের প্রতিটি অর্থহীন কাজের জবাব দিতে শুরু না করে। যতক্ষণ পর্যন্ত শিষ্টতা ও যৌক্তিতার সাহায্যে কোন অভিযোগ ও আপত্তির জবাব দেয়া কিংবা কোন জুলুমের প্রতিরোধ করা সম্ভব হয় ততক্ষণ পর্যন্ত তা থেকে বিরত থাকা উচিত নয়। কিন্তু যখনই এ সীমা লংঘিত হবে তখনই সেখানেই ক্ষান্তি দিয়ে ব্যাপারটি আল্লাহর কাছে সোপর্দ করতে হবে। মুসলমানরা নিজেরাই যদি তাদের মোকাবিলায় ময়দানে নেমে পড়ে তাহলে আল্লাহ তাদের সাথে মোকাবিলার ক্ষেত্রে মুসলমানদেরকে তাদের আপন অবস্থার ওপর ছেড়ে দেবেন। কিন্তু তারা যদি ক্ষমা ও উপেক্ষার নীতি অনুসরণ করে তাহলে আল্লাহ নিজেই জালেমদের সাথে বুঝাপড়া করবেন এবং মজলুমদেরকে তাদের ধৈর্য ও মহানুভবতার পুরস্কার দান করবেন।
مَنۡ عَمِلَ صَالِحًا فَلِنَفۡسِهٖ ۚ وَ مَنۡ اَسَآءَ فَعَلَیۡهَا ۫ ثُمَّ اِلٰی رَبِّكُمۡ تُرۡجَعُوۡنَ ﴿۱۵﴾
১৫. যে সৎকাজ করে সে তার কল্যাণের জন্যই তা করে এবং কেউ মন্দ কাজ করলে তা তারই উপর বর্তবে, তারপর তোমাদেরকে তোমাদের রবের দিকেই প্রত্যাবর্তিত করা হবে।
প্রত্যেক দল ও ব্যক্তির কর্ম, ভাল হোক অথবা মন্দ, তার লাভ ও ক্ষতি স্বয়ং কর্তারই; অন্য কারো নয়। এতে সৎকর্মের প্রতি উৎসাহিতও করা হয়েছে এবং অসৎকর্ম থেকে ভীতিপ্রদর্শনও।
তিনি সকলকে তার আমল অনুযায়ী প্রতিদান দেবেন। ভালো লোককে ভালো এবং মন্দলোককে মন্দ।
وَ لَقَدۡ اٰتَیۡنَا بَنِیۡۤ اِسۡرَآءِیۡلَ الۡكِتٰبَ وَ الۡحُكۡمَ وَ النُّبُوَّۃَ وَ رَزَقۡنٰهُمۡ مِّنَ الطَّیِّبٰتِ وَ فَضَّلۡنٰهُمۡ عَلَی الۡعٰلَمِیۡنَ ﴿ۚ۱۶
১৬. আর অবশ্যই আমরা বনী ইসরাঈলকে কিতাব, কর্তৃত্ব ও নবুওয়াত দান করেছিলাম এবং তাদেরকে রিযিক প্রদান করেছিলাম উত্তম বস্তু হতে, আর দিয়েছিলাম তাদেরকে সকল সৃষ্টির উপর শ্রেষ্ঠত্ব।
হুকুম অর্থ তিনটি জিনিস। এক-কিতাবের জ্ঞান ও উপলব্ধি এবং দ্বীনের অনুভূতি। দুই-কিতাবের অভিপ্রায় অনুসারে কাজ করার কৌশল। তিন-বিভিন্ন ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের যোগ্যতা।
অর্থ এ নয় যে, চিরদিনের জন্য সারা দুনিয়ার মানুষের ওপর মর্যাদা দান করেছেন। বরং এর সঠিক অর্থ হচ্ছে, সেই যুগে দুনিয়ার সমস্ত জাতির মধ্য থেকে আল্লাহ বনী ইসরাইলকে এই খেদমতের জন্য বাছাই করে নিয়েছিলেন যে, তারা হবে আল্লাহর কিতাবের ধারক এবং আল্লাহর আনুগত্যের ঝাণ্ডাবাহী।
وَ اٰتَیۡنٰهُمۡ بَیِّنٰتٍ مِّنَ الۡاَمۡرِ ۚ فَمَا اخۡتَلَفُوۡۤا اِلَّا مِنۡۢ بَعۡدِ مَا جَآءَهُمُ الۡعِلۡمُ ۙ بَغۡیًۢا بَیۡنَهُمۡ ؕ اِنَّ رَبَّكَ یَقۡضِیۡ بَیۡنَهُمۡ یَوۡمَ الۡقِیٰمَۃِ فِیۡمَا كَانُوۡا فِیۡهِ یَخۡتَلِفُوۡنَ ﴿۱۷
১৭. আর আমরা তাদেরকে দ্বীনের যাবতীয় বিষয়ে সুস্পষ্ট প্রমাণাদি দান করেছিলাম। তাদের কাছে জ্ঞান আসার পরও তারা শুধু পরস্পর বিদ্বেষবশতঃ মতবিরোধ করেছিল। তারা যে সব বিষয়ে মতবিরোধ করত, নিশ্চয় আপনার রব কিয়ামতের দিন তাদের মধ্যে সে সব বিষয়ে ফয়সালা করে দিবেন।
হালাল ও হারাম বিবৃত স্পষ্ট বিধান। অথবা মু’জিযা ও অলৌকিক ঘটনাবলী। কিংবা নবী (সাঃ)-এর আগমনের জ্ঞান। তাঁর নবী হওয়ার প্রমাণাদি এবং নির্দিষ্টভাবে সেই স্থানের জ্ঞান, যেখানে তিনি হিজরত করে যাবেন।
بَغْيًا بَيْنَهُمْ এর অর্থ, আপোসে একে অপরের প্রতি হিংসা ও বিদ্বেষবশতঃ অথবা খ্যাতি ও পদমর্যাদা লাভের জন্য জ্ঞান আসার পর তারা তাদের দ্বীনের ব্যাপারে মতবিরোধ অথবা রসূল (সাঃ)-এর রিসালাতকে অস্বীকার করল।
হকপন্থীদেরকে উত্তম প্রতিদান এবং বাতিলপন্থীদেরকে মন্দ বদলা দিবেন।
ثُمَّ جَعَلۡنٰكَ عَلٰی شَرِیۡعَۃٍ مِّنَ الۡاَمۡرِ فَاتَّبِعۡهَا وَ لَا تَتَّبِعۡ اَهۡوَآءَ الَّذِیۡنَ لَا یَعۡلَمُوۡنَ ﴿۱۸
১৮. তারপর আমরা আপনাকে প্রতিষ্ঠিত করেছি দ্বীনের বিশেষ বিধানের উপর; কাজেই আপনি তার অনুসরণ করুন। আর যারা জানে না তাদের খেয়াল খুশীর অনুসরণ করবেন না।
ইতিপূর্বে যে কাজের দায়িত্ব বনী ইসরাইলদের ওপর অর্পণ করা হয়েছিলো এখন তার দায়িত্ব তোমাদের ওপর অর্পণ করা হয়েছে। তারা জ্ঞান লাভ করা সত্ত্বেও আত্মস্বার্থের জন্য দ্বীনের মধ্যে এমন মতভেদ সৃষ্টি করে এবং পরস্পর এমন দলাদলিতে লিপ্ত হয়ে পড়ে যার ফলে দুনিয়ার মানুষকে আল্লাহর পথে আহবান জানানোর যোগ্যতাই হারিয়ে বসে। বর্তমানে তোমাদের সেই দ্বীনের সুস্পষ্ট রাজপথের ওপর দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়েছে যাতে তোমরা সেই খেদমত আঞ্জাম দিতে পার যা বনী ইসরাঈলরা পরিত্যাগ করেছে এবং যার যোগ্যতাও তাদের ছিল না। (আরো ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, সূরা আশ শূরা, আয়াত ১৩ থেকে ১৫ এবং টীকা ২০ থেকে ২৬)।
شَرِيعَة শরীয়তের আভিধানিক অর্থ হলঃ রাস্তা, ধর্মাদর্শ, বিধান এবং নিয়ম-পদ্ধতি। রাজপথ বা ‘মেনরোড’কেও شَارع ‘শারে’ বলা হয়। কারণ, তা গন্তব্যস্থানে পৌঁছে দেয়। তাই শরীয়ত বলতে এখানে সেই দ্বীনের বিধানকে বুঝানো হয়েছে, যা আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য নির্দিষ্ট করেছেন। যাতে মানুষ সে পথে চলে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করতে পারে। আয়াতের অর্থ হল, আমি তোমাকে একটি সুস্পষ্ট রাস্তায় বা তরীকায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছি, যা তোমাকে সত্য পর্যন্ত পৌঁছে দেবে।
খেয়াল-খুশির আভিধানিক অর্থ : আরবী هَوٰى শব্দটি هَوِىَ ক্রিয়ার ধাতু। আভিধানিক অর্থ হ’ল, কোন কিছুকে ভালবাসা, কাম্য বস্ত্ত পাওয়ার প্রবল বাসনা। আল-মুগরাব ফী তারতীবিল মু‘রাব ২/৩৯২।
[বাংলা অভিধানে هَوٰى (হাওয়া)-এর প্রতিশব্দ খেয়ালখুশি, নিয়ম ছাড়া ব্যাপার, স্বেচ্ছাচারিতা, খামখেয়ালি, অযৌক্তিক ইচ্ছা, কামনা, বাসনা, প্রবৃত্তি, কুপ্রবৃত্তি, ভোগের পথ ইত্যাদি।বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান।
পরিভাষায় هَوى বা খেয়ালখুশি : উপভোগ্য জিনিসের প্রতি শরী‘আতের কোন অনুমোদন ছাড়াই মনের যে ঝোঁক তৈরী হয় তাকে هَوى বা খেয়ালখুশি বলে। জুরজানী, আত-তা‘রীফাত, পৃঃ ৩২০।
ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেন, কাঙ্ক্ষিত জিনিসের প্রতি মনের ঝোঁককে هوى বা খেয়ালখুশি বলে। এই ঝোঁক মানুষের মাঝে তার অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থেই সৃষ্ট হয়েছে। কেননা তার যদি খাদ্য, পানীয় ও বিবাহ-শাদীর প্রতি ঝোঁক ও আকর্ষণ না থাকত, তাহ’লে সে খানা-পিনা, বিয়ে-শাদী কোনটাই করত না। সুতরাং প্রবৃত্তি মনের চাহিদার প্রতি মানুষকে অনুপ্রাণিত করে। যেমন করে ক্রোধ অপ্রীতিকর জিনিষ থেকে তাকে বিরত রাখে। রাওযাতুল মুহিববীন, পৃঃ ৪৬৯।
একে অপরের সাথে উঠাবসা করলে এবং দীর্ঘদিন কারো সাহচর্যে থাকলে পারস্পরিক ভালবাসা ও সাহায্য-সহযোগিতা বৃদ্ধি পায়। সুতরাং যে প্রবৃত্তির পূজারীদের সঙ্গে একান্তভাবে উঠাবসা করে এবং তাদের সাহচর্যে থাকে সে তাদের দ্বারা অবশ্যই প্রভাবিত হয়। বিশেষ করে যদি সে দুর্বল ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন হয় এবং তার মধ্যে বিচার-বিবেচনা ছাড়াই যে কোন ব্যক্তির দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার প্রবণতা থাকে। এ কারণেই সালাফে ছালেহীন বিদ‘আতী ও প্রবৃত্তির অনুসারীদের সাথে উঠাবসা করতে নিষেধ করতেন।
আবু কিলাবা (রহঃ) বলেছেন, لا تجالسوا أهل الأهواء ولا تجادلوهم فإني لا آمن أن يغمسوكم في الضلالة أو يلبسوا عليكم في الدين بعض ما لبس عليهم ‘তোমরা খেয়াল-খুশি ও প্রবৃত্তির অনুসারীদের সঙ্গে উঠাবসা করো না এবং তাদের সাথে তর্কে লিপ্ত হয়ো না। কেননা আমার ভয় হয় যে, তারা তোমাদেরকে গোমরাহীর মধ্যে ডুবিয়ে দিতে পারে অথবা দ্বীনের কোন কোন বিষয়ে তোমাদেরকে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ফেলে দিতে পারে; যেমনটা তারা নিজেরা দ্বিধাদ্বন্দ্বের শিকার। দারেমী হা/৩৯১, সনদ ছহীহ; আব্দুল্লাহ ইবনু আহমাদ, আস-সুন্নাহ, পৃঃ ৯১।
আর আপনার নিকট জ্ঞান আসার পরও যদি আপনি তাদের খেয়াল খুশির (প্রবৃত্তির) অনুসরণ করেন, তাহলে নিশ্চয় আপনি তখন অত্যাচারীদের অন্তর্ভুক্ত হবেন। আল-বাক্বারা, ২/১৪৫
ইহুদী ও খ্রীষ্টানরা কখনই আপনার প্রতি সন্তুষ্ট হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না আপনি তাদের ধর্মের অনুসরণ করেন। আপনি বলে দিন, নিশ্চয় আল্লাহর হিদায়াত হল সঠিক হিদায়াত আর আপনার কাছে যে জ্ঞান এসে পৌঁছেছে তারপর যদি আপনি তাদের ইচ্ছা-আকাঙ্খাসমূহের (প্রবৃত্তির) অনুসরণ করেন তাহলে আল্লাহর মোকাবিলায় আপনার কোন অভিভাবক ও সাহায্যকারী নেই। আল-বাকারা, ২/১২০
বরং সীমালঙ্ঘনকারীরা কোন জ্ঞান ছাড়াই তাদের খেয়াল-খূশীর অনুসরণ করে কাজেই আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন কে তাকে হিদায়াত করবে? আর তাদের জন্য কোন সাহায্যকারী নাই। আর-রূম, ৩০/২৯
اِنَّهُمۡ لَنۡ یُّغۡنُوۡا عَنۡكَ مِنَ اللّٰهِ شَیۡئًا ؕ وَ اِنَّ الظّٰلِمِیۡنَ بَعۡضُهُمۡ اَوۡلِیَآءُ بَعۡضٍ ۚ وَ اللّٰهُ وَلِیُّ الۡمُتَّقِیۡنَ ﴿۱۹
১৯. নিশ্চয় তারা আল্লাহ্র মুকাবেলায় আপনার কোনই কাজে আসবে না; আর নিশ্চয় যালিমরা একে অন্যের বন্ধু; এবং আল্লাহ মুত্তাকীদের বন্ধু।
যদি তোমরা তাদের সন্তুষ্ট করার জন্য দ্বীনের মধ্যে কোনো প্রকার রদবদল করো তাহলে তারা আল্লাহর সামনে জবাবদিহি থেকে তোমাদেরকে রক্ষা করতে পারবে না।
৬২ اَلَاۤ اِنَّ اَوۡلِیَآءَ اللّٰهِ لَا خَوۡفٌ عَلَیۡهِمۡ وَ لَا هُمۡ یَحۡزَنُوۡنَ ﴿ۚۖ۶۲
১০ : ৬৩ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَ كَانُوۡا یَتَّقُوۡنَ ﴿ؕ۶۳﴾
১০ : ৬৪ لَهُمُ الۡبُشۡرٰی فِی الۡحَیٰوۃِ الدُّنۡیَا وَ فِی الۡاٰخِرَۃِ ؕ لَا تَبۡدِیۡلَ لِكَلِمٰتِ اللّٰهِ ؕ ذٰلِكَ هُوَ الۡفَوۡزُ الۡعَظِیۡمُ ﴿ؕ۶۴﴾
৬২. জেনে রাখা আল্লাহর বন্ধুদের কোন ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না।
৬৩. যারা ঈমান এনেছে এবং তাকওয়া অবলম্বন করত।
৬৪. তাদের জন্যই আছে সুসংবাদ দুনিয়ার জীবনে ও আখিরাতে, আল্লাহর বাণীর কোন পরিবর্তন নেই; সেটাই মহাসাফল্য। সূরা ইউনুসঃ ৬২-৬৪
‘আওলিয়া’ শব্দটি ওলীর বহুবচন। যার আভিধানিক অর্থ হল, নিকটবর্তী। এর পরিপ্রেক্ষিতে আওলিয়াউল্লাহর অর্থ হবে, ঐ সকল নেক ও খাঁটি মু’মিন ব্যক্তিগণ, যাঁরা আল্লাহর আনুগত্য করে এবং তাঁর অবাধ্যতা থেকে দূরে থেকে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। এই জন্য পরের আয়াতে আল্লাহ তাআলা নিজেই এই শব্দ দ্বারা তাঁদের প্রশংসা করেছেন, ‘‘তারা হচ্ছে সেই লোক যারা বিশ্বাস করেছে (ঈমান এনেছে) এবং সাবধানতা (পরহেযগারি) অবলম্বন করে থাকে।’’ আর ঈমান ও পরহেযগারি বা তাকওয়াই হচ্ছে আল্লাহর নৈকট্য লাভের মূল ভিত্তি এবং একমাত্র উপায়। এই হিসাবে সকল মুত্তাকী মু’মিনই হচ্ছে আল্লাহর ওলী (বন্ধু)।
আল্লাহর অলী হওয়ার জন্য একটিই উপায় রয়েছে, আর তা হচ্ছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর রঙে রঞ্জিত হওয়া, তার সুন্নাতের হুবহু অনুসরণ করা। যারা এ ধরনের অনুসরণ করতে পেরেছেন তাদের মর্যাদাই আলাদা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “আল্লাহর এমন কিছু বান্দা রয়েছে যাদেরকে শহীদরাও ঈর্ষা করবে। বলা হলোঃ হে আল্লাহর রাসূল! তারা কারা? হয়ত তাদের আমরা ভালবাসবো। রাসূল বললেনঃ “তারা কোন সম্পদ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ব্যতীতই একে অপরকে একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে ভালবেসেছে। নূরের মিম্বরের উপর তাদের চেহারা হবে নূরের। মানুষ যখন ভীত হয় তখন তারা ভীত হয় না। মানুষ যখন পেরেশান ও অস্থির হয় তখন তারা অস্থির হয় না।” তারপর তিনি এ আয়াত পাঠ করলেন। [ইবনে হিব্বানঃ ৫৭৩, আবু দাউদঃ ৩৫২৭]
هٰذَا بَصَآئِرُ لِلنَّاسِ وَ هُدًی وَّ رَحۡمَۃٌ لِّقَوۡمٍ یُّوۡقِنُوۡنَ ﴿۲۰
২০. এ কুরআন মানুষের জন্য আলোকবর্তিকা এবং হেদায়াত ও রহমত এমন সম্প্রদায়ের জন্য, যারা নিশ্চিত বিশ্বাস করে।
সেই দলীল-সমষ্টি যা দ্বীনের বিধি-বিধান সংবলিত এবং যার সাথে মানুষের যাবতীয় চাহিদা ও প্রয়োজনাদি সম্পৃক্ত। (এটি মানুষের জন্য একটি গাইডবুক ও জীবন-সংবিধান।)
অর্থাৎ, ইহকালে সৎপথ দেখায় এবং পরকালে আল্লাহর করুণার অধিকারী বানায়।
আল্লাহ তাআলা বলেন: “অবশ্যই তোমাদের নিকট আল্লাহর পক্ষ থেকে আলো ও সুস্পষ্ট গ্রন্থ এসেছে। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাদেরকে শান্তির পথ দেখান, যারা তাঁর সন্তুষ্টির অনুসরণ করে এবং তাঁর অনুমতিতে তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করেন। আর তাদেরকে সরল পথের দিকে হেদায়েত দেন।” (সূরা মায়িদাহ : ১৫-১৬)
اَمۡ حَسِبَ الَّذِیۡنَ اجۡتَرَحُوا السَّیِّاٰتِ اَنۡ نَّجۡعَلَهُمۡ كَالَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَ عَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ ۙ سَوَآءً مَّحۡیَاهُمۡ وَ مَمَاتُهُمۡ ؕ سَآءَ مَا یَحۡكُمُوۡنَ ﴿۲۱
২১. নাকি যারা দুষ্কর্ম করেছে তারা মনে করে যে, আমরা জীবন ও মৃত্যুর দিক দিয়ে তাদেরকে ওদের মত গণ্য করব যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে? তাদের বিচার-সিদ্ধান্ত কতই না মন্দ!
আখেরাত সত্য হওয়ার সপক্ষে এটা নৈতিক যুক্তি-প্রমাণ। নৈতিক চরিত্রের ভাল-মন্দ এবং কর্মের মধ্যে সৎ ও অসতের পার্থক্যের অনিবার্য দাবী হলো ভাল মন্দ লোকের পরিণাম এক হবে না বরং এক্ষেত্রে সৎ লোক তার সৎ কাজের ভাল প্রতিদান লাভ করবে এবং অসৎ লোক তার অসৎ কাজের মন্দ ফল লাভ করবে। তা যদি না হয় এবং ভাল ও মন্দের ফলাফল যদি একই রকম হয় সে ক্ষেত্রে নৈতিক চরিত্রের ভাল ও মন্দের পার্থক্যই অর্থহীন হয়ে পড়ে এবং আল্লাহর বিরুদ্ধে বে-ইনসাফর অভিযোগ আরোপিত হয়। যারা পৃথিবীতে অন্যায়ের পথে চলে তারা তো অবশ্যই চাইবে যেন কোনো প্রকার প্রতিদান ও শাস্তির ব্যবস্থা না থাকে। কারণ, এই ধারণাই তাদের আরামকে হারাম করে দেয়। কিন্তু বিশ্বজাহানের রব আল্লাহর যুক্তিপূর্ণ বিধান ও ন্যায় বিচারের নীতির সাথে এটা আদৌ সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় যে, তিনি সৎ ও অসৎ উভয় শ্রেণীর মানুষের সাথে একই রকম আচরণ করবেন এবং সৎকর্মশীল ঈমানদার ব্যক্তিগণ পৃথিবীতে কিভাবে জীবন যাপন করেছে আর কাফের ও ফাসেক ব্যক্তিরা কী বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে তার কিছুই দেখবেন না। এক ব্যক্তি সারা জীবন নিজেকে নৈতিকতার বিধি-বন্ধনে আবদ্ধ রাখলো, প্রাপকদের প্রাপ্য অধিকার দিল, অবৈধ স্বার্থ ও ভোগের উপকরণ থেকে নিজেকে বঞ্চিত রাখলো এবং ন্যায় ও সত্যের জন্য নানা রকম ক্ষতি বরদাশত করলো। আরেক ব্যক্তি সম্ভাব্য সব উপায়ে প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা পূরণ করলো। সে না আল্লাহর অধিকার চিনলো, না বান্দার অধিকার হস্তক্ষেপ থেকে বিরত হল এবং স্বার্থ ও ভোগের উপকরণ যেভাবে সম্ভব দুই হাতে আহরণ করলো। আল্লাহ এই দুই শ্রেণীর মানুষের জীবনের এই পার্থক্য উপেক্ষা করবেন তা কি আশা করা যায়? মৃত্যু পর্যন্ত যাদের জীবন এক রকম হলো না, মৃত্যুর পরে তাদের পরিণাম যদি একই রকম হয় তাহলে আল্লাহর সার্বভৌম কর্তৃত্বের ক্ষেত্রে এর চেয়ে বড় বে-ইনসাফী আর কী হতে পারে? (আরো ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, তাফহীমুল কুরআন, ইউনুস, টীকা ৯ ও ১০; হূদ, টীকা ১০৬; আন নাহল, টীকা ৩৫; আল হাজ্ব, টীকা ৯; আন নামল, টীকা ৮৬; আর রূম, টীকা ৬ থেকে ৮; সূরা সোয়াদ, আয়াত ২৮, টীকা ৩০)।
নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেনঃ যে সত্তার হাতে আমার প্রাণ সেই সত্তার কসম! এই ব্যক্তি আল্লাহর কাছে এমন ইসমে আজমের মাধ্যমে দু’আ করছে যার ওয়াসীলায় দু’আ করা হলে আল্লাহ তা’আলা কবুল করেন এবং যার ওয়াসীলায় যাঞ্চা করা হলে তিনি দান করেন।
اَللّٰهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ بِأَنِّي أَشْهَدُ أَنَّكَ أَنْتَ اللّٰهُ لاَ إِلَهَ إِلاَّ أَنْتَ الأَحَدُ الصَّمَدُ الَّذِي لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ وَلَمْ يَكُنْ لَهُ كُفُوًا أَحَدٌ
উচ্চারণঃ আল্লাহুম্মা ইন্নি আস আলুকা বি আন্নি আশহাদু আন্নাকা আনতাল্ল-হু লা ইলা-হা ইল্লা আনতাল আহাদুস সমাদুল্লাযি লাম ইয়ালিদ ওয়া লাম ইউ-লাদ ওয়া লাম ইয়া কুল্লাহু কুফুওয়ান আহাদ
অর্থঃ হে আল্লাহ আমি তোমার কাছে এই মর্মে সাক্ষ্য দিয়ে প্রার্থনা করছি যে, তুমি আল্লাহ, তুমি ছাড়া কোন ইলাহ নেই যিনি একক ও অদ্বিতীয়, অমুখাপেক্ষী, তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাঁকেও জন্ম দেওয়া হয়নি এবং তাঁর সমতুল্য কেউই নেই। [ তিরমিজি ৩৪৭৫ ]