أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
৭ : ২৬ یٰبَنِیۡۤ اٰدَمَ قَدۡ اَنۡزَلۡنَا عَلَیۡكُمۡ لِبَاسًا یُّوَارِیۡ سَوۡاٰتِكُمۡ وَ رِیۡشًا ؕ وَ لِبَاسُ التَّقۡوٰی ۙ ذٰلِكَ خَیۡرٌ ؕ ذٰلِكَ مِنۡ اٰیٰتِ اللّٰهِ لَعَلَّهُمۡ یَذَّكَّرُوۡنَ ﴿۲۶﴾
২৬. হে বনী আদম! অবশ্যই আমরা তোমাদের জন্য পোষাক নাযিল করেছি, তোমাদের লজ্জাস্থান ঢাকা ও বেশ-ভূষার জন্য। আর তাকওয়ার পোষাক, এটাই সর্বোত্তম। এটা আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্যতম, যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে।
لِبَاسُ التَّقْوَىٰ শব্দ থেকে এদিকেও ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, বাহ্যিক পোষাক দ্বারা গুপ্ত-অঙ্গ আবৃত করা ও সাজ-সজ্জা করার আসল উদ্দেশ্য তাকওয়া ও আল্লাহভীতি। এ আল্লাহভীতি পোষাকের মধ্যেও এভাবে প্রকাশ পায়।
তাই পোষাকে যেন গুপ্তাঙ্গগুলি পুরোপুরি আবৃত হয়। উলঙ্গের মত দৃষ্টিগোচর না হয়।
অহংকার ও গর্বের ভঙ্গিও না থাকা চাই। অপব্যয় না থাকা চাই।
মহিলাদের জন্য পুরুষের পোষাকের মত আর পুরুষের জন্য মহিলাদের পোষাকের মত না হওয়া চাই। পোষাকে বিজাতির অনুকরণ না হওয়া চাই।
এর প্রত্যেকটির ব্যাপারেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদীসে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
এ আয়াতে আল্লাহ তা’আলা সমস্ত আদম সন্তানকে সম্বোধন করে বলেছেনঃ তোমাদের পোষাক আল্লাহ তা’আলার একটি মহান নেয়ামত। একে যথার্থ মূল্য দাও। এখানে মুসলিমদেরকে সম্বোধন করা হয়নি- সমগ্র বনী-আদমকে করা হয়েছে। এতে ইঙ্গিত রয়েছে যে, গুপ্তাঙ্গ আচ্ছাদন ও পোষাক মানব জাতির একটি সহজাত প্রবৃত্তি ও প্রয়োজন। জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সবাই এ নিয়ম পালন করে। অতঃপর এর বিশদ বিবরণে তিন প্রকার পোশাকের উল্লেখ করা হয়েছে।
(এক) (لِبَاسًا يُوَارِي سَوْآتِكُمْ) এখানে يُوَارِي শব্দটি موارة থেকে উদ্ভুত, এর অর্থ আবৃত করা। আর سَوْآت শব্দটি سوءة এর বহুবচন, এর অর্থ মানুষের ঐসব অঙ্গ, যেগুলো খোলা রাখাকে মানুষ স্বভাবতই খারাপ ও লজ্জাকর মনে করে। উদ্দেশ্য এই যে, আমি তোমাদের মঙ্গলার্থে এমন একটি পোষাক সৃষ্টি করেছি, যা দ্বারা তোমরা গুপ্তাঙ্গ আবৃত করতে পার। মুজাহিদ বলেন, আরবের কিছু লোক আল্লাহ্র ঘরের তাওয়াফ উলঙ্গ হয়ে সম্পাদন করত। আবার কোন কোন লোক যে পোষাক পরিধান করে তাওয়াফ করেছে সে পোষাক আর পরিধান করত না। এ আয়াতে তাদেরকেও উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে। [তাবারী]
(দুই) وَرِيشًا সাজ-সজ্জার জন্য মানুষ যে পোষাক পরিধান করে, তাকে ريش বলা হয়। অর্থ এই যে, গুপ্তাঙ্গ আবৃত করার জন্য তো সংক্ষিপ্ত পোষাকই যথেষ্ট হয়; কিন্তু আমি তোমাদেরকে আরো পোষাক দিয়েছি, যাতে তোমরা তা দ্বারা সাজ-সজ্জা করে বাহ্যিক দেহাবয়বকে সুশোভিত করতে পার। ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, এখানে ‘রীশ’ বলে ‘সম্পদ’ বোঝানো হয়েছে। [তাবারী] বাস্তবিকই পোষাক একটি গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান সম্পদ।
(তিন) আয়াতে আল্লাহ তা’আলা তৃতীয় এক প্রকার পোশাকের কথা উল্লেখ করে বলেছেনঃ (وَلِبَاسُ التَّقْوَىٰ ذَٰلِكَ خَيْرٌ) অর্থাৎ তা হচ্ছে তাকওয়ার পোষাক আর এটিই সর্বোত্তম পোষাক। ইবন আব্বাস ও উরওয়া ইবন যুবাইর রাদিয়াল্লাহু আনহুমের তাফসীর অনুযায়ী তাকওয়ার পোষাক বলে সৎকর্ম ও আল্লাহভীতি বুঝানো হয়েছে। এটি মানুষের চারিত্রিক দোষ ও দুর্বলতার আবরণ এবং স্থায়ী কষ্ট ও বিপদাপদ থেকে মুক্তিলাভের উপায়। এ কারণেই এটি সর্বোত্তম পোষাক। কাতাদা বলেন, তাকওয়ার পোষাক বলে ঈমানকে বোঝানো হয়েছে। [তাবারী]
অর্থাৎ মানুষকে এ তিন প্রকার পোষাক দান করা আল্লাহ্ তা’আলার শক্তির নিদর্শনসমূহের অন্যতম- যাতে মানুষ এ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে।
তোমাদের এমন পোশাক দিয়েছেন, যা তোমাদের গরম থেকে বাঁচায় আবার এমন কিছু অন্যান্য পোশাক তোমাদের দিয়েছেন যা পারস্পরিক যুদ্ধে তোমাদের হেফাজত করে। এভাবে তিনি তোমাদের প্রতি তাঁর নিয়ামতসমূহ সম্পূর্ণ করেন, হয়তো তোমরা অনুগত হবে।(সূরা আন-নহলঃ ৮১)
এই আয়াত থেকে পোশাকের চারটি মৌলিক উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানা যায়ঃ
১। লজ্জাস্থান ঢাকা বা অন্তরাল করে।
২। সৌন্দর্য বিধান করে।
৩। তাকওয়া বা আল্লাহভীতির পরিচয় বহন করে।
৪। দেহকে সুরক্ষিত রাখে।
পোষাকের ব্যপারে আরো কিছু নির্দেশনা পাই সহীহ হাদীস থেকে । আমি কয়েকটি আপনাদের সামনে উপস্থাপন করছি।
আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূল(সঃ) বলেছেন, দুই শ্রেণীর দোযখী রয়েছে যাদের আমি দেখিনি। একশ্রেণীর হলো, যাদের কাছে গরুর লেজের মত চাবুক রয়েছে, যা দিয়ে তারা মানুষ মারে। আর দ্বিতীয় শ্রেনী হলো, যে স্ত্রীলোকেরা কাপড় পরেও উলংগ। তারা নিজেরাও বিপথগামী হয়েছে এবং অন্যদেরকেও বিপথগামী করেছে। তাদের মাথা বুখতি উটের কুঁজের মত একদিকে ঝুকানো। তারা না বেহেশতে যেতে পারবে আর না বেহেশতের সুঘ্রাণ পাবে। যদিও এর সুঘ্রাণ বহুদূর থেকে পাওয়া যায়। (সহীহ মুসলিম ৭ম খণ্ড ৫৪১৯)
এখানে এমন পাতলা ও আঁটসাঁট পোষাকের কথা বলা হয়েছে যা পরলেও শরীরের গঠন ও বাঁকসমূহ বাইরে থেকে যে কেউ তাকালেই দেখতে ও বুঝতে পারবে।
ইবনে আব্বাস(রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসূল(সঃ) ঐসব পুরুষকে লা’নত করেছেন, যারা নারীর বেশ ধারণ করে এবং ঐসব নারীকে যারা পুরুষের বেশ ধারণ করে।(সহীহ বুখারী-৫৪৬৫, তিরমিযীঃ ২৭২২)
এখানে লক্ষ্য করুন শুধুমাত্র পোশাকই নয় বরং একলিংগ বিপরীতলিংগের অনুকরণ ও সাদৃশ্যকেও অভিসম্পাত করেছেন। তাই এক ব্যক্তি আয়েশা(রাঃ)-কে পুরুষের জুতা পরিধানকারিণী এক মহিলা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ(সঃ) পুরুষের বেশ ধারনকারিণী মহিলাদের উপর লা’নত করেছেন।(আবু দাউদঃ ৪০৫৫)
এই দুটো হাদীস থেকে জানা যায়-
১। পোশাক পাতলা ও আঁটসাঁট হওয়া যাবে না।
২। পোশাক বিপরীত লিংগের সদৃশ হবে না।
ইবনে উমার(রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূল(সঃ) বলেন, যে ব্যক্তি গর্বভরে নিজের পরিধানের কাপড় মাটিতে হেঁচড়ে টেনে চলে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাঁর দিকে করুণার দৃষ্টিতে তাকাবেন না।(সহীহ মুসলিমঃ ৫২৯৬)
আব্দুল্লাহ ইবনে উমার(রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল(সঃ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি দুনিয়াতে যশ লাভের উদ্দেশ্যে পোশাক পরে কিয়ামতের দিন তাকে অপমানের পোশাক পরাবেন, অতঃপর তাতে অগ্নিসংযোগ করবেন।(সুনানে ইবনে মাজাহঃ ৩৬০৭)
পোষাক কোনভাবেই গর্ব প্রকাশক ও খ্যাতি লাভের মানসে হবে না।
তবে মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূল(সঃ) সুন্দর,পবিত্র পরিচ্ছন্ন পোশাক যা গর্ব প্রকাশক ও খ্যাতি লাভের মানসে না হয় তা অনুমোদন করেন। আনাস(রাঃ) বলেন, রাসূল(সঃ) পুরুষদেরকে জাফরানী রংয়ের কাপড় পরতে নিষেধ করেছেন।(সহীহ বুখারী-৫৪২১)
আলী ইবনে তালিব(রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূল(সঃ) কাসসী(একপ্রকার রেশমী কাপড়), হলুদ বর্ণের কাপড়, সোনার আংটি এবং রুকুতে কুরআন পাঠ নিষেধ করেছেন।(সহীহ মুসলিম ৭ম খণ্ড ৫২৭৬)
জাবির(রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূল(সঃ) বাম হাতে পানাহার করতে, একপায়ে জুতা পরে পথ চলতে, এক কাপড়ে পুরু শরীর ঢাকতে এবং এক কাপড় পরিধান করে হাঁটু পর্যন্ত পেঁচিয়ে বসতে নিষেধ করেছেন। এতে লজ্জাস্থান উন্মুক্ত হয়ে যাওয়ার আশংকা থাকে।(সহীহ মুসলিম ৭ম খণ্ড ৫৩৩৮)
রেশমী কাপড় (সিল্ক), জাফরান রং-এর পোশাক এবং এক কাপড়ের পোশাক যা লজ্জাস্থান দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে তা পুরুষদের জন্য নিষেধ।
আয়েশা(রাঃ ) থেকে বর্ণিত। তিনি ছবিযুক্ত একটি গদি বা আসন খরিদ করলেন। নবী(সঃ) এটি দেখে দরজায় দাঁড়িয়ে গেলেন, ভেতরে প্রবেশ করলেন না। আমি বললাম, আমি আল্লাহর দরবারে আমার গুনাহ থেকে তওবা করছি। তিনি জিজ্ঞেস করলেন এই গদিটি কেন? আমি বললাম, আপনার বসার এবং বালিশ হিসাবে ব্যবহারের জন্য। তিনি বলেন, এসব ছবি যারা তৈরি করেছে,কিয়ামতের দিন তাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে। তাদেরকে বলা হবে, যে জিনিষ তোমরা বানিয়েছ, তাতে জীবন দান করো। ফেরেশতারা কখনো এমন ঘরে প্রবেশ করেন না, যেখানে প্রানীর ছবি থাকে।(সহীহ বুখারী-৫৫২৪)
সুতরাং বোনেরা, আমাদের আরও সচেতন হতে হবে। আমরা অনেক সময় ছোট শিশুদের প্রাণীর ছবিযুক্ত পোশাক কিনে দেই, আমরা উক্ত হাদীসের শিক্ষাকে বাস্তবে আমল করিনা। আবার কিছু ব্যবসায়ী কাপড়ে একধরনের নকশী করিয়ে থাকেন যেখানে হাতি-সাপ-ময়ূর ইত্যাদির ছবি সম্বলিত যা সচেতনভাবে নজর না দিলে বুঝা যাবে না। অথচ এগুলো একশ্রেনীর ব্যক্তিদের পূজার বস্তু।প্রাণীর ছবি সম্বলিত পোশাক পড়া থেকে বিরত থাকা আবশ্যক।
পোশাক যেন অপচয়ের খাতায় নাম না লিখায় সে ব্যপারে সচেতন হতে হবে।
আর নিয়ামতের বহিঃপ্রকাশের বাহানায় আমরা কি অপচয় করে ফেলছি না? এটা কি রাসূল(সঃ) এর আদর্শ? আমাদের আরো সচেতন হওয়া দরকার কারণ সবকিছুরই জবাবদিহি করতে হবে। রাসূল(সঃ) বলেছেন—
কোন মুসলমান অপর মুসলমানকে কাপড় পরতে দিলে সে ততদিন আল্লাহর হেফাযতে থাকে, যতদিন পর্যন্ত সেই কাপড়ের সামান্য অংশও তাঁর শরীরে থাকে।(জামে আত তিরমিযীঃ ২৪২৫)
আবার অনেক মা-বোনেরা কাপড়ের যত্ন করাটাকে মনে করেন ইবাদাতের পরিপন্থি; অথচ, হাদিসে এসেছে-
জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ(রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একবার রাসূল(সঃ) আমাদের কাছে এসে এক ব্যক্তির মাথার চুল আলু-থালু দেখে বলেনঃ এ ব্যক্তির কি চুল আঁচড়ানোর মত কিছু নেই? অপর এক ব্যক্তির পরিধানে ময়লা কাপড় দেখে বলেনঃ সে কি তাঁর কাপড় ধোয়ার জন্য পানি পায় না?(আবু দাউদ শরীফঃ ৪০১৮)
রহমানের বান্দার পরিচয় দিতে গিয়ে মহান আল্লাহ সুবহান বলেছেন-তারা যখন ব্যয় করে তখন অযথা ব্যয় করে না এবং কার্পণ্যও করে না বরং উভয়ের মাঝামাঝি তাদের ব্যয় ভারসাম্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে। (সূরা আল ফুরকানঃ ৬৭)
ইসলামের দৃষ্টিতে তিনটি জিনিষকে অযথা ব্যয় বা অমিতব্যয়িতা বলা হয়।
১। অবৈধ কাজে অর্থ ব্যয় করা, তা একটি পয়সা হলেও
২। বৈধ কাজে ব্যয় করতে গিয়ে নিজের সামর্থ্যের চাইতে বেশী ব্যয় করা
৩। সৎ কাজে মানুষকে দেখানোর জন্য ব্যয় করা (আল্লাহ তা’আলার জন্য নয়)
কার্পণ্য বলে বিবেচিত হয় দুটি জিনিস।
১। মানুষ যখন নিজের ও নিজের পরিবার-পরিজনদের প্রয়োজন পূরণের জন্য নিজের সামর্থ্য ও মর্যাদা অনুযায়ী ব্যয় করে না।
২। ভালো ও সৎ কাজে ব্যয় করে না।
কিন্তু ইসলামের শিক্ষা হলো এই দুয়ের মাঝামাঝি ভারসাম্যের পথ অবলম্বন করা।
আর এভাবেই আমি তোমাদেরকে একটি ‘মধ্যমপন্থী’ উম্মাতে পরিণত করেছি, যেন তোমরা দুনিয়াবাসীদের উপর সাক্ষী হতে পারো এবং রাসূল হতে পারেন তোমাদের ওপর সাক্ষী। (সূরা আল বাকারাঃ ১৪৩)
আবু সাঈদ খুদরী(রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল(সঃ) বলেছেনঃ
নিশ্চয়ই তোমরা তোমাদের পূর্ববর্তীদের আচার-আচরণকে পুরোপুরি অনুকরণ করবে, প্রতি বিঘতে বিঘতে, প্রতি হাতে হাতে। এমনকি তাঁরা যদি গুঁইসাপের গর্তেও প্রবেশ করে থাকে, তাহলে তোমরাও এতে তাদের অনুকরণ করবে। আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! এরা কি ইহুদি ও নাসারা? তিনি বললেন,আর কারা? (সহীহ বুখারী-৩৪৫৬)
আজ মনে হচ্ছে আমরা রাসূলের(সঃ) সেই কথার দিকে, যে ব্যাপারে তিনি আমাদের সচেতন হওয়ার জন্য জানিয়ে গিয়েছেন, সেই দিকেই ধাবিত হচ্ছি। বিজাতীয়দের অনুকরণের জন্য আমরা আমাদের সময় ও অর্থ নষ্ট করে যাচ্ছি।
আব্দুল্লাহ ইবনু উমার(রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল(সঃ) বলেছেনঃ যদি কেউ কোনো সম্প্রদায়ের অনুকরণ করে,তবে সে উক্ত সম্প্রদায়ের অন্তর্ভূক্ত বলে গণ্য হবে। (আবু দাঊদ,আস-সুনান ৪/৪৪)
অন্য ধর্মের ‘নির্দিষ্ট’ চিহ্ন বহন করে যেমন ধূতি, ক্রুশচিহ্ণ ইত্যাদি পরিধান করা যাবে না।
মহান আল্লাহ তা’আলা আমাদের ইসলামের নির্দেশিত মূলনীতিগুলো মেনে চলতে মনের দৃঢ়তা দান করুন।
৭ : ২৭ یٰبَنِیۡۤ اٰدَمَ لَا یَفۡتِنَنَّكُمُ الشَّیۡطٰنُ كَمَاۤ اَخۡرَجَ اَبَوَیۡكُمۡ مِّنَ الۡجَنَّۃِ یَنۡزِعُ عَنۡهُمَا لِبَاسَهُمَا لِیُرِیَهُمَا سَوۡاٰتِهِمَا ؕ اِنَّهٗ یَرٰىكُمۡ هُوَ وَ قَبِیۡلُهٗ مِنۡ حَیۡثُ لَا تَرَوۡنَهُمۡ ؕ اِنَّا جَعَلۡنَا الشَّیٰطِیۡنَ اَوۡلِیَآءَ لِلَّذِیۡنَ لَا یُؤۡمِنُوۡنَ ﴿۲۷﴾
২৭. হে বনী আদম! শয়তান যেন তোমাদেরকে কিছুতেই প্রলুব্ধ না করে যেভাবে সে তোমাদের পিতামাতাকে জান্নাত থেকে বের করেছিল, সে তাদেরকে তাদের লজ্জাস্থান দেখাবার জন্য বিবস্ত্র করেছিল৷ নিশ্চয় সে নিজে এবং তার দল তোমাদেরকে এমনভাবে দেখে যে, তোমরা তাদেরকে দেখতে পাও না। নিশ্চয় আমরা শয়তানকে তাদের অভিভাবক করেছি, যারা ঈমান আনে না।
পবিত্র কোরআনে ‘শয়তান’ (এক বচন) শব্দটি ৬৩ বার আর ‘শায়াতিন’ (বহু বচন) শব্দটি ১৮ বার উল্লেখ করা হয়েছে। পৃথিবীতে শয়তান মুমিনের প্রধান শত্রু। কোরআনের অসংখ্য স্থানে আল্লাহ শয়তান সম্পর্কে মানবজাতিকে সতর্ক করেছেন।
ইরশাদ হয়েছে, ‘আর শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কোরো না; সে নিঃসন্দেহে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৬৮)
অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘হে মুমিনরা! তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কোরো না। নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২০৮)
শয়তান মানুষের এ দুর্বলতা আঁচ করে সর্বপ্রথম হামলা গুপ্তাঙ্গ আচ্ছাদনের উপর করেছে। তাই মানুষের সর্বপ্রথম মঙ্গল বিধানকারী শরীআত গুপ্তাঙ্গ আচ্ছাদনের প্রতি এতটুকু গুরুত্ব আরোপ করেছে যে, ঈমানের পর সর্বপ্রথম ফরয গুপ্তাঙ্গ আবৃত করা। সালাত, সিয়াম ইত্যাদি সবই এরপর।
মানুষের বিরুদ্ধে শয়তানের সর্বপ্রথম আক্রমণের ফলে তার পোষাক খসে পড়েছিল। আজও শয়তান তার শিষ্যবর্গের মাধ্যমে মানুষকে পথভ্রষ্ট করার ইচ্ছায় সভ্যতার নামে সর্বপ্রথম তাকে উলঙ্গ বা অর্ধ-উলঙ্গ করে পথে নামিয়ে দেয়। শয়তানের তথাকথিত প্রগতি নারীকে লজ্জা-শরম থেকে দূরে ঠেলে সাধারণ্যে অর্ধ-উলঙ্গ অবস্থায় নিয়ে আসা ছাড়া অর্জিতই হয় না।
ঈমানদারদেরকে শয়তান ও তার চেলাদের থেকে এই ভয় দেখানো হয়েছে যে, তারা যেন তোমাদের উদাসীনতার সুযোগ গ্রহণ করে তোমাদেরকেও ঐভাবে ফিতনা ও ভ্রষ্টতায় না ফেলে, যেভাবে তোমাদের পিতা-মাতা (আদম ও হাওয়া)-কে জান্নাত থেকে বের করেছিল এবং জান্নাতের পোশাকও খুলে ফেলেছিল; অথচ সে পোশাক দৃষ্টিগোচরও হত না। সুতরাং তার অনিষ্টকারিতা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য অধিক যত্নবান হওয়া এবং কৌশল অবলম্বন করা উচিত।
শয়তান মানুষের সামনে অশ্লীল ও খারাপ জিনিসকে আকর্ষণীয় ও উত্তম হিসেবে পেশ করে। আল্লাহ বলেন, ‘অবশ্যই সে (শয়তান) তোমাদের মন্দ ও অশ্লীল কাজের নির্দেশ দেয়। আর যেন তোমরা আল্লাহর ব্যাপারে এমন কথা বলো যা তোমরা জানো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৬৯)
শয়তানের বংশধর সম্পর্কে আল্লাহ বলেন: ‘তোমরা কি আমার পরিবর্তে তাকে এবং তার বংশধরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করছ? অথচ তারা তোমাদের শত্রু। এটা যালিমদের জন্য খুবই নিকৃষ্ট বদল।’ [কাহফ ১৮/৫০]
সব মানুষের সঙ্গে শয়তান আছে। মহানবী (সা.) বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই, যার সঙ্গে জিন এবং ফেরেশতাদের মধ্য থেকে কাউকে সঙ্গী নিযুক্ত করা হয়নি।’ সাহাবারা বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আপনার সঙ্গেও কি জিন সঙ্গী নিযুক্ত আছে? রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, হ্যাঁ, আমার সঙ্গেও আছে। তবে আল্লাহ তাআলা তার ওপর আমাকে বিজয়ী করেছেন, ফলে সে আমার অনুগত হয়ে গেছে। সে আমাকে কল্যাণকর কাজ ছাড়া অন্য কোনো কাজের পরামর্শ দেয় না।’ (সহিহ মুসলিম)
৭ : ২৮ وَ اِذَا فَعَلُوۡا فَاحِشَۃً قَالُوۡا وَجَدۡنَا عَلَیۡهَاۤ اٰبَآءَنَا وَ اللّٰهُ اَمَرَنَا بِهَا ؕ قُلۡ اِنَّ اللّٰهَ لَا یَاۡمُرُ بِالۡفَحۡشَآءِ ؕ اَتَقُوۡلُوۡنَ عَلَی اللّٰهِ مَا لَا تَعۡلَمُوۡنَ ﴿۲۸﴾
(২৮) যখন তারা কোন অশ্লীল আচরণ করে, তখন বলে, ‘আমরা আমাদের পূর্বপুরুষগণকে এটা করতে দেখেছি এবং আল্লাহও আমাদেরকে এর নির্দেশ দিয়েছেন।’ বল, ‘আল্লাহ অশ্লীল আচরণের নির্দেশ দেন না। তোমরা কি আল্লাহ সম্বন্ধে এমন কিছু বলছ, যে বিষয়ে তোমাদের কোন জ্ঞান নেই?
فحشاء، فحش ও فاحشة এমন প্রত্যেক মন্দ কাজকে বলা হয়, যা চূড়ান্ত পর্যায়ের মন্দ এবং যুক্তি, বুদ্ধি ও সুস্থ বিবেকের কাছে পূর্ণমাত্রায় সুস্পষ্ট। [ফাতহুল কাদীর]
ইসলামের পূর্বে মুশরিকরা উলঙ্গ অবস্থায় বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করত এবং বলত যে, আমরা সেই সময়ের অবস্থাকে অবলম্বন করে তাওয়াফ করি, যে অবস্থায় আমাদের মায়েরা আমাদেরকে প্রসব করেছিল। কেউ কেউ বলেছেন, তারা এর (উলঙ্গ অবস্থায় তাওয়াফ করার) ব্যাখ্যা এই করত যে, আমরা যে পোশাক পরে থাকি তাতে আমরা আল্লাহর অবাধ্যতার কাজ অনেক করি। অতএব, এই পোশাকে তাওয়াফ করা উচিত নয়। তাই পোশাক খুলে তাওয়াফ করত এবং মহিলারাও উলঙ্গ তাওয়াফ করত। কেবল নিজেদের লজ্জাস্থানের উপর কাপড়ের অথবা চামড়ার কোন টুকরা রেখে নিত। নিজেদের এই লজ্জাকর কাজের জন্য আরো দু’টি ওজুহাত তারা পেশ করত। একটি হল, আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে এইভাবে করতে দেখেছি।
আর দ্বিতীয়টি হল, আল্লাহই আমাদেরকে এর নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা তাদের কথা খন্ডন করে বলেন, এটা কিভাবে সম্ভব যে, তিনি নির্লজ্জতার নির্দেশ দেবেন? অর্থাৎ, তোমরা আল্লাহর উপর এমন কথা চাপিয়ে দিচ্ছ, যা তিনি বলেননি। এই আয়াতে সেই অন্ধ অনুকরণকারীদেরকে কঠোরভাবে তিরস্কার করা হয়েছে, যারা বাপ-দাদা ও পীর-বুযুর্গদের অন্ধ অনুকরণ এবং ব্যক্তিপূজায় ডুবে রয়েছে। তাদেরকেও যখন হক কথা শুনানো হয়, তখন তারাও এই ওজুহাত পেশ করে বলে যে, আমাদের বুযর্গরা এইভাবেই করেছেন অথবা আমাদের ইমাম, পীর বা শায়খের এটাই নির্দেশ। আর এটাই হল এমন অভ্যাস, যার কারণে ইয়াহুদীরা ইয়াহুদী ধর্মের উপর, খ্রিষ্টানরা খ্রিষটধর্মের উপর এবং বিদআতীরা তাদের বিদআতী কার্যকলাপের উপর কায়েম রয়েছে। (ফাতহুল ক্বাদীর)
৭ : ২৯ قُلۡ اَمَرَ رَبِّیۡ بِالۡقِسۡطِ ۟ وَ اَقِیۡمُوۡا وُجُوۡهَكُمۡ عِنۡدَ كُلِّ مَسۡجِدٍ وَّ ادۡعُوۡهُ مُخۡلِصِیۡنَ لَهُ الدِّیۡنَ ۬ؕ كَمَا بَدَاَكُمۡ تَعُوۡدُوۡنَ ﴿ؕ۲۹﴾
২৯. বলুন, আমার রব নির্দেশ দিয়েছেন ন্যায়বিচারের। আর তোমরা প্রত্যেক সাজদাহ বা ইবাদতে তোমাদের লক্ষ্য একমাত্র আল্লাহকেই নির্ধারণ কর এবং তারই আনুগত্যে বিশুদ্ধচিত্ত হয়ে একনিষ্ঠভাবে তাকে ডাক। তিনি যেভাবে তোমাদেরকে প্রথমে সৃষ্টি করেছেন তোমরা সেভাবে ফিরে আসবে
এ আয়াতে বলা হয়েছে যে, যেসব মূখ উলঙ্গ তাওয়াফ বৈধ করার ভ্রান্ত সম্বন্ধ আল্লাহর দিকে করে, আপনি তাদের বলে দিনঃ আল্লাহ্ তা’আলা সর্বদা قسط এর নির্দেশ দেন। قسط এর আসল অর্থ ন্যায়বিচার ও সমতা। এখানে ঐ কাজকে বুঝানো হয়েছে, যাতে কোনরূপ ক্রটিও নেই এবং নির্দিষ্ট সীমার লঙ্ঘনও নেই। অর্থাৎ স্বল্পতা ও বাহুল্য থেকে মুক্ত। শরীআতের সব বিধি-বিধানের অবস্থা তাই। এজন্য قسط শব্দের অর্থে যাবতীয় ইবাদাত, আনুগত্য ও শরীআতের সাধারণ বিধিবিধান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এখানে ইবাদতের সময় সবকিছু বাদ দিয়ে কেবলমাত্র ইখলাসের সাথে আল্লাহকে উদ্দেশ্য নিতে বলা হয়েছে। বিশেষ করে মসজিদসমূহে যখন ইবাদত করা হয়। [মুয়াসসার] ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, এ আয়াতে কিয়ামুল ওয়াজহ বলে অন্য আয়াত ‘ওয়াজ্জাহতু ওয়াজহিয়া’ যা বুঝানো হয়েছে, তাই বোঝানো হয়েছে। এ সবের অর্থ হচ্ছে, ইখলাসের সাথে যাবতীয় ইবাদত কেবল আল্লাহর উদ্দেশ্যে সম্পাদন করা। [ইসতিকামাহ ২/৩০৬] এখানে আরও একটি বিষয় স্পষ্ট হচ্ছে যে, ইবাদতের জন্য বিশেষ করে ইখলাসের সাথে ইবাদতের জন্য সবচেয়ে উত্তম স্থান হচ্ছে মাসজিদ, মাযার নয়। যেমনটি কোন কোন মানুষ মনে করে থাকে। [ইবন তাইমিয়্যাহ, ইকতিদায়ুস সিরাতিল মুস্তাকীম ১/৩৯২] মুজাহিদ রাহিমাহুল্লাহ আয়াতের অর্থে বলেন, ‘তোমরা তোমাদের চেহারাকে প্রতিটি মসজিদেই কিবলামুখী কর, যেখানেই সালাত আদায় কর না কেন’। [আত-তাফসীরুস সহীহ]
অর্থাৎ আল্লাহ তা’আলাকে এমনভাবে ডাক, যেন ইবাদাত খাঁটিভাবে তারই জন্য হয়; এতে যেন অন্য কারো অংশীদারিত্ব না থাকে; এমন কি গোপন শির্ক অর্থাৎ লোক দেখানো ও নাম-যশের উদ্দেশ্য থেকেও পবিত্র হওয়া চাই। এতে বোঝা গেল যে, বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ উভয় অবস্থাকেই শরীআতের বিধান অনুযায়ী সংশোধন করা অবশ্য কর্তব্য। আন্তরিকতা ব্যতীত শুধু বাহ্যিক আনুগত্যই যথেষ্ট নয়। এমনিভাবে শুধুমাত্র আন্তরিকতাও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরী’আতের অনুসরণ ব্যতীত গ্রহনযোগ্য নয়।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ হে লোক সকল! তোমরা আল্লাহর দিকে জমায়েত হবে খালি পা, কাপড় বিহীন, খতনাবিহীন অবস্থায়। তারপর তিনি বললেনঃ “তিনি যেভাবে প্রথমে তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন তোমরা সেভাবে ফিরে আসবে” এখান থেকে আয়াতের শেষ পর্যন্ত পড়লেন। তারপর বললেনঃ মনে রেখ! কেয়ামতের দিন প্রথম যাকে কাপড় পরানো হবে, তিনি হলেন ইবরাহীম। মনে রেখ! আমার উম্মতের কিছু লোককে নিয়ে আসা হবে তারপর তাদেরকে বাম দিকে নিয়ে যাওয়া হবে।
তখন আমি বলবঃ হে রব! এরা আমার প্রিয় সাথীবৃন্দ। তখন বলা হবেঃ আপনি জানেন না তারা আপনার পরে কি নতুন পদ্ধতির আবিস্কার করেছে। তারপর আমি তা বলব যা নেক বান্দা বলেছিল, “আর আমি তাদের মাঝে যতদিন ছিলাম তাদের উপর সাক্ষী ছিলাম, তারপর যখন আপনি আমাকে মৃত্যু দেন আপনিই তো তখন তাদের উপর খবরদার ছিলেন” তখন বলা হবেঃ আপনি তাদের কাছ থেকে চলে আসার পর থেকেই এরা তাদের পিছনে ফিরে গিয়েছিল। [বুখারীঃ ৪৬২৫, মুসলিমঃ ২৮৫৯]
৩৯ : ১১ قُلۡ اِنِّیۡۤ اُمِرۡتُ اَنۡ اَعۡبُدَ اللّٰهَ مُخۡلِصًا لَّهُ الدِّیۡنَ ﴿ۙ۱۱﴾
বলুন, আমি তো আদেশপ্রাপ্ত হয়েছি, আল্লাহর আনুগত্যে একনিষ্ঠ হয়ে তাঁর ‘ইবাদাত করতে; সূরা যুমারঃ ১১ বল, ‘আমার রব ন্যায়বিচারের নির্দেশ দিয়েছেন আর তোমরা প্রত্যেক সিজদার সময় তোমাদের চেহারা সোজা রাখবে এবং তাঁরই ইবাদাতের জন্য একনিষ্ঠ হয়ে তাঁকে ডাক। যেভাবে তিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, সেভাবে তোমরা প্রথমে ফিরে আসবে। (০৭. আরাফ ২৯)
আর তাদেরকে কেবল এ নির্দেশই প্রদান করা হয়েছিল যে, তারা যেন আল্লাহর ইবাদত করে তাঁরই জন্য দ্বীনকে একনিষ্ঠ করে এবং সালাত কায়েম করে ও যাকাত প্রদান করে। আর এটাই সঠিক দ্বীন। সূরা বাইয়্যেনাহঃ ৫
৭ : ৩০ فَرِیۡقًا هَدٰی وَ فَرِیۡقًا حَقَّ عَلَیۡهِمُ الضَّلٰلَۃُ ؕ اِنَّهُمُ اتَّخَذُوا الشَّیٰطِیۡنَ اَوۡلِیَآءَ مِنۡ دُوۡنِ اللّٰهِ وَ یَحۡسَبُوۡنَ اَنَّهُمۡ مُّهۡتَدُوۡنَ ﴿۳۰﴾
(৩০) একদলকে তিনি সৎপথে পরিচালিত করেছেন এবং সঙ্গত কারণেই অপর দলের পথভ্রান্তি নির্ধারিত হয়েছে। তারা আল্লাহকে ছেড়ে শয়তানদেরকে নিজেদের অভিভাবক (বা বন্ধু)রূপে গ্রহণ করেছে এবং তারা ধারণা করছে যে, তারাই সৎপথগামী।
এ আয়াতের সমর্থনে আরও আয়াত ও অনেক হাদীস এসেছে। সূরা আত-তাগাবুনের ২নং আয়াতেও আল্লাহ তা’আলা এ কথাটি স্পষ্ট করে দিয়েছেন। এটা তাকদীরের সাথে সংশ্লিষ্ট। অর্থাৎ আল্লাহ্ তা’আলা সমস্ত মানুষকে কাফের ও মুমিন এ দু’ভাগে ভাগ করেছেন। কিন্তু মানুষ জানেনা সে কোনভাগে। সুতরাং তার দায়িত্ব হবে কাজ করে যাওয়া। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিভিন্ন হাদীসেও তা বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমাদের কেউ কেউ এমন কাজ করে যে, বাহ্য দৃষ্টিতে সে জান্নাতের অধিবাসী অথচ সে জাহান্নামী। আবার তোমাদের কেউ কেউ এমন কাজ করে যে, বাহ্য দৃষ্টিতে মনে হয় সে জাহান্নামী অথচ সে জান্নাতী। কারণ মানুষের সর্বশেষ কাজের উপরই তার হিসাব নিকাশ। [বুখারীঃ ২৮৯৮, ৪২০২, মুসলিমঃ ১১২, আহমাদ ৫/৩৩৫]
অন্য হাদীসে এসেছে, প্রত্যেক বান্দাহ পুনরুত্থিত হবে সেটার উপর যার উপর তার মৃত্যু হয়েছে। [মুসলিমঃ ২৮৭৮]
আয়াতে আল্লাহ্ তা’আলা এটা বর্ণনা করেছেন যে, কাফেররা শয়তানদেরকে তাদের অভিভাবক বানিয়েছে। তাদের এ অভিভাবকত্বের স্বরূপ হচ্ছে যে, তারা আল্লাহর শরীআতের বিরোধিতা করে শয়তানের দেয়া মত ও পথের অনুসরণ করে থাকে। তারপরও মনে করে থাকে যে, তারা হিদায়াতের উপর আছে।
অন্য আয়াতে যারা এ ধরণের কাজ করবে তাদেরকে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বলে ঘোষণা করা হয়েছে। “বলুন, আমরা কি তোমাদেরকে সংবাদ দেব কাজে বিশেষ ক্ষতিগ্রস্তদের? ওরাই তারা, পার্থিব জীবনে যাদের প্রচেষ্টা পণ্ড হয়, যদিও তারা মনে করে যে, তারা সৎকাজই করছে।” [সূরা আল-কাহাফ: ১০৩–১০৪] [আদওয়াউল বায়ান]
মূলতঃ শরীআতের বিধি-বিধান সম্পর্কে মূর্খতা ও অজ্ঞতা কোন স্থায়ী ওযর নয়। যদি কেউ ভ্রান্ত পথকে বিশুদ্ধ মনে করে পূর্ণ আন্তরিকতা সহকারে তা অবলম্বন করে, তবে সে আল্লাহর কাছে ক্ষমার যোগ্য নয়। কেননা, আল্লাহ্ তা’আলা প্রত্যেককে চেতনা, ইন্দ্রিয় এবং জ্ঞান বুদ্ধি এ জন্যই দিয়েছেন, যাতে সে তা দ্বারা আসল ও মেকী এবং অশুদ্ধ ও শুদ্ধকে চিনে নেয়। অতঃপর তাকে এ জ্ঞান বুদ্ধির উপরই ছেড়ে দেননি, নবী প্রেরণ করেছেন এবং গ্রন্থ নাযিল করেছেন। এসবের মাধ্যমে শুদ্ধ ও ভ্রান্ত এবং সত্য ও মিথ্যাকে পুরোপুরিভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
৭ : ৩১ یٰبَنِیۡۤ اٰدَمَ خُذُوۡا زِیۡنَتَكُمۡ عِنۡدَ كُلِّ مَسۡجِدٍ وَّ كُلُوۡا وَ اشۡرَبُوۡا وَ لَا تُسۡرِفُوۡا ۚ اِنَّهٗ لَا یُحِبُّ الۡمُسۡرِفِیۡنَ ﴿۳۱
৩১. হে বনী আদম! প্রত্যেক সালাতের সময় তোমরা সুন্দর পোশাক গ্রহন কর। আর খাও এবং পান কর কিন্তু অপচয় কর না। নিশ্চয় তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না।
আয়াতে পোষাককে ‘যীনাত’ বা ‘সাজ-সজ্জা’ শব্দের মাধ্যমে এ জন্যই ব্যক্ত করা হয়েছে যে, সালাতে শধু গুপ্ত অঙ্গ আবৃত করা ছাড়াও সামথ্য অনুযায়ী সাজ-সজ্জার পোষাক পরিধান করা শ্ৰেয়। হাসান রাদিয়াল্লাহু আনহু সালাতের সময় উত্তম পোষাক পরিধানে অভ্যস্ত ছিলেন। তিনি বলতেনঃ ‘আল্লাহ্ তা’আলা সৌন্দর্য পছন্দ করেন, তাই আমি প্রতিপালকের সামনে সুন্দর পোষাক পরে হাজির হই’। যে গুপ্ত-অঙ্গ সর্বাবস্থায় বিশেষতঃ সালাত ও তাওয়াফে আবৃত করা ফরয, তার সীমা কি? কুরআনুল কারীম সংক্ষেপে গুপ্ত-অঙ্গ আবৃত করার নির্দেশ দিয়ে এর বিবরণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন যে, পুরুষের গুপ্তাঙ্গ নাভী থেকে হাটু পর্যন্ত এবং মহিলাদের গুপ্তাঙ্গ মুখমন্ডল, হাতের তালু এবং পদযুগল ছাড়া সমস্ত দেহ।
হাদীসসমূহে এসব বিবরণ বর্ণিত রয়েছে। এ হচ্ছে গুপ্ত অঙ্গের ফরয সম্পর্কিত বিধান। এটি ছাড়া সালাতই হয় না। সালাতে শুধু গুপ্ত অঙ্গ আবৃত করাই কাম্য নয়; বরং সাজ-সজ্জার পোষাক পরিধান করতেও বলা হয়েছে। যেমন সাদা পোষাক, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের পোষাকাদির মধ্যে সাদা পোষাক পরিধান কর। কেননা, পোষাকাদির মধ্যে তাই উত্তম পোষাক। আর এতে তোমাদের মৃতদেরকে কাফনও দাও। [আবু দাউদঃ ৩৮৭৮, তিরমিযীঃ ৯৯৪, ইবন মাজাহঃ ১৪৭২]
অনেকে সাজসজ্জার পোষাক পরাকে অহংকারী পোষাক মনে করে থাকে এটা আসলে ঠিক নয়। এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যার অন্তরে অনু পরিমাণ অহংকার থাকবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। এক লোক বললঃ কোন লোক পছন্দ করে তার পোষাক উত্তম হোক, তার জুতা সুন্দর হোক। রাসূল বললেনঃ অবশ্যই আল্লাহ সুন্দর, সুন্দরকে ভালবাসেন। অহংকার হল, হককে না মানা, মানুষকে অবজ্ঞা করা। [মুসলিমঃ ১৪৭] আবার অহংকার হয় এমন পোষাকও পরা যাবে না যদিও তাতে কারো কারো নিকট বাহ্যিক সুন্দর রয়েছে। যেমনঃ টাখনুর নীচে কাপড় পরা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে অহংকার বশে কাপড় টাখনুর নীচে ছেড়ে দিবে আল্লাহ তার দিকে তাকবেন না। [বুখারীঃ ৫৭৮৩]
আয়াতের শানে নুযুল হিসেবে এসেছে যে, আরবের মুশরিকরা জাহেলিয়াতে মসজিদে হারামে কাবার তাওয়াফ করার সময় উলঙ্গ হয়ে তাওয়াফ করত। এ ব্যাপারে তাদের দর্শন ছিল, যে কাপড় পরে গুণাহ করেছি তা দিয়ে তাওয়াফ করা যাবে না। বিশেষতঃ কুরাইশরা এ বিধিবিধানের প্রবর্তন করে। তারাই শুধু তাওয়াফের জন্য কাপড় দিতে পারবে। এতে করে তারা কিছু বাড়তি সুবিধা আদায় করতে পারত। এমনকি মহিলারাও উলঙ্গ তাওয়াফ করত। শয়তান তাদেরকে এভাবে ইবাদাত করতে উদ্বুদ্ধ করত এবং এ কাজকে তাদের মনে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে দিত। আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেনঃ মহিলা উলঙ্গ অবস্থায় কা’বার তাওয়াফ করত আর বলত, কে আমাকে তাওয়াফের কাপড় ধার দেবে? যা তার লজ্জাস্থানে রাখবে। আরও বলতঃ আজ হয় কিছু অংশ প্রকাশ হয়ে পড়বে নয়ত পুরোটাই। আর যা আজ প্রকাশিত হবে তা আর হালাল করব না। তখন এ আয়াত নাযিল হয়- “তোমরা তোমাদের মাসজিদ তথা ইবাদাতের স্থানে সুন্দর পোষাক পরবে।” [মুসলিমঃ ৩০২৮]
(২) এ আয়াত থেকে একটি মাসআলা এরূপ বুঝা যায় যে, জগতে পানাহারের যত বস্তু রয়েছে সেগুলো সব হালাল ও বৈধ ৷ যতক্ষণ পর্যন্ত কোন বিশেষ বস্তুর অবৈধতা ও নিষিদ্ধতা শরীআতের কোন দলীল দ্বারা প্রমাণিত না হয়, ততক্ষণ প্রত্যেক বস্তুকে হালাল ও বৈধ মনে করা হবে। আয়াতে وَلَا تُسْرِفُوا বলে পানাহারের অনুমতি বরং নির্দেশ থাকার সাথে সাথে অপব্যয় করার নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে। আয়াতে ব্যবহৃত إسراف শব্দের অর্থ সীমালংঘন করা। সীমালংঘন কয়েক প্রকারের হতে পারে।
(এক) হালালকে অতিক্রম করে হারাম পর্যন্ত পৌছা এবং হারাম বস্তু পানাহার করতে থাকা। এ সীমালংঘন যে হারাম তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
(দুই) আল্লাহর হালালকৃত বস্তুসমূহকে শরীআত সম্মত কারণ ছাড়াই হারাম মনে করে বর্জন করা। হারাম বস্তু ব্যবহার করা যেমন অপরাধ ও গোনাহ, তেমনি হালালকে হারাম মনে করাও আল্লাহর আইনের বিরোধিতা ও কঠোর গোনাহ। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কম খেয়ে দুর্বল হয়ে পড়া, ফলে ফরয কর্ম সম্পাদনের শক্তি না থাকা- এটাও সীমালংঘনের মধ্যে গণ্য। উল্লেখিত উভয় প্রকার অপব্যয় নিষিদ্ধ করার জন্য কুরআনুল কারীমের এক জায়গায় বলা হয়েছেঃ “অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই।” [সূরা আল-ইসরাঃ ২৭]
অন্যত্র বলা হয়েছেঃ “আল্লাহ তাদেরকে পছন্দ করেন, যারা ব্যয় করার ক্ষেত্রে মধ্যবর্তিতা অবলম্বন করে- প্রয়োজনের চাইতে বেশী ব্যয় করে না এবং কমও করে না।” [সূরা আল-ফুরকানঃ ৬৭] এ আয়াতে পানাহার সম্পর্কে যে মধ্যবর্তিতার নির্দেশ বর্ণিত হয়েছে, তা শুধু পানাহারের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং পরিধান ও বসবাসের প্রত্যেক কাজেই মধ্য পন্থা পছন্দনীয় ও কাম্য।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “সীমালংঘন ও অহংকার না করে খাও, দান কর এবং পরিধান কর।” [নাসাঈঃ ৫/৭৯, ইবন মাজাহঃ ৩৬০৫] অনুরূপভাবে ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেনঃ যা ইচ্ছা পানাহার কর এবং যা ইচ্ছা পরিধান কর, তবে শুধু দুটি বিষয় থেকে বেঁচে থাক। (এক) তাতে অপব্যয় অর্থাৎ প্রয়োজনের চাইতে বেশী না হওয়া চাই এবং (দুই) গর্ব ও অহংকার না থাকা চাই। [বুখারী] অন্যত্র এটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকেও বর্ণিত হয়েছে। [নাসায়ী: ২৫৫৯] তবে এ ক্ষেত্রে
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি স্বাভাবিক সীমা দিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেনঃ আদম সন্তান যে সমস্ত ভাণ্ডার পূর্ণ করে, তন্মধ্যে পেট হল সবচেয়ে খারাপ। আদম সন্তানের জন্য স্বল্প কিছু লোকমাই যথেষ্ট, যা দিয়ে সে তার পিঠ সোজা রাখতে পারে। এর বেশী করতে চাইলে এক-তৃতীয়াংশ খাবারের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ পানীয়ের জন্য এবং এক-তৃতীয়াংশ নিঃশ্বাসের জন্য নির্দিষ্ট করে। [তিরমিযীঃ ২৩৮০, ইবন মাজাহঃ ৩৩৪৯, মুসনাদে আহমাদঃ ৪/১৩২]
(وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا) আয়াত থেকে বেশ কয়েকটি মাসআলা জানা যায়।
(এক) যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু পানাহার করা ফরয।
(দুই) শরীআতের কোন দলীল দ্বারা কোন বস্তুর অবৈধতা প্রমানিত না হওয়া পর্যন্ত সব বস্তুই হালাল।
(তিন) আল্লাহ্ তা’আলা ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক নিষিদ্ধ বস্তুসমূহকে ব্যবহার করা অপব্যয় ও অবৈধ ৷
(চার) যেসব বস্তু আল্লাহ্ তাআলা হালাল করেছেন, সেগুলোকে হারাম মনে করাও অপব্যয় এবং মহাপাপ।
(পাঁচ) পেট ভরে খাওয়ার পরও আহার করা সমীচীন নয়।
(ছয়) এতটুকু কম খাওয়াও অবৈধ, যদ্দরুন দুর্বল হয়ে ফরয কর্ম সম্পাদন করতে অক্ষম হয়ে পড়ে। [দেখুন, কুরতুবী; ফাতহুল কাদীর]
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
»لا يقبل الله صلاة حائض – يعني: من بلغت الحيض – إلا بخمار«
“হায়েযা (ঋতুমতী) নারীর সালাত খিমার ব্যতীত গ্রহণ করা হয় না”। তিরমিযী ৩৭৭; আবু দাউদঃ ৬৪১; ইবন মাজাহঃ ৬৫৫; আহমদ (৬/২৫৯) অর্থাৎ ঋতু আরম্ভ হয়েছে এমন প্রাপ্তবয়স্কা নারীর সালাত। খিমার দ্বারা উদ্দেশ্য মাথা ও গর্দান আচ্ছাদনকারী কাপড়।
খুমুরুন’( خُمُر শব্দটি خمار এর বহুবচন) যা খিমার শব্দের বহুবচন। খিমার বলতে সেই কাপড় বুঝায় যা দিয়ে নারী তার মাথা, বক্ষ ও গলা ঢেকে রাখতে পারে।[কুরতুবী, ফাতহুল কাদীর]
উম্মে সালামাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করেন, নারী কি জামা ও খিমারে সালাত পড়তে পারে নিচের কাপড় ছাড়া? তিনি বলেন: »إذا كان الدرع سابغا يغطي ظهور قدميها«
“যদি জামা পর্যাপ্ত হয় যা তার পায়ের পাতা ঢেকে নেয়”। আবু দাউদ, হাদীস নং ৬৪০; মালিক, হাদীস নং ৩২৬ খিমার ও জামা দ্বারাই সালাত বিশুদ্ধ।
এ দু’টি হাদীস প্রমাণ করে যে, সালাতে নারীর মাথা ও গর্দান ঢেকে রাখা জরুরি, যা আয়েশা থেকে বর্ণিত হাদীসের দাবি। তার পায়ের বহিরাংশ (পাতা) পর্যন্ত শরীরের অংশও ঢেকে রাখা জরুরি, যা উম্মে সালামার হাদীসের দাবি। যদি পর-পুরুষ না দেখে চেহারা উন্মুক্ত রাখা বৈধ, এ ব্যাপারে সকল আহলে ইলম একমত।
আয়েশা (রাঃ) কর্তৃক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “আল্লাহ তাআলা খিমার পরিধান করা ব্যতীত কোন প্রাপ্ত বয়স্কা নারীর নামায কবুল করেন না।”[সুনানে আবু দাউদ, সুনানে তিরমিযি, আলবানি সহিহ আবু দাউদ গ্রন্থে হাদিসটিকে সহিহ আখ্যায়িত করেছেন]
মহিলাদের লেবাসে চুল, পেট, পিঠ, হাতের কব্জির উপরি ভাগের অঙ্গ (কনুই, বাহু প্রভৃতি) বের হয়ে থাকলে নামায হয় না। কেবল চেহারা ও কব্জি পর্যন্ত হাত বের হয়ে থাকবে। পায়ের পাতাও ঢেকে নেওয়া কর্তব্য। (মাজাল্লাতুল বুহূসিল ইসলামিয়্যাহ্ ১৬/১৩৮, ফাতাওয়া ইসলামিয়্যাহ্,ৎ
সঊদী উলামা-কমিটি ১/২৮৮, কিদারেমী, সুনান ৯৪পৃ:) অবশ্য সামনে কোন বেগানা পুরুষ থাকলে চেহারাও ঢেকে নিতে হবে।
ঘর অন্ধকার হলেও বা একা থাকলেও নামায পড়তে পড়তে ঢাকা ফরয এমন কোন অঙ্গ প্রকাশ পেয়ে গেলে নামায বাতিল হয়ে যাবে। সেই নামায পুনরায় ফিরিয়ে পড়তে হবে। (ফাতাওয়া ইসলামিয়্যাহ্, সঊদী উলামা-কমিটি ১/২৮৫)ঃ
সালাতে পুরুষদের ন্যূনতম সতর হল, দু কাঁধ এবং নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত ঢাকা। অর্থাৎ সর্ব নিম্ন এতটুকু ঢাকা থাকা সালাত শুদ্ধ হওয়ার জন্য শর্ত।
অবশ্য কাঁধ ঢাকা শর্ত কি না এ ব্যাপারে সম্মানিত ফকিহদের মাঝে দ্বিমত রয়েছে। তবে একাধিক বিশুদ্ধ হাদিসের আলোকে সালাতে দু কাঁধ ঢাকার মতটি অধিক শক্তিশালী বলে প্রতিয়মান হয়। যেমন হাদিসে বর্ণিত হয়েছে:
আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “তোমাদের কেউ যেন কাঁধ খোলা রেখে এক কাপড়ে সালাত আদায় না করে।” (সহীহ বুখারী ও মুসলিম) হাদিসে আরও বর্ণিত হয়েছে:
আবু হুরাইরাহ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “তোমাদের কেউ এক কাপড়ে সলাত আদায় করলে সে যেন কাপড়ের ডান পাশকে বাম কাঁধের উপর এবং বাম পাশকে ডান কাঁধের উপর ঝুলিয়ে রাখে।” (সহীহ মুসলিম)
এ হাদিসদ্বয় থেকে দু কাঁধ ঢাকার মতটি অধিক শক্তিশালী বলে প্রতিয়মান হয়। অবশ্য যে সকল ফকিহগণ কাঁধ ঢাকার বিষয়টিকে আবশ্যক মনে করে না তাদের মতে, কাঁধ ঢাকা সালাতের একটি সৌন্দর্য বা আদব মাত্র; এর বেশি নয়। যা হোক, একান্ত জরুরি পরিস্থিতির শিকার না হলে ইচ্ছাকৃতভাবে দু কাঁধ খোলা রেখে সালাত আদায় করা ঠিক নয়।