সূরা আরাফঃ ২২তম রুকু(১৭২-১৮১আয়াত)

১৭২. আর স্মরণ করুন, যখন আপনার রব আদম-সন্তানের পিঠ থেকে তার বংশধরকে বের করেন এবং তাদের নিজেদের সম্বন্ধে স্বীকারোক্তি গ্রহণ করেন এবং বলেন, ‘আমি কি তোমাদের রব নই? তারা বলেছিল, ‘হ্যাঁ অবশ্যই, আমরা সাক্ষী রইলাম। এটা এ জন্যে যে, তোমরা যেন কিয়ামতের দিন না বল, আমরা তো এ বিষয়ে গাফেল ছিলাম।

পূর্ববর্তী আলোচনা যেখানে শেষ হয়েছিল সেখানে বলা হয়েছিল, মহান আল্লাহ‌ বনী ইসরাঈলের কাছ থেকে বন্দেগী ও আনুগত্যের অঙ্গীকার নিয়েছিলেন এখন সাধারণ মানুষকে সম্বোধন করে তাদেরকে জানানো হচ্ছে যে, এ ব্যাপারে বনী ইসরাঈলের কোন বিশেষত্ব নেই বরং প্রকৃতপক্ষে তোমরা সবাই নিজেদের স্রষ্টার সাথে একটি অঙ্গীকারে আবদ্ধ এবং এ অঙ্গীকার তোমরা কতটুকু পালন করেছো সে ব্যাপারে তোমাদের একদিন জবাবদিহি করতে হবে।

এটিকে ‘আলাসতু’ অঙ্গীকার বলা হয় যা ألست بربكم হতে তৈরী। এই অঙ্গীকার আদম (আঃ)-এর সৃষ্টির পর তাঁর সৃষ্টজাত সকল সন্তানের নিকট হতে নেওয়া হয়েছিল। একটি সহীহ হাদীসে এভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, আরাফার দিনে নু’মান নামক জায়গায় মহান আল্লাহ আদম-সন্তান হতে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন। আদম (আঃ)-এর সকল সন্তানকে তার পৃষ্ঠদেশ হতে বের করলেন এবং তাদেরকে নিজের সামনে (পিঁপড়ের আকারে) ছড়িয়ে দিলেন ও তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আমি কি তোমাদের রব (প্রভু) নই।’ সকলে বলেছিল, بَلَى شَهِدنَا  অবশ্যই, আমরা সকলেই আপনার রব হওয়ার সাক্ষ্য দিচ্ছি। (মুসনাদে আহমাদ, হাকেম ২/৫৪৪, সিলসিলাহ সহীহাহ ১৬২৩নং) ইমাম শাওকানী এ হাদীসটি সম্পর্কে বলেন, এর সূত্রে কোন প্রকার ত্রুটি নেই। ইমাম শাওকানী আরো বলেন, তখনকার জগৎকে ‘আলামুয যার্র’ (পিপীলিকা জগৎ) বলা হয়। এটিই এর সঠিক ও যথার্থ ব্যাখ্যা। এর থেকে সরে যাওয়া ও অন্য অর্থ নেওয়া সঠিক নয়। কারণ, এটি আল্লাহর রসূলের হাদীস ও সাহাবাদের উক্তি দ্বারা প্রমাণিত। সুতরাং এটিকে ‘মাজায’ (রূপক বা ভাবগত) অর্থে ব্যবহার করাও উচিত নয়। মোটকথা, আল্লাহর রব হওয়ার সাক্ষ্য প্রত্যেক মানুষের প্রকৃতিতে সন্নিবিষ্ট আছে। এই ভাবার্থকেই আল্লাহর রসূল (সাঃ) এইভাবে বর্ণনা করেছেন, ‘‘প্রতিটি শিশু (ইসলামী ধর্মবোধের) প্রকৃতি নিয়ে জন্ম নেয়। পরে তার মাতা-পিতা তাকে ইয়াহুদী, খ্রিষ্টান বা অগ্নিপূজক বানিয়ে নেয়। যেমন জন্তুর বাচ্চা সম্পূর্ণ জন্ম হয়, তার নাক ও কান কাটা থাকে না।’’ (বুখারীঃ জানাযা অধ্যায়, মুসলিমঃ তকদীর অধ্যায়) সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় রয়েছে, মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি আমার বান্দাদেরকে একনিষ্ঠ (একমাত্র ইসলামের প্রতি অনুগত) রূপে সৃষ্টি করেছি। অতঃপর শয়তান তাদেরকে ইসলামী প্রকৃতি হতে পথভ্রষ্ট করে দেয়।’ (মুসলিমঃ জানাযা অধ্যায়) এই প্রকৃতিই আল্লাহর একত্ব ও তাঁর অবতীর্ণকৃত শরীয়ত। যা এখন ইসলাম নামে সংরক্ষিত।

পবিত্র কুরআনের এ আয়াতের তাফসীরে দুটি প্রসিদ্ধ মত বর্ণিত হয়েছে।

এক, এখানে যে অঙ্গীকার নেয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছে, তা ফিতরাত বা স্বভাবজাত দ্বীনের উপর মানুষকে সৃষ্টি করা, যাতে তারা কোন প্রকার পারিপার্শ্বিক প্রতিক্রিয়া দ্বারা আক্রান্ত না হলে আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাসী হতো, এ বিষয়টিকে বুঝানো হয়েছে। তখন আল্লাহর প্রশ্ন ও মানবজাতির প্রত্যুত্তর সবই অবস্থাভিত্তিক। অর্থাৎ তাদের মুখ দিয়ে কথা বের হয়নি। তাদের অবস্থাই একথার স্বীকৃতি দিচ্ছিল যে, তারা আল্লাহর রবুবিয়াতে পূর্ণ বিশ্বাসী।

এ মতের সমর্থনে ঐ সমস্ত আয়াত ও হাদীস পেশ করা যায় যাতে স্পষ্ট ঘোষণা করা হয়েছে যে, আল্লাহ তা’আলা মানবজাতিকে ফিতরাত বা স্বভাবজাত দ্বীন ইসলামের উপর সৃষ্টি করেছেন তারপর তাদের পিতামাতা তাদেরকে ইয়াহুদী বা নাসারা বা মাজুসী বানিয়েছে। শয়তান তাদেরকে দ্বীন থেকে সরিয়ে দিয়েছে। সত্যনিষ্ঠ আলেমদের এক বিরাট দল এ মতের পক্ষে রায় দিয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন, শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়া, ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম, ইবন কাসীর, ইবন আবুল ইযয আল হানাফী, আব্দুর রহমান আস-সাদী রাহিমাহুমুল্লাহ সহ আরো অনেকে।

—— আল্লাহ তা’আলা আদম আলাইহিস সালামের পিঠ থেকে তার সন্তানদেরকে বের করে তাদের কাছ থেকে তিনি মৌখিক অঙ্গীকার নিয়েছেন। এ মতের সপক্ষে বাহ্যিকভাবে আলোচ্য আয়াত, সূরা আল-বাকারার ২৭ এবং সূরা আল-হাদীদের ৮ নং আয়াতকে তারা তাদের দলীল হিসাবে পেশ করেন।

. যারা আল্লাহর সাথে দৃঢ় অঙ্গীকারে আবদ্ধ হওয়ার পর তা ভঙ্গ করে, আর যে সম্পর্ক অক্ষুন্ন রাখতে আল্লাহ আদেশ করেছেন তা ছিন্ন করে এবং যমীনের উপর ফাসাদ সৃষ্টি করে বেড়ায়, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত। সূরা আল-বাকারার ২৭

আর তোমাদের কি হল যে, তোমরা আল্লাহর উপর ঈমান আন না? অথচ রাসূল তোমাদেরকে তোমাদের রবের প্রতি ঈমান আনার জন্য ডাকছেন অথচ আল্লাহ তোমাদের কাছ থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছেন(১), যদি তোমরা ঈমানদার হও। সূরা আল-হাদীদ- ৮

 এ ছাড়াও এ মতের সমর্থনে বেশ কিছু হাদীস, সাহাবা-তাবেয়ীনদের উক্তি এবং মুফাসসেরীনদের মতামত রয়েছে। তন্মধ্যে হাদীসের বর্ণনায় সৃষ্টিলগ্নের এই প্রতিশ্রুতির আরো কিছু বিস্তারিত আলোচনা এসেছে। কিছু লোক উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর নিকট এ আয়াতটির মর্ম জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এ আয়াতটির মর্ম জিজ্ঞেস করা হয়েছিল।

তার কাছে যে উত্তর আমি শুনেছি তা হল এই- “আল্লাহ তা’আলা সর্বপ্রথম আদম ‘আলাইহিস্ সালামকে সৃষ্টি করেন। তারপর নিজের হাত যখন তার পিঠে বুলিয়ে দিলেন, তখন তার ঔরসে যত সৎমানুষ জন্মাবার ছিল তারা সব বেরিয়ে এল। তখন তিনি বললেনঃ এদেরকে আমি জান্নাতের জন্য সৃষ্টি করেছি এবং এরা জান্নাতেরই কাজ করবে। পুনরায় দ্বিতীয়বার তার পিঠে হাত বুলালেন। তখন যত পাপী-তাপী মানুষ তার ঔরসে জন্মাবার ছিল, তাদেরকে বের করে আনলেন এবং বললেনঃ এদেরকে আমি জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি এবং এরা জাহান্নামে যাবার মতই কাজ করবে”। সাহাবীগণের মধ্যে একজন নিবেদন করলেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ, প্রথমেই যখন জান্নাতী ও জাহান্নামী সাব্যস্ত করে দেয়া হয়েছে, তখন আর আমল করানো হয় কি উদ্দেশ্যে?

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ “যখন আল্লাহ্ তা’আলা কাউকে জান্নাতের জন্য সৃষ্টি করেন, তখন সে জান্নাত বাসের কাজই করতে শুরু করে। এমনকি তার মৃত্যুও এমন কাজের ভেতরেই হয়, যা জান্নাতবাসীদের কাজ। আর আল্লাহ যখন কাউকে জাহান্নামের জন্য তৈরী করেন, তখন সে জাহান্নামের কাজই করতে আরম্ভ করে। এমনকি তার মৃত্যুও এমন কোন কাজের মাধ্যমেই হয়, যা জাহান্নামের কাজ”। [মুয়াত্তাঃ ২/৮৯৮, মুসনাদে আহমাদঃ ১/৪৪, আবু দাউদঃ ৪৭০৩, তিরমিযীঃ ৩০৭৫, মুস্তাদরাকে হাকেমঃ ১/২৭, ২/৩২৪, ৫৪৪]। অর্থাৎ মানুষ যখন জানে না যে, সে কোন শ্রেণীভুক্ত, তখন তার পক্ষে নিজের সামর্থ্য, শক্তি ও ইচ্ছাকে এমন কাজেই ব্যয় করা উচিত যা জান্নাতবাসীদের কাজ, আর এমন আশাই পোষণ করা কর্তব্য যে, সেও তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে।

এ ছাড়া অন্য বর্ণনায় এসেছে, প্রথমবারে যারা আদম ‘আলাইহিস সালামের ঔরস থেকে বেরিয়ে এসেছিল তারা ছিল শ্বেতবর্ণ-যাদেরকে বলা হয়েছে জান্নাতবাসী। আর দ্বিতীয়বার যারা বেরিয়েছিল তারা ছিল কৃষ্ণবর্ণ- যাদেরকে জাহান্নামবাসী বলা হয়েছে। [দেখুন, মুসনাদে আহমাদঃ ৬/৪৪১] অপর এক বর্ণনায় এ কথাও রয়েছে যে, এভাবে কেয়ামত পর্যন্ত জন্মানোর মত যত আদমসন্তান বেরিয়ে এল, তাদের সবার ললাটে একটা বিশেষ ধরনের দীপ্তি ছিল। [দেখুন, তিরমিযী: ৩০৭৬, মুস্তাদরাকে হাকেম: ২/২৮৬]।

অন্য এক হাদীসে এসেছে যে, মহান আল্লাহ সবচেয়ে অল্প আযাবে লিপ্ত জাহান্নামবাসীকে জিজ্ঞাসা করবেন, যদি দুনিয়াতে যা কিছু আছে সব তোমার হয় তাহলে কি তুমি এ আযাবের বিনিময় হিসাবে দিতে? সে বলবে, হ্যাঁ, তখন আল্লাহ বলবেন, আমি তোমার কাছে তার থেকেও সামান্য জিনিস চেয়েছিলাম, যখন তুমি আদমের পিঠে ছিলে, তা হল, আমার সাথে শির্ক কর না। কিন্তু তুমি শির্ক ছাড়া কিছু করলে না। [বুখারী ৩৩৩৪; মুসলিম: ২৮০৫]

 এ স্বীকারোক্তি আমি এ কারণে গ্রহণ করেছি যাতে তোমরা কেয়ামতের দিন একথা বলতে না পার যে, আমরা তো এ ব্যাপারে অজ্ঞ ছিলাম। এতে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, এই সৃষ্টিলগ্নে তোমাদের অন্তরে ঈমানের মূল এমনিভাবে স্থাপিত হয়ে গেছে যে, সামান্য একটু চিন্তা করলেই তোমাদের পক্ষে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনকে পালনকর্তা স্বীকার না করে কোন অব্যাহতি থাকবে না। [ইবন কাসীর]

এ আয়াতে অঙ্গীকার নেয়ার আরেকটি কারণ এই বর্ণনা করা হয়েছে যে, এ অঙ্গীকার আমি এ জন্যও গ্রহণ করেছি, আবার না তোমরা কেয়ামতের দিন এমন কোন ওযর আপত্তি করতে থাক যে, শির্ক ও পৌত্তলিকতা তো আসলে আমাদের বড়রা অবলম্বন করেছিল, আর আমরা তো ছিলাম তাদের পরের বংশধর। আমরা তো খাঁটি-অখাঁটি ভুল-শুদ্ধ কোনটাই জানতাম না। কাজেই বড়রা যা কিছু করেছে, আমরাও তাই করেছি। অতএব, বড়দের শাস্তি আমাদেরকে দেয়া হবে কেন? আল্লাহ্ তাআলা বাতলে দিয়েছেন যে, অন্যের শাস্তি তোমাদেরকে দেয়া হয়নি বরং স্বয়ং তোমাদেরই শৈথিল্য ও গাফলতির শাস্তি দেয়া হয়েছে। কারণ, সৃষ্টিলগ্নের প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে মানবাত্মায় এমন এক বীজ রোপন করে দেয়া হয়েছিল যাতে সামান্য চিন্তা করলেই এটুকু বিষয় বুঝতে পারা কঠিন ছিল না যে, একজন স্রষ্টা রয়েছেন, আমাকে তারই ইবাদত করা উচিত। [দেখুন, তাবারী; বাগভী; ফাতহুল কাদীর; মুয়াসসার]

সৃষ্টির প্রথম দিনের এ অঙ্গীকার যদি বাস্তবে সংঘটিত হয়েও থাকে তাহলে তা কি আমাদের চেতনা ও স্মৃতিপটে সংরক্ষিত আছে? আমাদের মধ্য থেকে কোন একজনও কি একথা জানে, সৃষ্টির সূচনালগ্নে তাকে আল্লাহর সামনে পেশ করা হয়েছিল, সেখানে তার সামনে أَلَسْتُ بِرَبِّكُمْ(আমি কি তোমাদের রব নই? ) প্রশ্ন করা হয়েছিল এবং তার জবাবে সে বলেছিল بَلَى(হ্যাঁ)? জবাব যদি নেতিবাচক হয়ে থাকে, তাহলে যে অঙ্গীকারের কথা আমাদের চেতনা ও স্মৃতিপট থেকে উধাও হয়ে গেছে তাকে কেমন করে আমাদের বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে?

এর জবাবে বলা যায়, সেই অঙ্গীকারের কথা যদি মানুষের চেতনা ও স্মৃতিপটে জাগরুক রাখা হতো, তাহলে মানুষকে দুনিয়ার বর্তমান পরীক্ষাগারে পাঠানোর ব্যাপারটা একেবারে অর্থহীন হয়ে যেতো। কারণ এরপর পরীক্ষার আর কোন অর্থই থাকতো না। তাই এ অঙ্গীকারের কথা চেতনা ও স্মৃতিপটে জাগরুক রাখা হয়নি ঠিকই, কিন্তু অবচেতন মনে (Sub-conscious mind) ও সুপ্ত অনুভূতিতে (Intution) তাকে অবশ্যি সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। তার অবস্থা আমাদের অবচেতন ও অনুভূতি সঞ্জাত অন্যান্য জ্ঞানের মতই। সভ্যতা, সংস্কৃতি, নৈতিক ও ব্যবহারিক জীবনের সকল বিভাগে মানুষ আজ পর্যন্ত যা কিছুর উদ্ভব ঘটিয়েছে, তা সবই আসলে মানুষের মধ্যে প্রচ্ছন্নভাবে (Potentially) বিরাজিত ছিল। বাইরের কার্যকারণ ও ভিতরের উদ্যোগ-আয়োজন ও চেষ্টা-সাধনা মিলেমিশে কেবলমাত্র অব্যক্তকে ব্যক্ত করার কাজটুকুই সম্পাদন করেছে। এমন কোন জিনিস যা মানুষের মধ্যে অব্যক্তভাবে বিরাজিত ছিল না, তাকে কোন শিক্ষা, অনুশীলন, পরিবেশের প্রভাব ও আভ্যন্তরীন চেষ্টা-সাধনার বলে কোনক্রমেই তার মধ্যে সৃষ্টি করা সম্ভব নয় এটি একটি জাজ্বল্যমান সত্য। আর এ প্রভাব-প্রচেষ্টাসমূহ নিজের সর্বশক্তি নিয়োগ করলেও মানুষের মধ্যে যেসব জিনিস অব্যক্তভাবে বিরাজিত রয়েছে তাদের কোনটিকেও পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করে দেবার ক্ষমতা রাখে না। বড়জোর তারা তাকে তার মূল স্বাভাব প্রকৃতি থেকে বিকৃত (Pervert) করতে পারে মাত্র। তবুও সব রকমের বিকৃতি ও বিপথগামীতা সত্ত্বেও সেই জিনিসটি তার মধ্যে বিদ্যমান থাকবে, আত্মপ্রকাশের প্রচেষ্টা চালাতে থাকবে এবং বাইরের আবেদনে সাড়া দেয়ার জন্য সর্বক্ষণ উন্মুখ থাকবে। এ ব্যাপারটি যেমন আমি ইতিপূর্বে বলেছি, আমাদের সকল প্রকার অবচেতন ও প্রচ্ছন্ন অনুভূতিলব্ধ জ্ঞানের ক্ষেত্রে সর্বতোভাবে সত্যঃ

ঃ এগুলো সবই আমাদের মধ্যে অব্যক্তভাবে রয়েছে। আমরা বাস্তবে যা কিছু ব্যক্ত করি এবং যেসব কাজ করি, তার মাধ্যমেই এগুলোর অস্তিত্বের নিশ্চিত প্রমাণ আমরা পেয়ে থাকি।

ঃ এগুলোর কার্যকর অভিব্যক্তির জন্য বাইরের আলোচনা (স্মরণ করিয়ে দেয়া) শিক্ষা, অনুশীলন ও কাঠামো নির্মাণের প্রয়োজন হয়। আর আমাদের দ্বারা বাস্তবে যা কিছু সংঘটিত হয়, তা আসলে বাইরের সেই আবেদনেরই সাড়া বলে প্রতীয়মান হয়, যা আমাদের মধ্যে সুপ্তভাবে বিরাজমান জিনিসসমূহের পক্ষ থেকে এসে থাকে।

ঃ ভিতরের ভ্রান্ত কামনা, বাসনা ও বাইরের প্রতিকূল প্রভাব, প্রতিপত্তি ও কার্যক্রম এগুলোকে দাবিয়ে দিয়ে বিকৃত ও বিপথগামী করে এবং এগুলোর ওপর আবরণ ফেলে দিয়ে এগুলোকে নিস্তেজ ও নিষ্ক্রিয় করে দিতে পারে কিন্তু সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে না। আর এজন্যই ভিতরের চেতনা ও বাইরের প্রচেষ্টা-উভয়ের সহায়তায় সংস্কার, সংশোধন ও পরিবর্তন (conversion) সম্ভবপর।

বিশ্বজাহানে আমাদের যথার্থ মর্যাদা এবং বিশ্বজাহানের স্রষ্টার সাথে আমাদের সম্পর্কের ব্যাপারে আমরা যে সুপ্ত চেতনালব্ধ জ্ঞানের অধিকারী তার অবস্থাও এ একই পর্যায়ভুক্ত এ জ্ঞান যে আবহামানকাল ধরেই বিরাজমান তার প্রমাণ হচ্ছে এই যে, তা মানব জীবনের প্রতি যুগে, পৃথিবীর সব এলাকায়, প্রতিটি জনপদে, প্রত্যেকটি বংশে, প্রজন্মে ও পরিবারে আত্মপ্রকাশ করেছে এবং কখনো দুনিয়ার কোন শক্তিই তাকে নিশ্চিহ্ন করতে সক্ষম হয়নি।

ঃ ঐ জ্ঞান যে প্রকৃত সত্যের অনুরূপ তার প্রমাণ হচ্ছে এই যে, যখনই তা আত্মপ্রকাশ করে আমাদের জীবনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে তখনই তা সুস্থ ও কল্যাণকর ফল প্রদান করতে সক্ষম হয়েছে।

ঃ তার আত্মপ্রকাশ করার ও কার্যকর রূপলাভ করার জন্য সবসময় একটি বহিরাগত আবেদনের প্রয়োজন হয়েছে। তাই নবীগণ, আসমানী কিতাবসমূহ ও তাদের আনুগত্যকারী সত্যের আহবায়কদের সবাই এ দায়িত্বই পালন করে এসেছেন। এ জন্যই কুরআনে তাদেরকে মুযাক্কির (স্মারক) এবং তাদের কাজকে তাযকীর (স্মরণ করিয়ে দেয়া), যিকর (স্মরণ) ও তাযকিরাহ (স্মৃতি) ইত্যাদি শব্দাবলীর মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে। এর অর্থ দাঁড়ায়, নবীগণ, কিতাবসমূহ ও সত্যের আহবায়কগণ, মানুষের মধ্যে কোন নতুন জিনিস সৃষ্টি করেন না বরং তার মধ্যে আগে থেকেই যে জিনিসটির অস্তিত্ব বিরাজ করছিল, তাকে জাগিয়ে তোলেন এবং নতুন জীবনীশক্তি দান করেন মাত্র।

ঃ মানবাত্মার পক্ষ থেকে প্রতি যুগে এ স্মরণ করিয়ে দেবার প্রয়াসে ইতিবাচক সাড়া দেয়া হয়েছে। তার মধ্যে যে প্রকৃতপক্ষে এমন এক জ্ঞান সুপ্ত ছিল, যা নিজের আহ্বানকারীরা আওয়াজ চিনতে পেরে তার জবাব দেবার জন্য জেগে উঠেছে, এটি তার আর একটি প্রমাণ।

ঃ তারপর মূর্খতা, অজ্ঞতা, ইন্দ্রিয় লিপ্সা, স্বার্থপ্রীতি এবং মানুষ ও জ্বীনের বংশদ্ভূত শয়তানদের বিভ্রান্তিকর শিক্ষা ও প্ররোচনা তাকে সবসময় দাবিয়ে রাখার, বিপথগামী ও বিকৃত করার প্রচেষ্টা চালিয়েছে। এর ফলে শিরক, আল্লাহ‌ বিমুখতা, আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ এবং নৈতিক ও কর্মক্ষেত্রে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। কিন্তু বিভ্রান্তি ও ভ্রষ্টতার এ সমুদয় শক্তির সম্মিলিত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, সেই জ্ঞানের জন্মগত ছাপ মানুষের হৃদয়পটে কোন না কোন পর্যায়ে অক্ষুন্ন থেকেছে। এ জন্যই স্মরণ করিয়ে দেয়া ও নবায়নের প্রচেষ্টা তাকে জাগিয়ে তোলার ব্যাপারে সফল ভূমিকা পালন করে এসেছে।

অবশ্যি দুনিয়ার বর্তমান জীবনে যারা পরম সত্য ও বাস্তবতাকে অস্বীকার করতে বদ্ধপরিকর, তারা নিজেদের তথাকথিত যুক্তিবাদের ভিত্তিতে জন্মগতভাবে হৃদয়ফলকে খোদিত এ লিপিটির অস্তিত্ব অস্বীকার করতে পারে অথবা কমপক্ষে একে সন্দেহযুক্ত সাব্যস্ত করতে পারে। কিন্তু যেদিন হিসেব-নিকেশ ও বিচারের আদালত প্রতিষ্ঠিত হবে, সেদিন মহাশক্তিশালী স্রষ্টা তাদের চেতনা ও স্মৃতিপটে সৃষ্টির প্রথম দিনের সেই সম্মেলনটির স্মৃতি জাগিয়ে তুলবেন। সৃষ্টির প্রথম দিনে তারা একযোগে যে মহান স্রষ্টাকে তাদের একমাত্র রব ও মাবুদ বলে স্বীকার করে নিয়েছিল, সেই স্মৃতি আবার পুরোদমে তরতাজা করে দেবেন। তারপর তিনি তাদের নিজেদের অভ্যন্তর থেকে প্রমাণ সংগ্রহ করে এ অঙ্গীকারলিপি যে তাদের হৃদয়ে সবসময় খোদিত ছিল তা দেখিয়ে দেবেন। তাদের জীবনের সংরক্ষিত কার্যবিবরণী থেকে সর্বসম্মুখে এও দেখিয়ে দেবেন যে, তারা কিভাবে হৃদয়ফলকে খোদিত সে লিপিটি উপেক্ষা করেছে, কখন কোন সময় তাদের হৃদয়ের অভ্যন্তর থেকে এ লিপির সত্যতার স্বীকৃতি স্বগতভাবে উচ্চারিত হয়েছে, নিজের ও নিজের চারপাশের ভ্রষ্টতার ওপর তাদের বিবেক কোথায় কখন অসম্মতি ও বিদ্রোহের আওয়াজ বুলন্দ করেছে, সত্যের আহবায়কদের আহবানের জবাব দেয়ার জন্য তাদের অভ্যন্তরের লুকানো জ্ঞান কতবার কত জায়গায় আত্মপ্রকাশে উন্মুখ হয়েছে এবং তারা নিজেদের স্বার্থপ্রীতি ও প্রবৃত্তির লালসার বশবর্তী হয়ে কোন ধরনের তাল বাহানার মাধ্যমে তাকে ক্রমাগত প্রতারিত ও স্তব্ধ করে দিয়েছে। সেদিন যখন এসব গোপন কথা প্রকাশ হয়ে পড়বে, তখন যুক্তি-তর্ক করার অবকাশ থাকবে না বরং পরিষ্কারভাবে অপরাধ স্বীকার করে নিতে হবে। তাই কুরআন মজিদ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষনা করেছেঃ সেদিন অপরাধীরা একথা বলবে না, আমরা মুর্খ ছিলাম, অজ্ঞ ছিলাম, আমরা গাফেল ছিলাম বরং তারা একথা বলতে বাধ্য হবে, আমরা কাফের ছিলাম, অর্থাৎ আমরা জেনে বুঝে সত্যকে অস্বীকার করেছিলাম।

وَشَهِدُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ أَنَّهُمْ كَانُوا كَافِرِينَ

“আর তারা নিজেদের ব্যাপারেই সাক্ষ্য দেবে, তারা কাফের তথা অস্বীকার ও প্রত্যাখ্যানকারী ছিল।”(আন’আমঃ ১৩০)

ব্যাখ্যাকারীগণ এটিকে এক নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য বলেছেন, যে আল্লাহর কিতাবের জ্ঞান রাখত; কিন্তু পরে পার্থিব ভোগ-বিলাস ও শয়তানের পিছে পড়ে পথভ্রষ্ট হয়ে যায়। তবে নির্দিষ্ট ব্যক্তি কে ছিল? তা সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নয়। অতএব এ ব্যাপারে কষ্ট করার প্রয়োজন নেই। এটি সাধারণ ব্যাপার, এমন মানুষ প্রত্যেক জাতি ও প্রত্যেক যুগে জন্ম নেয়। যে ব্যক্তিই এ রকম হবে তাকে এর দলভুক্ত করা হবে

এ আয়াতে কোন নির্দিষ্ট এক ব্যক্তির প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে বলে মনে হয়। মুফাসসিরগণ রাসূলের যুগের এবং তাঁর পূর্ববর্তী যুগের বিভিন্ন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে এ দৃষ্টান্তের লক্ষ্য বলে চিহ্নিত করেছেন। ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু ‘বাল’আম ইবন আবার’ এর নাম নিয়েছেন। [আত-তাফসীরুস সহীহ] আবদুল্লাহ ইবন আমর নিয়েছেন উমাইয়া ইবন আবীস সালতের নাম। [আত-তাফসীরুস সহীহ] ইবন আব্বাস বলেন, এ ব্যক্তি ছিল সাইফ ইবনুর রাহেব। [ইবন কাসীর] কিন্তু প্রকৃতপক্ষে উদাহরণ হিসেবে যে বিশেষ ব্যক্তির ভূমিকা এখানে পেশ করা হয়েছে সে তো পর্দারন্তরালেই রয়ে গেছে। তবে যে ব্যক্তিই এ ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে তার ব্যাপারে এ উদাহরণটি প্রযোজ্য হবেই।

তবে বিখ্যাত ঘটনা হচ্ছে যে, তখনকার দিনে এক লোক ছিল যার দোআ কবুল হত। যখন মূসা আলাইহিস সালাম শক্তিশালী লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বের হলেন। তখন লোকেরা তার কাছে এসে বলল, তোমার দোআ তো কবুল হয়, সুতরাং তুমি মূসার বিরুদ্ধে দোআ কর। সে বলল, আমি যদি মূসার বিরুদ্ধে দোআ করি, তবে আমার দুনিয়া ও আখেরাত সবই যাবে। কিন্তু তারা তাকে ছাড়ল না। শেষ পর্যন্ত সে দোআ করল। কিন্তু আল্লাহ্ তা’আলা তার দোআ কবুল হওয়ার সুযোগ রহিত করে দিলেন। [ইবন কাসীর]

আমি ইচ্ছা করলে এসব আয়াতের মাধ্যমে তাকে উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন করে দিতাম, দুনিয়ার পঙ্কিলতা থেকে মুক্তি দিতে পারতাম। [ইবন কাসীর] কিন্তু সে দুনিয়ার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে গিয়েছিল। এ আয়াতে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, ঐ আয়াতসমূহ এবং সে সম্পর্কিত জ্ঞানই হল প্রকৃত মর্যাদা ও উন্নতির কারণ। কিন্তু যে লোক এ সমস্ত আয়াতের যথার্থ সম্মান না দিয়ে পার্থিব কামনা-বাসনাকে আল্লাহর আয়াতসমূহ অপেক্ষা অগ্রাধিকার দেবে, তার জন্য এই জ্ঞানই মহাবিপদ হয়ে যাবে।

 এখানে যে ব্যক্তির উদাহরণ পেশ করা হয়েছে সে আল্লাহর কিতাবের জ্ঞানের অধিকারী ছিল। অর্থাৎ প্রকৃত সত্য সম্পর্কে অবহিত ছিল। এ ধরনের জ্ঞানের অধিকারী হবার কারণে যে কর্মনীতিকে সে ভুল বলে জানতো তা থেকে দূরে থাকা এবং যে কর্মনীতিকে সঠিক মনে করতো তাকে অবলম্বন করাই তার উচিত ছিল। এ যথার্থ জ্ঞান অনুযায়ী কাজ করলে আল্লাহ তাকে মানবতার উচ্চতর পর্যায়ে উন্নীত করতেন। কিন্তু সে দুনিয়ার স্বার্থ, স্বাদ ও আরাম আয়েশের দিকে ঝুঁকে পড়ে। প্রবৃত্তির লালসার মুকাবিলা করার পরিবর্তে সে তার সামনে নতজানু হয়। উচ্চতর বিষয়সমূহ লাভের জন্য সে পার্থিব লোভ-লালসার উর্ধে উঠার পরিবর্তে তার মধ্যে এমনভাবে ডুবে যায় যার ফলে নিজের সমস্ত উচ্চতর আশা-আকাংখা, বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক উন্নতির সমস্ত সম্ভাবনা পরিত্যাগ করে বসে। ফলে শয়তান তার পেছনে লেগে যায় এবং অনবরত তাকে এক অধঃপতন থেকে আরেক অধঃপতনের দিকে টেনে নিয়ে যেতে থাকে। অবশেষে এ যালেম শয়তান তাকে এমন সব লোকের দলে ভিড়িয়ে দেয় যারা তার ফাঁদে পা দিয়ে বুদ্ধি বিবেক সব কিছু হারিয়ে বসেছিল।

এরপর আল্লাহ এ ব্যক্তির অবস্থাকে এমন একটি কুকুরের সাথে তুলনা করেছেন যার জিভ সবসময় ঝুলে থাকে। তার উপর বোঝা থাকলেও হাঁপাতে থাকে। আর বোঝা না থাকলেও একই অবস্থায় হাপাতে থাকে। মুজাহিদ বলেন, এ উদাহরণ দিয়েছে ঐ ব্যক্তির জন্য যে কিতাব পড়ে কিন্তু তার উপর আমল করে না। [তাবারী; আত-তাফসীরুস সহীহ] ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, এ উদাহরণটি কুকুরের জন্য এ উদ্দেশ্যে পেশ করা হয়েছে যে, তাকে কোন জ্ঞান ও হিকমতের কথা বললে সে তা নেয়ার মত যোগ্যতা রাখে না। আর যদি তাকে কোন কিছু না দিয়ে এমনিতেই ছেড়ে দেয়া হয়, তবে কোন কল্যাণই বয়ে আনতে পারে না। যেমনিভাবে কুকুর বসে থাকলেও হাঁপাতে থাকে। আর দৌড়ালেও হাঁপায়। [তাবারী; আত-তাফসীরুস সহীহ]

কারও কারও মতে আয়াতের অর্থ, সে তার পথভ্রষ্টতায় নিপতিত থাকা এবং ঈমানের দিকে আহবান জানানো হলে তা দ্বারা উপকৃত না হওয়ার দিক থেকে কুকুরের মত। তার উপর বোঝা চাপলেও সে হাঁপায়, না চাপলেও হাঁপায়। অনুরূপভাবে এ লোকটি উপদেশ ও ঈমানের প্রতি দাওয়াত দ্বারা উপকৃত হয়নি। অন্য আয়াতে যেমন বলা হয়েছে, “যারা কুফর করেছে আপনি তাদেরকে সতর্ক করুন বা না করুন, তারা ঈমান আনবে না [সূরা আল-বাকারাহ: ৬] অন্য আয়াতে এসেছে, “আপনি তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন অথবা তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা না করুন একই কথা; আপনি সত্তর বার তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলেও আল্লাহ তাদেরকে কখনই ক্ষমা করবেন না। [সূরা আত-তাওবাহ ৮০] অনুরূপ আরও আয়াতসমূহ। কারও কারও মতে, কাফের, মুনাফিক ও পথভ্ৰষ্টের অন্তর যেহেতু দুর্বল, হিদায়াতশূন্য থাকে সেহেতু সে খুব বেশী অস্থিরমতি। [ইবন কাসীর]

উল্লেখিত আয়াতগুলোতে চিন্তা করলে যে শিক্ষা আমরা পাই তন্মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলোঃ

 প্রথমতঃ কারো পক্ষেই নিজের জ্ঞান-গরিমা এবং ইবাদাত-বন্দেগীর ব্যাপারে গর্ব করা উচিত নয়। কারণ, সময় বদলাতে এবং বিপরীতগামী হতে দেরী হয় না। ইবাদাত-বন্দেগীর সাথে সাথে আল্লাহর শোকরগোযারী ও তাতে দৃঢ়তার জন্য আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করা এবং তার উপর ভরসা করা কর্তব্য। [কুরতুবী]

দ্বিতীয়তঃ আল্লাহ যে সমস্ত উদাহরণ পেশ করেছেন সেগুলোতে গবেষণা করলে জ্ঞান বাড়বে। আর জ্ঞান বাড়লে সেটা অনুযায়ী আমল করতে হবে। [সা’দী]

তৃতীয়ত: আল্লাহর আয়াতসমূহের বিরুদ্ধাচরণ স্বয়ং একটি আযাব এবং এর কারণে শয়তান তার উপর প্রবল হয়ে গিয়ে আরো হাজার রকমের মন্দ কাজে উদ্বুদ্ধ করে দেয়। কাজেই যে লোককে আল্লাহ তা’আলা দ্বীনের জ্ঞান দান করেছেন, সাধ্যমত সে জ্ঞানের সম্মান দান এবং নিজ আমল সংশোধনের চিন্তা থেকে এক মুহুর্তের জন্যও বিরত না থাকা তার একান্ত কর্তব্য।

চতুর্থত:এমন সবপরিবেশ ও কার্যকলাপ থেকে বেঁচে থাকা উচিত, যাতে স্বীয় দ্বানী ব্যাপারে ক্ষতির আশংকা থাকে। বিশেষ করে ধন-সম্পদ, স্ত্রী ও সন্তান-সন্তুতির ভালবাসার ক্ষেত্রে সেই অশুভ পরিণতির কথা সর্বক্ষণ স্মরণ রাখা আবশ্যক।

আল্লাহ তা’আলা এখানে বলেন যে, যাকে তিনি সুপথ প্রদর্শন করেন তাকে কেউ পথভ্রষ্ট করতে পারে না। আর যাকে তিনি পথভ্রষ্ট করেন, কার এমন শক্তি আছে যে, তাকে পথ দেখাতে পারে? আল্লাহ যা চান তাই হয় এবং তিনি যা চান না তা হয় না। এ জন্যেই ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর হাদীসে বর্ণিত হয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই জন্যে। আমরা তার প্রশংসা করছি; তাঁরই কাছে সাহায্য চাচ্ছি, তারই নিকট হিদায়াত কামনা করছি এবং তাঁরই কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আমরা আমাদের নফসের অকল্যাণ হতে তাঁর নিকট আশ্রয় চাচ্ছি এবং মন্দ আমল হতেও আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আল্লাহ যাকে পথ প্রদর্শন করেন তাকে কেউ পথভ্রষ্ট করতে পারে না এবং যাকে আল্লাহ পথভ্রষ্ট করেন তাকে কেউ পথ দেখাতে পারে না। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন মাবুদ নেই। তিনি এক । তাঁর কোন অংশীদার নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ (সঃ) তাঁর বান্দা ও রাসূল।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও আহলুস্ সুনান (রঃ) সম্পূর্ণরূপে বর্ণনা করেছেন)

এক:

তাওফিক ও হেদায়েত আল্লাহ্‌র হাতে। তিনি যাকে হেদায়েত দিতে চান তাকে হেদায়েত দেন; আর যাকে পথভ্রষ্ট করতে চান তাকে পথভ্রষ্ট করেন। আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন:

৩৯ : ২৩ اَللّٰهُ نَزَّلَ اَحۡسَنَ الۡحَدِیۡثِ كِتٰبًا مُّتَشَابِهًا مَّثَانِیَ ٭ۖ تَقۡشَعِرُّ مِنۡهُ جُلُوۡدُ الَّذِیۡنَ یَخۡشَوۡنَ رَبَّهُمۡ ۚ ثُمَّ تَلِیۡنُ جُلُوۡدُهُمۡ وَ قُلُوۡبُهُمۡ اِلٰی ذِكۡرِ اللّٰهِ ؕ ذٰلِكَ هُدَی اللّٰهِ یَهۡدِیۡ بِهٖ مَنۡ یَّشَآءُ ؕ وَ مَنۡ یُّضۡلِلِ اللّٰهُ فَمَا لَهٗ مِنۡ هَادٍ ﴿۲۳﴾

আল্লাহ নাযিল করেছেন উত্তম বাণী সম্বলিত কিতাব যা সুসামঞ্জস্য এবং যা পুনঃ পুনঃ আবৃত্তি করা হয়। এতে, যারা তাদের রবকে ভয় করে, তাদের শরীর শিউরে ওঠে, তারপর তাদের দেহ, মন বিনম্র হয়ে আল্লাহর স্মরণে ঝুঁকে পড়ে। এটাই আল্লাহর হিদায়াত, তিনি তা দ্বারা যাকে ইচ্ছে হিদায়াত করেন। আল্লাহ যাকে বিভ্রান্ত করেন তার কোন হেদায়াতকারী নেই। [সূরা যুমার,২৩]

তিনি আরও বলেন: “আল্লাহ্‌ যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে ইচ্ছা সঠিক পথে রাখেন।” [সূরা আনআম, ৬:৩৯] তিনি আরও বলেন: “আল্লাহ্‌ যাকে পথ দেখান সে-ই পথ পায় এবং যাদেরকে তিনি পথভ্রষ্ট করেন তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।” [সূরা আল-আরাফ, ৭:১৭৮]

একজন মুসলিম তার সালাতে দোয়া করে: “আমাকে সরল পথে অটল রাখুন।” [সূরা ফাতিহা, ১:৬] যেহেতু বান্দা জানে যে, হেদায়েত আল্লাহ্‌র হাতে। তা সত্ত্বেও বান্দা হেদায়েতের উপায়-উপকরণ গ্রহণ করতে আদিষ্ট। ধৈর্য রাখা, অবিচল থাকা এবং সরল পথে পথচলা শুরু করতে আদিষ্ট। কারণ আল্লাহ্‌ তাকে প্রোজ্জ্বল বিবেক-বুদ্ধি দিয়েছেন, স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দিয়েছেন; যা দিয়ে সে ভাল কিংবা মন্দ, হেদায়েত কিংবা পথভ্রষ্টতা নির্বাচন করতে পারে। যদি বান্দা প্রকৃত উপকরণগুলো ব্যবহার করে এবং এর জন্য সচেষ্ট থাকে তখন আল্লাহ্‌ তাকে হেদায়েত দেন, আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে সে তাওফিকপ্রাপ্ত হয়।

 আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন: “এভাবেই আমি এক দলকে আরেক দল দ্বারা পরীক্ষা করেছি; কেননা তারা বলতে পারত, ‘আল্লাহ্‌ কি আমাদের মধ্য থেকে এদেরকেই অনুগ্রহ করলেন?’ কৃতজ্ঞদের সম্পর্কে আল্লাহ্‌ই কি সবচেয়ে বেশী অবগত নন?” [সূরা আনআম, ৬:৫৩]

এই যে মাসয়ালাটি কিছু কিছু মানুষের কাছে জটিলতা তৈরী করে সেটা নিয়ে শাইখ উছাইমীন (রহঃ) দীর্ঘ আলোচনা করেছেন; তিনি বলেন:

 “যদি সব কিছুর উৎস হয় আল্লাহ্‌ তাআলার ইচ্ছা এবং সব কিছু তাঁর হাতেই থাকে তাহলে মানুষের পথ কী? যদি আল্লাহ্‌ তাআলা মানুষের পথভ্রষ্ট হওয়া ও হেদায়েত না-পাওয়া তাকদীরে রাখেন তাহলে মানুষের উপায় কী?

আমরা বলব: এর জবাব হচ্ছে আল্লাহ্‌ তাআলা কেবল তাকেই হেদায়েত দান করেন যে হেদায়েত পাওয়ার উপযুক্ত এবং তাকেই পথভ্রষ্ট করেন যে পথভ্রষ্ট হওয়ার উপযুক্ত। আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন: “কিন্তু তারা যখন বাঁকা পথ ধরল, তখন আল্লাহ্‌ও তাদের অন্তরকে বাঁকা করে দিলেন।” [সূরা আছ-ছফ, ৬১:৫] তিনি আরও বলেন: “অতএব তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গের কারণে আমি তাদেরকে অভিসম্পাত দিয়েছি এবং তাদের অন্তরসমূহ কঠিন করেছি। তারা শব্দসমূহের সঠিক অর্থ বিকৃত করে। তাদেরকে যা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছিল তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ তারা ভুলে গিয়েছে।” [সূরা আল-মা’ইদাহ, ৫:১৩]

আল্লাহ্‌ পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করেছেন যে, তিনি যে বান্দাকে পথভ্রষ্ট করেছেন তাকে পথভ্রষ্ট করার কারণ সে বান্দার পক্ষ থেকেই। বান্দা তো জানে না আল্লাহ্‌ তার তাকদীরে কী রেখেছেন। যেহেতু তাকদীরকৃত বিষয়টি সংঘটিত হওয়ার পর সে তাকদীরের কথা জানতে পারে। সে জানে না যে, আল্লাহ্‌ কি তাকে পথভ্রষ্ট হিসেবে তাকদীরে রেখেছেন; নাকি হেদায়েতপ্রাপ্ত হিসেবে? সুতরাং সে নিজে ভ্রষ্টতার পথ অবলম্বন করে কেন আপত্তি আরোপ করবে যে আল্লাহ্‌ই তার জন্য সেটা চেয়েছেন! তার জন্য কি এটাই উপযুক্ত ছিল না যে, সে নিজে হেদায়েতের পথে চলবে এবং এরপর বলবে: নিশ্চয় আল্লাহ্‌ আমাকে সঠিক পথে পরিচালিত করেছেন।

এটা কি তার জন্য সমীচীন যে পথভ্রষ্ট হওয়ার ক্ষেত্রে সে জাবারিয়া (নিয়তিবাদী) [1] হবে, আর আনুগত্যের সময় সে কাদারিয়া (তাকদীর অস্বীকারকারী) [2] হবে! কক্ষনো নয়, পথভ্রষ্টতা ও গুনাহর ক্ষেত্রে কোন মানুষের জাবারিয়া হওয়া সমীচীন নয় যে, পথভ্রষ্ট হয়ে কিংবা গুনাহ করে সে বলবে: এটি আমার জন্য লেখা ছিল ও তাকদীরে ছিল, আল্লাহ্‌ আমার জন্য যা ফয়সালা করে রেখেছেন সেটা থেকে বের হওয়া আমার পক্ষে সম্ভবপর নয়।

প্রকৃতপক্ষে মানুষের ক্ষমতা ও ইচ্ছাশক্তি রয়েছে। রিযিকের বিষয়টির চেয়ে হেদায়েতের বিষয় অধিক প্রচ্ছন্ন নয়। সকলের কাছেই সুবিদিত যে, মানুষের রিযিক পূর্বনির্ধারিত (তাকদীরকৃত)। কিন্তু তা সত্ত্বেও মানুষ রিযিক লাভের উপায়-উপকরণ অবলম্বন করার চেষ্টা করে; নিজের দেশে থেকে, বিদেশে গিয়ে, ডানে, বামে। কেউ নিজ বাড়ীতে বসে থেকে বলে না যে: আমার জন্য যে রিযিক নির্ধারণ করা আছে সেটা আমার কাছে আসবেই। বরং রিযিক লাভের উপায়-উপকরণগুলো গ্রহণ করার চেষ্টা করে। অথচ রিযিকের সাথে আমলের কথাও আছে; যেমনটি হাদিসে সাব্যস্ত হয়েছে।

নেক আমল বা বদ আমল করা যেমন লিপিবদ্ধ ঠিক তেমনি রিযিকও লিপিবদ্ধ। তাহলে দুনিয়ার রিযিক তালাশ করার জন্য আপনি ডানে যান, বামে যান, পৃথিবীতে ঘুরে বেড়ান; অথচ আখিরাতের রিযিক তালাশ করা ও চূড়ান্ত সুখ লাভে সফল হওয়ার জন্য আপনি নেক আমল করবেন না!

অথচ দুটো একই ধরণের। দুটোর মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। আপনি যেমন রিযিকের জন্য চেষ্টা করেন, নিজের জীবন ও বয়সকে প্রলম্বিত করার প্রচেষ্টা করেন: আপনি অসুস্থ হলে পৃথিবীর আনাচে কানাচে ভাল ডাক্তারের অনুসন্ধান করেন যিনি আপনার রোগের চিকিৎসা দিতে পারবে। অথচ আপনার আয়ু যতটুকু নির্ধারণ করা আছে তার চেয়ে একটুও বাড়বে না, কিংবা কমবে না। আপনি তো এর উপর নির্ভর করে বসে থাকেন না এবং বলেন না যে, আমি অসুস্থ হয়ে আমার ঘরে পড়ে থাকব; আল্লাহ্‌ যদি আমার আরও দীর্ঘ হায়াত নির্ধারণ করে রাখেন (তাকদীরে রাখেন) তাহলে হায়াত দীর্ঘায়িত হবেই। বরং আমরা দেখতে পাই যে, আপনি আপনার সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করেন, সন্ধান করেন যাতে করে এমন কোন ডাক্তার খুঁজে পান যার হাতে রোগ থেকে সুস্থ হওয়া আল্লাহ্‌ নির্ধারণ করে রেখেছেন।

তবে আপনার আখিরাতের ও সৎকর্মের পন্থা কেন দুনিয়ার কর্মপন্থার মত হয় না? ইতিপূর্বে আমরা উল্লেখ করেছি যে, ক্বাযা বা আল্লাহ্‌র ফয়সালা হচ্ছে এমন এক গোপন গূঢ় রহস্য যা জানা সম্ভবপর নয়।

এখন আপনার সামনে দুটো পথ খোলা আছে:

    • এক পথ আপনাকে নিরাপত্তা, সফলতা, সুখ ও সম্মানে পৌঁছাবে।

    • অপর পথ আপনাকে ধ্বংস, অনুতপ্ততা ও অসম্মানে পৌঁছাবে।

আপনি এখন এ দুটো রাস্তার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন এবং আপনি স্বাধীন। এমন কেউ নাই যে আপনাকে ডানের রাস্তায় চলতে বাধা দিবে কিংবা বামের রাস্তায় চলতে বাধা দিবে। আপনি চাইলে এই পথেও যেতে পারেন এবং ঐ পথেও যেতে পারেন

৯০ : ১০ وَ هَدَیۡنٰهُ النَّجۡدَیۡنِ

১০. আর আমরা তাকে দেখিয়েছি দুটি পথ। সূরা বালাদঃ১০

‘আমি তাকে পথের নির্দেশ দিয়েছি হয় সে কৃতজ্ঞ হবে, না হয় সে অকৃতজ্ঞ হবে।’’ (সূরা দাহার ৩ আয়াত)

৯১ : ৮ فَاَلۡهَمَهَا فُجُوۡرَهَا وَ تَقۡوٰىهَا ۪ۙ

৮. তারপর তাকে তার সৎকাজের এবং তার অসৎ-কাজের জ্ঞান দান করেছেন।সূরা আস শামসঃ৮

এ আলোচনার মাধ্যমে আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেল যে, মানুষ তার স্বনির্বাচিত কর্মে স্বাধীনভাবে অগ্রসর হতে পারে। অর্থাৎ সে তার দুনিয়াবী কর্মে যেভাবে স্বাধীনভাবে অগ্রসর হতে পারে; অনুরূপভাবে সে তার আখিরাতের পথেও এভাবে স্বাধীনভাবে চলতে পারে। বরং আখিরাতের পথগুলো দুনিয়ার পথগুলোর চেয়ে আরো বেশি সুস্পষ্ট। কারণ আখিরাতের পথগুলোর বর্ণনাকারী আল্লাহ্‌ তাআলা নিজে; তাঁর নাযিলকৃত গ্রন্থে ও তাঁর রাসূলের মুখে। তাই আখিরাতের পথগুলো দুনিয়ার পথগুলোর চেয়ে অধিক স্পষ্ট ও স্বচ্ছ। তা সত্ত্বেও মানুষ দুনিয়ার পথগুলো ধরে অগ্রসর হয়; যার ফলাফলের গ্যারান্টি নাই। কিন্তু আখিরাতের পথগুলো বর্জন করে; অথচ সেগুলোর ফলাফল গ্যারান্টিযুক্ত ও সুবিদিত; কেননা এর ফলাফল আল্লাহর প্রতিশ্রুত। আল্লাহ্‌তাঁয়ালা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন না

এই আলোচনার পর আমরা বলব: আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআত এই আকিদাকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তারা তাদের আকিদা-বিশ্বাস এভাবে ঠিক করেছেন যে, মানুষ নিজ ইচ্ছায় তার কর্ম করে এবং তার ইচ্ছানুযায়ী সে কথা বলে। কিন্তু তার ইচ্ছা ও এখতিয়ার আল্লাহ্‌র ইচ্ছা ও অভিপ্রায়ের অনুবর্তী

আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত ঈমান রাখে যে, আল্লাহ্‌র অভিপ্রায় তাঁর হেকমত (প্রজ্ঞা)-র অনুবর্তী। আল্লাহ্‌ তাআলার হেকমত বর্জিত কোন অভিপ্রায় নাই; বরং তাঁর অভিপ্রায় তাঁর হেকমতের অনুবর্তী। কেননা আল্লাহ্‌র নামসমূহের মধ্যে রয়েছে الحكيم “আল-হাকীম” (বিচারক, নিপুণ ও প্রজ্ঞাবান)। “আল-হাকীম” হচ্ছেন— যিনি সবকিছুর অস্তিত্বগত (কাউনি) ও আইনগত (শরয়ি) সিদ্ধান্ত দেন এবং কর্ম ও সৃষ্টির দিক থেকে সবকিছুকে নিপুণভাবে সম্পাদন করেন। আল্লাহ্‌ তাআলা তাঁর প্রজ্ঞা দিয়ে যার জন্য ইচ্ছা হেদায়েত নির্ধারণ করে রাখেন, যার ব্যাপারে জানেন যে সে সত্যকে গ্রহণ করতে চায় ও তার অন্তর সঠিক পথে আছে। আর যে এমন নয় তার জন্য পথভ্রষ্টতা নির্ধারণ করে রাখেন, যার কাছে ইসলামকে পেশ করা হলে তার অন্তর সংকুচিত হয়ে পড়ে যেন সে আকাশে আরোহণ করছে। আল্লাহ্‌ তাআলার প্রজ্ঞা এমন ব্যক্তির হেদায়েতপ্রাপ্ত হওয়াকে অস্বীকার করে; তবে যদি না আল্লাহ্‌ তাআলা তাঁর সংকল্পকে নবায়ন করেন এবং তাঁর পূর্ব ইচ্ছাকে অন্য কোন ইচ্ছা দিয়ে পরিবর্তন করে নেন। আল্লাহ্‌ তাআলা সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাবান। কিন্তু আল্লাহ্‌ তাআলার হেকমত (প্রজ্ঞা)-র দাবী হচ্ছে— হেতু বা কারণের সাথে ফলাফল সম্পৃক্ত থাকা।” [রিসালা ফিল কাযা ওয়াল ক্বাদর (পৃষ্ঠা-১৪-২১) থেকে সংক্ষেপিত ও সমাপ্ত

একজন মুসলিম ক্বাযা ও ক্বাদর (ভাগ্য ও নিয়তি)-এর বিষয়টি যে কর্মের দায়িত্ব তাকে দেয়া হয়েছে তার সাথে এভাবেই বুঝে থাকে। যে কর্মের উপর তার সুখ ও দুঃখ নির্ভর করে। হেদায়েতপ্রাপ্তি ও জান্নাতে প্রবেশের কারণ হচ্ছে— নেক আমল। আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন:

 “এই হল জান্নাত; তোমাদের কর্মের প্রতিদানে তোমাদেরকে এর উত্তরাধিকারী করা হয়েছে।” [সূরা আরাফ, ৭:৪৩]

তিনি আরও বলেন: “তোমরা যেসব (ভাল) কাজ করতে তার প্রতিদানস্বরূপ জান্নাতে প্রবেশ কর।” [সূরা নাহল, ১৬:৩২]

 আর পথভ্রষ্টতা ও জাহান্নামের প্রবেশের কারণ হচ্ছে— আল্লাহর অবাধ্যতা ও তাঁর আনুগত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া। জাহান্নামবাসীদের সম্পর্কে আল্লাহ্‌তাআলা বলেন: “তারপর অন্যায়কারীদেরকে বলা হবে, ‘চিরন্তন শাস্তি আস্বাদন কর। তোমরা যা উপার্জন করতে তোমাদেরকে তারই প্রতিফল দেওয়া হচ্ছে।” [সূরা ইউনুস, ১০:৫২]  তিনি আরও বলেন: “তোমরা তোমাদের কৃতকর্মের জন্য চিরস্থায়ী শাস্তি ভোগ করতে থাক।” [সূরা আস-সাজদাহ, ৩২:১৪]

হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দো’আ করতেন,

 (اللَّهُمَّ آتِ نَفْسِي تَقْوَاهَا وَزَكِّهَا أَنْتَ خَيْرُ مَنْ زَكَّاهَا أَنْتَ وَلِيُّهَا وَمَوْلَاهَا) অর্থাৎ

 “হে আল্লাহ আমাকে তাকওয়ার তওফীক দান করুন এবং নাফসকে পবিত্র করুন, আপনিই তো উত্তম পবিত্রকারী। আর আপনিই আমার নাফসের মুরুব্বী ও পৃষ্ঠপোষক।” [মুসলিম: ২৭২২]

এভাবে বুঝলে একজন মুসলিম সঠিক পথে তার প্রথম পদক্ষেপ ফেলতে পারবে। সে তার জীবনের একটি মুহূর্তও আল্লাহ্‌র পথে আমল করা ছাড়া নষ্ট করবে না। একই সময়ে সে তার রবের প্রতি বিনয়ী থাকবে এবং উপলব্ধি করবে যে, তাঁর হাতেই রয়েছে আসমান ও জমিনের নিয়ন্ত্রণ। তখন সে সার্বক্ষণিক তাঁর কাছে ভিখারি হয়ে থাকা ও তাঁর তাওফিকপ্রাপ্তির প্রয়োজন অনুভব করবে।

আমরা আল্লাহ্‌ তাআলার কাছে আমাদের জন্য ও আপনাদের জন্য হেদায়েতপ্রাপ্তি এবং সকল ভাল কর্মের তাওফিক প্রার্থনা করছি।আল্লাহ্‌ই সর্বজ্ঞ।

মূল ফতোয়ার লিঙ্কঃ

 বাংলাঃ  https://islamqa.info/bn/220690/

[1] প্রাচীন একটি ভ্রান্ত আকিদা। এই আকিদার অনুসারীরা মানুষের কর্মের প্রভাবকে অস্বীকার করতো। তারা মনে করতো স্রেফ তাকদিরের জন্যই সব কিছু হয়, মানুষের কর্মের আদৌ ভূমিকা নেই। বর্তমান সময়েও অনেকে কুরআন-সুন্নাহর অর্থ ঠিকভাবে অনুধাবন না করে এই ধরনের আকিদা পোষণ করে। অনেক ইসলামবিরোধী আছে যারা এই ধরণের ব্যাখ্যা করে ইসলামে তাকদিরের ধারণাকে অনৈতিক বা জুলুমমূলক দাবি করে মুসলিমদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে।

[2] আরেকটি ভ্রান্ত আকিদা। এই আকিদার অনুসারীরা তাকদির বা আল্লাহর পূর্বনির্ধারণের প্রভাবকে অস্বীকার করতো। বর্তমান যুগেও কেউ কেউ ইসলামবিরোধীদের জবাব দিতে গিয়ে অজ্ঞতাবশত নিজের অজান্তেই এই ধরণের বিশ্বাস পোষণ করতে শুরু করে। আহলুস সুন্নাহর আকিদা জাবারিয়া, কাদারিয়া কোনোটিই নয়। আহলুস সুন্নাহর আকিদা হচ্ছে কুরআন-সুন্নাহর আকিদা। যেখানে মানুষের কর্ম এবং পূর্বলিখন উভয়ের প্রভাবেরই উল্লেখ আছে।

এর সম্পর্ক তকদীরের সাথে। অর্থাৎ, প্রত্যেক মানুষ ও জ্বিনের ব্যাপারে আল্লাহর জানা ছিল যে, পৃথিবীতে গিয়ে তারা ভাল করবে না মন্দ করবে, সেই মত তিনি লিখে দিয়েছেন। এখানে ঐ সকল দোযখবাসীদের কথা উল্লিখিত হয়েছে, যারা আল্লাহর পূর্বজ্ঞান অনুযায়ী দোযখবাসী হওয়ারই কাজ করবে। পরবর্তীতে তাদের আরো কিছু গুণের কথা বলা হয়েছে যে, যাদের মধ্যে এ সকল জিনিস এভাবে পাওয়া যাবে, যার বর্ণনা এখানে দেওয়া হয়েছে, জানতে হবে তাদের পরিণাম হবে মন্দ।

এর অর্থ এটা নয় যে, আমি তাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করার জন্যই সৃষ্টি করেছিলাম এবং তাদেরকে সৃষ্টি করার সময় এ সংকল্প করেছিলাম যে, তাদেরকে জাহান্নামের ইন্ধনে পরিণত করবো এবং এর সঠিক অর্থ হচ্ছে, আমি তো তাদেরকে হৃদয়, মস্তিষ্ক, কান, চোখ সবকিছুসহ সৃষ্টি করেছিলাম। কিন্তু এ বেকুফরা এগুলোকে যথাযথভাবে ব্যবহার করেনি এবং নিজেদের অসৎ কাজের বদৌলতে শেষ পর্যন্ত তারা জাহান্নামের ইন্ধনে পরিণত হয়েছে। চরম দুঃখ প্রকাশ ও আক্ষেপ করার জন্য মানুষের ভাষায় যে ধরনের বাক-রীতির প্রচলন রয়েছে, এখানেও এ বিষয়বস্তুটি প্রকাশ করার জন্য সেই একই ধরনের বাক্য-রীতির আশ্রয় নেয়া হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কোন মায়ের কয়েকজন জোয়ান ছেলে যুদ্ধে মারা গেলে সে লোকদের বলতে থাকে, আমি তাদেরকে যুদ্ধের ময়দানে জীবন দান করার জন্যই বুঝি খাইয়ে পরিয়ে বড় করেছিলাম। এ বাক্যে মায়ের বক্তব্যের উদ্দেশ্য এ নয় যে, সত্যই সে তার সন্তানদেরকে এ উদ্দেশ্যে লালন পালন করেছিল বরং এ ধরনের আক্ষেপের সুরে সে আসলে বলতে চায়, আমি নিজের সন্তানদেরকে বড়ই পরিশ্রম করে নিজের শরীরের রক্ত পানি করে বড় করে তুলে ছিলাম। কিন্তু আল্লাহ‌ বিপর্যয় সৃষ্টিকারী যুদ্ধবাজদেরকে শাস্তি দিন। কারণ তাদের জন্যই আমার পরিশ্রম ও ত্যাগের ফসল এভাবে মাটি হয়ে গেলো।

আয়াতে বলা হয়েছেঃ এরা কিছুই বোঝে না, কোন কিছু দেখেও না এবং শুনেও না। অথচ বাস্তবে এরা পাগল বা উম্মাদ নয় যে, কিছুই বুঝতে পারে না। অন্ধও নয় যে, কোন কিছু দেখবে না, কিংবা বধিরও নয় যে, কোন কিছু শুনবে না। বরং প্রকৃতপক্ষে এরা পার্থিব বিষয়ে অধিকাংশ লোকের তুলনায় অধিক সতর্ক ও চতুর। উদ্দেশ্য এই যে, তাদের যা বুঝা বা উপলব্ধি করা উচিত ছিল তারা তা করেনি, যা দেখা উচিত ছিল তা তারা দেখেনি, যা কিছু তাদের শুনা উচিত ছিল তা তারা শুনেনি। আর যা কিছু বুঝেছে, দেখেছে এবং শুনেছে, তা সবই ছিল সাধারণ জীবজন্তুর পর্যায়ের বুঝা, দেখা ও শুনা, যাতে গাধা-ঘোড়া, গরু-ছাগল সবই সমান।

এ জন্যই উল্লেখিত আয়াতের শেষাংশে এসব লোক সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ “এরা চতুস্পদ জীব-জানোয়ারের মত।” শুধুমাত্র শরীরের বর্তমান কাঠামোর সেবায় নিয়োজিত। খাদ্য আর পেটই হলো তাদের চিন্তার সর্বোচ্চ স্তর। অতঃপর বলা হয়েছেঃ “এরা চতুস্পদ জীব-জানোয়ারের চেয়েও নিকৃষ্ট” তার কারণ চতুস্পদ জীব-জানোয়ার শরীআতের বিধি-নিষেধের আওতাভুক্ত নয়- তাদের জন্য কোন সাজা-শাস্তি কিংবা দান-প্রতিদান নেই। তাদের লক্ষ্য যদি শুধুমাত্র জীবন ও শরীর-কাঠামোতে সীমিত থাকে তবেই যথেষ্ট। কিন্তু মানুষকে যে স্বীয় কৃতকর্মের হিসাব দিতে হবে। সেজন্য তাদের সুফল কিংবা শাস্তি ভোগ করতে হবে। কাজেই এসব বিষয়কেই নিজেদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য বলে সাব্যস্ত করে বসা জীবজন্তুর চেয়েও অধিক নির্বুদ্ধিতা। তাছাড়া জীব-জানোয়ার নিজের প্রভূ ও মালিকের সেবা যথার্থই সম্পাদন করে। পক্ষান্তরে অকৃতজ্ঞ না-ফরমান মানুষ স্বীয় মালিক, পালনকর্তার আনুগত্যে ক্রটি করতে থাকে। সে কারণে তারা চতুস্পদ জানোয়ার অপেক্ষা বেশী নির্বোধ ও গাফেল। কাজেই বলা হয়েছে “এরাই হলো প্রকৃত গাফেল।” [দেখুন, তাবারী; ইবন কাসীর]

আয়াতে বলা হয়েছে যে, “সব উত্তম নাম আল্লাহরই জন্য নির্ধারিত রয়েছে। কাজেই তোমরা তাকে সেসব নামেই ডাক৷” এখানে উত্তম নাম বলতে সে সমস্ত নামকে বুঝানো হয়েছে, যা গুণ-বৈশিষ্ট্যের পরিপূর্ণতার সর্বোচ্চ স্তরকে চিহ্নিত করে। বলাবাহুল্য, কোন গুণ বা বৈশিষ্ট্যের সর্বোচ্চ স্তর যার ঊর্ধ্বে আর কোন স্তর থাকতে পারে না, তা শুধুমাত্র মহান পালনকর্তা আল্লাহ জাল্লা শানুহুর জন্যই নির্দিষ্ট। তাকে ছাড়া কোন সৃষ্টির পক্ষে এই স্তরে উন্নীত হওয়া সম্ভব নয়। সে কারণেই আয়াতে এমন ভাষা প্রয়োগ করা হয়েছে, যাতে বুঝা যায় যে, এসব আসমাউল-হুসনা বা উত্তম নামসমূহ একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের বৈশিষ্ট্য। এ বৈশিষ্ট্য লাভ করা অন্য কারো পক্ষে সম্ভব নয়; কাজেই এ বিষয়টি যখন জানা গেল যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কিছু আসমাউল-হুসনা রয়েছে এবং সে সমস্ত ‘ইসম’ বা নাম একমাত্র আল্লাহর সত্তার সাথেই নির্দিষ্ট, তখন আল্লাহকে যখনই ডাকবে এসব নামে ডাকাই কর্তব্য।

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ‘আল্লাহ তা’আলার নিরানব্বইটি এমন নাম রয়েছে, কোন ব্যক্তি যদি এগুলোকে আয়ত্ত করে নেয়, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। [বুখারীঃ ৬৪১০, মুসলিমঃ ২৬৭৭]

হাদীসে বলা হয়েছে, “আল্লাহর এমন নিরানব্বইটি নাম রয়েছে যে কেউ এগুলোর (সঠিকভাবে) সংরক্ষণ করবে (হক আদায় করবে) সে জান্নাতে যাবে”। [বুখারী: ২৭৩৬, মুসলিম: ২৬৭৭]

এই নিরানব্বইটি নাম সম্পর্কে ইমাম তিরমিযী ও হাকেম সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু যেহেতু তা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে সরাসরি সহীহ সনদে বর্ণিত হয়নি তাই সেগুলো নির্ধারনে কোন অকাট্য কিছু বলা যাবে না। আবার এটা জেনে নেওয়াও জরুরী যে, আল্লাহর নাম নিরানব্বইটিতেই সীমাবদ্ধ নয়। আল্লাহর নামের অসীলা দিয়ে দোআ করা জরুরী।

هُوَ ٱللَّهُ ٱلْخَٰلِقُ ٱلْبَارِئُ ٱلْمُصَوِّرُ لَهُ ٱلْأَسْمَآءُ ٱلْحُسْنَىٰ يُسَبِّحُ لَهُۥ مَا فِى ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلْأَرْضِ وَهُوَ ٱلْعَزِيزُ ٱلْحَكِيمُ

সেই পরম সত্তা তো আল্লাহ-ই যিনি সৃষ্টির পরিকল্পনাকারী, পরিকল্পনা বাস্তবায়নের র্নিদেশ দানকারী এবং সেই অনুপাতে রূপদানকারী। উত্তম নামসমূহ তাঁর-ই। আসমান ও যমীনের সবকিছু তাঁর তাসবীহ বা পবিত্রতা বর্ণনা করে চলেছে। তিনি পরাক্রমশালী ও মহাজ্ঞানী। সূরা হাশরঃ ২৪

আল্লাহ স্বয়ং ওয়াদা করেছেনঃ  وَ قَالَ رَبُّكُمُ ادۡعُوۡنِیۡۤ اَسۡتَجِبۡ لَكُمۡ

 “তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের প্রার্থনা মঞ্জুর করব।” [সূরা গাফেরঃ ৬০] আরও বলেনঃ

আল্লাহ বলেন, (فَادْعُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ)

“সুতরাং আল্লাহকে ডাক তাঁর আনুগত্যে একনিষ্ঠ হয়ে”। [সূরা গাফিরঃ ১৪]

২ : ১৮৬ وَ اِذَا سَاَلَكَ عِبَادِیۡ عَنِّیۡ فَاِنِّیۡ قَرِیۡبٌ ؕ اُجِیۡبُ دَعۡوَۃَ الدَّاعِ اِذَا دَعَانِ ۙ فَلۡیَسۡتَجِیۡبُوۡا لِیۡ وَ لۡیُؤۡمِنُوۡا بِیۡ لَعَلَّهُمۡ یَرۡشُدُوۡنَ

 আর আমার বান্দাগণ যখন আমার সম্পর্কে আপনাকে জিজ্ঞেস করে, (তখন বলে দিন যে) নিশ্চয় আমি অতি নিকটে। আহবানকারী যখন আমাকে আহবান করে আমি তার আহবানে সাড়া দেই। কাজেই তারাও আমার ডাকে সাড়া দিক এবং আমার প্রতি ঈমান আনুক, যাতে তারা সঠিক পথে চলতে পারে। [সূরা আল-বাকারাহঃ ১৮৬]

‘দোআ’ শব্দের অর্থ হচ্ছে, ডাকা কিংবা আহবান করা। আর দোআ শব্দটি কুরআনে দুই অর্থে ব্যবহৃত হয়। একটি হল আল্লাহর যিকির, প্রশংসা ও তাসবীহ-তাহলীলের সাথে যুক্ত। যা ইবাদাতগত দোআ নামে খ্যাত। আর অপরটি হল নিজের অভীষ্ট বিষয় প্রার্থনা এবং বিপদাপদ থেকে মুক্তি আর সকল জটিলতার নিরসনকল্পে সাহায্যের আবেদন সম্পর্কিত। যাকে প্রার্থনাগত দো’আ বলা হয়। এ আয়াতে ‘দোআ’ শব্দটি উভয় অর্থেই ব্যাপক।

‘দোআ’ শব্দের অর্থ হচ্ছে, ডাকা কিংবা আহবান করা। আর দোআ শব্দটি কুরআনে দুই অর্থে ব্যবহৃত হয়। একটি হল আল্লাহর যিকির, প্রশংসা ও তাসবীহ-তাহলীলের সাথে যুক্ত। যা ইবাদাতগত দোআ নামে খ্যাত। আর অপরটি হল নিজের অভীষ্ট বিষয় প্রার্থনা এবং বিপদাপদ থেকে মুক্তি আর সকল জটিলতার নিরসনকল্পে সাহায্যের আবেদন সম্পর্কিত। যাকে প্রার্থনাগত দো’আ বলা হয়। এ আয়াতে ‘দোআ’ শব্দটি উভয় অর্থেই ব্যাপক।

বস্তুত: এ আয়াতের মাধ্যমে গোটা মুসলিম জাতি দো’আ প্রার্থনার বিষয়ে দুটি হেদায়াত বা দিক নির্দেশ লাভ করেছে।

প্রথমতঃ আল্লাহ ব্যতীত কোন সত্তাই হামদ-সানা কিংবা বিপদমুক্তি বা উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য ডাকার যোগ্য নয়। দ্বিতীয়তঃ তাকে ডাকার জন্য মানুষ এমন মুক্ত নয় যে, যে কোন শব্দে ইচ্ছা ডাকতে থাকবে, বরং আল্লাহ বিশেষ অনুগ্রহপরবশ হয়ে আমাদিগকে সেসব শব্দসমষ্টিও শিখিয়ে দিয়েছেন যা তার মহত্ত্ব ও মর্যাদার উপযোগী। কারণ, আল্লাহ্ তা’আলার গুণ-বৈশিষ্ট্যের সব দিক লক্ষ্য রেখে তার মহত্ত্বের উপযোগী শব্দ চয়ন করতে পারা মানুষের সাধ্যের উর্ধ্বে।

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ‘আল্লাহ তা’আলার নিরানব্বইটি এমন নাম রয়েছে, কোন ব্যক্তি যদি এগুলোকে আয়ত্ত করে নেয়, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। [বুখারীঃ ৬৪১০, মুসলিমঃ ২৬৭৭]

হাদীসে বর্ণিত আছেঃ ‘দোআই হল ইবাদাত’। আবু দাউদঃ ১৪৭৯, তিরমিযীঃ ৩২৪৭] যে উদ্দেশ্যে মানুষ দোআ করে অধিকাংশ সময় হুবহু সে উদ্দেশ্যটি সিদ্ধ হয়ে যায়। আবার কোন কোন সময় এমনও হয় যে, যে বিষয়টিকে প্রার্থনাকারী নিজের উদ্দেশ্য সাব্যস্ত করেছিল, তা তার পক্ষে কল্যাণকর নয় বলে আল্লাহ স্বীয় অনুগ্রহে সে দোআকে অন্য দিকে ফিরিয়ে দেন, যা তার জন্য একান্ত উপকারী ও কল্যাণকর। আর আল্লাহর হামদ ও সানার মাধ্যমে যিকর করা হল ঈমানের খোরাক। এর দ্বারা আল্লাহ্ তা’আলার প্রতি মানুষের মহব্বত ও আগ্রহ বৃদ্ধি পায় ও তাতে সামান্য পার্থিব দুঃখ-কষ্ট উপস্থিত হলেও শীঘ্রই তা সহজ হয়ে যায়।

সেজন্যই হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “যে লোক চিন্তা-ভাবনা, পেরেশানী কিংবা কোন জটিল বিষয়ের সম্মুখীন হবে, তার পক্ষে নিম্নলিখিত বাক্যগুলো পড়া উচিত। তাতে সমস্ত জটিলতা সহজ হয়ে যাবেঃ

  لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ الْعَظِيمُ الْحَلِيمُ، لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ، لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ رَبُّ السَّمَوَاتِ، وَرَبُّ الْأَرْضِ، وَرَبُّ الْعَرْشِ العَظِيمِ

অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া ইবাদতের যোগ্য কোন মা’বুদ নেই, তিনি মহান, সহনশীল। আল্লাহ ছাড়া ইবাদতের যোগ্য কোন মা’বূদ নেই, তিনি আরশের মহান প্রতিপালক। আল্লাহ ছাড়া কোন ইবাদতের যোগ্য মা’বূদ নেই, তিনি আসমান ও যমীনের প্রতিপালক এবং আরশের মহান প্রতিপালক। [বুখারীঃ ৬৩৪৫, মুসলিমঃ ২৭৩০]

অন্য এক হাদীসে আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস ওয়াসাল্লাম ফাতেমা যাহরা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে বলেনঃ “আমার ওসীয়তগুলো শুনে নিতে (এবং সেমতে আমল করতে) তোমার বাধা কিসে? সে ওসীয়তটি হল এই যে, সকাল-সন্ধ্যায় এই দোআটি পড়ে নেবেঃ

يَا حَيُّ يَا قَيُّومُ بِرَحْمَتِكَ أَسْتَغِيثُ، أَصْلِحْ لِي شَأْنِي كُلَّهُ، وَلَا تَكِلْنِي إِلَى نَفْسِي طَرْفَةَ عَيْنٍ

হে চিরঞ্জীব, হে সবকিছুর ধারক! আমি আপনার রাহমাতের বিনিময়ে উদ্ধার কামনা করছি, আমার যাবতীয় ব্যাপার ঠিক করে দিন আর আমাকে আমার নিজের কাছে ক্ষনিকের জন্যও সোপর্দ করেন না। [তিরমিযীঃ ৩৫২৪, অনুরূপ আবুদাউদঃ ৫০৯০] [সিফাতুল্লাহিল ওয়ারিদা ফিল কিতাবি ওয়াস সুন্নাহ]

সারকথা হল এই যে, উল্লেখিত আয়াতের এ বাক্যে উম্মতকে দুটি হেদায়াত দেয়া হয়েছে।

একটি হল এই যে, যে কোন উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য, যে কোন বিপদ থেকে মুক্তি লাভের জন্য শুধুমাত্র আল্লাহকেই ডাকবে। কোন সৃষ্টিকে নয়।

অপরটি হল এই যে, তাকে সে নামেই ডাকবে যা আল্লাহ তা’আলার নাম হিসাবে প্রমাণিত হয়েছে; তার শব্দের কোন পরিবর্তন করবে না।

আয়াতের পরবর্তী বাক্যে এ সম্পর্কেই বলা হয়েছেঃ সে সমস্ত লোকের কথা ছাড়ুন, যারা আল্লাহ্ তা’আলার আসমায়ে-হুসনার ব্যাপারে বাক চাল অবলম্বন করে। তারা তাদের কৃত বাঁকামীর প্রতিফল পেয়ে যাবে। অভিধান অনুযায়ী ‘ইলহাদ’ অর্থ ঝুঁকে পড়া এবং মধ্যমপন্থা থেকে সরে পড়া। কুরআনের পরিভাষায় ইলহাদ বলা হয় সঠিক অর্থ ছেড়ে তাতে এদিক সেদিকের ব্যাখ্যা- বিশ্লেষণ জুড়ে দেয়াকে।

إلحاد (ইলহাদ) এর অর্থ হল এক দিকে ঝুঁকে পড়া। আর এর থেকে ‘লাহাদ’ এসেছে। লাহাদ ঐ কবরকে বলা হয় যার একদিক খনন করা হয়। দ্বীনের মধ্যে ইলহাদ হল, বক্রপথ অবলম্বন করা বা ধর্মত্যাগী হওয়া।

এ আয়াতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস ওয়াসাল্লামকে হেদায়াত দেয়া হয়েছে যে, আপনি এমন সব লোকের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলুন, যারা আল্লাহ্ তা’আলার আসমায়ে-হুসনার ব্যাপারে বক্রতা অর্থাৎ অপব্যাখ্যা ও অপবিশ্লেষণ করে।

আল্লাহর নামের অপব্যাখ্যা ও বিকৃতির কয়েকটি পন্থাই হতে পারে। আর সে সমস্তই এ আয়াতে বর্ণিত বিষয়বস্তুর অন্তর্ভুক্ত।

প্রথমতঃ আল্লাহ্ তা’আলার জন্য এমন কোন নাম ব্যবহার করা যা কুরআন-হাদীসের দ্বারা প্রমাণিত নয়। সত্যনিষ্ঠ আলেমগণ এ ব্যাপারে একমত যে, আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর ব্যাপারে কারুরই এমন কোন অধিকার নেই যে, যে যা ইচ্ছা নাম রাখবে কিংবা যে গুণে ইচ্ছা তার গুণাগুণ প্রকাশ করবে। শুধুমাত্র সে সমস্ত শব্দ প্রয়োগ করাই আবশ্যক যা কুরআন ও সুন্নায় আল্লাহ তা’আলার নাম কিংবা গুণ হিসেবে উল্লেখিত রয়েছে। যেমন, আল্লাহকে ‘কারীম’ বলা যাবে, কিন্তু ‘ছখী’ নামে ডাকা যাবে না। ‘নুর’ নামে ডাকা যাবে, কিন্তু ‘জ্যোতি’ ডাকা যাবে না। কারণ, এই দ্বিতীয় শব্দগুলো প্রথম শব্দের সমর্থক হলেও কুরআন হাদীসে বর্ণিত হয়নি।

বিকৃতি সাধনের দ্বিতীয় পন্থটি হলো আল্লাহর যে সমস্ত নাম কুরআন-হাদীসে উল্লেখ রয়েছে সেগুলোর মধ্যে কোন নামকে অশোভন মনে করে বর্জন বা পরিহার করা। এতে সে নামের প্রতি বেআদবী বা অবজ্ঞা প্রদর্শন বুঝা যায়।

বিকৃতির তৃতীয় পন্থা হলো আল্লাহর জন্য নির্ধারিত নাম অন্য কোন লোকের জন্য ব্যবহার করা। তবে এতে এই ব্যাখ্যা রয়েছে যে, আসমায়ে-হুসনাসমূহের মধ্যে কিছু নাম এমনও আছে যেগুলো স্বয়ং কুরআন ও হাদীসে অন্যান্য লোকের জন্যও ব্যবহার করা হয়েছে। আর কিছু নাম রয়েছে যেগুলো শুধুমাত্র আল্লাহ্ ব্যতীত অপর কারো জন্য ব্যবহার করার কোন প্রমাণ কুরআন-হাদীসে নেই। যেসব নাম আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও জন্য ব্যবহার করা কুরআন-হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে, সেসব নাম অন্যের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। যেমন, রাহীম, রাশীদ, আলী, কারীম, আজীজ প্রভৃতি। পক্ষান্তরে আল্লাহ ছাড়া অপর কারো জন্য যেসব নামের ব্যবহার কুরআন-হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নয়, সেগুলো একমাত্র আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট।

আল্লাহ ছাড়া অন্য করে জন্য এগুলোর ব্যবহার করাই উল্লেখিত ইলহাদ তথা বিকৃতি সাধনের অন্তর্ভুক্ত এবং না-জায়েয ও হারাম। যেমন, রাহমান, রাযযাক, খালেক, গাফফার, কুদ্দুস প্রভৃতি। [সিফাতুল্লাহিল ওয়ারিদা ফিল কিতাবি ওয়াস সুন্নাহ] তদুপরি এই নির্দিষ্ট নামগুলো যদি আল্লাহ ছাড়া অপর কারো ক্ষেত্রে কোন ভ্রান্ত বিশ্বাসের ভিত্তিতে হয় যে, যাকে এসব শব্দের দ্বারা সম্বোধন করা হচ্ছে তাকেই যদি খালেক কিংবা রাযযাক মনে করা হয়, তাহলে তা বড় শির্ক। আর বিশ্বাস যদি ভ্রান্ত না হয়, শুধুমাত্র অমনোযোগিতা কিংবা না বুঝার দরুন কাউকে খালেক, রাযযাক, রাহমান বলে ডেকে থাকে, তাহলে তা যদিও কুফর নয়, কিন্তু শির্কীসুলভ শব্দ হওয়ার কারণে কঠিন পাপের কাজ বটে। [আশ-শির্ক ফিল কাদীম ওয়াল হাদীস]

আল্লাহ পাক বলেন- আমার সৃষ্ট কওমের মধ্যে কোন কোন কওম কথায় ও কাজে সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। তারা সত্য কথা বলে, সত্যের দিকে মানুষকে আহ্বান করে এবং সত্যের হিসেবে ফায়সালাও করে। এই উম্মত দ্বারা উম্মতে মুহাম্মাদীয়াকে বুঝানো হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন এই আয়াতটি পাঠ করতেন তখন বলতেনঃ এই লোক তোমরাই। আর ঐ কওমও, যারা তোমাদের পূর্বে অতীত হয়েছে। তারাও লোকদেরকে সত্যের দিকে আহ্বান করতো।”

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমার উম্মতের মধ্যে একদল আল্লাহ্‌র সুনির্দিষ্ট নির্দেশ আসা পর্যন্ত  আল্লাহ্‌র আদেশকে বাস্তাবায়ন করার জন্য সদা-সর্বদা প্রস্তুত থাকবে। তাদেরকে কেউ মিথ্যারোপ করবে অথবা অপমান করবে তার পরোয়া তারা করবে না। [বুখারীঃ ৭৪৬০, মুসলিমঃ ১০৩৭]

আবদ্ ইবনে হুমাইদের এক রেওয়ায়েতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) সাহাবায়ে কিরাম (রা)-কে উদ্দেশ্য করে বললেন, এ আয়াতটি তোমাদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। আর তোমাদের পূর্বেও একটি উম্মতকে এ সমস্ত বৈশিষ্ট্য দান করা হয়েছিল। অতঃপর তিনি তিলাওয়াত করলেন وَمِنْ قَوْمِ مُوسَى أُمَّةٌ يَهْدُونَ بِالْحَقِّ وَبِهِ يَعْدِلُونَ অর্থাৎ হযরত মূসা (আ)-এর উম্মতের মধ্যেও একটি দল এ সমস্ত গুণ-বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ছিল। তারাও মানুষকে সৎ পথ প্রদর্শন এবং নিজেদের বিবাদ-বিসংবাদের মীমাংসার ব্যাপারে ন্যায়ের অর্থাৎ আল্লাহ্ প্রদত্ত শরীয়তের পরিপূর্ণ অনুসরণ করত। বস্তুত হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর উম্মতকেও আল্লাহ্ তা’আলা এ সমস্ত গুণ-বৈশিষ্ট্যে অনন্য করে দিয়েছেন

 এর সার-সংক্ষেপ হলো দুটি চরিত্র।

একটি হলো অন্যান্য লোকের নেতৃত্ব দান, পথ প্রদর্শন কিংবা পরামর্শ দানে শরীয়তের অনুসরণ করা।

দ্বিতীয়টি হলো পরস্পরের মধ্যে কোন ঝগড়া-বিবাদের সৃষ্টি হলে শরীয়তের আইন অনুসারে তার মীমাংসা করা।

 লক্ষ্য করলে বোঝা যায় যে, এ দুটি চরিত্রই এমন যা কোন জাতি ও সম্প্রদায়ের মঙ্গল, সুখ-সাচ্ছন্দ্য এবং দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের যমীন হতে পারে যে, শান্তি ও যুদ্ধ আর মৈত্রী ও শত্রুতা যেকোন অবস্থায়ই তাদের নীতি হবে ন্যায় ও সত্যনিষ্ঠ। বন্ধু হোক আর প্রতিপক্ষ হোক, যাকেই যে পরামর্শ দেবে, যে কর্মপন্থা বাতলাবে, তাতে ন্যায়েরই অনুসরণ করবে। আর প্রতিপক্ষের সাথে বিবাদের ক্ষেত্রেও ন্যায়ের সমর্থনে নিজের যাবতীয় ধ্যান-ধারণা ও কামনা-বাসনাকে বিসর্জন দিয়ে দেবে। এরই সার-সংক্ষেপ হলো সত্যনিষ্ঠা।

 এই সত্যনিষ্ঠাই মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর উম্মতের মর্যাদা অন্য সমস্ত উম্মত অপেক্ষা অধিক হওয়ার রহস্য এবং তাদের বৈশিষ্ট্য। যারা সত্যিকারভাবে উম্মতে মুহাম্মদী তারা নিজের সমগ্র জীবনকে ন্যায়ের অনুগামী করে দেয়। যে দল বা পার্টির নেতৃত্ব দেয় তাও একান্ত নির্ভেজাল ন্যায় ও সত্যের ভিত্তিতেই দিয়ে থাকে। নিজের ব্যক্তিগত কোন স্বার্থ বা কামনা-বাসনা এবং বংশগত কিংবা জাতীয় আচার আচরণের কোন প্রভাব তাতে থাকতে দেয় না। আর পারস্পরিক বিবাদ-বিসংবাদের ক্ষেত্রেও সবসময় ন্যায়ের সামনে মস্তক অবনত করে দেয়। কাজেই সাহাবায়ে কিরাম (রা) ও তাবেঈন (রা)-এর সমগ্র ইতিহাস এই চরিত্রেরই বিকাশ।

 পক্ষান্তরে যখনই এ উম্মতের উল্লিখিত দুটি চরিত্রে কোন রকম ত্রুটি-বিচ্যুতি ঘটেছে, তখন থেকেই শুরু হয়েছে অবনতি ও বিপর্যয়।