সূরা আরাফঃ ২১তম রুকু(১৬৩-১৭১আয়াত)

এই জনবসতিটি সঠিক কোন শহর বা গ্রাম ছিল সে সম্পর্কে মতভেদ আছে। কেউ কেউ বলেন আইলাহ, কেউ বলেন ত্বাবারিয়্যাহ, কেউ ঈলিয়া, আবার কেউ বলেন শাম দেশের কোন এক জনপদ; যা সমূদ্রতীরে অবস্থিত ছিল। মুফাসসিরদের অধিক মত আইলার দিকে। যা মাদয়্যান ও ত্বূর পাহাড়ের মধ্যবর্তী লোহিত সাগরের তীরে অবস্থিত।

বিশেষজ্ঞদের অধিকাংশের মতে এ স্থানটি ছিল ‘আয়লা, ‘আয়লাত’ বা ‘আয়লুত’। ইসরাঈলের ইহুদী রাষ্ট্র বর্তমানে এখানে এ নামে একটি বন্দর নির্মাণ করেছে। এর কাছেই রয়েছে জর্দানের বিখ্যাত বন্দর আকাবা। লোহিত সাগরের যে শাখাটি সিনাই উপদ্বীপের পূর্ব উপকূল ও আরবের পশ্চিম উপকূলের মাঝখানে একটি লম্বা উপসাগরের মত দেখায়, তার ঠিক শেষ মাথায় এ স্থানটি অবস্থিত। বনী ইসরাঈলের উত্থানযুগে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র ছিল। হযরত সুলাইমান আলাইহিস সালাম এ শহরেই তাঁর লোহিত সাগরের সামরিক ও বাণিজ্যিক নৌবহরের কেন্দ্র স্থাপন করেছিলেন।

এখানে যে ঘটনাটির দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে ইহুদীদের পবিত্র গ্রন্থসমূহে আমরা তার কোন উল্লেখ পাই না। তাদের ইতিহাসও এ প্রসঙ্গে নীরব। কিন্তু কুরআন মজীদে যেভাবে এ ঘটনাটিকে এখানে ও সূরা বাকারায় বর্ণনা করা হয়েছে, তা থেকে পরিষ্কার প্রতীয়মান হয় যে, কুরআন নাযিলের সময় বনী ইসরাঈলীরা সাধারণভাবে এ ঘটনাটি সম্পর্কে ভালভাবেই অবগত ছিল। এটি একটি প্রমাণিত সত্য যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরোধিতার প্রশ্নে যেখানে মদীনার ইহুদীরা কোন একটি সুযোগও হাতছাড়া হতে দিতো না সেখানে কুরআনের এ বর্ণনার বিরুদ্ধে তারা আদৌ কোন আপত্তিই তোলেনি।

কুরআনে ‘সাব্ত’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। ‘সাব্ত’ মানে শনিবার। বনী ইসরাঈলীদের জন্য এ দিনটিকে পবিত্র দিন গণ্য করা হয়েছিল। মহান আল্লাহ‌ এ দিনটিকে  বনী ইসরাঈলীদের সন্তান-সন্তুতিদের মধ্যে সম্পাদিত পুরুষানুক্রমিক স্থায়ী অঙ্গীকার গণ্য করে তাকীদ করেছিলেন যে, এ দিন কোন পার্থিব কাজ করা যাবে না, ঘরে আগুন পর্যন্ত জ্বালানো যাবে না, গৃহপালিত পশু এমন কি চাকর-বাকর-দাসদাসীদের থেকেও কোন সেবা করা চলবে না এবং যে ব্যক্তি এ নিয়ম লংঘন করবে তাকে হত্যা করা হবে। কিন্তু উত্তরকালে বনী ইসরাঈল প্রকাশ্যে এ আইনের বিরোধিতা করতে থাকে। ইয়ারমিয়াহ (যিরমিয়) নবীর আমলে (যিনি খৃষ্টপূর্ব ৬২৮ ও ৫৮৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে বেঁচে ছিলেন)। লোকেরা খাস জেরুজালেমের সিংহ দরজাগুলো দিয়ে মালপত্র নিয়ে চলাফেরা করতো। এতে ঐ নবী ইহুদীদেকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, তোমরা যদি এভাবে প্রকাশ্যে শরীয়াতের বিরুদ্ধাচারণ করা থেকে বিরত না হও তাহলে জেরুজালেমে আগুন লাগিয়ে দেয়া হবে। (যিরমিয় ১৭: ২১-২৭) হযরত হিযকিঈল (যিহিস্কেল) নবীও এ একই অভিযোগ করেন। তাঁর আমল ছিল খৃষ্টপূর্ব ৫৯৫ ও ৫৩৬ এর মধ্যবর্তী সময়ে। তাঁর গ্রন্থে শনিবারের অবমাননাকে ইহুদীদের একটি মস্তবড় জাতীয় অপরাধ গণ্য করা হযেছে। (যিহিস্কেল ২০: ১২-২৪) এসব উদ্ধৃতি থেকে অনুমান করা যেতে পারে, কুরআন মজিদ এখানে যে ঘটনাটির কথা বলছে সেটিও সম্ভবত এ একই যুগের ঘটনা।

মানুষকে পরীক্ষা করার জন্য মহান আল্লাহ‌ যেসব পদ্ধতি অবলম্বন করে থাকেন তার মধ্যে এও একটি পদ্ধতি যে, যখন কোন ব্যক্তি বা দলের মধ্যে আনুগত্য বিচ্যুতি ও নাফরমানীর প্রবণতা বাড়তে থাকে, তখন তাকে আরো বেশী করে নাফরমানী করার সুযোগ দেয়া হয়। যেন তার যেসব প্রবণতা ভেতরে লুকিয়ে থাকে সেগুলো পুরোপুরি উন্মুক্ত হয়ে যায় এবং যেসব অপরাধে সে নিজেকে কুলষিত করতে চায়, কেবলমাত্র সুযোগের অভাবে সে সেগুলো থেকে বিরত থেকে না যায়।

وسئلهم এ هم (তাদের) সর্বনাম দ্বারা ইয়াহুদীদের বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, ইয়াহুদীদেরকে জিজ্ঞাসা কর। এখানে ইয়াহুদীদেরকে এই বলা উদ্দেশ্য যে, এই ঘটনার জ্ঞান নবী (সাঃ)-এরও আছে, যা তাঁর সত্য নবী হওয়ার কথা প্রমাণ করে। কারণ আল্লাহর পক্ষ হতে অহী না হলে তিনি সে ঘটনা সম্পর্কে জানতে পারতেন না।

 حيتان শব্দটি حوت এর বহুবচন, شرع শব্দটি شارع এর বহুবচন, যার অর্থ হল, এমন মাছ যা পানির উপরি ভাগে ভেসে ওঠে। এখানে ইয়াহুদীদের ঐ ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে, যাতে তাদের শনিবার দিন মাছ শিকার করতে নিষেধ করা হয়েছিল। কিন্তু পরীক্ষার জন্য শনিবার দিন বেশি বেশি মাছ পানির উপর ভেসে উঠত। আর এদিন পার হলে এমনটি আর হত না। শেষ পর্যন্ত ইয়াহুদীরা এক চালাকি অবলম্বন করে আল্লাহর আদেশ লংঘন করল। তারা সমুদ্র সংলগ্নে খাল খনন করেছিল, ফলে শনিবার তাতে মাছ প্রবেশ করে ফেঁসে যেত। অতঃপর শনিবার গত হলেই তা শিকার করত।

এ বর্ণনা থেকে জানা যায়, এ জনপদে তিন ধরনের লোক ছিল।

এক, যারা প্রকাশ্যে ও পূর্ণ ঔদ্ধত্য সহকারে আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধাচরণ করছিল।

দুই, যারা নিজেরা বিরুদ্ধাচরণ করছিল না কিন্তু অন্যের বিরুদ্ধাচরণকে নীরবে হাত-পা গুটিয়ে বসে বসে দেখছিল এবং উপদেশ দানকারীদের বলছিল, এ হতভাগাদের উপদেশ দিয়ে কী লাভ?

তিন, যারা ঈমানী সম্ভমবোধ ও মর্যাদাবোধের কারণে আল্লাহর আইনের এহেন প্রকাশ্য অমর্যাদা বরদাশত করতে পারেনি এবং তারা এ মনেকরে সৎকাজের আদেশ দিতে ও অসৎকাজ থেকে অপরাধীদের বিরত রাখতে তৎপর ছিল যে, হয়তো ঐ অপরাধীরা তাদের উপদেশের প্রভাবে সৎপথে এসে যাবে, আর যদি তারা সৎপথে নাও আসে তাহলে অন্তত নিজেদের সামর্থ্য মোতাবিক কর্তব্য পালন করে তারা আল্লাহর সামনে নিজেদের দায় মুক্তির প্রমাণ পেশ করতে পারবে।

এ অবস্থায় এ জনপদের ওপর যখন আল্লাহর আযাব নেমে এলো, তখনকার অবস্থা বিশ্লেষণ করে কুরআন মজীদ বলছে, এ তিনটি দলের মধ্য থেকে একমাত্র তৃতীয় দলটিকেই বাঁচিয়ে নেয়া হয়েছিল। কারণ একমাত্র তারাই আল্লাহর সামনে নিজেদের ওযর পেশ করার চিন্তা করছিল এবং একমাত্র তারাই নিজেদের দায়িত্ব মুক্তির প্রমাণ সংগ্রহ করে রেখেছিল। বাকি দল দু’টিকে অপরাধীদের মধ্যে গণ্য করা হলো এবং নিজেদের অপরাধ অনুপাতে তারা শাস্তি ভোগ করলো। কোন কোন তাফসীরকার এ অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, আল্লাহ‌ প্রথম দলটির শাস্তি ভোগ করার এবং দ্বিতীয় দলটির উদ্ধার প্রাপ্তির ব্যাপারে স্পষ্ট উক্তি করেছেন। কিন্তু তৃতীয় দলটির ব্যাপারে নীরবতা অবলম্বন করেছেন। কাজেই তারা শাস্তি ভোগ করেছিল না উদ্ধার পেয়েছিল, এ ব্যাপারে কিছুই বলা যায় না।

আবার আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর একটি বর্ণনা পাওয়া যায়। তাতে বলা হয়েছে, তিনি প্রথমে দ্বিতীয় দলটি শাস্তি লাভ করেছিল বলে মত পোষণ করতেন। পরে তাঁর ছাত্র ইকরামা তাকে এ ব্যাপারে নিশ্চিন্ত করে দেন যে, দ্বিতীয় দলটি উদ্ধার পেয়েছিল। কিন্তু কুরআনের বর্ণনা সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করলে মনে হয়, হযরত ইবনে আব্বাসের প্রথম চিন্তাটিই সঠিক ছিল। একথা সুস্পষ্ট যে, কোন জনপদের ওপর আল্লাহর আযাব অবতীর্ণ হলে সমগ্র জনপদবাসীরা দু’ভাগেই বিভক্ত হয়ে যেতে পারে। এক ভাগে এমন সব লোকেরা থাকে যারা আযাব ভোগ করে এবং অন্য ভাগে থাকে তারা যারা আযাব থেকে বেঁচে যায়।

এখন কুরআনের বক্তব্য অনুযায়ী উদ্ধারপ্রাপ্ত যদি কেবল তৃতীয় দলটিই হয়ে থাকে, তাহলে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, যারা উদ্ধার পায়নি তাদের মধ্যে থাকবে প্রথম ও দ্বিতীয় উভয় দলই। এরই সমর্থন পাওয়া যায় مَعْذِرَةً إِلَى رَبِّكُمْ(অর্থাৎ এসব কিছুই করছি আমরা তোমাদের রবের সামনে নিজের ওযর পেশ করার উদ্দেশ্যে) বাক্যাংশটির মধ্যে। এ বাক্যাংশটিতে আল্লাহ‌ নিজেই একথা সুস্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, আল্লাহর কাছে ওযর করার জন্য অবশ্যি নিজেদের দায়িত্ব পুরোপুরি পালন করে যেতে হবে। এভাবে দায়িত্ব মুক্তির প্রমাণ যারা সংগ্রহ করতে পারবে, একমাত্র তারাই আল্লাহর কাছে ওযর পেশ করতে পারবে। এ থেকে পরিষ্কার প্রমাণিত হচ্ছে, যে জনপদে প্রকাশ্যে আল্লাহর বিধান লংঘন করা চলতে থাকে, সেখানকার সবাই জবাবদিহির সম্মুখীন হয়। সেখানকার কোন অধিবাসী শুধু নিজেই আল্লাহর বিধান লঙ্ঘন করেনি বলেই আল্লাহর সামনে জবাবদিহি থেকে বাঁচতে পারে না। বরং আল্লাহর সামনে নিজের সাফাই পেশ করার জন্য তাকে অবশ্যই এ মর্মে প্রমাণ পেশ করতে হবে যে, নিজের সামর্থ্য মোতাবিক মানুষের সংশোধন ও আল্লাহর সত্য দ্বীনের প্রতিষ্ঠার জন্য সে প্রচেষ্টা চালিয়ে এসেছে। এছাড়া কুরআন হাদীসের অন্যান্য বক্তব্য থেকেও আমরা সামষ্টিক অপরাধের ক্ষেত্রে আল্লাহর এ একই ধরনের আইনের কথা জানতে পারি। তাই আমরা দেখি কুরআনে বলা হয়েছেঃ

আর তোমরা ফেৎনা থেকে বেঁচে থাক যা বিশেষ করে তোমাদের মধ্যে যারা যালিম শুধু তাদের উপরই আপতিত হবে না। আর জেনে রাখ যে, নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তি দানে কঠোর। সূরা আনফালঃ২৫

وَاتَّقُوا فِتْنَةً لَا تُصِيبَنَّ الَّذِينَ ظَلَمُوا مِنْكُمْ خَاصَّةً

(সেই বিপর্যয় থেকে সাবধান হও, যার কবলে বিশেষভাবে কেবলমাত্র তোমাদের মধ্য থেকে যারা জুলুম করেছে তারাই পড়বে না) আর এর ব্যাখ্যায় নবী ﷺ বলেছেনঃ

إِنَّ اللَّهَ لاَ يُعَذِّبُ الْعَامَّةَ بِعَمَلِ الْخَاصَّةِ حَتَّى يَرَوُا الْمُنْكَرَ بَيْنَ ظَهْرَانَيْهِمْ وَهُمْ قَادِرُونَ عَلَىأَنْ يُنْكِرُوهُ فَلاَ يُنْكِرُوهُ فَإِذَا فَعَلُوا ذَلِكَ عَذَّبَ اللَّهُ الْخَاصَّةَ وَالْعَامَّةَ-

“মহান আল্লাহ‌ বিশেষ লোকদের অপরাধের দরুন সর্বসাধারণকে শাস্তি দেন না, যতক্ষন সাধারণ লোকদের অবস্থা এমন পর্যায়ে না পৌঁছে যায় যে, তারা নিজেদের চোখের সামনে খারাপ কাজ হতে দেখে এবং তার বিরুদ্ধে অসন্তোষ প্রকাশের ক্ষমতাও রাখে, এরপরও কোন অসন্তোষ প্রকাশ করে না। কাজেই লোকেরা যখন এমন অবস্থায় পৌঁছে যায়, তখন আল্লাহ‌ সাধারণ ও অসাধারণ নির্বিবেশেষে সবাইকে আযাবের মধ্যে নিক্ষেপ করেন।”

আমাদের চারপাশে দৈনন্দিন কত অন্যায়-অপরাধ সংঘটিত হয়। ব্যক্তি,পরিবার,সমাজ এবং রাষ্ট্র সর্বত্রই নানা অপরাধের স্বাক্ষী আমরা। অনেকেই এসব অপরাধের কেবল নিরব দর্শক হয়। তা নির্মুলে কোনো ভূমিকা রাখে না বা রাখার চেষ্টা করে না। ইসলাম এমন নিরব ভূমিকা সমর্থন করে না; বরং নিজ সাধ্য ও সামর্থ্যের আলোকে এসব অন্যায়-অপরাধের প্রতিবাদ করা এবং তা নির্মুলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা ঈমানের অপরিহার্য দাবী। একজন মুসলিমের এটা ঈমানী দায়িত্ব। এমনকি অনান্য জাতিগোষ্ঠীর তুলনায় মুসলিম সম্প্রদায় শ্রেষ্ঠতম হওয়ার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘তোমরাই হলে সর্বোত্তম উম্মত, মানবজাতির কল্যানের জন্যেই তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দান করবে ও অন্যায় কাজে বাধা দেবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে। (আলে ইমরান- ১১০)

হাদিস শরীফে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাধ্যানুযায়ী অন্যায়ের প্রতিবাদ করার আদেশ করেছেন এবং প্রতিবাদের ধরন অনুযায়ী ঈমানের স্তর ঘোষণা করেছেন।

“হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেছেন, তোমাদের সামনে যখন ইসলামবিরোধী কাজ হতে দেখবে তখন হাত দিয়ে প্রতিরোধ করবে। যদি এতে অক্ষম হও তবে মুখ দিয়ে প্রতিবাদ জানাবে। যদি তাতে অক্ষম হও তবে অন্তর দিয়ে তাকে ঘৃণা করবে, তবে এটি দুর্বল ঈমানের পরিচায়ক।” (সহীহ মুসলিম)

আর যদি তারা কোনো শহরে, গ্রামে বা গোত্রে একদল হয় তবে তাদের ওপর (এটি) ফরযে কিফায়াহ হবে। তাদের মধ্যে যে এটি প্রতিহত করবে, আর যার দ্বারা উদ্দেশ্য অর্জন হবে সে প্রতিদান অর্জন করে সফল হবে। আর তারা সবাই যদি এটিকে বর্জন করে তবে সবাই পাপী হবে, সকল ফরযে কিফায়ার ন্যায়।

আর যদি কোনো গ্রামে বা গোত্রে কেবল একজন আলেম থাকে, তবে তার ওপর মানুষকে শিক্ষা দেওয়া ও তাদেরকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করা ফরযে ‘আইন হয়ে যাবে। আর তার সামর্থ্য অনুযায়ী তাদেরকে ন্যায়ের আদেশ দিবে ও অন্যায়ের নিষেধ করবে, পূর্বে বর্ণিত হাদীসগুলোর কারণে ও নিম্নে বর্ণিত আল্লাহর তা‘আলার বাণীর কারণে:

﴿فَٱتَّقُواْ ٱللَّهَ مَا ٱسۡتَطَعۡتُمۡ﴾ [التغابن: ١٦]

“সুতরাং তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর তোমাদের শক্তি অনুপাতে। আত-তাগাবুন: ১৬]

নু‘মান ইবনু বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে মহান আল্লাহর নির্ধারিত সীমার মধ্যে প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং যে সীমা লঙ্ঘন করে, তাদের দৃষ্টান্ত সেই যাত্রীদলের মতো, যারা কুরআ’র মাধ্যমে এক নৌযানে নিজেদের স্থান নির্ধারণ করে নিল। তাদেও কেউ স্থান পেল উপর তলায় আর কেউ নীচ তলায় (পানির ব্যবস্থা ছিল উপর তলায়) কাজেই নীচের তলার লোকেরা পানি সংগ্রহ কালে উপর তলার লোকদের ডিঙ্গিয়ে যেত। তখন নীচ তলার লোকেরা বলল, উপর তলার লোকেদের কষ্ট না দিয়ে আমরা যদি নিজেদের অংশে একটি ছিদ্র করে নেই (তবে ভালো হয়) এমতাবস্থায় তারা যদি এদেরকে আপন মর্জির উপর ছেড়ে দেয় তাহলে সবাই ধ্বংস হয়ে যাবে। আর যদি তারা এদের হাত ধরে রাখে (বিরত রাখে) তবে তারা এবং সকলেই রক্ষা পাবে। (বুখারী-২৪৯৩)

অতএব, আল্লাহর আযাব এবং সমাজে ঘটমান অন্যায়-অপরাধের দরুন আসা বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতে হলে আমাদের সবাইকে সাধ্যমতো সমাজের সর্বস্তরের অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হবে এবং সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে যেকোন অপরাধ নিমুলে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। আল্লাহ তাওফীক দিন!

এছাড়াও আলোচ্য আয়াত থেকে একথাও জানা যায় যে, এ জনপদের ওপর দুই পর্যায়ে আল্লাহর আযাব নাযিল হয়। প্রথম পর্যায়ে নাযিল হয় عَذَابٍ بَئِيسٍ(কঠিন শাস্তি) এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে নাফরমানী যারা অব্যাহত রেখেছিল তাদেরকে বানরে পরিণত করা হয়।  প্রথম পর্যায়ের আযাবে উভয় দলই শামিল ছিল এবং দ্বিতীয় পর্যায়ের আযাব দেয়া হয়েছিল কেবলমাত্র প্রথম দলকে।

এক্ষেত্রে অবশ্যি সঠিক ব্যাপার একমাত্র আল্লাহই ভাল জানেন। সূরা বাকারায়(৬৫নং আয়াত) এসেছে–

 “আর তোমাদের মধ্যে যারা শনিবার সীমালংঘন করেছিল তাদেরকে তোমরা নিশ্চিতভাবে জেনেছিলে। ফলে আমরা তাদেরকে বলেছিলাম, তোমরা ঘৃণিত বানরে পরিণত হও”।

আয়াতে বর্ণিত এ ঘটনাটি দাউদ আলাইহিস সালাম-এর আমলেই সংঘটিত হয়। ইসরাঈল-বংশধরদের জন্য শনিবার ছিল পবিত্র এবং সাপ্তাহিক উপাসনার জন্য নির্ধারিত দিন। এ দিন মৎস শিকার নিষিদ্ধ ছিল। তারা সমুদ্রোপকূলের অধিবাসী ছিল বলে মৎস শিকার ছিল তাদের প্রিয় কাজ। তারা প্রথম প্রথম কলা-কৌশলের অন্তরালে এবং পরে সাধারণ পদ্ধতিতে ব্যাপকভাবে মৎস শিকার করতে থাকে। এতে তারা দুই দলে বিভক্ত হয়ে যায়। একদল ছিল সৎ ও বিজ্ঞ লোকদের। তারা এ অপকর্মে বাধা দিলেন। কিন্তু প্রতিপক্ষ বিরত হলো না। অবশেষে তারা এদের সাথে যাবতীয় সম্পর্ক ছিন্ন করে পৃথক হয়ে গেলেন। এমনকি বাসস্থানও দুই ভাগে ভাগ করে নিলেন। একভাগে অবাধ্যরা বসবাস করতো আর অপর ভাগে সৎ ও বিজ্ঞজনেরা বাস করতেন। একদিন তারা অবাধ্যদের বস্তিতে অস্বাভাবিক নীরবতা লক্ষ্য করলেন।

অতঃপর সেখানে পৌছে দেখলেন যে, সবাই বিকৃত হয়ে বানরে রূপান্তরিত হয়ে গেছে। কাতাদাহ বলেন, তাদের যুবকরা বানরে এবং বৃদ্ধরা শুকরে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। রূপান্তরিত বানররা নিজ নিজ আত্মীয় স্বজনকে চিনতো এবং তাদের কাছে এসে অঝোরে অশ্রু বিসর্জন করতো। হাদীসে এসেছে, জনৈক সাহাবী একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের যুগের বানর ও শুকরগুলো কি সেই রূপান্তরিত ইয়াহুদী সম্প্রদায়? তিনি বললেন, আল্লাহ্ তা’আলা যখন কোন সম্প্রদায়কে ধ্বংস করেন অথবা তাদেরকে শাস্তি দিয়ে থাকেন তখন তিনি তাদের অবশিষ্ট বংশধর রাখেন না। বস্তুতঃ বানর ও শূকর পৃথিবীতে তাদের পূর্বেও ছিল। [মুসলিমঃ ২৬৬৩] সুতরাং বর্তমান বানরদের সাথে রূপান্তরিত বানর ও শূকরের কোন সম্পর্ক নেই। দেখুন, [আত-তাফসীরুস সহীহ] যেমনিভাবে এ ধারণা করারও কোন সুযোগ নেই যে, মানুষ কোন এক সময় বানরের বংশধর ছিল।

إيذان تأذن সংবাদ দেওয়া, ঘোষণা করা। অর্থাৎ, সেই সময়কে স্মরণ কর, যখন তোমার প্রতিপালক ঐ ইয়াহুদীদের মাঝে ঘোষণা দিয়েছিলেন। لَيَبعَثَنّ এর লাম তাকীদের জন্য, যা শপথেরও অর্থ দেয়। অর্থাৎ, মহান আল্লাহ শপথ করে দৃঢ়তার সাথে বলছেন, তাদের উপর কিয়ামত পর্যন্ত এমন সব লোকেদেরকে আধিপত্য দান করবেন; যারা তাদেরকে কঠিন শাস্তি দিতে থাকবে। সুতরাং ইয়াহুদীদের পুরো ইতিহাস লাঞ্ছনা, দারিদ্র্য দাসত্ব ও গোলামীর ইতিহাস। যার সংবাদ মহান আল্লাহ এই আয়াতে দিয়েছেন। ইস্রাঈলের বর্তমান রাজত্ব কুরআনের বর্ণিত এই সত্যের পরিপন্থী নয়। কারণ তা কুরআনেরই বর্ণিত ব্যতিক্রম إلا حبل من الناس (মানুষের আশ্রয়) এর প্রকাশ মাত্র। যা কুরআনের ভবিষ্যদ্বাণীর সত্যতার বিপরীত নয়; বরং তার সমর্থনকারী।

 ‘তাআযযানা’ বাক্যাংশের দুটি অর্থ হতে পারে।

এক. ঘোষনা দিয়ে জানিয়ে দেয়া। দুই. সুদৃঢ় ইচ্ছা এবং সে অনুসারে নির্দেশ। [ইবন কাসীর]

আলোচ্য আয়াতে পূর্ববর্তী আয়াতে মূসা আলাইহিস সালামের অবশিষ্ট কাহিনী বিবৃত করার পর তার উম্মত অর্থাৎ ইয়াহুদীদের অসৎকর্মশীল লোকদের প্রতি নিন্দাবাদ এবং তাদের নিকৃষ্ট পরিণতির বর্ণনা এসেছে। সে অনুসারে তাদের উপর শাস্তির ঘোষণা খ্ৰীষ্টপূর্ব অষ্টম শতক থেকে প্রায় প্রতিটি গ্রন্থে দেয়া হয়েছে। এমনকি ঈসা আলাইহিস সালামও তাদেরকে এ একই সতর্কবাণী শুনান। বিভিন্ন ইনজীল গ্রন্থে তাঁর একাধিক ভাষণ থেকে এ বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়ে উঠে। সবশেষে কুরআনুল কারীমেও এ কথাটিকে দৃঢ়ভাবে পূনর্ব্যক্ত করেছে। আর তা হল কেয়ামত পর্যন্ত আল্লাহ্ তা’আলা তাদের উপর এমন কোন ব্যক্তিকে অবশ্যই চাপিয়ে রাখতে থাকবেন, যে তাদেরকে কঠিন শাস্তি দিতে থাকবে এবং অপমান ও লাঞ্ছনায় জড়িয়ে রাখবে।

সুতরাং তখন থেকে নিয়ে অদ্যাবধি ইয়াহুদীরা সবসময়ই সর্বত্র ঘৃণিত, পরাজিত ও পরাধীন অবস্থায় রয়েছে। বলা হয়ে থাকে যে, মূসা আলাইহিস সালাম তাদের উপর সাত বছর বা তেরো বছর খাজনা আরোপ করেছিলেন। তারপর গ্রীক, কাশদানী, কালদানী নৃপতিরা তাদের উপর কঠোর শাস্তি নিয়ে আপতিত হয়েছিল। পরে বুখতানাসারের হাতে, তারপর নাসারাদের হাতে, তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাধ্যমে। সবশেষে তারা দাজ্জালের সহযোগীরূপে বের হবে, তারপর দাজ্জাল যখন মারা পড়বে, তখন মুসলিমরা ঈসা আলাইহিস সালামকে সাথে নিয়ে তাদের হত্যা করবে। [দেখুন, বুখারীঃ ২৯২৫, ২৯২৬] [ইবন কাসীর]।

এ আয়াতে ইয়াহুদীদের উপর আরোপিত অন্য আরেক শাস্তির কথা বলা হয়েছে। তা হল, তাদেরকে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে একান্ত বিক্ষিপ্ত করে দেয়া। কোথাও কোন এক দেশে তাদের সমবেতভাবে বসবাসের সুযোগ হয়নি। (وَقَطَّعْنَاهُمْ فِي الْأَرْضِ أُمَمًا) এর মর্মও তাই। قَطَّعْنَا শব্দটি تقطيع থেকে নির্গত। যার অর্থ খণ্ড-বিখণ্ড করে দেয়া। আর أُمَما হল أمة এর বহুবচন। যার অর্থ দল বা শ্রেণী। এর মর্ম হল, আমি ইয়াহুদী জাতিকে খণ্ড খণ্ড করে পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে বিক্ষিপ্ত করে দিয়েছি। সুতরাং যেখানেই কেউ ঢুকবে সেখানে ইয়াহুদীদের কোন সম্প্রদায় দেখতে পাবে। [তাবারী]

— এ আয়াতে ইয়াহুদীদের শ্রেণী বিভাগ করে বলা হচ্ছেঃ (مِنْهُمُ الصَّالِحُونَ) অর্থাৎ “এদের মধ্যে কিছু লোক রয়েছে সৎ এবং কিছু অন্য রকম।” “অন্য রকম” এর মর্ম হল এই যে, কাফের দুস্কৃতকারী ও অসৎ লোক রয়েছে। অর্থাৎ ইয়াহুদীদের মধ্যে সবই এক রকম লোক নয়, কিছু সৎও আছে। [তাবারী; ইবন কাসীর] এর অর্থ, সেসব লোক, যারা তাওরাতের যুগে তাওরাতের নির্দেশাবলীর পূর্ণ আনুগত্য ও অনুশীলন করেছে। না তার হুকুমের প্রতি কৃতঘ্নতা প্রকাশ করেছে, আর না কোন রকম অপব্যাখ্যা ও বিকৃতির আশ্রয় নিয়েছে। [আত-তাহরীর ওয়াত তানওয়ীর]

এছাড়া এতে তারাও উদ্দেশ্য হতে পারেন, যারা কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার পর তার আনুগত্যে আত্মনিয়োগ করেছেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর ঈমান এনেছেন। অপরদিকে রয়েছে সে সমস্ত লোক, যারা তাওরাতকে আসমানী গ্রন্থ বলে স্বীকার করা সত্বেও তার বিরুদ্ধাচরণ করেছে, কিংবা তার আহকাম বা বিধি বিধানের বিকৃতি ঘটিয়ে নিজেদের আখেরাতকে পৃথিবীতে নিকৃষ্ট বস্তু-সামগ্রীর বিনিময়ে বিক্রি করে দিয়েছে। [বাগভী; ফাতহুল কাদীর]

 —আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছেঃ “আমি ভাল-মন্দ অবস্থার দ্বারা তাদের পরীক্ষা করেছি যেন তারা নিজেদের গহিত আচার-আচরণ থেকে ফিরে আসে।” “ভাল অবস্থার দ্বারা”-এর অর্থ হল এই যে, তাদেরকে ধন-সম্পদের প্রাচুর্য ও ভোগবিলাসের উপকরণ দান। আর “মন্দ অবস্থার দ্বারা”-এর অর্থ হয় লাঞ্ছনা-গঞ্জনার সে অবস্থা যা যুগে যুগে বিভিন্নভাবে তাদের উপর নেমে এসেছে, অথবা কোন কোন সময়ে তাদের উপর আপতিত দুর্ভিক্ষ ও দারিদ্র্য। [তাবারী; ইবন কাসীর] সারমর্ম এই যে, মানব জাতির আনুগত্য ও ঔদ্ধত্যের পরীক্ষা করার দুটিই প্রক্রিয়া। তাদের ব্যাপারে উভয়টিই ব্যবহৃত হয়েছে।

কিন্তু ইহুদী সম্প্রদায় এতদুভয় পরীক্ষাতেই অকৃতকার্য হয়েছে। আল্লাহ তা’আলা যখন তাদের জন্য নেয়ামতের দুয়ার খুলে দিয়ে ধন-সম্পদের প্রাচুর্য দান করেছেন, তখন তারা বলতে শুরু করেছে, (إِنَّ اللَّهَ فَقِيرٌ وَنَحْنُ أَغْنِيَاءُ) অর্থাৎ “আল্লাহ হলেন ফকীর আর আমরা ধনী।” [সূরা আলে-ইমরান: ১৮১] আর তাদেরকে যখন দারিদ্র্য ও দুর্দশার মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয়েছে, তখন বলতে শুরু করেছেঃ (يَدُ اللَّهِ مَغْلُولَةٌ) অর্থাৎ “আল্লাহর হাত সংকুচিত হয়ে গেছে।” [সূরা আল-মায়েদাহঃ ৬৪]

خَلَف (লামের যবরের সাথে) সৎ সন্তান এবং خَلْف (লামে জযমের সাথে) অসৎ ও অযোগ্য সন্তানদেরকে বলা হয়।

মুজাহিদ বলেন, এখানে অযোগ্য উত্তরপুরুষ বলে নাসারাদের বোঝানো হয়েছে। [আত-তাফসীরুস সহীহ] ইবন কাসীর বলেন, এখানে ইয়াহুদী, নাসারাসহ পরবর্তী সবাই উদ্দেশ্য হতে পারে। ইবন কাসীর মুজাহিদ বলেন, দুনিয়ার যে বস্তুতেই তাদের চোখ পড়বে, সেটা হালাল কিংবা হারাম যাই হোক না কেন, তারা তাই গ্রহণ করে, তারপর ক্ষমার তালাশে থাকে। আবার যদি আগামী কাল অনুরূপ কিছু নজরে পড়ে সেটাও গ্রহণ করে। [তাবারী]

সুদ্দী বলেন, তাদের মধ্যে কাউকে বিচারক নিয়োগ করা হলে সে ঘুষ খেয়ে বিচার করত, তখন তাদের ভাললোকেরা একত্র হয়ে বলল যে, এটা করা যাবে না এবং ঘুষও দেয়া যাবে না। কিন্তু পূণরায় তাদের কেউ কেউ ঘুষ খেতে আরম্ভ করে। তাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে বলতো যে, আমাকে ক্ষমা করে দেয়া হবে। তখন অন্যরা তাকে খারাপ বলত। তারপর এ বিচারকের পদচ্যুতি বা মৃত্যুর কারণে যদি অন্য কাউকেও নিয়োগ করা হতো, সেও ঘুষ খেত। [ইবন কাসীর]

— অর্থাৎ তারা আল্লাহর কিতাব পড়েছে কিন্তু কিতাবের হুকুমের বিরোধিতা করেছে। দুনিয়ার যত নিকৃষ্ট কামাই আছে যেমন ঘুষ ইত্যাদি তা-ই তারা গ্রহণ করে। কারণ তাদের লোভ ও লালসা প্রচণ্ড। তারা গোনাহ করে, তারা জানে এ কাজটি করা গুণাহ। তবুও এ আশায় তারা এ কাজটি করে যে, কোন না কোনভাবে তাদের গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। কারণ তারা মনে করে, তারা আল্লাহর প্রিয়পাত্র এবং তারা যত কঠিন অপরাধই করুক না কেন তাদের ক্ষমালাভ অপরিহার্য। এ ভুল ধারণার ফলে কোন গুনাহ করার পর তারা লজ্জিত হয় না এবং তাওবাও করে না। বরং একই ধরনের গোনাহ করার সুযোগ এলে তারা তাতে জড়িয়ে পড়ে। তারপর আবার যদি তাদের কাছে দুনিয়ার কোন ভোগ এসে যায়, তা যত হারামই হোক তা গ্রহণ করতে কুন্ঠাবোধ করে না। বরং তা বারবার করতে থাকে। [মুয়াসসার]

—-অর্থাৎ তারা নিজেরাই জানে যে, আল্লাহ কখনো তাদেরকে একথা বলেননি এবং তাদের নবীগণও কখনো তাদেরকে এ ধরণের নিশ্চয়তা দেননি যে, তোমরা যা ইচ্ছা করতে পারো, তোমাদের সকল গুনাহ অবশ্যি মাফ হয়ে যাবে। তাছাড়া আল্লাহ নিজে যে কথা কখনো বলেননি তাকে আল্লাহর কথা বলে প্রচার করার কি অধিকারই বা তাদের থাকতে পারে? অথচ তাদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নেয়া হয়েছিল যে, আল্লাহর নামে কোন অসত্য কথা তারা বলবে না। তাওরাত কায়েম করবে, সে অনুযায়ী আমল করবে। কুরআনের অন্যত্র তাদের এ অঙ্গীকারটি বর্ণিত হয়েছে।

সেখানে এসেছে, “স্মরণ করুন, যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছিল আল্লাহ তাদের প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলেন: অবশ্যই তোমরা তা মানুষের কাছে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করবে এবং তা গোপন করবে না। এরপরও তারা তা তাদের পেছনে ফেলে রাখে (অগ্রাহ্য করে) ও তুচ্ছ মূল্যে বিক্রি করে; কাজেই তারা যা ক্রয় করে তা কত নিকৃষ্ট। [সূরা আলে ইমরান: ১৮৭] কিন্তু তারা কিতাবের বিধান জানার পরও সেটাকে নষ্ট করে দেয়, তা অনুসারে আমল করে না। এভাবে তারা আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকারকে ভঙ্গ করে। [মুয়াসসার]

— অর্থাৎ এমন নয় যে, তারা বুঝে না। তারা আল্লাহর কিতাব অধ্যয়ণ করে, তারা জানে যে, তাদেরকে এ ধরনের হারাম বস্তু গ্রহণ করা থেকে তাদের কিতাবে নিষেধ করা হয়েছে। এমন নয় যে, তারা সন্দেহের বশবর্তী হয়ে তা করছে। বস্তুতঃ তাদের কোন সন্দেহ নেই। তারা জেনে-বুঝেই এ অন্যায় করছে। এটা নিঃসন্দেহে খারাপ কাজ। [সা’দী]

আখেরাতের আবাস তো আল্লাহর ভয়ে ভীত লোকদেরই জন্য ভাল

এ আয়াতটির দু’টি অনুবাদ হতে পারে। একটি অনুবাদ আমি এখানে করেছি। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে, “আল্লাহর ভয়ে ভীত লোকদের জন্য তো আখেরাতের আবাসই ভাল।” প্রথম অনুবাদের আলোকে আয়াতের তাৎপর্য হবে এই যে, মাগফেরাত কারোর একচেটিয়া ব্যক্তিগত বা পারিবারিক অধিকার নয়। তুমি এমন কাজ করবে যা শাস্তি লাভের যোগ্য, কিন্তু আখেরাতে তুমি নিছক ইহুদী বা ইসরাঈলী হবার কারণে ভাল জায়গা পেয়ে যাবে, এটা কখনো হতে পারে না। তোমাদের মধ্যে সামান্যতম বিবেক-বুদ্ধি থাকলেও তোমরা নিজেরাই বুঝতে পারবে যে, আখেরাতের ভাল জয়গা একমাত্র তারাই পেতে পারে যারা দুনিয়ায় আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে কাজ করে।

আর দ্বিতীয় অনুবাদটি গ্রহণ করলে মর্ম এ দাঁড়ায় যে, যেসব লোক আল্লাহর ভয়ে ভীত নয় একমাত্র তারাই দুনিয়াবী লাভ ও স্বার্থকে আখেরাতের ওপর অগ্রাধিকার দেয়। আল্লাহর ভয়ে ভীত লোকেরা নিশ্চিতভাবে আখেরাতের স্বার্থকে দুনিয়ার স্বার্থের ওপর এবং আখেরাতের কল্যাণ ও লাভকে দুনিয়ার আয়েশ-আরামের ওপর অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে

পূর্ববর্তী আয়াতগুলোতে একটি প্রতিজ্ঞা ও প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে যা বিশেষতঃ বনী-ইসরাঈলের আলেম সম্প্রদায়ের নিকট থেকে তাওরাত সম্পর্কে নেয়া হয়েছিল যে, এতে কোন রকম পরিবর্তন কিংবা বিকৃতি সাধন করবে না এবং সত্য ও সঠিক বিষয় ছাড়া মহান রবের প্রতি অন্য কোন বিষয় আরোপ করবে না। আর এ বিষয়টি পূর্বেই উল্লেখিত হয়ে গিয়েছিল যে, বনী-ইসরাঈলের আলেমগণ প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে স্বার্থাম্বেষীদের কাছ থেকে উৎকোচ নিয়ে তাওরাতের বিধিবিধানের পরিবর্তন করেছে এবং তাদের উদ্দেশ্য ও স্বার্থের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে বাতলিয়েছে।

তাদের মধ্যে যারা তাকওয়া, পরহেযগারি ও সাবধানতার পথ অবলম্বন করবে, কিতাবকে শক্তভাবে ধারণ করবে; যার অর্থঃ আসল তাওরাতের উপর আমল করে মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর নবুঅতের উপর ঈমান আনবে, নামায ইত্যাদির উপর দৃঢ় থাকবে। তাহলে এমন সৎকর্মশীলদের কর্মফল আল্লাহ নষ্ট করবেন না। এখানে ঐ সকল আহলে কিতাবের (বিশেষভাবে ইয়াহুদীদের) কথা বর্ণনা রয়েছে। যারা কিতাবকে শক্তভাবে ধারণ করবে, নামায প্রতিষ্ঠা করার ব্যাপারে সচেষ্ট হবে এবং তাদের জন্য পরকালের সুসংবাদও রয়েছে; এর অর্থ হল, তারা যেন মুসলমান হয়ে যায় ও শেষনবীর রিসালাতের উপর ঈমান আনে। কারণ, এখন শেষ নবী মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর উপর ঈমান আনা ছাড়া পরকালের সুসংবাদ লাভ সম্ভব নয়।

এখানে আলোচ্য এই আয়াতটিতে সে বর্ণনারই উপসংহার হিসাবে বলা হয়েছে যে, বনী-ইসরাঈলের সব আলেমই এমন নয়; কোন কোন আলেম এমনও রয়েছে যারা তাওরাতের বিধি-বিধানকে দৃঢ়তার সাথে ধরেছে এবং বিশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে সৎকাজেও নিষ্ঠা অবলম্বন করেছে। আর যথারীতি সালাতও প্রতিষ্ঠা করেছে। এমনি লোকদের সম্পর্কে বলা হয়েছে- আল্লাহ তাদের প্রতিদান বিনষ্ট করে দেন না, যারা নিজেদের সংশোধন করে। কাজেই যারা ঈমান ও আমলের উভয় ফরয আদায়ের মাধ্যমে নিজের সংশোধন করে নিয়েছে, তাদের প্রতিদান বা প্রাপ্য বিনষ্ট হতে পারে না। এ আয়াতে কয়েকটি লক্ষণীয় ও জ্ঞাতব্য বিষয় রয়েছে-

প্রথমতঃ কিতাব বলতে এতে সে কিতাবই উদ্দেশ্য যার আলোচনা ইতোপূর্বে এসেছে অর্থাৎ তাওরাত। অর্থাৎ যারা তাদের কিতাবে যে নবীর কথা বলা হয়েছে সে অনুসারে ঈমান এনেছে। মুজাহিদ বলেন, এ অনুসারে এটি আহলে কিতাবদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে। [কুরতুবী; ইবন কাসীর; ফাতহুল কাদীর] আর এও হতে পারে যে, এতে কুরআনকেই উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে। অর্থাৎ যারা বর্তমান নাযিলকৃত কিতাবের অনুসরণ করে তাদের প্রচেষ্টা ও আমল নষ্ট হবার নয়। তখন উম্মতে মুহাম্মাদীই উদ্দেশ্য হবে। [বাগভী; জালালাইন: সা’দী] অথবা সমস্ত আসমানী কিতাবই উদ্দেশ্য। তখন অর্থ হবে, যাদেরকেই আমরা কিতাব দিয়েছি তারা যদি তাদের সময়কার কিতাব অনুসারে চলে আমরা তাদের কর্মকাণ্ড ও আমল নষ্ট করি না। আর বর্তমানে কুরআন অনুসারেই সকলকে চলতে হবে।         দ্বিতীয়তঃ আল্লাহর কিতাবকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করতে হবে। তাতে যত হুকুম আহকাম আছে তারা সেটার উপর যত্ন সহকারে আমল করে, এ ব্যাপারে তাদের কোন শৈথিল্য হয় না। যাদের আমল বিনষ্ট হয় না। তাদের পরিচয় হচ্ছে যে, তারা কঠোরভাবে এ কিতাবে বর্ণিত শরীআতের উপর আমল করে। [আইসারুত তাফসীর] সুতরাং একান্ত আদব ও সম্মানের সাথে অতি যত্ন সহকারে নিজের কাছে শুধু রেখে দিলেই তার উদ্দেশ্য সাধিত হয় না; বরং তার বিধি-বিধান ও নির্দেশাবলীর অনুবতীও হতে হবে।

তৃতীয় লক্ষণীয় বিষয় হল, এখানে একটিমাত্র বিধান সালাত প্রতিষ্ঠা করার কথা বলেই ক্ষান্ত করা হয়েছে। এতে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, আল্লাহর কিতাবের বিধিবিধানসমূহের মধ্যে সর্বোত্তম ও গুরুত্বপূর্ণ বিধান হল সালাত। [সা’দী] তদুপরি সালাতের অনুবর্তিতা আসমানী বিধানসমূহের অনুবর্তিতার বিশেষ লক্ষণ। এরই মাধ্যমে চেনা যায়, কে কৃতজ্ঞ আর কে কৃতঘ্ন। আর এর নিয়মানুবর্তিতার একটা বিশেষ কার্যকারিতাও রয়েছে যে, যে লোক সালাতে নিয়মানুবর্তী হয়ে যাবে, তার জন্য অন্যান্য বিধি-বিধানের নিয়মানুবর্তিতাও সহজ হয়ে যায়।

পক্ষান্তরে যে লোক সালাতের ব্যাপারে নিয়মানুবর্তী নয়, তার দ্বারা অন্যান্য বিধি-বিধানের নিয়মানুবর্তিতাও সম্ভব হয় না। সহীহ হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ‘সালাত হল দ্বীনের স্তম্ভ’, [তিরমিযীঃ ২৬১৬] অর্থাৎ যার উপরে তার ইমারত রচিত হয়েছে, যে ব্যক্তি এই স্তম্ভকে প্রতিষ্ঠিত রেখেছে, সে দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত রেখেছে, যে এ স্তম্ভকে বিধ্বস্ত করেছে, সে গোটা দ্বীনের ইমারতকে বিধ্বস্ত করে দিয়েছে। যে সালাতের ব্যাপারে গাফলতি করে, সে যত তাসবীহ-ওযীফাই পড়ুক কিংবা যত প্রচেষ্টা করুক না কেন, আল্লাহর নিকট সে কিছুই নয়।

এটি সেই সময়ের ঘটনা, যখন মূসা (আঃ) তাদের নিকট তাওরাত নিয়ে এলেন ও তার আদেশ-নিষেধ পড়ে শোনালেন, তখন তারা অভ্যাস মত তার উপর আমল করতে অস্বীকৃতি জানাল এবং তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল। যার ফলে মহান আল্লাহ পাহাড়কে তাদের উপর তুলে ধরলেন যে, তোমাদেরকে পাহাড় চাপা দিয়ে শেষ করে দেওয়া হবে। যার ভয়ে তারা তাওরাতের উপর আমল করার অঙ্গীকার করল। কেউ কেউ বলেন, পাহাড় তাদের উপর তোলার ঘটনা তাদেরই দাবী অনুসারে ঘটেছিল। যখন তারা বলেছিল, আমরা তাওরাতের উপর তখনই আমল করব যখন মহান আল্লাহ আমাদের মাথার উপর পাহাড়কে তুলে দেখাবেন। তবে প্রথম কথাটিই বেশি সঠিক বলে মনে হয়। (আর আল্লাহই অধিক জানেন।) এখানে সাধারণ পাহাড় তুলে ধরার কথা বলা হয়েছে, পাহাড়ের কোন নাম নেওয়া হয়নি। কিন্তু এর পূর্বে সূরা বাক্বারার ৬৩ ও ৯৩নং আয়াতে দুই জায়গায় এই ঘটনার উল্লেখ হয়েছে এবং সেখানে পরিষ্কারভাবে ত্বূর পাহাড়ের কথাই বলা হয়েছে।

অন্য আয়াতেও আল্লাহ তা’আলা সেটা বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, “আর তাদের অঙ্গীকার গ্রহণের জন্য তুর পর্বতকে আমরা তাদের উপর উত্তোলন করেছিলাম।” [সূরা আন-নিসা ১৫৪]