أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
৭ : ১৮৯ هُوَ الَّذِیۡ خَلَقَكُمۡ مِّنۡ نَّفۡسٍ وَّاحِدَۃٍ وَّ جَعَلَ مِنۡهَا زَوۡجَهَا لِیَسۡكُنَ اِلَیۡهَا ۚ فَلَمَّا تَغَشّٰهَا حَمَلَتۡ حَمۡلًا خَفِیۡفًا فَمَرَّتۡ بِهٖ ۚ فَلَمَّاۤ اَثۡقَلَتۡ دَّعَوَا اللّٰهَ رَبَّهُمَا لَئِنۡ اٰتَیۡتَنَا صَالِحًا لَّنَكُوۡنَنَّ مِنَ الشّٰكِرِیۡنَ
১৮৯. তিনিই তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন ও তার থেকে তার স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন, যাতে সে তার কাছে শান্তি পায়। তারপর যখন সে তার সাথে সংগত হয় তখন সে এক হালকা গর্ভধারণ করে এবং এটা নিয়ে সে অনায়াসে চলাফেরা করে। অতঃপর গর্ভ যখন ভারী হয়ে আসে তখন তারা উভয়ে তাদের রব আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে, যদি আপনি আমাদেরকে এক পূর্ণাঙ্গ সন্তান দান করেন তাহলে আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকব।
আদম (আঃ) হতে সৃষ্টির সূচনা। সেই কারণে তাঁকে প্রথম মানব বা মানব-পিতা বলা হয়।
এর থেকে হাওয়া (আলাইহাস সালাম)-কে বুঝানো হয়েছে; যিনি আদমের জীবন-সঙ্গিনী ছিলেন। তাঁর সৃষ্টি আদম হতেই হয়েছিল। যা منها এর সর্বনাম হতে বুঝা যায়। (বিস্তারিত দেখুন সূরা নিসা ১নং আয়াতের টীকায়।)
একটি প্রাণ’ বলতে মানবকুলের পিতা আদম (আঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। আর خَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا এতে مِنْهَا থেকে উক্ত প্রাণ অর্থাৎ, আদম (আঃ)-কেই বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, আদম (আঃ) থেকেই তাঁর স্ত্রী হাওয়াকে সৃষ্টি করেন। আদম (আঃ) থেকে হাওয়াকে কিভাবে সৃষ্টি করা হয়, এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে।
এখানে দুটি মত রয়েছে, (এক) তার থেকে অর্থাৎ তারই সমপর্যায়ের করে তার স্ত্রীকে সৃষ্টি করেছেন।
(দুই) তার শরীর থেকেই তার স্ত্রীকে সৃষ্টি করেছেন। এ মতের সপক্ষে হাদীসের কিছু উক্তি পাওয়া যায়,
ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, হাওয়া পুরুষ অর্থাৎ, আদম (আঃ) থেকে সৃষ্টি হয়েছেন। অর্থাৎ, তাঁর পাঁজরের হাড় থেকে। অপর একটি হাদীসে বলা হয়েছে যে, ‘‘নারীদেরকে পাঁজরের হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আর পাঁজরের হাড়ের মধ্যে উপরের হাড়টি অধিক বাঁকা। যদি তা সোজা করতে যাও, তাহলে ভেঙ্গে ফেলবে। আর যদি তুমি তার দ্বারা উপকৃত হতে চাও, তবে তার মধ্যে বক্রতা অবশিষ্ট থাকা অবস্থাতেই উপকৃত হতে পারবে।’’ (বুখারী ৩৩৩১, মুসলিম ১৪৬৮নং) উলামাদের কেউ কেউ এই হাদীসের ভিত্তিতে ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত উক্তিকেই সমর্থন করেছেন। কুরআনের শব্দ خَلَقَ مِنْهَا থেকেও এই মতের সমর্থন হয়। অর্থাৎ, মা হাওয়ার সৃষ্টি সেই একটি প্রাণ থেকেই হয়েছে, যাকে ‘আদম’ বলা হয়।
হে মানুষ! তোমরা তোমাদের রবের তাকওয়া অবলম্বন কর যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন ও তার থেকে তার স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের দুজন থেকে বহু নর-নারী ছড়িয়ে দেন; আর তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর যার নামে তোমরা একে অপরের কাছে নিজ নিজ হক দাবী কর এবং তাকওয়া অবলম্বন কর রক্ত-সম্পর্কিত আত্মীয়ের ব্যাপারেও। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের উপর পর্যবেক্ষক। সুরা নিসাঃ ১
অর্থাৎ, যাতে সে তাঁর নিকট প্রশান্তি ও সুখ লাভ করে। কারণ, প্রত্যেক জীব কেবল স্বজাতির কাছেই নৈকট্য লাভ করে ও শান্তি পায়; যা মানসিক প্রশান্তির জন্য একান্ত জরুরী। নৈকট্য বিনা তা সম্ভব নয়।
অন্যত্র আল্লাহ বলেন, {وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِّتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَّوَدَّةً وَرَحْمَةً} অর্থাৎ, তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে আর একটি নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য হতেই তোমাদের সঙ্গিনীদেরকে সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা ওদের নিকট শান্তি পাও এবং তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও মায়া-মমতা সৃষ্টি করেছেন। (সূরা রূম ২১ আয়াত)
অর্থাৎ, মহান আল্লাহ নারী-পুরুষের মধ্যে পারস্পরিক যে টান ও আকর্ষণ সৃষ্টি করেছেন। প্রকৃতির এই চাহিদা জোড়া সৃষ্টির মাধ্যমে পূরণ হয় এবং এক অপরের নৈকট্য ও ভালবাসা অর্জন করে। সুতরাং বাস্তব এই যে, স্বামী-স্ত্রীর মাঝে যে প্রেম-ভালবাসা দেখা যায়, তা পৃথিবীর আর কারো মাঝে দেখা যায় না।
সূরা আর রুম এর ২১ নং আয়াত থেকে যদি স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কটা বুঝি,.
.এই আয়াত থেকে স্বামী-স্ত্রী সম্পর্কটির বিভিন্ন পর্যায় তিনটি শব্দের দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায়।
প্রথম শব্দ: ‘তাসকুনু’
“যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তিতে থাক”
‘শান্তি’ এর আরবি শব্দটি হচ্ছে – ‘তাসকুনু’। ‘তাসকুনু’ শব্দটির মূল হচ্ছে সুকুন। সুকুন অর্থাৎ প্রশান্তি।
যে কেউই তার ভালবাসার ব্যক্তির সাথে থাকার সময় প্রশান্তির এই অনুভূতি তীব্রভাবে অনুভব করে। আর এই সুকুন সম্পর্কটা কে এগিয়ে নিয়ে যায় দ্বিতীয় ধাপের দিকে।
দ্বিতীয় শব্দ: ‘মাওয়াদ্দাহ’
“তিনি তোমাদের মধ্যে সৃষ্টি করেছেন পারস্পরিক সম্প্রীতি”
‘সম্প্রীতি’ এর আরবি শব্দটি হচ্ছে – ‘মাওয়াদ্দাহ’। মহান আল্লাহর সুন্দরতম নামের একটি হলো আল-ওয়াদূদ। যার অর্থ প্রেমময়। মাওয়াদ্দাহ শব্দটি একই উৎস থেকে এসেছে। যা দ্বারা বুঝায় – গভীর আবেগের উচ্ছ্বাস মিশ্রিত ভালবাসা, কারোর জন্য বা কোন কিছুর প্রতি তীব্র আকর্ষণ মূলক বন্ধন। অর্থাৎ স্বামী স্ত্রী একে অপরের সাথে এই পবিত্র বন্ধনে যুক্ত থাকে।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় যে, যে সম্পর্কের বয়স যত বাড়তে থাকে, সেখানে আবেগ অনুভুতি কমতে থাকে এবং বাস্তবতা সামনে আসে। প্রথম প্রথম পরস্পরের ভুল ত্রুটি পরস্পরের চোখে না পরলেও বা ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখলেও, দিন যত যায়, পরস্পরের দোষ ত্রুটি পরস্পরের চোখে পড়া শুরু করে। দাম্পত্য জীবনের পথ চলায় অনিবার্য কিছু বাঁধা বিপত্তি এসেই যায়। তাহলে এখন কী দরকার?
] তৃতীয় শব্দঃ ‘রাহমা’
তারপর আল্লাহ তায়ালা দয়া সৃষ্টির কথা বললেন,
“এবং তিনি তোমাদের মধ্যে সৃষ্টি করেছেন দয়া”
‘দয়া’ এর আরবি শব্দ ‘রাহমা’। রাহমা অর্থ দয়া/ মমতা/ কোমলতা, স্নেহময় ভালবাসা।
সম্পর্কের বয়স যখন আরো বাড়তে থাকে একসময় ঝগড়া মনোমালিন্য ইত্যাদি কারণে আগের সেই সুকুন তথা প্রশান্তি সবসময় থাকেনা। একসময় তো এমনও মনে হয় যে, বিয়ে করেই ভুল হয়েছে।
তাই শেষে আল্লাহ তায়ালা বললেন যে, তিনি উভয়ের হৃদয়ে পরপ্সরের জন্য ‘রাহমা’ এঁকে দিয়েছেন। এতে করে মান অভিমান হলেও যেন একে অপরকে গভীর মমতায় ক্ষমা করে দিতে পারে।
এই ‘রাহমা’ ই সম্পর্কটাকে এগিয়ে নিয়ে যায়, কারণ যত কিছুই হোক না কেন বুকের গভীরে আমরা কখনোই চাইনা আমাদের ভালবাসার মানুষটা কষ্ট পাক।
স্বামী নিজ স্ত্রীকে সর্বপ্রকার সুখ-সুবিধা ও আরাম-আয়েশ দান করে থাকে। অনুরূপ স্ত্রীও নিজের সাধ্য ও ক্ষমতা অনুযায়ী স্বামীর সেবা করে থাকে। মহান আল্লাহ উভয়ের উপরেই সে দায়িত্ব ন্যস্ত করেছেন। বলা বাহুল্য, মানুষ এই শান্তি ও অগাধ প্রেম-ভালবাসা সেই দাম্পত্যের মাধ্যমেই লাভ করতে পারে যার সম্পর্কের ভিত্তি শরীয়তসম্মত বিবাহের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে। পরন্তু ইসলাম একমাত্র বিবাহসূত্রের মাধ্যমেই সম্পৃক্ত দম্পতিকেই জোড়া বলে স্বীকার করে। অন্যথায় শরীয়ত-বিরোধী দাম্পত্যের (লিভ টুগেদারের) সম্পর্ককে ইসলাম জোড়া বলে স্বীকার করে না। বরং তাদেরকে ব্যভিচারী আখ্যায়িত করে এবং তাদের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান প্রয়োগ করে।.
আয়াতটির শেষে আল্লাহ তায়ালা বলেছেনঃ
“নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল লোকদের জন্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে”
সুতরাং বৈবাহিক জীবন মানেই কেবল ‘কেয়ারিং’ আর ‘শেয়ারিং’ নয়। মুলত বিয়ের উদ্দেশ্য পরস্পর থেকে সুকুন তথা প্রশান্তি লাভ হলেও, একেবারে টানা সবসময় সেই প্রশান্তি আশা করলেই চলবেনা।
দাম্পত্য জীবন সহজ নয়। এখানে অনেক গুলো ঝামেলার ব্যাপার আছে। সংসারে অভাব আসবে, বাঁধা বিপত্তি আসবে, কথা ধরা ধরি মনোমালিন্য, ভুল বুঝাবুঝি হবে, সংসার কেন্দ্রিক চিন্তা বিষন্নতা আসবে ইত্যাদি। তারপর আল্লাহ তায়ালা আবার যখন সন্তান দান করবেন, সেই সন্তান একই সাথে নেয়ামত আবার পরীক্ষাও, কাউকে সন্তান দিয়ে পরীক্ষা করা হয়, কাউকে না দিয়ে। মুলত সংসার জীবনটাই পরীক্ষা।
সুতরাং জীবনসংগী এমন হবে যে, আল্লাহ’র উপর তাওয়াক্কুল করে যাকে সাথে নিয়ে প্রতিকুলতা গুলো কে ম্যানেজ করে পরস্পরের প্রতি ‘রাহমা’ (দয়া) প্রদর্শন করে, পরস্পরকে ক্ষমা করে সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে।
সুতরাং আল্লাহ তায়ালা যখন সুকুন দান করবেন তখন তা উপভোগ করতে হবে, আল্লাহ প্রদত্ত নেয়ামত- পারস্পারিক সম্প্রীতি বজায় রেখে চলার চেষ্টা করতে হবে এবং সংসার জীবনে যখন পরীক্ষা চলে আসবে তখন ধৈর্য্য ধরে ‘রাহমা’ প্রদর্শনেরর প্র্যাকটিস করতে হবে।
অর্থাৎ, এইভাবেই মানব-বংশ বিস্তার লাভ করে ও পরবর্তীতে এক জোড়া স্বামী-স্ত্রী এক অপরের সাথে মিলিত হয়। تَغَشَّاها এর আসল অর্থ ঢেকে নেওয়া, উদ্দেশ্য যৌন-মিলনে লিপ্ত হওয়া।
অর্থাৎ, গর্ভের শুরু দিনগুলিতে। শুক্র হতে রক্তপিন্ড এবং তা হতে গোশতপিন্ডে পরিণত হওয়া পর্যন্ত গর্ভ হাল্কাই থাকে, অনুভবও হয় না, আর মহিলাদের বিশেষ কোন কষ্টও হয় না।
ভারী হয়ে যাওয়ার অর্থ যখন ভ্রূণ পেটে বড় হয়ে যায়। আর জন্মের সময় যত নিকটবর্তী হয়, পিতা-মাতার অন্তরে নানান দুশ্চিন্তা ও আশংকা উঁকি মারে। আর এটি মানুষের স্বভাবজাত অভ্যাস যে, বিপদের সময় আল্লাহর দিকেই ফিরে যায়। অতএব তারা দু’জন আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে ও তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশের প্রতিশ্রুতি দেয়।
৭ : ১৯০ فَلَمَّاۤ اٰتٰهُمَا صَالِحًا جَعَلَا لَهٗ شُرَكَآءَ فِیۡمَاۤ اٰتٰهُمَا ۚ فَتَعٰلَی اللّٰهُ عَمَّا یُشۡرِكُوۡنَ
১৯০. অতঃপর তিনি (আল্লাহ) যখন তাদেরকে এক পূর্ণাঙ্গ সুসন্তান দান করেন, তখন তারা তাদেরকে তিনি যা দিয়েছেন সেটাতে আল্লাহ্র বহু শরীক নির্ধারণ করে, বস্তুত তারা যাদেরকে (তার সাথে) শরীক করে আল্লাহ তার চেয়ে অনেক ঊর্ধ্বে।
এখানে মুশরিকদের জাহেলিয়াত প্রসূত গোমরাহীর সমালোচনা করা হয়েছে। এ ভাষণটির মূল বক্তব্য হচ্ছে, মহান সর্বশক্তিমান আল্লাহই সর্বপ্রথম মানব জাতিকে সৃষ্টি করেন। মুশরিকরাও একথা অস্বীকার করেনা। তারপর পরবর্তিকালের প্রত্যেকটি মানুষকেও তিনিই অস্তিত্ব দান করেন। আর একথাটিও মুশরিকরা জানে। নারী গর্ভে শুক্রকে সংরক্ষণ, তারপর এ সামান্য হালকা গর্ভটি লালন করে তাকে একটি জীবন্ত মানব শিশুতে পরিণত করা, এরপর সেই শিশুটির মধ্যে বিভিন্ন ধরনের শক্তি ও যোগ্যতা সৃষ্টি করে তাকে একটি সুস্থ ও পরিপূর্ণ অবয়বের অধিকারী মানুষ হিসেবে দুনিয়ার বুকে ভূমিষ্ঠ করা-এসবকিছু আল্লাহর ইচ্ছাধীন। মহান ও সর্বশক্তিমান আল্লাহ যদি নারীর গর্ভে সাপ, বাঁদর বা অন্য কোন অদ্ভুত দেহাবয়ব বিশিষ্ট জীব সৃষ্টি করে দেন অথবা মায়ের গর্ভেই শিশুকে অন্ধ, বধির, বোবা, খঞ্জ করে দেন বা তার শারীরিক, মানসিক ও আত্মিক শক্তির মধ্যে কোন ত্রুটি জন্মিয়ে দেন, তাহলে আল্লাহর গড়া এ আকৃতিকে পরিবর্তন করার ক্ষমতা কারোর নেই। একক আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাসীদের ন্যায় মুশরিকরাও এ সত্যটি সম্পর্কে সমানভাবে অবগত। তাই দেখা যায়, গর্ভবস্থায় সুস্থ, সবল ও নিখুঁত অবয়বধারী শিশু ভূমিষ্ঠ হবার ব্যাপারে আল্লাহর ওপরই পূর্ণ ভরসা করা হয়। কিন্তু সেই আশা পূর্ণ হয়ে যদি চাঁদের মত ফুটফুটে সুন্দর শিশু ভূমিষ্ঠ হয়, তাহলেও জাহেলী কর্মকাণ্ড নবতর রূপ নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে। কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উদ্দেশ্যে কোন দেবী, অবতার, অলী ও পীরের নামে নজরানা ও শিন্নী নিবেদন করা হয় এবং শিশুকে এমন সব নামে অভিহিত করা হয় যেন, মনে হয় সে আল্লাহর নয়, বরং অন্য কারোর অনুগ্রহের ফল। যেমন তার নামকরণ করা হয় হোসাইন বখশ (হোসাইনের দান), পীর বখশ (পীরের দান), আবদুর রসূল (রসূলের গোলাম), আবদুল উয্যা(উয্যা দেবতার দাস), আবদে শামস(সূর্য দাস) ইত্যাদি ইত্যাদি।
আরবের মুশরিক সম্প্রদায়ের অপরাধ ছিল এই যে, তারা সুস্থ, সবল ও পূর্ণ অবয়ব সম্পন্ন সন্তান জন্মের জন্য আল্লাহর কাছে দোআ করতো কিন্তু সন্তানের জন্মের পর আল্লাহর এ দানে অন্যদেরকে অংশীদার করতো। নিঃসন্দেহে তাদের এ অবস্থা ছিল অত্যন্ত খারাপ। কিন্তু বর্তমানে তাওহীদের দাবীদারদের মধ্যে আমরা যে শির্কের চেহারা দেখছি তা তার চাইতেও খারাপ।
এ তাওহীদের তথাকথিত দাবীদাররা সন্তানও চায় আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যদের কাছে। গর্ভ সঞ্চারের পর আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যদের নামে মানত মানে এবং সন্তান জন্মের পর তাদেরই আস্তানায় গিয়ে নজরানা নিবেদন করে। এরপরও জাহেলী যুগের আরবরাই কেবল মুশরিক, আর এরা নাকি পাক্কা তাওহীদবাদী!
এই বিশ্বাস পোষণ করা যে, আমি অমুক পীরের মাযারে গিয়েছিলাম, আর সেখান থেকেই এই সন্তান লাভ হয়েছে। অথবা সন্তান লাভের পর কোন মৃত ব্যক্তির নামে নযর-নিয়ায দেওয়া। অথবা সন্তানকে কোন মাযারে নিয়ে গিয়ে তার মাথা সেখানে ঠেকানো; এই ধারণায় যে, তারই বর্কতেই এই সন্তান হয়েছে। এই সকল কর্মই আল্লাহর সাথে শরীক করার পর্যায়ভুক্ত; যা দুর্ভাগ্যক্রমে মুসলিম জনসাধারণের মধ্যেও বিস্তার লাভ করেছে। পরবর্তী আয়াতে মহান আল্লাহ শিরকের খন্ডন করেছেন।
৭ : ১৯১ اَیُشۡرِكُوۡنَ مَا لَا یَخۡلُقُ شَیۡئًا وَّ هُمۡ یُخۡلَقُوۡنَ
১৯১. তারা কি এমন বস্তুকে শরীক করে যারা কিছুই সৃষ্টি করে না? বরং ওরা নিজেরাই সৃষ্ট
এ আয়াতে আল্লাহ তা’আলা ঐ সমস্ত লোকদের কর্মকাণ্ডের নিন্দা করছেন, যার আল্লাহর সাথে মূর্তি, দেব-দেবী ইত্যাদিকে শরীক করে। অথচ তারা সৃষ্ট, মানুষের হাতের তৈরী। তারা কিছুরই মালিক নয়। ক্ষতি কিংবা উপকার করার ক্ষমতা রাখে না। উপাসনাকারীদের পক্ষে প্রতিরোধ করার ক্ষমতাও তাদের নেই। বরং এগুলো হচ্ছে, মৃত। নড়াচড়া কিংবা শোনা বা দেখার ক্ষমতাও তাদের নেই। বরং উপাসনাকারীরা এগুলোর চেয়ে বেশী শক্তিশালী; কারণ তাদের চোখ আছে, কান আছে, তারা পাকড়াও করার ক্ষমতা রাখে। তাহলে তোমরা কিভাবে তাদের ইবাদত করছ যারা কোন কিছুই সৃষ্টি করেনি? কোন কিছু সৃষ্টি করার ক্ষমতাও যাদের নেই? [ইবন কাসীর]
অন্য আয়াতেও আল্লাহ্ তা’আলা অনুরূপ বলেছেন, “হে মানুষ! একটি উপমা দেয়া হচ্ছে, মনোযোগের সাথে তা শোন: তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদেরকে ডাক তারা তো কখনো একটি মাছিও সৃষ্টি করতে পারবে না, এ উদ্দেশ্যে তারা সবাই একত্র হলেও। এবং মাছি যদি কিছু ছিনিয়ে নিয়ে যায় তাদের কাছ থেকে, এটাও তারা তার কাছ থেকে উদ্ধার করতে পারবে না। অন্বেষনকারী ও অন্বেষনকৃত কতই না দুর্বল; তারা আল্লাহকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেয়নি যেমন মর্যাদা দেয়া উচিত ছিল, আল্লাহ নিশ্চয় ক্ষমতাবান, পরাক্রমশালী। [সূরা হজ-৭৩–৭৪] আল্লাহ বলেন, যে, তাদের উপাস্যগুলো সবাই একত্রিত হলেও কোন একটি মাছি সৃষ্টি করতে পারবে না। বরং যদি মাছি এ সমস্ত উপাস্যদের কোন নিকৃষ্ট খাবার নিয়ে উড়ে চলে যায়, তারা সেটাও মাছির কাছ থেকে উদ্ধার করতে পারবে না। যার অবস্থা হচ্ছে এই, রিযক কিংবা সাহায্য লাভের জন্য কিভাবে ইবাদত তার করা হবে? [ইবন কাসীর]
৭ : ১৯২ وَ لَا یَسۡتَطِیۡعُوۡنَ لَهُمۡ نَصۡرًا وَّ لَاۤ اَنۡفُسَهُمۡ یَنۡصُرُوۡنَ
১৯২. ওরা না তাদেরকে সাহায্য করতে পারে আর না নিজেদের সাহায্য করতে পারে
এমনকি কেউ তাদের ক্ষতি করতে চাইলেও তারা নিজেদের পক্ষ থেকে প্রতিরোধ করতে পারবে না। ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এ সমস্ত মা’বুদদেরকে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে ফেলেছিলেন এবং এ বিষয়টি নিয়ে মুশরিকদের উপাস্যদেরকে অপমান করতে ছাড়েন নি। আল্লাহ বলেন, “তারপর ইবরাহীম তাদের উপর সবলে আঘাত হানলেন [সূরা আস-সাফফাত: ৯৩] আরও বলেন, “তারপর তিনি চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিলেন মূর্তিগুলোকে, তাদের প্রধানটি ছাড়া ; যাতে তারা তার দিকে ফিরে আসে। [সূরা আল-আম্বিয়া: ৫৮] [ইবন কাসীর]
৭ : ১৯৩ وَ اِنۡ تَدۡعُوۡهُمۡ اِلَی الۡهُدٰی لَا یَتَّبِعُوۡكُمۡ ؕ سَوَآءٌ عَلَیۡكُمۡ اَدَعَوۡتُمُوۡهُمۡ اَمۡ اَنۡتُمۡ صَامِتُوۡنَ
১৯৩. আর তোমরা তাদেরকে সৎপথে ডাকলেও তারা তোমাদেরকে অনুসরণ করবে না; তোমরা ওদেরকে ডাক বা চুপ থাক, তোমাদের জন্য উভয়ই সমান।
মুশরিকদের বাতিল মা’বুদদের অবস্থা হচ্ছে এই যে, তাদের পক্ষে কাউকে সঠিক পথ দেখানো এবং নিজেদের অনুগামী ও পূজারীদেরকে পথের সন্ধান দেয়া তো দূরের কথা, তারা তো কোন পথপ্রদর্শকের অনুসরণ করারও যোগ্যতা রাখে না। এমন কি কোন আহবানকারীর আহবানের জবাব দেবার ক্ষমতাও তাদের নেই। তাদেরকে কেউ ডাকল কি তাদেরকে পিষে ফেলল, সবই তাদের কাছে সমান। একথাটিই ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তার পিতাকে বলেছিলেন, “যখন তিনি তার পিতাকে বললেন, হে আমার প্রিয় পিতা! আপনি তার ইবাদাত করেন কেন যে শুনে না, দেখে না এবং আপনার কোন কাজেই আসে না? [সূরা মারইয়াম: ৪২] [ইবন কাসীর]
৭ : ১৯৪ اِنَّ الَّذِیۡنَ تَدۡعُوۡنَ مِنۡ دُوۡنِ اللّٰهِ عِبَادٌ اَمۡثَالُكُمۡ فَادۡعُوۡهُمۡ فَلۡیَسۡتَجِیۡبُوۡا لَكُمۡ اِنۡ كُنۡتُمۡ صٰدِقِیۡنَ
১৯৪. আল্লাহ ছাড়া তোমরা যাদেরকে আহবান কর তারা তো তোমাদেরই মত বান্দা; সুতরাং তোমরা তাদেরকে ডাক, অতঃপর তারা যেন তোমাদের ডাকে সাড়া দেয়, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।
যখন তারা জীবিত ছিল। আর এখন (ওদের মৃত্যুর পর) তোমরা তাদের তুলনায় বেশি ‘কামেল’ (সাবলম্বী)। কারণ, তারা দেখতে পায় না, তোমরা দেখতে পাও। তারা শুনতে পায় না, তোমরা শুনতে পাও। তারা কারো কথা বুঝতে পারে না, আর তোমরা বুঝতে পার। তারা উত্তর দিতে সক্ষম নয়, তোমরা উত্তরদানে সক্ষম। এখান হতে প্রমাণিত যে, মুশরিকরা যাদের মূর্তি তৈরী করে ইবাদত করত, তারাও আল্লাহর বান্দা মানুষই ছিল। যেমন নূহ (আঃ)-এর পাঁচ মূর্তি সম্পৃক্ত ঘটনায় সহীহ বুখারীতে এ কথা স্পষ্ট যে, তাঁরা আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দা ছিলেন।
৭ : ১৯৫ اَلَهُمۡ اَرۡجُلٌ یَّمۡشُوۡنَ بِهَاۤ ۫ اَمۡ لَهُمۡ اَیۡدٍ یَّبۡطِشُوۡنَ بِهَاۤ ۫ اَمۡ لَهُمۡ اَعۡیُنٌ یُّبۡصِرُوۡنَ بِهَاۤ ۫ اَمۡ لَهُمۡ اٰذَانٌ یَّسۡمَعُوۡنَ بِهَا ؕ قُلِ ادۡعُوۡا شُرَكَآءَكُمۡ ثُمَّ كِیۡدُوۡنِ فَلَا تُنۡظِرُوۡنِ
১৯৫. তাদের কি পা আছে যা দিয়ে ওরা চলে? তাদের কি হাত আছে যা দিয়ে ওরা ধরে? তাদের কি চোখ আছে যা দিয়ে ওরা দেখে? কিংবা তাদের কি কান আছে যা দিয়ে ওরা শুনে? বলুন, তোমরা যাদেরকে আল্লাহর শরীক করেছ তাদেরকে ডাক তারপর আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র কর এবং আমাকে অবকাশ দিও না।
এখানে আল্লাহ ছাড়া তারা যাদের আহবান করে, যাদের ইবাদত করে, যাদের প্রতি তাদের আশা-আকাঙ্খা ও ভয়-ভীতি পোষণ করে, তাদের অপারগতা ও অসহায়তা সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। আল্লাহ বলেন যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া যাদের আহবান করে থাক, তাদের কি পাকড়াও করার মত সত্যিকারের হাত আছে? নাকি তাদের সত্যিকারের চোখ আছে যে, তারা দেখবে? নাকি তাদের সত্যিকারের কান আছে যে তারা তোমাদের আহবান শুনবে? মানুষের কাছে যে সমস্ত শক্তি আছে তাদের কাছে তো তাও নেই। যদি এগুলো তোমাদের কোন কাজেই না আসে, তোমাদের আহবানেও সাড়া না দেয়, তারা তোমাদের মতই বান্দা বরং তোমরা তাদের থেকেও পরিপূর্ণ, তাহলে কিসের ভিত্তিতে তোমরা তাদের ইবাদত কর? তোমরা ও তোমাদের উপাস্যরা একত্রিত হয়ে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র কর, আমাকে কোন প্রকার অবকাশ দিও না। দেখতে পাবে যে, তোমরা আমার কোন ক্ষতি পৌছাতে সক্ষম নও। [সা’দী]
৭ : ১৯৬ اِنَّ وَلِیِّ ۦَ اللّٰهُ الَّذِیۡ نَزَّلَ الۡكِتٰبَ ۫ۖ وَ هُوَ یَتَوَلَّی الصّٰلِحِیۡنَ
১৯৬. আমার অভিভাবক তো আল্লাহ্ যিনি কিতাব নাযিল করেছেন এবং তিনিই সৎকর্মপরায়ণদের অভিভাবকত্ব করে থাকেন।
এখানে ‘ওলী’ অর্থ রক্ষাকারী, সাহায্যকারী, অভিভাবক। আর ‘কিতাব’ অর্থ কুরআন। ‘সালেহীন’ অর্থ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমার ভাষায় সে সমস্ত লোক, যারা আল্লাহর সাথে কাউকে সমকক্ষ সাব্যস্ত করে না। এতে নবী-রাসূল থেকে শুরু করে সাধারণ সৎকর্মশীল মুসলিম পর্যন্ত সবাই অন্তর্ভুক্ত। আয়াতের অর্থ হচ্ছে, তোমাদের বিরোধিতার কোন ভয় আমার এ কারণেই নেই যে, আমার রক্ষাকারী, সাহায্যকারী ও অভিভাবক হলেন আল্লাহ, যিনি আমার উপর কুরআন নাযিল করেছেন।
এখানে আল্লাহ তা’আলার সমস্ত গুণাবলীর মধ্যে বিশেষভাবে কুরআন নাযিল করার গুণটি উল্লেখ করা হয়েছে এজন্য যে, তোমরা যে আমার শক্রতা ও বিরোধিতায় বদ্ধপরিকর হয়ে আছ তার কারণ হচ্ছে যে, আমি তোমাদেরকে কুরআনের শিক্ষা দেই এবং তিনিই আমার সাহায্যদাতা ও রক্ষণাবেক্ষণকারী। অতএব, আমার কি চিন্তা?
আয়াতের শেষ বাক্যটিতে একটি সাধারণ নিয়ম বাতলে দেয়া হয়েছে যে, নবী-রাসূলগণের মর্যাদা তো বহু উর্ধ্বে, সাধারণ সৎ মুসলিমদের জন্যও আল্লাহ সহায়, রক্ষাকারী ও অভিভাবক। অর্থাৎ আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট। তিনিই আমার সাহায্যকারী, তার উপরই আমার ভরসা। আর তার কাছেই আমি আশ্রয় চাই। দুনিয়া ও আখেরাতে তিনিই আমার অভিভাবক। আর আমার পরে প্রত্যেক নেককার বান্দারও তিনি অভিভাবক। [ইবন কাসীর]
এ আয়াতের সমর্থনে অন্যত্র এসেছে, “আমরা তো এটাই বলি, আমাদের উপাস্যদের মধ্যে কেউ তোমাকে অশুভ দ্বারা আবিষ্ট করেছে। তিনি বললেন, নিশ্চয় আমি আল্লাহকে সাক্ষী করছি এবং তোমরাও সাক্ষী হও যে, নিশ্চয় আমি তা থেকে মুক্ত যাকে তোমরা শরীক কর, আল্লাহ ছাড়া। সুতরাং তোমরা সবাই আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র কর; তারপর আমাকে অবকাশ দিও না। আমি তো নির্ভর করি আমার ও তোমাদের রব আল্লাহর উপর; এমন কোন জীব-জন্তু নেই, যে তার পূর্ণ আয়ত্তাধীন নয়; নিশ্চয় আমার রব আছেন সরল পথে।” [সূরা হুদ: ৫৪–৫৬]
৭ : ১৯৭ وَ الَّذِیۡنَ تَدۡعُوۡنَ مِنۡ دُوۡنِهٖ لَا یَسۡتَطِیۡعُوۡنَ نَصۡرَكُمۡ وَ لَاۤ اَنۡفُسَهُمۡ یَنۡصُرُوۡنَ
১৯৭. আর আল্লাহ ছাড়া তোমরা যাদেরকে ডাক তারা তো তোমাদেরকে সাহায্য করতে পারে না এবং তারা তাদের নিজেদেরকেও সাহায্য করতে পারে না।
৭ : ১৯৮ وَ اِنۡ تَدۡعُوۡهُمۡ اِلَی الۡهُدٰی لَا یَسۡمَعُوۡا ؕ وَ تَرٰىهُمۡ یَنۡظُرُوۡنَ اِلَیۡكَ وَ هُمۡ لَا یُبۡصِرُوۡنَ
১৯৮. আর যদি আপনি তাদেরকে সৎপথে ডাকেন তবে তারা শুনবে না এবং আপনি দেখতে পাবেন যে, তারা আপনার দিকে তাকিয়ে আছে; অথচ তারা দেখে না।
অন্যত্রও আল্লাহ্ তা’আলা এ কথা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, “তোমরা তাদেরকে ডাকলে তারা তোমাদের ডাক শুনবে না এবং শুনলেও তোমাদের ডাকে সাড়া দেবে না। [সূরা ফাতের: ১৪]
অর্থাৎ এ উপাস্যদের দিকে তাকালে মনে হবে যেন, তারা তোমার দিকে তাকিয়ে আছে। বস্তুত: তারা তাদের এ নির্জীব চোখ দিয়ে তোমাদের দিকে তাকাতে দেখলেও তারা কিন্তু তোমাদের দেখতে পাচ্ছে না। এ ব্যাপারে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। [ইবন কাসীর]
৭ : ১৯৯ خُذِ الۡعَفۡوَ وَ اۡمُرۡ بِالۡعُرۡفِ وَ اَعۡرِضۡ عَنِ الۡجٰهِلِیۡنَ
১৯৯. মানুষের (চরিত্র ও কর্মের) উৎকৃষ্ট অংশ গ্রহণ করুন, সৎকাজের নির্দেশ দিন এবং অজ্ঞদেরকে এড়িয়ে চলুন।
আলোচ্য আয়াতগুলোতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সর্বোত্তম চরিত্রের হেদায়াত দেয়া হয়েছে। [সা’দী] তাতে তিনটি বাক্য রয়েছে।
প্রথম নির্দেশ হচ্ছে, আপনি عفو গ্রহণ করুন। এখানে উল্লেখিত العفو শব্দটির আরবী অভিধান মোতাবেক একাধিক অর্থ হতে পারে এবং একত্রে সব ক’টি অর্থই প্রযোজ্য হতে পারে। সে কারণেই তাফসীরবিদ আলেমগণের বিভিন্ন দল বিভিন্ন অর্থ গ্রহণ করেছেন।
(এক) অধিকাংশ তাফসীরকার যে অর্থ নিয়েছেন তা হল এই যে, عفو বলা হয় এমন প্রত্যেকটি কাজকে, যা সহজে কোন রকম আয়াস ব্যতিরেকে সম্পন্ন হতে পারে। [ইবন কাসীর] তাহলে বাক্যটির অর্থ দাঁড়ায় এই যে, আপনি এমন বিষয় গ্রহণ করে নিন, যা মানুষ অনায়াসে করতে পারে। অর্থাৎ শরীআত নির্ধারিত কর্তব্য সম্পাদনে আপনি সাধারণ মানুষের কাছে সুউচ্চমান দাবী করবেন না; বরং তারা সহজে যে পরিমাণ আমল করতে পারে আপনি তাই গ্রহণ করে নিন। মুফাসসিরগণের মতে, এ আয়াতটিতে আল্লাহ্ তা’আলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মানুষের আমল-আখলাকের ব্যাপারে সাধারণ আনুগত্য কবুল করে নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। [আত-তাফসীরুস সহীহ] অর্থাৎ মানুষ যা করতে পারে তার প্রকাশ্যরূপ দেখেই আমি সন্তুষ্ট থাকব। তাদের প্রকৃতি যেটা করতে সমর্থ নয় সেটা তাদের উপর চাপিয়ে দেব না। তাদের ভুল-ত্রুটি হলে সেটা উপেক্ষা করে যাব। তাদের উপর কঠোরতা আরোপ করব না। [ইবন কাসীর; সাদী; ফাতহুল কাদীর]
(দুই) عفو এর অপর অর্থ ক্ষমা করা এবং অব্যাহতি দেয়াও হয়ে থাকে। তাফসীরকার আলেমগণের এক দল এক্ষেত্রে এ অর্থেই বাক্যটির মর্ম সাব্যস্ত করেছেন এই যে, আপনি পাপী-অপরাধীদের ক্ষমা করে দিন। [ইবন কাসীর, যায়দ ইবন আসলাম হতে]
আয়াতের দ্বিতীয় নির্দেশ হচ্ছে, আপনি عرف এর নির্দেশ দিন। এখানে العرف শব্দটির অর্থ, সৎকাজ বা পরিচিত কাজ। যে কোন ভাল ও প্রশংসনীয় কাজই এর অন্তর্ভুক্ত। [ইবন কাসীর] অর্থাৎ যেসব লোক আপনার সাথে মন্দ ও উৎপীড়নমূলক আচরণ করে, আপনি তাদের থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করবেন না; বরং তাদেরকে ক্ষমা করে দিন। কিন্তু সেই সাথে তাদেরকে সৎকাজেরও উপদেশ দিতে থাকুন। অর্থাৎ অসদাচরণের বিনিময় সদাচরণ এবং অত্যাচারের বিনিময় শুধুমাত্র ন্যায়নীতির মাধ্যমেই নয়; বরং অনুগ্রহের মাধ্যমে দান করুন।
আয়াতের তৃতীয় নির্দেশ হচ্ছে, আপনি জাহেল বা মূখদেরকে উপেক্ষা করুন। যারা জাহেল তাদের কাছ থেকে আপনি দূরে সরে থাকুন। মর্মার্থ এই যে, আপনি অত্যাচারের প্রতিশোধ না নিয়ে তাদের সাথে কল্যাণকর ও সৌহার্দ্যপূর্ণ ব্যবহার করুন এবং একান্ত কোমলতার সাথে তাদেরকে সত্য ও ন্যায়ের বিষয় বাতলে দিন। কিন্তু বহু মূৰ্খ এমনও থাকে যারা এহেন ভদ্রোচিত আচরণে প্রভাবিত হয় না; বরং এমতাবস্থায়ও তারা মূর্খজনোচিত রূঢ় ব্যবহারে প্রবৃত্ত হয়।
এমন ধরনের লোকদের সাথে আপনার আচরণ হবে এই যে, তাদের হৃদয়বিদারক মূর্খ-জনোচিত কথা-বার্তায় দুঃখিত হয়ে তাদেরই মত ব্যবহার আপনিও করবেন না; বরং তাদের থেকে দূরে সরে থাকবেন। তাফসীরশাস্ত্রের ইমাম ইবনে-কাসীর রাহিমাহুল্লাহ বলেনঃ দূরে সরে থাকার অর্থও মন্দের প্রত্যুত্তরে মন্দ ব্যবহার না করা। এর অর্থ এই নয় যে, তাদের হেদায়াত করাও বর্জন করতে হবে। কারণ, এটা রিসালাত ও নবুওয়তের দায়িত্ব এবং মর্যাদার যোগ্য নয়।
এক্ষেত্রে আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত একটি ঘটনা রয়েছে যে, উমার ফারুক রাদিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফত আমলে উয়াইনাহ ইবনে হিসন একবার মদীনায় আসে এবং স্বীয় ভ্রাতুস্পপুত্র হুর ইবন কায়সের মেহমান হয়। হুর ইবনে কায়স ছিলেন সে সমস্ত বিজ্ঞ আলেমদের একজন যারা ফারুকে আযম রাদিয়াল্লাহু আনহুর পরামর্শ সভায় অংশগ্রহণ করতেন। উয়াইনাহ স্বীয় ভ্রাতুস্পপুত্র হুরকে বললঃ তুমি তো আমীরুল মু’মীনের একজন অতি ঘনিষ্ঠ লোক; আমার জন্য তার সাথে সাক্ষাতের একটা সময় নিয়ে এসো।
হুর ইবনে কায়স রাদিয়াল্লাহু আনহু উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর নিকট নিবেদন করলেন যে, আমার চাচা উয়াইনাহ আপনার সাথে সাক্ষাত করতে চান। তখন তিনি অনুমতি দিয়ে দিলেন। কিন্তু উয়াইনাহ উমার ফারুক রাদিয়াল্লাহু আনহুর দরবারে উপস্থিত হয়েই একান্ত অমার্জিত ও ভ্রান্ত কথাবার্তা বলতে লাগল যেঃ আপনি আমাদেরকে না দেন আমাদের ন্যায্য অধিকার, না করেন আমাদের সাথে ন্যায় ও ইনসাফের আচরণ। উমার ফারক রাদিয়াল্লাহু আনহু তার এসব কথা শুনে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলে হুর ইবন কায়স নিবেদন করলেনঃ হে আমীরুল মুমিনীন, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন, “আপনি ক্ষমা করুন, সৎকাজের নির্দেশ দিন এবং অজ্ঞদেরকে এড়িয়ে চলুন” আর এ লোকটিও জাহেলদের একজন। এই আয়াতটি শোনার সাথে সাথে উমার ফারুক রাদিয়াল্লাহু আনহুর সমস্ত রাগ শেষ হয়ে গেল এবং তাকে কোন কিছুই বললেন না। উমার ফারুক রাদিয়াল্লাহু আনহুর ব্যাপারে প্রসিদ্ধ ছিল যে, আল্লাহর কিতাবে বর্ণিত হুকুমের সামনে তিনি ছিলেন উৎসর্গিত প্ৰাণ। [বুখারীঃ ৪৬৪২]
৭ : ২০০ وَ اِمَّا یَنۡزَغَنَّكَ مِنَ الشَّیۡطٰنِ نَزۡغٌ فَاسۡتَعِذۡ بِاللّٰهِ ؕ اِنَّهٗ سَمِیۡعٌ عَلِیۡمٌ
২০০. আর যদি শয়তানের কুমন্ত্রণা আপনাকে প্ররোচিত করে, তবে আল্লাহর আশ্রয় চাইবেন। নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।
এ আয়াতটি পূর্ববর্তী আয়াতের উপসংহার। কারণ, এতে হেদায়াত দেয়া হয়েছে যে, যারা অত্যাচার-উৎপীড়ন করে এবং মূর্খজনোচিত ব্যবহার করে, তাদের ভুলক্রটি ক্ষমা করে দেবেন। তাদের মন্দের উত্তর মন্দের দ্বারা দেবেন না। এ বিষয়টি মানব প্রকৃতির পক্ষে একান্তই কঠিন। বিশেষতঃ এমন পরিস্থিতিতে সৎ এবং ভাল মানুষদেরকেও শয়তান রাগাম্বিত করে লড়াই-ঝগড়ায় প্রবৃত্ত করেই ছাড়ে। সে জন্যই পরবর্তী আয়াতে উপদেশ দেয়া হয়েছে যে, যদি এহেন মুহুর্তে রোষানল জ্বলে উঠতে দেখা যায়, তবে বুঝবেন শয়তানের পক্ষ থেকেই এমনটি হচ্ছে এবং তার প্রতিকার হল আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাওয়া, তার সাহায্য প্রার্থনা করা।
হাদীসে উল্লেখ রয়েছে যে, দুজন লোক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস ওয়াসাল্লামের সামনে ঝগড়া-বিবাদ করছিল। এদের একজন রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারাবার উপক্রম হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আমি একটি বাক্য জানি, যদি এ লোকটি সে বাক্য উচ্চারণ করে, তাহলে তার এই উত্তেজনা প্রশমিত হয়ে যাবে।
তারপর বললেনঃ বাক্যটি হল এই أعُوذُ بِاللهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ সে লোক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট শুনে সঙ্গে সঙ্গে বাক্যটি উচ্চারণ করল। তাতে সাথে সাথে তার রোষানল প্রশমিত হয়ে গেল। [বুখারীঃ ৩২৮২, ৬০৪৮, ৬১১৫, মুসলিমঃ ২৬১০, ইবন হিব্বানঃ ৫৬৯২, আবু দাউদঃ ৪৭৮০, তিরমিযীঃ ৩৪৫২, মুসনাদে আহমাদঃ ৫/২৪৪, নাসায়ী, আমলুল ইয়াওমে ওয়াল্লাইলাঃ ৩৯৩]
অন্য হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে তাহাজ্জুদের জন্য দাঁড়ালে তিনবার তাকবীর বলতেন, তিনবার লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলতেন, সুবহানাল্লাহ ওয়া বিহামদিহী তিনবার বলতেন, তারপর বলতেনঃ أَعُوذُ بِاللهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ مِنْ هَمْزِهِ وَنَفْخِهِ وَنَفْثِهِ
অর্থাৎ আমি বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই, তার কুমন্ত্রণা হতে, অহংকার হতে, তার হাতে মৃত্যু হওয়া থেকে। [আবু দাউদঃ ৭৬৪, ইবন মাজাহঃ ৮০৭, মুসনাদে আহমাদঃ ৪/৮৫]
৭ : ২০১ اِنَّ الَّذِیۡنَ اتَّقَوۡا اِذَا مَسَّهُمۡ طٰٓئِفٌ مِّنَ الشَّیۡطٰنِ تَذَكَّرُوۡا فَاِذَا هُمۡ مُّبۡصِرُوۡنَ
২০১. নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করছে, তাদেরকে শয়তান যখন কুমন্ত্রনা দেয় তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে এবং সাথে সাথেই তাদের চোখ খুলে যায়।
মূল আরবী হচ্ছে, طائف। মুজাহিদ বলেন, এর অর্থ ক্ৰোধ। [তাবারী] ইবন আব্বাস বলেন, এর অর্থ শয়তানের কোন ছোঁয়া বা স্পর্শ। [তাবারী]
শয়তান যেহেতু ইসলামের পথের দিকে দাওয়াত দেয়ার কাজটির উন্নতি কখনো দু’চোখে দেখতে পারে না তাই সে হামেশাই এ ব্যাপারে প্রতিকুল পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। তাই এ আয়াতে বলা হয়েছে, যারা মুত্তাকী তারা নিজেদের মনে কোন শয়তানী প্ররোচনার প্রভাব এবং কোন অসৎ চিন্তার ছোঁয়া অনুভব করতেই সাথে সাথেই সজাগ হয়ে উঠে। তারপর এ পর্যায়ে কোন ধরনের কর্মপদ্ধতি অবলম্বনে দ্বীনের স্বার্থ রক্ষিত হবে এবং সত্য প্রীতির প্রকৃত দাবী কি তা তারা পরিষ্কার দেখতে পায়। তারা তাওবা করে এবং প্রচুর পরিমাণে সৎকাজ করে। ফলে শয়তান বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হয়৷
পক্ষান্তরে যাদের কাজের সাথে স্বার্থপ্রীতি অংগাংগীভাবে জড়িত এবং এ জন্য শয়তানের সাথে যাদের ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, তারা অবশ্যি শয়তানী প্ররোচনার মোকাবিলায় টিকে থাকতে পারে না এবং তার কাছে পরাজিত হয়ে ভুল পথে পা বাড়ায়। একের পর এক খারাপ ও পাপের পথে শয়তান তাদেরকে নিয়ে যায়। এসব কাজ করতে তারা সামান্যতমও পিছপা হয় না। সুতরাং শয়তান তাদের পথভ্রষ্টতায় কমতি করে না। আর তারাও খারাপ কাজে যেতে কসূর করে না। [সা’দী]
৭ : ২০২ وَ اِخۡوَانُهُمۡ یَمُدُّوۡنَهُمۡ فِی الۡغَیِّ ثُمَّ لَا یُقۡصِرُوۡنَ
২০২. তাদের সঙ্গী-সাথীরা তাদেরকে ভুলের দিকে টেনে নেয়। তারপর এ বিষয়ে তারা কোন ত্রুটি করে না।
শয়তান মানুষদের মধ্যে যাদেরকে তাদের অনুগত পায়, তাদেরকে পথভ্রষ্টতায় নিপতিত করতেই থাকে। তারপর শয়তানরা তাদেরকে প্ররোচনা দিতেই থাকে, এ ব্যাপারে তারা কোন প্রকার কমতি করে না। অনুরূপভাবে শয়তানের অনুসারীরাও শয়তানরা তাদেরকে যে সমস্ত গর্হিত কাজের প্ররোচনা দেয় সেগুলোর উপর আমল করতে সামান্যতম কুষ্ঠিত হয় না। [মুয়াসসার]
সুতরাং অন্যায় কাজে তারা একে অপরের সহযোগী। তারা সর্বক্ষণ পথভ্রষ্টতাতেই লিপ্ত থাকে। তাদের কাছে কোন প্রকার ওয়ায নসীহত আসলেও তা কাজে লাগে না। ওয়ায ও নসীহত তাদের চক্ষু খুলে দেয় না, যেমনটি পূর্বের আয়াতে বলা হয়েছে যে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে তারা শয়তানের ধোঁকায় পড়লেও ওয়ায-নসীহত পেলে তাদের চোখ খুলে যায় এবং তারা অন্যায় কাজ থেকে ফিরে আসে। কিন্তু যারা খারাপ লোক তারা শয়তানের প্ররোচনা ও ভ্রষ্টতাতেই লিপ্ত থাকে। তারা কখনো চক্ষুষ্মান হয় না। [জালালাইন]
৭ : ২০৩ وَ اِذَا لَمۡ تَاۡتِهِمۡ بِاٰیَۃٍ قَالُوۡا لَوۡ لَا اجۡتَبَیۡتَهَا ؕ قُلۡ اِنَّمَاۤ اَتَّبِعُ مَا یُوۡحٰۤی اِلَیَّ مِنۡ رَّبِّیۡ ۚ هٰذَا بَصَآئِرُ مِنۡ رَّبِّكُمۡ وَ هُدًی وَّ رَحۡمَۃٌ لِّقَوۡمٍ یُّؤۡمِنُوۡنَ
২০৩. আপনি যখন তাদের কাছে (তাদের চাওয়া মত) কোন আয়াত নিয়ে আসেন না, তখন তারা বলে, আপনি নিজেই একটি আয়াত বানিয়ে নেন না কেন? বলুন, ‘আমার রবের পক্ষ থেকে যা আমার কাছে ওহী হিসেবে প্রেরণ করা হয়, আমি তো শুধু তারই অনুসরণ করি। এ কুরআন তোমাদের রবের পক্ষ থেকে স্পষ্ট প্রমাণ। আর হিদায়াত ও রহমত এমন সম্প্রদায়ের জন্য যারা ঈমান আনে।
এখানে আয়াত বলে মু’জিযা ও অলৌকিক কিছু প্রদর্শনের কথা বোঝানো হয়েছে। যেমন অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, “আমরা ইচ্ছে করলে আসমান থেকে তাদের কাছে এক নিদর্শন নাযিল করতাম, ফলে সেটার প্রতি তাদের ঘাড় বিনত হয়ে পড়ত।” [সূরা আশ-শু’আরা: ৪] কারণ মক্কার কুরাইশ ও কাফেররা সবসময় এটা বলত যে, আপনি কষ্ট করে এমন একটি মু’জিযা নিয়ে আসেন না কেন, যা দেখে আমরা ঈমান আনতে বাধ্য হয়ে যাই।
এর জবাবে আল্লাহ্ তা’আলা তার নবীকে বলছেন যে, আপনি বলুন, মু’জিযা নিয়ে আসা আমার কাজ নয়। আমি তো শুধু আমার রবের ওহীর অনুসরণ করি। তিনি যদি কোন মু’জিযা আমাকে প্রদান করেন আমি সেটা গ্রহণ করি। আর যদি না দেন তবে আমি নিজের পক্ষ থেকে সেটা চেয়ে নেই না। তারপর আল্লাহ তা’আলা তাদেরকে সর্বশ্রেষ্ঠ মু’জিযা কুরআন গ্রহণ করার প্রতি পথনির্দেশ করলেন। [ইবন কাসীর]
অর্থাৎ এই কুরআন তোমাদের রবের পক্ষ থেকে আগত বহুবিধ দলীল-প্রমাণ ও নিদর্শনের এক সমাহার। এতে সামান্য লক্ষ্য করলেই একথা বিশ্বাস না করে উপায় থাকে না যে, এটি যথার্থই আল্লাহর কালাম। এতে কোন সৃষ্টিরই কোন হাত নেই। অতঃপর বলা হয়েছেঃ এই কুরআন সারা বিশ্বের জন্য সত্য দলীল তো বটেই, অবলম্বনও বটে।
৭ : ২০৪ وَ اِذَا قُرِیٴَ الۡقُرۡاٰنُ فَاسۡتَمِعُوۡا لَهٗ وَ اَنۡصِتُوۡا لَعَلَّكُمۡ تُرۡحَمُوۡنَ
২০৪. আর যখন কুরআন পাঠ করা হয় তখন তোমরা মনোযোগের সাথে তা শুন এবং নিশ্চুপ হয়ে থাক যাতে তোমাদের প্রতি দয়া করা হয়।
এখানে ঐ সকল কাফেরদের সম্পর্কে বলা হচ্ছে, যারা কুরআন তিলাঅতের সময় চেঁচামেচি করত এবং সঙ্গী-সাথীদের বলত, {لَا تَسْمَعُوا لِهَذَا الْقُرْآنِ وَالْغَوْا فِيهِ} অর্থাৎ, তোমরা কুরআন শোন না এবং হট্টগোল কর। (সূরা হা-মীম সাজদাহ ২৬) তাদেরকে বলা হল যে, এর পরিবর্তে তোমরা যদি মন দিয়ে শোন ও নীরব থাক, তাহলে হয়তো বা তোমাদেরকে আল্লাহ হিদায়াত দান করবেন এবং সেই সাথে তোমরা আল্লাহর দয়া ও রহমতের অধিকারী হয়ে যাবে। কোন কোন ইমাম এটিকে সাধারণ আদেশ বলে ব্যক্ত করেছেন। অর্থাৎ, যখনই কুরআন পাঠ করা হবে; নামাযে হোক বা নামাযের বাইরে তখনই সকলকেই নীরব থেকে কুরআন শ্রবণ করার আদেশ দেওয়া হয়েছে। এই সাধারণ আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে সশব্দে ক্বিরাআত পড়া হয়, এমন সমস্ত নামাযে মুক্তাদীদের সূরা ফাতিহা পাঠ কুরআনের এই আদেশের পরিপন্থী বলেছেন। পক্ষান্তরে অন্যান্য ইমামদের মত হল, সশব্দে ক্বিরাআত পড়া হয়, এমন নামাযে ইমামের পিছনে সূরা ফাতিহা পাঠ করার ব্যাপারে নবী (সাঃ) তাকীদ করেছেন, যা সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। তাঁদের নিকট এই আয়াত শুধুমাত্র কাফেরদের জন্য মনে করাই সঠিক। যেমন এই সূরার মক্কী হওয়ার মধ্যেও এর সমর্থন পাওয়া যায়। কিন্তু যদি এটিকে সাধারণ আদেশ মেনে নেওয়া যায়, তবুও নবী (সাঃ) এই সাধারণ আদেশ হতে মুক্তাদীদেরকে আলাদা করে নিয়েছেন। আর এভাবে কুরআনের এই আদেশ সত্ত্বেও মুক্তাদীদের সশব্দে ক্বিরাআতবিশিষ্ট নামাযেও সূরা ফাতিহা পাঠ করা আবশ্যিক হবে। কারণ কুরআনের এই সাধারণ আদেশ থেকে সূরা ফাতিহা পাঠ করার আদেশ সহীহ মজবূত হাদীস দ্বারা ব্যতিক্রান্ত। যেমন অন্য কিছু ক্ষেত্রে কুরআনের ব্যাপক আদেশকে সহীহ হাদীস দ্বারা নির্দিষ্ট করে নেওয়া স্বীকৃত। যেমন, (الزَّانِيَةُ والزَّانِي فَاجلِدُوا) এর ব্যাপক আদেশ হতে বিবাহিত ব্যভিচারীকে আলাদা বা নির্দিষ্ট করা হয়েছে। অনুরূপ (والسَّارِقُ وَالسَّارِقة) এর ব্যাপক আদেশ হতে এমন চোরকে আলাদা বা নির্দিষ্ট করা হয়েছে, যে দীনারের এক চতুর্থাংশের কম মাল চুরি করেছে অথবা চুরির মাল যথেষ্ট হিফাযতে ছিল না ইত্যাদি। অনুরূপ (فَاستَمِعُوا لَهُ وأَنصِتُوا) এর ব্যাপক আদেশ হতে মুক্তাদীদেরকে আলাদা বা নির্দিষ্ট করে নেওয়া হবে। সুতরাং তাদের সশব্দে ক্বিরাআত হয় এমন সকল নামাযেও সূরা ফাতিহা পাঠ করা জরুরী হবে। কারণ নবী (সাঃ) এর তাকীদ দিয়েছেন। যেমন সূরা ফাতিহার তফসীরে ঐ সকল হাদীস বর্ণিত হয়েছে।
৭ : ২০৫ وَ اذۡكُرۡ رَّبَّكَ فِیۡ نَفۡسِكَ تَضَرُّعًا وَّ خِیۡفَۃً وَّ دُوۡنَ الۡجَهۡرِ مِنَ الۡقَوۡلِ بِالۡغُدُوِّ وَ الۡاٰصَالِ وَ لَا تَكُنۡ مِّنَ الۡغٰفِلِیۡنَ
২০৫. আর আপনি আপনার রবকে নিজ মনে স্মরণ করুন সবিনয়ে, সশংকচিত্তে ও অনুচ্চস্বরে, সকালে ও সন্ধ্যায়। আর উদাসীনদের অন্তভুক্ত হবেন না।
স্মরণ করা অর্থ নামাযও এবং অন্যান্য ধরনের স্মরণ করাও। চাই মুখে মুখে বা মনে মনে যে কোনভাবেই তা হোক না কেন। সকাল-সাঁঝ বলতে সুনির্দিষ্টভাবে এ দুটি সময়ও বুঝানো হয়ে থাকতে পারে। আর এ দু’ সময়ে আল্লাহর স্মরণ বলতে বুঝানো হয়েছে সকালের ও বিকালের নামাযকে। [তাবারী] অনুরূপ অর্থে অপর সূরায় এসেছে,
“এবং আপনার রবের সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করুন সূর্যোদয়ের আগে ও সূর্যাস্তের আগে।” [সূরা কাফ: ৩৯]
যিকর আরবী শব্দ। এর বেশ কয়েকটি অর্থ হতে পারে-
(ক) মুখ থেকে যা উচ্চারণ করা হয়।
(খ) অন্তরে কোন কিছু স্মরণ করা।
(গ) কোন জিনিস সম্পর্কে সতর্ক করা।
শরী’ঈ পরিভাষায় যিকর হচ্ছে, বান্দা তার রবকে স্মরণ করা। হোক তা তার নাম নিয়ে, গুণ নিয়ে, তার কাজ নিয়ে, প্রশংসা করে, তার কিতাব তিলাওয়াত করে, তার একত্ববাদ ঘোষণা করে, তার নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করে অথবা তার কাছে কিছু চেয়ে।
যিকর দুই প্রকার। যথা – কওলী বা কথার মাধ্যমে যিকর ও আমলী বা কাজের মাধ্যমে যিকর। প্রথম প্রকার যিকরের মধ্যে রয়েছে – কুরআন তিলাওয়াত, আল্লাহর সুন্দর সুন্দর নাম ও সিফাতসমূহের আলোচনা ও স্মরণ, তার একত্ববাদ ঘোষণা ইত্যাদি।
আর দ্বিতীয় প্রকারে রয়েছে – ইলম অর্জন করা ও শিক্ষা দেয়া, আল্লাহর হুকুম-আহকাম ও আদেশ-নিষেধ মেনে চলা ইত্যাদি।
পক্ষান্তরে সকাল-সাঁঝ কথাটা “সর্বক্ষণ” অর্থেও ব্যবহৃত হয়। [কাশশাফ] এবং তখন এর অর্থ হয় সবসময় আল্লাহর স্মরণে মশগুল থাকা। এর উদ্দেশ্য বর্ণনা প্রসংগে বলা হয়েছে, তোমাদের অবস্থা যেন গাফেলদের মত না হয়ে যায়। দুনিয়ায় যা কিছু গোমরাহী ছড়িয়েছে এবং মানুষের নৈতিক চরিত্রে ও কর্মকাণ্ডে যে বিপর্যয়ই সৃষ্টি হয়েছে তার একমাত্র কারণ হচ্ছে, মানুষ ভুলে যায়, আল্লাহ তার রব, সে আল্লাহর বান্দা, দুনিয়ার জীবন শেষ হবার পর তাকে তার রবের কাছে হিসাব দিতে হবে। যখন উদাসীনতা কোন ব্যক্তির উপর প্রাধান্য বিস্তার করে তখন সে কেবল ধারণা ও মনোবৃত্তির অনুসরণ করে এবং এটাকে শয়তান তার নিকট সুশোভিত করে তোলে। আর তার চিত্ত নানা কুপ্রবৃত্তিকে ভালোবাসে। এ জাতীয় গাফলতির কারণেই আল্লাহ তা‘আলা কাফের এবং মুনাফিক্বদের দুনিয়া ও আখেরাতে শাস্তি প্রদান করবেন।
গাফলতির অর্থ হল: ইচ্ছাকৃতভাবে কল্যাণ কামনা না করা ও তা পছন্দ না করা, সেই সাথে উপকারী জ্ঞান ও সৎকর্ম থেকে অন্তর শূন্য হওয়া। আর এটাই হল ধ্বংসকারী চরম গাফলতি। বস্তুত এ জাতীয় গাফলতী কাফের ও মুনাফিক্বদের মাঝে বিরাজ করে এবং এটা কারো মাঝে থাকলে সে আল্লাহর নিকট তাওবা করা ব্যতীত সফলকাম হবে না।
অন্তরের সবচেয়ে বড় ব্যাধিসমূহের অন্যতম হল গাফলতি। বস্তুত চরম গাফলতির কারণে কাফের ও মুনাফিক্বেরা হতভাগ্য হয়েছে এবং এটি তাদেরকে জাহান্নামে স্থায়ী হওয়াকে অবধারিত করেছে। মহান আল্লাহ বলেন,
مَنۡ کَفَرَ بِاللّٰہِ مِنۡۢ بَعۡدِ اِیۡمَانِہٖۤ اِلَّا مَنۡ اُکۡرِہَ وَ قَلۡبُہٗ مُطۡمَئِنٌّۢ بِالۡاِیۡمَانِ وَ لٰکِنۡ مَّنۡ شَرَحَ بِالۡکُفۡرِ صَدۡرًا فَعَلَیۡہِمۡ غَضَبٌ مِّنَ اللّٰہِ ۚ وَ لَہُمۡ عَذَابٌ عَظِیۡمٌ . ذٰلِکَ بِاَنَّہُمُ اسۡتَحَبُّوا الۡحَیٰوۃَ الدُّنۡیَا عَلَی الۡاٰخِرَۃِ ۙ وَ اَنَّ اللّٰہَ لَا یَہۡدِی الۡقَوۡمَ الۡکٰفِرِیۡنَ . اُولٰٓئِکَ الَّذِیۡنَ طَبَعَ اللّٰہُ عَلٰی قُلُوۡبِہِمۡ وَ سَمۡعِہِمۡ وَ اَبۡصَارِہِمۡ ۚ وَ اُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡغٰفِلُوۡنَ .
‘কেউ তার ঈমান আনার পর আল্লাহর সাথে কুফরী করলে এবং কুফরীর জন্য হৃদয় উন্মুক্ত রাখলে তার উপর আপতিত হবে আল্লাহর গযব এবং তার জন্য রয়েছে মহাশাস্তি। তবে তার জন্য নয়, যাকে কুফরীর জন্য বাধ্য করা হয় কিন্তু তার চিত্ত ঈমানে অবিচলিত। এটা এ জন্য যে, তারা দুনিয়ার জীবনকে আখিরাতের উপর প্রাধান্য দেয়। আর আল্লাহ কাফির সম্প্রদায়কে হেদায়াত করেন না। এরাই তারা, আল্লাহ যাদের অন্তর, কান ও চোখে মোহর মেরে দিয়েছেন। আর তারাই গাফিল’ (সূরা আন-নাহাল : ১০৬-১০৮)।
একজন মুসলিমের পক্ষে কল্যাণকর কোন কাজে এবং কল্যাণকর উপকরণ গ্রহণে ও অকল্যাণ হতে নাজাতের পথ অবলম্বনে গাফলতি হতে পারে। ফলে তার গাফলতির পরিমাণ অনুসারে কল্যাণমূলক কাজের সওয়াব থেকে সে বঞ্চিত হয়। আর নাজাতের অবলম্বন পরিত্যাগ করার কারণে তার গাফলতির পরিমাণ অনুসারে দুর্ভাগ্য ও মন্দ দ্বারা তাকে শাস্তি দেয়া হয়। মহান আল্লাহ বলেন,
وَ لِکُلٍّ دَرَجٰتٌ مِّمَّا عَمِلُوۡا ۚ وَ لِیُوَفِّیَہُمۡ اَعۡمَالَہُمۡ وَ ہُمۡ لَا یُظۡلَمُوۡنَ
‘আর প্রত্যেকের জন্য তাদের আমল অনুসারে মর্যাদা রয়েছে এবং যাতে আল্লাহ প্রত্যেকের কাজের পূর্ণ প্রতিফল দিতে পারেন। আর তাদের প্রতি যুলুম করা হবে না’ (সূরা আল-আহকাফ : ১৯)। তিনি আরো বলেন,
وَ اَنۡ لَّیۡسَ لِلۡاِنۡسَانِ اِلَّا مَا سَعٰی . وَ اَنَّ سَعۡیَہٗ سَوۡفَ یُرٰی . ثُمَّ یُجۡزٰىہُ الۡجَزَآءَ الۡاَوۡفٰی.
‘আর এই যে, মানুষ তাই পায় যা সে চেষ্টা করে। আর তার প্রচেষ্টার ফল শীঘ্রই দেখা যাবে। তারপর তাকে দেয়া হবে পূর্ণ প্রতিদান’ (সূরা আন-নাজম : ৩৯-৪১)। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর রবের থেকে বর্ণনা করে বলেন, ‘তোমরা আমার অনুগ্রহে জান্নাতে প্রবেশ কর এবং তোমাদের আমল অনুপাতে নিজের অংশ গ্রহণ কর’।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আরো বলেছেন, ‘একদল লোক সর্বদা পিছনে থাকবে ফলে মহান আল্লাহও তাদেরকে পিছনে ফেলে রাখবেন। যদিও তারা জান্নাতে প্রবেশ করে’।
নাজাতের উপকরণ গ্রহণে উদাসীনতার শাস্তি সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
اَوَ لَمَّاۤ اَصَابَتۡکُمۡ مُّصِیۡبَۃٌ قَدۡ اَصَبۡتُمۡ مِّثۡلَیۡہَا ۙ قُلۡتُمۡ اَنّٰی ہٰذَا ؕ قُلۡ ہُوَ مِنۡ عِنۡدِ اَنۡفُسِکُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ .
‘কি ব্যাপার! যখন তোমাদের উপর মুছীবত আসল (ওহুদের যুদ্ধে) তখন তোমরা বললে, এটা কোত্থেকে আসল? অথচ তোমরা তো দ্বিগুণ বিপদ ঘটিয়েছিলে (বদরের যুদ্ধে)। বলুন, এটা তোমাদের নিজেদেরই কাছ থেকে। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছুর উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান’ (সূরা আলে-ইমরান : ১৬৫)।
তিনি আরো বলেন, وَ مَاۤ اَصَابَکُمۡ مِّنۡ مُّصِیۡبَۃٍ فَبِمَا کَسَبَتۡ اَیۡدِیۡکُمۡ وَ یَعۡفُوۡا عَنۡ کَثِیۡرٍ ‘আর তোমাদের যে বিপদ-আপদ ঘটে তা তোমাদের হাত যা অর্জন করেছে তার কারণে এবং অনেক অপরাধ তিনি ক্ষমা করে দেন’ (সূরা আশ-শূরা : ৩০)
‘আমি যখনই তাদের উপর থেকে শাস্তি দূর করে দিতাম এক নির্দিষ্ট সময়ের জন্য যা তাদের জন্য নির্ধারিত ছিল, তারা তখনই তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গ করত। কাজেই আমি তাদের থেকে প্রতিশোধ নিয়েছি এবং তাদেরকে অতল সাগরে ডুবিয়ে দিয়েছি। কারণ তারা আমার নিদর্শনকে অস্বীকার করত এবং এ সম্বন্ধে তারা ছিল গাফেল’ (সূরা আল-আ‘রাফ : ১৩৫-১৩৬)।
তিনি আরো বলেন, وَ اِنَّ کَثِیۡرًا مِّنَ النَّاسِ عَنۡ اٰیٰتِنَا لَغٰفِلُوۡنَ ‘আর নিশ্চয় মানুষের মধ্যে অনেকেই আমার নিদর্শন সম্বন্ধে গাফিল’ (সূরা ইউনুস : ৯২)।
৭ : ২০৬ اِنَّ الَّذِیۡنَ عِنۡدَ رَبِّكَ لَا یَسۡتَكۡبِرُوۡنَ عَنۡ عِبَادَتِهٖ وَ یُسَبِّحُوۡنَهٗ وَ لَهٗ یَسۡجُدُوۡنَ ﴿۲۰۶﴾۩ (سُجود
২০৬. নিশ্চয় যারা আপনার রবের সন্নিধ্যে রয়েছে তারা তাঁর ইবাদাতের ব্যাপারে অহঙ্কার করে না। আর তারা তাঁরই তাসবীহ পাঠ করে এবং তারই জন্য সিজদা করে। [সাজদাহ]
যারা আল্লাহর কাছে রয়েছেন তারা আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত ফেরেশতাগণ। সে হিসেবে আয়াতের অর্থ হচ্ছে, শ্রেষ্ঠত্বের অহংকার করা ও রবের বন্দেগী থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া শয়তানের কাজ। এর ফল হয় অধঃপতন ও অবনতি। পক্ষান্তরে আল্লাহর সামনে ঝুঁকে পড়া এবং তাঁর বন্দেগীতে অবিচল থাকা একটি ফেরেশতাসুলভ কাজ। এর ফল হয় উন্নতি ও আল্লাহর নৈকট্য লাভ। যদি তোমরা এ উন্নতি চাও তাহলে নিজেদের কর্মনীতিকে শয়তানের পরিবর্তে ফেরেশতাদের কর্মনীতির অনুরূপ করে গড়ে তোল।
আল্লাহর মহিমা ঘোষণা করে অর্থাৎ আল্লাহ যে ক্রটিমুক্ত, দোষমুক্ত, ভুলমুক্ত সব ধরনের দুর্বলতা থেকে তিনি যে একেবারেই পাক-পবিত্র এবং তিনি যে লা-শরীক, তুলনাহীন ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী, এ বিষয়টি সর্বন্তিকরণে মেনে নেয়। মুখে তার স্বীকৃতি দেয় ও অঙ্গীকার করে এবং স্থায়ীভাবে সবসময় এর প্রচার ও ঘোষণায় সোচ্চার থাকে।
এখানে সালাত সংক্রান্ত ইবাদাতের মধ্য থেকে শুধু সিজদার কথা উল্লেখ করার কারণ এই যে, সালাতের সমগ্র আরকানের মধ্যে সিজদার একটি বিশেষ ফযীলত রয়েছে। হাদীসে রয়েছে যে, কোন এক লোক সওবান রাদিয়াল্লাহু আনহুর নিকট নিবেদন করলেন যে, আমাকে এমন একটা আমল বাতলে দিন যাতে আমি জান্নাতে যেতে পারি। সওবান রাদিয়াল্লাহু আনহু নীরব রইলেন; কিছু বললেন না। লোকটি আবার নিবেদন করলেন, তখনও তিনি চুপ করে রইলেন।
এভাবে তৃতীয়বার যখন বললেন, তখন তিনি বললেনঃ আমি এ প্রশ্নটিই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে করেছিলাম। তিনি আমাকে ওসীয়ত করেছিলেন যে, অধিক পরিমাণে সিজদা করতে থাক। কারণ, তোমরা যখন একটি সিজদা কর তখন তার ফলে আল্লাহ তা’আলা তোমাদের মর্যাদা এক ডিগ্রি বাড়িয়ে দেন এবং একটি গোনাহ ক্ষমা করে দেন। লোকটি বললেনঃ সওবান রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাথে আলাপ করার পর আমি আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাথে সাক্ষাৎ করে তার কাছেও একই নিবেদন করলাম এবং তিনিও একই উত্তর দিলেন। মুসলিমঃ ৪৮৮]
অন্য এক হাদীসে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বান্দা স্বীয় রবের সর্বাধিক নিকটবর্তী তখনই হয়, যখন সে বান্দা সিজদায় অবনত থাকে। কাজেই তোমরা সিজদারত অবস্থায় খুব বেশী করে দোআ-প্রার্থনা করবে। তাতে তা কবুল হওয়ার যথেষ্ট আশা রয়েছে। [মুসলিমঃ ৪৭৯, ৪৮২]
সুরা আল-আ’রাফের শেষ আয়াতটি হল আয়াতে সিজদা। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত রয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ‘কোন আদম সন্তান যখন কোন সিজদার আয়াত পাঠ করে অতঃপর সিজদায়ে তেলাওয়াতে সম্পন্ন করে, তখন শয়তান কাঁদতে কাঁদতে পালিয়ে যায় এবং বলে যে, আফসোস, মানুষের প্রতি সিজদার হুকুম হল আর সে তা আদায়ও করল, ফলে তার ঠিকানা হল জান্নাত, আর আমার প্রতিও সিজদার হুকুম হয়েছিল, কিন্তু আমি তার না-ফরমানী করেছি বলে আমার ঠিকানা হল জাহান্নাম’। [মুসলিমঃ ১৩৩]