সূরা ইউসুফ ১২তম রুকু(১০৫-১১১) আয়াত

নভোমন্ডল ও ভূমন্ডল এবং উভয়ের মধ্যে অসংখ্য বস্তুর অস্তিত¸ এ কথার প্রমাণ বহন করে যে, একজন সৃষ্টিকর্তা ও স্রষ্টা আছেন, যিনি উক্ত বস্তুসমূহকে অস্তিত¸ দান করেছেন এবং একজন পরিচালক আছেন, যিনি এসব এমনভাবে পরিচালনা করছেন যে, আদিকাল থেকে এই নিয়ম-শৃঙ্খলা সুচারুরূপে চালু আছে; অথচ এদের মধ্যে পারস্পরিক কোন সংঘর্ষ নেই। কিন্তু মানুষ এসব কিছু দেখার পরও এমনিই উপেক্ষা ও অতিক্রম করে চলে যায়, না তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে, আর না এ সবের মাধ্যমে নিজ প্রতিপালককে চেনে।

এ মহাজগতে বিদ্যমান ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অনু থেকে শুরু করে সর্ববৃহৎ সৃষ্টি সবকিছুই আল্লাহ তাআলার অস্তিত্ব প্রমাণ করে।

আর বিশ্বাসীদের জন্য পৃথিবীতে ছড়িয়ে আছে আমার নিদর্শনাবলি এবং স্বয়ং তোমাদের মাঝেও। সুতরাং তোমরা কি অনুধাবন করবে না? আকাশে বরাদ্দ করে রাখা হয়েছে তোমাদের জীবনোপকরণ ও তোমাদেরকে যা কিছুর প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। —সূরা যারিয়াত (৫১) : ২০-২১

ওপরের এগারটি রুকূ’তে হযরত ইউসুফের (আ) কাহিনী শেষ হয়েছে. যেহেতু লোকেরা নিজেরাই নবীকে ডেকে এনেছিল এবং  শোনার জন্য কান খাড়া করেছিল, তাই তাদের কথা শেষ হতেই নিজের উদ্দেশ্যমূলক কয়েকটি বাক্যও আল্লাহ তায়ালা জানিয়ে দিলেন। অতি সংক্ষেপে এ কয়েকটি বাক্যে উপদেশ ও দাওয়াতের সমস্ত বিষয়বস্তু একত্র করে দেয়া হয়েছে।

লোকদেরকে তাদের গাফলতি সম্পর্কে সতর্ক করে দেয়াই এর উদ্দেশ্য। পৃথিবী ও আকাশের প্রত্যেকটি জিনিস নিছক একটি জিনিসই নয় বরং সত্যের প্রতি ইঙ্গিতকারী একটি নিদর্শনও। যারা এ জিনিসগুলোকে শুধুমাত্র একটি জিনিস হিসেবে দেখে তারা মানুষের মতো নয় বরং পশুর মতো দেখে। পানিকে পানি, গাছকে গাছ এবং পাহাড়কে পাহাড় তো পশুরাও দেখে থাকে এবং নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রত্যেকটি পশু এগুলোর ব্যবহার ক্ষেত্রও জানে। কিন্তু মানুষকে যে উদ্দেশ্যে ইন্দ্রিয়ানুভূতি সহকারে চিন্তা-ভাবনা করার জন্য মস্তিষ্ক দান করা হয়েছে তা শুধু এজন্য নয় যে, মানুষ সেগুলো দেখবে এবং সেগুলোর ব্যবহার ক্ষেত্র জানবে বরং মানুষ সত্য অনুসন্ধান করবে এবং এ নিদর্শনগুলোর সাহায্যে তাকে চিনে নেবে, এটিই হচ্ছে এর মূল উদ্দেশ্য। এ ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ গাফলতির মধ্যে পড়ে আছে। আর এ গাফলতিই তাদেরকে গোমরাহীতে নিক্ষেপ করেছে। যদি মনের দুয়ারে এ তালা না লাগিয়ে নেয়া হতো, তাহলে নবীদের কথা বুঝা এবং তাঁদের নেতৃত্ব থেকে ফায়দা হাসিল করা লোকদের জন্য এত কঠিন হতো না।

কেন মানুষ উদাসীন থাকে?

চিন্তার অভাব: মানুষ প্রায়শই নিজের চারপাশের নেয়ামত ও প্রকৃতির বৈচিত্র্য নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে না।

অকৃতজ্ঞতা: আল্লাহর অসংখ্য নেয়ামত পেয়েও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করা এবং তা ভুলে যাওয়া।

গাফলত: আল্লাহর ইবাদত ও তাঁর সাথে সাক্ষাতের (কিয়ামতের) দিনের প্রস্তুতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া।

অহংকার ও অজ্ঞতা: নিজেকে বড় মনে করা এবং নিজের সৃষ্টি রহস্য না জানা।

এখানে এমন লোকদের সম্পর্কে বলা হচ্ছে, যারা আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাসী, কিন্তু তার সাথে অন্য বস্তুকে অংশীদার সাব্যস্ত করে। বলা হয়েছেঃ (وَمَا يُؤْمِنُ أَكْثَرُهُمْ بِاللَّهِ إِلَّا وَهُمْ مُشْرِكُونَ) অর্থাৎ তাদের মধ্যে যারা আল্লাহর উপর বিশ্বাস করে, তারাও শির্কের সাথে করে। তারা আল্লাহ্ তা’আলাকে রব, জীবনদাতা, মৃত্যুদাতা স্বীকার করে, কিন্তু তা সত্বেও তারা ইবাদাত করার সময় আল্লাহর সাথে অন্যান্যদেরও ইবাদাত করে। [তাবারী; কুরতুবী; বাগভী; ইবন কাসীর; সাদী] তাদের ঈমান হল আল্লাহর প্রভূত্বের উপর, আর তাদের শির্ক হল আল্লাহর ইবাদাতে। এ আয়াতের মধ্যে ঐ সমস্ত নামধারী মুসলিমও অন্তর্ভুক্ত, যারা আল্লাহ্‌র ইবাদতের পাশাপাশি পীর, কবর ইত্যাদির ইবাদাতও করে থাকে।

মক্কার মুশরিকরাও একটা পর্যায় পর্যন্ত আল্লাহ তাআলাকে এক মানত। কিন্তু কুরআন মজীদের ঘোষণা অনুযায়ী তা যথেষ্ট নয়। যেমন শুধু এটুকু মানা যে, আসমান-যমীন ও বিশ্বজগতের স্রষ্টা শুধু একজন। জগতের একাংশ একজনের সৃষ্টি, অন্য অংশ আরেক জনের এমন নয়। কুরআন মজীদের পাতায় পাতায় আছে, এটুকু একত্বের বিশ্বাস আরবের মুশরিকদেরও ছিল।

আল্লাহ তা‘আলার কতিপয় নির্দিষ্ট হক রয়েছে, যা এককভাবে আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট করা ওয়াজিব। এ হকগুলো তিন প্রকার:

১. মালিকানা ও কর্তৃত্বের অধিকার

২. ইবাদাত পাওয়ার অধিকার

৩. নাম ও গুণাবলীর অধিকার

এজন্যই আলেমগণ তাওহীদকে তিনভাগে বিভক্ত করেছেন। তাওহীদুর রুবূবীয়্যাহ, তাওহীদুল আসমা ওয়াস সিফাত এবং তাওহীদুল উলুহিয়্যাহ।

﴿إِنَّهُۥ مَن يُشۡرِكۡ بِٱللَّهِ فَقَدۡ حَرَّمَ ٱللَّهُ عَلَيۡهِ ٱلۡجَنَّةَ وَمَأۡوَىٰهُ ٱلنَّارُۖ وَمَا لِلظَّٰلِمِينَ مِنۡ أَنصَارٖ﴾ [المائ‍دة: ٧٢]

“যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শরীক করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতকে হারাম করে দিয়েছেন, তার ঠিকানা হবে জাহান্নাম এবং যালেমদের জন্য কোনো সাহায্যকারী থাকবে না।” [সূরা আল-মায়েদা, আয়াত: ৭২]

কুরআন মজীদের বিভিন্ন জায়গায় এ কথা আছে যে, মুশরিকদের যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, কে এই বিশ্বজগত ও আসমান-যমীনের স্রষ্টা, তারা বলবে, ‘আল্লাহ’।

ولئن سألتهم من خلق السموات والارض وسخر الشمس والقمر ليقولن الله.

সূরা আনকাবূত (২৯) : ৬১

বরং তারা এটাও মানত যে, এই জগতের নিয়ন্ত্রকও একমাত্র আল্লাহ। রিযিক ও জীবিকা তিনিই দান করেন, জীবন ও মৃত্যু তাঁরই আদেশে হয়। সূরায়ে ইউনুসে বলা হয়েছে

قل من يرزقكم من السماء والارض ام من يملك السمع والابصار ومن يخرج الحىّ من الميت ويخرج الميت من الحىّ ومن يدبر الامر فسيقولون الله.

(হে নবী! আপনি এই মুশরিকদের) জিজ্ঞাসা করুন, ‘কে আকাশ ও ভূমি হতে জীবিকা দান করেন, কিংবা কে মালিক শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তির, কে জীবিতকে বের করেন মৃত হতে আর মৃতকে জীবিত হতে, এবং কে নিয়ন্ত্রণ করেন (বিশ্বজগতের) সকল বিষয়, তারা বলবে, (এই সবকিছু করেন এক) আল্লাহ। বলুন তবু তোমরা সাবধান হচ্ছো না?-সূরা ইউনুস (১০) : ৩১

‘‘তাদেরকে জিজ্ঞেস করো, যদি তোমরা জানো তাহলে বলো, পৃথিবী এবং এর মধ্যে যারা বসবাস করছে তারা কার? তারা নিশ্চয়ই বলবে, সবই আল্লাহর। বলো, তবুও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না? তাদেরকে জিজ্ঞাসা করো, সাত আসমান ও মহান আরশের অধিপতি কে? তারা নিশ্চয় বলবে, আল্লাহ। বলো, তবুও কি তোমরা ভয় করবেনা? তাদেরকে জিজ্ঞেস করো, যদি তোমরা জেনে থাকো তাহলে বলো, কার হাতে সব বস্তুর কর্তৃত্ব? আর কে তিনি যিনি আশ্রয় দেন এবং তার মুকাবেলায় কেউ আশ্রয় দিতে পারে না? তারা নিশ্চয় বলবে এ বিষয়টি আল্লাহর জন্যই নির্ধারিত। বলো, তাহলে কোথা থেকে তোমাদেরকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে?’’ (সূরা মুমিনূন: ৮৪-৮৯)।

এটুকু একত্ব আরবের মুশরিকরাও মানত। তাহলে চিন্তা করা দরকার, তাদের শিরক আসলে কী ছিল। এ তো জানা কথা যে, তারা ছিল পৌত্তলিক জাতি এবং অসংখ্য দেব-দেবীতে বিশ্বাসী

কুরআন মজীদ থেকেই জানা যায়, এই সকল দেব-দেবী সম্পর্কে তারা মনে করত, এরা যদিও সেই শক্তিমান আল্লাহরই সৃষ্টি, কিন্তু আল্লাহর সাথে তাদের আছে এমন বিশেষ সম্পর্ক, যে, তারা কাউকে কিছু দিতে চাইলে দিতে পারে, কারো কাছ থেকে কিছু হরণ করতে চাইলে করতে পারে। তারা সম্পদ, সন্তান ও সুস্থতা দিতে পারে, আবার নিঃস্ব, অসহায় ও পথের ভিখারীও বানাতে পারে।

তাই এদেরকে রাজিখুশি করার জন্য তারা এদের উপাসনা করত, এদের নামে মান্নত-নযর মানত, নৈবেদ্য নিবেদন করত, মূর্তির চারপাশে প্রদক্ষিণ করত এবং নিজেদের হাজত ও জরুরত তাদের কাছে পেশ করত। তাদের এই সংস্কার ও রীতি-নীতিকেই কুরআন শিরক আখ্যা দিয়েছে। পৌত্তলিক সমাজ ও সম্প্রদায়ে সাধারণত এই শিরকই প্রচলিত ছিল। এমন মুশরিক বোধহয় খুব বেশি  ছিল না, যারা মনে করত, এই বিশ্বজগতের সৃজন ও নিয়ন্ত্রণে আল্লাহর কোনো শরীক আছে। আমাদের জানামতে কোনো মুশরিক সম্প্রদায় নিজেদের উপাস্যদের আল্লাহর সমকক্ষ মনে করেনি। আরবের মুশরিকদের বিষয়ে তো কুরআন-হাদীসে এ কথা পরিষ্কার আছে। কুরআন মজীদেই কয়েক জায়গায় আছে, নৌপথের ভ্রমণে তারা যখন বিপদের মুখোমুখি হত এবং উত্তাল তরঙ্গে প্রাণের আশঙ্কা দেখা দিত তখন তারা সব দেব-দেবীকে ভুলে যেত এবং শুধু এক আল্লাহকেই ডাকত। যেমন সূরা বনী ইসরাঈলে বলা হয়েছে-

واذا مسكم الضر في البحر ضل من تدعون الا اياه.

যখন সমুদ্রে বিপদ তোমাদের স্পর্শ করে তখন তো তিনি ছাড়া অন্যরা, যাদের তোমরা নাম ডেকে থাক অন্তর্হিত হয়ে যায়।-সূরা বনী ইসরাঈল (১৭) : ৬৭

সূরা লুকমানে বলা হয়েছে-

واذا غشيهم موج كالظلل دعوا الله مخلصين له الدين.

অর্থাৎ যখন সমুদ্রের ঢেউ মেঘমালার মতো তাদেরকে আচ্ছন্ন করে তখন তারা একনিষ্ঠ বিশ্বাসে এক আল্লাহকে ডাকতে থাকে। …-সূরা লুকমান (৩১) : ৩২

মোটকথা, আরবের মুশরিকদের আচরণ ও উচ্চারণ থেকে প্রকাশিত যে, তারা তাদের দেবতাদের আল্লাহর সমান মনে করত না; বরং তাঁর দাস ও সৃষ্টি বলেই মনে করত। তাদের বিশ্বাসেও আল্লাহই সবার উর্দ্ধে ও সবচেয়ে বড়। কিন্তু ইতিপূর্বে যা বলা হয়েছে সেটাই ছিল তাদের শিরক এবং একারণে তারা আল্লাহর কাছে মুশরিক বলে গণ্য।

কুরআন মজীদে এ শিরকেরই খন্ডন বেশি করা হয়েছে।  এক জায়গায় বলা হয়েছে-

واتخذوا من دونه آلهة لا يخلقون شيئا وهم يخلقون ولا يملكون لانفسهم ضرا ولا نفعا ولا يملكون موتا ولا حيوة ولا نشورا.

 আর তারা (মুশরিকরা) তাঁর পরিবর্তে এমন কিছু ইলাহ গ্রহণ করেছে, যারা কিছুই সৃষ্টি করে না; বরং তারা নিজেরাই আল্লাহর সৃষ্টি। তারা (অন্যদের বিষয়ে তো বলাইবাহুল্য) নিজেদেরই অপকার বা উপকারের ক্ষমতা রাখে না এবং না (এই দুনিয়ার) জীবন-মৃত্যুর উপর, না (মৃত্যুর পর) পুনুরুত্থানের উপর তাদের কোনো ক্ষমতা আছে। -সূরা ফুরকান (২৫) : ৩

অন্য জায়গায় ইরশাদ হয়েছে-

قل ادعوا الذين زعمتم من دون الله لا يملكون مثقال ذرة فى السموات ولا فى الارض وما لهم فيهما من شرك وما له منهم من ظهير.

 (হে নবী! ঐ মুশরিকদের) বলুন, ডাক তাদেরকে, যাদেরকে তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে (মালিক-মোখতার) মনে কর। তারা তো একটি কণারও মালিক নয়, না আসমানের, না যমীনের আর না এতদুভয়ে ওদের কোনো অংশ আছে, আর না ওদের কেউ আল্লাহর সাহায্যকারী ।-সূরা সাবা (৩৪) : ২২

ইবনে কাসীর বলেনঃ যেসব মুসলিম ঈমান সত্ত্বেও বিভিন্ন প্রকার শির্কে লিপ্ত রয়েছে, তারাও এ আয়াতের অন্তর্ভুক্ত। এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ আমি তোমাদের জন্য যেসব বিষয়ের আশঙ্কা করি, তন্মধ্যে সবচাইতে বিপজ্জনক হচ্ছে ছোট শির্ক। সাহাবায়ে কেরামের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বললেনঃ রিয়া (লোক দেখানো ইবাদাত) হচ্ছে ছোট শির্ক। [মুসনাদে আহমাদ ৫/৪২৯] এমনিভাবে অন্য এক হাদীসে আল্লাহ ব্যতীত অন্যের কসম করাকেও শির্ক বলা হয়েছে। [সহীহ ইবনে হিব্বানঃ ১০/১৯৯, হাদীস নং ৪৩৫৮]

আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নামে মান্নত করা এবং যবেহ্ করা শির্কের অন্তর্ভুক্ত।

হাদীসে আরও এসেছে, মুশরিকরা তাদের হজের তালবিয়া পাঠের সময় বলত: ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইক লা শারীকা লাকা, ইল্লা শারীকান হুয়া লাকা তামলিকুহু ওমা মালাক। (অর্থাৎ আমি হাযির আল্লাহ আমি হাযির, আমি হাযির, আপনার কোন শরীক নেই, তবে এমন এক শরীক আছে যার আপনি মালিক, সে আপনার মালিক নয়) এটা বলত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের এ শির্কী তালবিয়া পড়ার সময় যখন তারা (লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইক লা শারীকা লাকা) পর্যন্ত বলত, তখন তিনি বলতেন যথেষ্ট এতটুকুই বল। [মুসলিম: ১১৮৫] কারণ এর পরের অংশটুকু শির্ক। তারা ঈমানের সাথে শির্ক মিশ্রিত করে ফেলেছে। [ইবন কাসীর]

দু’প্রকার তাওহীদের এক প্রকারের সাথে অন্য প্রকারের সম্পর্ক হলো, তাওহীদুর রুবুবীয়া তাওহীদুল উলুহিয়াকে আবশ্যক করে। অর্থাৎ তাওহীদুর রুবুবীয়াহকে স্বীকৃতি দেয়া তাওহীদুল উলুহীয়ার স্বীকৃত প্রদানকে আবশ্যক করে এবং সেটাকে বাস্তবায়ন করার দাবি জানায়।

সুতরাং যে ব্যক্তি জানতে পারবে, আল্লাহ তার প্রভু, স্রষ্টা এবং তার সকল কাজের ব্যবস্থাপক, তার উপর আবশ্যক হয়ে যাবে যে, সে একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করবে। তিনি এক, অদ্বিতীয় এবং তার কোনো শরীক নেই।

 তাওহীদুল উলুহীয়া তাওহীদুর রুবুবীয়াকেও শামিল করে। অর্থাৎ তাওহীদুর রুবুবীয়াহ তাওহীদুল উলুহীয়ার মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। সুতরাং যে ব্যক্তি এককভাবে আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করে, তার সাথে অন্য কাউকে শরীক করে না, সে অবশ্যই বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ তা‘আলাই তার একমাত্র প্রভু ও স্রষ্টা। যেমন ইবরাহীম খলীল আলাইহিস সালাম বলেছেন,

﴿أَفَرَأَيْتُم مَّا كُنتُمْ تَعْبُدُونَ أَنتُمْ وَآبَاؤُكُمُ الْأَقْدَمُونَ فَإِنَّهُمْ عَدُوٌّ لِّي إِلَّا رَبَّ الْعَالَمِينَ الَّذِي خَلَقَنِي فَهُوَ يَهْدِينِ وَالَّذِي هُوَ يُطْعِمُنِي وَيَسْقِينِ وَإِذَا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِينِ وَالَّذِي يُمِيتُنِي ثُمَّ يُحْيِين وَالَّذِي أَطْمَعُ أَن يَغْفِرَ لِي خَطِيئَتِي يَوْمَ الدِّينِ﴾

‘‘তোমরা ভেবে দেখেছো কি তার সম্বন্ধে যার ইবাদত করছো? তোমরা এবং তোমাদের অতীতের পিতৃপুরুষেরা। বিশ্বজগতের প্রতিপালক ব্যতীত এরা তো সবাই আমার দুশমন। যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, তিনিই আমাকে পথ দেখান। তিনি আমাকে খাওয়ান ও পান করান এবং রোগাক্রান্ত হলে তিনিই আমাকে রোগমুক্ত করেন। তিনি আমাকে মৃত্যু দান করবেন এবং পুণর্বার আমাকে জীবন দান করবেন। এবং আশা করি তিনি কিয়ামতের দিন আমার অপরাধসমূহ মার্জনা করবেন। (সূরা শুআরা: ৭৫-৮২)

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,

﴿وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولًا أَنِ اُعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ﴾

‘আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্যেই রসূল পাঠিয়েছি। তার মাধ্যমে এ নির্দেশ দিয়েছি যে তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, আর তাগুতকে বর্জন করো। (সূরা আন নাহাল ১৬:৩৬)

রসূলগণ তাদের জাতিকে এটি বলেননি যে, তোমরা স্বীকার করো যে, আল্লাহই একমাত্র স্রষ্টা। কেননা তারা আগে থেকেই স্রষ্টার অস্তিত্ব স্বীকার করতো। এ জন্যই তারা বলেছেন,

﴿اُعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ﴾

তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, আর তাগুতকে বর্জন করো (সূরা আন নাহল ১৬:৩৬)।

শির্ক দু’প্রকার (১) বড় শির্ক। (২) ছোট শির্ক।

বড় শির্ক দ্বীন থেকে খারেজ করে দেয়, সমস্ত আমল পন্ড করে দেয় এবং তওবা ছাড়া মারা গেলে চিরস্থায়ী জাহান্নামী বানায়। আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্য ইবাদত করা বড় শিরক। যেমন: গাইরুল্লাহকে আহবান করা। কবরবাসী, জ্বিন ও শয়তান ইত্যাদির নামে নজর-মান্নত মানা ও জবাই করা। অনুরূপ গাইরুল্লাহ এর নিকট এমন জিনিস চাওয়া যা তার শক্তির বাইরে। যেমন: অভাবমুক্ত, রোগ আরোগ্য, প্রয়োজন কামনা করা ও বৃষ্টি চাওয়া। এসব অজ্ঞ-মূর্খরা অলি ও নেককারদের কবরের পার্শ্বে বা গাছ ও পাথর ইত্যাদি মূর্তির নিকটে বলে ও করে থাকে।

বড় শির্কের কিছু প্রকার:

ভয়-ভীতিতে শির্ক: আল্লাহ ব্যতীত যেমন: মূর্তি বা তাগুত কিংবা মৃত বা অনুপস্থিত অলিদের কিংবা জ্বিন বা মানুষ  ক্ষতি বা অনিষ্ট করতে পারে বলে ভয় করা। এ ধরনের ভয়-ভীতির স্থান দ্বীন ইসলামে অনেক বড়। সুতরাং যে ইহা আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্য করবে সে আল্লাহর সাথে বড় শিরক করল। আল্লাহ  এরশাদ করেন:

فَلَا تَخَافُوۡهُمۡ وَ خَافُوۡنِ اِنۡ کُنۡتُمۡ مُّؤۡمِنِیۡنَ ﴿۱۷۵﴾

‘‘সুতরাং, তাদেরকে ভয় করা না বরং যদি তোমরা মু‘মিন হয়ে থাক তাহলে আমাকে ভয় কর।’’ [সূরা আল-ইমরান:১৭৫]

ভরসার মধ্যে শিরক: প্রতিটি বিষয়ে ও প্রতিটি অবস্থায় একমাত্র আল্লাহর উপর ভরসা করা একটি বিরাট ইবাদত। ভরসা একমাত্র আল্লাহর উপর করা ওয়াজিব। সুতরাং যে ব্যক্তি গাইরুল্লাহ এর উপর এমন ব্যাপারে ভরসা করে যা তার ক্ষমতার বাইরে। যেমন: ক্ষতিকর জিনিস দূর করার জন্যে বা কল্যাণ ও রিজিক লাভের জন্য মৃত্যু ও অনুপস্থিত ইত্যাদির উপর ভরসা করা। এ ধরনের কাজ যে করবে সে বড় শিরক করল।

আল্লাহর বাণী:

وَ عَلَی اللّٰهِ فَتَوَکَّلُوۡۤا اِنۡ کُنۡتُمۡ مُّؤۡمِنِیۡنَ ﴿۲۳﴾

‘আর তোমরা একমাত্র আল্লাহর উপরই ভরসা কর যদি তোমরা মু‘মিন হয়ে থাক। [ সূরা মায়েদা: ২৩ ]

মহব্বত তথা ভালোবাসায় শির্ক: আল্লাহর ভালোবাসা যা পূর্ণ বিনয়তা ও পূর্ণ আনুগত্যকে বাধ্য করে। এ ভালোবাসা একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট। এর মধ্যে অন্য কাউকে শরিক করা হারাম। অতএব, যে ব্যক্তি আল্লাহর অনুরূপ আর কাউকে ভালোবাসল ও ভক্তি করল সে আল্লাহর সঙ্গে ভালোবাসা ও সম্মানে শিরক করল। আল্লাহর বাণী :

وَ مِنَ النَّاسِ مَنۡ یَّتَّخِذُ مِنۡ دُوۡنِ اللّٰهِ اَنۡدَادًا یُّحِبُّوۡنَهُمۡ کَحُبِّ اللّٰهِ

‘আর মানুষের মধ্যে এরূপ আছে- যারা আল্লাহ ব্যতীত অপরকে সদৃশ স্থির করে, আল্লাহকে ভালোবাসার ন্যায় তারা তাদেরকে ভালোবেসে থাকে। [ সূরা বাকার: ১৬৫]

আনুগত্যে শির্ক: আনুগত্যে শিরকের মধ্যে যেমন: শারিয়তের নাফরমানি ও অবাধ্যতার বিষয়ে আলেম সমাজ, ইমাম, শাসনকর্তা, রাষ্ট্রপতি ও পীর-বুজুর্গদের আনুগত্য করা। আল্লাহর হারামকৃত বস্ত্তকে হালাল বা আল্লাহর হালালকৃত বিষয়কে হারাম করার ব্যাপারে তাদের আনুগত্য করা। অতএব, এ ব্যাপারে তাদের যে আনুগত্য করবে সে তাদেরকে বিধান রচনায় ও হালাল-হারাম করার ব্যাপারে আল্লাহর সঙ্গে শরিক বানালো। আর ইহা বড় শিরকের অন্তর্ভুক্ত।

আল্লাহর বাণী:

اِتَّخَذُوۡۤا اَحۡبَارَهُمۡ وَ رُهۡبَانَهُمۡ اَرۡبَابًا مِّنۡ دُوۡنِ اللّٰهِ وَ الۡمَسِیۡحَ ابۡنَ مَرۡیَمَ ۚ وَ مَاۤ اُمِرُوۡۤا اِلَّا لِیَعۡبُدُوۡۤا اِلٰـهًا وَّاحِدًا ۚ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا هُوَ ؕ سُبۡحٰنَهٗ عَمَّا یُشۡرِکُوۡنَ ﴿۳۱﴾

‘তারা আল্লাহকে ছেড়ে নিজেদের আলেম, ধর্ম-যাজক ও মরয়মের ছেলে মাসীহকে রব তথা প্রতিপালক বানিয়ে নিয়েছে। অথচ তাদেরকে এক ইলাহ্ ছাড়া অন্য কোন ইলাহর ইবাদত করতে বলা হয়নি। তিনি ছাড়া অন্য কোন সত্য ইলাহ্ নেই। তারা যে সকল তাঁর শরিক সাব্যস্ত করে, তা থেকে তিনি পবিত্র। [সূরা তাওবা: ৩১]

১২ : ১০৭ اَفَاَمِنُوۡۤا اَنۡ تَاۡتِیَهُمۡ غَاشِیَۃٌ مِّنۡ عَذَابِ اللّٰهِ اَوۡ تَاۡتِیَهُمُ السَّاعَۃُ بَغۡتَۃً وَّ هُمۡ لَا یَشۡعُرُوۡنَ

১০৭. তবে কি তারা আল্লাহর সর্বগ্রাসী শাস্তি হতে বা তাদের অজান্তে কিয়ামতের আকস্মিক উপস্থিতি হতে নিরাপদ হয়ে গেছে?

এ আয়াতে হুশিয়ার করা হয়েছে যে, তারা নবীগণের বিরুদ্ধাচরণের অশুভ পরিণতির প্রতি লক্ষ্য করে না। যদি তারা সামান্যও চিন্তা করত এবং পারিপার্শ্বিক শহর ও স্থানসমূহের ইতিহাস পাঠ করত, তবে নিশ্চয়ই জানতে পারত যে, নবীগণের বিরুদ্ধাচরণকারীরা এ দুনিয়াতে কিরূপ ভয়ানক পরিণতির সম্মুখীন হয়েছে। কওমে লুতের জনপদসমূহকে উল্টে দেয়া হয়েছে। কওমে-আদ ও কওমে সামূদকে নানাবিধ আযাব দ্বারা নাস্তানাবুদ করে দেয়া হয়েছে। দুনিয়াতে তাদের উপর এ ধরনের আযাব আসার ব্যাপারে তারা কিভাবে নিজেদেরকে নিরাপদ ভাবছে? আর আখেরাত তা তো তাদের কাছে হঠাৎ করেই আসবে। যখন তারা সেটার আগমন সম্পর্কে কিছুই জানতে পারবে না। ইবন আব্বাস বলেন, যখন আখেরাতের সে চিৎকার আসবে তখন তারা বাজারে ও তাদের কর্মস্থলে কাজ-কারবারে ব্যস্ত থাকবে। [বাগভী]

লোকদেরকে সতর্ক করাই এর উদ্দেশ্য। অর্থাৎ অবকাশ জীবনকে দীর্ঘতর মনে করে এবং বর্তমানের শান্তি ও নিরাপত্তাকে চিরস্থায়ী ভেবে পরিণামের চিন্তাকে ভবিষ্যতের জন্য শিকেয় তুলে রেখো না। কোন ব্যক্তিই নিশ্চয়তা সহকারে একথা বলতে পারে না যে, তার জীবনকাল অমুক সময় পর্যন্ত অবশ্যি স্থায়ী হবে। কাকে হঠাৎ কখন গ্রেফতার করা হবে এবং কোথা থেকে কি অবস্থায় তাকে ধরে আনা হবে তা কেউ জানে না। তোমাদের দিন-রাতের অভিজ্ঞতা হচ্ছে, ভবিষ্যতের গর্ভে তোমাদের জন্য কি লুকানো আছে তা এক মুহূর্ত আগেও তোমরা জানতে পার না। কাজেই যা কিছু চিন্তা করার এখনই করে নাও। জীবনের যে পথে এগিয়ে যাচ্ছো তার ওপর সামনে অগ্রসর হবার আগে ঠিক পথে যাচ্ছো কিনা একটু থেমে চিন্তা করে দেখো। এটা যে সঠিক পথ, এর সপক্ষে কোন যথার্থ দলীল তোমাদের কাছে আছে কি? বিশ্ব প্রকৃতির নিদর্শনাবলী থেকে এর সত্য-সঠিক পথ হবার কোন প্রমাণ পাচ্ছো কি? তোমাদের স্বজাতীয় লোকেরা এ পথে চলে ইতিপূর্বে যে ফল লাভ করেছে এবং বর্তমানে তোমাদের সমাজ সংস্কৃতিতে এর যে ফলাফল দেখা যাচ্ছে তা কি একথাই প্রমাণ করে যে, তোমরা সঠিক পথে যাচ্ছো?

অর্থাৎ আপনি তাদেরকে বলে দিন, আমার তরীকা এই যে, মানুষকে সম্পূর্ণ জেনে-বুঝে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দিতে থাকব -আমি এবং আমার অনুসারীরাও। এটাই আমার পথ, পদ্ধতি ও নিয়ম যে আমি আল্লাহ ছাড়া কোন মা’বুদ নেই একমাত্র তিনিই মা’বুদ, তাঁর কোন শরীক নেই, এ সাক্ষ্য দানের দিকে মানুষকে আহবান জানাব। জেনে বুঝে, বিশ্বাস ও প্রমাণের উপর নির্ভরশীল হয়ে এ পথে আহবান জানাবো। অনুরূপভাবে যারা আমার অনুসরণ করবে তারা সবাই এ পথের দাওয়াত দিবে। যে পথে তাদের রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাওয়াত দিয়েছেন। তারাও এটা করবে সম্পূর্ণরূপে জেনে-বুঝে, শরীআত ও বিবেক অনুমোদিত পদ্ধতিতে। [ইবন কাসীর] উদ্দেশ্য এই যে, আমার দাওয়াত আমার কোন চিন্তাধারার উপর ভিত্তিশীল নয়; বরং এটা পরিপূর্ণ জ্ঞান, বুদ্ধিমত্তা ও প্রজ্ঞার ফলশ্রুতি। আমার উপর যারা ঈমান আনবে এবং আমাকে সত্য বলে বিশ্বাস করবে তারাও এ দাওয়াতের কাজ করবে। [বাগভী]

আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন,

اُدْعُ إلَى سَبِيْلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُمْ بِالَّتِيْ هِيَ أَحْسَنُ-

‘আপনি আপনার পালনকর্তার প্রতি দাওয়াত দিন কুরআন বা সঠিক জ্ঞান এবং উত্তম উপদেশের মাধ্যমে। আর পসন্দনীয় পন্থায় প্রত্যুত্তর করুন’ (নাহল ১২৫)।

এখানে আল্লাহ তা‘আলা আমাদের প্রিয় নবীকে সঠিক পথে দাওয়াত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন সুস্পষ্ট দলীল সহকারে। সেই সাথে তাঁর অনুসারীদেরকেও দলীল সহকারে দাওয়াত দেওয়ার নির্দেশ করেছেন। আয়াতের শেষাংশে তাওহীদের দাওয়াত দানকারী মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত যেন না হয় বলে ঘোষণা করা হয়েছে। অতএব আয়াতের শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, আমাদেরকে সুস্পষ্ট দলীল সহকারে আল্লাহর পথে দাওয়াত দিতে হবে।

আল্লাহ অন্যত্র বলেন, يُؤْمِنُوْنَ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَيَأْمُرُوْنَ بِالْمَعْرُوْفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَيُسَارِعُوْنَ فِي الْخَيْرَاتِ وَأُولَئِكَ مِنَ الصَّالِحِيْنَ

‘তারা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে। তারা ভাল কাজের আদেশ করে, মন্দ কাজের নিষেধ করে এবং কল্যাণকর কাজে তারা দ্রুত অগ্রসর হয়। তারাই সৎলোক ও সফল মানুষ’ (আলে ইমরান ১১৪)।

এর বিপরীত কাজ হচ্ছে মুনাফিকদের। আল্লাহ বলেন,

 الْمُنَافِقُوْنَ وَالْمُنَافِقَاتُ بَعْضُهُمْ مِنْ بَعْضٍ يَأْمُرُوْنَ بِالْمُنْكَرِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمَعْرُوْفِ وَيَقْبِضُوْنَ أَيْدِيَهُمْ نَسُوا اللهَ فَنَسِيَهُمْ إِنَّ الْمُنَافِقِيْنَ هُمُ الْفَاسِقُوْنَ

‘মুনাফিক পুরুষ মুনাফিক নারী তারা পরস্পর এক খেয়ালের মানুষ। তারা মন্দ কাজের আদেশ করে, ভাল কাজের নিষেধ করে এবং কল্যাণকর কাজ হতে নিজেদের হাত গুটিয়ে রাখে। এরা আল্লাহকে ভুলে গেছে, ফলে আল্লাহ তাদের ভুলে গেছেন। এরাই মুনাফিক নিঃসন্দেহ তারা ফাসিক’ (তওবা ৬৭)

عَنْ أَبِىْ بَكْرَةَ قَالَ خَطَبَنَا النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ النَّحَرِ … قَالَ ألاَ هَلْ بَلَّغْتُ قَالُوْا نَعَمْ قَالَ اللهُمَّ اشْهَدْ فّلْيُبَلِّغِ الشَّاهِدُ الْغَائِبَ-

আবু বাকরা (রাঃ) বলেন, নবী করীম (সা) কুরবানীর দিন আমাদের সামনে বক্তব্য পেশ করলেন। … তিনি এক পর্যায়ে বললেন, আমি কি (আমার উপর অর্পিত রিসালাত) পৌঁছে দিয়েছি? উপস্থিত ছাহাবীগণ বললেন, হ্যাঁ (আপনি পৌঁছে দিয়েছেন)। তখন তিনি বললেন, হে আল্লাহ তুমি সাক্ষী থাকো। (অতঃপর তিনি বললেন) উপস্থিত যারা আছে তারা যেন অনুপস্থিতদের নিকট এ দাওয়াত পৌঁছে দেয়’ (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/২৬৫৯; বাংলা মিশকাত ৫ম খন্ড, হা/২৫৪১ ‘হজ্জ’ অধ্যায়)।

وَفِيْ رِوَايَةٍ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَنْتُمْ تَسْأَلُوْنَ عَنِّيْ فَمَا أَنْتُمْ قَائِلُوْنَ؟ قَالُوْا نَشْهَدُ أَنَّكَ قَدْ بَلَّغْتَ وَأَدَّيْتَ وَنَصَحْتَ فَقَالَ بِإِصْبَعِهِ السَّبَّابَةِ يَرْفَعُهَا إلَى السَّمَاءِ وَيَنْكُتُهَا إِلَى النَّاسِ اللهُمَّ اشْهَدْ اللهُمَّ اشْهَدْ ثَلاَثَ مَرَّاتٍ-

অন্য বর্ণনায় রয়েছে রাসূল (সা) বলেন, আমার দাওয়াত পৌঁছানো সম্পর্কে তোমাদেরকে একদিন জিজ্ঞেস করা হবে। সেদিন তোমরা কি বলবে? ছাহাবীগণ বললেন, আমরা সাক্ষ্য দিব যে, নিশ্চয়ই আপনি দাওয়াত পৌঁছে দিয়েছেন, আপনি আপনার দায়িত্ব পালন করেছেন, আপনি মানুষকে উপদেশ দান করেছেন। রাসূল (সা) তখন শাহাদত অঙ্গুলি আকাশের দিকে উঠিয়ে ইশারা করে তিনবার বললেন, হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থেকো, হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থেকো (আমি তোমার পয়গাম মানুষের নিকট পৌঁছে দিয়েছি)’ (মুসলিম, মিশকাত হা/২৫৫৫; বাংলা মিশকাত ৫ম খন্ড, হা/২৪৪০ ‘হজ্জ’ অধ্যায়)।

হাদীছদ্বয় দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) স্বীয় রিসালাতের দায়িত্ব যথাযথভাবে পৌঁছে দিয়েছেন। অতএব আমাদেরকেও যথাযথভাবে পৌঁছানোর চেষ্টা করতে হবে।

আমরা যদি দাওয়াত পৌঁছাতে অলসতা করি তবে আমাদেরকেও ক্বিয়ামতের মাঠে জবাবদিহি করতে হবে। হাদীছে এসেছে-

عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَمْرٍو قَالَ قَالَ رَسُوْلُ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَلِّغُوْا عَنِّيْ وَلَوْ آيَةً وَحَدِّثُوْا عَنْ بَنِيْ إِسْرَائِيْلَ وَلاَ حَرَجَ وَمَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِدًا فَلْيَتَبَوَّأ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ.

‘আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, আমার একটি কথাও জানা থাকলে অন্যের নিকট পৌঁছে দাও। আর বনী ইসরাঈলের কাহিনীও প্রয়োজনে বর্ণনা কর, এতে কোন দোষ নেই। তবে যে ব্যক্তি আমার উপর মিথ্যারোপ করবে সে যেন তার স্থান জাহান্নামে করে নেয়’ (বুখারী, মিশকাত হা/১৯৮; বাংলা মিশকাত ২য় খন্ড, হা/১৮৮ ‘ইলম’ অধ্যায়)।

—- যারা আমার অনুসরণ করেছে এখানে তার অনুসরণকারী কারা তা নির্ধারণে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, এতে সাহাবায়ে কেরামকে বোঝানো হয়েছে, যারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জ্ঞানের বাহক। আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ সাহাবায়ে কেরাম এ উম্মতের সর্বোত্তম ব্যক্তিবর্গ। তাদের অন্তর পবিত্র এবং জ্ঞান সুগভীর। তাদের মধ্যে লৌকিকতার নাম-গন্ধও নেই। আল্লাহ তা’আলা তাদেরকে স্বীয় রাসূলের সংসর্গ ও সেবার জন্য মনোনীত করেছেন। তোমরা তাদের চরিত্র অভ্যাস ও তরীকা আয়ত্ত কর। কেননা, তারা সরল পথের পথিক। কলবী ও ইবনে যায়েদ বলেনঃ এ আয়াত থেকে আরো জানা গেল যে, যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অনুসরণের দাবী করে, তার অবশ্য কর্তব্য হচ্ছে তার দাওয়াতকে ঘরে ঘরে পৌছানো এবং কুরআনের শিক্ষাকে ব্যাপকতর করা। [বাগভী; কিওয়ামুস সুন্নাহ আল-ইসফাহানী, আল-হুজ্জাহ কী বায়ানিল মাহাজ্জাহঃ ৪৯৮]

আল্লাহ পথের দা‘য়ীর প্রথম সম্বল হবে আল্লাহর কিতাব আল কুরআন ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সহীহ ও গ্রহণযোগ্য হাদীসের ইলমের দ্বারা পাথেয় সংগ্রহ করা। ইলম ব্যতীত দাওয়াত অজ্ঞতাপূর্ণ দাওয়াত। আর অজ্ঞভাবে দাওয়াতের সুফলের চেয়ে কুফলই বেশি। কেননা একজন দা‘য়ী নিজে একজন পথপ্রদর্শক ও উপদেশ দাতা। আর সে দা‘য়ী যদি অজ্ঞ হয় তবে সে নিজে পথ ভ্রষ্ট হবে এবং অন্যদেরকেও পথ ভ্রষ্ট করবে।

—–  যারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ করে। সুতরাং আল্লাহর পথে দাওয়াত দিতে হলে জেনে বুঝে দাওয়াত দিতে হবে, নিজে অজ্ঞ হয়ে নয়।

তিনটি বিষয়ে জেনে বুঝে দাওয়াত দাও।

প্রথমত: যে দিকে দাওয়াত দিবে সে ব্যাপারে দূরদর্শী হওয়া।

যেমন: যে দিকে দাওয়াত দিবে সে ব্যাপারে শর‘য়ী জ্ঞান থাকে। কেননা সে হয়ত কোন কাজ ফরয ভেবে সেদিকে আহ্বান করবে কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল তা ফরয নয়। ফলে সে আল্লাহর বান্দাহর উপর অনাবশ্যকীয় জিনিসকে অত্যাবশ্যকীয় করে দিবে। আবার কখনও সে হারাম ভেবে তা থেকে বিরত থাকতে আহ্বান করবে, অথচ তা আল্লাহর দ্বীনে হারাম নয়, ফলে সে আল্লাহর হালালকৃত জিনিসকে হারাম করল।

দ্বিতীয়ত: দাওয়াতের অবস্থা সম্পর্কে দূরদর্শী হওয়া। এজন্যই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মু‘য়ায রাদিয়াল্লাহু আনহুকে ইয়ামানে প্রেরণ করেন তখন তাকে বলেছিলেন,

তুমি আহলে কিতাবের এক সম্প্রদায়ের কাছে যাচ্ছ।” বুখারী, হাদীস নং ১৪৯৬, মুসলিম, হাদীস নং ১৯। তাদের অবস্থা সম্পর্কে জানতে বলেছেন এবং এ জন্য প্রস্তুতি নিতে বলেছেন। অতঃএব দা‘য়ী যাদেরকে দাওয়াত দিবে তাদের অবস্থা সম্পর্কে জানবে। তাদের ইলমী অবস্থা কি সে সম্পর্কে ভালভাবে জ্ঞাত হবে। তাদের তর্ক বিতর্ক করার দক্ষতা কি তাও জানবে যাতে প্রস্তুতি নিয়ে তাদের সাথে আলোচনা ও বিতর্ক করা যায়। কেননা তুমি যখন এ ধরনের বিতর্কে লিপ্ত হবে তখন তোমাকে সত্যের বিজয়ের জন্য শক্তিশালী হতে হবে। কেননা সত্য বিজয় তখন তোমার দক্ষতার উপর নির্ভরশীল। তুমি কখনও এটা ভেবো না যে বাতিল শক্তি তোমার প্রতি সদয় হবে।

তৃতীয়ত: দাওয়াতের পদ্ধতি সম্পর্কে দূরদর্শী হওয়া। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿ ٱدۡعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِٱلۡحِكۡمَةِ وَٱلۡمَوۡعِظَةِ ٱلۡحَسَنَةِۖ وَجَٰدِلۡهُم بِٱلَّتِي هِيَ أَحۡسَنُۚ ﴾ [النحل: ١٢٥

“তুমি তোমরা রবের পথে হিকমত ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে আহবান কর এবং সুন্দরতম পন্থায় তাদের সাথে বিতর্ক কর”। [সূরা: আন-নাহাল: ১২৫]

কিছু মানুষ খারাপ কাজ দেখেই তা বন্ধ করতে ঝাঁপিয়ে পড়ে, কিন্তু ভবিষ্যতে তার ও তার মত অন্যান্য হকের প্রতি দা‘য়ীদের উপর কি ফলাফল বর্তাবে তা নিয়ে চিন্তা করে না। এজন্যই দা‘য়ীদের উচিত কোন আন্দোলনে নামার আগে তার ফলাফল কি হবে তা খেয়াল করা ও সে বিষয়ে অনুমান করা। সে সময় হয়ত তার প্রভাব প্রতিপত্তির কারণে যা ইচ্ছা তা করল, কিন্তু পরবর্তীতে দা‘য়ী ও অন্যান্যদের প্রভাবের কারণে চিরতরে কাজটি নির্বাপিত হয়ে যেতে পারে। এটা হয়ত শীঘ্রই বাস্তবায়িত হবে। এজন্যই আমি দা‘য়ী ভাইদেরকে হিকমত ও ধীরস্থীরতার সাথে কাজ করতে উৎসাহিত করি। যদিও এতে কিছুটা বিলম্ব হয়, তথাপি শেষ পরিণাম হবে আল্লাহর ইচ্ছায় সুদূরপ্রসারী।

তোমার কাছে আমার একটা আয়াত পৌঁছলেও তা মানুষের কাছে পৌঁছে দাও।” জবাবে বলব: এটা বিরোধপূর্ণ নয়। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমার পক্ষ থেকে পৌঁছে দাও। তাহলে আমরা যা পৌঁছাবো তা অবশ্যই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সাব্যস্ত হতে হবে।

— অর্থাৎ আল্লাহ শির্ক থেকে পবিত্র এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই। উপরে বর্ণিত হয়েছিল যে, অধিকাংশ লোক ঈমানের সাথে প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য শির্ককেও যুক্ত করে দেয়। তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শির্ক থেকে নিজের সম্পূর্ণ পবিত্রতার প্রকাশ করেছেন। সারকথা এই যে, আমার দাওয়াতের উদ্দেশ্য মানুষকে নিজের দাসে পরিণত করা নয়; বরং আমি নিজেও আল্লাহর দাস এবং মানুষকেও তার দাসত্ব স্বীকার করার দাওয়াত দেই।

এ আয়াতেই (أَهْلِ الْقُرَىٰ) শব্দ দ্বারা জানা যায় যে, আল্লাহ্ তা’আলা সাধারণতঃ শহর ও নগরবাসীদের মধ্য থেকে পুরুষদেরকেই রাসূল প্রেরণ করেছেন; কোন গ্রাম কিংবা বনাঞ্চলের অধিবাসীদের মধ্য থেকে রাসূল প্রেরিত হননি। কারণ, সাধারণতঃ গ্রাম বা বনাঞ্চলের অধিবাসীরা স্বভাব-প্রকৃতি ও জ্ঞান-বুদ্ধিতে নগরবাসীদের তুলনায় পশ্চাতপদ হয়ে থাকেন। [ইবন কাসীর] ইয়াকুব আলাইহিস সালামও শহরবাসী ছিলেন, কিন্তু কোন কারণে তারা শহর ছেড়ে গ্রামে চলে গিয়েছিলেন। তাই কুরআনের সূরা ইউসুফেরই ১০০ নং আয়াতে তাদেরকে গ্রাম থেকে নিয়ে আসার কথা বলা হয়েছে। কোন কোন মুফাসসির বলেন, এ আয়াতে কাফেরদের একটি প্রশ্নের উত্তর দেয়া হয়েছে, যেখানে তারা ফিরিশতার উপর এ কুরআন নাযিল হলো না কেন তা জিজ্ঞেস করেছিল। উত্তর দেয়া হচ্ছে যে, আমি তো কেবল নগরবাসী পুরুষদেরকেই রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেছি। [কুরতুবী]

—– এ আয়াতে নবীগণের সম্পর্কে رِجَالًا শব্দের ব্যবহার থেকে বোঝা যায় যে, নবী সবসময় পুরুষই হন। নারীদের মধ্যে কেউ নবী বা রাসূল হতে পারে না। মূলত: এটাই বিশুদ্ধ মত যে, আল্লাহ তা’আলা কোন নারীকে নবী কিংবা রাসূল হিসেবে পাঠাননি। কোন কোন আলেম কয়েকজন মহিলা সম্পর্কে নবী হওয়ার দাবী করেছেন; উদাহরণতঃ ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর বিবি সারা, মূসা আলাইহিস সালাম এর জননী এবং ঈসা আলাইহিস সালাম-এর জননী মরিয়ম। এ তিন জন মহিলা সম্পর্কে কুরআনুল কারীমে এমন ভাষা প্রয়োগ করা হয়েছে, যা দ্বারা বোঝা যায় যে, আল্লাহ তা’আলার নির্দেশে ফিরিশতারা তাদের সাথে বাক্যালাপ করেছে, সুসংবাদ দিয়েছে কিংবা ওহীর মাধ্যমে স্বয়ং তারা কোন বিষয় জানতে পেরেছেন। কিন্তু ব্যাপকসংখ্যক আলেমের মতে এসব আয়াত দ্বারা উপরোক্ত তিন জন মহিলার মাহাত্ম্য এবং আল্লাহর কাছে তাদের উচ্চ মর্যাদাশালিনী হওয়া বোঝা যায় মাত্র। এই ভাষা নবুওয়াত ও রেসালাত প্রমাণের জন্য যথেষ্ট নয়। [ইবন কাসীর]

—-বলা হয়েছে যে, দুনিয়ার সুখ-দুঃখ সর্বাবস্থায়ই ক্ষণস্থায়ী। আসল চিন্তা আখেরাতের হওয়া উচিত। সেখানকার অবস্থান চিরস্থায়ী এবং সুখ-দুঃখও চিরস্থায়ী। আরো বলা হয়েছে যে, আখেরাতের সুখ-শান্তি তাকওয়ার উপর নির্ভরশীল। তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর নিষেধকৃত যাবতীয় বিষয় থেকে নিজেকে হেফাযত করে শরীআতের যাবতীয় বিধি-বিধান পালন করা।

এ নৈরাশ্য স্বীয় সম্প্রদায়ের ঈমান নিয়ে আসার ব্যাপারে ছিল। ক্বিরাআত হিসেবে এই আয়াতের কয়েকটা অর্থ করা হয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে উপযুক্ত অর্থ এই যে, ظَنُّوا এর কর্তা القوم অর্থাৎ কাফেরদেরকে করা হোক। অর্থাৎ কাফেররা প্রথমে তো শাস্তির ধমক পেয়ে ভয় করল; কিন্তু যখন বেশি দেরী হল তখন ধারণা করল যে, পয়গম্বরের দাবি অনুসারে আযাব তো আসছে না, আর না আসবে বলে মনে হচ্ছে, সেহেতু বলা যায় যে, নবীদের সাথেও মিথ্যা ওয়াদা করা হয়েছে। উদ্দেশ্য নবী করীম (সাঃ)-কে সান্ত¸না প্রদান করা যে, তোমার সম্প্রদায়ের উপর আযাব আসতে দেরী হওয়ার কারণে ঘাবড়ানোর দরকার নেই, পূর্বের সম্প্রদায়সমূহের উপর আযাব আসতে অনেকানেক বিলম্ব হয়েছে এবং আল্লাহর ইচ্ছা ও হিকমত অনুসারে তাদেরকে অনেক অবকাশ দেওয়া হয়েছে, এমনকি রসূলগণ স্বীয় সম্প্রদায়ের ঈমানের ব্যাপারে নিরাশ হয়ে গেছেন এবং লোকেরা ধারণা করতে লেগেছে যে, তাদের সাথে আযাবের মিথ্যা ওয়াদা করা হয়েছে।

 এতে বাস্তবে মহান আল্লাহর অবকাশ দানের সেই নীতির কথা বর্ণনা করা হয়েছে, যা তিনি অবাধ্যদেরকে দিয়ে থাকেন, এমনকি এ সম্পর্কে তিনি স্বীয় নবীদের ইচ্ছার বিপরীতও অধিকাধিক অবকাশ দেন, তাড়াহুড়া করেন না। ফলে অনেক সময়ে নবীদের অনুবর্তীরাও আযাব থেকে নিরাশ হয়ে বলতে শুরু করেন যে, তাদের সাথে এমনিই মিথ্যা ওয়াদা করা হয়েছে। স্মরণ থাকে যে, মনের মধ্যে শুধু এ ধরনের কুমন্ত্রণার উদ্রেক ঈমানের পরিপন্থী নয়।

 এ উদ্ধারের অধিকারী শুধু ঈমানদাররাই ছিল।

নবীদের কাহিনীতে বুদ্ধিমানদের জন্য বিশেষ শিক্ষা রয়েছে। এর অর্থ সমস্ত নবীর কাহিনীতেও হতে পারে এবং বিশেষ করে ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর কাহিনীতেও হতে পারে, যা এ সূরায় বর্ণিত হয়েছে। কেননা, এ ঘটনায় পূর্ণরূপে প্রতিভাত হয়েছে যে, আল্লাহ তা’আলার অনুগত বান্দাদের কি কি ভাবে সাহায্য ও সমর্থন প্রদান করা হয় এবং কূপ থেকে বের করে রাজসিংহাসনে এবং অপবাদ থেকে মুক্তি দিয়ে উচ্চতম শিখরে কিভাবে পৌছে দেয়া হয়। পক্ষান্তরে চক্রান্ত ও প্রতারণাকারীরা পরিণামে কিরূপ অপমান ও লাঞ্ছনা ভোগ করে।

— অর্থাৎ এ কুরআন কোন মনগড়া কথা নয়। এর পূর্বে যা ছিল সেগুলোর মধ্যে যা যা সত্য সেগুলোকে এ কুরআন সমর্থন করে আর যেগুলো পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত হয়েছে সেগুলোকে অস্বীকার করে। [ইবন কাসীর] অথবা এ কাহিনী কোন মনগড়া কথা নয়, বরং পূর্বে অবতীর্ণ গ্রন্থসমূহের সমর্থনকারী। কেননা, তাওরাত ও ইঞ্জিলে এ কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। [কুরতুবী]

তুমি এ কাহিনী তাদেরকে শুনাতে থাকো, হয়তো তারা কিছু চিন্তা -ভাবনা করবে৷ (আরাফ ১৭৬)

মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন-

আর হে মুহাম্মদ! এ রসূলদের বৃত্তান্ত, যা আমি তোমাকে শোনাচ্ছি, এসব এমন জিনিস যার মাধ্যমে আমি তোমার হৃদয়কে মজবুত করি৷ এসবের মধ্যে তুমি পেয়েছো সত্যের জ্ঞান এবং মুমিনরা পেয়েছে উপদেশ ও জাগরণবাণী৷ সূরা হুদঃ১২০