সূরা ইউসুফ ১১তম রুকু(৯৪-১০৪) আয়াত

কাফেলা শহর থেকে বের হতেই ইয়াকুব আলাইহিস সালাম নিকটস্থ লোকদেরকে বললেনঃ তোমরা যদি আমাকে বোকা না মনে কর, তবে আমি বলছি যে, আমি ইউসুফের গন্ধ পাচ্ছি। মিসর থেকে কেনান পর্যন্ত ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমার বর্ণনা অনুযায়ী আট দিনের দূরত্ব ছিল। [তাবারী] হাসান বসরীর বর্ণনা মতে দশ দিনের, অপর বর্ণনায় একমাসের রাস্তা ছিল। [কুরতুবী] ইবন জুরাইজ বলেন, আশি ফারসাখের রাস্তা ছিল। [ইবন কাসীর]

আল্লাহর নবীগণ কেমন অসাধারণ শক্তির অধিকারী হয়ে থাকেন, এ ঘটনা থেকে সে সম্পর্কে ধারণা জন্মে। একদিকে হযরত ইউসুফের (আ) জামা নিয়ে মিসর থেকে কাফেলা সবেমাত্র রওয়ানা দিচ্ছে আর অন্যদিকে শত শত মাইল দূরে হযরত ইয়াকূব (আ) তার গন্ধ পাচ্ছেন। কিন্তু এ থেকে একথাও জানা যায় যে, নবীগণের এ শক্তিগুলো আসলে তাঁদের সহজাত ছিল না বরং এগুলো আল্লাহ তাঁদেরকে দান করেছিলেন এবং আল্লাহ যখন ও যে পরিমাণ চাইতেন এ শক্তিকে কাজে লাগানোর সুযোগ দিতেন। হযরত ইউসুফ (আ) বহু বছর যাবত মিসরে রয়েছেন এবং সে সময় হযরত ইয়াকূব (আ) কখনো তাঁর গন্ধ পাননি। কিন্তু এখন হঠাৎ ঘ্রাণ শক্তি এত তীব্র হয়ে গেলো যে, তাঁর জামা মিসর থেকে চলা শুরু হওয়ার সাথে সাথেই তিনি তার সুগন্ধ পেতে শুরু করলেন।

এটা যেন এ কথার ঘোষণা ছিল যে, যতক্ষণ না আল্লাহর পক্ষ থেকে সংবাদ আসে রসূলও অনবগত থাকেন, যদিও পুত্র নিজ শহরের কোন কূপে থাকে (তবুও তিনি জানতে পারেন না)। পক্ষান্তরে মহান আল্লাহ যখন ব্যবস্থা করে দেন, তখন মিসরের মত দূর দূরান্ত এলাকা থেকেও পুত্রের সুগন্ধি চলে আসে।

যেমন সূরা কাহফের যুবকদের অবস্থা,ইবরাহীম আ এর আগুনে নিক্ষেপের পর অবস্থা। সবই মুযিজা।

এ থেকে বুঝা যায়, সমগ্র পরিবারে হযরত ইউসুফ (আ) ছাড়া তাদের পিতার মর্যাদা উপলব্ধিকারী দ্বিতীয় কোন ব্যক্তি ছিল না।

ضَلَال এর অর্থ মমতাময় ভালবাসার সেই বিহ্বলতা যা ইয়াকূব (আঃ)-এর স্বীয় পুত্র ইউসুফ (আঃ)-এর সাথে ছিল।

 হযরত ইয়াকূব (আ) নিজেও তাদের এ মানসিক ও নৈতিক অধোপতনের কারণে হতাশ ছিলেন। গৃহের প্রদীপের আলো বাইরে ছড়িয়ে পড়ছিল কিন্তু গৃহবাসীরা নিজেরাই আঁধারের মধ্যে বাস করছিল। তাদের দৃষ্টিতে তিনি একটি পোড়া মাটি ছাড়া আর কিছুই ছিলেন না। ইতিহাসের শ্রেষ্ট ব্যক্তিদের অধিকাংশই প্রকৃতির এ নির্মম পরিহাসের শিকার হয়েছেন।

উপস্থিত লোকেরা বললঃ আল্লাহর কসম, আপনি তো সেই পুরোনো ভ্রান্ত ধারণায়ই পড়ে রয়েছেন যে, ইউসুফ জীবিত আছে এবং তার সাথে মিলন হবে। ইবন কাসীর বলেন, তারা তাদের পিতার সাথে এমন কথা বললো যা কোন পিতার সাথে বলা যায় না। আল্লাহর কোন নবীর সাথে বলাই যায় না। কুরতুবী বলেন, যারা এ কথা বলেছিল তারা ঘরের অন্যান্য লোকেরা। ছেলেরা বলেনি। কারণ, তারা তখনও কেনআনে ফিরে আসেনি। পরবর্তী আয়াত থেকে তা বুঝা যাচ্ছে।

একটা পরিবারের কর্তা বা পিতার ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ন,সম্মানের হওয়ার কথা। কিন্তু এই পরিবারের অন্য সদস্যরা সেই মর্যাদা দিয়ে ইয়াকুব আ এর সাথে কথা বলে নি। ইয়াকুব আ আল্লাহর কাছেই মর্যাদা আকাংখি ছিলেন অন্যদের কাছে নয়।

পরিবারে সবার প্রতি আচরন বা আখলাক হওয়া প্রয়োজন,ভালোবাসা,সম্মান,নিরাপত্তা

যখন কাফেলা ও ছেলেরা এসে পৌঁছল, সুসংবাদদাতা এসে ইয়াকূব (আঃ)-এর চেহারায় উক্ত জামা রাখল, তখন অলৌকিকভাবে তাঁর দৃষ্টিশক্তি ফিরে এল।

এখানে সুসংবাদ বলতে সেই জামা যা ইউসুফ আ এর ছিলো।

 কেননা আমার নিকট জ্ঞানের একটি মাধ্যম অহীও আছে, যা তোমাদের মধ্যে কারো কাছে নেই। উক্ত অহীর মাধ্যমে মহান আল্লাহ স্বীয় নবীদেরকে প্রয়োজন ও চাহিদা অনুপাতে অবস্থা সম্পর্কে অবহিত করে থাকেন।

বাস্তব ঘটনা যখন সবার জানা হয়ে গেল, তখন ইউসুফের ভ্রাতারা স্বীয় অপরাধের জন্য পিতার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে বললঃ আপনি আমাদের জন্য আল্লাহর কাছে মাগফেরাতের দোআ করুন। বলাবাহুল্য, যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে তাদের মাগফেরাতের জন্য দো’আ করবে, সে নিজেও তাদের অপরাধ মাফ করে দেবে।

সূরা তাওবা ৬৪- আয়াতে মহান রব ইরশাদ করেছেন-

৬৪. আল্লাহর অনুমতিক্রমে কেবলমাত্র আনুগত্য করার জন্যই আমরা রাসূলদের প্রেরণ করেছি। যখন তারা নিজেদের প্রতি যুলুম করে তখন তারা আপনার কাছে আসলে ও আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করলে এবং রাসূলও তাদের জন্য ক্ষমা চাইলে তারা অবশ্যই আল্লাহকে পরম ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালুরূপে পাবে।

এ আয়াতটি মুনাফিকদের সাথে সম্পর্কযুক্ত এবং রাসূলের জীবদ্দশায়ই তার পক্ষে তাদের কথা শোনা ও তাদের জন্য দো’আ ও ক্ষমা প্রার্থনা করা সম্ভব। রাসূলের মৃত্যুর পর তার কবরের কাছে এসে এ আয়াত তেলাওয়াত করে রাসূলের কাছে দোআ করা সম্পূর্ণ নাজায়েয ও শির্ক। অনুরূপভাবে রাসূলের মৃত্যুর পর তার কবরের কাছে এসে আল্লাহর কাছে তার জন্য দো’আ করা বা ক্ষমা প্রার্থনা করার জন্য আহবান করা বেদ’আত ও শির্কের মাধ্যম।

সূরা তাওবা ৮০–আয়াতে মহান রব ইরশাদ করেছেন-

৮০. আপনি তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন অথবা তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা না করুন একই কথা; আপনি সত্তর বার তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলেও আল্লাহ তাদেরকে কখনই ক্ষমা করবেন না। এটা এ জন্যে যে, তারা আল্লাহ ও তার রাসূলের সাথে কুফরী করেছে। আর আল্লাহ ফাসেক সম্প্রদায়কে হিদায়াত দেন না।

ঈমান ও নেক আমলের পুঁজি সংগ্রহ করে আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হয়। যদি এই আখেরাতের পাথেয় কারো কাছে না থাকে, তাহলে এমন কাফের ও অবাধ্যদের জন্য কেউ সুপারিশ করবে না। যেহেতু আল্লাহ তাআলা এমন লোকদের জন্য সুপারিশের অনুমতিই দান করবেন না।

সত্ত্বর ক্ষমা-প্রার্থনার দু’আ না করে ভবিষ্যতে দু’আ করার ওয়াদা করলেন। উদ্দেশ্য এই ছিল যে, রাতের শেষ প্রহরে যে সময়টি আল্লাহর ইবাদতের জন্য তাঁর প্রিয় বান্দাদের বিশেষ সময় সেই সময়ে আল্লাহর কাছে তোমাদের জন্য ক্ষমা-প্রার্থনার দু’আ করব।

দ্বিতীয় কথা এই যে, ভায়েরা ইউসুফ (আঃ)-এর প্রতি অন্যায় করেছিলেন, সেহেতু তাঁর পরামর্শ নেওয়া জরুরী ছিল। তাই তিনি সত্ত্বর ক্ষমা-প্রার্থনার দু’আ না করে পরে করার ওয়াদা করলেন।

আরো একটি ব্যখ্যা এই যে, এখন শুধু নয় আমি ক্ষমা চাইতেই থাকবো।

আরো একটি ব্যখ্যা যে,তোমাদের বিশ্বাস আমি করছি না এখন একটু দেখে নেই আসলেই অনুশোচনা করে ক্ষমা চাচ্ছে কি না।

ইউসুফ আলাইহিস সালাম পরিবারের সবাইকে বললেনঃ আপনারা সবাই আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী অভাব অনটন থেকে মুক্ত হয়ে, নির্ভয়ে, অবাধে মিসরে প্রবেশ করুন। [তাবারী] উদ্দেশ্য এই যে, ভিনদেশীদের প্রবেশের ব্যাপারে স্বভাবতঃ যেসব বিধিনিষেধ থাকে আপনারা সেগুলো থেকে মুক্ত। [বাগভী; কুরতুবী] শ্রদ্ধা ও সম্মানের সাথে তাঁদেরকে নিজের কাছে স্থান দিলেন এবং ভক্তিপূর্ণ আপ্যায়ন করলেন।

এখানে أَبَوَيْهِ (পিতা-মাতা) উল্লেখ করা হয়েছে। তাই অনেকের মতেই ইউসুফের মাতা জীবিত ছিলেন। [ইবন কাসীর]। তবে অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, ইউসুফ ‘আলাইহিস সালাম-এর মাতা তার শৈশবেই ইন্তেকাল করেছিলেন। কিন্তু তারপর ইয়াকুব আলাইহিস সালাম মৃতার ভগ্নিকে বিয়ে করেছিলেন। তিনি ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর খালা হওয়ার দিক দিয়েও মায়ের মতই ছিলেন এবং পিতার বিবাহিতা স্ত্রী হওয়ার দিক দিয়েও মাতাই ছিলেন। [বাগভী; কুরতুবী]

 অর্থাৎ পিতা-মাতাকে রাজ সিংহাসনে বসালেন আর ভ্রাতারা সবাই ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর সামনে সিজদা করলেন।

পিতা-মাতা প্রত্যেক মানুষের নিকটে সর্বোচ্চ সম্মানের অধিকারী। তাদেরকে সম্মান দিয়ে কথা বলতে হবে এবং তাদের সাথে নম্র-ভদ্র আচরণ করতে হবে। আল্লাহ বলেন

,وَقَضَى رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِنْدَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُلْ لَهُمَا أُفٍّ وَلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُلْ لَّهُمَا قَوْلًا كَرِيْمًا،

‘আর তোমার প্রতিপালক আদেশ করেছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারো উপাসনা কর না এবং তোমরা পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ কর। তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়ে যদি তোমার নিকট বার্ধক্যে উপনীত হন, তাহ’লে তুমি তাদের প্রতি উহ শব্দটিও বল না এবং তাদেরকে ধমক দিয়ো না। আর তাদের সাথে নরমভাবে কথা বল’ (বনী ইসরাঈল ১৭/২৩)।

এ “সিজদাহ” শব্দটি বহু লোককে বিভ্রান্ত করেছে। এমনকি একটি দল তো এ থেকে প্রমাণ সংগ্রহ করে বাদশাহ ও পীরদের জন্য “আদবের সিজদাহ” ও “সম্মান প্রদর্শনের সিজদাহ” এর বৈধতা আবিষ্কার করেছেন। এর দোষমুক্ত হবার জন্য অন্য লোকদের এ ব্যাখ্যা দিতে হয়েছে যে, আগের নবীদের শরীআতে কেবলমাত্র ইবাদাতের সিজদা আল্লাহ ছাড়া আর সবার জন্য হারাম ছিল।

এ ছাড়া যে সিজদার মধ্যে ইবাদাতের অনুভূতি নেই তা আল্লাহ ছাড়া অন্যদের জন্যও করা যেতে পারতো। তবে মুহাম্মাদী শরীয়াতে আল্লাহ্‌ ছাড়া অন্যদের জন্য সব রকমের সিজদা হারাম করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু আসলে “সিজদাহ” শব্দটি বর্তমান ইসলামী পরিভাষার অর্থে গ্রহণ করার ফলেই যাবতীয় বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। অর্থাৎ হাত, হাটু ও কপাল মাটিতে ঠেকিয়ে দেয়া। অথচ সিজদাহর মূল অর্থ হচ্ছে শুধুমাত্র ঝুঁকে পড়া। আর এখানে এ শব্দটি এ অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। আর এ অর্থই ইমাম বাগভী পছন্দ করেছেন।                                              এখানে আরও জানা আবশ্যক যে, কারো প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার, কাউকে অভ্যর্থনা জানাবার অথবা নিছক কাউকে সালাম করার জন্য সামনের দিকে কিছুটা ঝুঁকে পড়ার রেওয়াজ প্রাচীন যুগের মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। এ ধরনের ঝুঁকে পড়ার জন্য আরবীতে ‘সিজদাহ’ শব্দ ব্যবহার করা হয়। সেটাও এ শরীআতে মনসুখ বা রহিত। [কুরতুবী]

এ থেকে পরিষ্কার জানা যায়, বর্তমানে ইসলামী পরিভাষায় ‘সিজদাহ’ বলতে যা বুঝায় এ সিজদাহর অর্থ তা নয়। ইসলামী পরিভাষায় যাকে সিজদা বলা হয়, সে সিজদা আল্লাহর পাঠানো শরীআতে তা কোনদিন গায়রুল্লাহর জন্য জায়েয ছিল না। হাদীসে বলা হয়েছেঃ কোন মানুষের জন্য অপর মানুষকে সিজদা করা বৈধ নয়। [নাসায়ী, আস-সুনানুল কুবরা: ৯১৪৭; ইবন আবী শাইবাহ, হাদীস নং ১৭১৩২]

() ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর সামনে যখন পিতা-মাতা ও এগার ভাই একযোগে সিজদা করল, তখন শৈশবের স্বপ্নের কথা তার মনে পড়ল। তিনি বললেনঃ পিতা, এটা আমার শৈশবে দেখা স্বপ্নের ব্যাখ্যা, যাতে দেখেছিলাম যে, সূর্য, চন্দ্র ও এগারটি নক্ষত্র আমাকে সিজদা করছে। আল্লাহর শোকর যে, তিনি এ স্বপ্নের সত্যতা চোখে দেখিয়ে দিয়েছেন।

 এরপর ইউসুফ আলাইহিস সালাম পিতা-মাতার কাছে কিছু অতীত কাহিনী বর্ণনা করতে শুরু করে বললেনঃ “আল্লাহ তা’আলা আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, যখন কারাগার থেকে আমাকে বের করেছেন এবং আপনাকে বাইরে থেকে এখানে এনেছেন; অথচ শয়তান আমার ও আমার ভাইদের মধ্যে কলহ সৃষ্টি করে দিয়েছিল”।

ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর দুঃখ-কষ্ট যথাক্রমে তিন অধ্যায়ে বিভক্ত।

 (এক) ভাইদের অত্যাচার ও উৎপীড়ন।

 (দুই) পিতা-মাতার কাছ থেকে দীর্ঘদিনের বিচ্ছেদ এবং

(তিন) কারাগারের কষ্ট।

আল্লাহর মনোনীত নবী স্বীয় বিবৃতিতে প্রথমে ঘটনাবলীর ধারাবাহিকতা পরিবর্তন করে কারাগার থেকে কথা শুরু করেছেন। ভ্রাতারা যে তাকে কূপে নিক্ষেপ করেছিল, তা উল্লেখ করেননি, কারণ, তিনি তা উল্লেখ করে ভাইদেরকে লজ্জা দেয়া সমীচীন মনে করেননি। [কুরতুবী] ইউসুফ আলাইহিস সালাম তারপর বললেন, আমার পালনকর্তা যে কাজ করতে চান, তার তদবীর সূক্ষ্ম করে দেন। নিশ্চয় তিনি সুবিজ্ঞ, প্রজ্ঞাবান। তিনি তাঁর বান্দার স্বার্থ যাতে রয়েছে তাতে তাকে এমনভাবে প্রবেশ করান যে, কেউ তা জানতে পারে না। [কুরতুবী]

এ “সিজদাহ” শব্দটি বহু লোককে বিভ্রান্ত করেছে। এমনকি একটি দল তো এ থেকে প্রমাণ সংগ্রহ করে বাদশাহ ও পীরদের জন্য “আদবের সিজদাহ” ও “সম্মান প্রদর্শনের সিজদাহ”-এর বৈধতা আবিষ্কার করেছেন। এর দোষমুক্ত হবার জন্য অন্য লোকদের এ ব্যাখ্যা দিতে হয়েছে যে, আগের নবীদের শরীয়াতে কেবলমাত্র ইবাদাতের সিজদা আল্লাহ ছাড়া আর সবার জন্য হারাম ছিল। এছাড়া যে সিজদার মধ্যে ইবাদাতের অনুভূতি নেই তা আল্লাহ ছাড়া অন্যদের জন্যও করা যেতে পারতো। তবে মুহাম্মাদী শরীয়াতে আল্লাহ ছাড়া অন্যদের জন্য সব রকমের সিজদা হারাম করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু আসলে “সিজদাহ” শব্দটিকে বর্তমান ইসলামী পরিভাষার অর্থে গ্রহণ করার ফলেই যাবতীয় বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। অর্থাৎ হাত, হাঁটু ও কপাল মাটিতে ঠেকিয়ে দেয়া। অথচ সিজদার মূল অর্থ হচ্ছে শুধুমাত্র ঝুঁকে পড়া। আর এখানে এ শব্দটি এ অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। কারো প্রতি কৃতজ্ঞা প্রকাশ করার, কাউকে অভ্যর্থনা জানাবার অথবা নিছক কাউকে সালাম করার জন্য বুকে দু’হাত বেঁধে সামনের দিকে কিছুটা ঝুঁকে পড়ার রেওয়াজ প্রাচীন যুগের মানুষের সাংস্কৃতিক জীবনে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল এবং আজও দুনিয়ার কোন কোন দেশে এর প্রচলন আছে। এ ধরনের ঝুঁকে পড়ার জন্য আরবীতে “সিজদাহ” এবং ইরেজীতে Bow শব্দ ব্যবহার করা হয়। বাইবেলে আমরা এর অসংখ্য দৃষ্টান্ত পাই, যা থেকে প্রমাণ হয় যে, প্রাচীন যুগে এ পদ্ধতিটি সাংস্কৃতিক জীবনের অংশ ছিল। তাই হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম সম্পর্কে এক জায়গায় বলা হয়েছেঃ তিনি নিজের তাঁবুর দিকে তিনটি লোককে আসতে দেখলেন। তাদেরকে অভ্যর্থনা করার জন্য তিনি দৌড়ে গেলেন এবং মাটি পর্যন্ত ঝুঁকে পড়লেন।

পিতা-মাতা ও ভাইদের সাথে সাক্ষাতের ফলে যখন জীবনে শান্তি এল, তখন সরাসরি আল্লাহর প্রশংসা, তার কাছে দোআয় মশগুল হয়ে গেলেন এবং বললেনঃ “হে আমার পালনকর্তা! আপনি আমাকে রাষ্ট্রক্ষমতা দান করেছেন এবং আমাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিখিয়েছেন। হে আসমান ও যমীনের স্রষ্টা! আপনিই দুনিয়া ও আখেরাতে আমার কার্যনির্বাহী। আমাকে পূর্ণ আনুগত্যশীল অবস্থায় দুনিয়া থেকে উঠিয়ে নিন এবং আমাকে পরিপূর্ণ সৎ বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত রাখুন।” পরিপূর্ণ সৎ বান্দা নবীগণই হতে পারেন।

এ দোআয় ‘খাতেমা বিলখায়ের’ অর্থাৎ অন্তিম সময়ে পূর্ণ আনুগত্যশীল হওয়ার প্রার্থনাটি বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। আল্লাহ্ তা’আলার প্রিয়জনদের বৈশিষ্ট্য এই যে, তারা দুনিয়া ও আখেরাতে যত উচ্চ মর্যাদাই লাভ করুন এবং যত প্রভাবপ্রতিপত্তি ও পদমর্যাদাই তাদের পদচুম্বন করুক, তারা কখনো গর্বিত হন না; বরং সর্বদাই এসব অবস্থা বিলুপ্ত হওয়ার অথবা হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা করতে থাকেন। তাই তারা দোআ করতে থাকেন, যাতে আল্লাহ-প্রদত্ত বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ নেয়ামতসমূহ জীবনের শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত অব্যাহত থাকে, বরং সেগুলো আরো যেন বৃদ্ধি পায়।

এ সময় হযরত ইউসুফের (আ) কণ্ঠ নিঃসৃত এ বাক্য কটি আমাদের সামনে একজন সাচ্চা মুমিনের চরিত্রের একটা অদ্ভূত মনোমুগ্ধকর চিত্র তুলে ধরে। মরু পশুপালক পরিবারের এক ব্যক্তি, যাঁকে তাঁর হিংসুটে ভাইয়েরা মেরে ফেলতে চেয়েছিল, জীবনের উত্থান-পতন দেখতে দেখতে অবশেষে পার্থিব উন্নতির সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করেন। তাঁর দুর্ভিক্ষ পীড়িত পরিবারবর্গ তাঁরই করুণা ভিখারী হয়ে তাঁর সামনে এসে হাযির হয়েছে এবং এ সাথে এসেছে তাঁর সেই হিংসুটে ভাইয়েরা যারা তাঁকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল। তারা সবাই তাঁর রাজকীয় সিংহাসনের সামনে মাথা নত করে দাঁড়িয়ে আছে। দুনিয়ার সাধারণ রীতি অনুযায়ী এটি ছিল অহংকার, অভিযোগ ও দোষারোপ করার এবং তিরষ্কার ও ভর্ৎসনার তীর বর্ষণ করার উপযুক্ত সময়। কিন্তু আল্লাহর সত্যিকার অনুগত একজন মানুষ এ সময় কিছুটা ভিন্ন ধরনের চারিত্রিক গুণাবলীর প্রকাশ ঘটান। তিনি নিজের এ উন্নতির জন্য অহংকার করার পরিবর্তে যে আল্লাহ তাঁকে এ মর্যাদা দান করেছেন তাঁর অনুগ্রহের স্বীকৃতি দেন। তাঁর পরিবারের লোকেরা জীবনের প্রথম দিকে তাঁর ওপর যে জুলুম অত্যাচার চালিয়েছিল সেজন্য তিনি তাদেরকে তিরষ্কার ও ভর্ৎসনা করেন না। বরং আল্লাহ এত দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতার পর তাদেরকে আমার সাথে মিলিয়ে দিয়েছেন এ বলে তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি হিংসুটে ভাইদের বিরুদ্ধে মুখে অভিযোগের একটি শব্দও উচ্চারণ করেন না। এমন কি একথা বলেন না যে, তারা আমার সাথে দুর্ব্যবহার করেছিল। বরং নিজেই এভাবে তাদের সাফাই গাইছেন যে, শয়তান আমার ও তাদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করে দিয়েছে। আবার সেই বিরোধের খারাপ দিক বাদ দিয়ে তার এ ভালো দিকটি পেশ করছেন যে, আল্লাহ আমাকে যে মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করতে চাচ্ছিলেন সেজন্য এ সূক্ষ্ম কৌশল অবলম্বন করেছেন। অর্থাৎ ভাইদের দ্বারা শয়তান যা কিছু করায় তার মধ্যে আল্লাহর জ্ঞান অনুযায়ী আমার জন্য কল্যাণ ছিল। কয়েক শব্দে এসব কিছু প্রকাশ করার পর তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজের প্রভু— আল্লাহর সামনে নত হন এবং তাঁর প্রতি এ বলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেনঃ তুমিই আমাকে বাদশাহী দান করেছো এবং এমন সব যোগ্যতা দান করেছো যার বদৌলতে আমি জেলখানায় পচে মরার বদলে আজ দুনিয়ার সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রটির ওপর শাসন কর্তৃত্ব চালাচ্ছি। সবশেষে তিনি আল্লাহর কাছে যা কিছু চান তা হচ্ছে এই যে, দুনিয়ায় যতদিন বেঁচে থাকি ততদিন যেন তোমার বন্দেগী ও দাসত্বে অবিচল থাকি আর যখন দুনিয়া থেকে বিদায় নেই তখন আমাকে সৎ বান্দাদের সাথে মিশিয়ে দিয়ো। কতই উন্নত, পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র এ চারিত্রিক আদর্শ!

হযরত ইউসুফের এ মূল্যবান ভাষণটিও বাইবেল ও তালমূদে কোন স্থান পায়নি। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, এ কিতাব দু’টি অপ্রয়োজনীয় গল্প কাহিনীর বিস্তারিত বিবরণে ভরা। অথচ যেসব বিষয় নৈতিক মূল্যমান ও মূল্যবোধের সাথে সম্পর্ক রাখে এবং যার সাহায্যে নবীগণের মূল শিক্ষা, তাঁদের যথার্থ মিশন এবং তাঁদের সীরাতের শিক্ষণীয় দিকগুলোর ওপর আলোকপাত হয়, এ কিতাব দু’টিতে সেগুলোর কোন উল্লেখই নেই।

এখানে এ কাহিনী শেষ হচ্ছে। তাই পাঠকদেরকে পুনর্বার এ সত্যটির ব্যাপারে সজাগ করে দেয়া জরুরী মনে করি যে, হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম সম্পর্কে কুরআনের এ বর্ণনাটি একান্তই তার নিজস্ব ও স্বতন্ত্র বর্ণনা। এটি বাইবেল বা তালমূদের চর্বিতচর্বন নয়। তিনটি কিতাবের তুলনামূলক অধ্যয়নের পর একথা অত্যন্ত সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, কাহিনীটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অংশে কুরআনের বর্ণনা অন্য দু’টি থেকে আলাদা। কোন কোন জিনিস কুরআন তাদের চেয়ে বেশী বর্ণনা করে, কোন কোনটা কম এবং কোন কোনটায় তাদের বর্ণনার প্রতিবাদ করে। কাজেই মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বনী ইরসাঈলের থেকে এ কাহিনীটি শুনে থাকবেন এবং তারই ভিত্তিতে এটি বর্ণনা করেন, একথা বলার সুযোগই কারোর নেই।

বলা হয়েছে, এগুলো গায়েবের সংবাদ, যা আমি আপনাকে ওহীর মাধ্যমে বলি। এ বিষয়বস্তুটি প্রায় এমনি ভাষায় সূরা আলে-ইমরানের ৪৪তম আয়াতে ব্যক্ত হয়েছে। —

৪৪. এটা গায়েবের সংবাদের অন্তর্ভুক্ত, যা আমরা আপনাকে ওহী দ্বারা অবহিত করছি। আর মারইয়ামের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব তাদের মধ্যে কে গ্রহণ করবে এর জন্য যখন তারা তাদের কলম নিক্ষেপ করছিল, আপনি তখন তাদের নিকট ছিলেন না এবং তারা যখন বাদানুবাদ করছিল তখনো আপনি তাদের নিকট ছিলেন না।

সূরা হুদের ৪৯ তম আয়াতে নূহ আলাইহিস সালাম-এর ঘটনা প্রসঙ্গেও তাই বলা হয়েছে।

৪৯. এসব গায়েবের সংবাদ আমরা আপনাকে ওহী দ্বারা অবহিত করছি, যা এর আগে আপনি জানতেন না এবং আপনার সম্প্রদায়ও জানত না। কাজেই আপনি ধৈর্য ধারণ করুন। নিশ্চয় শুভ পরিণাম মুত্তাকীদেরই জন্য।

 এসব আয়াত থেকে জানা যায় যে, আল্লাহ তা’আলা ওহীর মাধ্যমে নবীগণকে গায়েবের সংবাদ বলে দেন। বিশেষ করে আমাদের শ্রেষ্ঠতম নবী মুহাম্মাদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে এসব গায়েবের সংবাদের বিশেষ অংশ দান করা হয়েছে, যার পরিমাণ পূর্ববতী নবীগণের তুলনায় বেশী। এ কারণে তিনি উম্মতকে এমন অনেক ঘটনা বিস্তারিত অথবা সংক্ষেপে বলে দিয়েছেন, যেগুলো কেয়ামত পর্যন্ত সংঘটিত হবে। ‘কিতাবুল-ফিতান’ শিরোনামে ভবিষ্যতে সংঘটিত হবে এমন বর্ণনা সম্বলিত বহুসংখ্যক ভবিষ্যদ্বাণী হাদীসের গ্রন্থসমূহে মওজুদ রয়েছে। এ সমস্ত গায়েবের জ্ঞান আল্লাহ্‌ তাঁর রাসূলকে দান করেছেন।

 ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর কাহিনী পুরোপুরি বর্ণনা করার পর আলোচ্য আয়াতসমূহে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে সম্বোধন করে বলা হয়েছে, এই কাহিনী ঐসব গায়েবী সংবাদের অন্যতম, যেগুলো আমি ওহীর মাধ্যমে আপনাকে বলেছি। আপনি ইউসুফ-ভ্রাতাদের কাছে উপস্থিত ছিলেন না, যখন তারা ইউসুফকে কূপে নিক্ষেপ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এবং এজন্য কলা-কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছিল। এ বর্ণনার উদ্দেশ্য এই যে, ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর কাহিনীটি পূর্ণ বিবরণসহ ঠিক ঠিক বলে দেয়া আপনার নবুওয়াত, রিসালাত ও ওহীর সুস্পষ্ট প্রমাণ। [ইবন কাসীর] কেননা, কাহিনীটি হাজারো বছর পূর্বেকার। আপনি সেখানে বিদ্যমান ছিলেন না যে, স্বচক্ষে দেখে বিবৃত করবেন এবং আপনি কারো কাছে শিক্ষাও গ্রহণ করেননি যে, ইতিহাস গ্রন্থ পাঠ করে অথবা কারো কাছে শুনে বর্ণনা করবেন। অতএব, আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী ব্যতীত এ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করার দ্বিতীয় কোন পথ নেই।

মহান আল্লাহ আরো কয়েক স্থানে অনুরূপ অদৃশ্যের জ্ঞানের এবং প্রত্যক্ষ দর্শনের কথা খন্ডন করেছেন। (উদাহরণ স্বরূপ দেখুনঃ সূরা আলে ইমরান ৭ ও ৪৪নং আয়াত, সূরা ক্বস্বাস্ব ৪৫-৪৬নং আয়াত এবং সূরা স্বা-দ ৬৯-৭০নং আয়াত)

আপনাকে আল্লাহ্ তা’আলা পূর্ববর্তী এ ঘটনাগুলো এজন্যই জানিয়েছেন যাতে এর দ্বারা মানুষের জন্য শিক্ষণীয় উপকরণ থাকে এবং মানুষের দ্বীন ও দুনিয়ার নাজাতের মাধ্যম হয়। তারপরও অনেক মানুষই ঈমান আনে না। এ জন্যই আল্লাহ বলেন যে, আপনার ঐকান্তিক ইচ্ছা যতই থাকুক না কেন অধিকাংশ মানুষই ঈমান আনবে না।

২৮ : ৫৬ اِنَّكَ لَا تَهۡدِیۡ مَنۡ اَحۡبَبۡتَ وَ لٰكِنَّ اللّٰهَ یَهۡدِیۡ مَنۡ یَّشَآءُ ۚ وَ هُوَ اَعۡلَمُ بِالۡمُهۡتَدِیۡنَ

আপনি যাকে ভালবাসেন ইচ্ছে করলেই তাকে সৎপথে আনতে পারবেন না। বরং আল্লাহই যাকে ইচ্ছে সৎপথে আনয়ন করেন এবং সৎপথ অনুসারীদের সম্পর্কে তিনিই ভাল জানেন। সূরা ক্বাসাসঃ ৫৬

এই আয়াত ঐ সময় অবতীর্ণ হয় যখন নবী (সাঃ)-এর হিতাকাঙ্ক্ষী চাচা আবু তালেবের মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসে। তখন তিনি চেষ্টা করলেন যাতে চাচা একবার নিজ মুখে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বাণী উচ্চারণ করুক, যাতে পরকালে আল্লাহর সামনে তার ক্ষমার জন্য সুপারিশ করতে পারেন। কিন্তু সেখানে কুরাইশ নেতাদের উপস্থিতির কারণে আবূ তালেব ঈমান আনয়নের সৌভাগ্য হতে বঞ্চিত থাকে এবং কুফরের উপরই তার মৃত্যু হয়। নবী (সাঃ) এর জন্য অত্যন্ত দুঃখিত হলেন। এই সময় মহান আল্লাহ এই আয়াত অবতীর্ণ করে স্পষ্ট করে দিলেন যে, তোমার কাজ কেবলমাত্র পৌঁছিয়ে দেওয়া ও আহবান করা। আর হিদায়াত দান করা আমার কাজ। হিদায়াত সেই ব্যক্তিই লাভ করে থাকে, যাকে আমি হিদায়াত দান করি। তুমি যাকে হিদায়াতের উপর দেখতে পছন্দ কর, সে হিদায়াত পায় না। (বুখারীঃ সূরা কাস্বাসের তাফসীর পরিচ্ছেদ, মুসলিমঃ ঈমান অধ্যায়)

‘হেদায়াত’ শব্দটি কয়েক অর্থে ব্যবহৃত হয়। এক, শুধু পথ দেখানো। এর জন্য জরুরী নয় যে, যাকে পথ দেখানো হয় সে গন্তব্যস্থলে পৌঁছতেই হবে। দুই, পথ দেখিয়ে গন্তব্যস্থলে পৌছে দেয়া।

অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, “আর যদি আপনি যমীনের অধিকাংশ লোকের কথামত চলেন, তবে তারা আপনাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করবে।” [সূরা আল-আনআমঃ ১১৬] [ইবন কাসীর] সুতরাং অধিকাংশ মানুষ ঈমান না আনলে আপনার কিছু করার নেই। আপনি চাইলেই কাউকে হিদায়াত দিতে পারবেন না। [কুরতুবী]

ওপরের সতর্কীকরণের পর এটি দ্বিতীয় সতর্কীকরণ। তবে ওর তুলনায় এর মধ্যে তিরস্কারের দিকটি কম এবং উপদেশের অংশ বেশী। এ উক্তিটিও বাহ্যত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করে করা হয়েছে কিন্তু আসলে এখানে কাফেরদের সমাবেশকে সম্বোধন করা হয়েছে এবং তাদেরকে একথা বুঝানোই উদ্দেশ্য যে, আল্লাহর বান্দারা! একটু ভেবে দেখো, তোমাদের এ হঠকারিতার এখানে অবকাশ কোথায়? যদি পয়গম্বর নিজের কোন ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারের জন্য দাওয়াত ও প্রচারের এ কাজ চালু করে থাকতেন অথবা নিজের জন্য তিনি কিছু চাইতেন তাহলে অবশ্যি তোমাদের জন্য একথা বলার সুযোগ ছিল যে, আমরা এ ধরনের মতলবী লোকের কথা কেন মানবো? কিন্তু তোমরা দেখছো, এ ব্যক্তি নিস্বার্থ, তোমাদের এবং সারা দুনিয়ার মানুষের ভালোর জন্য নসীহত করে যাচ্ছেন এবং এর মধ্যে তার নিজের কোন স্বার্থ লুকিয়ে নেই। কাজেই এ ধরনের হঠকারিতার সাহায্যে এর মোকাবিলা করার পেছনে কি যুক্তি আছে? যে ব্যক্তি সবার ভালোর জন্য নিস্বার্থভাবে একটি কথা বলে, তার বিরুদ্ধে খামাখা জিদ ধরে বসে থাকা কেন? খোলা মনে তার কথা শোনো। ভালো লাগলে মেনে নাও, ভালো না লাগলে মানবে না