أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
১২ : ৫৮ وَ جَآءَ اِخۡوَۃُ یُوۡسُفَ فَدَخَلُوۡا عَلَیۡهِ فَعَرَفَهُمۡ وَ هُمۡ لَهٗ مُنۡكِرُوۡنَ
৫৮. আর ইউসুফের ভাইয়েরা আসল এবং তার কাছে প্রবেশ করল। অতঃপর তিনি তাদেরকে চিনলেন, কিন্তু তারা তাকে চিনতে পারল না।
এখানে আবার সাত আট বছরের ঘটনা মাঝখানে বাদ দিয়ে বর্ণনার ধারাবাহিকতা এমন এক জায়গা থেকে শুরু করে দেয়া হয়েছে যেখান থেকে বনী ইসরাঈলের মিসরে স্থানান্তরিত হবার এবং ইয়াকুব আলাইহিস সালামের হারানো ছেলের সন্ধান পাওয়ার সূত্রপাত হয়। মাঝখানে যেসব ঘটনা বাদ দেয়া হয়েছে যা মহান আল্লাহ উল্লেখ করেননি, সেটা আমরা যেনো চিন্তা করি বা আমাদের আকল দিয়ে চিন্তা ভাবনা করে পরবর্তী আয়াতের সাথে সম্পর্কিত করে বুঝার চেষ্টা করি। কুর’আনের এটাও একটা সুন্দর উউপস্থাপন যেনো এর পাঠক এ নিয়ে চিন্তা করে এবং প্রশ্নের অবতারনা হয় তার মাঝে, সুবহান আল্লাহ।
সেগুলোর সংক্ষিপ্তসার হচ্ছে, ইউসুফ আলাইহিস সালামের রাজত্বের প্রথম সাত বছর মিসরে প্রচুর শস্য উৎপন্ন হয়। এ সময় তিনি আসন্ন দুর্ভিক্ষ সমস্যা দূর করার জন্য পূর্বাহ্নে এমন সমস্ত ব্যবস্থা অবলম্বন করেন যার পরামর্শ তিনি স্বপ্নের তা’বীর বলার পর বাদশাহকে দিয়েছিলেন। এরপর শুরু হয় দুর্ভিক্ষের যামানা। [ইবন কাসীর]
এ আয়াত থেকে পরবর্তী কয়েক আয়াতে ইউসুফ-ভ্রাতাদের খাদ্যশস্যের জন্যে মিসরে আগমন উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ, দুর্ভিক্ষ শুধু মিসরেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং দূর-দূরান্ত অঞ্চল এর করালগ্রাসে পতিত হয়েছিল। ইয়াকুব আলাইহিস সালাম-এর জন্মভূমি কেনান ছিল ফিলিস্তিনের একটি অংশ। এ এলাকাটিও দুর্ভিক্ষের করালগ্রাস থেকে মুক্ত ছিল না।
ফলে ইয়াকুব আলাইহিস সালাম-এর পরিবারেও অনটন দেখা দেয়। সাথে সাথেই মিসরের এ সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে যে, সেখানে স্বল্পমূল্যের বিনিময়ে খাদ্যশস্য পাওয়া যায়। ইয়াকুব আলাইহিস সালাম-এর কানে এ সংবাদ পৌছে যে, মিসরের বাদশাহ অত্যন্ত সৎ ও দয়ালু ব্যক্তি। তিনি জনসাধারণের মধ্যে খাদ্যশস্য বিতরণ করেন। অতঃপর তিনি পুত্রদেরকে বললেনঃ তোমরাও যাও এবং মিসর থেকে খাদ্যশস্য নিয়ে আসো। সর্বকনিষ্ঠ পুত্র বিনইয়ামীন ছিলেন ইউসুফ আলাইহিস্ সালাম-এর সহোদর।
ইউসুফ নিখোঁজ হওয়ার পর ইয়াকুব আলাইহিস সালাম-এর স্নেহ ও ভালবাসা তার প্রতিই কেন্দ্রীভূত হয়েছিল। তাই সাস্তুনা ও দেখাশোনার জন্য তাকে নিজের কাছে রেখে দিলেন। দশ ভাই কেনান থেকে মিসর পৌছল।
তারা ইউসুফ আ এর রাজকীয় যে নিয়ম সেটা অনুসরন করেই তারা অর্থাৎ ভাইরা প্রবেশ করলো। ইউসুফ আ সব কিছুই নজরে রাখতেন। যেমন সুলায়মান আ তার রাজত্বের অনুগতদের সম্পর্কে ওয়াকিফহাল থাকতেন,তাই হুদহুদ অনুপস্থিত থাকায় তিনি ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন। মহান আল্লাহ তার রাসূলদের রাজ্বের ক্ষমতা দিয়ে এই যোগ্যতাও দান করেন।
তারা ইউসুফ আলাইহিস সালাম-কে চিনল না; কিন্তু ইউসুফ আলাইহিস সালাম তাদেরকে ঠিকই চিনে ফেললেন। এরপর যে কোনভাবেই হোক ইউসুফ আলাইহিস সালাম তাদের কাছ থেকে তাদের আরেক ছোট ভাইয়ের তথ্য উদঘাটন করলেন। তারপর ইউসুফ আলাইহিস সালাম তাদেরকে রাজকীয় মেহমানের মর্যাদায় রাখা এবং যথারীতি খাদ্যশস্য প্রদান করার আদেশ দিলেন। বন্টনের ব্যাপারে ইউসুফ ‘আলাইহিস সালাম-এর রীতি ছিল এই যে, একবারে কোন এক ব্যক্তিকে এক উটের বোঝার চাইতে বেশী খাদ্যশস্য দিতেন না। হিসাব অনুযায়ী যখন তা শেষ হয়ে যেত, তখন পুনর্বার দিতেন। [কুরতুবী; ইবন কাসীর]
১২ : ৫৯ وَ لَمَّا جَهَّزَهُمۡ بِجَهَازِهِمۡ قَالَ ائۡتُوۡنِیۡ بِاَخٍ لَّكُمۡ مِّنۡ اَبِیۡكُمۡ ۚ اَلَا تَرَوۡنَ اَنِّیۡۤ اُوۡفِی الۡكَیۡلَ وَ اَنَا خَیۡرُ الۡمُنۡزِلِیۡنَ
৫৯. আর তিনি যখন তাদেরকে তাদের সামগ্রীর ব্যবস্থা করে দিলেন তখন তিনি বললেন, তোমরা আমার কাছে তোমাদের পিতার পক্ষ থেকে বৈমাত্রেয় ভাইকে নিয়ে আস। তোমরা কি দেখছ না যে, আমি মাপে পূর্ণ মাত্রায় দেই এবং আমি উত্তম অতিথিপরায়ণ।
ভাইদের কাছে সব বিবরণ জানার পর তার মনে এরূপ আকাঙ্খার উদয় হওয়া স্বাভাবিক যে, তারা পুনর্বার আসুক। এজন্যে একটি প্রকাশ্য ব্যবস্থা গ্রহণ করে তিনি স্বয়ং ভাইদেরকে বললেন, তোমরা যখন পুনর্বার আসবে, তখন তোমাদের সে ভাইকেও সঙ্গে নিয়ে এসো। তোমরা দেখতেই পাচ্ছ যে, আমি কিভাবে পুরোপুরি খাদ্যশস্য প্রদান করি এবং কিভাবে অতিথি আপ্যায়ন করি। এরপর একটি সাবধান বাণীও শুনিয়ে দিলেন, তোমরা যদি ভাইকে সাথে না আন, তবে আমি তোমাদের কাউকেই খাদ্যশস্য দেব না। কেননা, আমি মনে করব যে, তোমরা আমার সাথে মিথ্যা বলেছ। এভাবে তোমরা আমার কাছে আসবে না।
অপর একটি গোপন ব্যবস্থা এই করলেন যে, তারা খাদ্যশস্যের মূল্যবাবদ যে নগদ অর্থকড়ি কিংবা অলংকার জমা দিয়েছিল, সেগুলো গোপনে তাদের আসবাবপত্রের মধ্যে রেখে দেয়ার জন্য কর্মচারীদেরকে আদেশ দিলেন, যাতে বাড়ী পৌছে যখন তারা আসবাবপত্র খুলবে এবং নগদ অর্থ ও অলংকার পাবে, তখন যেন পুনর্বার খাদ্যশস্য নেয়ার জন্য আসতে পারে। মোটকথা, ইউসুফ ‘আলাইহিস সালাম কর্তৃক এসব ব্যবস্থা সম্পন্ন করার কারণ ছিল এই যে, ভবিষ্যতেও ভাইদের আগমন যেন অব্যাহত থাকে এবং ছোট সহোদর ভাইয়ের সাথেও তার সাক্ষাত ঘটার সুযোগ উপস্থিত হয়। [দেখুন, কুরতুবী; ইবন কাসীর; ফাতহুল কাদীর]
এ আয়াতাংশের দুটি অর্থ হতে পারে।
এক. তোমরা তোমাদের পিতার কাছ থেকে আরেকজনকে নিয়ে আস, যাতে তোমরা আরও এক বোঝা বেশী নিতে পার। তোমরা কি দেখতে পাওনা যে, মিশরে আমি সুন্দরভাবে সওদার ওজন প্রদান করে থাকি। [তাবারী] তাছাড়া আরেকটি অনুবাদ হচ্ছে, তোমরা তোমাদের পিতার পক্ষীয় ভাই অর্থাৎ তোমাদের বৈমাত্রেয় ভাইকে নিয়ে আস। তোমরা তো দেখছ যে আমি পূর্ণ মাপ প্রদান করে থাকি। মাপে কম দেই না। [তাবারী; আত-তাফসীরুস সহীহ] কোন কোন তাফসীরে এসেছে যে, তারা কথায় কথায় তাদের অপর ভাইয়ের কথা ইউসুফের কাছে বর্ণনা করেছিল। তিনি তাদেরকে সেটার সত্যতা নিরূপনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। যাতে করে তার আপন ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ হয়ে যায় [যামাখশারী; ফাতহুল কাদীর]
এর দুই অর্থ হতে পারে, এক. আমি সুন্দর অতিথি পরায়ণ। দুই. আমার এখানে মানুষ নিরাপদ। [কুরতুবী]
১২ : ৬০ فَاِنۡ لَّمۡ تَاۡتُوۡنِیۡ بِهٖ فَلَا كَیۡلَ لَكُمۡ عِنۡدِیۡ وَ لَا تَقۡرَبُوۡنِ
৬০. কিন্তু তোমরা যদি তাকে আমার কাছে না নিয়ে আস তবে আমার কাছে তোমাদের জন্য কোন বরাদ্দ থাকবে না এবং তোমরা আমার ধারে-কাছেও আসবে না।
বর্ণনা সংক্ষেপের কারণে হয়তো কারো পক্ষে একথা অনুধাবন করা কঠিন হয়ে পড়ছে যে, হযরত ইউসুফ যখন নিজের ব্যক্তিত্বকে তাদের সামনে প্রকাশ করতে চাচ্ছিলেন না তখন আবার তাদের বৈমাত্রেয় ভাইয়ের কথা এলো কেমন করে? এবং তাকে আনার ব্যাপারে তাঁর এত বেশী পীড়াপীড়ি করারই বা অর্থ কি? কেননা, এভাবে তো রহস্য ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। কিন্তু সামান্য চিন্তা করলে একথা পরিষ্কার বুঝা যায়। সেখানে খাদ্যশস্যের নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা ছিল এবং প্রত্যেক ব্যক্তি একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ খাদ্যশস্য গ্রহণ করতে পারতো। শস্য নেবার জন্য তারা দশ ভাই এসেছিল। কিন্তু তারা তাদের পিতার ও একাদশতম ভাইয়ের অংশও হয়তো চেয়েছিল। একথায় হযরত ইউসুফ (আ) বলে থাকবেন, বুঝলাম তোমাদের পিতার না আসার জন্য যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত কারণ রয়েছে। তিনি অত্যন্ত বৃদ্ধ এবং তার ওপর চোখে দেখতে পান না, ফলে তাঁর পক্ষে সশরীরে আসা সম্ভব নয়। কিন্তু ভাইয়ের না আসার কি ন্যায়সঙ্গত কারণ থাকতে পারে? এমন তো নয় যে, একজন বানোয়াট ভাইয়ের নাম করে অতিরিক্ত শস্য সংগ্রহ করে তোমরা অবৈধ ব্যবসায়ে নামার চেষ্টা করছো? জওয়াবে তারা হয়তো নিজেদের গৃহের অবস্থা বর্ণনা করেছে। তারা বলে থাকবে, সে আমাদের বৈমাত্রেয় ভাই। কিছু অসুবিধার কারণে পিতা তাকে আমাদের সাথে পাঠাতে ইতস্তত করেন। তাদের এসব কথায় হযরত ইউসুফ সম্ভবত বলেছেন, যাক এবারের জন্য তো আমি তোমাদের কথা বিশ্বাস করে পূর্ণ শস্য দিয়ে দিলাম কিন্তু আগামীতে তোমরা যদি তাকে সঙ্গে করে না আনো তাহলে তোমাদের ওপর থেকে আস্থা উঠে যাবে এবং এখান থেকে তোমরা আর কোন শস্য পাবে না। এ শাসক সুলভ হুমকি দেবার সাথে সাথে তিনি নিজের দাক্ষিণ্য ও মেহমানদারীর মাধ্যমে তাদেরকে বশীভূত করার চেষ্টা করেন। কারণ নিজের ছোট ভাইকে দেখার এবং ঘরের অবস্থা জানার জন্য তাঁর মন অস্থির হয়ে পড়েছিল। এটি ছিল ঘটনার একটি সাদামাটা চেহারা। সামান্য একটু চিন্তা-ভাবনা করলে ব্যাপারটি আপনা-আপনিই বুঝতে পারা যায়। এ অবস্থায় বাইবেলের আদি পুস্তকের ৪২-৪৩ অধ্যায়ে নানা প্রকার রং চড়িয়ে যে অতিরঞ্জিত কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে তার ওপর আস্থা স্থাপন করার কোন প্রয়োজন নেই।
১২ : ৬১ قَالُوۡا سَنُرَاوِدُ عَنۡهُ اَبَاهُ وَ اِنَّا لَفٰعِلُوۡنَ
৬১. তারা বলল, তার ব্যাপারে আমরা তার পিতাকে সম্মত করানোর চেষ্টা করব এবং আমরা নিশ্চয়ই এটা করব।
অর্থাৎ সেই ভাইকে নিয়ে আসার জন্য আমরা আব্বাকে উদ্ধুদ্ধ করব, আশা করি যে, আমাদের প্রচেষ্টায় আমরা সফল হব।
১২ : ৬২ وَ قَالَ لِفِتۡیٰنِهِ اجۡعَلُوۡا بِضَاعَتَهُمۡ فِیۡ رِحَالِهِمۡ لَعَلَّهُمۡ یَعۡرِفُوۡنَهَاۤ اِذَا انۡقَلَبُوۡۤا اِلٰۤی اَهۡلِهِمۡ لَعَلَّهُمۡ یَرۡجِعُوۡنَ
৬২. ইউসুফ তাঁর কর্মচারীদেরকে বললেন, তারা যে পণ্যমূল্য দিয়েছে তা তাদের মালপত্রের মধ্যে রেখে দাও, যাতে স্বজনদের কাছে ফিরে যাওয়ার পর তারা তা চিনতে পারে, যাতে তারা আবার ফিরে আসে।
فِتْيَانٌ (যুবকগণ) শব্দ থেকে এখানে তাদেরকে বোঝানো হয়েছে, যারা রাজদরবারে ভৃত্য-চাকর এবং খাদেম-সেবক ও গোলাম-দাস হিসেবে নিযুক্ত ছিল। ইউসুফ আ নিজেও তরুন বা যুবক,তিনি তার অধিনে যুবকদের কাজে লাগিয়েছেন।
সেই পণ্যমূল্য বা পুঁজি যা ইউসুফ (আঃ)-এর ভায়েরা শস্য ক্রয় করার জন্য সঙ্গে নিয়ে এসেছিল। رِحَالٌ (সফর সামান বা মালপত্র)-এর অর্থ তাদের ঐসব সরঞ্জাম যা তাদের সফরের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছিল। ‘পুঁজি’ গুপ্তভাবে তাদের সরঞ্জামে রেখে দেয়ার আদেশ এ জন্য দিয়েছিলেন যে, হয়তো দ্বিতীয়বার আসার জন্য তাদের কাছে পুঁজি না থাকলে এই পুঁজি নিয়েই চলে আসবে।
এর কারণ কারও কারও মতে, ইউসুফ আলাইহিস সালাম ভয় পাচ্ছিলেন যে, তাদের সম্ভবত: পুনরায় ক্রয় করার মত অর্থ-কড়ি থাকবে না। ফলে তারা আর আসবে না। কারও কারও মতে, তিনি ভাইদের কাছ থেকে টাকা নিতে অস্বস্তি বোধ করছিলেন। কারও কারও মতে, তিনি জানতেন যে, তারা যখন দেখবে যে এ টাকা তাদেরই, যা তারা পণ্যের বিনিময়ে দিয়েছিল, তখন সেটা ফেরৎ দেয়ার জন্য হলেও মিশর আসবে। [ইবন কাসীর]
ইউসুফ আ যেহেতু পূর্ণ ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন তিনি কাকে কতটুকু খাদ্য দিবেন বা সাহায্য করবেন সেটা তারই ইখতিয়ারে ছিলো। তিনি ইচ্ছে করলে ফ্রী দিতেও পারেন। অথবা এমনও হতে পারে ইউসুফ আ নিজের অর্থ ফান্ডে রেখে ভাইদেরটা ফেরত দিয়েছিলেন।
১২ : ৬৩ فَلَمَّا رَجَعُوۡۤا اِلٰۤی اَبِیۡهِمۡ قَالُوۡا یٰۤاَبَانَا مُنِعَ مِنَّا الۡكَیۡلُ فَاَرۡسِلۡ مَعَنَاۤ اَخَانَا نَكۡتَلۡ وَ اِنَّا لَهٗ لَحٰفِظُوۡنَ
৬৩. অতঃপর তারা যখন তাদের পিতার কাছে ফিরে আসল, তখন তারা বলল, হে আমাদের পিতা! আমাদের জন্য বরাদ্দ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কাজেই আমাদের ভাইকে আমাদের সাথে পাঠিয়ে দিন যাতে আমরা পরিমাপ করে রসদ পেতে পারি। আর আমরা অবশ্যই তার রক্ষণাবেক্ষণকারী।
অর্থাৎ, আগামীর শস্যপ্রাপ্তি বিন্য়্যামীনকে পাঠানোর উপর নির্ভরশীল। যদি সে আমাদের সাথে যায়, তাহলে শস্য পাওয়া যাবে। আর যদি না যায়, তাহলে শস্য পাওয়া যাবে না। সুতরাং তাকে আমাদের সাথে অবশ্যই পাঠান, যেন গত বারের মত দ্বিতীয়বারও শস্য পাই। আর ইউসুফকে পাঠাবার সময় যে ভয় করেছিলেন, সে ধরনের ভয় করবেন না। এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব আমাদের।
১২ : ৬৪ قَالَ هَلۡ اٰمَنُكُمۡ عَلَیۡهِ اِلَّا كَمَاۤ اَمِنۡتُكُمۡ عَلٰۤی اَخِیۡهِ مِنۡ قَبۡلُ ؕ فَاللّٰهُ خَیۡرٌ حٰفِظًا ۪ وَّ هُوَ اَرۡحَمُ الرّٰحِمِیۡنَ
৬৪. তিনি বললেন, আমি কি তোমাদেরকে তার সম্বন্ধে সেরূপ নিরাপদ মনে করব, যেরূপ আগে নিরাপদ মনে করেছিলাম তোমাদেরকে তার ভাই সম্বন্ধে? তবে আল্লাহই রক্ষণাবেক্ষণে শ্রেষ্ঠ এবং তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।
এ আয়াতসমূহে ঘটনার অবশিষ্টাংশ বর্ণিত হয়েছে যে, ইউসুফ আলাইহিস সালাম এর ভ্রাতারা যখন মিসর থেকে খাদ্যশস্য নিয়ে গৃহে প্রত্যাবর্তন করল, তখন পিতার কাছে মিসরের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে একথাও বললঃ আযীযে মিসর ভবিষ্যতের জন্য আমাদেরকে খাদ্যশস্য দেয়ার ব্যাপারে একটি শর্ত আরোপ করেছেন। তিনি বলেছেন যে, ছোটভাইকে সাথে আনলে খাদ্যশস্য পাবে, অন্যথায় নয়। তাই আপনি ভবিষ্যতে বিনইয়ামীনকেও আমাদের সাথে প্রেরণ করবেন- যাতে ভবিষ্যতেও আমরা খাদ্যশস্য পাই। আমরা তার পুরোপুরি হেফাজত করব। তার কোনরূপ কষ্ট হবে না। পিতা বললেনঃ আমি কি তার সম্পর্কে তোমাদেরকে তেমনি বিশ্বাস করব, যেমন ইতিপূর্বে তার ভাই ইউসুফের ব্যাপারে করেছিলাম? উদ্দেশ্য, এখন তোমাদের কথায় কি বিশ্বাস! একবার বিশ্বাস করে বিপদ ভোগ করেছি, ইউসুফকে হারিয়েছি।
তখনও হেফাজতের ব্যাপারে তোমরা এ ভাষাই প্রয়োগ করেছিলে। এটা ছিল তাদের কথার উত্তর। কিন্তু পরে পরিবারের প্রয়োজনের পরিপ্রেক্ষিতে নবীসুলভ তাওয়াক্কুল এবং এ বাস্তবতায় ফিরে গেলেন যে, লাভ-ক্ষতি কোনটাই বান্দার ক্ষমতাধীন নয় -যতক্ষণ আল্লাহ তা’আলা ইচ্ছা না করেন। আল্লাহর ইচ্ছা হয়ে গেলে তা কেউ টলাতে পারে না। তাই বললেন, তোমাদের হেফাজতের ফল তো ইতিপূর্বে দেখে নিয়েছি। এখন আমি আল্লাহর হেফাজতের উপরই ভরসা করি এবং তিনি সর্বাধিক দয়ালু। মোটকথা, ইয়াকুব আলাইহিস সালাম বাহ্যিক অবস্থা ও সন্তানদের ওয়াদা-অঙ্গীকারের উপর ভরসা করলেন না। তবে আল্লাহর ভরসায় কনিষ্ঠ সন্তানকেও তাদের সাথে প্রেরণ করতে সম্মত হলেন।
১২ : ৬৫ وَ لَمَّا فَتَحُوۡا مَتَاعَهُمۡ وَجَدُوۡا بِضَاعَتَهُمۡ رُدَّتۡ اِلَیۡهِمۡ ؕ قَالُوۡا یٰۤاَبَانَا مَا نَبۡغِیۡ ؕ هٰذِهٖ بِضَاعَتُنَا رُدَّتۡ اِلَیۡنَا ۚ وَ نَمِیۡرُ اَهۡلَنَا وَ نَحۡفَظُ اَخَانَا وَ نَزۡدَادُ كَیۡلَ بَعِیۡرٍ ؕ ذٰلِكَ كَیۡلٌ یَّسِیۡرٌ
৬৫. আর যখন তারা তাদের মালপত্র খুলল তখন তারা দেখতে পেল তাদের পণ্যমূল্য তাদেরকে ফেরত দেয়া হয়েছে। তারা বলল, হে আমাদের পিতা! আমরা আর কি প্রত্যাশা করতে পারি? এটা আমাদের দেয়া পণ্যমূল্য, আমাদেরকে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে। আর আমরা আমাদের পরিবারবর্গকে খাদ্য-সামগ্রী এনে দেব এবং আমরা আমাদের ভাইয়ের রক্ষণাবেক্ষণ করব এবং আমরা অতিরিক্ত আরো এক উট বোঝাই পণ্য আনব; ঐ পরিমাণ শস্য অতি সহজ
এতক্ষন পর্যন্ত সফরের অবস্থা বর্ণনা প্রসঙ্গেই তাদের কথাবার্তা হচ্ছিল। আসবাবপত্র তখনও খোলা হয়নি। অতঃপর যখন আসবাবপত্র খোলা হল এবং দেখা গেল যে, খাদ্যশস্যের মূল্য বাবদ পরিশোধিত মূল্য আসবাবপত্রের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। তখন তারা অনুভব করতে পারল যে, এ কাজ ভুলবশতঃ হয়নি; বরং ইচ্ছাপূর্বক আমাদের পুঁজি আমাদেরকে ফেরত দেয়া হয়েছে। তাই (رُدَّتْ إِلَيْنَا) বলা হয়েছে। অতঃপর তারা পিতাকে বললঃ (مَا نَبْغِي) অর্থাৎ আমরা আর কি চাই? খাদ্যশস্যও এসে গেছে এবং এর মূল্যও ফেরত পাওয়া গেছে। এখন তো অবশ্যই ভাইকে নিয়ে পুনর্বার যাওয়া দরকার। কারণ, এ আচরণ থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, আযীযে মিসর আমাদের প্রতি খুবই সদয়।
কাজেই কোন আশঙ্কার কারণ নেই; আমরা পরিবারের জন্য খাদ্যশস্য আনব, ভাইকেও হেফাজতে রাখব এবং ভাইয়ের অংশের বরাদ্দ অতিরিক্ত পাব। ভাইকে নেয়ার বিনিময়ে যা পাব তা অত্যন্ত সহজেই পাচ্ছি। এ দুর্ভিক্ষের দিনে এত সহজে খাবার পাওয়া বিরাট ব্যাপার। [ইবন কাসীর] তাছাড়া এ বাড়তি পরিমাণ খাদ্যশস্য দেয়া আযীযের জন্যও কঠিন কিছু নয়। [ফাতহুল কাদীর; মুয়াসসার]। আবার আপনার জন্যও এ সামান্য সময় আমাদের ছোট ভাইটিকে ছেড়ে থাকা কষ্টের হবে না। আমাদের বর্তমান খাদ্য শস্যের পরিমাণও কম সুতরাং বাড়িয়ে আনতে পারলেই লাভ বেশী।
يسير এর একটি ভাবার্থ এই যে, রাজার জন্য এক উটের বোঝা পরিমাণ শস্য দেয়া সহজ, কষ্টকর ব্যাপার নয়। দ্বিতীয় ভাবার্থ এই যে, ذلك দ্বারা ইঙ্গিত করা হয়েছে সেই শস্যের দিকে যা তারা সঙ্গে নিয়ে এসেছিল এবং يسير এর অর্থ অল্প, অর্থাৎ যে পরিমাণ শস্য আমরা সাথে নিয়ে এসেছি তা অল্প। বিনইয়ামীনকে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে যদি বেশি পরিমাণে শস্য পাওয়া যায়, তাহলে তো ভাল কথা, আমাদের প্রয়োজনাদি ভালোরূপে পূরণ হয়ে যাবে।
এমনভাবে ছেলেরা ইয়াকুব আ এর কাছে এসে বলছিলো তারা যাবেই বেনিয়ামীনকে নিয়ে কারন পরিবারের জন্য খাবার আনতে হবে। তারা ভাইকে হেফাজত করবে বার বারই বলেছে। আগের মত এইবার ভুল করবে না।
তখনকার পারিবারিক ও সামাজিক অবস্থা উঠে এসেছে, অন্যায় করার পরও কোন অনুভূতি যখন থাকে না,তারা নিজেদের প্রয়োজনকেই প্রাধান্য দেয়। এইবার তারা আর পিতাকে জিজ্ঞেস নয় তারা সিদ্ধান্ত নেয় বেনইয়ামিনকে নিয়ে যাবে।
১২ : ৬৬ قَالَ لَنۡ اُرۡسِلَهٗ مَعَكُمۡ حَتّٰی تُؤۡتُوۡنِ مَوۡثِقًا مِّنَ اللّٰهِ لَتَاۡتُنَّنِیۡ بِهٖۤ اِلَّاۤ اَنۡ یُّحَاطَ بِكُمۡ ۚ فَلَمَّاۤ اٰتَوۡهُ مَوۡثِقَهُمۡ قَالَ اللّٰهُ عَلٰی مَا نَقُوۡلُ وَكِیۡلٌ
৬৬. পিতা বললেন, আমি তাকে কখনোই তোমাদের সাথে পাঠাবো না যতক্ষণ না তোমরা আল্লাহর নামে অঙ্গীকার কর যে, তোমরা তাকে আমার কাছে নিয়ে আসবেই, অবশ্য যদি তোমরা বেষ্টিত হয়ে পড় (তবে ভিন্ন কথা)। তারপর যখন তারা তার কাছে প্রতিজ্ঞা করল তখন তিনি বললেন, আমরা যে বিষয়ে কথা বলছি, আল্লাহ তার বিধায়ক।
এসব কথা শুনে পিতা উত্তর দিলেন, আমি বিনইয়ামীনকে তোমাদের সাথে ততক্ষণ পর্যন্ত পাঠাব না, যতক্ষণ না তোমরা আল্লাহর কসমসহ এরূপ ওয়াদা-অঙ্গীকার আমাকে দাও যে, তোমরা অবশ্যই তাকে সাথে নিয়ে আসবে। ঐ অবস্থা ব্যতীত, যখন তোমরা সবাই কোন বেষ্টনীতে পড়ে যাও। তাফসীরবিদ মুজাহিদ বলেনঃ এর অর্থ এই যে, তোমরা সবাই মৃত্যুমুখে পতিত হও। [কুরতুবী] কাতাদাহর মতে অর্থ এই যে, তোমরা সম্পূর্ণ অক্ষম ও পরাভূত হয়ে পড়। [ইবন কাসীর]
অর্থাৎ ছেলেরা যখন প্রার্থিত পন্থায় ওয়াদা-অঙ্গীকার করল অর্থাৎ সবাই কসম করল এবং পিতাকে আশ্বস্ত করার জন্য কঠোর ভাষায় প্রতিজ্ঞা করল,
আল্লাহর কসম করা অর্থ হলো আল্লাহ সাক্ষী রইলেন। আল্লাহর কাছেও জবাবদিহীতা রয়ে যায়।
তখন ইয়াকুব ‘আলাইহিস সালাম বললেনঃ বিনইয়ামীনের হেফাজতের জন্য হলফ নেয়া-হলফ করার যে কাজ আমরা করেছি, আল্লাহ্ তা’আলার উপরই তার নির্ভর। তিনি শক্তি দিলেই কেউ কারো হেফাযত করতে পারে এবং দেয়া অঙ্গীকার পূর্ণ করতে পারে। [কুরতুবী] নতুবা মানুষ অসহায়; তার ব্যক্তিগত সামর্থাধীন কোন কিছুই নয়।
১২ : ৬৭ وَ قَالَ یٰبَنِیَّ لَا تَدۡخُلُوۡا مِنۡۢ بَابٍ وَّاحِدٍ وَّ ادۡخُلُوۡا مِنۡ اَبۡوَابٍ مُّتَفَرِّقَۃٍ ؕ وَ مَاۤ اُغۡنِیۡ عَنۡكُمۡ مِّنَ اللّٰهِ مِنۡ شَیۡءٍ ؕ اِنِ الۡحُكۡمُ اِلَّا لِلّٰهِ ؕ عَلَیۡهِ تَوَكَّلۡتُ ۚ وَ عَلَیۡهِ فَلۡیَتَوَكَّلِ الۡمُتَوَكِّلُوۡنَ
৬৭. আর তিনি বললেন, হে আমার পুত্রগণ! তোমরা এক দরজা দিয়ে প্রবেশ করে না, ভিন্ন ভিন্ন দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে আল্লাহর সিদ্ধান্তের বিপরীতে আমি তোমাদের জন্য কিছু করতে পারি না। হুকুমের মালিক তো আল্লাহই। আমি তারই উপর নির্ভর করি। আর আল্লাহরই উপর যেন নির্ভরকারীরা নির্ভর করে।
আলোচ্য আয়াতসমূহে ছোট ভাইকে সাথে নিয়ে ইউসুফ-ভ্রাতাদের দ্বিতীয়বার মিসর সফরের কথা বর্ণিত হয়েছে। ইউসুফ আলাইহিস সালামের পরে তার ভাইকে পাঠাবার সময় ইয়াকুব আলাইহিস সালামের মন কত দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল তা এখানে বর্ণিত হয়েছে। নানা সন্দেহ ও আশংকা তার মনে জেগে ওঠা বিচিত্র নয় এবং সর্বদাই এ চিন্তায় তিনি পেরেশান হয়ে গিয়ে থাকবেন যে, আল্লাহই ভালো জানেন এখন এ ছেলের চেহারাও আর দেখতে পাবো কি না। তাই তিনি হয়তো নিজের সাধ্যমত সতর্কতা অবলম্বন করার ক্ষেত্রে কোন প্রকার ক্রটি না রাখতে চেয়েছিলেন।
ইমোশনাল ফিলিংস অবস্থা-মানুষের মাঝে আল্লাহ কিছু জিনিষের চাহিদার প্রয়োজন অনুভূতি দিয়ে দিয়েছেন। সন্তানের নিরাপত্তা চাওয়াটাও তার মাঝে একটি। প্রয়োজনীয় জিনিস চাওয়াটা ফিতরাত, এরপর আল্লাহর উপর নির্ভর করা পরিনতির জন্য।
তখন ইয়াকুব আলাইহিস সালাম তাদেরকে মিসর শহরে প্রবেশ করার জন্য একটি বিশেষ উপদেশ দেন যে, তোমরা এগার ভাই শহরের একই প্রবেশ দ্বার দিয়ে প্রবেশ করো না, বরং নগর প্রাচীরের কাছে পৌছে ছত্রভঙ্গ হয়ে যেয়ো এবং বিভিন্ন দরজা দিয়ে শহরে প্রবেশ করো। এর কারণ কি, আল্লাহ্ তা বর্ণনা করেননি। তবে অনেকে মনে করেন- এরূপ উপদেশ দানের কারণ এই আশঙ্কা ছিল যে, স্বাস্থ্যবান, সুঠামদেহী, সুদৰ্শন এবং রূপ ও ঔজ্জ্বল্যের অধিকারী এসব যুবক সম্পর্কে যখন লোকেরা জানবে যে, এরা একই পিতার সন্তান এবং ভাই ভাই, তখন কারো বদ নজর গেলে তাদের ক্ষতি হতে পারে। কুরতুবী [ইবন কাসীর] অথবা সঙ্গবদ্ধভাবে প্রবেশ করার কারণে হয়ত কেউ হিংসাপরায়ণ হয়ে তাদের ক্ষতি সাধন করতে পারে। কুরতুবী]
ইয়াকুব আলাইহিস সালাম একদিকে কুদৃষ্টি অথবা হিংসা, অথবা সন্দেহভাজন মনে করার আশঙ্কাবশতঃ ছেলেদের একই দরজা দিয়ে শহরে প্রবেশ করতে নিষেধ করেছেন এবং অন্যদিকে একটি বাস্তব সত্য প্রকাশ করাও জরুরী মনে করেছেন। তা হচ্ছে, কুদৃষ্টি থেকে আত্মরক্ষার যে তদবীর আমি বলেছি, আমি জানি যে, তা আল্লাহর ইচ্ছাকে এড়াতে পারবে না। আদেশ একমাত্র আল্লাহরই চলে। তবে মানুষের প্রতি বাহ্যিক তদবীর করার নির্দেশ আছে। তাই এ উপদেশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু আমি তদবীরের উপর ভরসা করি না; বরং আল্লাহর উপরই ভরসা করি।
তার উপরই ভরসা করা এবং বাহ্যিক ও বস্তুভিত্তিক তদবীরের উপর ভরসা না করা প্রত্যেক মানুষের অবশ্য কর্তব্য। যারা সর্বাবস্থায় আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করে তাদের সম্পর্কে হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিভিন্ন সুসংবাদ দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমার উম্মতের মধ্যে সত্তর হাজার লোক বিনা হিসাবে জান্নাতে যাবে। আর তারা হলেন সে সমস্ত লোক যারা (তাদের অসুস্থতার সময়) কারও কাছে ঝাড়ফুক চায় না, লোহা গরম করে ছেক দেয় না, কুলক্ষণ গ্রহণ করে না এবং সর্বদা তাদের প্রভুর উপর ভরসা করে। [বুখারীঃ ৬৪৭২]
১২ : ৬৮ وَ لَمَّا دَخَلُوۡا مِنۡ حَیۡثُ اَمَرَهُمۡ اَبُوۡهُمۡ ؕ مَا كَانَ یُغۡنِیۡ عَنۡهُمۡ مِّنَ اللّٰهِ مِنۡ شَیۡءٍ اِلَّا حَاجَۃً فِیۡ نَفۡسِ یَعۡقُوۡبَ قَضٰهَا ؕ وَ اِنَّهٗ لَذُوۡ عِلۡمٍ لِّمَا عَلَّمۡنٰهُ وَ لٰكِنَّ اَكۡثَرَ النَّاسِ لَا یَعۡلَمُوۡنَ
৬৮. আর যখন তারা তাদের পিতা যেভাবে আদেশ করেছিলেন সেভাবেই প্রবেশ করল, তখন আল্লাহ্র হুকুমের বিপরীতে তা তাদের কোন কাজে আসল না; ইয়াকুব শুধু তার মনের একটি অভিপ্রায় পূর্ণ করছিলেন আর অবশ্যই তিনি আমাদের দেয়া শিক্ষায় নবান ছিলেন। কিন্তু বেশীর ভাগ মানুষই জানে না।
এ আয়াতে পূর্ববর্তী আয়াতে বর্ণিত বিষয়টিকে আরো স্পষ্ট করে বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ ছেলেরা পিতার আদেশ পালন করে বিভিন্ন দরজা দিয়ে শহরে প্রবেশ করে। ফলে পিতার নির্দেশ কার্যকর হয়ে গেল। অবশ্য এ তদবীর আল্লাহর কোন নির্দেশকে এড়াতে পারত না, কিন্তু পিতৃ-সুলভ স্নেহ-মমতার চাহিদা ছিল যা, তা তিনি পূর্ণ করেছেন। পূর্ব আয়াতের শেষ ভাগে ইয়াকুব আলাইহিস সালাম-এর প্রশংসা করে বলা হয়েছে, ইয়াকুব বড় বিদ্বান ছিলেন, কারণ, আমি তাকে বিদ্যা দান করেছিলাম। এ কারণেই তিনি শরীআতসম্মত ও প্রশংসনীয় বাহ্যিক তদবীর অবলম্বন করলেও তার উপর ভরসা করেননি। বরং কৌশল ও আল্লাহর প্রতি নির্ভরশীলতার মধ্যে যথাযথ ভারসাম্য স্থাপন করেছেন।
আলোচ্য দু’আয়াত থেকে কতিপয় নির্দেশ ও মাসআলা জানা যায়-
(এক) বদ নযর লাগা সত্য। [দেখুন- বুখারীঃ ৫৭৪০, মুসলিমঃ ২১৮৭] সুতরাং ক্ষতিকর খাদ্য ও ক্ষতিকর ক্রিয়াকর্ম থেকে আত্মরক্ষার তদবীর করার ন্যায় এ থেকে আত্মরক্ষার তদবীর করাও সমভাবে শরীআতসিদ্ধ।
(দুই) যদি অন্য কারো কোন গুণ অথবা নেয়ামত দৃষ্টিতে বিস্ময়কর ঠেকে এবং নযর লেগে যাওয়ার আশঙ্কা হয়, তবে তা দেখে بَارَكَ اللهُ অথবা مَا شَاءَ الله বলা দরকার, যাতে অন্যের কোন ক্ষতি না হয়।
(তিন) নযর লাগা থেকে আত্মরক্ষার জন্য শরীআতসম্মত যে কোন তদবীর করা জায়েয। তন্মধ্যে দোআ, কুরআন-হাদীসভিত্তিক ঝাড়-ফুক দ্বারা প্রতিকার করাও অন্যতম। [কুরতুবী, সংক্ষেপিত]
এর অর্থ হচ্ছে, কৌশল ও আল্লাহর প্রতি নির্ভরশীলতার মধ্যে যথাযথ ভারসাম্য স্থাপন, যা তোমরা ইয়াকূব আলাইহিস সালামের উপরোল্লিখিত উক্তির মধ্যে পাও। আসলে আল্লাহর অনুগ্রহে তার সত্যজ্ঞানের যে ধারা বর্ষিত হয়েছিল এ ছিল তারই ফলশ্রুতি। একদিকে উপায়-উপকরণের স্বাভাবিক বাধ্যবাধকতার বিধান অনুযায়ী তিনি এমন সব ব্যবস্থা অবলম্বন করেন, যা বুদ্ধি, চিন্তা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে অবলম্বন করা সম্ভব ছিল। ছেলেদেরকে তাদের প্রথম অপরাধের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ভয় দেখান ও সাবধান করে দেন, যাতে তারা পুনর্বার ঐ ধরনের অপরাধ করার সাহস না করে। তাদের কাছ থেকে বৈমাত্রয় ভাইয়ের হেফাজত করার জন্য আল্লাহর নামে শপথ নেন এবং তদানীন্তন রাজনৈতিক অবস্থার প্রেক্ষিতে যে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা অবলম্বন করার প্রয়োজন অনুভূত হয় তা অবলম্বন করার জন্য তাদেরকে নির্দেশ দেন, যাতে নিজেদের সাধ্যমত ব্যবস্থাপনার মধ্যে এমন কোন ত্রুটি থাকতে না দেয়া হয় যার ফলে তারা ঘেরাও হয়ে যেতে পারে। কিন্তু অন্যদিকে প্রতি মুহূর্তে একথা তাঁর সামনে আছে এবং তিনি বারবার একথা প্রকাশও করেন যে, আল্লাহর অনুগ্রহের ওপর ভরসা করা উচিত। যে ব্যক্তি প্রকৃত সত্যের জ্ঞান রাখে, যে ব্যক্তি একথাও জানে যে, দুনিয়ার জীবনের বাইরের দিকে আল্লাহর তৈরী প্রাকৃতিক ব্যবস্থা কোন্ ধরনের প্রচেষ্টা ও কাজ দাবী করে এবং একথাও জানে যে, এ বাহ্যিক দিকের পেছনে যে প্রকৃত সত্য লুকিয়ে আছে তার ভিত্তিতে আসল কার্যকর শক্তি কি এবং তার উপস্থিতিতে নিজের প্রচেষ্টা ও কাজের ওপরে মানুষের ভরসা কত বেশী ভিত্তিহীন— একমাত্র সে-ই নিজের কথা ও কাজের মধ্যে এ সঠিক ভারসাম্য কায়েম করতে পারে। একথাটিই অধিকাংশ লোক জানে না। তাদের মধ্য থেকে যাদের বাহ্যিক দিকের প্রভাব বেশী পড়ে তারা আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা থেকে গাফেল হয়ে কৌশল ও ব্যবস্থা অবলম্বনকে সবকিছু মনে করে বসে এবং অন্তর্নিহিত সত্য যার মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলে সে জাগতিক কৌশল ও ব্যবস্থা অবলম্বন না করে শুধুমাত্র আল্লাহর প্রতি নির্ভরতার ভিত্তিতে জীবনের গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যেতে চায়।
মানুষের মাঝে কিছু আছে তারা কুসংস্কারে বিশ্বাস করে থাকে।
কিছু মানুষ তারা যে প্রিকসন ( বস্তুগত সাবধানতা) নিয়েছে সেটার উপর নির্ভর করে থাকে।
কেউ আছে আল্লাহর উপর নির্ভর করে কোন প্রটেকসান মিজার( সাবধানতা) নেয় না।
ভারসাম্যনীতি অনুসরন করতে হবে। সাবধান হওয়ার অর্থাৎ প্রিকসন নেয়ার পরও ঘটনা ঘটতে পারে এটা সম্পূর্নই আল্লাহর ইচ্ছা।
যেমন মুসা আ এর মা তার মেয়েকে পানিতে ভাসিয়ে দেয়া শিশু মুসার বাক্সটা অনুসরন করতে বলেছিলেন, এটা হলো সেই মায়ের চাওয়া মনের, সন্তানের নিরাপত্তার জন্য।
মানুষের যে চাহিদাগুলো ফিতরাতের মাঝেই রয়েছে তার মধ্যে একটি হলো শারিরীক চাহিদা-খাদ্য ,
রুহানী বা Spiritual need- সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর স্মরন
মানসিক বা Imotional needs— নিরাপদ থাকতে চাওয়া,ভালোবাসা,পারস্পরিক সৌহার্দ চাওয়া
আরো অনেক এইরকম চাহিদা রয়েছে যা সৃষ্টগতভাবেই আল্লাহ দিয়েছেন। তবে এই চাওয়াগুলো যদিও আলাদা আলাদা গুরুত্ব রাখে আবশ্যক,তবুও একটি চাওয়া অন্যটির উপর প্রভাব ফেলে থাকে। আলাদা আলাদা চাওয়া কিন্তু নির্ভর করে একটির উপর আরেকটি। তাই কোন চাওয়া পাওয়ার না কারনে বা প্রয়োজনটার জন্য কোনো সমস্যা হলে, সেটার সমাধান করেই ব্যক্তির সমস্যা সমাধান করতে হবে। তাই প্রয়োজন হলো সনাক্ত করা কোথায় সমস্যা হচ্ছে। সবকিছু স্প্রিচুয়্যাল সমাধান দিয়ে হয় না। স্প্রিচুয়্যালি আল্লাহর উপর নির্ভর করা, ইমোশনালি প্রিকশন নেয়া।