أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
৪৬ : ২৭ وَ لَقَدۡ اَهۡلَكۡنَا مَا حَوۡلَكُمۡ مِّنَ الۡقُرٰی وَ صَرَّفۡنَا الۡاٰیٰتِ لَعَلَّهُمۡ یَرۡجِعُوۡنَ
২৭. আর অবশ্যই আমরা ধ্বংস করেছিলাম তোমাদের চারপাশের জনপদসমূহ; এবং আমরা বিভিন্নভাবে আয়াতসমূহ বিবৃত করেছিলাম, যাতে তারা ফিরে আসে।
‘চতুষ্পাশর্ববর্তী জনপদসমূহ’ বলতে আ’দ, সামুদ এবং লূতের ঐ বসতিগুলোকে বুঝানো হয়েছে, যেগুলো হেজাযের নিকটে অবস্থিত ছিল এবং ইয়ামান, সিরিয়া ও ফিলিস্তীন যাতায়াত পথে সেগুলোর পাশ দিয়েই তারা অতিক্রম করত।
অর্থাৎ, আমি বিভিন্নভাবে এবং বিভিন্ন ধরনের দলীলাদি তাদের সামনে উপস্থাপন করেছিলাম এই মনে করে যে, হয়তো তারা তাওবা করবে। কিন্তু তারা অটল-অবিচল থাকল।
৪৬ : ২৮ فَلَوۡ لَا نَصَرَهُمُ الَّذِیۡنَ اتَّخَذُوۡا مِنۡ دُوۡنِ اللّٰهِ قُرۡبَانًا اٰلِـهَۃً ؕ بَلۡ ضَلُّوۡا عَنۡهُمۡ ۚ وَ ذٰلِكَ اِفۡكُهُمۡ وَ مَا كَانُوۡا یَفۡتَرُوۡنَ
২৮. অতঃপর তারা আল্লাহর সান্নিধ্য যাদেরকে ইলাহরূপে গ্রহণ করেছিল। তারা তাদেরকে সাহায্য করল না কেন? বরং তাদের ইলাহগুলো তাদের কাছ থেকে হারিয়ে গেল। আর এটা ছিল তাদের মিথ্যাচার; এবং যা তারা অলীক উদ্ভাবন করছিল।
যে উপাস্যগুলোকে তারা আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম মনে করত, তারা তাদের কোন সাহায্য করল না, বরং তারা সেই মুহূর্তে আসেইনি, তাদের কোন পাত্তাই ছিল না। এ থেকেও জানা গেল যে, মক্কার মুশরিকরা মূর্তিগুলোকে প্রকৃত উপাস্য মনে করত না, বরং তাদেরকে আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম ও অসীলা মনে করত। মহান আল্লাহ এই অসীলাগুলোকে ‘ইফক’ (মিথ্যা) এবং ‘ইফতিরা’ (মনগড়া উদ্ভাবন) সাব্যস্ত করে স্পষ্ট করে দিলেন যে, এটা অবৈধ ও হারাম।
৪৬ : ২৯ وَ اِذۡ صَرَفۡنَاۤ اِلَیۡكَ نَفَرًا مِّنَ الۡجِنِّ یَسۡتَمِعُوۡنَ الۡقُرۡاٰنَ ۚ فَلَمَّا حَضَرُوۡهُ قَالُوۡۤا اَنۡصِتُوۡا ۚ فَلَمَّا قُضِیَ وَلَّوۡا اِلٰی قَوۡمِهِمۡ مُّنۡذِرِیۡنَ
২৯. আর স্মরণ করুন, যখন আমরা আপনার দিকে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম জিনদের একটি দলকে, যারা মনোযোগসহকারে কুরআন পাঠ শুনছিল। অতঃপর যখন তারা তার কাছে উপস্থিত হল, তারা বলল, চুপ করে শুন। অতঃপর যখন কুরআন পাঠ সমাপ্ত হল তারা তাদের সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে গেল সতর্ককারীরূপে।
মক্কার কাফেরদেরকে শোনানোর জন্যে পূর্বেকার আয়াতসমূহে কুফর ও অহংকারের নিন্দা ও ধ্বংসকারিতা বর্ণিত হয়েছে। আলোচ্য আয়াতসমূহে তাদেরকে লজ্জা দেয়ার উদ্দেশ্যে জিনদের ইসলাম গ্রহণের ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। উদ্দেশ্য এই যে, জিনরা অহংকার ও গর্বে তোমাদের চেয়েও বেশি, কিন্তু কুরআন শুনে তাদের অন্তরও বিগলিত হয়ে গেছে এবং ইসলাম গ্রহণ করেছে। তোমাদেরকে আল্লাহ তা’আলা জিনদের চেয়ে বেশি জ্ঞান-বুদ্ধি ও চেতনা দান করেছেন; কিন্তু তোমরা ইসলাম গ্ৰহণ করছ না।
জিন্নদের কুরআন শ্রবণ ও ইসলাম গ্রহণের ঘটনা সহীহ হাদীসসমূহে এভাবে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নবুওয়াত লাভের পর থেকে জিন জাতিকে আকাশের সংবাদ সংগ্রহ থেকে নিবৃত্ত রাখা হয়। সেমতে তাদের কেউ সংবাদ শোনার মানসে উপরে গেলে তাকে উল্কাপিণ্ড নিক্ষেপ করে বিতাড়িত করা হত।
জিন্নরা এই নতুন পরিস্থিতির কারণ উদঘাটনে সচেষ্ট হল এবং তাদের বিভিন্ন দল কারণ অনুসন্ধানে পৃথিবীর বিভিন্ন ভূখণ্ডে কয়েকজন সাথীসহ ঘুরে বেড়াচ্ছিল। সে সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কয়েকজন সাহাবীসহ বাতনে নাখলা নামক স্থানে অবস্থান করছিলেন। তাঁর ওকায বাজারে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল। আরবরা আমাদের যুগের প্রদর্শনীর মত বিভিন্ন জায়গায় বিশেষ বিশেষ দিনে মেলার আয়োজন করত। এসব মেলায় বহুলোক উপস্থিত থাকত, দোকান খোলা হত এবং সভা-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হত। ওকায নামক স্থানে প্রতি বছর এমনি ধরনের এক মেলা বসত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্ভবতঃ ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে সেখানে গমন করছিলেন। নাখলা নামক স্থানে তিনি যখন ফজরের সালাতে কুরআন পাঠ করছিলেন, তখন জিনদের অনুসন্ধানী দলটি সেখানে দিয়ে পৌঁছল। তারা কুরআন পাঠ শুনে বলতে লাগল, এই সে নতুন ঘটনা, যার কারণে আমাদেরকে আকাশের সংবাদ সংগ্রহে নিবৃত্ত করা হয়েছে। [বুখারী: ৭৭৩, মুসলিম: ৪৪৯, তিরমিযী: ৩৩২৩, নাসায়ী: আল কুবরা ১১৬৪]
অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, জিনরা সেখানে পৌছে পরস্পর বলতে লাগল, চুপ করে কুরআন শুন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সালাত শেষ করলে জিনরা ইসলামের সত্যতায় বিশ্বাস স্থাপন করে তাদের সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে গেল এবং তদন্তকার্যের রিপোর্ট পেশ করে একথাও বলল, আমরা মুসলিম হয়ে গেছি। তোমাদেরও ইসলাম গ্রহণ করা উচিত। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম সূরা জিন অবতীর্ণ না হওয়া পর্যন্ত এই জিনদের গমনাগমন এবং তাদের কুরআন পাঠ শুনে ইসলাম গ্রহণের বিষয় কিছুই জানতেন না। সূরা জিনে আল্লাহ তা’আলা তাকে এ বিষয়ে অবহিত করেন। আরও এক বর্ণনায় আছে, নসীবাঈন নামক স্থানের অধিবাসী এই জিনদের সংখ্যা ছিল নয় অথবা সাত। [মুস্তাদরাকে হাকিম: ২/৪৫৬র
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইতিহাস খ্যাত তায়েফ সফরের ঘটনাটি ঘটেছিল হিজরাতের তিন বছর আগে নবুওয়াতের ১০ম বছরে। তায়েফের উক্ত সফরে জিন দের কুরআন শোনার যে ঘটনা ঘটেছিল তা সূরা আহকাফের ২৯ থেকে ৩২ আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। ঐ আয়াতগুলো একবার দেখলেই বুঝা যায়, সে সময় যেসব জিন কুরআন শুনে তার প্রতি ঈমান এনেছিল তারা আগে থেকেই হযরত মূসা এবং পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান পোষণ করতো। পক্ষান্তরে সূরা জীনের ২ হতে ৭ পর্যন্ত আয়াত থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, এ সময় যে জিনেরা কুরআন শুনেছিল তারা ছিল মুশরিক। তারা আখেরাত ও রিসালাত অস্বীকার করতো।রসূলুল্লাহ ﷺ সে সময় জিনদের দেখতে পাচ্ছিলেন না এবং তারা যে কুরআন শুনছে একথাও তাঁর জানা ছিল না। পরবর্তী সময়ে আল্লাহ তা’আলা তাঁকে অহীর মাধ্যমে এ ঘটনা জানিয়ে দিয়েছেন। এ ঘটনাটির বর্ণনা প্রসঙ্গে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, সে সময় রসূলুল্লাহ ﷺ জিনদের উদ্দেশ্যে কুরআন পাঠ করেননি এবং তিনি তাদের দেখেনওনি। ” (মুসলিম, তিরমিযী, মুসনাদে আহমাদ, ইবনে জারীর)
তাছাড়াও এ বিষয়টি ইতিহাস থেকে প্রমাণিত যে, তায়েফের সফরে যায়েদ ইবনে হারেসা ছাড়া আর কেউ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে ছিলেন না। পক্ষান্তরে এ সূরা জীনে উল্লেখিত সফর সম্পর্কে ইবনে আব্বাস বর্ণনা করেছেন যে, এ সময় কয়েকজন সাহাবী তাঁর সাথে ছিলেন। তা ছাড়াও অনেক গুলো বর্ণনা এ বিষয়ে একমত যে, সূরা আহকাফে বর্ণিত ঘটনায় জিনরা যখন কুরআন শুনেছিল তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তায়েফ থেকে মক্কা ফেরার পথে নাখলায় অবস্থান করছিলেন। আর ইবনে আব্বাসের বর্ণনা মতে এ সূরায় বর্ণিত সফরে জিনদের কুরআন শোনার ঘটনা তখন ঘটেছিল যখন তিনি মক্কা থেকে উকায যাচ্ছিলেন। এসব কারণে যে বিষয়টি সঠিক বলে জানা যায় তা হলো, সূরা আহকাফ এবং সূরা জিনে একই ঘটনার উল্লেখ করা হয়নি। বরং এ ছিল ভিন্ন ভিন্ন সফরে সংঘটিত ভিন্ন ভিন্ন দু’টি ঘটনা।
আল্লামা ইবনে ইসহাকের সূত্রে আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) এ ঘটনাকে হিজরতের পূর্বে বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) তায়েফ থেকে ফেরার পথে এক উপত্যকায় নামাজ আদায় করছিলেন। তখন জিনদের একটি দল তাঁর কোরআন তিলাওয়াত শুনে থেমে যায় এবং রাসুল (সা.)-এর ঈমানের ঘোষণা দেয়। সম্ভবত তায়েফবাসীর আচরণে তিনি যে ব্যথা পেয়েছিলেন, তার সান্ত্বনাস্বরূপ আল্লাহ তাঁর প্রতি জিনদের দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেন। আল্লামা ইবনে ইসহাক ও ইবনে সাদের মতে, সেই দলে দুই গোত্রের ৭০ থেকে ৯০ জন জিন উপস্থিত ছিল।
অন্যান্য হাদীসে জিনদের আগমনের ঘটনা অন্যভাবেও ব্যক্ত হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে একাধিক ঘটনা বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত হওয়ার কারণে এসব বর্ণনায় কোন বৈপরীত্য নেই। ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত আছে যে, জিনরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে বার বার আগমন করেছে।
ড. খালেদ বিন উসমান আস-সাবত বলেন, রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে জিনদের ছয়টি পৃথক সাক্ষাতের বর্ণনা পাওয়া যায়। যার মধ্যে দুইবার মক্কায়, তিনবার মদিনায় এবং একবার মদিনার বাইরে তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। কখনো তিনি একা ছিলেন আবার কখনো তাঁর সঙ্গে সাহাবিদের কেউ উপস্থিত ছিলেন।
খাফিফাযী বলেন, সবগুলো হাদীস একত্রিত করলে দেখা যায় যে, জিনদের আগমনের ঘটনা ছয় বার সংঘটিত হয়েছে।
৪৬ : ৩০ قَالُوۡا یٰقَوۡمَنَاۤ اِنَّا سَمِعۡنَا كِتٰبًا اُنۡزِلَ مِنۡۢ بَعۡدِ مُوۡسٰی مُصَدِّقًا لِّمَا بَیۡنَ یَدَیۡهِ یَهۡدِیۡۤ اِلَی الۡحَقِّ وَ اِلٰی طَرِیۡقٍ مُّسۡتَقِیۡمٍ
৩০. তারা বলেছিল, হে আমাদের সম্প্রদায়! নিশ্চয় আমরা এমন এক কিতাবের পাঠ শুনেছি যা নাযিল হয়েছে মূসার পরে, এটা তার সম্মুখস্থ কিতাবকে সত্যায়ন করে এবং সত্য ও সরল পথের দিকে হেদায়াত করে।
এ থেকে জানা যায়, এসব জিন পূর্ব থেকে হযরত মূসা ও আসমানী কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান রাখতো। কুরআন শোনার পর তারা বুঝতে পারলো পূর্ববর্তী নবী-রসূলগণ যে শিক্ষা দিয়েছেন এটাও সেই শিক্ষা। তাই তারা এই কিতাব এবং এর বাহক রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লামের ওপর ঈমান আনলো।
৪৬ : ৩১ یٰقَوۡمَنَاۤ اَجِیۡبُوۡا دَاعِیَ اللّٰهِ وَ اٰمِنُوۡا بِهٖ یَغۡفِرۡ لَكُمۡ مِّنۡ ذُنُوۡبِكُمۡ وَ یُجِرۡكُمۡ مِّنۡ عَذَابٍ اَلِیۡمٍ
৩১. হে আমাদের সম্প্রদায়! আল্লাহর দিকে আহবানকারীর প্রতি সাড়া দাও এবং তাঁর উপর ঈমান আন, তিনি তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন এবং যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি হতে তোমাদেরকে রক্ষা করবেন।
নির্ভরযোগ্য হাদীসসমূহ থেকে জানা যায়, এরপর জিনদের প্রতিনিধি দল একের পর এক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লামের কাছে আসতে থাকে এবং তাঁর সাথে তাদের সামনা সামনি সাক্ষাত হতে থাকে। এ বিষয়ে হাদীস গ্রন্থ-সমূহ যেসব বর্ণনা উদ্ধৃত হয়েছে তা একত্রিত করলে জানা যায়, হিজরতের পূর্বে মক্কায় এ রকম প্রায় ছয়টি প্রতিনিধি দল এসেছিলো।
এসব প্রতিনিধি দলের একটি সম্পর্কে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ বলেনঃ একদিন রসূলুল্লাহ ﷺ সারা রাত মক্কায় অনুপস্থিত ছিলেন। আমরা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলাম এই ভেবে যে, তাঁর ওপর হয়তো আক্রমণ হয়ে থাকবে। প্রত্যুষে আমরা তাঁকে হেরা পর্বতের দিক থেকে আসতে দেখলাম। জিজ্ঞেস করায় তিনি বললেনঃ এক জিন আমাকে সঙ্গে করে নিতে এসেছিলো। আমি তার সাথে গিয়ে জিনদের একটি দলকে কুরআন শুনিয়েছি (মুসলিম, মুসনাদে আহমদ, তিরমিযী, আবু দাউদ)।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের আরো একটি বর্ণনা হচ্ছে, মক্কায় একবার নবী (সা.) সাহাবাদের (রা.) বললেনঃ আজ রাতে তোমাদের মধ্য থেকে কে আমার সাথে জিনদের সাথে সাক্ষাতের জন্য যাবে। আমি তাঁর সাথে যেতে প্রস্তুত হলাম। মক্কার উচ্চভূমি এলাকায় এক স্থানে দাগ কেটে নবী (সা.) আমাকে বললেনঃ এটা অতিক্রম করবে না। অতঃপর তিনি এগিয়ে গেলেন এবং দাঁড়িয়ে কুরআন তিলাওয়াত শুরু করলেন। আমি দেখলাম, বহু লোক তাঁকে ঘিরে আছে এবং তারা আমার ও নবীর ﷺ মাঝে আড়াল করে আছে (ইবনে জারীর, বায়হাকী, দালায়েলুন নবুওয়াত, আবু নু’আইম ইসপাহানী)।
আরো একটি ক্ষেত্রেও রাতের বেলা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে ছিলেন এবং নবী (সা.) মক্কার হাজুন নামক স্থানে জিনদের একটি মোকদ্দমায় ফয়সালা করেছিলেন। এর বহু বছর পর ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু কুফায় কৃষকদের একটি দলকে দেখে বলেছিলেনঃ আমি হাজুনে জিনদের যে দলটিকে দেখেছিলাম তারা অনেকটা এই লোকগুলোর মত ছিল (ইবনে জারীর)।
৪৬ : ৩২ وَ مَنۡ لَّا یُجِبۡ دَاعِیَ اللّٰهِ فَلَیۡسَ بِمُعۡجِزٍ فِی الۡاَرۡضِ وَ لَیۡسَ لَهٗ مِنۡ دُوۡنِهٖۤ اَوۡلِیَآءُ ؕ اُولٰٓئِكَ فِیۡ ضَلٰلٍ مُّبِیۡنٍ
৩২. আর যে আল্লাহর দিকে আহ্বানকারীর প্রতি সাড়া না দেয় তবে সে যমীনে আল্লাহকে অপারগকারী নয়। আর আল্লাহ্ ছাড়া তার কোন অভিভাবক নেই। তারাই সুস্পষ্ট বিভ্রান্তিতে রয়েছে। এমন হতেই পারে না যে, সে সুবিশাল ও সুপ্রসারিত পৃথিবীর কোথাও এমনভাবে আত্মগোপন করে নেবে যে, আল্লাহর পাকড়াও থেকে বেঁচে যাবে।
যে তাকে আল্লাহর শাস্তি থেকে বাঁচিয়ে নেবে। অর্থাৎ, না সে নিজে আল্লাহর পাকড়াও থেকে বাঁচতে পারবে, আর না অন্য কারো সাহায্যে তা সম্ভব হবে।
৪৬ : ৩৩ اَوَ لَمۡ یَرَوۡا اَنَّ اللّٰهَ الَّذِیۡ خَلَقَ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضَ وَ لَمۡ یَعۡیَ بِخَلۡقِهِنَّ بِقٰدِرٍ عَلٰۤی اَنۡ یُّحۡیِۦَ الۡمَوۡتٰی ؕ بَلٰۤی اِنَّهٗ عَلٰی كُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ
৩৩. আর তারা কি দেখে না যে, নিশ্চয় আল্লাহ্, যিনি আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন এবং এসবের সৃষ্টিতে কোন ক্লান্তি বোধ করেননি, তিনি মৃতের জীবন দান করতেও সক্ষম? অবশ্যই হ্যাঁ, নিশ্চয় তিনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান।
أَوَ لَمْ يَرَوا ‘তারা কি দেখে না’ বলতে অন্তর-দৃষ্টি দ্বারা দেখাকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, তারা কি জানে না। أَلَمْ يَعْلَمُوْا অথবা أَلَمْ يَتَفَكَّرُوْا অর্থে। অর্থাৎ, যে আল্লাহ সীমাহীন ও প্রান্তহীন বিশাল আকাশ ও সুবিস্তৃত পৃথিবীর স্রষ্টা এবং এগুলোকে সৃষ্টি করে তিনি কলান্ত হননি, তিনি কি মৃতদের পুনরায় জীবিত করতে পারবেন না? অবশ্যই পারবেন। কারণ, তিনি عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيْر এর গুণে গুণান্বিত।
ইমাম ত্বহাবী রহিমাহুল্লাহ বলেন, (خَالِقٌ بِلَا حَاجَةٍ رَازِقٌ بِلَا مؤنَةٍ) তিনি সৃষ্টিকর্তা। সৃষ্টির প্রতি তার কোনো প্রয়োজন ছাড়াই তিনি সৃষ্টি করেছেন। কোনো প্রকার ক্লান্তি ছাড়াই তিনি রিযিকদাতা।
রসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,
«يَا عِبَادِى لَوْ أَنَّ أَوَّلَكُمْ وَآخِرَكُمْ وَإِنْسَكُمْ وَجِنَّكُمْ كَانُوا عَلَى أَفْجَرِ قَلْبِ رَجُلٍ وَاحِدٍ مَا نَقَصَ ذَلِكَ مِنْ مُلْكِى شَيْئًا يَا عِبَادِى لَوْ أَنَّ أَوَّلَكُمْ وَآخِرَكُمْ وَإِنْسَكُمْ وَجِنَّكُمْ قَامُوا فِى صَعِيدٍ وَاحِدٍ فَسَأَلُونِى فَأَعْطَيْتُ كُلَّ إِنْسَانٍ مَسْأَلَتَهُ مَا نَقَصَ ذَلِكَ مِمَّا عِنْدِى إِلاَّ كَمَا يَنْقُصُ الْمِخْيَطُ إِذَا أُدْخِلَ الْبَحْرَ»
‘হে আমার বান্দারা! তোমাদের সর্বপ্রথম, সর্বশেষ, তোমাদের সমস্ত মানুষ এবং সমস্ত জিন মিলে যদি তোমাদের সর্বাধিক মুত্তাকী ব্যক্তির অন্তরে একত্রিত হয়ে যায় অর্থাৎ তোমাদের সকলের তাকওয়া যদি আল্লাহর সর্বোত্তম বান্দার তাকওয়ার মত হয়ে যায় তাহলে তা আমার রাজত্বের মধ্যে কিছুই বাড়াতে পারবে না। হে আমার বান্দারা! তোমাদের সর্বপ্রথম, সর্বশেষ, তোমাদের সমস্ত মানুষ এবং সমস্ত জিন মিলে যদি সর্বাধিক নিকৃষ্ট বান্দার অন্তরে একত্রিত হয়ে যায় অর্থাৎ তোমাদের পাপাচার ও অবাধ্যতা যদি ইবলীসের অবাধ্যতার মত হয়ে যায়, তাহলেও তা আমার রাজত্ব ও ক্ষমতার কিছুই কমাতে পারবে না। হে আমার বান্দারা! তোমাদের সর্বপ্রথম, সর্বশেষ, তোমাদের সমস্ত মানুষ এবং সমস্ত জিন মিলে যদি একটি মাঠে দাঁড়িয়ে আমার কাছে চায়, আর আমি যদি তাদের প্রত্যেকের প্রার্থনা অনুপাতে দান করি, তাহলেও আমার ভান্ডার থেকে কেবল ঐ পরিমাণই কমতে পারে যেমন সাগরে একটি সুই ঢুকালে উহা যে পরিমাণ পানি কমিয়ে দেয়। ইমাম মুসলিম এ হাদীছটি বর্ণনা করেছেন। ইমাম ত্বহাবীর উক্তি, بلا مؤنة অর্থ হলো কষ্ট ও ক্লান্তি ছাড়াই।
৪৬ : ৩৪ وَ یَوۡمَ یُعۡرَضُ الَّذِیۡنَ كَفَرُوۡا عَلَی النَّارِ ؕ اَلَیۡسَ هٰذَا بِالۡحَقِّ ؕ قَالُوۡا بَلٰی وَ رَبِّنَا ؕ قَالَ فَذُوۡقُوا الۡعَذَابَ بِمَا كُنۡتُمۡ تَكۡفُرُوۡنَ
৩৪. আর যারা কুফরী করেছে যেদিন তাদেরকে পেশ করা হবে জাহান্নামের আগুনের কাছে, (সেদিন তাদেরকে বলা হবে) এটা কি সত্য নয়? তারা বলবে, আমাদের রবের শপথ! অবশ্যই হ্যাঁ। তিনি বলবেন, সুতরাং শাস্তি আস্বাদন কর; কারণ তোমরা কুফরী করেছিলে।
সেখানে শুধু সত্য বলেই স্বীকারই করবে না, বরং নিজেদের ঐ স্বীকারোক্তির উপর কসম খেয়ে তা সুদৃঢ়ও করবে। তবে সে সময়ে এই স্বীকারোক্তি কোন উপকারে আসবে না। কারণ, প্রত্যক্ষ দেখার পর স্বীকারোক্তির কিই-বা দাম থাকতে পারে? আর স্বচক্ষে দেখার পর স্বীকার না করে কেউ কি অস্বীকার করবে?
কেননা, যখন মানার সময় ছিল, তখন মানোনি। এ শাস্তি হল সেই কুফরী ও অস্বীকারেরই প্রতিফল, যা তোমাদেরকে ভোগ করতেই হবে।
আর যারা কুফরী করেছে তাদের জন্য আছে জাহান্নামের আগুন। তাদের উপর ফায়সালা দেয়া হবে না যে, তারা মরবে এবং তাদের থেকে জাহান্নামের শাস্তিও লাঘব করা হবে না। এভাবেই আমরা প্রত্যেক অকৃতজ্ঞকে শাস্তি দিয়ে থাকি। আর সেখানে তার আর্তনাদ করে বলবে, ‘হে আমাদের রব! আমাদেরকে বের করুন, আমরা যা করতাম তার পরিবর্তে সৎকাজ করব।’ আল্লাহ বলবেন, ‘আমরা কি তোমাদেরকে এতো দীর্ঘ জীবন দান করিনি যে, তখন কেউ উপদেশ গ্রহণ করতে চাইলে উপদেশ গ্রহণ করতে পারতো? আর তোমাদের কাছে সতর্ককারীও এসেছিল। কাজেই তোমরা শাস্তি আস্বাদন কর; আর যালিমদের কোন সাহায্যকারী নেই। সূরা ফাতির: ৩৬-৩৭
৪৬ : ৩৫ فَاصۡبِرۡ كَمَا صَبَرَ اُولُوا الۡعَزۡمِ مِنَ الرُّسُلِ وَ لَا تَسۡتَعۡجِلۡ لَّهُمۡ ؕ كَاَنَّهُمۡ یَوۡمَ یَرَوۡنَ مَا یُوۡعَدُوۡنَ ۙ لَمۡ یَلۡبَثُوۡۤا اِلَّا سَاعَۃً مِّنۡ نَّهَارٍ ؕ بَلٰغٌ ۚ فَهَلۡ یُهۡلَكُ اِلَّا الۡقَوۡمُ الۡفٰسِقُوۡنَ
৩৫. অতএব আপনি ধৈর্য ধারণ করুন যেমন ধৈর্য ধারণ করেছিলেন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ রাসূলগণ। আর আপনি তাদের জন্য তাড়াহুড়ো করবেন না। তাদেরকে যে বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে তা যেদিন তারা দেখতে পাবে, সেদিন তাদের মনে হবে, তারা যেন দিনের এক দণ্ডের বেশী দুনিয়াতে অবস্থান করেনি। এ এক ঘোষণা, সুতরাং পাপাচারী সম্প্রদায়কেই কেবল ধ্বংস করা হবে।
তোমাদের পূর্ববর্তী নবী-রসূলগণ যেভাবে বছরের পর বছর ধরে ক্রমাগত ধৈর্য ও অক্লান্ত প্রচেষ্টার মাধ্যমে তাদের জাতির অসন্তুষ্টি, বিরোধিতা, বাধা-বিপত্তি ও নানা রকম উৎপীড়নের মোকাবিলা করেছেন তুমিও সে রকম করো এবং কখনো মনে এরূপ ধারণাকে স্থান দিও না যে, হয় এসব লোক অনতিবিলম্বে ঈমান আনুক, নয়তো আল্লাহ তাদের ওপর আযাব নাযিল করুক।
এখানে মক্কার কাফেরদের অশালীন আচরণের কারণে নবী করীম (সাঃ)-কে সান্ত্বনা দেওয়া হচ্ছে এবং তাঁকে ধৈর্য ধারণের নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।
৭০ : ৫ فَاصۡبِرۡ صَبۡرًا جَمِیۡلًا
কাজেই আপনি ধৈর্য ধারণ করুন পরম ধৈর্য। সূরাঃ আল-মা’আরিজঃ ৫
আর অবশ্যই যে ধৈর্য ধারণ করে। এবং ক্ষমা করে দেয়, নিশ্চয় তা দৃঢ় সংকল্পেরই কাজ। সূরা শুরাঃ ৪৩
কিয়ামতের ভয়াবহ শাস্তি দেখার পর তাদের কাছে পার্থিব জীবনটা এ রকম মনে হবে যে, সেখানে তারা কেবল দিনের একটি মুহূর্ত কাটিয়ে এসেছে।
بلاغ হল مبتدأ محذوف (ঊহ্য উদ্দেশ্য পদ)এর বিধেয় পদ। অর্থাৎ, أَيْ: هَذَا الَّذِيْ وَعَظْتَهُمْ بِهِ بَلاَغٌ তুমি তাদেরকে যে উপদেশ দিলে, তা হল ঘোষণা।
এই আয়াতেও ঈমানদারদের জন্য রয়েছে সুসংবাদ ও উৎসাহবর্ধক বাণী যে, পরকালের ধ্বংস কেবল তাদের ভাগ্যেই আছে, যারা হবে আল্লাহর অবাধ্য ও তাঁর সীমা লঙ্ঘনকারী।
২৩ : ১১২ قٰلَ كَمۡ لَبِثۡتُمۡ فِی الۡاَرۡضِ عَدَدَ سِنِیۡنَ
২৩ : ১১৩ قَالُوۡا لَبِثۡنَا یَوۡمًا اَوۡ بَعۡضَ یَوۡمٍ فَسۡـَٔلِ الۡعَآدِّیۡنَ
২৩ : ১১৪ قٰلَ اِنۡ لَّبِثۡتُمۡ اِلَّا قَلِیۡلًا لَّوۡ اَنَّكُمۡ كُنۡتُمۡ تَعۡلَمُوۡنَ
২৩ : ১১৫ اَفَحَسِبۡتُمۡ اَنَّمَا خَلَقۡنٰكُمۡ عَبَثًا وَّ اَنَّكُمۡ اِلَیۡنَا لَا تُرۡجَعُوۡنَ
২৩ : ১১৬ فَتَعٰلَی اللّٰهُ الۡمَلِكُ الۡحَقُّ ۚ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا هُوَ ۚ رَبُّ الۡعَرۡشِ الۡكَرِیۡمِ
আল্লাহ বলবেন, তোমরা যমীনে কত বছর অবস্থান করেছিলে?
তারা বলবে, আমরা অবস্থান করেছিলাম একদিন বা দিনের কিছু অংশ; সুতরাং আপনি গণনাকারীদেরকে জিজ্ঞেস করুন।
তিনি বলবেন, তোমরা অল্প কালই অবস্থান করেছিলে, যদি তোমরা জানতে!
তোমরা কি মনে করেছিলে যে আমরা তোমাদেরকে অনর্থক সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে আনা হবে না?
সুতরাং আল্লাহ মহিমান্বিত, প্রকৃত মালিক, তিনি ছাড়া কোন হক্ক ইলাহ নেই; তিনি সম্মানিত আরশের রব। সূরা মুমিনুনঃ ১১২-১১৬
‘তিনি যখন (কেয়ামতের দিন) তাদের একত্রিত করবেন, তাদের মনে হবে, (পৃথিবীতে) তারা যেন দিনের সামান্য সময় অতিবাহিত করেছে। (সেখানে) তারা একে অন্যকে চিনতে পারবে। আল্লাহর সাক্ষাৎ যারা অস্বীকার করেছে, তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং তারা সৎপথপ্রাপ্ত ছিল না। (সুরা ইউনুস: ৪৫)