أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
৪৬ : ২১ وَ اذۡكُرۡ اَخَا عَادٍ ؕ اِذۡ اَنۡذَرَ قَوۡمَهٗ بِالۡاَحۡقَافِ وَ قَدۡ خَلَتِ النُّذُرُ مِنۡۢ بَیۡنِ یَدَیۡهِ وَ مِنۡ خَلۡفِهٖۤ اَلَّا تَعۡبُدُوۡۤا اِلَّا اللّٰهَ ؕ اِنِّیۡۤ اَخَافُ عَلَیۡكُمۡ عَذَابَ یَوۡمٍ عَظِیۡمٍ
২১. আর স্মরণ করুন, আদ সম্প্রদায়ের ভাইয়ের কথা, যখন সে আহকাফে স্বীয় সম্প্রদায়কে সতর্ক করেছিল। যার আগে এবং পরেও সতর্ককারী এসেছিলেন (এ বলে) যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া কারও ইবাদাত করো না। নিশ্চয় আমি তোমাদের জন্য মহাদিনের শাস্তির আশংকা করছি।
‘আদ ও ছামূদ ছিল নূহ (আঃ)-এর পুত্র সামের বংশধর এবং নূহ আ এর পঞ্চম অথবা অষ্টম অধঃস্তন পুরুষ। নূহ আ এর পুত্র সামের পুত্র ইরাম এবং ইরামের একপুত্র ‘আদ-এর বংশধরগণ ‘আদ ঊলা’ বা প্রথম ‘আদ এবং অপর পুত্রের সন্তান ছামূদ-এর বংশধরগণ ‘আদ ছানী বা দ্বিতীয় ‘আদ বলে খ্যাত। ‘আদ ও ছামূদ উভয় গোত্রই ইরাম-এর দু’টি শাখা। সেকারণ ‘ইরাম’ কথাটি ‘আদ ও ছামূদ উভয় গোত্রের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য। এজন্য কুরআনে কোথাও ‘আদ ঊলা’ (নাজম ৫০) এবং কোথাও ‘ইরাম যাতিল ‘ইমাদ’ (ফজর ৭) শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে।
أَحْقَافٌ হল حِقْفٌ এর বহুবচন। বালির উঁচু ও লম্বা পাহাড়। কেউ কেউ এর অর্থ করেছেন, পাহাড় ও গুহা। এটা (ইয়ামানের) ‘হাযবরা-মাউত’-এর নিকটস্থ হূদ (আঃ)-এর সম্প্রদায় প্রথম আ’দ-এর এলাকার নাম। মক্কার কাফেরদের মিথ্যা ভাবার কারণে নবী (সাঃ)-এর দগ্ধ হৃদয়ে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বিগত নবীদের ঘটনাবলী উল্লেখ করা হচ্ছে।
যেহেতু কুরাইশ নেতারা তাদের শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা পোষণ করতো এবং নিজেদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও মোড়লিপনার কারণে আনন্দে আত্মহারা ছিল তাই এখানে তাদেরকে আদ কওমের কাহিনী শুনানো হচ্ছে। আরবে আদ জাতি এভাবে পরিচিত ছিল যে, প্রাচীনকালে এই ভূখণ্ডে তারা ছিল সর্বাধিক শক্তিশালী কওম।
ইবনে ইসহাকের বর্ণনা অনুসারে আদ কওমের আবাস ভূমি ওমান থেকে ইয়ামান পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। আর কুরআন মজীদ আমাদের বলছে, তাদের আদি বাসস্থান ছিল আল-আহক্বায। এখান থেকে বেরিয়ে তারা আশেপাশের দেশসমূহে ছড়িয়ে পড়েছিলো এবং দুর্বল জাতিসমূহকে গ্রাস করে ফেলেছিলো। বর্তমান কাল পর্যন্তও দক্ষিণ আরবের অধিবাসীদের মধ্যে একথা ছড়িয়ে আছে যে, এ এলাকাই ছিল আদ জাতির আবাস ভূমি। বর্তমানে “মুকাল্লা” শহর থেকে উত্তর দিকে ১২৫ মাইল দূরত্বে হাদ্রামাউতের একটি স্থানে লোকেরা হযরত হুদের (আ) মাযার তৈরী করে রেখেছে। সেটি হূদের কবর নামেই বিখ্যাত। প্রতি বছর ১৫ই শা’বান সেখানে ‘উরস’ হয়। আরবের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজার হাজার লোক সেখানে সমবেত হয়। যদিও ঐতিহাসিকভাবে এ কবরটি হূদের কবর হিসেবে প্রমাণিত নয়। কিন্তু সেখানে তা নির্মাণ করা এবং দক্ষিণ আরবের ব্যাপক জনগোষ্ঠীর তার প্রতি আকৃষ্ট হওয়া কম করে হলেও এতটুকু অবশ্যই প্রমাণ করে যে, আঞ্চলিক ঐতিহ্য এই এলাকাকেই আদ জাতির এলাকা বলে চিহ্নিত করে। এছাড়া হাদ্রামাউতে এমন কতিপয় ধ্বংসাবশেষ (Ruins) আছে যেগুলোকে আজ পর্যন্ত স্থানীয় অধিবাসীরা আবাসভূমি বলে আখ্যায়িত করে থাকে।
আহক্বাফ অঞ্চলের বর্তমান অবস্থা দেখে কেউ কল্পনা করতে পারে না যে, এক সময় এখানে জাঁকালো সভ্যতার অধিকারী একটি শক্তিশালী জাতি বাস করতো। সম্ভবত হাজার হাজার বছর পূর্বে এটা এক উর্বর অঞ্চল ছিল। পরে আবহাওয়ার পরিবর্তন একে মরুভুমিতে পরিণত করেছে। বর্তমানে এই এলাকার একটি বিশাল মরুভূমি, যার আভ্যন্তরীণ এলাকায় যাওয়ার সাহসও কারো নেই। ১৮৪৩ খৃষ্টাব্দে ব্যাভেরিয়ার একজন সৈনিক এর দক্ষিণ প্রান্ত সীমায় পৌঁছেছিলো। তার বক্তব্য হলোঃ যদি হাদ্রামাউতের উত্তরাঞ্চলের উচ্চ ভূমিতে দাঁড়িয়ে দেখা যায়, তাহলে বিশাল এই মরুপ্রান্তর এক হাজার ফুট নীচুতে দৃষ্টিগোচর হয়। এখানে মাঝে মাঝে এমন সাদা ভূমিখণ্ড যেখানে কোন বস্তু পতিত হলে তা বালুকা রাশির নীচে তলিয়ে যেতে থাকে এবং একেবারে পচে খসে যায়। আরব বেদুইনরা এ অঞ্চলকে ভীষণ ভয় করে এবং কোন কিছুর বিনিময়েই সেখানে যেতে রাজি হয় না। এক পর্যায়ে বেদুইনরা তাকে সেখানে নিয়ে যেতে রাজি না হলে সে একাই সেখানে চলে যায়। তার বর্ণনা অনুসারে এখানকার বালু একেবারে মিহিন পাউডারের মত। সে দূর থেকে তার মধ্যে একটি দোলক নিক্ষেপ করলে ৫ মিনিটের মধ্যেই তা তলিয়ে যায় এবং যে রশির সাথে তা বাধাঁ ছিল তার প্রান্ত গলে যায়। বিস্তারিত তথ্যের জন্য দেখুনঃ
-Arabia and th Isles, Harold Ingram, London, 1946
The unveiling of Arabia. R.H.Kirnan, London, 1937.
The Empty Quarter, Phiby, London, 1933.
৪৬ : ২২ قَالُوۡۤا اَجِئۡتَنَا لِتَاۡفِكَنَا عَنۡ اٰلِهَتِنَا ۚ فَاۡتِنَا بِمَا تَعِدُنَاۤ اِنۡ كُنۡتَ مِنَ الصّٰدِقِیۡنَ
২২. তারা বলেছিল, তুমি কি আমাদেরকে আমাদের উপাস্যগুলো থেকে নিবৃত্ত করতে এসেছ? তুমি যদি সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাক তবে আমাদেরকে যার ওয়াদা করছি তা নিয়ে আস।
আদ জাতির লোকেরা শক্তি মদমত্ত হয়ে ‘আমাদের চেয়ে শক্তিশালী আর কে আছে’ বলে ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করতে শুরু করেছিল।যেমন কুর’আনে বলা হয়েছেঃ
তাদের অবস্থা ছিল এই যে, পৃথিবীতে তারা অন্যায়ভাবে নিজেদেরকে বড় মনে করে বসেছিলো এবং বলতে শুরু করেছিল : আমাদের চেয়ে অধিক শক্তিশালী আর কে আছে ? তারা একথা বুঝলোনা যে, যে আল্লাহ তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন , তিনি তাদের অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী৷ তারা আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকারই করে চললো৷ হামীম সাজদাহ ১৫
তারা আল্লাহর ইবাদত পরিত্যাগ করে নূহ (আঃ)-এর আমলে ফেলে আসা মূর্তিপূজার শিরক-এর পুনরায় প্রচলন ঘটালো।
لِتَأْفِكَنَا এর অর্থ لِتَصْرِفَنَا অথবা لِتَمْنَعَنَا বা لِتُزِيْلَنَا সবগুলোরই অর্থ প্রায় কাছাকাছি; যাতে তুমি আমাদেরকে আমাদের উপাস্যদের পূজা হতে ফিরিয়ে দাও, থামিয়ে দাও, সরিয়ে দাও, নিবৃত্ত কর।
আর তারা বলে, যদি তোমরা সত্যবাদী হও, (তবে বল) এ প্রতিশ্রুতি কবে ফলবে? সূরা ইউনুসঃ ৪৮
“যারা এটাতে ঈমান রাখে না তারাই তা ত্বরান্বিত করতে চায়। আর যারা ঈমান এনেছে তারা তা থেকে ভীত থাকে এবং তারা জানে যে, তা অবশ্যই সত্য [সূরা আশ-শূরা: ১৮] আরও বলেন,
“আর তারা আপনাকে শাস্তি ত্বরান্বিত করতে বলে, অথচ আল্লাহ তার প্রতিশ্রুতি কখনো ভংগ করেন না। আপনার রব-এর কাছে একদিন তোমাদের গণনার হাজার বছরের সমান।” [সূরা আল-হজ: ৪৭]
আরও বলেন, “তারা আপনাকে শাস্তি ত্বরান্বিত করতে বলে, জাহান্নাম তো কাফিরদেরকে পরিবেষ্টন করবেই।” [সূরা আল-আনকাবুত: ৫৪]
৪৬ : ২৩ قَالَ اِنَّمَا الۡعِلۡمُ عِنۡدَ اللّٰهِ ۫ۖ وَ اُبَلِّغُكُمۡ مَّاۤ اُرۡسِلۡتُ بِهٖ وَ لٰكِنِّیۡۤ اَرٰىكُمۡ قَوۡمًا تَجۡهَلُوۡنَ
২৩. তিনি বললেন, এ জ্ঞান তো শুধু আল্লাহরই কাছে। আর আমি যা নিয়ে প্রেরিত হয়েছি শুধু তা-ই তোমাদের কাছে প্রচার করি, কিন্তু আমি দেখছি তোমরা এক মুর্খ সম্প্রদায়।
কবে তোমাদের ওপর আযাব আসবে তা শুধু আল্লাহই জানেন। তোমাদের ওপর কবে আযাব নাযিল করতে হবে এবং কতদিন পর্যন্ত তোমাদের অবকাশ দেয়া হবে তার ফয়সালা করা আমার কাজ নয়। তিনি তাঁর ইচ্ছানুযায়ী ফায়সালা করেন। আমার কাজ কেবল বার্তা পৌঁছে দেওয়া।
এক তো কুফরীর উপর অবিচল থাকছ। আর দ্বিতীয়তঃ আমার নিকট এমন জিনিসের দাবি করছ, যা আমার এখতিয়ারাধীন নয়। নিজের নির্বুদ্ধিতার কারণে আমার এই সতর্কীকরণকে তোমরা তামাশার বস্তু বলে মনে করছো এবং খেলার সামগ্রীর মত আযাবের দাবী করে চলেছো। আল্লাহর আযাব যে কী ভয়াবহ জিনিস সে ধারণা তোমাদের নেই। তোমাদের আচরণের কারণে তা যে তোমাদের কাছে এসে গেছে সে বিষয়েও তোমরা অবগত নও।
৪৬ : ২৪ فَلَمَّا رَاَوۡهُ عَارِضًا مُّسۡتَقۡبِلَ اَوۡدِیَتِهِمۡ ۙ قَالُوۡا هٰذَا عَارِضٌ مُّمۡطِرُنَا ؕ بَلۡ هُوَ مَا اسۡتَعۡجَلۡتُمۡ بِهٖ ؕ رِیۡحٌ فِیۡهَا عَذَابٌ اَلِیۡمٌ
২৪. অতঃপর যখন তারা তাদের উপত্যকার দিকে মেঘ আসতে দেখল। তখন বলতে লাগল, এ তো মেঘ আমাদেরকে বৃষ্টি দান করবে। না, বরং এটাই তো তা, যা তোমরা ত্বরান্বিত করতে চেয়েছ, এক ঝড়, এতে রয়েছে। যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।
এখানে এ বিষয়টি সুস্পষ্ট নয় যে, কে তাদেরকে এই জবাব দিয়েছিলো। বক্তব্যের ধরন থেকে আপনাআপনি এ ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, সেই সময় বাস্তব পরিস্থিতি তাদেরকে কার্যত যে জবাব দিয়েছিলো এটা ছিল সেই জবাব। তারা মনে করেছিলো এটা বৃষ্টির মেঘ, তাদের উপত্যকাসমূহ বর্ষণসিক্ত করার জন্য আসছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা ছিল প্রচণ্ড ঝড়-তুফান, যা তাদেরকে ধ্বংস করার জন্য এগিয়ে আসছিলো।
দীর্ঘদিন ধরে তাদের ওখানে বৃষ্টি হয়নি। আকাশে উত্থিত মেঘমালা দেখে আনন্দিত হল যে, এবার বৃষ্টি হবে। মেঘকে عارض (দিগন্তপ্রসারী) এই কারণে বলা হয় যে, তা আকাশের দিগন্তে প্রসারিত হয়।
এ কথা হূদ (আঃ) তাদেরকে বললেন যে, এটা শুধু মেঘ নয়, যেমনটি তোমরা ভাবছ। বরং এটা সেই আযাব, যার সত্বর আসার দাবি তোমরা করছিলে।
যে বাতাস দ্বারা এই জাতির ধ্বংস সাধিত হয়, তা ঐ মেঘের সাথেই উঠেছিল এবং তা সেখান থেকেই বের হয়েছিল। আল্লাহর ইচ্ছায় তাদেরকে এবং তাদের প্রত্যেক জিনিসকে বিনাশপ্রাপ্ত করে দেওয়া হল। এই জন্য হাদীসে এসেছে যে, একদা আয়েশা (রাঃ) রসূল (সাঃ)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, লোকেরা মেঘ দেখে আনন্দিত হয় যে, বৃষ্টি হবে। কিন্তু এর বিপরীত আপনার মুখমন্ডলে চিন্তা ও অস্থিরতার লক্ষণসমূহ লক্ষ্য করা যায়? তিনি বললেন, ‘‘আয়েশা! এই মেঘে যে আযাব নেই তার কি কোন নিশ্চয়তা আছে? এক জাতিকে তো বাতাসের আযাব দ্বারা ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। তারাও তো মেঘ দেখে বলেছিল, এই মেঘ আমাদের উপর বৃষ্টি বষর্ণ করবে। (বুখারীঃ তাফসীর সূরা আহক্বাফ, মুসলিমঃ কিতাবুস্ স্বালাত)
কওমে ‘আদ-এর উপরে আপতিত গযব-এর বিবরণ
মুহাম্মাদ ইবনু ইসহাক বলেন, কওমে ‘আদ-এর অমার্জনীয় হঠকারিতার ফলে প্রাথমিক গযব হিসাবে উপর্যুপরি তিন বছর বৃষ্টিপাত বন্ধ থাকে। তাদের শস্যক্ষেত সমূহ শুষ্ক বালুকাময় মরুভূমিতে পরিণত হয়।
বাগ-বাগিচা জ্বলে-পুড়ে ছারখার হয়ে যায়। এতদসত্ত্বেও তারা শিরক ও মূর্তিপূজা ত্যাগ করেনি। কিন্তু অবশেষে তারা বাধ্য হয়ে আল্লাহর কাছে বৃষ্টি প্রার্থনা করে।
তখন আসমানে সাদা, কালো ও লাল মেঘ দেখা দেয় এবং গায়েবী আওয়ায আসে যে, তোমরা কোনটি পসন্দ করো? লোকেরা কালো মেঘ কামনা করল। তখন কালো মেঘ এলো। লোকেরা তাকে স্বাগত জানিয়ে বলল, هَذَا عَارِضٌ مُّمْطِرُنَا ‘এটি আমাদের বৃষ্টি দেবে’। জবাবে তাদের নবী হূদ (আঃ) বললেন,
‘বরং এটা সেই বস্ত্ত যা তোমরা তাড়াতাড়ি চেয়েছিলে। এটা এমন বায়ু যার মধ্যে রয়েছে মর্মন্তুদ আযাব’। ‘সে তার প্রভুর আদেশে সবাইকে ধ্বংস করে দেবে…’। আহক্বাফ ৪৬/২৪, ২৫; ইবনু কাছীর, সূরা আ‘রাফ ৭১।
ফলে অবশেষে পরদিন ভোরে আল্লাহর চূড়ান্ত গযব নেমে আসে। সাত রাত্রি ও আট দিন ব্যাপী অনবরত ঝড়-তুফান বইতে থাকে। মেঘের বিকট গর্জন ও বজ্রাঘাতে বাড়ী-ঘর সব ধ্বসে যায়, প্রবল ঘুর্ণিঝড়ে গাছ-পালা সব উপড়ে যায়, মানুষ ও জীবজন্তু শূন্যে উত্থিত হয়ে সজোরে যমীনে পতিত হয় (ক্বামার ৫৪/২০; হাক্বক্বাহ ৬৯/৬-৮) এবং এভাবেই শক্তিশালী ও সুঠাম দেহের অধিকারী বিশালবপু ‘আদ জাতি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। আল্লাহ বলেন, এছাড়াও তাদের জন্য রয়েছে চিরস্থায়ী অভিসম্পাৎ দুনিয়া ও আখেরাতে (হূদ ১১/৬০)।
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে যে, যখন প্রবল হাওয়া চলত, তখন তিনি (সাঃ) এই দু’আ পড়তেন।
(اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ خَيْرَهَا وَخَيْرَ مَا فِيهَا وَخَيْرَ مَا أُرْسِلَتْ بِهِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّهَا وَشَرِّ مَا فِيهَا وَشَرِّ مَا أُرْسِلَتْ بِهِ)
(অর্থাৎ, হে আল্লাহ! নিশ্চয় আমি এর কল্যাণ, এর মধ্যে যা আছে তার কল্যাণ এবং যার সাথে এ প্রেরিত হয়েছে তার কল্যাণ তোমার নিকট প্রার্থনা করছি। আর এর অনিষ্ট, এর মধ্যে যা আছে তার অনিষ্ট এবং যার সাথে এ প্রেরিত হয়েছে তার অনিষ্ট হতে পানাহ চাচ্ছি।) আর যখন আকাশে মেঘ ঘন হয়ে যেত, তখন তাঁর রঙ পরিবর্তন হয়ে যেত, তাঁর উপর ভয়ের ভাব সৃষ্টি হত এবং এর ফলে তিনি অস্থির হয়ে পড়তেন। কখনো বাইরে আসতেন, আবার কখনো ভিতরে প্রবেশ করতেন। কখনো আগে যেতেন, আবার কখনো পিছনে। অতঃপর যখন বৃষ্টি বর্ষণ হত, তখন তিনি স্বস্তি লাভ করতেন। (মুসলিম, উক্ত অধ্যায়)
৪৬ : ২৫ تُدَمِّرُ كُلَّ شَیۡءٍۭ بِاَمۡرِ رَبِّهَا فَاَصۡبَحُوۡا لَا یُرٰۤی اِلَّا مَسٰكِنُهُمۡ ؕ كَذٰلِكَ نَجۡزِی الۡقَوۡمَ الۡمُجۡرِمِیۡنَ
২৫. এটা তার রবের নির্দেশে সব কিছুকে ধ্বংস করে দেবে। অতঃপর তাদের পরিণাম এ হল যে, তাদের বসতিগুলো ছাড়া আর কিছুই দেখা গেল না। এভাবে আমরা অপরাধী সম্প্রদায়কে প্রতিফল দিয়ে থাকি।
সূরা হা-ক্বক্বাহ ৭-৮ আয়াতে আল্লাহ বলেন,
‘তাদের উপরে প্রচন্ড ঝঞ্ঝাবায়ু প্রবাহিত হয়েছিল সাত রাত্রি ও আট দিবস ব্যাপী অবিরতভাবে। (হে মুহাম্মাদ!) তুমি দেখলে দেখতে পেতে যে, তারা অসার খর্জুর কান্ডের ন্যায় ভূপাতিত হয়ে রয়েছে। ‘তুমি (এখন) তাদের কোন অস্তিত্ব দেখতে পাও কি? (হা-ক্বক্বাহ ৬৯/৭-৮)।
৪৬ : ২৬ وَ لَقَدۡ مَكَّنّٰهُمۡ فِیۡمَاۤ اِنۡ مَّكَّنّٰكُمۡ فِیۡهِ وَ جَعَلۡنَا لَهُمۡ سَمۡعًا وَّ اَبۡصَارًا وَّ اَفۡـِٕدَۃً ۫ۖ فَمَاۤ اَغۡنٰی عَنۡهُمۡ سَمۡعُهُمۡ وَ لَاۤ اَبۡصَارُهُمۡ وَ لَاۤ اَفۡـِٕدَتُهُمۡ مِّنۡ شَیۡءٍ اِذۡ كَانُوۡا یَجۡحَدُوۡنَ ۙ بِاٰیٰتِ اللّٰهِ وَ حَاقَ بِهِمۡ مَّا كَانُوۡا بِهٖ یَسۡتَهۡزِءُوۡنَ
২৬. আর অবশ্যই আমরা তাদেরকে যেভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম তোমাদেরকে সেভাবে প্রতিষ্ঠিত করিনি; আর আমরা তাদেরকে দিয়েছিলাম কান, চোখ ও হৃদয়; অতঃপর তাদের কান, চোখ ও হৃদয় তাদের কোন কাজে আসেনি; যখন তারা আল্লাহর আয়াতসমূহকে অস্বীকার করেছিল। আর যা নিয়ে তারা ঠাট্টা-বিদ্রুপ করত, তা-ই তাদেরকে পরিবেষ্টন করল।
মক্কাবাসীদেরকে সম্বোধন করে বলা হচ্ছে যে, তোমরা এমন কি শক্তিমান? তোমাদের পূর্বের জাতিগণ, যাদেরকে আমি ধ্বংস করে দিয়েছি, তারা তো শক্তি ও প্রতাপে তোমাদের চাইতে অনেক বেশী ছিল। কিন্তু যখন তারা আল্লাহ প্রদত্ত যোগ্যতা (কান, চোখ ও অন্তর)-কে সত্য শোনার, দেখার ও বুঝার কাজে ব্যবহার করল না, তখন পরিশেষে আমি তাদেরকে ধ্বংস করে দিলাম এবং এ জিনিসগুলো তাদের কোনই উপকারে এল না।
যে শাস্তিকে তারা অসম্ভব মনে করে ঠাট্টাচ্ছলে বলত যে, নিয়ে এস দেখি তোমার আযাব, সে আযাব এসে তাদেরকে এমনভাবে ঘিরে ধরল যে, তা থেকে আর বের হতে পারেনি।
