সূরা যুখরুফঃ ৫ম রুকু (৪৬-৫৬)আয়াত

মক্কার কুরাইশরা বলেছিল যে, আল্লাহ যদি কাউকে নবী বানিয়ে প্রেরণ করতেন, তবে মক্কা ও তায়েফের কোন এমন ব্যক্তিকে প্রেরণ করতেন, যে হত প্রতিপত্তি ও বিত্তশালী এবং সুউচ্চ মর্যাদার অধিকারী। যেমন, ফিরআউন মূসা (আঃ)-এর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বলেছিল, ‘‘আমি মূসা অপেক্ষা উত্তম। এ তো আমার থেকে (মর্যাদায়) অনেক কম। এ তো পরিষ্কারভাবে কথা বলতেও পারে না।’’ যে কথা পরে আসছে। সম্ভবতঃ উভয় অবস্থার মধ্যে সাদৃশ্য থাকার কারণে এখানে মূসা (আঃ) ও ফিরআউনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে। এ ছাড়া এতে নবী কারীম (সাঃ)-এর জন্য সান্ত্বনারও একটি দিক রয়েছে যে, মূসা (আঃ)-কেও বহু পরীক্ষার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করতে হয়েছে। সে ধৈর্য ও দৃঢ় সংকল্প অবলম্বন করেছিল। অনুরূপ তুমিও মক্কার কাফেরদের দেওয়া কষ্ট ও অভদ্র ব্যবহারে দুঃখিত না হয়ে ধৈর্য ও হিম্মত বজায় রাখ। পরিশেষে তুমিও মূসা (আঃ)-এর মত বিজয়ী ও সফল হবে। আর মক্কাবাসীরা ফিরআউনের মতই ব্যর্থ ও অসফল হবে।

এখানে এ ঘটনাটা তিনটি উদ্দেশ্য বর্ণনা করা হয়েছে।

এক-আল্লাহ তাঁর নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পাঠিয়ে আরববাসীদের বর্তমানে একটি সুযোগ দান করেছেন। যখনই আল্লাহ‌ কোন দেশ ও জাতির কাছে তাঁর নবী পাঠিয়ে তাদের এ ধরনের সুযোগ দান করেন কিন্তু সে জাতি তার মর্যাদা ও মূল্য দেয়া এবং তা থেকে উপকৃত হওয়ার পরিবর্তে ফিরাউন ও তার কওম যেমন নির্বুদ্ধিতার কাজ করেছিলো তেমন কাজ করে বসে। তখন তারা এমন পরিণামের সম্মুখীন হয় যা ইতিহাসে শিক্ষণীয় উদাহরণ হয়ে আছে।

দুই-যেভাবে বর্তমানে মক্কার কুরাইশ গোত্রের কাফেররা তাদের নেতাদের তুলনায় মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নগণ্য ও হেয় মনে করছে ফিরাউনও তার বাদশাহী, জাঁকজমক, প্রতিপত্তি এবং ধন-সম্পদের গর্বে গর্বিত হয়ে মূসা আলাইহিস সালামকে ঠিক তেমনি নগণ্য ও হেয় মনে করেছিলো। কিন্তু মহান আল্লাহর ফায়সালা ছিল ভিন্ন রকম। এবং বাস্তবে হেয় ও নগণ্য কে ছিলো সেই ফায়সালাই শেষ পর্যন্ত তা বুঝিয়ে দিয়েছে।

তিন-আল্লাহর নিদর্শনসমুহের সাথে বিদ্রূপ করা এবং তাঁর সতর্ক বাণীসমূহের বিরুদ্ধে শক্তিমত্তা প্রদর্শন করা কোন ছোটখাট ব্যাপার নয়, বরং অত্যন্ত চড়া মূল্য দাবী করার মত ব্যাপার। যারা এর পরিণাম ভোগ করেছে তাদের উদাহরণ থেকে যদি শিক্ষা গ্রহণ না করো তাহলে নিজেও একদিন সেই পরিণাম ভোগ করবে।

এর অর্থ প্রাথমিক যেসব নিদর্শন নিয়ে হযরত মূসা আলাইহিস সালাম ফেরাউনের দরবারে গিয়েছিলেন। অর্থাৎ লাঠি ও ‘ইয়াদে বায়দা’ বা আলোকোজ্জ্বল হাত (ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল আ’রাফ, টীকা ৮৭ থেকে ৮৯; ত্বাহা, টীকা ১২, ১৩, ২৯, ৩০; আশ শু’আরা, টীকা ২৬-২৯; আন নামল, টীকা ১৬; আল কাসাস, টীকা ৪৪ ও ৪৫)।

মূসা (আঃ) যখন ফিরআউন ও তার সভাসদদেরকে তাওহীদের দাওয়াত দিলেন, তখন তারা তাঁর রসূল হওয়ার দলীল তলব করল। তিনি তখন সেই সব দলীল ও মু’জিযাগুলি পেশ করলেন, যা আল্লাহ তাঁকে দিয়ে ছিলেন। সেগুলো দেখে তারা উপহাস ও বিদ্রূপ করল এবং বলল যে, এগুলো কি এমন জিনিস? এগুলো তো যাদুর মাধ্যমে আমরাও পেশ করতে পারি।

এই নিদর্শনগুলো হল সেই নিদর্শন, যা তুফান, পঙ্গপাল, উকুন, ব্যাঙ এবং রক্ত ইত্যাদির আকারে একের পর এক তাদেরকে দেখানো হয়েছিল। যার উল্লেখ সূরা আ’রাফের ১৩৩-১৩৫ আয়াতে উল্লিখিত হয়েছে। পরে আগত প্রত্যেক নিদর্শন পূর্বের চেয়ে আরো বৃহত্তর ছিল এবং এর ফলে মূসা (আঃ)-এর সত্যতা আরো বেশী সুস্পষ্ট হয়ে যেত।

 এই নিদর্শনসমূহ অথবা আযাব দেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল, যাতে তারা নবীকে মিথ্যা মনে করা থেকে বিরত হয়।

নিদর্শনগুলো ছিলঃ

একঃ জনসমক্ষে যাদুকরদের সাথে আল্লাহর নবীর মোকাবিলা হয় এবং তারা পরাজিত হয়ে ঈমান আনে। বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল আ’রাফ, টীকা ৮৮ থেকে ৯২; ত্বাহা, টীকা ৩০ থেকে ৫০; আশ শু’আরা, টীকা ২৯ থেকে ৪০।

দুইঃ হযরত মূসার ভবিষ্যত বাণী অনুসারে মিসর দেশে প্রচণ্ড দুর্ভিক্ষ হয় এবং হযরত মূসার দোয়ার কারণেই তা দূরীভূত হয়।

তিনঃ তাঁর ভবিষ্যত বাণীর পর গোটা দেশে ভয়াবহ বৃষ্টি, শিলা বৃষ্টি, বজ্রপাত এবং বিদ্যুৎ বর্ষণসহ প্রবল ঝড়, তুফান আসে, যা জনপদ ও কৃষি ক্ষেত্র ধ্বংস করে ফেলে। বিপদও তাঁর দোয়াতেই কেটে যায়।

চারঃ তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী অনুসারে গোটা দেশে পঙ্গপালের ভয়ানক আক্রমণ হয় এবং এ বিপদও ততক্ষণ পর্যন্ত দূরীভূত হয়নি যতক্ষন না তিনি তা দূরীভূত হওয়ার জন্য দোয়া করেছেন।

পাঁচঃ তাঁর ঘোষণা অনুযায়ী গোটা দেশে উকুন ও কীটানু ছড়িয়ে পড়ে যার কারণে একদিকে মানুষ ও জীবজন্তু মারাত্মক কষ্টে পড়ে, অপর দিকে খাদ্য শস্যের গুদাম ধ্বংস হয়ে যায়। এ আযাব কেবল তখনই দূরীভূত হয় যখন কাকুতি-মিনতি করে হযরত মূসার দ্বারা দোয়া করানো হয়।

ছয়ঃ হযরত মূসা (আ) এর পূর্ব-সতর্ক বাণী অনুসারে গোটা দেশের আনাচে-কানাচে ব্যাঙের সয়লাব আসে যার ফলে গোটা জনপদের প্রায় দমবদ্ধ হওয়ার মত অবস্থা হয়। আল্লাহর এ সৈনিকরাও হযরত মূসার দোয়া ছাড়া ফিরে যায়নি।

সাতঃ ঠিক তাঁর ঘোষণা মোতাবেক রক্তের আযাব দেখা দেয়। যার ফলে সমস্ত নদী নালা, কূপ, ঝর্ণাসমূহ, দীঘি এবং হাউজের পানি রক্তে পরিণত হয়, মাছ মরে যায়, সর্বত্র পানির আধারে দূর্গন্ধ সৃষ্টি হয় এবং পুরো এক সপ্তাহ পর্যন্ত মিশরের মানুষ পরিষ্কার পানির জন্য তড়পাতে থাকে। এ বিপদও কেবল তখনই কেটে যায় যখন তা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য হযরত মূসাকে দিয়ে দোয়া করানো হয়।

বলা হয় যে, সে যুগে যাদু কোন নিন্দনীয় জিনিস ছিল না। বড় জ্ঞানীদেরকে সম্মানার্থে ‘যাদুকর’ বলে সম্বোধন করা হত। এ ছাড়া সমস্ত মু’জিযা এবং নিদর্শনের ব্যাপারে তাদের ধারণা ছিল যে, এ সব হল মূসা (আঃ)-এর যাদুর ভেলকি। তাই তারা তাঁকে ‘যাদুকর’ বলে সম্বোধন করল।

 ‘‘তোমার প্রতিপালক’’ এ কথা তারা তাদের শিরকীয় ধারণার ভিত্তিতে বলেছিল। কারণ, মুশরিকদের বিভিন্ন প্রতিপালক ও উপাস্য হত। অর্থাৎ, ওহে মূসা! তোমার প্রতিপালক দ্বারা এ কাজ করিয়ে নাও!

 অর্থাৎ, আমরা ঈমান আনলে আযাব প্রত্যাহার করার অঙ্গীকার।

 যদি এ আযাব প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়, তবে আমরা তোমাকে সত্য রসূল বলে মেনে নেব

এবং তোমার প্রতিপালকেরই ইবাদত করব। কিন্তু প্রত্যেকবার তারা নিজেদের অঙ্গীকার ভঙ্গ করত। যেমন, পরের আয়াতে এসেছে এবং সূরা আ’রাফেও এ কথা উল্লিখিত হয়েছে।

ফেরাউন ও তার কওমের নেতাদের হঠকারিতার মাত্রা পরিমাপ করা যায় এভাবে যে, যখন তারা আল্লাহর আযাবে অতিষ্ঠ হয়ে তা থেকে মুক্তি লাভের জন্য মূসাকে দিয়ে দোয়া করতে চাইতো তখনও তারা তাঁকে নবী বলে সম্বোধন না করে যাদুকর বলেই সম্বোধন করতো। অথচ যাদুর তাৎপর্য তারা জানতো না, তা নয়। তাছাড়া একথাও তাদের কাছে গোপন ছিল না যে, এসব অদ্ভূত কর্মকাণ্ড কোন প্রকার যাদুর সাহায্যে সংগঠিত হতে পারে না। একজন যাদুকর বড় জোর যা করতে পারে তা হচ্ছে, একটি সীমিত পরিসরে যেসব মানুষ তার সামনে বর্তমান থাকে সে তাদের মন-মস্তিষ্কের ওপর এমন প্রভাব বিস্তার করে যার ফলে তারা মনে করতে থাকে, পানি রক্তে পরিণত হয়েছে অথবা ব্যাঙ উপছে পড়ছে কিংবা পঙ্গপালের ঝাঁক ক্রমে এগিয়ে আসছে। এই সীমিত পরিসরের মধ্যেও পানি বাস্তবিকই রক্তে পরিণত হবে না। বরং ঐ পরিসর থেকে মুক্ত হওয়া মাত্রই পানি পানিতে পরিণত হবে। বাস্তবে কোন ব্যাঙ সৃষ্টি হবে না। আপনি যদি সেটিকে ধরে ঐ গণ্ডির বাইরে নিয়ে যান তাহলে আপনার হাতে ব্যাঙের বদলে থাকবে শুধু বাতাস। পঙ্গপালের ঝাকও হবে শুধু মনের কল্পনা। তা কোন ক্ষেতের ফসল ধ্বংস করতে পারবে না। এখন কথা হলো, একটা গোটা দেশ দুর্ভিক্ষ কবলিত হওয়া, কিংবা সমগ্র দেশের নদী-নালা, ঝর্ণা এবং কূপসমূহ রক্তে পরিপূর্ণ হওয়া অথবা হাজার হাজার মাইল এলাকা জুড়ে পঙ্গপালের আক্রমণ হওয়া এবং লাখ লাখ একর জমির ফসল ধ্বংস করা। আজ পর্যন্ত কখনো কোন যাদুকর এ কাজ করতে সক্ষম হয়নি এবং যাদুর জোরে কখনো তা সম্ভবও নয়। কোন রাজা-বাদশাহর কাছে এমন কোন যাদুকর থাকলে তার সেনাবাহিনী রাখার এবং যুদ্ধের বিপদাপদ সহ্য করার প্রয়োজনই হতো না। যাদুর জোরেই সে গোটা দুনিয়াকে পদানত করতে পারতো। যাদুকরদের এমন শক্তি থাকলে তারা কি রাজা-বাদশাহদের অধীনে চাকরি করতো? তারা নিজেরাই কি বাদশাহ হয়ে বসতো না?

মুফাসসিরগণ এখানে সাধারণভাবে একটি জটিলতার সম্মুখীন হয়েছেন। অর্থাৎ আযাব থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ফেরাউন ও তার সভাসদরা হযরত মূসার কাছে যখন দোয়ার জন্য আবেদন করতো তখনো তারা তাকে ‘হে যাদুকর’ বলে সম্বোধন করতো কি করে? বিপদের সময় সাহায্য প্রার্থনাকারী তো তোষামোদ করে থাকে, নিন্দাবাদ নয়। এ কারণে তারা এই বলে ব্যাখ্যা করেছেন যে, সে যুগে মিসরবাসীদের দৃষ্টিতে যাদু অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ বিদ্যা ছিল। ‘হে যাদুকর’ বলে তারা প্রকৃতপক্ষে হযরত মূসার নিন্দাবাদ করতো না, বরং তাদের মতে যেন সম্মানের সাথে তাঁকে ‘হে জ্ঞানী’ বলে সম্বোধন করতো। কিন্তু এ ব্যাখ্যা পুরোপুরিই ভুল। কারণ কুরআনের অন্যান্য স্থানে যেখানেই ফেরাউন কর্তৃক মূসাকে যাদুকর এবং তাঁর পেশকৃত মু’জিযাসমূহকে যাদু বলে আখ্যায়িত করার কথা উদ্ধৃত হয়েছে সেখানেই নিন্দাবাদ ও হেয় প্রতিপন্ন করার অভিপ্রায়ই সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে এবং স্পষ্ট বুঝা গেছে, তাদের কাছে যাদু ছিল একটি মিথ্যা জিনিস। আর এ কারণেই তারা হযরত মূসার বিরুদ্দে যাদুর অভিযোগ আরোপ করে তাঁকে নবুওয়াতের মিথ্যা দাবীদার বলে আখ্যায়িত করতো। তাই এক্ষেত্রে ‘যাদুকর’ কথাটি হঠাৎ করে তাদের দৃষ্টিতে সম্মানিত আলেম বা বিদ্বানের উপাধি হয়ে যাবে তা গ্রহণযোগ্য নয়। এখন প্রশ্ন হলো, দোয়ার জন্য আবেদন জানানোর সময়ও যখন তারা প্রকাশ্যে হযরত মূসার অমর্যাদা করতো তখন তিনি তাদের আবেদন গ্রহণই বা করতেন কেন? এর জবাব হচ্ছে, হযরত মূসার লক্ষ্য ছিল আল্লাহর নির্দেশে ঐ সব লোকদের কাছে ‘ইতমামে হুজ্জত’ বা যুক্তি-প্রমাণের চূড়ান্ত করা। আযাব দূরীভূত করার জন্য তাঁর কাছে তাদের দোয়ার আবেদন করাই প্রমাণ করছিল যে, আযাব কেন আসছে কোথা থেকে আসছে এবং কে তা দূর করতে পারে মনে মনে তারা তা উপলব্ধি করে ফেলেছিলো। কিন্তু তা সত্ত্বেও যখন তারা হঠকারিতা করে তাঁকে যাদুকর বলতো এবং আযাব কেটে যাওয়ার পর সঠিক পথ গ্রহণের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করতো তখন মূলত তারা আল্লাহর নবীর কোন ক্ষতি করতো না। বরং নিজেদের বিরুদ্ধে মোকদ্দমাকে আরো বেশি জোরালো করে তুলতো। আর আল্লাহ‌ তাঁর ফায়সালা করে দিয়েছিলেন তাদের পুরোপুরি মূলোৎপাটন করার মাধ্যমে। তাঁকে তাদের যাদুকর বলার অর্থ এ নয় যে, তারা সত্যিই মন থেকেও বিশ্বাস করতো, তাদের ওপর যেসব আযাব আসছে তা যাদুর জোরেই আসছে। তারা মনে মনে ঠিকই উপলব্ধি করতো যে এগুলো সবই বিশ্ব-জাহানের রব আল্লাহর নিদর্শন। কিন্তু জেনে শুনেও তা অস্বীকার করতো। সূরা নামলে এ কথাটিই বলা হয়েছেঃ

আরবীوَجَحَدُوا بِهَا وَاسْتَيْقَنَتْهَا أَنْفُسُهُمْ ظُلْمًا وَعُلُوًّا (ايت : 14)

“তারা মনে মনে বিশ্বাস করে ফেলেছিলো। কিন্তু জুলুম ও অহংকারের বশবর্তী হয়ে এসব নিদর্শন অস্বীকার করতো।”সূরা নমলঃ১৪

গোটা জাতির মধ্যে ঘোষণার বাস্তব রূপ সম্ভবত এই ছিল যে, ফেরাউন তার দরবারে সাম্রাজ্যের উচ্চ পদস্থ কর্মচারি ও জাতির বড় বড় নেতাদের উদ্দেশ্য করে যে কথা বলে ছিলো ঘোষকদের মাধ্যমে তা গোটা দেশের সমস্ত শহর ও জনপদে প্রচার করা হয়েছিলো। সেই যুগে তার কাছে তো তোষামুদে প্রেস, নিজের পোষা সংবাদ সরবরাহ প্রতিষ্ঠান এবং সরকারী বেতার ছিল না যে তার মাধ্যমে ঘোষণা করতো।

যখন মূসা (আঃ) এমন কয়েকটি নিদর্শন পেশ করেছিলেন, যার পরেরটি ছিল প্রথমটির চেয়ে আরো বৃহত্তর, তখন ফিরআউন নিজ জাতির মূসা (আঃ)-এর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ার আশঙ্কা বোধ করল। তাই সে তার পরাজয়ের গ্লানিকে ঢাকার জন্য এবং অব্যাহতভাবে স্বীয় জাতিকে ধোকায় পতিত রাখার জন্য নতুন ফন্দি এই আঁটল যে, স্বীয় সার্বভৌমত্ব ও প্রশাসনিক ক্ষমতার কথা উল্লেখ করে মূসা (আঃ)-এর অমর্যাদা ও অপদস্থতাকে প্রকাশ করা হোক, যাতে জাতি তার প্রশাসনিক ক্ষমতাকে ভয় করে।

 এ থেকে বুঝানো হয়েছে নীল-নদ অথবা তার কিছু শাখা-প্রশাখা (অববাহিকা) যা ফিরআউনের মহলের নীচে দিয়ে অতিক্রম করত।পরিস্থিতি দেখে ফেরাউন বলে উঠেছিলোঃ হতভাগারা, এ দেশে কার রাজত্ব চলছে এবং নীল নদ থেকে উৎপন্ন যে সব নদী-নালার ওপর তোমাদের গোটা আর্থিক কায়-কারবার নির্ভরশীল তা কার নির্দেশে প্রবাহিত হচ্ছে তা তোমরা চোখে দেখতে পাও না? এসব উন্নয়নমূলক কাজ তো করেছি আমি এবং আমার খান্দান আর তোমরা ভক্ত অনুরক্ত হচ্ছো এই ফকীরের।

কোন কোন মুফাসসিরের ধারণা, বাল্যকাল থেকেই হযরত মূসার (আ) কথায় যে তোতলামি ছিল সে বিষয়েই ফেরাউনের এই আপত্তি। কিন্তু এ ধারণা ঠিক নয়। সূরা তোহাতে একথা বলা হয়েছে যে, হয়রত মূসাকে (আ) যে সময় নবুওয়াতের পদ-মর্যাদার ভূষিত করা হচ্ছিলো তখন তিনি আল্লাহর কাছে এই বলে প্রার্থনা করেছিলেন যে আমার কথার জড়তা দূর করে দিন যাতে মানুষ ভালভাবে আমার কথা বুঝতে পারে। সেই সময়ই তাঁর অন্যান্য প্রার্থনার সাথে এই প্রার্থনাও মঞ্জুর করা হয়েছিলো (আয়াতে ২৭ থেকে ৩৬)। তাছাড়া কুরআন মজীদের বিভিন্ন স্থানে হযরত মূসার (আ) যেসব বক্তৃতা উদ্ধৃত করা হয়েছে তা তাঁর পূর্ণ মাত্রার সাবলীল ভাষার প্রতি ইঙ্গিত করে। অতএব, ফেরাউনের আপত্তির কারণ তাঁর কথার তোতলামি ছিল না। বরং তার আপত্তির বিষয় ছিল এই যে, এ ব্যক্তি অজানা কি সব এলোমেলো কথাবার্তা বলে যার উদ্দেশ্য ও অভিপ্রায় কখনো আমাদের বোধগম্য হয়নি। সূরা ত্বাহা ২৭-২৯ আয়াতে—

رَبِّ اشۡرَحۡ لِیۡ صَدۡرِیۡ হে আমার রব! আমার বক্ষ সম্প্রসারিত করে দিন।

  وَ یَسِّرۡ لِیۡۤ اَمۡرِیۡ   এবং আমার কাজ সহজ করে দিন।

وَ احۡلُلۡ عُقۡدَۃً مِّنۡ لِّسَانِیۡ  আর আমার জিহবার জড়তা দূর করে দিন,

یَفۡقَهُوۡا قَوۡلِیۡ   যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে।

وَ اجۡعَلۡ لِّیۡ وَزِیۡرًا مِّنۡ اَهۡلِیۡ  আর আমার জন্য করে দিন একজন সাহায্যকারী আমার স্বজনদের মধ্য থেকে

তৃতীয় দোআ, আমার জিহ্বার জড়তা দূর করে দিন, যাতে লোকেরা আমার কথা বুঝতে পারে। কারণ রিসালাত ও দাওয়াতের জন্য স্পষ্টভাষী ও বিশুদ্ধভাষী হওয়াও একটি জরুরী বিষয়। মূসা আলাইহিস সালাম হারূনকে রিসালাতের কাজে সহকারী করার যে দো’আ করেছেন, তাতে একথাও বলেছেন যে, “হারূন আমার চাইতে অধিক বিশুদ্ধভাষী।” [সূরা আল-কাসাসঃ ৩৪] এ থেকে জানা যায় যে, ভাষাগত কিছু একটা সমস্যা তার মধ্যে ছিল। এছাড়া ফিরআউন মুসা আলাইহিস সালাম এর চরিত্রে যেসব দোষারোপ করেছিল; তন্মধ্যে একটি ছিল এই, “সে তার বক্তব্য পরিস্কারভাবে ব্যক্ত করতে পারে না”। [সূরা আয-যুখরুফঃ ৫২] মূসা আলাইহিস্ সালাম তার দোআয় জিহবার জড়তা এতটুকু দূর করার প্রার্থনা জানিয়েছিলেন, যতটুকুতে লোকেরা তার কথা বুঝতে পারে। বলাবাহুল্য, সে পরিমাণ জড়তা দূর করে দেয়া হয়েছিল। [দেখুন, ইবন কাসীর]

সে যুগে মিসর ও পারস্যের বাদশাহরা (জনসাধারণের উপর) পৃথক মর্যাদা ও বিশেষ সম্মানকে বিকশিত করার জন্য সোনার বালা পরিধান করত। অনুরূপ গোত্রের সর্দারদের হাতেও সোনার বালা এবং গলায় সোনার হার ও চেন পরিয়ে দেওয়া হত। আর এগুলোকে তাদের সর্দারির নিদর্শন মনে করা হত। এই জন্যই ফিরআউন মূসা (আঃ) সম্পর্কে বলল যে, যদি তাঁর কোন মর্যাদা ও পৃথক কোন বৈশিষ্ট্য থাকত, তবে তাঁর হাতে সোনার বালা থাকা উচিত ছিল।

 যাঁরা এ কথার সত্যায়ন করতেন যে, এ (মূসা) হলেন আল্লাহর রসূল। অথবা বাদশাহদের মত তাঁর মান-মর্যাদাকে প্রকাশ করার জন্য তাঁর সাথে থাকতেন।

এই ছোট্ট আয়াতটিতে একটি অনেক বড় সত্য বর্ণনা করা হয়েছে।

اِستَخَفَّ قَومَه অর্থাৎ, اسْتَخَفَّ عُقُوْلَهُمْ সে তার জাতির জ্ঞানকে অতি তুচ্ছ ভাবল (তাদেরকে বেঅকুফ বানাল) অথবা তাদেরকে বোকা বানিয়ে তাদের মূর্খতা ও ভ্রষ্টতায় অটল থাকতে তাকীদ করল এবং জাতিও তার কথা মেনে নিল।

 যখন কোন ব্যক্তি কোন দেশে তার স্বেচ্ছাচারিতা চালানোর চেষ্টা করে এবং সেজন্য প্রকাশ্যে সব রকমের চক্রান্ত করে। সব রকমের প্রতারণা, শঠতা ও বিশ্বাসঘাতকতার আশ্রয় নেয়। প্রকাশ্যে বিবেক বিক্রির কারবার চালায় এবং যারা বিক্রি হয় না তাদেরকে দ্বিধাহীন চিত্তে পদদালিত করে তখন সে মুখে না বললেও কার্যক্ষেত্র একথা স্পষ্ট করে দেয় যে, প্রকৃতপক্ষে সে ঐ দেশের অধিবাসীদেরকে বুদ্ধি-বিবেক, নৈতিকতা ও সাহসিকতার দিক থেকে গুরুত্বহীন মনে করে এবং তাদের সম্পর্কে এই মত পোষন করে যে, এসব নির্বোধ, বিবেক-বুদ্ধিহীন ও ভীরু লোকগুলোকে আমি যেদিকে ইচ্ছা তাড়িয়ে নিয়ে যেতে পারি। তার এ প্রচেষ্টা যখন সফল হয় এবং দেশের অধিবাসীরা এর অনুগত দাসে পরিণত হয় তখন নিজেদের কাজ দ্বারাই তারা প্রমাণ করে দেয় যে, সেই ঘৃণ্য লোকটি তাদেরকে যা মনে করেছিলো তারা বাস্তবেও তাই। তাদের এই লাঞ্ছনাকর অবস্থায় পতিত হওয়ার আসল কারণ হচ্ছে, তারা মৌলিকভাবে ‘ফাসেক’। হক ও বাতিল এবং ইনসাফ ও জুলুম কি তা নিয়ে তাদের কোন মাথা ব্যাথা থাকে না। সততা, দ্বীনদারী এবং মহত্ব মূল্য ও মর্যাদা লাভের উপযুক্ত না মিথ্যা, বে-ঈমানী এবং নীচতা মূল্য ও মর্যাদা লাভের উপযুক্ত তা নিয়ে তাদের কোন মাথা ব্যাথা থাকে না। এসব বিষয়ের পরিবর্তে ব্যক্তি স্বার্থই তাদের কাছে আসল গুরুত্বের বিষয়। সেজন্য তারা যে কোন জালেমকে সহযোগিতা করতে, যে কোন স্বৈরাচারের সামনে মাথা নত করতে, যে কোন বাতিলকে গ্রহণ করতে এবং সত্যের যে কোন আওয়াজকে দাবিয়ে দিতে প্রস্তুত হয়ে যায়।

] آسَفُونَا এর অর্থ أَسْخَطُوْنَا অথবা أَغْضَبُونَا আর سَلَفٌ হল سَالِفٌ এর বহুবচন। যেমন, خَدَمٌ হল خاَدِمٌ এর এবং حَرَسٌ হল حَارِسٌ এর বহুবচন। ‘সালাফ’এর অর্থ হল, যে জিনিস স্বীয় অস্তিত্বে অন্যের পূর্বে হয় (পূর্ববর্তী)। অর্থাৎ, তাদেরকে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য শিক্ষণীয় উপদেশ ও দৃষ্টান্ত বানিয়ে দিলাম। যাতে এই প্রজন্মের মানুষরা ফিরআউনের মত কুফরী, যুলুম, সীমালঙ্ঘন এবং ফাসাদ না করে। তাহলে তারা সেই রকম শিক্ষামূলক অবস্থার সম্মুখীন হওয়া থেকে সুরক্ষিত থাকবে, যার সম্মুখীন হয়েছিল ফিরআউন।

যারা তাদের পরিণাম দেখে শিক্ষা গ্রহণ না করবে এবং তাদের মতই আচরণ করবে তাদের জন্য তারা অগ্রবর্তী আর যারা শিক্ষা গ্রহণ করবে তাদের জন্য শিক্ষণীয় উদাহরণ।