أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
৭ : ১৩০ وَ لَقَدۡ اَخَذۡنَاۤ اٰلَ فِرۡعَوۡنَ بِالسِّنِیۡنَ وَ نَقۡصٍ مِّنَ الثَّمَرٰتِ لَعَلَّهُمۡ یَذَّكَّرُوۡنَ
১৩০. আর অবশ্যই আমরা ফিরআউনের অনুসারীদেরকে দুর্ভিক্ষ ও ফল ফসলের ক্ষতির দ্বারা আক্রান্ত করেছি, যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে।
آل فِرعَون বলতে ফিরআউনের জাতিকে বুঝানো হয়েছে। আর سنين অর্থঃ অনাবৃষ্টি ও ফসলাদিতে পোকা-মাকড় লেগে যাওয়ার কারণে উৎপাদন কমে যাওয়া। পরীক্ষার উদ্দেশ্য এই ছিল যে, অত্যাচার ও অহংকারের পথ পরিহার করুক, যাতে তারা মেতে ছিল।
ظَهَرَ الْفَسَادُ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِي النَّاسِ لِيُذِيقَهُم بَعْضَ الَّذِي عَمِلُوا لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ-
‘স্থলে ও জলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে মানুষের কৃতকর্মের দরুন। এর দ্বারা আল্লাহ তাদের কিছু কিছু কর্মের শাস্তি আস্বাদন করাতে চান, যাতে তারা (সরল পথে) ফিরে আসে’ (রূম ৩০/৪১)।
গযব নাযিলের বিধি হ’ল প্রধানতঃ দু’টি।
এক- বান্দার অন্যায় কৃতকর্মের ফলাফল প্রদান।
দুই- প্রতিটি অন্যায় কর্মের সাথে সাথে প্রতিশোধ না নিয়ে বান্দাকে তওবা করার অবকাশ দান ও তওবা না করলে শাস্তি প্রদান।
যেমন আল্লাহ বলেন, وَمَا أَصَابَكُم مِّن مُّصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُو عَن كَثِيرٍ-
‘তোমাদেরকে যেসব বিপদাপদ স্পর্শ করে, সেগুলি তোমাদের কৃতকর্মের ফল। তবে অনেক পাপ আল্লাহ ক্ষমা করে থাকেন’ (শূরা ৪২/৩০)।
এছাড়াও আরেকটি বিধি রয়েছে, সেটি হ’ল প্রথমে ছোট ছোট আযাব পাঠিয়ে বান্দাকে হুঁশিয়ার করা। অতঃপর বড় শাস্তি নাযিল করা। যেমন আল্লাহ বলেন,
وَلَنُذِيقَنَّهُمْ مِنَ الْعَذَابِ الْأَدْنَى دُونَ الْعَذَابِ الْأَكْبَرِ لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ-
‘গুরু দন্ডের পূর্বে অবশ্যই আমরা তাদেরকে লঘুদন্ডের আস্বাদন ভোগ করাব, যাতে তারা ফিরে আসে’ (সাজদাহ ৩২/২১)।
৭ : ১৩১ فَاِذَا جَآءَتۡهُمُ الۡحَسَنَۃُ قَالُوۡا لَنَا هٰذِهٖ ۚ وَ اِنۡ تُصِبۡهُمۡ سَیِّئَۃٌ یَّطَّیَّرُوۡا بِمُوۡسٰی وَ مَنۡ مَّعَهٗ ؕ اَلَاۤ اِنَّمَا طٰٓئِرُهُمۡ عِنۡدَ اللّٰهِ وَ لٰكِنَّ اَكۡثَرَهُمۡ لَا یَعۡلَمُوۡنَ
১৩১. অতঃপর যখন তাদের কাছে কোন কল্যাণ আসত, তখন তারা বলত, ‘এটা আমাদের পাওনা’ আর যখন কোন অকল্যাণ পৌঁছত তখন তারা মূসা ও তার সাথীদেরকে অলক্ষুণে গণ্য করত। সাবধান! তাদের অকল্যাণ তো কেবল আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে; কিন্তু তাদের অনেকেই জানে না।
حَسَنة (কল্যাণ) অর্থ ফল-ফসলের প্রাচুর্য। আর سَيّئَة এর বিপরীত (অকল্যাণ) অনাবৃষ্টি ও উৎপাদন কম হওয়া। কল্যাণের সকল অংশকে নিজেদের চেষ্টা ও পরিশ্রমের ফল মনে করত। আর অকল্যাণ তথা অনাবৃষ্টি ও ফসল না হওয়ার সকল দোষ মূসা (আঃ) ও তাঁর উপর ঈমান আনয়নকারীদের উপর চাপিয়ে দিয়ে বলত যে, ‘তোমাদের অশুভ আগমনের এই কুফল আমাদের দেশে পড়েছে।’
طائر এর অর্থ (উড়ন্ত) অর্থাৎ পাখি। যেহেতু পাখির ডানে বামে উড়ে যাওয়াকে মানুষ শুভ-অশুভ মনে করত। সেই জন্য এই শব্দ সাধারণ শুভাশুভ লক্ষণের অর্থে ব্যবহার হতে লাগে। আর এখানেও এই অর্থেই ব্যবহার হয়েছে। আল্লাহ বলেন, কল্যাণ-অকল্যাণ; যা বৃষ্টি-অনাবৃষ্টির কারণে তাদের জীবনে আসে তা সবই আল্লাহর পক্ষ হতে, মূসা (আঃ) ও তাঁর উপর ঈমান আনয়নকারীরা তার কারণ নয়। طَائِرُهُم عِندَ الله (তাদের অশুভ আল্লাহর নিয়ন্ত্রণাধীন)এর অর্থ হল, তাদের অশুভ আল্লার জ্ঞানায়ত্ত। আর তা হল তাদের কুফরী ও অস্বীকার; না অন্য কিছু। অথবা তাদের অশুভ আল্লাহর পক্ষ হতে, আর তার কারণ তাদের কুফরী।
ফেরাউন সম্প্রদায় যখন সুখ-সাচ্ছন্দে থাকতো অর্থাৎ তারা যখন প্রশস্ত রিযিক প্রাপ্ত হত এবং সুস্বাস্থ্য উপভোগ করত তখন বলতোঃ আমরা ইহার হকদার। অর্থাৎ আমরাই ইহা পাওয়ার অধিক উপযোগী। মুজাহিদ এবং অন্যান্য আলেম এভাবেই এ আয়াতের তাফসীর করেছেন। আর যখন তারা মসীবত ও অনাবৃষ্টির দ্বারা আক্রান্ত হত, তখন তারা বলতোঃ মুসা এবং তাঁর সাথীদের কারণেই এ রকম হয়েছে। তাদের অমঙ্গল আমাদেরকেও স্পর্শ করেছে। আল্লাহ তাআলা তখন বললেনঃ তাদের অমঙ্গল আল্লাহর পক্ষ হতেই। আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর পক্ষ হতে তাদের জন্য যা কিছু নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, তাদের মন্দ কিসমত আল্লাহর পক্ষ হতেই। তাদের কুফরী করার কারণে এবং আল্লাহ তাআলার আয়াত এবং তাঁর রাসূলদেরকে অস্বীকার করার কারণে আল্লাহর পক্ষ হতেই তাদের অমঙ্গল এসেছে।
وَلَكِنَّ أَكْثَرَهُمْ لَا يَعْلَمُونَ ‘‘কিন্তু তাদের অধিকাংশ লোকই অজ্ঞ’’ঃ অর্থাৎ তাদের অধিকাংশ লোকই মূর্খ। তারা কিছুই জানত না। তারা যদি বুঝত এবং অনুধাবন করত, তাহলে অবশ্যই জানতে পারত যে, মুসা (আঃ) তাদের জন্য যা কিছু নিয়ে এসেছেন তাতে বরকত ও কল্যাণ ব্যতীত অন্য কিছু নেই। সুতরাং সৌভাগ্য ও সাফল্য ঐ ব্যক্তির জন্য, যে তাঁর প্রতি ঈমান আনয়ন করেছে এবং তাঁর কথা মান্য করেছে।
আল্লাহ তাআলা আরও বলেনঃ
قَالُوا طَائِرُكُمْ مَعَكُمْ أَئِنْ ذُكِّرْتُمْ بَلْ أَنْتُمْ قَوْمٌ مُسْرِفُونَ
‘রাসূলগণ বললেন, তোমাদের অকল্যাণ তোমাদের সাথেই। তোমাদেরকে উপদেশ দেয়া হচ্ছে বলেই কি তোমরা এ কথা বলছো? বস্ত্ততঃ তোমরা সীমা লংঘনকারী সম্প্রদায়’। (সূরা ইয়াসিনঃ ১৯)
قَالُوا طَائِرُكُمْ مَعَكُمْ ‘‘রাসূলগণ বললেন, তোমাদের অকল্যাণ তোমাদের সাথেই’’ঃ আয়াতের অর্থ হচ্ছে তোমাদের নসীব এবং তোমাদেরকে যে অকল্যাণ স্পর্শ করেছে, তা তোমাদের সাথেই রয়েছে। এগুলো তোমাদের খারাপ কর্ম, কুফরী এবং উপদেশ দানকারীদের বিরোধীতা করার কারণেই। তা কোনোভাবেই আমাদের কারণে নয়; বরং তা তোমাদের সীমা লংঘন ও শত্রুতার কারণেই। সুতরাং যালেম ও সীমালংঘনকারীর বদনসীব তার সাথেই লেগে আছে। যে অকল্যাণই তাদেরকে স্পর্শ করেছে, তা তাদের যুলুম ও সীমালংঘনের কারণেই এবং তা আল্লাহর ফয়সালা, নির্ধারণ, হিকমত এবং ইনসাফ অনুপাতেই হয়েছে।
أَئِنْ ذُكِّرْتُمْ ‘‘তোমাদেরকে উপদেশ দেয়া হচ্ছে বলেই কি তোমরা এ কথা বলছো?’’ অর্থাৎ আমরা তোমাদেরকে উপদেশ দিয়েছি এবং তোমাদেরকে আল্লাহর তাওহীদ মেনে চলার আদেশ দিয়েছি বলেই কি তোমরা এ কথা বলছ? আসল কথা হচ্ছে তোমরা সীমা লংঘনকারী সম্প্রদায়।
আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্নিত আছে, তিনি বলেনঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ «لا عَدْوَى وَلا طِيَرَةَ وَلا هَامَةَ وَلا صَفَر»‘‘রোগের কোনো সংক্রামণ শক্তি নেই, পাখি উঁড়িয়ে কল্যাণ-অকল্যাণ নির্ধারণ করারও কোনো ভিত্তি নেই। ‘হামাহ’ তথা হুতুম পেচাঁর ডাক শুনে অশুভ নির্ধারণ করা ভিত্তিহীন। সফর মাসেরও বিশেষ কোনো প্রভাব নেই। অর্থাৎ সফর মাসকে বরকতহীন মনে করা ঠিক নয়। মুসলিমের হাদীছে ‘নক্ষত্রের কোনো প্রভাব নেই এবং ভূত-প্রেত বলতে কিছুই নেই’- এ কথাটুকু অতিরিক্ত রয়েছে’’। বুখারী, অধ্যায়ঃ কুষ্ঠরোগ।
ব্যাখ্যাঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ কোনো রোগ নিজে নিজে সংক্রামিত হয়না। ইমাম আবুস সাআদাত (রঃ) বলেনঃ কোনো রোগীর শরীর থেকে স্থানান্তরিত হয়ে কোনো সুস্থ ব্যক্তির শরীরে লেগে যাওয়ার নাম عدوى (আদ্ওয়া)। রোগীর শরীরে যে রোগ রয়েছে তা যখন অন্য কোনো সুস্থ ব্যক্তির শরীরে স্থানান্তরিত হয়, তখন বলা হয়أعداه الداء يعديه إعداء অর্থাৎ সে অমুকের শরীরে রোগ সংক্রামিত করেছে।
لاطيرة পাখি উড়িয়ে শুভ-অশুভ নির্ধারণ করার কোনো ভিত্তি নেইঃ ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রঃ) বলেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণীঃ لاطيرة শব্দটি দুই অর্থে ব্যবহৃত হতে পারে। نفي (নাফী) অর্থে অর্থাৎ ‘তিয়ারা’-এর প্রভাবকে সম্পূর্ণরূপে বাতিল করার জন্য অথবা نهي (নাহী) অর্থে অর্থাৎ তিয়ারা থেকে নিষেধ করার জন্য ব্যবহৃত হতে পারে। নিষেধাজ্ঞা অর্থে ব্যবহৃত হলে অর্থ হবে, لاتطيروا তোমরা পাখি উড়িয়ে শুভ-অশুভ নির্ণয় করোনা। তবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাণীঃ
«لاعَدْوَى وَلا طِيَرَةَ وَلا هَامَةَ وَلا صَفَرَ»
প্রমাণ করে যে, এখানে নাফী উদ্দেশ্য এবং এখানে ঐ সমস্ত কুসংস্কারকে বাতিল করা উদ্দেশ্য, যাতে জাহেলীয়াতের লোকেরা লিপ্ত ছিল। তাই এখানে نهي (নিষেধাজ্ঞা)-এর চেয়ে نفي উদ্দেশ্য হওয়াই অধিক বাঞ্চনীয়। কেননা নফী তিয়ারাকে বাতিল প্রমাণিত করে এবং তাকে প্রভাবহীন বলে ঘোষণা করে। আর নাহী শুধু তা থেকে বিরত থাকার আহবান জানায়।
ইকরিমা (রঃ) বলেনঃ আমরা একদা আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট বসা ছিলাম। এ সময় একটি পাখি ডাকাডাকি করতে করতে অতিক্রম করছিল। তখন এক লোক বললঃ ভাল হোক! ভাল হোক! আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস রাযিয়াল্লাহু আনহু তখন বললেনঃ ভাল বা খারাপ কোনটাই না হোক। ইবনে আববাস তাদের কথার দ্রুত প্রতিবাদ করলেন। যাতে করে কল্যাণ ও অকল্যাণের ব্যাপারে ঐ পাখির কোনো প্রভাব আছে বলে বিশ্বাস না করা হয়।
ইমাম আবু দাউদ (রঃ) উকবা বিন আমের রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে সহীহ সনদে বর্ণনা করেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে ‘তিয়ারাহ’ (কুলক্ষণ) সম্পর্কে আলোচনা করা হল। তখন তিনি বললেনঃ এগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম হচ্ছে নেকফাল গ্রহণ করা। বদ ফাল কোনো মুসলিমকে কাজে অগ্রসর হওয়া থেকে প্রতিহত করতে পারেনা। তোমাদের কেউ যদি অপছন্দনীয় কিছু দেখে তখন সে যেন বলেঃ
«اللَّهُمَّ لاَ يَأْتِى بِالْحَسَنَاتِ إِلاَّ أَنْتَ وَلاَ يَدْفَعُ السَّيِّئَاتِ إِلاَّ أَنْتَ وَلاَ حَوْلَ وَلاَ قُوَّةَ إِلاَّ بِكَ»
‘‘হে আল্লাহ! তুমি ছাড়া অন্য কেউ কল্যাণ আনয়ন করতে পারেনা। তুমি ছাড়া অন্য কেউ অকল্যাণ প্রতিহত করতে সক্ষম নয়। তোমার সাহায্য ব্যতীত কেউ অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকতে পারেনা এবং তোমার তাওফীক ও শক্তি ব্যতীত সৎ আমল করাও সম্ভব নয়। আবু দাউদ, অধ্যায়ঃ তিয়ারাহ। ইমাম আলবানী (রঃ) এই হাদীছকে সহীহ বলেছেন। দেখুনঃ সিলসিলায়ে সহীহা, হাদীছ নং- ১৬১৯।
ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন,
«مَنْ رَدَّتْهُ الطِّيَرَةُ مِنْ حَاجَةٍ فَقَدْ أَشْرَكَ»
‘‘কুলক্ষণের ধারণা যাকে প্রয়োজন পুরণে বের হতে বাধা দিল সে শির্ক করল। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করলেনঃ এর কাফ্ফারা কী? উত্তরে তিনি বললেনঃ তোমরা এ দুআ পড়বে
«اللَّهُمَّ لَا خَيْرَ إِلَّا خَيْرُك وَلَا طَيْرَ إِلَّا طَيْرُك وَلَا إِلَهَ غَيْرُك»
‘হে আল্লাহ! তোমার কল্যাণ ব্যতীত অন্য কোনো কল্যাণ নেই। তোমার অমঙ্গল ছাড়া অন্য কোনো অমঙ্গল নেই। আর তুমি ছাড়া অন্য কোনো সত্য ইলাহ নেই। মুসনাদে আহমাদ। ইমাম আলবানী (রঃ) হাদীছটিকে সহীহ বলেছেন। দেখুনঃ হাদীছ নং- ১০৬৫।
৭ : ১৩২ وَ قَالُوۡا مَهۡمَا تَاۡتِنَا بِهٖ مِنۡ اٰیَۃٍ لِّتَسۡحَرَنَا بِهَا ۙ فَمَا نَحۡنُ لَكَ بِمُؤۡمِنِیۡنَ
১৩২. আর তারা বলত, আমাদেরকে জাদু করার জন্য তুমি যে কোন নিদর্শন আমাদের কাছে পেশ কর না কেন, আমরা তোমার উপর ঈমান আনব না।
ফেরাউনের সভাসদরা এমন একটি জিনিসকে যাদু গণ্য করছিল, যে সম্পর্কে তারা নিজেরাও নিশ্চিতভাবে জানতো যে, তা যাদুর ফল হতে পারে না। এটা তাদের চরম হঠকারিতা ও বাগাড়ম্বর ছাড়া আর কিছুই ছিল না। একটি দেশের সমগ্র এলাকায় দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়া এবং একনাগাড়ে কয়েক বছর কম ফসল উৎপাদন ও ফসলহানি হওয়া কোন যাদুর কারসাজি হতে পারে বলে সম্ভবত কোন নির্বোধও বিশ্বাস করবে না। এ জন্যই কুরআন মজীদ বলছেঃ فَلَمَّا جَاءَتْهُمْ آيَاتُنَا مُبْصِرَةً قَالُوا هَذَا سِحْرٌ مُبِينٌ وَجَحَدُوا بِهَا وَاسْتَيْقَنَتْهَا أَنْفُسُهُمْ ظُلْمًا
“যখন আমার নিদর্শনসমূহ প্রকাশ্যে তাদের দৃষ্টি সম্মুখে এসে গেলো তখন তারা বললো, এটা তো সুস্পষ্ট যাদু। অথচ তাদের মন ভিতর থেকে স্বীকার করে নিয়েছিল, কিন্তু তারা নিছক জুলুম ও বিদ্রোহের কারণে তা অস্বীকার করলো।” (আন নামল ১৩-১৪ আয়াত।)
৭ : ১৩৩ فَاَرۡسَلۡنَا عَلَیۡهِمُ الطُّوۡفَانَ وَ الۡجَرَادَ وَ الۡقُمَّلَ وَ الضَّفَادِعَ وَ الدَّمَ اٰیٰتٍ مُّفَصَّلٰتٍ ۟ فَاسۡتَكۡبَرُوۡا وَ كَانُوۡا قَوۡمًا مُّجۡرِمِیۡنَ
১৩৩. অতঃপর আমরা তাদের উপর তুফান, পঙ্গপাল, উকুন, ব্যাঙ ও রক্ত বিস্তারিত নিদর্শন হিসেবে প্রেরণ করি। এরপরও তারা অহংকার করল। আর তারা ছিল এক অপরাধী সম্প্রদায়।
ফিরআউনের জাদুকরদের সাথে সংঘটিত সে ঐতিহাসিক ঘটনার পরও মূসা ‘আলাইহিস সালাম দীর্ঘ দিন যাবৎ মিসরে অবস্থান করে সেখানকার অধিবাসীদেরকে আল্লাহর বাণী শুনান এবং সত্য ও সরল পথের দিকে আহবান করতে থাকেন। এ সময়ে আল্লাহ্ তা’আলা মূসা আলাইহিস সালামকে নয়টি নিদর্শন দান করেছিলেন। এগুলোর উদ্দেশ্য ছিল ফিরআউনের সম্প্রদায়কে সতর্ক করে সত্য পথে আনা। আলোচ্য আয়াতে এই নয়টি নিদর্শন সম্পর্কেই বলা হয়েছে।
এই নয়টি নিদর্শনের মধ্যে প্রথম দুটি অর্থাৎ লাঠির সাপে পরিণত হওয়া এবং হাতের শুভ্রতা ফিরআউনের দরবারে প্রকাশিত হয়। আর এগুলোর মাধ্যমেই জাদুকরদের বিরুদ্ধে মূসা আলাইহিস সালাম জয়লাভ করেন। তারপরের একটি নিদর্শন যার আলোচনা পূর্ববর্তী আয়াতে করা হয়েছে তা ছিল ফিরআউনের সম্প্রদায়ের হঠকারিতা ও দুরাচরণের ফলে দুর্ভিক্ষের আগমন।
যাতে তাদের ক্ষেতের ফসল এবং বাগ-বাগিচার উৎপাদন চরমভাবে হ্রাস পেয়েছিল। ফলে এরা অত্যন্ত ব্যাকুল হয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত মূসা আলাইহিস সালামের মাধ্যমে দুর্ভিক্ষ থেকে মুক্তিলাভের দোআ করায়। কিন্তু দুর্ভিক্ষ রহিত হয়ে গেলে পুনরায় নিজেদের ঔদ্ধত্যে লিপ্ত হয় এবং বলতে শুরু করে যে, এই দুর্ভিক্ষ তো মূসা আলাইহিস সালামের সঙ্গী-সাথীদের অলক্ষণের দরুনই আপতিত হয়েছিল। আর এখন যে দুর্ভিক্ষ রহিত হয়েছে, তা হল আমাদের সুকৃতির স্বাভাবিক ফলশ্রুতি। এমনটিই তো আমাদের প্রাপ্য।
তারপর আল্লাহ্ তা’আলা মূসা আলাইহিস সালামকে আরো ছয়টি এমন নিদর্শন দেন যার উদ্দেশ্য ছিল ফিরআউনের সম্প্রদায়কে সৎপথে নিয়ে আসা। আল্লাহ বলেনঃ অতঃপর আমি তাদের উপর পাঠিয়েছি তুফান, পঙ্গপাল, ঘুন পোকা, ব্যাঙ এবং রক্ত। এতে ফিরআউনের সম্প্রদায়ের উপর আপতিত পাঁচ রকমের আযাবের কথা আলোচিত হয়েছে। সর্বশেষ হলো ফিরাউনকে তার দলবলসহ ডুবে মারা।
طوفان (তুফান) বলতে বন্যা, প্লাবন, প্রচুর বৃষ্টিপাত, যাতে প্রতিটি জিনিস ডুবে যায়। অথবা অধিক মৃত্যু বোঝানো হয়েছে, যাতে প্রতিটি ঘরে মাতম শুরু হয়।
جراد পঙ্গপালকে বলে। ফসলের উপর পঙ্গপালের আক্রমণ ও অনিষ্টকারিতা সর্বজন-বিদিত। এই সমস্ত পঙ্গপাল তাদের ফসল ও ফলাদি খেয়ে শেষ করে ফেলত।
পঙ্গপাল এক প্রকারের বড় জাতের ফড়িংসদৃশ প্রাণী, যা ভক্ষণ করা হালাল। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘আমাদের জন্য দু’টি মৃত জীব হালাল করা হয়েছে, মাছ ও জারাদ (পঙ্গপাল) (ইবনু মাজাহ হা/৩৩১৪; ছহীহাহ হা/১১১৮)। ছাহাবীগণ বলেন, আমরা আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)-এর সাথে থেকে সাতটি যুদ্ধ করেছি, তাতে আমরা পঙ্গপাল খেয়েছি (বুখারী হা/৫৪৯৫; মুসলিম হা/১৯৫২; মিশকাত হা/৪১১৩)। সুতরাং কারো রুচি হ’লে তা খেতে পারে।
قُمَّل উকুন যা মানুষের দেহ, পোশাক বা চুলে পাওয়া যায়। অথবা ঘুণ পোকা যা শস্যের অধিক অংশ খেয়ে নষ্ট করে দেয়। উকুনকে মানুষ ঘৃণা করে। আর বেশি পরিমাণে হলে মানুষ পেরেশান হয়ে যায়। আবার তা যদি শাস্তি স্বরূপ হয়, তাহলে তার কষ্ট অনুমেয়। অনুরূপ ঘুণ পোকা মানুষের রুযী ও আর্থিক পরিকাঠামো ভেঙ্গে ফেলার জন্য যথেষ্ট। মূল শব্দ হচ্ছে قُمَّلَ(কুম্মালু)। এর কয়েকটি অর্থ হয়। যেমন উকুন, ছোট মাছি, ছোট পংগপাল, মশা, ঘুণ ইত্যাদি। সম্ভবত এ বহু অর্থবোধ শব্দটি ব্যবহার করার কারণ হচ্ছে এই যে, একই সঙ্গে উকুন ও মশা মানুষের ওপর এবং ঘুণ খাদ্য শস্যের ওপর আক্রমণ করে থাকবে।
ضفادع ضفدعة এর বহুবচন। যার অর্থ ব্যাঙ। যা পানিতে খাল ও ডোবায় জন্মায়। এই সমস্ত ব্যাঙ তাদের খাবারে, বিছানায়, গুদামজাত শস্যে এসে উপস্থিত হত; মোটকথা চারিদিকে শুধু ব্যাঙ আর ব্যাঙই নজরে আসত। যার কারণে তাদের খাওয়া, পান করা, শোয়া, আরাম করা সব হারাম হয়ে গিয়েছিল।
دَم (রক্ত) এর অর্থ পানি রক্তে পরিণত হওয়া। ফলে তাদের পানি পান করা অসম্ভব হয়ে পড়ত। কেউ কেউ রক্ত বলতে নাক দিয়ে ঝরা রক্ত বুঝিয়েছেন। অর্থাৎ, প্রত্যেক ব্যক্তির নাক দিয়ে রক্ত ঝরার রোগ শুরু হয়। آيات مفصلات এগুলি স্পষ্ট ও আলাদা আলাদা মু’জিযা ছিল; যা সময়ের ব্যবধানে তাদের উপর এসেছিল।
এসব আযাবে অসহ্য হয়ে সবাই মূসা আলাইহিস সালামের কাছে পাকাপাকি ওয়াদা করল যে, তারা এ সমস্ত আযাব থেকে মুক্তি পেলে মূসা আলাইহিস সালামের উপর ঈমান আনবে। মূসা আলাইহিস সালাম দোআ করলেন, ফলে তারা এ সমস্ত আযাব থেকে মুক্তি পেল। কিন্তু যে জাতির উপর আল্লাহর আযাব চেপে থাকে, তাদের বুদ্ধি-বিবেচনা, জ্ঞান-চেতনা কোন কাজই করে না। কাজেই এ ঘটনার পরেও আযাব থেকে মুক্তি পেয়ে এরা আবারও নিজেদের হঠকারিতায় আঁকড়ে বসল এবং ঈমান আনতে অস্বীকার করল। ইরশাদ হয়েছে-
আর তারা অন্যায় ও উদ্ধতভাবে নিদর্শনগুলো প্রত্যাখ্যান করল, যদিও তাদের অন্তর এগুলোকে নিশ্চিত সত্য বলে গ্রহণ করেছিল। সুতরাং দেখুন, বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পরিণাম কেমন হয়েছিল!নমলঃ১৪
৭ : ১৩৪ وَ لَمَّا وَقَعَ عَلَیۡهِمُ الرِّجۡزُ قَالُوۡا یٰمُوۡسَی ادۡعُ لَنَا رَبَّكَ بِمَا عَهِدَ عِنۡدَكَ ۚ لَئِنۡ كَشَفۡتَ عَنَّا الرِّجۡزَ لَنُؤۡمِنَنَّ لَكَ وَ لَنُرۡسِلَنَّ مَعَكَ بَنِیۡۤ اِسۡرَآءِیۡلَ
১৩৪. আর যখন তাদের উপর শাস্তি আসত তারা বলত, হে মূসা! তুমি তোমার রবের কাছে আমাদের জন্য প্রার্থনা কর তোমার সাথে তিনি যে অঙ্গীকার করেছেন সে অনুযায়ী; যদি তুমি আমাদের থেকে শাস্তি দূর করে দিতে পার তবে আমরা তো তোমার উপর ঈমান আনবই এবং বনী ইসরাঈলকেও তোমার সাথে অবশ্যই যেতে দেব।
৭ : ১৩৫ فَلَمَّا كَشَفۡنَا عَنۡهُمُ الرِّجۡزَ اِلٰۤی اَجَلٍ هُمۡ بٰلِغُوۡهُ اِذَا هُمۡ یَنۡكُثُوۡنَ
১৩৫. আমরা যখনই তাদের উপর থেকে শাস্তি দূর করে দিতাম এক নির্দিষ্ট সময়ের জন্য যা তাদের জন্য নির্ধারিত ছিল, তারা তখনই তাদের অঙ্গীকার ভংগ করত।
যখন একটি আযাব আসত, তখন তাতে পেরেশান হয়ে তা দূর করার জন্য তারা মূসা (আঃ)-এর নিকট আসত। অতঃপর তাঁর দু’আর কারণে তা দূর হয়ে যেত। কিন্তু তারা ঈমান আনার পরিবর্তে কুফরী ও শিরকের উপরই অটল থাকত। আবার দ্বিতীয় আযাব এলে তাই করত। এভাবে সময়ের ব্যবধানে তাদের উপর পাঁচ পাঁচটি আযাব আসে। কিন্তু তাদের অন্তরের ঔদ্ধত্য ও মস্তিষ্কের গর্ব সত্যের পথে পাহাড় হয়ে দাঁড়ায়। আর এত এত স্পষ্ট প্রমাণাদি দেখার পরও তারা ঈমানের সম্পদ হতে বঞ্চিত থেকে যায়।
নিশ্চয় মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে অতিশয় অস্থিরচিত্তরূপে। যখন বিপদ তাকে স্পর্শ করে সে হয় হা-হুতাশকারী। আর যখন কল্যাণ তাকে সম্পর্শ করে সে হয় অতি কৃপণ; তবে সালাত আদায়কারীগণ ছাড়া, যারা তাদের সালাতে সর্বদা প্রতিষ্ঠিত. সূরা মায়ারিজঃ১৯-২৩
আর সাগরে যখন তোমাদেরকে বিপদ স্পর্শ করে তখন শুধু তিনি ছাড়া অন্য যাদেরকে তোমরা ডেকে থাক তারা হারিয়ে যায়; অতঃপর তিনি যখন তোমাদেরকে উদ্ধার করে স্থলে আনেন তখন তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও। আর মানুষ খুবই অকৃতজ্ঞ। বনী ইসরাইলঃ ৬৭
অতঃপর যখন কোন বিপদ-আপদ মানুষকে স্পর্শ করে, তখন সে আমাদেরকে ডাকে; তারপর যখন তাকে আমরা আমাদের কোন নিয়ামতের অধিকারী করি তখন সে বলে, আমাকে এটা দেয়া হয়েছে কেবল আমার জ্ঞানের কারণে। বরং এটা এক পরীক্ষা, কিন্তু তাদের বেশীর ভাগই তা জানে না। সূরা যুমারঃ ৪৯
হা-মিম-সাজদাঃ ৫১ — আর যখন আমরা মানুষের প্রতি অনুগ্রহ করি তখন সে মুখ ফিরিয়ে নেয় ও দূরে সরে যায়। আর যখন তাকে অকল্যাণ স্পর্শ করে তখন সে দীর্ঘ প্রার্থনাকারী হয়।
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, কাফেররা যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দাওয়াত কবুল করতে অস্বীকার করল এবং কুফরীকেই আঁকড়ে রইল, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের উপর দোআ করলেন যে, হে আল্লাহ! এদের উপর ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর আমলের দুর্ভিক্ষের ন্যায় দুর্ভিক্ষ চাপিয়ে দিন। ফলে কাফেররা ভয়ংকর দুর্ভিক্ষে পতিত হল। এমনকি, তারা অস্থি এবং মৃত জন্তুও ভক্ষণ করতে লাগল। তারা আকাশের দিকে তাকালে ধুম্র ব্যতীত কিছুই দৃষ্টিগোচর হত না। এক বর্ণনায় আছে, তাদের কেউ আকাশের দিকে তাকালে ক্ষুধার তীব্রতায় সে কেবল ধুম্রের মত দেখত। অতঃপর আবদুল্লাহ ইবনে মসউদ তার বক্তব্যের প্রমাণ স্বরূপ এ আয়াতখানি তেলাওয়াত করলেন। দুর্ভিক্ষ প্ৰপীড়িত জনগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে আবেদন করল, আপনি আপনার মুদার গোত্রের জন্য আল্লাহর কাছে বৃষ্টির দোআ করুন।
নতুবা আমরা সবাই ধ্বংস হয়ে যাব। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম দো’আ করলে, বৃষ্টি হল। তখন (إِنَّا كَاشِفُو الْعَذَابِ قَلِيلًا) আয়াত নাযিল হল। অর্থাৎ, আমরা কিছুদিনের জন্যে তোমাদের থেকে আযাব প্রত্যাহার করে নিচ্ছি। কিন্তু তোমরা বিপদমুক্ত হয়ে গেলে আবার কুফরের দিকে ফিরে যাবে। বাস্তবে তাই হল, তারা তাদের পূর্বাবস্থায় ফিরে গেল। তখন আল্লাহ তা’আলা (يَوْمَ نَبْطِشُ الْبَطْشَةَ الْكُبْرَىٰ إِنَّا مُنتَقِمُونَ) আয়াত নাযিল করলেন। অর্থাৎ যেদিন আমরা প্রবলভাবে পাকড়াও করব, সেদিনের ভয় কর। অতঃপর ইবনে-মসউদ বললেন, এই প্রবল পাকড়াও বদর যুদ্ধে হয়ে গেছে। এই ঘটনা বর্ণনা করার পর তিনি আরও বললেন, পাঁচটি বিষয় অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। অর্থাৎ, দোখান তথা ধুম্র, রোম (এর পারসিকদের উপর জয়লাভ), চাঁদ (দ্বিখণ্ডিত হওয়া), পাকড়াও (যা বদরের প্রান্তরে সংঘটিত হয়েছিল) ও লেযাম (বা স্থায়ী আযাব)। [বুখারী: ৪৮০৯, মুসলিম: ২৭৯৮]
কারো জীবনে আবার অন্যরকম দেখা যায়–
যখন বিপদাপদ দেখা দেয় তখন তারা আল্লাহ ছাড়া অন্য যাদের ইবাদত করে তাদেরকে ভুলে যায়। তারা তখন তাদের মন থেকে হারিয়ে যায়। একমাত্র আল্লাহকেই তারা ডাকতে থাকে। মক্কা বিজয়ের পর ইকরিমা ইবন আবি জাহল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে পালিয়ে হাবশা চলে যাচ্ছিল। সাগরের মাঝে তার নৌকা প্ৰচণ্ড ঝড়ের কবলে পড়ে যায়। তখন নৌকার সবাই একমাত্র আল্লাহকে ডাকার জন্য একে অপরকে পরামর্শ দিতে থাকে।
আর ঠিক তখনি ইকরিম নিজ মনে বলছিল যে, যদি সাগর বক্ষে আল্লাহ ব্যতিত আর কেউ রক্ষা করার না থাকে তা হলে ডাঙ্গাতেও তিনিই একমাত্র রক্ষক। হে আল্লাহ! আমি অঙ্গীকার করছি যে, যদি এ বিপদ থেকে বেঁচে যাই তবে অবশ্য ফিরে গিয়ে মুহাম্মাদের হাতে হাত রেখে ঈমান আনিব। তাকে আমি অবশ্যই রহমদিল পাব। তারপর তারা যখন সমুদ্র বক্ষ থেকে বের হলো তখনি তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে ফিরে আসলেন এবং ঈমান আনলেন। আর তার ইসলাম ছিল অত্যন্ত সুন্দর৷ [মুস্তাদরাকে হাকোমঃ ৩/২৪১-২৪২]
৭ : ১৩৬ فَانۡتَقَمۡنَا مِنۡهُمۡ فَاَغۡرَقۡنٰهُمۡ فِی الۡیَمِّ بِاَنَّهُمۡ كَذَّبُوۡا بِاٰیٰتِنَا وَ كَانُوۡا عَنۡهَا غٰفِلِیۡنَ
১৩৬. কাজেই আমরা তাদের থেকে প্রতিশোধ নিয়েছি এবং তাদেরকে অতল সাগরে ডুবিয়ে দিয়েছি। কারণ তারা আমাদের নিদর্শনকে অস্বীকার করত এবং এ সম্বন্ধে তারা ছিল গাফেল।
এত বড় বড় নিদর্শন দেখা সত্ত্বেও তারা ঈমান আনার জন্য ও গাফিলতির ঘুম হতে জাগার জন্য প্রস্তুত হল না। শেষ পর্যন্ত তাদেরকে সমুদ্রে ডুবিয়ে মারা হল।
৭ : ১৩৭ وَ اَوۡرَثۡنَا الۡقَوۡمَ الَّذِیۡنَ كَانُوۡا یُسۡتَضۡعَفُوۡنَ مَشَارِقَ الۡاَرۡضِ وَ مَغَارِبَهَا الَّتِیۡ بٰرَكۡنَا فِیۡهَا ؕ وَ تَمَّتۡ كَلِمَتُ رَبِّكَ الۡحُسۡنٰی عَلٰی بَنِیۡۤ اِسۡرَآءِیۡلَ ۬ۙ بِمَا صَبَرُوۡا ؕ وَ دَمَّرۡنَا مَا كَانَ یَصۡنَعُ فِرۡعَوۡنُ وَ قَوۡمُهٗ وَ مَا كَانُوۡا یَعۡرِشُوۡنَ
১৩৭. যে সম্প্রদায়কে দুর্বল মনে করা হত তাদেরকে আমরা আমাদের কল্যাণপ্রাপ্ত রাজ্যের পূর্ব ও পশ্চিমের উত্তরাধিকারী করি; এবং বনী ইসরাঈল সম্বন্ধে আপনার রবের শুভ বাণী সত্যে পরিণত হল, যেহেতু তারা ধৈর্য ধরেছিল, আর ফিরআউন ও তার সম্প্রদায়ের শিল্প এবং যেসব প্রাসাদ তারা নির্মাণ করেছিল তা ধ্বংস করেছি।
বানী ইস্রাঈল; যাদেরকে ফিরআউন দাস বানিয়ে রেখেছিল এবং যাদের উপর নানাভাবে যুলুম করত। এই দিক দিয়ে বাস্তবে মিসরে তাদেরকে দুর্বল মনে করা হত। কেন না তারা ছিল পরাভূত ও পরাধীন দাস। কিন্তু আল্লাহ যখন ইচ্ছা করলেন, তখন সেই পরাভূত ও দাস জাতিকে সেই ফিরআউনী রাজ্যের উত্তরাধিকারী বানালেন। যেহেতু তিনি যাকে ইচ্ছা রাজত্ব দান করেন এবং যার নিকট থেকে ইচ্ছা রাজত্ব কেড়ে নেন, যাকে ইচ্ছা সম্মানিত করেন এবং যাকে ইচ্ছা অপমানিত করেন। (সূরা আলে ইমরান ২৬ আয়াত)
রাজ্য বা দেশ বলতে শাম দেশের এলাকা ফিলিস্তীনকে বুঝানো হয়েছে। সেখানে মহান আল্লাহ আমালেকাদের পর বানী ইস্রাঈলকে বিজয়ী করেন। মূসা (আঃ) ও হারূন (আঃ)-এর ইন্তিকালের পর বানী ইস্রাঈলরা শাম দেশে তখন গেলেন, যখন ইউশা’ বিন নূন আমালেকাদেরকে পরাজিত করে বানী ইস্রাঈলদের জন্য রাস্তা সহজ করে দিলেন। আর দেশের ঐ অংশকে বরকত ও কল্যাণময় করলেন। অর্থাৎ, শাম (সিরিয়া ও ফিলিস্তীন) এলাকা; যেখানে অধিকাংশ নবীদের বাসস্থান ও সমাধিক্ষেত্র ছিল এবং বাহ্যিক সুন্দর শস্য-শ্যামলতাও আছে। অর্থাৎ বাহির ও ভিতর দুই দিক দিয়েই এই এলাকা ছিল সম্পদশালী। مشارق শব্দটি مشرق এর বহুবচন, অনুরূপ مغارب হল مغرب এর বহুবচন। যদিও পূর্ব-পশ্চিম একটিই হয়। বহুবচন পূর্ব ও পশ্চিমসমূহ থেকে উদ্দিষ্ট, দেশের বরকতময় পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্ত।
এই শুভবাণী বা প্রতিশ্রুতি তাই, যা ইতিপূর্বে মূসা (আঃ) প্রমুখাৎ ১২৮-১২৯নং আয়াতে দেওয়া হয়েছে। যেমন সূরা ক্বাস্বাসেবও বলা হয়েছে,
{وَنُرِيدُ أَن نَّمُنَّ عَلَى الَّذِينَ اسْتُضْعِفُوا فِي الْأَرْضِ وَنَجْعَلَهُمْ أَئِمَّةً وَنَجْعَلَهُمُ الْوَارِثِينَ، وَنُمَكِّنَ لَهُمْ فِي الْأَرْضِ وَنُرِي فِرْعَوْنَ وَهَامَانَ وَجُنُودَهُمَا مِنْهُم مَّا كَانُوا يَحْذَرُونَ} (সূরা কাসাস ৫-৬ আয়াত)
‘‘সে দেশে যাদেরকে হীনবল করা হয়েছিল, আমি তাদের প্রতি অনুগ্রহ করতে, তাদেরকে নেতা ও দেশের উত্তরাধিকারী করতে ইচ্ছা করলাম। ইচ্ছা করলাম দেশে তাদেরকে ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করতে এবং ফিরআউন, হামান ও তাদের বাহিনীকে তা দেখিয়ে দিতে, যা তাদের নিকট হতে ওরা আশঙ্কা করত। আর এই সম্মান ও অনুগ্রহ সেই ধৈর্যের বিনিময়ে লাভ করেছিল, যা তারা ফিরআউনের অত্যাচারের মুকাবিলায় প্রদর্শন করেছিল।
‘নির্মিত শিল্প’ বলতে কারখানা, ইমারত ও অস্ত্রশস্ত্র ইত্যাদি। يعرشون (যা তারা উঁচু করত) বলতে উঁচু উঁচু প্রাসাদও হতে পারে, আবার আঙ্গুর ইত্যাদির বাগানও হতে পারে, যা মাচানের উপর ছড়ানো থাকে। অর্থ এই যে আমি তাদের শহরের বড় বড় প্রাসাদ, তাদের অস্ত্রশস্ত্র ও অন্যান্য সামগ্রী ধ্বংস করেছি এবং তাদের বাগানসমূহও।
প্রসংগত আরেকটি বিষয়–
আল কুরআনে মুসা (আ.) এর ঘটনায় মিসরের ফিরআউনের (Pharaoh) সাথে সাথে আরও একজন মন্দ ব্যক্তির কথা উল্লেখ আছে। আর সে হচ্ছে হামান (Haman)। সে ছিল ফিরআউনের সহযোগী। কুরআনের ৩টি সূরায় সূরা ক্বাসাস ২৮ : ৬-৮, ৩৮; সূরা আনকাবুত ২৯ : ৩৯ সূরা মু’মিন (গাফির) ৪০ : ২৪, ৩৬ হামানের কথা উল্লেখ আছে। আল কুরআনে উল্লেখ আছে যে, ফিরআউন তামাশাচ্ছলে হামানকে এক সুউচ্চ ইমারত (tower) নির্মাণের নির্দেশ দেয়, যাতে করে সে আকাশে উঁকি দিয়ে মুসা(আ.) এর উপাস্য প্রভুকে দেখতে পায়।
قَالَ فِرْعَوْنُ يَا هَامَانُ ابْنِ لِي صَرْحًا لَّعَلِّي أَبْلُغُ الْأَسْبَابَ ﴿٣٦﴾ أَسْبَابَ السَّمَاوَاتِ فَأَطَّلِعَ إِلَىٰ إِلَـٰهِ مُوسَىٰ وَإِنِّي لَأَظُنُّهُ كَاذِبًا ۚ
অর্থ : ফিরআউন আরও বলল, “হে হামান, আমার জন্য একটি উঁচু ইমারত বানাও যাতে আমি অবলম্বন পাই।
আসমানে আরোহণের অবলম্বন, যাতে আমি মুসার ইলাহ [উপাস্য প্রভু]কে দেখতে পাই, আর আমি কেবল তাকে মিথ্যাবাদী মনে করি”…। আল কুরআন, মু’মিন (গাফির) ৪০ : ৩৬-৩৭
সুরা কাসাসে হামান সংক্রান্ত আয়াতের তাফসিরে প্রখ্যাত মুফাসসির তাহির ইবন আশুর(র.) উল্লেখ করেছেনঃ
وَأَحْسَبُ أَنْ هَامَانَ لَيْسَ بَاسِمِ عَلَمٍ وَلَكِنَّهُ لَقَبُ خِطَّةٍ مِثْلُ
فِرْعَوْنَ وَكِسْرَى وَقَيْصَرَ وَنَجَاشِيٍّ. فَالظَّاهِرُ أَنْ هَامَانَ لَقَبُ وَزِيرِ الْمَلِكِ فِي مِصْرَ فِي ذَلِكَ الْعَصْرِ.
অর্থঃ “আমি মনে করি হামান কোনো ব্যক্তির নির্দিষ্ট নাম নয়, বরং এটি একটি পদবি বা উপাধি। যেমন ফিরআউন, কিসরা, কায়সার এবং নাজাশী। সুতরাং, স্পষ্টতই হামান ছিল তখনকার যুগে মিসরের বাদশাহর উযিরের উপাধি।
১৭৯৯ সালে নেপোলিয়ন বোনাপার্টের মিসর অভিযানের সময়ে তার একজন সৈন্য Rosetta Stone আবিষ্কার করে। Rosetta Stone এ প্রাচীন মিসরীয় লিপি এবং তার তুলনামূলক গ্রিক বর্ণমালার বিবরণ ছিল, যার সাহায্যে গবেষকগণ প্রাচীন মিসরীয় লিপির (hieroglyphics) পাঠোদ্ধার করতে সক্ষম হন। [6] প্রাচীন মিসরীয় লিপির মর্মোদ্ধারের ওপর ভিত্তি করে মিসরবিদগণ ‘Egyptologist’; প্রাচীন মিসর নিয়ে গবেষণা করেন যারা, সে সময়কার বহু মূল্যবান ঐতিহাসিক তথ্য জানতে পেরেছেন। এ জাতীয় গবেষণার জন্য অগ্রগামী হচ্ছেন ফ্রান্স এবং জার্মানির মিসরবিদগণ।
আল কুরআনে হামান-বিষয়ক তথ্যের সত্যতা নিরূপণের জন্য ড. মরিস বুকাইলি ফ্রান্সের একজন মিসরবিদের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। তিনি মিসরবিদকে কুরআনে হামান সম্পর্কে যা আছে সেটিই দেখালেন। এরপর বললেন, ৭ম শতাব্দীর একটা ডকুমেন্টে এই বাক্যটি পাওয়া গেছে। সেখানে প্রাচীন মিসরীয় ইতিহাসের সাথে জড়িত কারো কথা উল্লেখ আছে। মিসরবিদ এই ‘হামান’ শব্দটাকে প্রাচীন মিসরীয় ভাষার (Hieroglyphic) একটা উচ্চারণ হিসেবেই ধরলেন। তার কাছে বিষয়টা অবাক করা ছিলো কারণ ৭ম শতাব্দীতে কারো কাছে এমন তথ্য থাকা অসম্ভব। ঐ সময়টাতে এ ভাষা কেউ জানতো না। পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিলো। প্রাচীন মিসরে মুসা(আ.) এর সময়কালের খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্দশ থেকে ত্রয়োদশ শতক, প্রাচীন মিসরের New Kingdom রাজত্বকাল;
“Moses [Encyclopedia]” এই ব্যাপারটি অনুসন্ধানের জন্য তিনি ড. মরিস বুকাইলিকে Hermann Ranke এর Egyptian Personal Names of The New Kingdom ডিকশনারি (Die Ägyptischen Personennamen) দেখতে বলেন। এটি প্রাচীন মিসরীয় ভাষার একটি অভিধান। সেখানে অবাক বিস্ময়ে তিনি দেখেন যে,পাথর আহরণ স্থানের নির্মাণ কর্মীদের নেতার উপাধি ‘হামান’! ফিরে মরিস বুকাইলি সেই মিসরবিদকে অভিধানটির ফটোকপি দেখান, যাতে তিনি ‘হামান’ এর সন্ধান পেয়েছেন। এরপর তিনি তাকে কুরআন থেকে হামানের আয়াত দেখান। এটা দেখে সেই ফরাসি মিসরবিদ বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে যান
৭ : ১৩৮ وَ جٰوَزۡنَا بِبَنِیۡۤ اِسۡرَآءِیۡلَ الۡبَحۡرَ فَاَتَوۡا عَلٰی قَوۡمٍ یَّعۡكُفُوۡنَ عَلٰۤی اَصۡنَامٍ لَّهُمۡ ۚ قَالُوۡا یٰمُوۡسَی اجۡعَلۡ لَّنَاۤ اِلٰـهًا كَمَا لَهُمۡ اٰلِـهَۃٌ ؕ قَالَ اِنَّكُمۡ قَوۡمٌ تَجۡهَلُوۡنَ
১৩৮. আর আমরা বনী ইসরাঈলকে সাগর পার করিয়ে দেই; তারপর তারা মূর্তিপূজায় রত এক জাতির কাছে উপস্থিত হয়। তারা বলল, হে মূসা! তাদের মা’বুদদের ন্যায় আমাদের জন্যও একজন মা’বুদ স্থির করে দাও। তিনি বললেন, তোমরা তো এক জাহিল সম্প্রদায়।
বনী ইসরাঈল যে স্থান থেকে লোহিত সাগর অতিক্রম করেছিল সেটি ছিল সম্ভবত বর্তমান সুয়েজ ও ইসমাঈলীয়ার মধ্যবর্তী কোন একটি স্থান। এখান থেকে লোহিত সাগর পার হয়ে তারা সিনাই উপদ্বীপের দক্ষিণ অঞ্চলের দিকে উপকূলের কিনারা ঘেঁষে রওয়ানা হয়েছিল। সে সময় সিনাই উপদ্বীপের পশ্চিম ও উত্তরাংশ মিসরের শাসনাধীন ছিল। দক্ষিণের এলাকায় বর্তমান তূর শহর ও আবু যানীমার মধ্যবর্তী স্থানে তামা ও নীলম পাথরের খনি ছিল। এ খনিজ সম্পদ দ্বারা মিসরবাসী প্রচুর লাভবান হতো। এ খনিগুলো সংরক্ষন করার জন্য মিসরীয়রা কয়েক জায়গায় টহলদার চৌকি স্থাপন করেছিল। মাফকাহ নামক স্থানে এ ধরনের একটি চৌকি ছিল। এখানে ছিল মিসরীয়দের একটি বিরাট মন্দির। উপদ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে এখনো এর ধ্বংসাবশেষে পাওয়া যায়। এর কাছাকাছি আর একটি স্থানে প্রাচীন সিরীয় জাতিসমূহের চন্দ্রদেবীর মন্দির ছিল। সম্ভবত এরই কোন একটি জায়গা দিয়ে যাবার সময় দীর্ঘকাল মিসরীয়দের গোলামীতে জীবন যাপন করার কারণে মিসরীয় পৌত্তলিক ভাবধারায় গভীরভাবে প্রভাবিত বনী ইসরাঈল সম্প্রদায়ের মনে একটি কৃত্রিম খোদার প্রয়োজন অনুভূত হয়ে থাকবে।
মিসরবাসীদের দাসত্ব বনী ইসরাঈলীদের মনমানসকে কিভাবে বিকৃত করে দিয়েছিল নিম্নোক্ত বিষয়টি থেকে তা সহজেই অনুমান করা যায়। মিসর থেকে বের হয়ে আসার ৭০ বছর পর হযরত মূসার প্রথম খলীফা হযরত ইউসা ইবনে নূন বনী ইসরাঈলীদের সাধারণ সমাবেশে তাঁর শেষ ভাষণে বলেনঃ
“তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সৎ সংকল্প ও নিষ্ঠার সাথে তাঁর উপাসনা করো। আর তোমাদের পূর্ব-পুরুষরা বড় নদীর (ফোরাত) ওপারে ও মিসরে যেসব দেবতার পূজা করতো তাদেরকে বাদ দাও। আর একমাত্র আল্লাহর ইবাদাত যদি তোমাদের খারাপ লাগে তাহলে তোমরা যার উপাসনা করবে আজই তাকে মনোনীত করে নাও। …..এখন রইলো আমার ও আমার পরিবারবর্গের কথা, আমরা শুধুমাত্র আল্লাহরই উপাসনা করতে থাকবো।” (যিহোশূয় ২৪: ১৪-১৫)
এ থেকে বুঝা যায় যে, ফেরাউন শাসিত মিসরের দাসত্বের যুগে এ জাতির শিরা উপশিরা পৌত্তলিকতার যে প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছিল, ৪০ বছর পর্যন্ত হযরত মূসার এবং ২৮ বছর পর্যন্ত হযরত ইউশা’র অধীনে শিক্ষা ও অনুশীলন লাভ এবং তাঁদের নেতৃত্ব জীবন পরিচালনা করার পরও তা দূর করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। এ অবস্থায় তারা নিজেদের সাবেক প্রভুদেরকে এসব মূর্তির পদতলে মাথা ঘষতে দেখেছে, মিসর থেকে বের হবার সাথে সাথেই সেই ধরনের মূর্তি দেখে তার সামনে মাথা নোয়াতে এসব বিকৃতমনা ও পথভ্রষ্ট মুসলমানরা যে উদগ্রীব হয়ে উঠবে না, সেটা কেমন করেই বা সম্ভব।
বনী ইসরাঈলদের মত অবস্থা এ উম্মতের মধ্যে ঘটেছে এবং নিত্য ঘটছে। এ উম্মাতের মধ্যেও কিছু না বুঝে না শুনে অন্যান্য জাতির অনুকরণে শির্ক ও কুফরী করার মানসিকতা রয়ে গেছে। আবু ওয়াকিদ আল-লাইসি বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এক হাদীসে এসেছে, আবু ওয়াকিদ বলেনঃ আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে হুনাইনের দিকে এক যুদ্ধে বের হলাম। আমরা একটা বরই গাছের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। তখন আমি বললামঃ হে আল্লাহর নবী! আমাদের জন্য এ গাছটিকে লটকানোর জন্য নির্ধারিত করে দিন যেমনটি নির্ধারিত রয়েছে কাফেরদের জন্য।
কারণ কাফেরদের একটি বরই গাছ ছিল যাতে তারা তাদের হাতিয়ার লটকিয়ে রাখত এবং তার চতুষ্পার্শ ঘিরে বসত। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আল্লাহু আকবার! এটা তো এমন যেমন বনী ইসরাঈল মূসাকে বলেছিলঃ “তাদের যেমন অনেক উপাস্য রয়েছে আমাদের জন্যও তেমন উপাস্য নির্ধারিত করে দিন”। অবশ্যই তোমরা তোমাদের পূর্ববর্তীদের রীতিনীতির অনুসরণ করবে। [তিরমিযীঃ ২১৮০ মুসনাদে আহমাদঃ ৫/২১৮, ইবন হিব্বানঃ ৬৭০২]
৭ : ১৩৯ اِنَّ هٰۤؤُلَآءِ مُتَبَّرٌ مَّا هُمۡ فِیۡهِ وَ بٰطِلٌ مَّا كَانُوۡا یَعۡمَلُوۡنَ
১৩৯. এসব লোক যাতে লিপ্ত রয়েছে তা তো বিধ্বস্ত করা হবে এবং তারা যা করছে তাও অমূলক।
৭ : ১৪০ قَالَ اَغَیۡرَ اللّٰهِ اَبۡغِیۡكُمۡ اِلٰـهًا وَّ هُوَ فَضَّلَكُمۡ عَلَی الۡعٰلَمِیۡنَ
১৪০. তিনি আরো বললেন, আল্লাহ ছাড়া তোমাদের জন্য আমি কি অন্য ইলাহ খোঁজ করব অথচ তিনি তোমাদেরকে সৃষ্টিকুলের উপর শ্ৰেষ্ঠত্ব দিয়েছেন?
২ : ৪৭ یٰبَنِیۡۤ اِسۡرَآءِیۡلَ اذۡكُرُوۡا نِعۡمَتِیَ الَّتِیۡۤ اَنۡعَمۡتُ عَلَیۡكُمۡ وَ اَنِّیۡ فَضَّلۡتُكُمۡ عَلَی الۡعٰلَمِیۡنَ
হে ইসরাঈল বংশধরগণ! আমার সে নেয়ামতের কথা স্মরণ কর যা আমি তোমাদেরকে দিয়েছিলাম। আর নিশ্চয় আমি সমগ্র সৃষ্টিকুলের উপর তোমাদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছিলাম।
কাতাদাহ ও মুজাহিদ বলেন, তাদেরকে তৎকালীন সময়ের সমস্ত সৃষ্টিকুলের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছিলেন। বর্তমানের সাথে সম্পৃক্ত নয়। [তাফসীর আব্দুর রাজ্জাক, তাবারী] তাদের শ্ৰেষ্ঠত্বের বিষয়াদি সম্পর্কে আবুল আলীয়াহ বলেন, তাদেরকে রাজত্ব, রাসূল, কিতাব ইত্যাদি দিয়ে ঐ সময়কার সমস্ত সৃষ্টিজগত থেকে আলাদা মর্যাদা দেয়া হয়েছিল। [আত-তাফসীরুস সহীহ] ইবনে কাসীর বলেন, অবশ্যই এ শ্রেষ্ঠত্ব তৎকালীন সময়ের সাথে সম্পৃক্ত বলতে হবে। কারণ, এ উম্মত অর্থাৎ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উম্মত তাদের থেকেও উত্তম। কারণ, আল্লাহ্ তা’আলা বলেন, “তোমরাই শ্ৰেষ্ঠ উম্মত, মানব জাতির জন্য তোমাদের আবির্ভাব হয়েছে; তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দিবে, অসৎকাজে নিষেধ করবে এবং আল্লাহর উপর ঈমান আনবে।
তাদের প্রতি কৃত পুরস্কারসমূহের মধ্যে অন্যতম পুরস্কার হল, তাদেরকে নিখিল বিশ্বের সবার উপরে শ্রেষ্ঠত্ব দান করা হয়েছিল। অর্থাৎ, উম্মাতে মুহাম্মাদীয়ার পূর্বে জগত-শ্রেষ্ঠ হওয়ার দুর্লভ মর্যাদা বানী-ইস্রাঈলরাই লাভ করেছিল। কিন্তু আল্লাহর অবাধ্যতার শিকার হয়ে এই মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য তারা হারিয়ে ফেলে এবং উম্মাতে মুহাম্মাদীকে “সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মত” উপাধি দান করা হয়। এখানে এ ব্যাপারেও সতর্ক করা হয়েছে যে, ইলাহী পুরস্কারসমূহ কোন বিশেষ গোষ্ঠীর সাথে নির্দিষ্ট নয়, বরং তা ঈমান ও আমলের ভিত্তিতে লাভ করা যায় এবং ঈমান ও আমল থেকে বঞ্চিত হলে ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
আহলে কিতাবগণ যদি ঈমান আনতো তবে তা ছিল তাদের জন্য ভাল [সূরা আলে ইমরান ১১০] তাছাড়া হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “তোমরা সত্তরটি উম্মত পূর্ণ করবে। তন্মধ্যে তোমরা হচ্ছ আল্লাহর নিকট সবচেয়ে উত্তম এবং সম্মানিত” [ইবনে মাজাহঃ ৪২৮৭, মুসনাদে আহমাদ: ৫/৩]
৭ : ১৪১ وَ اِذۡ اَنۡجَیۡنٰكُمۡ مِّنۡ اٰلِ فِرۡعَوۡنَ یَسُوۡمُوۡنَكُمۡ سُوۡٓءَ الۡعَذَابِ ۚ یُقَتِّلُوۡنَ اَبۡنَآءَكُمۡ وَ یَسۡتَحۡیُوۡنَ نِسَآءَكُمۡ ؕ وَ فِیۡ ذٰلِكُمۡ بَلَآءٌ مِّنۡ رَّبِّكُمۡ عَظِیۡمٌ
১৪১. আর স্মরণ কর, যখন আমরা তোমাদেরকে ফিরআউনের অনুসারীদের হাত থেকে উদ্ধার করেছি যারা তোমাদেরকে নিকৃষ্ট শাস্তি দিত। তারা তোমাদের পুত্র-সন্তানদেরকে হত্যা করত এবং তোমাদের নারীদেরকে জীবিত রাখত; এতে ছিল তোমাদের রবের এক মহাপরীক্ষা।
আমরা বনী-ইসরাঈলকে সাগর পার করে দিয়েছি। ফিরআউন সম্প্রদায়ের মোকাবেলায় বনী-ইসরাঈলের যে অলৌকিক কৃতকার্যতা ও প্রশান্তি লাভ হয়, তার সে প্রতিক্রিয়াই হয়েছে যা সাধারণতঃ প্রাচুর্য আসার পর বস্তুবাদী জনগোষ্ঠীর মধ্যে সৃষ্টি হয়ে থাকে। অর্থাৎ তারাও ভোগবিলাসের প্রতি আকৃষ্ট হতে শুরু করল। ঘটনাটি হল এই যে, এই জাতি মূসা আলাইহিস সালামের মু’জিযা বলে সদ্য লোহিত সাগর পাড়ি দিয়ে এসেছিল এবং গোটা ফিরআউন সম্প্রদায়ের সাগরে ডুবে মরার দৃশ্য স্বচক্ষে দেখে নিয়েছিল, কিন্তু তা সত্বেও একটু অগ্রসর হতেই তারা এমন এক মানব গোষ্ঠীর বাসভূমির উপর দিয়ে অতিক্রম করল, যারা বিভিন্ন মূর্তির পূজায় লিপ্ত ছিল।
এই দেখে বনী ইসরাঈলেরও তাদের সেসব রীতি-নীতি পছন্দ হতে লাগল। তাই মূসা আলাইহিস সালামের নিকট আবেদন জানাল, এসব লোকের যেমন বহু উপাস্য রয়েছে, আপনি আমাদের জন্যও এমনি ধরণের কোন একটা উপাস্য নির্ধারণ করে দিন, যাতে আমরা একটা দৃষ্ট বস্তুকে সামনে রেখে ইবাদাত করতে পারি, আল্লাহর সত্তা তো আর সামনে আসে না।
মূসা আলাইহিস সালাম বললেন, “তোমাদের মধ্যে বড়ই মূর্খতা রয়েছে।” যাদের রীতি-নীতি তোমরা পছন্দ করছ, তাদের সমস্ত আমল তো বিনষ্ট ও বরবাদ হয়ে গেছে। এরা মিথ্যার অনুগামী। তাদের এসব ভ্রান্ত রীতি-নীতির প্রতি আকৃষ্ট হওয়া তোমাদের পক্ষে উচিত নয়। আল্লাহকে বাদ দিয়ে আমি কি তোমাদের জন্য অন্য কোন উপাস্য বানিয়ে দেব? অথচ তিনিই তোমাদেরকে দুনিয়াবাসীর উপর বিশিষ্টতা দান করেছেন। অর্থাৎ তৎকালীন বিশ্ববাসীর উপর মর্যাদাসম্পন্ন করেছেন। কারণ, তখন মূসা আলাইহিস সালামের উপর যারা ঈমান এনেছিল, তারাই ছিল অন্যান্য লোক অপেক্ষা বেশী মর্যাদাসম্পন্ন ও উত্তম
অতঃপর বনী-ইস্রাঈলকে তাদের বিগত অবস্থা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলা হয়েছে যে, ফিরআউনের কওমের হাতে তারা এমনই নির্যাতিত ও দুর্দশাগ্রস্ত ছিল যে, তাদের ছেলেদেরকে হত্যা করে নারীদেরকে অব্যাহতি দেয়া হত সেবাদাসী বানিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে। আল্লাহ মূসা ‘আলাইহিস সালামের বদৌলতে এবং তার দোআর বরকতে তাদেরকে সে আযাব থেকে মুক্তি দিয়েছেন। এই অনুগ্রহের প্রভাব কি এই হওয়া উচিত যে, তোমরা সেই রাব্বুল আলামীনের সাথে দুনিয়ার নিকৃষ্টতম পাথরকে অংশীদার সাব্যস্ত করবে। এযে মহা যুলুম। এই থেকে তাওবাহ কর।
কৃতজ্ঞ হওয়ার জন্য—
আপনার প্রতি আল্লাহ্ তা’য়ালার অসংখ্য করুণার কথা স্মরণ করুন, কীভাবে সে করুণাসমূহ আপনাকে আপাদমস্তক বেষ্টন করে রেখেছে-আসলে সর্বদিক দিয়েই ঐ করুণাসমূহ আপনাকে ঘিরে রেখেছে।
وَإِنْ تَعُدُّوا نِعْمَتَ اللَّهِ لَا تُحْصُوهَا
“যদি তুমি আল্লাহর নিয়ামতরাজিকে গণনা করতে চাও তবে তা তুমি কখনও গণনা করে শেষ করতে পারবে না।” (১৪-সূরা ইবরাহীম: আয়াত-৩৪)
সুস্থতা, নিরাপত্তা, খাদ্য, বস্ত্র, বায়ু ও পানি ইত্যাদি সবকিছুই দুনিয়াটাকে আপনার বলে ঘোষণা দিচ্ছে-তবুও আপনি বুঝতে পারছেন না। জীবন ধারণের জন্য অপরিহার্য প্রয়োজনীয় যা কিছু থাকতে হয় তার সবকিছুই আপনার আছে- তবুও আপনি অজ্ঞই থেকে গেলেন।
وَأَسْبَغَ عَلَيْكُمْ نِعَمَهُ ظَاهِرَةً وَبَاطِنَةً
“তিনি তোমাদের উপর তার প্রকাশ্য ও গোপন নিয়ামতসমূহ পূর্ণ করে রেখেছেন।” (৩১-সূরা লুকমান: আয়াত-২০) (প্রকাশ্য নিয়ামত হল ইসলামী একত্ববাদ বা তাওহীদ এবং সুস্থতা, সৌন্দর্য ইত্যাদিসহ এ জগতের বৈধ যৌন আমোদপ্রমোদ। আর অপ্রকাশ্য বা গোপন নিয়ামত হল আল্লাহর প্রতি কারো ঈমান, আমলে সালেহ বা সৎকাজের জন্য পথনির্দেশক, কুরআনের উপর ঈমান এবং আখেরাতে বেহেশতের আনন্দ-ফুর্তি ইত্যাদির প্রতি ঈমান।)
নিজের আয়ত্তে আপনার দুটি আঁখি, একটি জিহ্বা, দুটি ঠোট, দুটি হাত আর দুটি পা আছে। (একটু ভেবে দেখুন ও কৃতজ্ঞ হোন -অনুবাদক)
فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ
“সুতরাং (হে জ্বীন ও ইনসান জাতি!) তোমরা উভয় জাতি তোমাদের প্রতিপালকের কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে? (৫৫-সূরা আর রাহমান: আয়াত-১৩)
একটু ভেবে দেখুন এবং কৃতজ্ঞ হন।
وَفِي أَنْفُسِكُمْ أَفَلَا تُبْصِرُونَ
“এবং তোমাদের নিজেদের মধ্যেও (আমার নিদর্শন আছে), তাহলে তোমরা কি (তা) দেখতে পাও না?” (৫১-সূরা যারিয়াত: আয়াত-২১)
আপনার নিজের কথা, আপনার পরিবারের কথা, আপনার বন্ধু-বান্ধবের এবং আপনার চারপাশের গোটা দুনিয়ার কথা গভীরভাবে চিন্তা-গবেষণা করুন।
আপনার রিযিক, আপনার স্ত্রী, আপনার সন্তানাদি, আপনার কাজ, আপনার গৃহ এবং আপনার জীবনযাপনের উপর সন্তুষ্ট থাকুন।
فَخُذْ مَا آتَيْتُكَ وَكُنْ مِنَ الشَّاكِرِينَ
আমি আপনাকে যা দান করেছি তা গ্রহণ করুন এবং কৃতজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হোন। (৭-সূরা আল আ’রাফ: আয়াত-১৪৪)
يَعْرِفُونَ نِعْمَتَ اللَّهِ ثُمَّ يُنكِرُونَهَا وَأَكْثَرُهُمُ الْكَافِرُونَ তারা আল্লাহর নিয়ামতকে অনুধাবন করতে পারে, তবুও তা তারা অস্বীকার করে তাদের অধিকাংশই কাফের। (১৬-সূরা আন নাহল: আয়াত-৮৩)