أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
৭ : ৯৪ وَ مَاۤ اَرۡسَلۡنَا فِیۡ قَرۡیَۃٍ مِّنۡ نَّبِیٍّ اِلَّاۤ اَخَذۡنَاۤ اَهۡلَهَا بِالۡبَاۡسَآءِ وَ الضَّرَّآءِ لَعَلَّهُمۡ یَضَّرَّعُوۡنَ
৯৪. আর আমরা কোন জনপদে নবী পাঠালেই সেখানকার অধিবাসীদেরকে অর্থ-সংকট ও দুঃখ-কষ্ট দ্বারা আক্রান্ত করি, যাতে তারা কাকুতি-মিনতি করে।
بأسَاء শারীরিক কষ্টকে বুঝায়; যেমন অসুখ ও অসুস্থতা। আর ضَرَّاء বলা হয় অভাব ও দারিদ্র্যকে। উদ্দেশ্য এই যে, যে জনপদেই আমি রসূল প্রেরণ করি এবং সেখানকার মানুষ তাকে মিথ্যাজ্ঞান করে, যার ফলে আমি তাদেরকে অসুখ ও দারিদ্র্য দিয়ে পরীক্ষা করে থাকি, যার উদ্দেশ্য হয় যে, তারা যেন আল্লাহর পথে ফিরে আসে এবং তাঁর নিকট কাকুতি-মিনতি করে।
এ আয়াতে বলা হয়েছে যে, নূহ আলাইহিস সালামের সম্প্রদায় এবং আদ’ ও সামূদ জাতিকে যেসব ঘটনার সম্মুখীন হতে হয়েছিল, তা শুধুমাত্র তাদের সাথেই এককভাবে সম্পৃক্ত নয়; বরং সকল জাতির জন্য সমভাবে প্রযোজ্য। কুরাইশ কাফেরদের জন্যও প্রযোজ্য। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন স্বীয় রীতি অনুযায়ী দুনিয়ার বিভ্রান্ত জাতি-সম্প্রদায়ের সংশোধন ও কল্যাণ সাধনকল্পে যেসব নবী-রাসূল প্রেরণ করেন তাদের আদেশ-উপদেশের প্রতি যারা মনোনিবেশ করে না প্রথমে তাদেরকে পার্থিব বিপদাপদের সম্মুখীন করা হয়, যাতে এই বিপদাপদের চাপে আল্লাহর দিকে মনোযোগী হতে পারে। তাঁরই দিকে ফিরে আসতে পারে, নবী-রাসূলদের উপর মিথ্যারোপ করা থেকে বিরত হয়। [তাবারী; সাদী]
কুরআনে কারীমে এবিষয়ে আমাদের সচেতন করেছেন। ইরশাদ হয়েছে-
وَ نَبْلُوْكُمْ بِالشَّرِّ وَ الْخَیْرِ فِتْنَةً .
আর আমি মন্দ ও ভালো দিয়ে তোমাদের পরীক্ষা করি। -সূরা আম্বিয়া (২১) : ৩৫
مِنْهُمُ الصّٰلِحُوْنَ وَ مِنْهُمْ دُوْنَ ذٰلِكَ ؗ وَ بَلَوْنٰهُمْ بِالْحَسَنٰتِ وَ السَّیِّاٰتِ لَعَلَّهُمْ یَرْجِعُوْنَ.
তাদের মধ্যে কতক ছিল সৎকর্মশীল এবং কতক অন্য রকম। আমি তাদেরকে ভালো ও মন্দ অবস্থা দ্বারা পরীক্ষা করেছি, যাতে তারা (সঠিক পথের দিকে) ফিরে আসে। -সূরা আরাফ (৭) : ১৬৮
আল্লাহ মানুষকে যেভাবে পরীক্ষা করেন: আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন,
২ : ১৫৫ وَ لَنَبۡلُوَنَّكُمۡ بِشَیۡءٍ مِّنَ الۡخَوۡفِ وَ الۡجُوۡعِ وَ نَقۡصٍ مِّنَ الۡاَمۡوَالِ وَ الۡاَنۡفُسِ وَ الثَّمَرٰتِ ؕ وَ بَشِّرِ الصّٰبِرِیۡنَ
২ : ১৫৬ الَّذِیۡنَ اِذَاۤ اَصَابَتۡهُمۡ مُّصِیۡبَۃٌ ۙ قَالُوۡۤا اِنَّا لِلّٰهِ وَ اِنَّاۤ اِلَیۡهِ رٰجِعُوۡنَ
২ : ১৫৭ اُولٰٓئِكَ عَلَیۡهِمۡ صَلَوٰتٌ مِّنۡ رَّبِّهِمۡ وَ رَحۡمَۃٌ ۟ وَ اُولٰٓئِكَ هُمُ الۡمُهۡتَدُوۡنَ
“অবশ্যই আমি তোমাদিগকে পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, মাল ও জানের ক্ষতি ও ফল-ফসল বিনষ্টের মাধ্যমে। তবে সুসংবাদ দাও সবরকারীদের।যখন তারা বিপদে পতিত হয়, তখন বলে, নিশ্চয় আমরা সবাই আল্লাহর জন্য এবং আমরা সবাই তাঁরই সান্নিধ্যে ফিরে যাবো।তারা সে সমস্ত লোক, যাদের প্রতি আল্লাহর অফুরন্ত অনুগ্রহ ও রহমত রয়েছে এবং এসব লোকই হেদায়েত প্রাপ্ত।(সূরা :বাকারা,আয়াত:১৫৫-১৫৭)
উপরোক্ত আয়াতে আল্লাহতায়ালা মানুষকে পাঁচটি বিষয়ে অবশ্যই পরীক্ষা করবেন।
পরীক্ষা গুলো হলো:
-ভয়:
-ক্ষুধা বা দারিদ্র্য:
-সহায়-সম্পদের ক্ষতি:
-জীবনের ক্ষয়ক্ষতি:
-ফল-ফসলাদির ক্ষতি:
মহান আল্লাহ বলেন, ‘পৃথিবীতে যা কিছু আছে, আমি তা তার জন্য শোভা বানিয়েছি, যেন আমি পরীক্ষা করতে পারি মানুষের মধ্যে আমলে কে শ্রেষ্ঠ।’(সুরা : কাহফ : ৭) পৃথিবীর শোভা মানুষের জন্য পরীক্ষা
কেউ যদি ক্ষমতা, সম্মান, সামাজিক মান, পদমর্যাদা ও সম্পদ দ্বারা ভূষিত হয়, তবে তাকে অবশ্যই বুঝতে হবে যে সে পরীক্ষিত হচ্ছে। সুলাঈমান (আঃ) যখন রাণী বিলকিসের সিংহাসনকে তার সামনে হাজির দেখলেন তখন তিনি বলেন-
هَٰذَا مِن فَضْلِ رَبِّي لِيَبْلُوَنِي أَأَشْكُرُ أَمْ أَكْفُرُ
“এটাতো আমার প্রতিপালকের দয়ার বদৌলতে, আমাকে পরিক্ষা করার জন্য-আমি কি কৃতজ্ঞ হই নাকি অকৃতজ্ঞ হই।” (২৭-সূরা আন নামলঃ আয়াত-৪০)
কঠোর পরীক্ষার মধ্য দিয়েই কৃতজ্ঞদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশিত হয়, পক্ষান্তরে অকৃতজ্ঞরাও চিহ্নিত হয়ে যায়। আর আমাদেরকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, আল্লাহ আমাদেরকে সুসময়ে এবং দুঃসময়েও পরীক্ষা করেন।
“আর মানুষতো এমন যে, যখন তার প্রতিপালক তাকে সম্মানিত করে ও তাকে অনুগ্রহ দান করে পরীক্ষা করেন তখন সে বলে, “আমার প্রভু আমাকে সম্মানিত করেছেন।” কিন্তু যখন তিনি তার রিযিককে সংকুচিত করে দিয়ে তাকে পরীক্ষা করেন তখন সে বলে, “আমার প্রতিপালক আমাকে অপমানিত করেছেন।” কখনও না….।” (৮৯-সূরা আল ফাজরঃ আয়াত-১৫-১৭)
মুমিনের পরীক্ষার কারন অন্যরকম—
“মানুষের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন মুসিবতের শিকার হয়েছেন নবীগণ; অতঃপর ক্রমানুসারে পরবর্তী ধাপের সৎব্যক্তিগণ, ব্যক্তি পরীক্ষা বা কষ্টের সম্মুখীন হবে তার দীনদারী অনুসারে; সুতরাং সে যদি তার দীনের ব্যাপারে দৃঢ়তার সাথে অটল থাকে, তাহলে তার বিপদ-আপদও কঠোর থেকে কঠোরতর হবে; আর যদি সে তার দীনের ব্যাপারে আপোষকামী হয়, তাহলে সে পরীক্ষা বা কষ্টের সম্মুখীন হবে তার দীনদারী অনুসারে; সুতরাং বান্দা বালা-মুসিবতে আক্রান্ত হতেই থাকবে যতক্ষণ না তা তাকে যমীনের উপরে গুনাহ বিহীন অবস্থায় চলাফেরা করাতে পারবে।” তিরমিযী- ২৩৯৮; ইবনু মাজাহ,- ৪০২৩; দারেমী: ২/৩২০; ইবনু হিব্বান:
“যখন আল্লাহ তা‘আলা কোনো মুসলিম বান্দাকে তার শারীরিক দুঃখ-কষ্ট বা রোগ-ব্যাধির দ্বারা পরীক্ষা করেন, তখন আল্লাহ বলেন: তার সৎকাজগুলো লিখ, যে কাজগুলো সে (সুস্থ অবস্থায়) করত; অতঃপর তিনি যদি তাকে রোগমুক্ত করেন, তাহলে তিনি (রহমতের পানি দ্বারা) ধুয়ে মুছে তাকে পবিত্র করে দেন; আর যদি তাকে মৃত্যুর মাধ্যমে উঠিয়ে নেন, তাহলে তিনি তাকে ক্ষমা করে দেন এবং তার প্রতি রহম করেন।” আহমাদ: (৩/১৪৮, ২৩৮, ২৫৮); তিনি হাদিসটি হাম্মাদ ইবন সালামা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি সিনান ইবন রবি‘আ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণনা করেন।
৭ : ৯৫ ثُمَّ بَدَّلۡنَا مَكَانَ السَّیِّئَۃِ الۡحَسَنَۃَ حَتّٰی عَفَوۡا وَّ قَالُوۡا قَدۡ مَسَّ اٰبَآءَنَا الضَّرَّآءُ وَ السَّرَّآءُ فَاَخَذۡنٰهُمۡ بَغۡتَۃً وَّ هُمۡ لَا یَشۡعُرُوۡنَ
৯৫. তারপর আমরা অকল্যাণকে কল্যাণে পরিবর্তিত করি। অবশেষে তারা প্রাচুর্যের অধিকারী হয় এবং বলে, আমাদের পূর্বপুরুষরাও তো দুঃখ-সুখ ভোগ করেছে। অতঃপর হঠাৎ আমরা তাদেরকে পাকড়াও করি, এমনভাবে যে, তারা উপলব্ধিও করতে পারে না।
এক একজন নবী ও এক একটি সম্প্রদায়ের ব্যাপার আলাদা আলাদা ভাবে বর্ণনা করার পর এবার একটি সাধারণ ও সর্বব্যাপী নিয়ম ও বিধান বর্ণনা করা হচ্ছে। প্রতি যুগে প্রত্যেক নবীকে প্রেরণ করার সময় মহান আল্লাহ এ নিয়মটি অবলম্বন করেন।
নিয়মটি হচ্ছে, যখনই কোন সম্প্রদায়ের মধ্যে কোন নবী পাঠানো হয়েছে, তখনই প্রথমে সেই সম্প্রদায়ের বাহ্যিক পরিবেশকে নবীর দাওয়াত গ্রহণের জন্য সর্বাধিক অনুকূল ও উপযোগী বানানো হয়েছে। অর্থাৎ তাদেরকে রকমারি দুর্যোগ দুর্বিপাক ও বিপদের মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে। দুর্ভিক্ষ, মহামারী, বানিজ্যিক, ক্ষয়ক্ষতি, সামরিক পরাজয় ও এ ধরনের আরো নানান দুর্ভোগ তাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে, যাতে তাদের মন নরম হয়ে যায়, অহংকার ও ঔদ্ধত্যে দৃপ্ত গ্রীবা নত হয়, শক্তিমদত্ততা ও ধনলিপ্সা নিস্তেজ হয়ে পড়ে। নিজেদের উপায়-উপকরণ, শক্তি ও যোগ্যতার ওপর নির্ভরতা ভেঙ্গে পড়ে এবং তারা যাতে অনুভব করতে পারে যে ওপরে অন্য কোন শক্তিধর সত্তা আছে এবং তারই হাতে রয়েছে তাদের ভাগ্যের লাগাম। এভাবে উপদেশের বানী শোনার জন্য তাদের কান খুলে যাবে এবং নিজেদের প্রভু পরওয়ারদিগারের সামনে সবিনয়ে শির আনত করার জন্য তারা প্রস্তুত হয়ে যাবে।
তারপর এ ধরনের উপযোগী পরিবেশেও তাদের মন সত্যকে গ্রহণ করতে উদ্যোগী না হলে সমৃদ্ধি ও প্রাচুর্যের পরীক্ষার মধ্যে তাদেরকে ঠেলে দেয়া হয়। এখান থেকেই শুরু হয় তাদের ধ্বংসের প্রক্রিয়া। প্রাচুর্য ও সমৃদ্ধির মধ্যে জীবন যাপন করার সময় তারা নিজেদের দুর্দিনের কথা ভুলে যায়। তাদের বিকৃত বিবেকবুদ্ধি সম্পন্ন নেতৃত্ববর্গ তাদের মনোজগতে ইতিহাসের এ নির্বোধ সুলভ ধারণা ঢুকিয়ে দেয় যে, জগতে যা কিছু উত্থান পতন ও ভাঙ্গা-গড়া চলছে, তা কোন বিচক্ষণ কুশলী সত্তার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় হচ্ছে না এবং কোন নৈতিক কারণেও হচ্ছে না। বরং একটি অচেতন ও অন্ধ প্রকৃতি, সম্পূর্ণ নীতি বিবর্জিত কার্যকরণের ভিত্তিতে কখনো ভালো ও কখনো মন্দ দিনের উদ্ভব ঘটাতে থাকে। কাজেই ঝড় ঝন্ঝা ও বিপদ-আপদের অবতারণা থেকে কোন নৈতিক শিক্ষা গ্রহণ করা এবং কোন শুভাকাংখীর সদুপদেশ মেনে নিয়ে আল্লাহর সামনে বিনীতভাবে কান্নাকাটি শুরু করে দেয়া এক ধরনের মানসিক দুর্বলতা ছাড়া আর কিছুই নয়। নবী ﷺ এ নির্বোধসুলভ মানসিকতারই নকশা একেছেন নিম্নোক্ত হাদীসটিতে।
لاَ يَزَالُ الْبَلاَءُ بِالْمُؤْمِنِ ِ حَتَّى يَخْرُجَ نَقِيًّامِن ذُنُوبِه , وَالمُنَافِقُ مَثَلُهُ كَمَثَلِ الْحِمَارِ لاَيَدرِى فَيمَ رَبَطَهُ اَهلُهُ وَلاَ فِيمَ اَرسَلُوهُ-
“বিপদ-মুসিবত তো মু’মিনকে পর্যায়ক্রমে সংশোধন করতে থাকে, অবশেষে যখন সে এ চুল্লী থেকে বের হয়, তখন তার সমস্ত ভেজাল ও খাদ পুড়ে সে পরিচ্ছন্ন ও খাঁটি হয়ে বেরিয়ে আসে। কিন্তু মুনাফিকের অবস্থা হয় ঠিক গাধার মতো। সে কিছুই বোঝে না, তার মালিক কেন তাকে বেঁধে রেখেছিল আবার কেনইবা তাকে ছেড়ে দিল।”
কাজেই যখন কোন জাতির অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে, বিপদেও তার হৃদয় আল্লাহর সামনে নত হয় না, আল্লাহর অপরিসীম অনুগ্রহে ও ধন-সম্পদের প্রাচুর্যেও তার হৃদয়ে কৃতজ্ঞতাবোধ জাগে না এবং কোন অবস্থায়ই সে সংশোধিত হয় না, তখন ধ্বংস তার মাথার ওপর এমনভাবে চক্রাকারে ঘুরতে থাকে যেন তা যে কোন সময় তার ওপর নেমে আসবে। ঠিক যেমন সন্তান ধারণের সময় পূর্ণ হয়ে গেছে, এমন একজন গর্ভবতী নারীর যে কোন সময় সন্তান প্রসব হতে পারে।
এখানে আরো একটি কথাও জেনে নেয়া উচিত। এ আয়াতগুলোতে আল্লাহ নিজের যে নিয়মের কথা উল্লেখ করেছেন নবী (সা.) এর আবির্ভাবকালেও ঠিক সেই নিয়মটিই কার্যকর করা হয়। ভাগ্য বিড়ম্বিত জাতিগুলোর যেসব কর্মকাণ্ডের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে, সূরা আ’রাফ অবতীর্ণ হওয়ার দিনগুলোতে মক্কার কুরাইশরা ঠিক সেই একই ধরনের কর্মকাণ্ডের প্রকাশ ঘটিয়ে চলছিল। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) ও আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) উভয়েই একযোগে রেওয়াত করেছেন যে, নবী (সা.) এর নবুওয়াত লাভের পর যখন কুরাইশরা তাঁর দাওয়াতের বিরুদ্ধে চরম উগ্র মনোভাব অবলম্বন করতে শুরু করে তখন নবী (সা.) দোয়া করেন, হে আল্লাহ! ইউসুফের যুগে যেমন সাত বছর দুর্ভিক্ষ হয়েছিল তেমনি ধরনের দুর্ভিক্ষের সাহায্যে এ লোকদের মোকাবিলা করার ব্যাপারে আমাকে সাহায্য করো। ফলে আল্লাহ তাদেরকে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সম্মুখীন করেন। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে, লোকেরা মৃত প্রাণীর গোশত খেতে শুরু করে, এমন কি চামড়া, হাড় ও পশম পর্যন্ত খেয়ে ফেলে। অবশেষে মক্কার লোকেরা আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে নবী (সা.) এর কাছে তাদের জন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া করার আবেদন জানায়। কিন্তু তাঁর দোয়ায় আল্লাহ যখন সেই মহা সংকট থেকে তাদেরকে উদ্ধার করেন এবং লোকেরা আবার সুদিনের মুখ দেখে তখন তাদের বুক অহংকারে আগের চাইতে আরো বেশী স্ফীত হয়ে উঠে। তাদের মধ্যে থেকে যে গুটিকয় লোকের মন নরম হয়ে গিয়েছিল, দুষ্টলোকেরা তাদেরকেও এ বলে ঈমানের পথ থেকে ফিরিয়ে নিতে থাকেঃ আরে মিয়া! এসব তো সময়ের উত্থান পতন ও কালের আবর্তন ছাড়া আর কিছুই নয়। এর আগেও দুর্ভিক্ষ এসেছে। এবারের দুর্ভিক্ষ দীর্ঘ দিন স্থায়ী হয়েছে এটা কোন নতুন কথা নয়। কাজেই এসব ব্যাপারে প্রতারিত হয়ে মুহাম্মাদের ফাঁদে পা দিয়ো না। এ সূরা আ’রাফ যে সময় নাযিল হয় সে সময় মুশরিকরা এ বাগাড়ম্বর করে বেড়াচ্ছিল। কাজেই কুরআন মজীদের এসব আয়াত অত্যন্ত সময়োপযোগী ও চলতি ঘটনাবলীর সাথে সামঞ্জস্যশীল ছিল। এ পটভূমিকার আলোকে এ আয়াতগুলোর নিগূঢ় অর্থ ও তাৎপর্য পুরোপুরি অনুধাবন করা যেতে পারে
মানুষকে কোন বিপদ স্পর্শ করার পর যখন আমি তাদেরকে কোন নিয়ামতের স্বাদ উপভোগ করাই, তখনই তারা আমার আয়াতসমূহ সম্বন্ধে দূরভিসন্ধি (কুমতলব) করতে থাকে। তুমি বলে দাও, ‘আল্লাহ দুরভিসন্ধিতে অধিক তৎপর।’ নিশ্চয়ই আমার ফিরিশতাগণ তোমাদের সকল দুরভিসন্ধি লিপিবদ্ধ করছে। সূরা ইউনুসঃ ২১
আল্লাহ দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন এক জনপদের যা ছিল নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত, যেথায় আসতো সর্বদিক হতে প্রচুর জীবনোপকরণ; অতঃপর তারা আল্লাহর অনুগ্রহ অস্বীকার করল; ফলে তারা যা করত, তার জন্য আল্লাহ তাদেরকে আস্বাদন করালেন ক্ষুধা ও ভীতির স্বাদ। সূরা নহলঃ১১২
অধিকাংশ ব্যাখ্যাকারীগণ এই জনপদ বা শহর বলতে মক্কা বুঝিয়েছেন। অর্থাৎ, এই আয়াতে মক্কা ও মক্কাবাসীদের অবস্থা বর্ণিত হয়েছে। আর তা ঐ সময় ঘটেছিল যখন আল্লাহর রসূল (সাঃ) তাদের জন্য অভিশাপ দিয়ে বলেছিলেন, اللهم اشدد وطأتك على مضر واجعلها عليهم سنين كسني يوسف অর্থাৎ, হে আল্লাহ মুযার গোত্রকে কঠিনভাবে ধর এবং তাদের উপর এমন অনাবৃষ্টি এনে দাও যেমন ইউসুফ (আঃ)-এর যুগে মিসরে হয়েছিল। (বুখারী ৪৮২১, মুসলিম ২১৫৬নং) অতএব মহান আল্লাহ তাদের নিরাপত্তাকে ভয় এবং সুখকে ক্ষুধা দ্বারা পরিবর্তন করে দিয়েছিলেন। এমন কি তাদের অবস্থা এই পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল যে, তারা হাড় ও গাছের পাতা খেয়ে দিন যাপন করতে বাধ্য হয়েছিল। কিছু ব্যাখ্যাকারীর মতে এই জনপদ কোন নির্দিষ্ট গ্রাম নয়। বরং এটি উপমা স্বরূপ ব্যক্ত করা হয়েছে যে, অকৃতজ্ঞ লোকেদের এই পরিণাম হবে। তাতে তারা যে স্থানের বা যে কালেরই হোক না কেন।
৭ : ৯৬ وَ لَوۡ اَنَّ اَهۡلَ الۡقُرٰۤی اٰمَنُوۡا وَ اتَّقَوۡا لَفَتَحۡنَا عَلَیۡهِمۡ بَرَكٰتٍ مِّنَ السَّمَآءِ وَ الۡاَرۡضِ وَ لٰكِنۡ كَذَّبُوۡا فَاَخَذۡنٰهُمۡ بِمَا كَانُوۡا یَكۡسِبُوۡنَ
(৯৬) আর যদি জনপদের অধিবাসীবৃন্দ বিশ্বাস করত ও সাবধান হত, তাহলে তাদের জন্য আমি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর কল্যাণ-দ্বার উন্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা মিথ্যা মনে করল। ফলে তাদের কৃতকর্মের জন্য আমি তাদেরকে পাকড়াও করলাম।
৭ : ৯৭ اَفَاَمِنَ اَهۡلُ الۡقُرٰۤی اَنۡ یَّاۡتِیَهُمۡ بَاۡسُنَا بَیَاتًا وَّ هُمۡ نَآئِمُوۡنَ
(৯৭) তবে কি জনপদের অধিবাসীবৃন্দ ভয় রাখে না যে, আমার শাস্তি তাদের উপর আসবে রাত্রিকালে, যখন তারা থাকবে ঘুমে মগ্ন ?
৭ : ৯৮ اَوَ اَمِنَ اَهۡلُ الۡقُرٰۤی اَنۡ یَّاۡتِیَهُمۡ بَاۡسُنَا ضُحًی وَّ هُمۡ یَلۡعَبُوۡنَ
(৯৮) অথবা জনপদের অধিবাসীবৃন্দ কি ভয় করে না যে, আমার শাস্তি তাদের উপর আসবে দিনের প্রথম ভাগে, যখন তারা থাকবে খেলায় মত্ত?
বরকতের শাব্দিক অর্থ প্রবৃদ্ধি। আর বরকতের মূল হচ্ছে, কোন কিছু নিয়মিত থাকা। [বাগভী] ‘আসমান ও যমীনের সমস্ত বরকত খুলে দেয়া’ বলতে উদ্দেশ্য হল সব রকম কল্যাণ সবদিক থেকে খুলে দেয়া। অর্থাৎ তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক সময়ে আসমান থেকে বৃষ্টি বর্ষিত হত আর যমীন থেকে যে কোন বস্তু তাদের মনমত উৎপাদিত হত এবং অতঃপর সেসব বস্তু দ্বারা তাদের লাভবান হওয়ার এবং সুখস্বাচ্ছন্দ্যের ব্যবস্থা করে দেয়া হত। ফা[তহুল কাদীর] তাতে তাদেরকে এমন কোন চিন্তা-ভাবনা কিংবা টানাপোড়নের সম্মুখীন হতে হত না যার দরুন বড় বড় নেয়ামতও পঙ্কিলতাপূর্ণ হয়ে পড়ে। ফলে তাদের প্রতিটি বিষয়ে বরকত বা প্রবৃদ্ধি ঘটত।
“আর যে কেউ আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করে আল্লাহ তার জন্য (উত্তরণের) পথ করে দেবেন, এবং তিনি তাকে তার ধারণাতীত উৎস হতে দান করবেন রিযিক”। সূরা তালাকঃ ২-৩
পৃথিবীতে বরকতের বিকাশ ঘটে দু’রকমে।
কখনো মুল বস্তুটি প্রকৃতভাবেই বেড়ে যায়। যেমন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মু’জিযাসমূহের মধ্যে রয়েছে একটা সাধারণ পাত্রের পানি দ্বারা গোটা কাফেলার পরিতৃপ্ত হওয়া। কিংবা সামান্য খাদ্য দ্রব্যে বিরাট সমাবেশের পেটভরে খাওয়া যা সঠিক ও বিশুদ্ধ রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে।
আবার কোন কোন সময় মূল বস্তুতে বাহ্যতঃ কোন বরকত বা প্রবৃদ্ধি যদিও হয় না, পরিমাণে যা ছিল তাই থেকে যায় কিন্তু তার দ্বারা এতবেশী কাজ হয় যা এমন দ্বিগুণ, চতুর্গুণ বস্তুর দ্বারাও সাধারণতঃ সম্ভব হয় না।
তাছাড়া সাধারণভাবেও দেখা যায় যে, কোন একটা পাত্র কাপড়-চোপড় কিংবা ঘরদুয়ার অথবা ঘরের অন্য কোন আসবাবপত্র এমন বরকতময় হয় যে মানুষ তাতে আজীবন উপকৃত হওয়ার পরেও তা তেমনি বিদ্যমান থেকে যায়। পক্ষান্তরে অনেক জিনিষ তৈরী করার সময়ই ভেঙ্গে বিনষ্ট হয়ে যায় কিংবা অটুট থাকলেও তার দ্বারা উপকার লাভের কোন সুযোগ আসে না। অথবা উপকারে আসলেও তাতে পরিপূর্ণ উপকৃত হওয়া সম্ভব হয়ে উঠে না। এই বরকত মানুষের ধন সম্পদে হতে পারে, মন মস্তিস্কে হতে পারে আবার কাজ কর্মেও হতে পারে।
কোন কোন সময় মাত্র এক গ্রাস খাদ্যও মানুষের জন্য পূর্ণ শক্তি-সামর্থ্যের কারণ হয়। আবার কোন কোন সময় অতি উত্তম পুষ্টিকর খাদ্যদ্রব্য বা ঔষধও কোন কাজে আসে না। তেমনিভাবে কোন সময়ের মধ্যে বরকত হলে মাত্র এক ঘন্টা সময়ে এত অধিক কাজ করা যায়, যা অন্য সময় চার ঘন্টায়ও করা যায় না। এসব ক্ষেত্রে পরিমাণের দিক দিয়ে সম্পদ বা সময় বাড়ে না সত্য, কিন্তু এমনি বরকত তাতে প্রকাশ পায় যাতে কাজ হয় বহুগুণ বেশী।
৭ : ৯৯ اَفَاَمِنُوۡا مَكۡرَ اللّٰهِ ۚ فَلَا یَاۡمَنُ مَكۡرَ اللّٰهِ اِلَّا الۡقَوۡمُ الۡخٰسِرُوۡنَ
৯৯. তারা কি আল্লাহর কৌশল থেকেও নিরাপদ হয়ে গেছে? বস্তুত ক্ষতিগ্রস্থ সম্প্রদায় ছাড়া কেউই আল্লাহর কৌশলকে নিরাপদ মনে করে না।
মূলে ‘মকর’ শব্দ ব্যবহার হয়েছে, আরবীতে এর মূল অর্থ হচ্ছে, ধোঁকাগ্রস্ত করা [ফাতহুল কাদীর] বা গোপনে গোপনে কোন চেষ্টা তদবীর করা। অর্থাৎ কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে এমনভাবে গুটি চালানো, যার ফলে তার উপর চরম আঘাত না আসা পর্যন্ত সে জানতেই পারে না যে, তার উপর এক মহা বিপদ আসন্ন। বরং বাইরের অবস্থা দেখে সে একথাই মনে করতে থাকে যে, সব কিছু ঠিকমত চলছে। [আল-মানার ১১/২৭৪]
তবে এ আয়াতে যে ‘মকর’ বা কৌশল অবলম্বনের কথা বলা হয়েছে, তা আল্লাহর এক গুণ। তিনি তার বিরোধীদের পাকড়াও করার জন্য যে কৌশলই অবলম্বন করেন তা অবশ্যই প্রশংসাপূর্ণ গুণ হিসেবে বিবেচিত হবে। কারণ তারাও আল্লাহর সাথে অনুরূপ করে বলে মনে করে থাকে। তিনি যে রকম তার গুণও সে রকম। তার এ গুণে গুণান্বিত হবার ধরণ সম্পর্কে কেউ জানতে পারে না। এ জাতীয় আলোচনা সূরা বাকারায় বিস্তারিতভাবে করা হয়েছে। [আরও দেখুন, সিফাতুল্লাহিল ওয়ারিদা ফিল কিতাবি ওয়াস সুন্নাহ]
وَ مَكَرُوۡا وَ مَكَرَ اللّٰهُ ؕ وَ اللّٰهُ خَیۡرُ الۡمٰكِرِیۡنَ
আর তারা কুটকৌশল করেছিল আল্লাহও কৌশল করেছিলেন; আর আল্লাহ শ্রেষ্ঠতম কৌশলী। আলে ইমরানঃ৫৪
আরবী অর্থের দিক দিয়েই এখানে আল্লাহকে “শ্রেষ্ঠতম কুশলী” বলা হয়েছে। তাছাড়া مَكْر ও خِدَاع এবং এ জাতীয় শব্দসমূহের ব্যাপারে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকীদা হলো, এগুলো যদি কাফেরদের مَكْر ও خِدَاع এর বিপরীতে ব্যবহৃত হয় তখন সেটি খারাপ গুণ হিসেবে বিবেচিত হয় না। বরং কাফেরদের مَكْر ও خِدَاع এর বিপরীতে আল্লাহ্ তা’আলার পক্ষ থেকে مَكْر ও خِدَاع করা একটি ইতিবাচক গুণ। [সিফাতুল্লাহিল ওয়ারিদা ফিল কিতাবি ওয়াস সুন্নাহ, আস-সাক্কাফ]
উদ্দেশ্য এই যে, ইয়াহুদীরা ঈসা আলাইহিস সালামের বিরুদ্ধে নানাবিধ ষড়যন্ত্র ও গোপন কৌশল অবলম্বন করতে আরম্ভ করে। তারা অনবরত বাদশাহর কাছে বলতে থাকে যে, লোকটি আল্লাদ্রোহী। সে তাওরাত পরিবর্তন করে সবাইকে বিধর্মী করতে সচেষ্ট। এসব অভিযোগ শুনে বাদশাহ তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি করেন। ইয়াহুদীদের এ ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করার জন্যে আল্লাহ তা’আলার সূক্ষ্ম ও গোপন কৌশলও স্বীয় পথে অগ্রসর হচ্ছিল
৮ : ৩০ وَ اِذۡ یَمۡكُرُ بِكَ الَّذِیۡنَ كَفَرُوۡا لِیُثۡبِتُوۡكَ اَوۡ یَقۡتُلُوۡكَ اَوۡ یُخۡرِجُوۡكَ ؕ وَ یَمۡكُرُوۡنَ وَ یَمۡكُرُ اللّٰهُ ؕ وَ اللّٰهُ خَیۡرُ الۡمٰكِرِیۡنَ
৩০. আর স্মরণ করুন, যখন কাফেররা আপনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে আপনাকে বন্দী করার জন্য, বা হত্যা করার অথবা নির্বাসিত করার জন্য। আর তারা ষড়যন্ত্র করে এবং আল্লাহও (তাদের ষড়যন্ত্রের বিপক্ষে) ষড়যন্ত্র করেন; আর আল্লাহ্ সর্বশ্রেষ্ঠ কৌশলী। আনফালঃ ৩০
মহান আল্লাহ পৃথিবীতে মানুষকে পাঠিয়েছেন তাঁর প্রতিনিধি হিসাবে। সুতরাং মানুষ আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে চলবে, এটা তার জন্য ফরয কর্তব্য। কিন্তু মানুষ বিভিন্ন সময়ে আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করে, তাঁর অবাধ্য হয়। সে আল্লাহর শাস্তির কথা ভুলে গিয়ে ধরাকে সরা জ্ঞান করে। স্রষ্টার প্রতি তার দায়িত্ব-কর্তব্য ভুলে গিয়ে নিজেকে পৃথিবীতে শক্তিধর হিসাবে যাহির করার চেষ্টা করে। আর এই স্পর্ধা থেকে নানা অনাচার-পাপাচার করে পৃথিবীকে কলুষিত করে তোলে। ফলে তাদের উপরে নেমে আসে আল্লাহর আযাব-গযব হিসাবে নানা ধরনের বালা-মুছীবত। নিম্নে এসব বালা-মুছীবত থেকে পরিত্রাণের উপায় সম্পর্কে নাতিদীর্ঘ আলোচনা পেশ করা হ’ল।
বালা-মুছীবতের কারণ সমূহ : বিভিন্ন কারণে মানুষের উপরে বালা-মুছীবত আপতিত হয়। তন্মধ্যে আল্লাহর সাথে শিরক ও কুফরী, মানুষের উপরে যুলুম-নির্যাতন করা, অধিক পাপাচার করা ও সৎকাজের আদেশ কম করা, অবাধ্যতা ও অহংকার করা, মিথ্যাচার করা, আল্লাহ প্রদত্ত নে‘মতের অস্বীকৃতি, দুনিয়াবী বিষয়ে প্রতিযোগিতা ও কৃপণতা, রাসূল (ছাঃ)-কে মিথ্যাপ্রতিপন্ন করা, ছালাত পরিত্যাগ করা, যাকাত অস্বীকার করা, জিহাদ পরিত্যাগ করা, অশ্লীলতার প্রসার ঘটানো, আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার ভঙ্গ করা, সূদ-ঘুষ আদান-প্রদান করা বা হারাম ভক্ষণ করা, আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান দ্বারা ফায়ছালা না করা ইত্যাদি কারণে মানুষের উপরে বালা-মুছীবত নেমে আসে।
বালা-মুছীবত থেকে পরিত্রাণের উপায় সমূহ (ড. মুহাম্মাদ কাবীরুল ইসলাম ) লেখা থেকে নেয়া
বালা-মুছীবত থেকে পরিত্রাণের উপায়গুলিকে দু’ভাগে ভাগ করা যায়।
ক. বালা-মুছীবত নাযিল হওয়ার পূর্বে করণীয়
খ. বালা-মুছীবত নাযিল হওয়ার পরে করণীয়।
ক. বালা-মুছীবত নাযিল হওয়ার পূর্বে করণীয় :
মানুষ আল্লাহর বিধান মেনে চললে তাদের উপরে আল্লাহর আযাব-গযব হিসাবে বালা-মুছীবত নেমে আসবে না। বালা-মুছীবত যাতে না আসে সেজন্য কিছু করণীয় আছে। সেগুলো নিম্নে উল্লেখ করা হ’ল।-
১. আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে চলাঃ
‘তুমি আল্লাহর বিধান হেফাযত কর আল্লাহ তোমাকে রক্ষা করবেন। তুমি আল্লাহর বিধান হেফাযত কর আল্লাহকে তোমার সামনে পাবে। তুমি সুখের সময় আল্লাহকে স্মরণে রাখ, বিপদের সময় আল্লাহ তোমাকে স্মরণে রাখবেন’।হাকেম হা/৬৩০৩; যিলালুল জান্নাহ হা/৩১৫, সনদ ছহীহ।
২. উত্তম চরিত্রের অধিকারী হওয়া
ইমাম কিরমানী (রহঃ) বলেন,‘আর এতে (খাদীজা রাঃ-এর বক্তব্যে) রয়েছে যে, উত্তম স্বভাব-চরিত্র ধ্বংস থেকে নিরাপত্তা লাভের উপায়। সচ্চরিত্র কষ্ট-ক্লেশ বা অপসন্দনীয় বিষয় প্রতিরোধের উপায়’। শরহুল কিরমানী আলা ছহীহিল বুখারী, ১ম খন্ড (বৈরূত : দারুল কুতুবিল ইলমিয়া), পৃঃ ২০৬।
৩. তওবা ও ইস্তেগফার করা
‘অথচ আল্লাহ কখনো তাদের উপর শাস্তি নাযিল করবেন না যতক্ষণ তুমি (হে মুহাম্মাদ) তাদের মধ্যে অবস্থান করবে। আর আল্লাহ তাদেরকে শাস্তি দিবেন না যতক্ষণ তারা ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবে’ (আনফাল ৮/৩৩)।
৪. তাক্বওয়া বা আল্লাহভীতি অর্জন করা :
‘আর ছামূদ সম্প্রদায়ের ব্যাপার তো এই যে, আমরা তাদেরকে পথ-নির্দেশ করেছিলাম, কিন্তু তারা সৎপথের পরিবর্তে ভ্রান্তপথ অবলম্বন করেছিল। অতঃপর তাদেরকে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি আঘাত হানল তাদের কৃতকর্মের পরিণাম স্বরূপ। আমরা উদ্ধার করলাম তাদেরকে যারা ঈমান এনেছিল এবং যারা তাক্বওয়া অবলম্বন করত’ (হা-মীম আস-সাজদা ৪১/১৭-১৮)।
৫. খাদ্য-পানীয়ের পাত্র সমূহ ঢেকে রাখা :
খাদ্য ও পানপাত্র সমূহ ঢেকে রাখার জন্য বিশেষভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্যথা এতে রোগজীবাণু প্রবেশ করতে পারে। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘খাদ্য-পাত্র ঢেকে রাখো এবং মশক বন্ধ রাখো। কেননা বছরে এমন এক রাত্রি আছে, যে রাত্রে বিভিন্ন প্রকারের বালা-মুছীবত নাযিল হয়। ঐসব বালার গতিবিধি এমন সব পাত্রের দিকে হয় যা ঢাকা নয় এবং এমন পান-পাত্রের দিকে হয় যার মুখ বন্ধ নয়, ফলে তা তার মধ্যে প্রবেশ করে’।মুসলিম হা/২০১৪; মিশকাত হা/৪২৯৮; সিলসিলা ছহীহাহ হা/৩৭; ইরওয়া হা/৩৯; ছহীহুল জামে‘ হা/৭৬০৮।৬. বিভিন্ন দো‘আ করা :
রাসূল (ছাঃ) বলেন,إِنَّ الدُّعَاءَ يَنْفَعُ مِمَّا نَزَلَ وَمِمَّا لَمْ يَنْزِلْ فَعَلَيْكُمْ عِبَادَ اللهِ بِالدُّعَاءِ. ‘যে বিপদ-আপদ এসেছে আর যা (এখনও) আসেনি তাতে দো‘আয় কল্যাণ হয়। অতএব হে আল্লাহর বান্দাগণ! তোমরা দো‘আকে আবশ্যিক করে নাও’। তিরমিযী হা/৩৫৪৮; ছহীহুল জামে‘ হা/৩৪০৯; ছহীহ আত-তারগীব হা/১৬৩৪; মিশকাত হা/২২৩৯।
খ. বালা-মুছীবত নাযিল হওয়ার পরে করণীয় :
১. বেশী বেশী ইবাদত করা :
রাসূল (ছাঃ) বলেন. ‘সূর্য ও চন্দ্র আল্লাহর নিদর্শন সমূহের দু’টি নিদর্শন। কারো মৃত্যু বা জন্মের কারণে সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণ হয় না। কাজেই যখন তোমরা তা দেখবে তখন তোমরা আল্লাহর নিকট দো‘আ করবে। তাঁর মহত্ব ঘোষণা করবে এবং ছালাত আদায় করবে ও ছাদাক্বাহ করবে’।বুখারী হা/১০৪৪; নাসাঈ হা/১৫০০; মিশকাত হা/১৪৮৩।
ক. নফল ছালাত আদায় করা
খ. তাহাজ্জুদ ছালাত আদায় করা
গ. যিকর করা
ঘ. ছাদাক্বাহ করা
২. বেশী বেশী নেক আমল বা সৎকাজ করা
রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘সৎকর্ম করা বালা-মুছীবত, বিপদাপদ ও ধ্বংস থেকে রক্ষার মাধ্যম। আর দুনিয়াতে যিনি সৎকর্মশীলদের অন্তর্গত, আখিরাতে তিনি সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত হবে’। ত্বাবারানী, আল-আওসাত; ছহীহুল জামে‘ হা/৩৭৯৫; ছহীহ আত-তারগীব হা/৮৯০।
৩. আল্লাহর নিকটে বিনীতভাবে দো‘আ করা :
৪. আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দন করা
৫. আক্রান্ত এলাকায় গমন না করা : যে এলাকায় মহামারী দেখা দেয়, সেখানে গমন করতে রাসুল (ছাঃ) নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, ‘তোমরা যখন কোন স্থানে প্লেগের ছড়াছড়ি শুনতে পাও, তখন তোমরা সেখানে যেয়ো না। আর যখন প্লেগ এমন জায়গায় দেখা দেয়, যেখানে তুমি অবস্থান করছ, তখন সে স্থান হ’তে পালানোর লক্ষ্যে বের হয়ো না’। বুখারী হা/৩৪৭৩; মুসলিম হা/২২১৮।
আল্লাহ বলেনঃ “এমন আযাবকে ভয় করো, যা এসে গেলে শুধু যালেমদের পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকবে না” [সূরা আল-আনফালঃ ২৫] বরং অন্যরাও এর কবলে পতিত হবে। তাই এখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এই দো’আ শিক্ষা দেয়া হয়েছে যে, আপনি বলুনঃ হে আল্লাহ, যদি তাদের উপর আপনার আযাব আমার সামনে এবং আমার চোখের উপরই আসে, তবে আমাকে এই যালেমদের সাথে রাখবেন না। আমাকে তাদের বাইরে রাখবেন। [ ফাতহুল কাদীর]
দোয়াটি হলো— رَبِّ اِمَّا تُرِیَنِّیۡ مَا یُوۡعَدُوۡنَ رَبِّ فَلَا تَجۡعَلۡنِیۡ فِی الۡقَوۡمِ الظّٰلِمِیۡنَ উচ্চারণ:
‘রাব্বি ইম্মা তুরিয়ান্নি মা ইউআদূনা রাব্বি ফালা তাজআলনী ফী ক্বাওমাজ জ্ব-লিমীন।’ অর্থ: ‘হে আমার প্রতিপালক! যে শাস্তির বিষয়ে তাদেরকে প্রতিশ্রুতি প্রদান করা হচ্ছে তা যদি আপনি আমাকে দেখাতে চান, তবে হে আমার প্রতিপালক, আপনি আমাকে জালিম সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত করবেন না।’ (সুরা মুমিনুন: ৯৩-৯৪)
হাদিসে এসেছে যে, নবী (সাঃ) এই বলে দুয়া করতেন, “হে আল্লাহ্! যখন তুমি কোন জাতিকে ফিতনায় ফেলার ইচ্ছা কর তখন তার পূর্বেই তুমি আমাকে (পৃথিবী হতে) তোমার নিকট ফিতনামুক্ত অবস্থায় তুলে নিও।” (তিরমিজিঃ তাফসীর সুরা সা-দ, আহমাদ ৫/২৪৩)