সূরা আশ-শূরাঃ৫ম রুকু (৪৪-৫৩) আয়াত

আল্লাহ‌ এসব লোকের হিদায়াতের জন্য কুরআনের মত সর্বশ্রেষ্ঠ কিতাব পাঠিয়েছেন, যা অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত এবং অত্যন্ত কার্যকর ও চিত্তাকর্ষক উপায়ে প্রকৃত সত্যের জ্ঞান দান করছে এবং জীবনের সঠিক পথ বলে দিচ্ছে। তাদের পথপ্রদর্শনের জন্য মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মত নবী পাঠিয়েছেন যার চেয়ে শ্রেষ্ঠ জীবন ও চরিত্রের অধিকারী মানুষ তাদের দৃষ্টি কখনো দেখেনি। আল্লাহ‌ এই কিতাব ও এই রসূলের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সুফলসমূহও ঈমান গ্রহণকারীদেরকে তাদের নিজের চোখে দেখিয়ে দিয়েছেন। এসব দেখার পর যদি কোন ব্যক্তি হিদায়াত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় তাহলে আল্লাহ‌ পুনরায় তাকে সেই গোমরাহীর মধ্যে নিক্ষেপ করবেন যেখান থেকে সে বেরিয়ে আসতে আগ্রহী নয়। আর আল্লাহই যখন তাকে তার দরজা থেকে ঠেলে সরিয়ে দেন তখন তাকে সঠিক পথে নিয়ে আসার দায়িত্ব কে নিতে পারে?

আজ যখন ফিরে আসার সুযোগ আছে তখন এরা ফিরে আসতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। কিন্তু কাল যখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়ে যাবে এবং শাস্তির নির্দেশ কার্যকর হবে তখন নিজেদের দুর্ভাগ্য দেখে এরা ফিরে আসার সুযোগ পেতে চাইবে.

“আপনি যদি দেখতে পেতে যখন তাদেরকে আগুনের উপর দাঁড় করানো হবে তখন তারা বলবে, ‘হায়! যদি আমাদেরকে ফেরত পাঠানো হত, আর আমরা আমাদের রবের আয়াতসমূহে মিথ্যারোপ না করতাম এবং আমরা মুমিনদের অন্তর্ভুক্ত হতাম। আনয়ামঃ২৭

সেখান থেকে পুনরায় ফিরে আসা সম্ভব হবে না। কাজেই তারা তাদের এই আশা পূরণ করতে পারবে না। কাফেরদের এই ধরনের আশার কথা কুরআন বিভিন্ন স্থানে উল্লেখ করেছে।

{رَبَّنَا أَخْرِجْنَا مِنْهَا فَإِنْ عُدْنَا فَإِنَّا ظَالِمُونَ* قَالَ اخْسَأُوا فِيهَا وَلا تُكَلِّمُونِ}

 ‘‘হে আমাদের প্রতিপালক! এ থেকে আমাদেরকে উদ্ধার কর; আমরা যদি পুনরায় তা করি, তবে আমরা (বড়ই) যালেম গণ্য হব। আল্লাহ বলবেন, তোমরা ধিক্কৃত অবস্থায় এখানেই পড়ে থাক এবং আমার সাথে কোন কথা বলো না।’’ (সূরা মু’মিনূন ১০৭-১০৮)

 {رَبَّنَا أَبْصَرْنَا وَسَمِعْنَا فَارْجِعْنَا نَعْمَلْ صَالِحًا إِنَّا مُوقِنُونَ}

 ‘‘হে আমাদের পালনকর্তা! আমরা দেখলাম ও শুনলাম। এখন আমাদেরকে ফেরৎ পাঠিয়ে দিন, আমরা সৎকর্ম করব। আমরা দৃঢ় বিশ্বাসী হয়ে গেছি।’’ (সূরা সাজদাহ ১২)

মানুষের স্বভাব হচ্ছে, কোন ভয়ানক দৃশ্য যখন তার সামনে থাকে এবং সে বুঝতে পারে, চোখের সামনে যা দেখা যাচ্ছে খুব শীঘ্রই সে তার কবলে পড়তে যাচ্ছে তখন প্রথমেই ভয়ের চোটে চোখ বন্ধ করে নেয়। এরপরও যদি তার হাত থেকে রেহাই না পায় তখন দেখার চেষ্টা করে বিপদটা কেমন এবং এখনো তার থেকে কত দূরে আছে। কিন্তু মাথা উঁচু করে ভালভাবে দেখার হিম্মত তার থাকে না। তাই সে বার বার একটু একটু করে চোখ খুলে বাঁকা দৃষ্টিতে দেখে এবং ভয়ের চোটে আবার চোখ বন্ধ করে নেয়। এ আয়াতে জাহান্নামের দিকে অগ্রসরমান লোকদের এই অবস্থাই এখানে চিত্রিত করা হয়েছে।

দুনিয়াতে কাফেররা ইমানদারদের বোকা, অনুন্নত ও ক্ষতিগ্রস্ত মনে করত। অথচ আমরা তো দুনিয়াতে আখেরাতকে প্রাধান্য দিতাম এবং পার্থিব ক্ষতির কোনই গুরুত্ব দিতাম না। আজ দেখে নাও, প্রকৃত ক্ষতির শিকার কারা হয়েছে; যারা দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী ক্ষতির কোনই পরোয়া করেনি এবং আজ যারা জান্নাতের সুখভোগ করছে তারা, নাকি তারা যারা দুনিয়াকেই সব কিছু ভেবে নিয়েছিল এবং আজ জাহান্নামের আযাবে পরিবেষ্টিত হয়েছে, যা থেকে নিষ্কৃতি লাভ সম্ভবই নয়?

“আর ইয়াহুদী ও নাসারারা আপনার প্রতি কখনো সন্তুষ্ট হবে না, যতক্ষণ না আপনি তাদের মিল্লাতের অনুসরণ করেন। বলুন নিশ্চয় আল্লাহর হেদায়াতই প্রকৃত হেদায়াত। আর যদি আপনি তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করেন আপনার কাছে জ্ঞান আসার পরও, তবে আল্লাহর পক্ষ থেকে আপনার কোন অভিভাবক থাকবে না এবং থাকবে না কোন সাহায্যকারীও। বাকারাঃ১২০

নিশ্চয় তারা আল্লাহ্‌র মুকাবেলায় আপনার কোনই কাজে আসবে না; আর নিশ্চয় যালিমরা একে অন্যের বন্ধু; এবং আল্লাহ মুত্তাকীদের বন্ধু। জাসিয়াঃ১৯

যাকে রোধ করার এবং রদ্দ করার শক্তি কারো নেই।

 অর্থাৎ, তোমাদের জন্য কোন এমন স্থান হবে না, যেখানে তোমরা লুকিয়ে নিখোঁজ ও পরিচয়হীন হয়ে যাবে অথবা দৃষ্টিগোচর হবে না। যেমন অন্যত্র বলেন,

 {يَقُوْلُ الْإِنْسَانُ يَوْمَئِذٍ اَيْنَ الْمَفَرُّ، كَلاَّ لاَ وَزَرَ، إِلَى رَبِّكَ يَوْمَئِذٍ الْمُسْتَقَرّ}ُ অর্থাৎ,

 সেদিন মানুষ বলবে, পলায়নের জায়গা কোথায়? না, কোন আশ্রয়স্থল নেই। তোমার পালনকর্তার কাছেই সেদিন ঠাঁই হবে। (সূরা ক্বিয়ামাহ ১০-১২) অথবা

 نَكِير অর্থ, ইনকার (অস্বীকার) করা। অর্থাৎ, তোমরা নিজেদের পাপসমূহকে অস্বীকার করতে পারবে না। কারণ, প্রথমতঃ সবকিছুই লিখিত থাকবে। দ্বিতীয়তঃ স্বয়ং মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও সাক্ষ্য দেবে। কিংবা যে আযাব তোমাদেরকে তোমাদের পাপের কারণে দেওয়া হবে, তোমরা সেই আযাবকে অস্বীকার করতে পারবে না। কেননা, পাপ স্বীকার করা ছাড়া কোন উপায় থাকবে না।

মূল আয়াতাংশ হচ্ছেوَمَا لَكُمْ مِنْ نَكِيرٍএই আয়াতাংশের আরো কয়েকটি অর্থ আছে।

এক—তোমরা নিজেদের কৃতকর্মের কোনটিকেই অস্বীকার করতে পারবে না।

দুই—তোমরা পোশাক বদল করে কোথাও লুকাতে পারবে না।

তিন—তোমাদের সাথে যে আচরণই করা হোক না কেন তোমরা তার কোন প্রতিবাদ এবং তার বিরুদ্ধে কোন প্রকার অসন্তোষ প্রকাশ করতে পারবে না।

চার—তোমাদেরকে যে পরিস্থিতির মধ্যে নিক্ষেপ করা হয়েছে তোমরা তা পাল্টিয়ে ফেলতে পারবে না।

তোমাদের ওপর এ দায়িত্ব অর্পণ করা হয়নি যে, তোমরা অবশ্যই তাদেরকে সঠিক পথে আনবে অন্যথায় তারা সঠিক পথে আসেনি কেন সেজন্য তোমাদের জবাবদিহি করতে হবে।

যেমন, অন্যত্র বলেছেন,{لَيْسَ عَلَيْكَ هُدَاهُمْ وَلَكِنَّ اللهَ يَهْدِيْ مَنْ يَّشَاءُ}  (البقرة: ২৭২)

তাদের হিদায়াত দানের দায়িত্ব আপনার নয়; বরং আল্লাহ যাকে ইচ্ছে হিদায়াত দেন। আর যে ধন-সম্পদ তোমরা ব্যয় কর তা তোমাদের নিজেদের জন্য আর তোমরা তো শুধু আল্লাহ্‌কে চেয়েই (তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যই) ব্যয় করে থাক। আর তোমরা উত্তম কোন কিছু ব্যয় করে থাকলে তার পুরস্কার তোমাদেরকে পুরোপুরিভাবেই দেয়া হবে এবং তোমাদের প্রতি যুলুম করা হবে না। বাকারাঃ২৭২

তিনি আরো বলেন, {فَاِنَّمَا عَلَيْكَ الْبَلاَغُ وَعَلَيْنَا الْحِسَابُ} (الرعد: ৪০)

. আর আমরা তাদেরকে যে শাস্তির প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি তার কিছু যদি আমরা আপনাকে দেখাই বা যদি এর আগে আপনার মৃত্যু ঘটাই তবে আপনার কর্তব্য তো শুধু প্রচার করা, আর হিসাব-নিকাশ তো আমারই দায়িত্ব। রাদঃ৪০

 {فَذَكِّرْ اِنَّمَا اَنْتَ مُذَكِّرٌ، لَسْتَ عَلَيْهِمْ بِمُصَيْطِر}ٍ (الغاشية: ২১-২২) এ সব আয়াতের অর্থ হল, তোমার দায়িত্ব কেবল আল্লাহর বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। মেনে নিক, আর না নিক এ ব্যাপারে তোমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে না। কারণ, হিদায়াত দেওয়া তোমার এখতিয়ারে নেই। এটা কেবল আল্লাহরই এখতিয়ারাধীন।  রুযী লাভের উপায়-উপকরণের প্রাচুর্য, শারীরিক সুস্থতা ও রোগশূন্যতা, সন্তান-সন্ততির আধিক্য এবং মর্যাদা-সম্মান ইত্যাদি।

 অর্থাৎ, অহংকার ও গর্ব প্রদর্শন করে। নচেৎ আল্লাহর নিয়ামত ও অনুগ্রহ পেয়ে আনন্দিত হওয়া অথবা খুশী প্রকাশ করা অপছন্দনীয় ব্যাপার নয়। কিন্তু তা হতে হবে নিয়ামতের বর্ণনা এবং কৃতজ্ঞতা স্বরূপ; অহংকার, গর্ব এবং লোকপ্রদর্শনের জন্য যেন না হয়।

 অভাব-অনটন, অসুস্থতা, সন্তানহীনতা ইত্যাদি। অর্থাৎ, সত্বর নিয়ামতসমূহ ভুলে যায় এবং নিয়ামত-দাতাকেও। এটা অধিকাংশ মানুষের অবস্থা অনুপাতে বলা হয়েছে, যাতে দুর্বল ঈমানের লোকেরাও শামিল। তবে আল্লাহর নেক বান্দা এবং পূর্ণ ঈমানের অধিকারী লোকদের অবস্থা এ রকম নয়। যেহেতু তারা কষ্টের সময় ধৈর্য ধরে এবং নিয়ামতসমূহের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে। যেমন, রসূল (সাঃ) বলেছেন, ‘‘মুমিনের ব্যাপারটাই বিস্ময়কর! যদি তার কোন মঙ্গল আসে, তাহলে তাতে সে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা করে। আর তা তার জন্য মঙ্গলময়। আবার যদি তার কোন অমঙ্গল আসে, তাহলে তাতে সে ধৈর্য ধরে। আর তাও তার জন্য মঙ্গলময়। এ মঙ্গল মু’মিন ছাড়া আর কারো জন্য নয়। (মুসলিম)

যারা কুফর ও শিরকের নির্বুদ্ধিতায় ডুবে আছে তারা যদি বুঝানোর পরও না মানতে চায় না মানুক, সত্য যথা স্থানে সত্যই। যমীন ও আসমানের বাদশাহী দুনিয়ার তথাকথিত বাদশাহ, স্বৈরাচারী ও নেতাদের হাতে ছেড়ে দেয়া হয়নি। কোন নবী, অলী, দেবী বা দেবতার তাতে কোন অংশ নেই, আল্লাহ‌ একাই তার মালিক। তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহকারী না নিজের শক্তিতে বিজয়ী হতে পারে, না সেই সব সত্তার কেউ এসে তাকে রক্ষা করতে পারে যাদেরকে মানুষ নিজের নির্বুদ্ধিতার কারণে খোদায়ী ক্ষমতা ও এখতিয়ারসমূহের মালিক মনে করে বসে আছে।

এটা আল্লাহর বাদশাহীর নিরংকুশ (Aboslute) হওয়ার একটি সুস্পষ্ট প্রমাণ। কোন মানুষ, সে পার্থিব ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের যত বড় অধিকর্তাই সাজুক না কেন, কিংবা তাকে আধ্যাত্মিক ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের যত বড় মালিকই মনে করা হোক না কেন, অন্যদের সন্তান দেওয়ানো তো দূরের কথা নিজের জন্য নিজের ইচ্ছানুসারে সন্তান জন্ম দানেও সে কখনো সক্ষম হয়নি। আল্লাহ‌ যাকে বন্ধ্যা করে দিয়েছেন সে কোন ওষুধ, কোন চিকিৎসা এবং কোন তাবীজ কবজ দ্বারা সন্তান ওয়ালা হতে পারেনি। আল্লাহ‌ যাকে শুধু কন্যা সন্তান দান করেছেন সে কোনভাবেই একটি পুত্র সন্তান লাভ করতে পারেনি এবং আল্লাহ‌ যাকে শুধু পুত্র সন্তানই দিয়েছেন সে কোনভাবেই একটি কন্যা সন্তান লাভ করতে পারেনি। এক্ষেত্রে সবাই নিদারুণ অসহায় এমনকি সন্তান জন্মের পূর্বে কেউ এতটুকু পর্যন্ত জানতে পারেনি যে মায়ের গর্ভে পুত্র সন্তান বেড়ে উঠছে না কন্যা সন্তান। এসব দেখে শুনেও যদি কেউ খোদার খোদায়ীতে সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী সেজে বসে, কিংবা অন্য কাউকে ক্ষমতা ও ইখতিয়ারে অংশীদার মনে করে তাহলে সেটা তার নিজের অদূরদর্শিতা যার পরিণাম সে নিজেই ভোগ করবে। কেউ নিজে নিজেই কোন কিছু বিশ্বাস করে বসলে তাতে প্রকৃত সত্যের সামান্য কোন পরিবর্তন সাধিত হয় না।

যাকে চান পুত্র ও কন্যা উভয়ই দান করেন। এখানে মহান আল্লাহ চার প্রকার মানুষের কথা উল্লেখ করেছেন। (ক) যারা কেবল পুত্র সন্তান লাভ করে।

 (খ) যারা কেবল কন্যা সন্তান লাভ করে।

(গ) যারা পুত্র ও কন্যা উভয় সন্তান লাভ করে।

 (ঘ) বন্ধ্যা; যারা না পুত্র সন্তান পায়, আর না কন্যা সন্তান।

মানুষের মাঝে এই পার্থক্য ও তফাৎ আল্লাহ তাআলার মহাশক্তির নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ কর্তৃক জারী এই তফাৎকে পৃথিবীর কোন শক্তি পরিবর্তন করার সামর্থ্য রাখে না। এই পার্থক্য তো জাতকের দিক দিয়ে। জনকের দিক দিয়েও মানুষ চার প্রকার। যথাঃ

(ক) আদম (আঃ)-কে কেবল মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন। তাঁর না বাপ আছেন, আর না মা।

 (খ) হাওয়া (আলাইহাস সালাম)-কে আদম (আঃ) হতে; অর্থাৎ পুরুষ থেকে সৃষ্টি করেছেন, তাঁর মা নেই।

(গ) ঈসা (আঃ)-কে কেবল নারীর গর্ভ থেকে সৃষ্টি করেছেন, তাঁর বাপ নেই।

(ঘ) অবশিষ্ট সকল মানুষকে নারী-পুরুষের মিলনের মাধ্যমে সৃষ্টি করেছেন। তাদের জনক আছে এবং জননীও। فَسُبْحَانَ اللهِ الْعَلِيْمِ الْقَدِيْرِ (ইবনে কাসীর)

এই আয়াতে অহীর তিনটি প্রকারের কথা বর্ণিত হয়েছে।

 প্রথমঃ অন্তরে কোন কথা প্রক্ষিপ্ত করা (ঢুকিয়ে দেওয়া) অথবা স্বপ্নে বলে দেওয়া এই প্রত্যয়ের সাথে যে, তা আল্লাহরই পক্ষ হতে।  অহী অর্থ ‘ইলকা ইলহাম, মনের মধ্যে কোন কথা সৃষ্টি করে দেয়া কিংবা স্বপ্নে কিছু দেখিয়ে দেয়া, যেমন হযরত ইবরাহীম ও ইউসুফকে দেখানো হয়েছিলো (ইউসুফ, আয়াত ৪ ও ১০০ এবং             

 “অতঃপর তিনি যখন তার পিতার সাথে কাজ করার মত বয়সে উপনীত হলেন, তখন ইবরাহীম বললেন, হে প্রিয় বৎস! আমি স্বপ্নে দেখি যে, তোমাকে আমি যবেহ করছি(১), এখন তোমার অভিমত কি বল? তিনি বললেন, হে আমার পিতা! আপনি যা আদেশপ্ৰাপ্ত হয়েছেন তা-ই করুন। আল্লাহর ইচ্ছায় আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন”।  আস সাফফাত, ১০২)

দ্বিতীয়ঃ অদৃশ্য থেকে সরাসরি কথা বলা। যেমন, মূসা (আঃ)-এর সাথে ত্বুর পাহাড়ে বলা হয়েছিল।

তৃতীয়ঃ ফিরিশতার মাধ্যমে স্বীয় অহী প্রেরণ করা। যেমন, জিবরীল (আঃ) অহী নিয়ে আগমন করতেন এবং নবীদেরকে শুনাতেন।

“এভাবে” অর্থ শুধু শেষ পদ্ধতি নয়, বরং ওপরের আয়াতে যে তিনটি পদ্ধতি উল্লেখিত হয়েছে তার সব কটি। আর ‘রূহ’ অর্থ অহী [তাবারী] অথবা এখানে রূহ বলে কুরআনকে বোঝানো হয়েছে। কারণ, কুরআন হচ্ছে এমন রূহ যার দ্বারা অন্তরসমূহ জীবন লাভ করে। [জালালাইন]। কুরআন ও হাদীস থেকেই একথা প্রমাণিত যে, এই তিনটি পদ্ধতিতেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হিদায়াত দান করা হয়েছে।

হাদীসে এসেছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে অহী আসার সূচনা হয়েছিলো সত্য স্বপ্নের আকারে। [বুখারী: ৩] এই ধারা পরবর্তী সময় পর্যন্ত জারি ছিল। তাই হাদীসে তার বহু সংখ্যক স্বপ্নের উল্লেখ দেখা যায়। যার মাধ্যমে হয় তাকে কোনো শিক্ষা দেয়া হয়েছে কিংবা কোনো বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে। তাছাড়া কুরআন মজীদে নবীর একটি স্বপ্নের সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে [সূরা আল-ফাতহ: ২৭]

“অবশ্যই আল্লাহ তাঁর রাসূলকে স্বপ্নটি যথাযথভাবে সত্যে পরিণত করে দিয়েছেন, আল্লাহর ইচ্ছায় তোমরা অবশ্যই মসজিদুল-হারামে প্রবেশ করবে নিরাপদে—মাথা মুণ্ডন করে এবং চুল ছেঁটে, নিৰ্ভয়ে। অতঃপর তিনি (আল্লাহ) জেনেছেন যা তোমরা জান নি। সুতরাং এ ছাড়াও তিনি তোমাদেরকে দিয়েছেন এক সদ্য বিজয়”। সূরা আল-ফাতহ: ২৭

—২য় তাছাড়া কতিপয় হাদীসে একথারও উল্লেখ আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আমার মনে অমুক বিষয়টি সৃষ্টি করে দেয়া হয়েছে, কিংবা আমাকে একথাটি বলা হয়েছে বা আমাকেই নির্দেশ দান করা হয়েছে অথবা আমাকে এ কাজ করতে নিষেধ করা হয়েছে। এ ধরনের সব কিছু অহীর প্রথমোক্ত শ্রেণীর সাথে সম্পর্কিত। বেশীর ভাগ হাদীসে কুদসী এই শ্রেণীরই অন্তর্ভুক্ত। মে’রাজে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দ্বিতীয় প্রকার অহী দ্বারা সম্মানিত করা হয়েছে। কতিপয় হাদীসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের নির্দেশ দেয়া এবং তা নিয়ে তার বারবার দরখাস্ত পেশ করার কথা যেভাবে উল্লেখিত হয়েছে তা থেকে স্পষ্ট বুঝা যায়, সে সময় কথাবার্তা হয়েছিলো যেমনটি তুর পাহাড়ের পাদদেশে মূসা আলাইহিস সালাম ও আল্লাহর মধ্যে হয়েছিলো।

এরপর থাকে অহীর তৃতীয় শ্রেণী। এ ব্যাপারে কুরআন নিজেই সাক্ষ্য দান করে যে, কুরআনকে জিবরীল আমীনের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে পৌছানো হয়েছে [সূরা-বাকারাহ: ৯৭,

আর নিশ্চয় এটা (আল-কুরআন) সৃষ্টিকুলের রব হতে নাযিলকৃত।  বিশ্বস্ত রূহ (জিবরীল) তা নিয়ে নাযিল হয়েছেন। আপনার হৃদয়ে, যাতে আপনি সতর্ককারীদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন। সুস্পষ্ট আরবী ভাষায় সূরা আশ-শু’আরা: ১৯২–১৯৫]

এটা কাফেরদের বিরুদ্ধে উচ্চারিত শেষ সতর্কবাণী। এর তাৎপর্য হলো, নবী (সা.) বললেন আর তোমরা তা শুনে প্রত্যাখ্যান করলে কথা এখানেই শেষ হয়ে যাবে না। পৃথিবীতে যা কিছু ঘটছে তার সবই আল্লাহর সামনে পেশ করা হবে এবং সবশেষে কার কি পরিণাম হবে সে চূড়ান্ত ফায়সালা তাঁর দরবার থেকেই হবে।

এই সঠিক ও সরল ‘পথ’ হল ইসলাম। এটাকে মহান আল্লাহর নিজের প্রতি সম্পৃক্ত করে এ পথের মাহাত্ম্য ও উচ্চ মর্যাদার কথা পরিষ্কার করে দিয়েছেন এবং এতে এ ইঙ্গিতও রয়েছে যে, এটাই একমাত্র মুক্তির পথ।

অর্থাৎ, কিয়ামতের দিন যাবতীয় ব্যাপারের ফায়সালা আল্লাহরই হাতে হবে। এতে রয়েছে কঠোর ধমক যা প্রতিফল (বদলা ও শাস্তি)-কে অনিবার্য করে।

কিয়ামতের দিন প্রত্যেক ব্যক্তিকেই আল্লাহ একাকী তাঁর সামনে দাঁড় করাবেন এবং তার কাছ থেকে দুনিয়ার জীবনের প্রত্যেকটি কাজের হিসাব নিবেন।

 এ ব্যাপারে সূরা মরিয়মে আল্লাহ বলেন,

وَكُلُّهُمْ آتِيهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَرْدًا (৯৫)

“আর কিয়ামতের দিন তাদের সকলেই তাঁর কাছে আসবে একাকী।” (সূরা মরিয়ম : ৯৫