সূরা আরাফঃ ১১তম রুকু(৮৫-৯৩আয়াত)

أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ

‘মাদয়ান’ ইবরাহীম (আঃ)-এর পুত্র অথবা পৌত্রের নাম ছিল। অতঃপর তাদের থেকেই গঠিত এই গোত্রের নাম ‘মাদয়ান’ এবং যে গ্রামে তারা বসবাস করত তারও নাম হয়ে যায় ‘মাদয়ান’। এইভাবে গোত্র ও গ্রাম উভয় ক্ষেত্রেই এটা (মাদয়ান) ব্যবহার হয়। এ গ্রামটা হিজাযের পথে ‘মাআন’এর সন্নিকটে অবস্থিত। এটাকেই কুরআনের অন্যত্র أَصْحَابُ الأَيْكَةِ (বনের অধিবাসী) বলা হয়েছে। এদের নিকট শুআইব (আঃ)-কে নবী বানিয়ে প্রেরণ করা হয়েছিল।  (সূরা শুআরার ১৭৬নং আয়াতের টীকা দ্রষ্টব্য)

জ্ঞাতব্যঃ প্রত্যেক নবীকে তার সম্প্রদায়ের ভাই বলা হয়েছে। যার অর্থ, সেই জাতির এবং গোত্রের তিনি একজন। আবার এটাকেই কোন কোন স্থানে رَسُوْلًا مِنْهُمْ অথবা مِنْ أَنْفُسِهِمْ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এ সবের অর্থ ও উদ্দেশ্য হল, রসূল ও নবী মানুষের মধ্যেকারই একজন মানুষ হন, যাঁকে আল্লাহ তাআলা মানুষের হিদায়াতের জন্য নির্বাচন করেন এবং অহীর মাধ্যমে তাঁর উপর স্বীয় কিতাব ও যাবতীয় বিধি-বিধান অবতীর্ণ করেন।

মাদইয়ানবাসীদের মূল এলাকাটি হেজাযের উত্তর পশ্চিমে এবং ফিলিস্তিনের দক্ষিণে লোহিত সাগর ও আকাবা উপসাগরের উপকূলে অবস্থিত ছিল। প্রাচীন যুগে যে বাণিজ্যিক সড়কটি লোহিত সাগরের উপকূল ধরে ইয়েমেন থেকে মক্কা ও ইয়াম্বু হয়ে সিরিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল এবং দ্বিতীয় যে বাণিজ্যিক সড়কটি ইরাক থেকে মিশরের দিকে চলে যেতো তাদের ঠিক সন্ধিস্থলে এ জাতির জনপদগুলো অবস্থিত ছিল। এ কারণে আরবের লোকেরা মাদইয়ান জাতি সম্পর্কে জানতো। কারণ তাদের ব্যবসাও এ পথে চলাচল করতো।

মাদইয়ানের বর্তমান নাম ‘আল বিদা’। এ এলাকাটি একটি প্রসিদ্ধ জনপদ। সৌদী আরবের শেষ প্রান্তে মিশরের সীমান্ত সংলগ্ন এ এলাকায় এখনো শু’আইব আলাইহিস সালামের জাতির বিভিন্ন চিহ্ন রয়ে গেছে। যা মাগায়েরে শু’আইব নামে খ্যাত। [ড. শাওকী আবু খালীল, আতলাসুল কুরআন, পৃ. ৭২]

 তাওহীদের দাওয়াত দেওয়ার পর এই জাতির মধ্যে ওজনে কম দেওয়ার যে বড় কুঅভ্যাস ছিল, তা থেকে তাদেরকে নিষেধ প্রদান করা হয়েছে এবং মাপ ও ওজন পূর্ণ করে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই ত্রুটিও বড় বিপজ্জনক আচরণ ছিল; যার ফলে এই জাতির নৈতিক অবক্ষয় ও অবনতির কথা প্রমাণ হয়। মূল্য পুরো নেওয়া হবে, কিন্তু জিনিস কম দেওয়া হবে, এটা তো জঘন্যতম খিয়ানত। এই কারণেই সূরা মুত্বাফফিফীনে এমন লোকদেরকে ধ্বংসের খবর দেওয়া হয়েছে।এ থেকে জানা যায়, এ জাতির দু’টি বড় দোষ ছিল। একটি শিরক এবং অন্যটি ব্যবসায়িক লেনদেনে অসাধুতা। এ দু’টি দোষ সংশোধন করার জন্য হযরত শো’আইব আলাইহিস সালামকে তাদের মধ্যে পাঠানো হয়েছিল।

পৃথিবীতে সত্যিকারার্থে সত্য ও ন্যায়নীতির বাস্তবায়নের মাধ্যমে সমাজ জীবনে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ও জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বজায় রাখা ইসলামের দৃষ্টিতে অপরিহার্য কর্তব্য এবং ঈমানি দায়িত্ব।  সুতরাং মানব সমাজে কোনো রকম নাশকতা, নৈরাজ্য, বিশৃঙ্খলা, সংঘাত, উগ্রতা, প্রতিহিংসাপরায়ণতা ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ইসলামে নিষিদ্ধ। আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে।

পৃথিবীতে মানুষের মৌলিক অধিকারের প্রাথমিক বিষয় বেঁচে থাকার অধিকার ও জীবনের সুরক্ষা। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সংঘাত ও সহিংসতাকে ইসলাম কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। হিংসা বিদ্বেষ ছেড়ে পরস্পরের মাঝে সৌহার্দ্য ও শাস্তিপূর্ণ সহবস্থান ইসলামের শিক্ষা। ইসলাম কখনো দ্বন্দ্ব, সংঘাত, বিশৃঙ্খলাকে প্রশ্রয় দেয় না। অশান্তি-বিশৃঙ্খলা তথা ফেতনা-ফ্যাসাদ সৃষ্টিকে কোরআনে হত্যার চেয়েও গুরুতর পাপ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘ফেতনা (দাঙ্গা, বিশৃঙ্খলা, নৈরাজ্য) হত্যা অপেক্ষা গুরুতর পাপ।’ (সুরা বাকারা, আয়াত, ১৯১)।

আরেক আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তারা দুনিয়ায় ধ্বংসাত্মক কাজ করে বেড়ায়, আল্লাহ ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত ব্যক্তিদের ভালোবাসেন না।’ (সুরা মায়েদা, আয়াত, ৬৪)

এ পাপ আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়েছে। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে এ পাপাচারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করার প্রয়োজন ও গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। কেননা একটি ফেতনা-অশান্তি সমাজে অসংখ্য ফেতনা-অশান্তি ও অরাজকতার জন্ম দিতে পারে। তাই ফেতনা-বিশৃঙ্খলা ও অশান্তি সৃষ্টির বিরুদ্ধে ইসলামের কঠোর অবস্থান।

ফেতনা-বিশৃঙ্খলা ও অশান্তি পরিহারকারীদের প্রকৃত মুসলিম বলে আখ্যা দিয়েছেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তিনি বলেছেন, ‘প্রকৃত মুসলমান সেই ব্যক্তি, যার হাত ও মুখ থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে’ (বুখারি : ৬৪৮৪; মুসলিম : ৪০)।

৭ : ৮৬ وَ لَا تَقۡعُدُوۡا بِكُلِّ صِرَاطٍ تُوۡعِدُوۡنَ وَ تَصُدُّوۡنَ عَنۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ مَنۡ اٰمَنَ بِهٖ وَ تَبۡغُوۡنَهَا عِوَجًا ۚ وَ اذۡكُرُوۡۤا اِذۡ كُنۡتُمۡ قَلِیۡلًا فَكَثَّرَكُمۡ ۪ وَ انۡظُرُوۡا كَیۡفَ كَانَ عَاقِبَۃُ الۡمُفۡسِدِیۡنَ

৮৬. আর তার প্রতি যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে ভয় দেখানোর জন্য, আল্লাহর পথ থেকে বাধা দিতে এবং তাতে বক্রতা অনুসন্ধান করতে তোমরা প্রতিটি পথে বসে থেকো না। আর স্মরণ কর, তোমরা যখন সংখ্যায় কম ছিলে, আল্লাহ তখন তোমাদের সংখ্যা বৃদ্ধি করেছেন এবং বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পরিণাম কিরূপ ছিল, তা লক্ষ্য কর।

আল্লাহর রাস্তা থেকে মানুষকে রোধ করার জন্য তাতে বক্রতা অনুসন্ধান করা প্রত্যেক যুগের অবাধ্যজনদের কাছে বড় পছন্দনীয় কাজ ছিল। আর এর দৃষ্টান্ত বর্তমানে আধুনিক এবং পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরণকারী লোকদের মাঝে দেখা যায়। أَعَاذَنَا اللهُ مِنْهُ। এ ছাড়াও রাস্তায় বসার আরো কয়েকটি অর্থ বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন,

–লোকদের কষ্ট দেওয়ার জন্য বসা। সাধারণতঃ দুষ্ট প্রকৃতিক লোকদের এই অভ্যাস হয়।

—অথবা শুআইব (আঃ)-এর কাছে যাওয়ার পথগুলোতে বসা। যাতে তাঁর কাছে যারা যায়, তাদেরকে যেতে বাধা দেয় এবং তাঁর ব্যাপারে তাদের মনে খারাপ ধারণা ঢুকিয়ে দেয়; যেমন মক্কার কুরাইশরা করত।

— কিংবা দ্বীনের পথগুলোতে বসা এবং এ পথের পথিকদের বাধা দেওয়া। এইভাবে লুণ্ঠনের জন্য ঘাঁটিতে বসে থাকা এবং আগমন ও প্রত্যাগমনকারীদের মাল-ধন লুটে নেওয়া।

— অথবা কারো কারো নিকট কর আদায় করার জন্য তাদের রাস্তায় বসা। ইমাম শাওকানী (রঃ) বলেন, প্রত্যেক অর্থই সঠিক হতে পারে। কেননা,

— এটাও হতে পারে যে, এ সব কিছুই তারা করত। (ফাতহুল ক্বাদীর)

রসূল (ﷺ) বলেন, ‘‘খবরদার! তোমরা রাস্তার ধারে বসো না। আর একান্তই যদি বসতেই হয়, তাহলে তার হক আদায় করো।  লোকেরা জিজ্ঞাসা করল, ‘রাস্তার হক কি? হে আল্লাহর রসূল!’ তিনি বললেন,

 ‘‘দৃষ্টি সংযত রাখা,

কাউকে কষ্ট দেওয়া হতে বিরত থাকা,

সালামের জবাব দেওয়া,

সৎকাজের আদেশ ও মন্দ কাজে বাধা দান করা (এবং পথভ্রষ্টকে পথ বলে দেওয়া)।’আহমাদ, বুখারী, মুসলিম, আবূ দাঊদ, সহীহুল জা’মে হা/২৬৭৫’

বিভিন্ন বর্ণনায় আরো কিছু বিষয় এসেছে। যেমন,)

৫. পথহারাকে পথ দেখিয়ে দেওয়া।

৬. মযলুম ও বিপদগ্রস্তের সাহায্য করা।

৭. বোঝা বহনকারীকে  (বোঝা উঠানো বা নামানোর ক্ষেত্রে) সহযোগিতা করা।

৮. ভালো কথা বলা।

৯. হাঁচির জবাব দেয়া। সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৪৮১৯; মুসনাদে বাযযার, হাদীস ৫২৩২; সহীহ মুসলিম, হাদীস ২১৬১; মুসনাদে আবি ইয়ালা, হাদীস ৬৬০৩

১০. দম্ভভরে না চলা (বিনয় অবলম্বন করা)। সূরা বনী ইসরাঈল : (১৬) ৩৭

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন

الْإِيمَانُ بِضْعٌ وَسَبْعُونَ – أَوْ بِضْعٌ وَسِتُّونَ – شُعْبَةً، فَأَفْضَلُهَا قَوْلُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ، وَأَدْنَاهَا إِمَاطَةُ الْأَذَى عَنِ الطَّرِيقِ، وَالْحَيَاءُ شُعْبَةٌ مِنَ الْإِيمَانِ.

ঈমানের সত্তরের অধিক শাখা রয়েছে, সর্বোত্তম শাখা ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলা, সর্বনিম্ন শাখা রাস্তা হতে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়া, আর লজ্জা ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ শাখা। ­সহীহ মুসলিম, হাদীস ৩৫

— রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আবু যর গিফারী রা.-কে নসীহত করেন; তার মাঝে একটি উপদেশ ছিল

وَإِمَاطَتُكَ الحَجَرَ وَالشَّوْكَةَ وَالعَظْمَ عَنِ الطَّرِيقِ لَكَ صَدَقَةٌ.

রাস্তা থেকে পাথর, কাঁটা, হাড্ডি সরানোও সদাকা। জামে তিরমিযী, হাদীস ১৯৫৬

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি এক ব্যক্তিকে জান্নাতের গালিচায় গড়াগড়ি খেতে দেখলাম (অর্থাৎ শান্তি ও আরামের সাথে সুখময় জীবন কাটাচ্ছে)। মানুষের চলাচলের পথে একটি গাছ ছিল, যার কারণে চলাচলে কষ্ট হচ্ছিল। এ ব্যক্তি তা কেটে দিয়েছিল। (ফলে আল্লাহ খুশি হয়ে তাকে জান্নাতে দাখেল করেন।) সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৯১৪

৭ : ৮৭ وَ اِنۡ كَانَ طَآئِفَۃٌ مِّنۡكُمۡ اٰمَنُوۡا بِالَّذِیۡۤ اُرۡسِلۡتُ بِهٖ وَ طَآئِفَۃٌ لَّمۡ یُؤۡمِنُوۡا فَاصۡبِرُوۡا حَتّٰی یَحۡكُمَ اللّٰهُ بَیۡنَنَا ۚ وَ هُوَ خَیۡرُ الۡحٰكِمِیۡنَ ﴿۸۷﴾

৮৭. আমি যা নিয়ে প্রেরিত হয়েছি তাতে যদি তোমাদের কোন দল ঈমান আনে এবং কোন দল ঈমান না আনে, তবে ধৈর্য ধর, যতক্ষন না আল্লাহ আমাদের মধ্যে ফয়সালা করে দেন, আর তিনিই শ্রেষ্ঠ ফয়সালাকারী।

এটা কুফরীর উপর ধৈর্য ধরার নির্দেশ নয়, বরং তার জন্য ধমক ও কঠিন হুমকি। কারণ, হকপন্থীদেরকে বাতিলপন্থীদের উপর বিজয়ী করাই হয় আল্লাহ তা’য়ালার শেষ ফায়সালা। এটা ঠিক এই ধরনের যেমন অন্যত্র বলেছেন, {فَتَرَبَّصُوا إِنَّا مَعَكُمْ مُتَرَبِّصُونَ} “সুতরাং তোমরা অপেক্ষা কর, আমরাও তোমাদের সাথে অপেক্ষমাণ।” (সূরা তাওবাহ ৫২ আয়াত)

ঐ প্রধানগণের দাম্ভিকতা ও আত্মগরিমার কথা আন্দাজ করুন যে, তারা শুধু তওহীদ ও ঈমানের দাওয়াতকে অস্বীকারই করেনি; বরং তার থেকেও সীমা অতিক্রম করে আল্লাহর নবী ও তাঁর উপর ঈমান আনয়নকারীদেরকে হুমকি দিয়ে বলেছিল যে, ‘তোমরা তোমাদের পূর্বপুরুষদের ধর্মে ফিরে এস, নচেৎ আমরা তোমাদেরকে এখান থেকে তাড়িয়ে দেব।’ ঈমানদারদের পূর্ব ধর্মে ফিরে আসার কথা বুঝে আসার মত। কারণ তারা কুফরী ছেড়ে ঈমান গ্রহণ করেছিল। কিন্তু শুআইব (আঃ)-কেও পূর্ব-পুরুষদের ধর্মে ফিরে আসার দাওয়াত হয়তো এই কারণে যে, তারা তাঁকেও নবুঅত-প্রাপ্তি এবং দাওয়াত ও তবলীগের আগে নিজেদের ধর্মাবলম্বী মনে করত, যদিও সত্য এর বিপরীত। অথবা সংখ্যাধিক্যের দিকে লক্ষ্য করে তাঁকেও নিজেদের মধ্যে শামিল করে নিয়েছে। (এখানে অনেকে ধর্মাদর্শে ফিরে আসার অনুবাদ করেছেন। কিন্তু নবীগণ আদৌ কুফরী ধর্মাদর্শে ছিলেন না। অতএব ফিরে আসার অনুবাদ না করাই উত্তম।) (ফাতহুল ক্বাদীর)

 এটি একটি ঊহ্য প্রশ্নের উত্তর। أ (প্রশ্ন) অস্বীকৃতিসূচক। আর و অবস্থা বর্ণনার জন্য। অর্থাৎ, তোমরা কি আমাদেরকে তোমাদের ধর্মে ফিরিয়ে দেবে কিংবা আমাদের নিজ গ্রাম হতে তাড়িয়ে দেবে, যদিও আমরা ঐ ধর্মে ফিরে যেতে বা এই গ্রাম হতে বেরিয়ে যেতে অপছন্দ করি? সার কথা তোমাদের জন্য উচিত নয় যে, তোমরা আমাদেরকে এর মধ্যে কোন একটি করতে বাধ্য করবে।

৭ : ৮৯ قَدِ افۡتَرَیۡنَا عَلَی اللّٰهِ كَذِبًا اِنۡ عُدۡنَا فِیۡ مِلَّتِكُمۡ بَعۡدَ اِذۡ نَجّٰنَا اللّٰهُ مِنۡهَا ؕ وَ مَا یَكُوۡنُ لَنَاۤ اَنۡ نَّعُوۡدَ فِیۡهَاۤ اِلَّاۤ اَنۡ یَّشَآءَ اللّٰهُ رَبُّنَا ؕ وَسِعَ رَبُّنَا كُلَّ شَیۡءٍ عِلۡمًا ؕ عَلَی اللّٰهِ تَوَكَّلۡنَا ؕ رَبَّنَا افۡتَحۡ بَیۡنَنَا وَ بَیۡنَ قَوۡمِنَا بِالۡحَقِّ وَ اَنۡتَ خَیۡرُ الۡفٰتِحِیۡنَ

৮৯. তোমাদের ধর্মাদর্শ থেকে আল্লাহ আমাদেরকে উদ্ধার করার পর যদি আমরা তাতে ফিরে যাই তবে তো আমরা আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করব। আর আমাদের রব আল্লাহ ইচ্ছে না করলে তাতে ফিরে যাওয়া আমাদের জন্য সমীচীন নয়। সবকিছুই আমাদের রবের জ্ঞানের সীমায় রয়েছে, আমরা আল্লাহ্‌র উপরই নির্ভর করি। হে আমাদের রব! আমাদের ও আমাদের সম্প্রদায়ের মধ্যে ন্যায্যভাবে ফয়সালা করে দিন এবং আপনিই শ্রেষ্ঠ ফয়সালাকারী।

যদি আমরা পুনর্বার পূর্ব ধর্মে ফিরে যাই, যার থেকে আল্লাহ আমাদের পরিত্রাণ দিয়েছেন, তাহলে এর অর্থ  হবে আমরা ঈমান ও তাওহীদের দাওয়াত দিয়ে আল্লাহর উপর মিথ্যারোপ করেছিলাম। যার অর্থ হল, আমরা এ রকম করব, তা কখনই স‎ম্ভব নয়।

তারা নিজেদের সংকল্প প্রকাশ করার পর ব্যাপারটি আল্লাহকে সোপর্দ করে দিল। অর্থাৎ, আমরা নিজের ইচ্ছায় কুফরীর দিকে ফিরে যেতে পারি না, তবে আল্লাহ চাইলে তা আলাদা ব্যাপার। কেউ কেউ বলেন, এটি সুচের ছিদ্রে উট প্রবেশ করার মত; যা অস‎ম্ভব।

 তিনি আমাদের ঈমানের উপর দৃঢ় রাখবেন এবং কুফরী ও কাফেরদের মধ্যে অন্তরায় সৃষ্টি করবেন। আমাদের উপর নিজ অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করবেন এবং নিজ আযাব হতে রক্ষা করবেন।

আর আল্লাহ যখন ফায়সালা করে ফেলেন, তখন এমনই হয় যে ঈমানদারদের পরিত্রাণ দিয়ে মিথ্যাজ্ঞানকারী ও অহংকারীদেরকে ধ্বংস করে দেন। এটি ছিল যেন আল্লাহর আযাব অবতীর্ণ হওয়ার দাবী।

এ বাক্যটি ঠিক সেই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে যে অর্থে আমরা ইনশাআল্লাহ বলে থাকি এবং যে সম্পর্কে সূরা কাহাফে (আয়াত ২৩-২৪) বলা হয়েছেঃ কোন জিনিস সম্পর্কে দাবী সহকারে একথা বলো না, আমি এমনটি করবো বরং এভাবে বলো, যদি আল্লাহ‌ চান তাহলে আমি এমনটি করবো। কারণ যে মু’মিন আল্লাহর সর্বময় কর্তৃত্ব এবং নিজের দাসত্ব, অধীনতা ও বশ্যতা সম্পর্কে যথাযথ উপলব্ধির অধিকারী হয়, সে কখনো নিজের শক্তির ওপর ভরসা করে এ দাবী করতে পারে না-আমি অমুক কাজটি করেই ছাড়বো অথবা অমুক কাজটি কখনো করবোই না। বরং সে এভাবে বলবে, আমার এ কাজ করার বা না করার ইচ্ছা আছে কিন্তু আমরা এ ইচ্ছা পূর্ণ হওয়া তো আমার মালিকের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে, তিনি তাওফিক দান করলে আমি সফলকাম হবো অন্যথায় ব্যর্থ হয়ে যাবো।

৭ : ৯০ وَ قَالَ الۡمَلَاُ الَّذِیۡنَ كَفَرُوۡا مِنۡ قَوۡمِهٖ لَئِنِ اتَّبَعۡتُمۡ شُعَیۡبًا اِنَّكُمۡ اِذًا لَّخٰسِرُوۡنَ

৯০. আর তার সম্প্রদায়ের নেতাদের মধ্যে যারা কুফরী করেছিল তারা বলল, তোমরা যদি শু’আইবকে অনুসরণ কর, তবে নিশ্চয় তোমরা ক্ষতিগ্রস্থ হবে।

নিজ পিতৃপুরুষদের ধর্ম ছেড়ে দেওয়া ও মাপে-ওজনে কম-বেশি না করা, এটি ছিল তাদের নিকট ক্ষতিকর জিনিস; যদিও এই দুয়ের মধ্যেই ছিল তাদের লাভ। কিন্তু দুনিয়ার লোকের চোখে নগদ লাভই সব কিছু, যা ওজনে কম-বেশি করার মাধ্যমে তারা পাচ্ছিল, তারা ঈমানদারদের মত আখেরাতের লাভের জন্য তা কেন ছেড়ে দেবে?

এ ছোট বাক্যটির ওপর ভাসা ভাসা দৃষ্টি বুলিয়ে এগিয়ে যাওয়া উচিত নয়। এটি থমকে দাঁড়িয়ে গভীরভাবে চিন্তা করার একটি স্থান। মাদ্ইয়ানের সরদাররা ও নেতারা আসলে যে কথা বলছিল এবং নিজের জাতিকেও বিশ্বাস করাতে চাইছিল তা এই যে, শো’আইব যে সততা ও ঈমানদারীর দাওয়াত দিচ্ছেন এবং মানুষকে নৈতিকতা ও বিশ্বস্ততার যেসব স্বতন্ত্র মূলনীতির অনুসারী করতে চাচ্ছেন, সেগুলো মেনে নিলে আমরা ধ্বংস হয়ে যাবো। আমরা যদি পূর্ণ সততার সাথে ব্যবসা করতে থাকি এবং কোন প্রকার প্রতারণার আশ্রয় না নিয়ে ঈমানদারীর সাথে পন্য বেচাকেনা করতে থাকি তাহলে আমাদের ব্যবসা কেমন করে চলবে?

আমরা দুনিয়ার দু’টি সবচেয়ে বড় বানিজ্যিক সড়কের সন্ধিস্থলে বাস করি এবং মিসর ও ইরাকের মতো দু’টি বিশাল সুসভ্য ও উন্নত রাষ্ট্রের সীমান্তে আমাদের জনপদ গড়ে উঠেছে। এমতাবস্থায় আমরা যদি বাণিজ্যিক কাফেলার মালপত্র ছিনতাই করা বন্ধ করে দিয়ে শান্তিপ্রিয় হয়ে যাই তাহলে বর্তমান ভৌগলিক অবস্থানের কারণে আমরা এতদিন যে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সুযোগ সুবিধা লাভ করে আসছিলাম তা একদম বন্ধ হয়ে যাবে এবং আশেপাশের বিভিন্ন জাতির ওপর আমাদের যে প্রতাপ ও আধিপত্য কায়েম আছে তাও খতম হয়ে যাবে। এ ব্যাপারটি কেবল শো’আইব সম্প্রাদায়ের প্রধানদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং প্রত্যেক যুগের পথভ্রষ্ট লোকেরা সত্য, ন্যায়, সততা ও বিশ্বস্ততার নীতি অবলম্বন করার মধ্যে এমনি ধরনের বিপদেরআশঙ্কা করেছে। প্রত্যেক যুগের নৈরাজ্যবাদীরা একথাই চিন্তা করেছে যে, ব্যবসায়-বাণিজ্য, রাজনীতি এবং অন্যান্য পার্থিব বিষয়াবলী মিথ্যা, বেঈমানী ও দুর্নীতি ছাড়া চলতে পারে না। প্রত্যেক জায়গায় সত্যের দাওয়াতের মোকাবিলায় যেসব বড় বড় অজুহাত পেশ করা হয়েছে তার মধ্যে একটি হচ্ছে এই যে, যদি দুনিয়ার প্রচলিত পথ থেকে সরে গিয়ে এ দাওয়াতের অনুসরণ করা হয় তাহলে সমগ্র জাতি ধ্বংস হয়ে যাবে।

এখানে رَجفَة (ভূমিকম্প) শব্দ ব্যবহার হয়েছে আর সূরা হূদের ৯৪ আয়াতে صَيحَة (চিৎকার) শব্দ এবং সূরা শুআরার ১৮৯ আয়াতে ظُلة (মেঘের ছায়া) শব্দ ব্যবহূত হয়েছে। ইমাম ইবনে কাসীর বলেন, আযাবে সকল জিনিসই একত্রিত হয়েছিল। অর্থাৎ, প্রথমে মেঘ তাদের উপর ছায়া বিস্তার করেছিল, যাতে আগুনের শিখা ও অঙ্গার ছিল। তারপর আকাশ হতে এক বিকট শব্দ ও মাটি হতে ভূমিকম্প শুরু হয়; যার ফলে তারা মারা যায় এবং তাদের লাশগুলি পাখীর ন্যায় উপুড় হয়ে পড়ে থাকে।

অর্থাৎ, যে এলাকা হতে তারা রসূল ও তার অনুসারীদের বের করার জন্য প্রস্তুত ছিল আল্লাহর আযাব আসার পর সে এলাকার অবস্থা এমন হল, যেন তারা এখানে বাসই করত না।

 ক্ষতিগ্রস্ত তারাই হল যারা নবীকে মিথ্যাজ্ঞান করেছিল, নবী (সাঃ) ও তাঁর অনুসারীগণ নন। আর ক্ষতি ইহকালের ও পরকালেরও। দুনিয়াতে অপমানজনক শাস্তি এবং আখেরাতে এর চেয়েও কঠিন শাস্তি রয়েছে।

শু’আইব ‘আলাইহিস সালাম যে সম্প্রদায়ের প্রতি প্রেরিত হয়েছিলেন, কুরআনুল কারীমে কোথাও তাদেরকে ‘আহলে মাদইয়ান’ ও ‘আসহাবে মাদইয়ান’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে। আবার কোথাও ‘আসহাবে আইকাহ’ নামে। ‘আইকাহ’ শব্দের অর্থ জঙ্গল ও বন। কোন কোন তাফসীরবিদ বলেনঃ ‘আসহাবে মাদইয়ান’ ও ‘আসহাবে আইকাহ’ পৃথক পৃথক জাতি। তাদের বাসস্থানও ছিল ভিন্ন ভিন্ন এলাকায়। শু’আইব ‘আলাইহিস সালাম প্রথমে এই জাতির প্রতি প্রেরিত হয়েছিলেন। তারা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর অপর জাতির প্রতি প্রেরিত হয়েছিলেন। উভয় জাতির উপর যে আযাব আসে, তার ভাষাও বিভিন্ন রূপ। আসহাবে মাদইয়ানের উপর কোথাও صيحة এবং কোথাও رجفة এবং আসহাবে আইকাহর উপর কোথাও ظلة এর আযাব উল্লেখ করা হয়েছে। صيحة শব্দের অর্থ বিকট চিৎকার এবং ভীষণ শব্দ। رجفة শব্দের অর্থ ভূমিকম্পন এবং ظلة শব্দের অর্থ ছায়াযুক্ত ছাদ, শামিয়ানা।

আসহাবে আইকাহর উপর এভাবে আযাব নাযিল করা হয় যে, প্রথমে কয়েকদিন তাদের বস্তিতে ভীষণ গরম পড়ে। ফলে গোটা জাতি ছটফট করতে থাকে। অতঃপর নিকটস্থ একটি গভীর জঙ্গলের উপর গাঢ় মেঘমালা দেখা দেয়। ফলে জঙ্গলে ছায়া পড়ে এবং শীতল বাতাস বইতে থাকে। এ দৃশ্য দেখে বস্তির সবাই জঙ্গলে জমায়েত হয়। এভাবে অপরাধীরা কোনরূপ গ্রেফতারী পরোয়ানা ও সিপাই-সান্ত্রীর প্রহরা ছাড়াই নিজ পায়ে হেঁটে বধ্যভূমিতে গিয়ে পৌছে। যখন সবাই সেখানে একত্রিত হয়, তখন মেঘমালা থেকে অগ্নি বৃষ্টি বর্ষিত হয় এবং নীচের দিকে শুরু হয় ভূমিকম্পন। ফলে সবাই নাস্তানাবুদ হয়ে যায়।

কোন কোন তাফসীরবিদ বলেনঃ ‘আসহাবে মাদইয়ান’ ও ‘আসহাবে আইকাহ’ একই সম্প্রদায়ের দুই নাম। পূর্বোল্লেখিত তিন প্রকার আযাবই তাদের উপর নাযিল হয়েছিল। প্রথমে মেঘমালা থেকে অগ্নি বর্ষিত হয়, অতঃপর বিকট চীৎকার শোনা যায় এবং সবশেষে ভূমিকম্পন হয়। ইবনে কাসীর এ তাফসীরেরই প্রবক্তা। [আশ-শির্ক ফিল কাদীম ওয়াল হাদীস, পৃ. ২৮৫-২৯৩]

মোটকথা, উভয় সম্প্রদায় ভিন্ন ভিন্ন হোক কিংবা একই সম্প্রদায়ের দু’নাম হোক শু’আইব ‘আলাইহিস সালাম তাদের কাছে তাওহীদের বাণীই পৌছান। তারা শির্কের পাশাপাশি এমনকিছু কুকর্মে লিপ্ত ছিল, যা থেকে শু’আইব ‘আলাইহিস্ সালাম তাদেরকে নিষেধ করেন। তারা একদিকে আল্লাহর হক নষ্ট করছিল, অপরদিকে বান্দার হকও নষ্ট করছিল। তারা আল্লাহ্ তা’আলা ও তাদের নবীর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন না করে আল্লাহর হকের বিরুদ্ধাচরণ করছিল। এর সাথে ক্রয়-বিক্রয়ে মাপ ও ওজনে কম দিয়ে বান্দাদের হক নষ্ট করছিল। তদুপরি তারা রাস্তা ও সড়কের মুখে বসে থাকত এবং পথিকদের ভয়-ভীতি দেখিয়ে তাদের ধন-সম্পদ লুটে নিত এবং শু’আইব ‘আলাইহিস সালামের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতে বাধা দিত। তারা এভাবে ভূ-পৃষ্ঠে অনর্থ সৃষ্টি করছিল। এসব অপরাধের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের হেদায়াতের জন্য শু’আইব ‘আলাইহিস সালাম প্রেরিত হয়েছিলেন। শু’আইব ‘আলাইহিস সালাম তাদের সংশোধনের জন্য তিনটি বিষয় বর্ণনা করেছেন।

প্রথমতঃ তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর। তিনি ব্যতীত ইবাদাত পাওয়ার যোগ্য আর কেউ নেই। একত্ববাদের এ দাওয়াতই সব নবী দিয়ে এসেছেন। এটিই সব বিশ্বাস ও কর্মের প্রাণ। এ সম্প্রদায়ও সৃষ্ট বস্তুর পূজায় লিপ্ত ছিল এবং আল্লাহর সত্তা, গুণাবলী ও হক সম্পর্কে গাফেল হয়ে পড়েছিল। তাই তাদেরকে সর্বপ্রথম এ বাণী পৌছানো হয়েছে। আরো বলা হয়েছেঃ তোমাদের কাছে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট প্রমাণ এসে গেছে। এখানে ‘সুস্পষ্ট প্রমাণ’-এর অর্থ ঐসব মু’জিযা, যা শু’আইব আলাইহিস সালামের হাতে প্রকাশ পেয়েছিল।

দ্বিতীয়তঃ তোমরা মাপ ও ওজন পূর্ণ কর এবং মানুষের দ্রব্যাদিতে কম দিয়ে তাদের ক্ষতি করো না। এতে প্রথমে একটি বিশেষ অপরাধ নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যা ক্রয়-বিক্রয়ের সময় ওজনে কম দিয়ে করা হত। অতঃপর সর্ব প্রকার হকে ক্রটি করাকে ব্যাপকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, তা ধন-সম্পদ, ইযযত-আবরু অথবা অন্য যে কোন বস্তুর সাথেই সম্পর্কযুক্ত হোক না কেন। এ থেকে জানা গেল যে, মাপ ও ওজনে পাওনার চাইতে কম দেয়া যেমন হারাম, তেমনি অন্যান্য হকে ক্রটি করাও হারাম। কারো ইযযত-আবরু নষ্ট করা, কারো পদমর্যাদা অনুযায়ী তার সম্মান না করা, যাদের আনুগত্য জরুরী তাদের আনুগত্যে ক্রটি করা ইত্যাদি সবই এ অপরাধের অন্তর্ভুক্ত, যা শু’আইব ‘আলাইহিস সালামের সম্প্রদায় করত। বিদায় হজের ভাষণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের ইযযত-আবরুকে তাদের রক্তের সমান সম্মানযোগ্য ও সংরক্ষণযোগ্য সাব্যস্ত করেছেন।

তৃতীয়তঃ পৃথিবীর সংস্কার সাধিত হওয়ার পর তাতে অনর্থ ছড়িও না। অর্থাৎ পৃথিবীর বাহ্যিক সংস্কার হল, প্রত্যেকটি বস্তুকে যথার্থ স্থানে ব্যয় করা, এবং নির্ধারিত সীমার প্রতি লক্ষ্য রাখা। বস্তুতঃ তা ন্যায় ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার উপর নির্ভরশীল। আর আভ্যন্তরীণ সংস্কার হল আল্লাহর সাথে সম্পর্ক রাখা এবং তা তার নির্দেশাবলী পালনের উপর ভিত্তিশীল। এমনিভাবে পৃথিবীর বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ অনর্থ এসব নীতি পরিত্যাগ করার কারণেই দেখা দেয়। শু’আইব ‘আলাইহিস সালামের সম্প্রদায় এসব নীতির প্রতি চরম উপেক্ষা প্রদর্শন করেছিল। ফলে পৃথিবীতে বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ সব রকম অনৰ্থ বিরাজমান ছিল। তাই তাদেরকে উপদেশ দেয়া হয়েছে যে, তোমাদের এসব কর্মকাণ্ড সমগ্র ভূ-পৃষ্ঠে অনর্থ সৃষ্টি করবে। তাই এগুলো থেকে বেঁচে থাক।

অতঃপর বলা হয়েছেঃ যদি তোমরা আমার কথা মান্য কর, তবে তোমাদের জন্য উত্তম। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, যদি তোমরা অবৈধ কাজ-কর্ম থেকে বিরত হও, তবে এতেই তোমাদের দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ ও মঙ্গল নিহিত রয়েছে। দ্বীন ও আখেরাতের মঙ্গলের বর্ণনা নিষ্প্রয়োজন। কারণ, এটি আল্লাহর আনুগত্যের সাথেই সর্বতোভাবে জড়িত। দুনিয়ার মঙ্গল এ জন্য যে, যখন সবাই জানতে পারবে যে, অমুক ব্যক্তি মাপ ও ওজনে এবং অন্যান্য হকের ব্যাপারে সত্যনিষ্ঠ, তখন বাজারে তার প্রভাব বিস্তৃত হবে এবং ব্যবসায়ে উন্নতি সাধিত হবে। এরপর তাদেরকে হুশিয়ার করার জন্য উৎসাহ প্রদান ও ভীতি প্রদর্শন উভয় পন্থা ব্যবহার করা হয়েছে। প্রথমে উৎসাহ প্রদানের উদ্দেশ্যে আল্লাহ তা’আলার নেয়ামত স্মরণ করানো হয়েছে যে, তোমরা পূর্বে সংখ্যা ও গণনার দিক দিয়ে কম ছিলে, আল্লাহ তা’আলা তোমাদের বংশ বৃদ্ধি করে তোমাদেরকে একটি বিরাট জাতিতে পরিণত করেছেন। অথবা তোমরা ধন-সম্পদের দিক দিয়ে কম ছিলে, আল্লাহ্ তাআলা ঐশ্বৰ্য্য দান করে তোমাদের স্বনির্ভর করে দিয়েছেন।

অতঃপর ভীতি প্রদর্শনার্থে বলা হয়েছেঃ পূর্ববর্তী অনর্থ সৃষ্টিকারী জাতিসমূহের পরিণামের প্রতি লক্ষ্য কর- কওমে নূহ, আদ, সামূদ ও কওমে লুতের উপর কি ভীষণ আযাব এসেছে। তোমরা ভেবে-চিন্তে কাজ কর। শু’আইব ‘আলাইহিস সালামের দাওয়াতের পর তার সম্প্রদায় দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। কিছু সংখ্যক মুসলিম হয়, এবং কিছু সংখ্যক কাফেরই থেকে যায়। কিন্তু বাহ্যিক দিক দিয়ে উভয় দল একই রূপ আরাম-আয়েশে দিনাতিপাত করতে থাকে। এতে তারা সন্দেহ প্রকাশ করে যে, কাফের হওয়া অপরাধ হলে অপরাধীরা অবশ্যই শাস্তি পেত। এ সন্দেহের উত্তরে বলা হয়েছেঃ তাড়াহুড়া কিসের? আল্লাহ তা’আলা স্বীয় সহনশীলতা ও কৃপাগুণে অপরাধীদের অবকাশ দিয়ে থাকেন।

তারা যখন চূড়ান্ত সীমায় পৌছে যায়, তখন সত্য ও মিথ্যার মীমাংসা করে দেয়া হয়। তোমাদের অবস্থাও তদ্রুপ। তোমরা যদি কুফর থেকে বিরত না হও, তবে অতি সত্বর কাফেরদের উপর চূড়ান্ত আযাব নাযিল হয়ে যাবে। জাতির অহংকারী সর্দারদের সাথে এ পর্যন্ত আলাপ-আলোচনার পর যখন শু’আইব ‘আলাইহিস সালাম বুঝতে পারলেন যে, তারা কোন কিছুতেই প্রভাবান্বিত হচ্ছে না, তখন তাদের সাথে কথা-বার্তা ছেড়ে আল্লাহ্ তা’আলার কাছে দোআ করলেনঃ হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদের ও আমাদের জাতির মধ্যে সত্যভাবে ফয়সালা করে দিন, এবং আপনি শ্রেষ্ঠতম ফয়সালাকারী। প্রকৃতপক্ষে এর মাধ্যমে শু’আইব ‘আলাইহিস সালাম স্বীয় সম্প্রদায়ের কাফেরদেরকে ধ্বংস করার দোআ করেছিলেন। আল্লাহ্ তা’আলা এ দোআ কবুল করে ভূমিকম্পের মাধ্যমে তাদেরকে ধ্বংস করে দেন।

শু’আইব ‘আলাইহিস সালামের সম্প্রদায়ের আযাবকে এখানে ভূমিকম্প বলা হয়েছে। কিন্তু অন্যান্য আয়াতে বলা হয়েছে, তাদেরকে ছায়াদিবসের আযাব পাকড়াও করেছে। [সূরা আশ-শু’আরা: ১৮৯] ছায়া দিবসের অর্থ এই যে, প্রথমে তাদের উপর ঘন কাল মেঘের ছায়া পতিত হয়। তারা এর নীচে একত্রিত হয়ে গেলে এ মেঘ থেকেই তাদের উপর প্রস্তর অথবা অগ্নিবৃষ্টি বর্ষণ করা হয়। আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা উভয় আয়াতের সামঞ্জস্য প্রসঙ্গে বলেনঃ শু’আইব আলাইহিস সালামের সম্প্রদায়ের উপর প্রথমে এমন ভীষণ গরম চাপিয়ে দেয়া হয়, যেন জাহান্নামের দরজা তাদের দিকে খুলে দেয়া হয়েছিল। ফলে তাদের শ্বাস রুদ্ধ হতে থাকে। ছায়া এমন কি পানিতেও তাদের জন্য শান্তি ছিল না।

তারা অসহ্য গরমে অতিষ্ট হয়ে ভূগর্ভস্থ কক্ষে প্রবেশ করে দেখল সেখনে আরো বেশী গরম। অতঃপর অস্থির হয়ে জঙ্গলের দিকে ধাবিত হল। সেখানে আল্লাহ তা’আলা একটি ঘন কাল মেঘ পাঠিয়ে দিলেন যার নীচে শীতল বাতাস বইছিল। তারা সবাই গরমে দিগ্বিদিক জ্ঞানহারা হয়ে মেঘের নিচে এসে ভিড় করল। তখন মেঘমালা আগুনে রূপান্তরিত হয়ে তাদের উপর বর্ষিত হল এবং ভূমিকম্পও এল। ফলে তারা সবাই ভস্মস্তুপে পরিণত হল। এভাবে তাদের উপর ভূমিকম্প ও ছায়ার আযাব উভয়টিই আসে। [তাবারী, ৬/৯/৪; আশ-শির্ক ফিল কাদীম ওয়াল হাদীস পৃ. ২৯২-২৯৩]

স্বজাতির উপর আযাব আসতে দেখে শু’আইব ‘আলাইহিস সালাম সঙ্গীদেরকে নিয়ে সেখান থেকে প্রস্থান করেন। জাতির চরম অবাধ্যতায় নিরাশ হয়ে শু’আইব আলাইহিস সালাম বদদোআ করেছিলেন ঠিকই কিন্তু যখন আযাব এসে গেল তখন নবীসুলভ দয়ার কারণে তার অন্তর ব্যথিত হল। তাই নিজের মনকে প্রবোধ দিয়ে জাতির উদ্দেশ্যে বললেনঃ আমি তোমাদের কাছে প্রতিপালকের নির্দেশ পৌছে দিয়েছিলাম এবং তোমাদের হিতাকাংখায় কোন ক্রটি করিনি; কিন্তু আমি কাফের সম্প্রদায়ের জন্য কতটুকু কি করতে পারি? [এ জাতির বিস্তারিত ঘটনা ও পরিণতি জানার জন্য দেখুন, ইবন কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ১/৪৩৯]

এখানে যতগুলো কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে, সবগুলোতে আসলে একজনের ঘটনা বর্ণনা করে তার মধ্যে অন্যজনের চেহারা দেখানোর রীতি অবলম্বন করা হয়েছে। এখানকার প্রত্যেকটি কাহিনী সে সময় মুহাম্মাদ ﷺ ও তাঁর জাতির মধ্যে যা কিছু সংঘটিত হচ্ছিল তার সাথে পুরোপুরি সাদৃশ্যপূর্ণ। প্রত্যেকটি কাহিনী ও ঘটনার এক পক্ষে একজন নবী আছেন। তাঁর শিক্ষা, দাওয়াত, উপদেশ ও কল্যাণকামিতা এবং তাঁর সমস্ত কথাই মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুরূপ। আর প্রত্যেকটি কাহিনীর দ্বিতীয় পক্ষে আছে সত্য প্রত্যাখানকারী, গোষ্ঠি, সম্প্রদায় ও জাতি। তাদের আকীদাগত বিভ্রান্তি, নৈতিক চরিত্রহীনতা, মূর্খতাজনিত হঠকারিতা, তাদের গোত্র প্রধানদের শ্রেষ্ঠত্বের অহমিকা এবং সত্য অস্বীকারকারী লোকদের নিজেদের গোমরাহীর ব্যাপারে একগুয়েমী ইত্যাদি সবকিছুই ঠিক তেমনি যেমন কুরাইশদের মধ্যে পাওয়া যেতো। আবার প্রত্যেকটি কাহিনীতে সত্য অস্বীকারকারী জাতিগুলোর যে পরিণাম দেখানো হয়েছে তার মাধ্যমে আসলে কুরাইশদেরকে শিক্ষা দেয়া হয়েছে যে, যদি তোমরা আল্লাহর পাঠানো নবীদের কথা না মানো এবং চরিত্র সংশোধনের যে সুযোগ তোমাদের দেয়া হচ্ছে অন্ধ জিদ ও গোয়ার্তুমীরবশবর্তী হয়ে তা হেলায় হারিয়ে বসো, তাহলে চিরদিন গোমরাহী ও ফিতনা-ফাসাদের ক্ষেত্রে জিদ ধরে বিভিন্ন জাতি যেমন পতন ও ধ্বংসের সম্মুখীন হয়েছে, তোমরাও তেমনি ধ্বংসের সম্মুখীন হবে।