সূরা আরাফঃ ৪র্থ রুকু(৩২-৩৯আয়াত)

أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ

৭ : ৩২ قُلۡ مَنۡ حَرَّمَ زِیۡنَۃَ اللّٰهِ الَّتِیۡۤ اَخۡرَجَ لِعِبَادِهٖ وَ الطَّیِّبٰتِ مِنَ الرِّزۡقِ ؕ قُلۡ هِیَ لِلَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا فِی الۡحَیٰوۃِ الدُّنۡیَا خَالِصَۃً یَّوۡمَ الۡقِیٰمَۃِ ؕ كَذٰلِكَ نُفَصِّلُ الۡاٰیٰتِ لِقَوۡمٍ یَّعۡلَمُوۡنَ ﴿۳۲﴾

৩২. বলুন, আল্লাহ্ নিজের বান্দাদের জন্য যেসব শোভার বস্তু ও বিশুদ্ধ জীবিকা সৃষ্টি করেছেন তা কে হারাম করেছে? বলুন, ‘পার্থিব জীবনে, বিশেষ করে কেয়ামতের দিনে এ সব তাদের জন্য, যারা ঈমান আনে। এভাবে আমরা জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য আয়াতসমূহ বিশদভাবে বিবৃত করি।

কোন বস্তু হালাল অথবা হারাম করা একমাত্র সে সত্তারই কাজ যিনি এসব বস্তু সৃষ্টি করেছেন। এতে অন্যের হস্তক্ষেপ বৈধ নয়। কাজেই সেসব লোক দণ্ডনীয়, যারা আল্লাহর হালালকৃত উৎকৃষ্ট পোষাক অথবা পবিত্র ও সুস্বাদু খাদ্যকে হারাম মনে করে। সংগতি থাকা সত্ত্বেও জীর্ণাবস্থায় থাকা ইসলামের শিক্ষা নয় এবং ইসলামের দৃষ্টিতে পছন্দনীয়ও নয়। খোরাক ও পোষাক সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবী ও তাবেয়ীগণের সুন্নাতের সারকথা এই যে, এসব ব্যাপারে লৌকিকতা পরিহার করতে হবে। যেরূপ পোষাক ও খোরাক সহজলভ্য তাই কৃতজ্ঞতা সহকারে ব্যবহার করতে হবে। আয়াতের তাফসীরে ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত আছে যে, আরবরা জাহিলিয়াতে কাপড়-চোপড় সহ বেশ কিছু জিনিস হারাম করত।

অথচ এগুলো আল্লাহ হারাম করেননি। যেমন অন্য আয়াতে আল্লাহ্ বলেছেন,

 বলুন তোমরা আমাকে জানাও, আল্লাহ্ তোমাদের যে রিযক দিয়েছেন তারপর তোমরা তার কিছু হালাল ও কিছু হারাম করেছ, বলুন, আল্লাহ কি তোমাদেরকে এটার অনুমতি দিয়েছেন, নাকি তোমরা আল্লাহর উপর মিথ্যা রটনা করছ? [সূরা ইউনুস: ৫৯] তখন আল্লাহ্ তা’আলা আলোচ্য এ আয়াত নাযিল করেন। [তাবারী] কাতাদা বলেন, এ আয়াত দ্বারা জাহেলিয়াতের কাফেররা বাহীরা, সায়েবা, ওসীলা, হাম ইত্যাদি নামে যে সমস্ত প্রাণী হারাম করত সেগুলোকে উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে। [তাবারী]

 আয়াতের এ বাক্যে একটি বিশেষ তাৎপর্য বর্ণনা করা হয়েছে যে, দুনিয়ার সব নেয়ামত; উৎকৃষ্ট পোষাক ও সুস্বাদু খাদ্য প্রকৃতপক্ষে আনুগত্যশীল মুমিনদের জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে এবং তাদের কল্যাণেই অন্যেরা ভোগ করতে পারছে। কিন্তু আখেরাতে সমস্ত নেয়ামত ও সুখ কেবলমাত্র আল্লাহর অনুগত বান্দাদের জন্য নির্দিষ্ট থাকবে। আয়াতের এ বাক্যে বলা হয়েছে, “আপনি বলে দিনঃ সব পার্থিব নেয়ামত প্রকৃতপক্ষে পার্থিব জীবনেও মুমিনদেরই প্রাপ্য এবং কেয়ামতের দিন তো এককভাবে তাদের জন্যই নির্দিষ্ট হবে।” [তাবারী ইবন আব্বাস হতে] আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমার অপর মতে এ বাক্যটির অর্থ এই যে, পার্থিব সব নেয়ামত ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য আখেরাতে শাস্তির কারণ হবে না- এ বিশেষ অবস্থাসহ তা একমাত্র অনুগত মুমিন বান্দাদেরই প্রাপ্য। কাফের ও পাপাচারীর অবস্থা এরূপ নয়। পার্থিব নেয়ামত তারাও পায় বরং আরো বেশী পায়; কিন্তু এসব নেয়ামত আখেরাতে তাদের জন্য শাস্তি ও স্থায়ী আযাবের কারণ হবে।

কাজেই পরিণামের দিক দিয়ে এসব নেয়ামত তাদের জন্য সম্মান ও সুখের বস্তু নয়। [কুরতুবী]

কোন কোন তাফসীরবিদের মতে এর অর্থ এই যে, পার্থিব সব নেয়ামতের সাথে পরিশ্রম, কষ্ট, হস্তচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা ও নানারকম দুঃখ-কষ্ট লেগে থাকে, নির্ভেজাল নেয়ামত ও অনাবিল সুখের অস্তিত্ব এখানে নেই। তবে কেয়ামতে যারা এসব নেয়ামত লাভ করবে, তারা নির্ভেজাল অবস্থায় লাভ করবে। এগুলোর সাথে কোনরূপ পরিশ্রম, কষ্ট, হস্তচ্যুযত হওয়ার আশংকা এবং কোন চিন্তা-ভাবনা থাকবে না [বাগভী] উপরোক্ত তিন প্রকার অর্থই আয়াতের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। তাই সাহাবী ও তাবেয়ী তাফসীরবিদগণ এসব অর্থই গ্রহণ করেছেন।

৭ : ৩৩ قُلۡ اِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّیَ الۡفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنۡهَا وَ مَا بَطَنَ وَ الۡاِثۡمَ وَ الۡبَغۡیَ بِغَیۡرِ الۡحَقِّ وَ اَنۡ تُشۡرِكُوۡا بِاللّٰهِ مَا لَمۡ یُنَزِّلۡ بِهٖ سُلۡطٰنًا وَّ اَنۡ تَقُوۡلُوۡا عَلَی اللّٰهِ مَا لَا تَعۡلَمُوۡنَ ﴿۳۳﴾

৩৩. বলুন, নিশ্চয় আমার রব হারাম করেছেন প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতা। আর পাপ ও অন্যায়ভাবে সীমালংঘন এবং কোন কিছুকে আল্লাহর শরীক করা- যার কোন সনদ তিনি নাযিল করেননি। আর আল্লাহ্ সম্বন্ধে এমন কিছু বলা যা তোমরা জান না।

আসল শব্দ হচ্ছেفَوَاحِشَ এ শব্দটি এমন সব কাজের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় যেগুলো সুস্পষ্ট খারাপ কাজ হিসেবে পরিচিত। কুরআনে ব্যভিচার, সমকাম (পুরুষ কামিতা), উলংগতা, মিথ্যা দোষারোপ এবং পিতার বিবাহিত স্ত্রীকে বিয়ে করাকে ফাহেশ কাজের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। হাদীসে চুরি ও মদপানের সাথে সাথে ভিক্ষাবৃত্তিকেও ফাহেশ ও অশ্লীল কাজের মধ্যে গণ্য করা হয়েছে। অনুরূপভাবে অন্যান্য সমস্ত নির্লজ্জতার কাজও ফাহেশের অন্তর্ভুক্ত। এক্ষেত্রে আল্লাহর ঘোষণা হচ্ছে এ ধরনের কাজ প্রকাশ্যে বা গোপনে কোনভাবেই করা যাবে না।

—প্রকাশ্য অশ্লীলতা বলতে কেউ কেউ বেশ্যালয় গিয়ে ব্যভিচার এবং গোপন অশ্লীলতা বলতে কোন ‘গার্ল্ ফ্রেন্ড’ বা অবৈধ প্রেমিকার সাথে বিশেষ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত করাকে বুঝিয়েছেন। আবার কেউ বলেছেন, প্রকাশ্য অশ্লীলতা হল, যাদের সাথে বিবাহ হারাম, তাদেরকে বিবাহ করা। সঠিক কথা হল, এটা কোন একটি জিনিসের সাথে নির্দিষ্ট নয়, বরং এটা ব্যাপক, যাতে সকল প্রকার প্রকাশ্য নির্লজ্জতা শামিল। (যেমন, ভিডিও, ভিসিআর, ভিসিপি, সিডি প্লেয়ার বা টিভির মাধ্যমে সিনেমা, নাটক, অশ্লীল ফিল্ম, অশ্লীল পত্র-পত্রিকা, নাচ-গানের আসর, মহিলাদের পর্দাহীনতা, পুরুষদের সাথে তাদের অবাধ মেলা-মেশা এবং বিবাহ-শাদীর দেশাচার ও লৌকিকতায় নির্লজ্জতার ব্যাপক প্রদর্শন ইত্যাদি সবই প্রকাশ্য অশ্লীলতার আওতাভুক্ত। أَعَاذَنَا اللهُ مِنْهَا।

— পাপ হল আল্লাহর অবাধ্যতার নাম। একটি হাদীসে নবী করীম (সাঃ) বলেছেন, ‘‘পাপ হল সেই জিনিস, যা তোমার অন্তরে খটকা ও উদ্বেগ সৃষ্টি করে এবং মানুষ জেনে নিক -এ কথা তুমি অপছন্দ কর। (মুসলিম, বির্র অধ্যায়) কেউ কেউ বলেছেন, পাপ হল এমন জিনিস, যার প্রতিক্রিয়া পাপী পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকে। আর বিদ্রোহ তথা অন্যায় হল এমন জিনিস, যার প্রতিক্রিয়া অপর পর্যন্তও পৌঁছে থাকে। এখানে بغي শব্দের সাথে بغير الحق লাগানোর অর্থ হল, অসংগত ও অযথা যুলুম ও অত্যাচার করা। যেমন, মানুষের অধিকার হরণ করা, কারো সম্পদ আত্মসাৎ করে নেওয়া, অন্যায়ভাবে মার-ধর করা এবং গালাগালি করে বেইজ্জত করা ইত্যাদি।

না জেনে আল্লাহ ও তাঁর দ্বীন সম্পর্কে কথা বলা বড় গোনাহ। এ আয়াতে এবং পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে আল্লাহ ও তাঁর দ্বীন সম্পর্কে না জেনে কথা বলাকে বড় অপরাধ হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে। যেমন,

ইয়াহুদীরা বলে, আগুন কখনই আমাদেরকে গণা-গুণতি কয়েক দিনের বেশি স্পর্শ করবে না। আপনি তাদেরকে বলে দিন, তোমরা কি আল্লাহর পক্ষ হতে কোনও প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেছ, ফলে আল্লাহ তাঁর সে প্রতিশ্রুতির বিপরীত কাজ করবেন না, না কি তোমরা আল্লাহর প্রতি এমন কথা আরোপ করছ, যে সম্পর্কে তোমাদের কোনও খবর নেই? সূরা আল-বাকারাহ: ৮০,

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ইয়াহুদীরা বলতোঃ পৃথিবীর মোট সময়কাল হচ্ছে সাত হাজার বছর। প্রতি হাজার বছরের পরিবর্তে আমাদের একদিন শাস্তি হবে। তা হলে আমাদেরকে মাত্র সাত দিন জাহান্নামে থাকতে হবে। তাদের এ কথাকে খণ্ডন করতে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়।

কারও কারও মতে তারা চল্লিশ দিন দোযখে থাকবে বলে ধারণা করতো। কেননা, তাদের পূর্বপুরুষরা চল্লিশ দিন পর্যন্ত বাছুরের পূজা করেছিল। কারও কারও মতে তাদের এই ধারণা হওয়ার কারণ ছিল এই যে, তাওরাতে আছেঃ দোযখের দুই ধারের ‘ যাম’ নামক বৃক্ষ পর্যন্ত চল্লিশ দিনের পথ’-তাই তারা বলতো যে, এ সময়ের পরে শাস্তি উঠে যাবে।একটি বর্ণনায় আছে যে, তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে বলেঃ চল্লিশ দিন পর্যন্ত আমরা দোযখে অবস্থান করবো, অতঃপর অন্যেরা আমাদের জায়গায় এসে যাবে। অর্থাৎ আপনার উম্মত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাদের মাথায় হাত রেখে বলেনঃ না, বরং তোমরা চিরকাল দোযখে অবস্থান করবে। সেই সময় এই আয়াত অবতীর্ণ হয়।

হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন যে, খাইবার বিজয়ের পর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে বিষ মিশ্রিত হাগলের গোশত ‘হাদিয়া স্বরূপ আসে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ তোমাদের বাপ কে?’ তারা বলেঃ অমুক।’ তিনি বলেনঃ তোমরা মিথ্যা বলছো, তোমাদের বাপ অমুক।’ অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেনঃ আমি তোমাদেরকে কতকগুলো প্রশ্ন করবো, তোমরা ঠিক ঠিক উত্তর দেবে তো?’ তারা বলেঃ ‘হ, হে আবুল কাসিম (সঃ)! আমরা যদি মিথ্যে বলি তবে আপনি জেনে ফেলবেন যেমন আমাদের বাপের ব্যাপারে জেনে ফেলেছেন। তখন তিনি বলেনঃ আচ্ছা বল তো দোযখী কারা? তারা বলেঃ কিছু দিন তো আমরা দোযখে অবস্থান করবো, অতঃপর আপনার উম্মত আমাদের স্থলে অবস্থান করবে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘আল্লাহকে ভয় কর, আল্লাহর শপথ! তখনও আমরা তোমাদের স্থলাভিষিক্ত হবো না।অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেনঃ আচ্ছা, আমি তোমাদেরকে একটা কথা জিজ্ঞেস করবো, তোমরা সত্য বলবে তো?’ তারা বলেঃ ‘হ, হে। আবুল কাসিম (সঃ)! তিনি বলেনঃ তোমরা কি এতে (গোশতে) বিষ মিশিয়েছো?’ তারা বলেঃ হাঁ।’ রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ কেন?’ তারা বলেঃ ‘এই জন্যে যে, যদি আপনি সত্যবাদী হন তবে এ বিষ আপনার কোন ক্ষতি করবে না, আর যদি মিথ্যেবাদী হন, তবে আমরা আপনা হতে শান্তি লাভ করবো। (মুসনাদ-ই-আহমাদ, সহীহ বুখারী, সুনান-ই- নাসাঈ)।   আরো রেফারেন্সঃ সূরা আল আরাফ: ২৮, ৩৩, সূরা ইউনুস: ৬৮]

আল্লাহর উপর না জেনে কথা বলা আসলেই বড় গোনাহর কাজ। আল্লাহ্ সম্পর্কে, গায়েব সম্পর্কে, আখেরাত সম্পর্কে, আল্লাহর দ্বীন সম্পর্কে যাবতীয় কথা যতক্ষন পর্যন্ত কুরআন ও সহীহ হাদীস ভিত্তিক না হবে ততক্ষন তা আল্লাহর উপর না জেনে কথা বলার আওতায় পড়বে। অনুরূপভাবে যারা না জেনে-বুঝে ফাতাওয়া দেয় তারাও আল্লাহর উপর না জেনে কথা বলেন। আর এজন্যই বলা হয়ঃ ফাতাওয়া দানে যে যতবেশী তৎপর জাহান্নামে যাওয়ার জন্যও সে ততবেশী তৎপর।

যে বিষয়ে তোমার নিশ্চিত জ্ঞান নেই (তাকে সত্য মনে করে) তার পিছনে পড়ো না। জেনে রেখ, কান, চোখ ও অন্তর এর প্রতিটি সম্পর্কে (তোমাদেরকে) জিজ্ঞেস করা হবে। বনী ইসরাইলঃ ৩৬

৭ : ৩৪ وَ لِكُلِّ اُمَّۃٍ اَجَلٌ ۚ فَاِذَا جَآءَ اَجَلُهُمۡ لَا یَسۡتَاۡخِرُوۡنَ سَاعَۃً وَّ لَا یَسۡتَقۡدِمُوۡنَ

৩৪. আর প্রত্যেক জাতির জন্য এক নির্দিষ্ট সময় আছে। অতঃপর যখন তাদের সময় আসবে তখন তারা মুহুর্তকাল দেরি করতে পারবে না এবং এগিয়েও আনতে পারবে না।

নির্দিষ্ট সময় বা মেয়াদ’ বলতে আমল করার সেই অবসর ও সুযোগ, যা মহান আল্লাহ পরীক্ষা করার জন্য প্রত্যেককে দান করেন। তিনি দেখতে চান যে, সে এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার প্রতি যত্ন নেয়, না তার অবাধ্যতা ও ধৃষ্টতা আরো বেড়ে যায়। এই অবসর কখনো কখনো তার পুরো জীবন পর্যন্ত প্রসারিত থাকে। অর্থাৎ, পার্থিব জীবনে আল্লাহ তাকে পাকড়াও করেন না। বরং কেবল আখেরাতেই তিনি শাস্তি দেবেন। তার নির্দিষ্ট মেয়াদ হল কিয়ামতেরই দিন। আর যাকে দুনিয়াতে তিনি শাস্তি দেন, তার নির্দিষ্ট মেয়াদ তখনই হয়, যখন তাকে পাকড়াও করেন।

 কোন জাতি তার নির্দিষ্ট কালকে ত্বরান্বিত করতে পারে না, বিলম্বিতও করতে পারে না।  আল-হিজরঃ ৫

 তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন এবং তোমাদেরকে অবকাশ দেবেন। এক নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত। নিশ্চয় আল্লাহ কর্তৃক নির্দিষ্ট সময় উপস্থিত হলে তা বিলম্বিত করা হয় না; যদি তোমরা এটা জানতে! সূরা নূহঃ ৪

যখন কারও নির্ধারিত কাল এসে যাবে তখন আল্লাহ তাকে কিছুতেই অবকাশ দিবেন না। আর তোমরা যা-কিছু কর, আল্লাহ সে সম্পর্কে পরিপূর্ণ অবহিত।আল-মুনাফিকূনঃ ১১

আল্লাহ তা’আলা স্বীয় মুমিন বান্দাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন খুব বেশী বেশী করে আল্লাহর যিক্‌র করে এবং তাদেরকে সতর্ক করছেন যে, তারা যেন ধন-দৌলত ও সন্তান-সন্ততির প্রেমে পড়ে আল্লাহকে ভুলে না যায়। এরপর বলেনঃ যারা আল্লাহর স্মরণে উদাসীন হবে তারা হবে ক্ষতিগ্রস্ত।অতঃপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা’আলা তাঁর আনুগত্যের কাজে মাল খরচ করার নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন মৃত্যুর পূর্বেই তাদেরকে প্রদত্ত মাল হতে খরচ করে। মৃত্যুর সময়ের নিরুপায় অবস্থা দেখে মাল খরচ করতঃ শান্তি লাভের আশা করা বৃথা হবে। ঐ সময় তারা চাইবে যে, যদি অল্প সময়ের জন্যেও ছেড়ে দেয়া হতো তবে যা কিছু ভাল কাজ আছে সবই তারা করতো এবং মন খুলে আল্লাহর পথে দান-খয়রাত করতো। কিন্তু তখন সময় কোথায়? যে বিপদ আসার তা এসেই গেছে। এটা কখনো টলবার নয়। বিপদ মাথার উপর এসেই পড়েছে। অন্য জায়গায় রয়েছেঃ

(আরবি)অর্থাৎ যেদিন তাদের শাস্তি আসবে সেই দিন সম্পর্কে তুমি মানুষকে সতর্ক কর, তখন যালিমরা বলবেঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে কিছু কালের জন্যে অবকাশ দিন, আমরা আপনার আহ্বানে সাড়া দিবো এবং রাসূলদেরকে অনুসরণ করবো! তোমরা কি পূর্বে শপথ করে বলতে না যে, তোমাদের পতন নেই? সূরা ইবরাহীমঃ৪৪ (১৪:৪৪) আল্লাহ তা’আলা আর এক জায়গায় বলেনঃ

 শেষ পর্যন্ত তাদের কারো যখন মৃত্যু এসে যাবে তখন বলবে- হে আমার প্রতিপালক! আমাকে ফিরিয়ে দিন, যেন আমি ভাল কাজ করতে পারি যা আমি ছেড়ে দিয়েছিলাম, কখনো নয়।” (২৩:৯৯-১০০)

এখানে মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ নির্ধারিত সময়কাল যখন উপস্থিত হয়ে যাবে, আল্লাহ কখনো কাউকেও অবকাশ দিবেন না। তোমরা যা কর আল্লাহ সে সম্পর্কে সবিশেষ অবহিত। এ লোকগুলোকে যদি ফিরিয়ে দেয়া হয় তবে এসব কথা তারা ভুলে যাবে এবং পূর্বে যে কাজ করতো পুনরায় ঐ কাজই করতে থাকবে।

 হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ ঐ মালদার ব্যক্তি যে হজ্ব করেনি ও যাকাত দেয়নি সে মৃত্যুর সময় দুনিয়ায় ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা করবে। একটি লোক তখন বললোঃ জনাব! আল্লাহকে ভয় করুন। দুনিয়ায় ফিরে আসার আকাক্ষা তো করবে কাফির।” তখন তিনি বললেনঃ তাড়াতাড়ি করছো কেন? আমি তোমাকে কুরআন থেকে এটা পাঠ করে শুনাচ্ছি।” অতঃপর তিনি (আরবি) হতে পূর্ণ রুকূটি পাঠ করে শুনালেন। লোকটি জিজ্ঞেস করলোঃ কি পরিমাণ সম্পদে যাকাত ওয়াজিব হয়?” জবাবে তিনি বলেনঃ দুই শত এবং এর চেয়ে বেশী হলে।” সে প্রশ্ন করলোঃ হজ্ব কখন ফরয হয়?” তিনি উত্তর দিলেনঃ যখন পথ খরচ ও সওয়ারীর শক্তি থাকে। একটি মারফূ’ রিওয়াইয়াতেও অনুরূপ বর্ণিত আছে। কিন্তু এর মাওকুফটাই সঠিকতর। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত হযরত যহ্‌হাক (রঃ)-এর রিওয়াইয়াতে ইনকিতা’ রয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে হযরত আবূ দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। যে, একদা সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে বেশী বয়সের আলোচনা করেন। তখন তিনি বলেনঃ নির্ধারিত কাল যখন উপস্থিত হবে, আল্লাহ কখনো অবকাশ দিবেন না। বয়সের আধিক্য এই ভাবে হয় যে, আল্লাহ তা’আলা কোন বান্দাকে সুসন্তান দান করেন এবং ঐ সন্তানরা তাদের পিতার মৃত্যুর পর তার জন্যে দু’আ করতে থাকে। ঐ দু’আ তার কবরে পৌঁছে থাকে।”

৭ : ৩৫ یٰبَنِیۡۤ اٰدَمَ اِمَّا یَاۡتِیَنَّكُمۡ رُسُلٌ مِّنۡكُمۡ یَقُصُّوۡنَ عَلَیۡكُمۡ اٰیٰتِیۡ ۙ فَمَنِ اتَّقٰی وَ اَصۡلَحَ فَلَا خَوۡفٌ عَلَیۡهِمۡ وَ لَا هُمۡ یَحۡزَنُوۡنَ ﴿۳۵﴾

৩৫. হে বনী আদম! যদি তোমাদের নিকট তোমাদের মধ্য থেকে রাসূলগণ আসেন, যারা আমার আয়াতসমূহ তোমাদের কাছে বিবৃত করবেন, তখন যারা তাকওয়া অবলম্বন করবে এবং নিজেদের সংশোধন করবে, তাদের কোন ভয় থাকবে না এবং তারা চিন্তিতও হবে না

এ আয়াতে সেই ঈমানদারদের সুন্দর পরিণামের কথা বর্ণনা করা হয়েছে, যাঁরা আল্লাহভীরুতা এবং নেক আমলের সাজে সজ্জিত হন। কুরআন ঈমানের সাথে সাথে অধিকাংশ স্থানে নেক আমলের কথা অবশ্যই উল্লেখ করেছে। যা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহর নিকট সেই ঈমানই গ্রহণযোগ্য যার সাথে নেক আমলও থাকে।

ঈমানী সিফাত বা যেসব গুণাবলির সম্পর্ক ঈমানের সাথে এবং ঈমানের কারণে যেসব গুণাবলি মানুষের মধ্যে পয়দা হয়- ঈমান যত মজবুত হয় ওই গুণগুলো তত বৃদ্ধি পেতে থাকে। গুণগুলো যত বাড়তে থাকে, ঈমানও তত মজবুত হতে থাকে। ঈমানী সিফাতগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিফাত তাকওয়া। তাকওয়াকে বলা হয় ‘মিলাকুল হাসানাত’- তথা সমস্ত নেকীর মূল। এটা কেবল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণই নয়, বরং সবচেয়ে বড় সিফাত। কুরআন কারীমের বহু আয়াতে তাকওয়ার নির্দেশ করা হয়েছে, আবার অনেক আয়াতে তাকওয়ার ফায়দাগুলোর বিবরণও দেওয়া হয়েছে

এটা এমন বিষয়, যার দ্বারা তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও আখেরাত দিবসের প্রতি ঈমান রাখে, তাদেরকে উপদেশ দেওয়া হচ্ছে। যে কেউ আল্লাহকে ভয় করবে, আল্লাহ তার জন্য সংকট থেকে উত্তরণের কোনো পথ তৈরি করে দেবেন এবং তাকে এমন স্থান থেকে রিযিক দান করবেন, যা তার ধারণার বাইরে। যে কেউ আল্লাহর ওপর নির্ভর করে, আল্লাহ্ই তার (কর্ম সম্পাদনের) জন্য যথেষ্ট। নিশ্চয়ই আল্লাহ তার কাজ পূরণ করেই থাকেন। (অবশ্য) আল্লাহ সবকিছুর জন্য একটা পরিমাণ নির্দিষ্ট করে রেখেছেন। -সূরা ত্বলাক (৬৫)

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اِنۡ تَتَّقُوا اللّٰہَ یَجۡعَلۡ لَّکُمۡ فُرۡقَانًا وَّیُکَفِّرۡ عَنۡکُمۡ سَیِّاٰتِکُمۡ وَیَغۡفِرۡ لَکُمۡ ؕ وَاللّٰہُ ذُو الۡفَضۡلِ الۡعَظِیۡمِ

হে মুমিনগণ! তোমরা যদি আল্লাহর সঙ্গে তাকওয়ার নীতি অবলম্বন কর, তবে তিনি তোমাদেরকে (সত্য ও মিথ্যার মধ্যে) পার্থক্য করার শক্তি দেবেন, তোমাদের পাপ মোচন করবেন এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন। আল্লাহ মহা অনুগ্রহের মালিক। আনফালঃ ২৯

এটা তাকওয়ার এক বৈশিষ্ট্য যে, তা মানুষকে পরিষ্কার বুঝ-সমঝ ও চিন্তার স্বচ্ছতা দান করে। ফলে সে সত্য-মিথ্যা ও ন্যায়-অন্যায়ের মধ্যে পার্থক্য করতে সক্ষম হয়। অপর দিকে গুনাহ ও পাপাচারের বৈশিষ্ট্য হল, তা মানুষের বিবেক-বুদ্ধি নষ্ট করে দেয়। ফলে সে ভালোকে মন্দ ও মন্দকে ভালো মনে করতে শুরু করে।

মানুষের দোষত্রুটি নিয়ে সমালোচনা করা এবং অন্যকে সংশোধন করার পূর্বে নিজের দোষত্রুটি সংশোধন করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নিজেরা ভ্রান্তির মধ্যে ডুবে থেকে অন্যকে সংশোধনের বলা ঈমানের পরিচয় নয়।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন, اَتَاۡمُرُوۡنَ النَّاسَ بِالۡبِرِّ وَ تَنۡسَوۡنَ اَنۡفُسَکُمۡ وَ اَنۡتُمۡ تَتۡلُوۡنَ الۡکِتٰبَ ؕ اَفَلَا تَعۡقِلُوۡنَ

‘তোমরা কি মানুষকে সৎকর্মের নির্দেশ দাও এবং নিজেরা নিজেদেরকে ভুলে যাও, অথচ তোমরা কিতাব পাঠ কর? তবুও কি তোমরা চিন্তা কর না’? (সূরা আল-বাক্বারাহ : ৪৪)।

অন্য আয়াতে বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের চিন্তা কর। তোমরা যখন সৎপথে রয়েছ, তখন কেউ পথভ্রান্ত হলে তাতে তোমাদের কোন ক্ষতি নেই’ (সূরা মায়িদাহ : ১০৫)।

قَدْ أَفْلَحَ مَنْ زَكَّاهَا- وَقَدْ خَابَ مَنْ دَسَّاهَا- (الشمس 9-10)

‘সফল হয় সেই ব্যক্তি যে তার আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে’। ‘এবং ব্যর্থ হয় সেই ব্যক্তি যে তার আত্মাকে কলুষিত করে’ (শাম্স ৯১/৯-১০)।

সাধারণত কেউ যদি আত্মসমালোচনা করে অর্থাৎ নির্জনে-একান্ত একাকীত্বে নিজের দায়িত্ব-কর্তব্য, করণীয়-বর্জনীয়, সফলতা-ব্যর্থতা এবং দোষত্রুটি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা ও হিসাব-নিকাশ করে তাহলে তার কাছে তার নিজের ত্রুটি-বিচ্যুতি ধরা পড়বে। আল্লাহ তা‘আলা প্রতিটি মানুষকে বিবেক নামক এটি আয়না দিয়েছেন। মানুষ যদি সে আয়নার সামনে নিজেকে দাঁড় করায় তাহলে তার মধ্যে কোথায় কী সমস্যা আছে তা সে পরিষ্কার দেখতে পায়।

 আল্লাহ বলেন, بَلِ الۡاِنۡسَانُ  عَلٰی نَفۡسِہٖ بَصِیۡرَۃٌ ‘বরং মানুষ নিজেই নিজের ব্যাপারে খুব ভাল জানে’ (সূরা আল-ক্বিয়ামাহ : ১৪)। যেমন ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলতেন,

حَاسِبُوْا أَنْفُسَكُمْ قَبْلَ أَنْ تُحَاسَبُوْا وَزِنُوْا أَنْفُسَكُمْ قَبْلَ أَنْ تُوْزَنُوْا فَإِنَّهُ أَهْوَنُ عَلَيْكُمْ فِي الْحِسَابِ غَدًا أَنْ تُحَاسِبُوْا أَنْفُسَكُمُ الْيَوْمَ وَتَزَيَّنُوا لِلْعَرْضِ الْأَكْبَرِ يَوْمَئِذٍ تُعْرَضُوْنَ لَا تَخْفَى مِنْكُمْ خَافِيَةٌ

‘তোমরা নিজরা নিজেদের হিসাব নাও (পরকালে) হিসাবের সম্মুখীন হওয়ার পূর্বে এবং তোমরা নিজেরা নিজেদের মেপে নাও (পরকালে) তোমাদেরকে মাপার পূর্বে। কেননা আজকের তোমার এই নিজে নিজে হিসাব-নিকাশ করাটা আগামী কালকে হিসাব দেয়ার চেয়ে অনেক সহজ। আর তোমরা বড় পরীক্ষা দেয়ার সম্মুখীন হওয়ার জন্য প্রস্তুত হও।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,  یَوۡمَئِذٍ تُعۡرَضُوۡنَ  لَا تَخۡفٰی مِنۡکُمۡ خَافِیَۃٌ ‘সেদিন তোমাদেরকে (আল্লাহর সামনে হিসাব-নিকাশ ও প্রতিদান প্রদানের জন্য) পেশ করা হবে, তখন তোমাদের কোনকিছুই গোপন থাকবে না’ (সূরা আল-হাক্কাহ : ১৮; ইবনু আবিদ দুনিয়া, মুহাসাবাতুন নাফস, পৃ. ২৯, হা/২; আয-যুহুদ লিল ইমাম আহমাদ, পৃ. ১২০; হিলইয়াতুল আওলিয়া, ১ম খণ্ড, পৃ. ৫২; ‍মুসান্নাফে ইবনু আবী শায়বাহ, ১৩ তম খণ্ড, পৃ. ২৭০; মুওআত্তা ইমাম মালিক, ২য় খণ্ড, পৃ. ১১১)।

আরবিতে একটা প্রবাদ আছে, أبصر الناس من نظر إلى عيوبه ‘সবচেয়ে দূরদৃষ্টি সম্পন্ন বা বিচক্ষণ মানুষ হল ঐ ব্যক্তি যে নিজের দোষ-ত্রুটি দেখে। অতএব এটাই নিজেকে সংশোধনের সবচেয়ে বড় উপায়।

আত্মশুদ্ধির উপায় সমূহ :

(১) সর্বাবস্থায় আল্লাহকে ভয় করা

(২) সকল ক্ষেত্রে অহি-র বিধান জানা ও মেনে চলা

(৩) মন্দ কাজের শাস্তি সম্পর্কে জানা ও তা সর্বদা স্মরণ করা

৪. ছগীরা গোনাহ সমূহ পরিত্যাগ করা : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, يَا عَائِشَةُ إِيَّاكِ وَمُحَقِّرَاتِ الذُّنُوبِ فَإِنَّ لَهَا مِنَ اللهِ طَالِباً হে আয়েশা! তুচ্ছ গোনাহ থেকেও বেঁচে থাকো। কেননা উক্ত পাপগুলির খোঁজ রাখার জন্য আল্লাহর পক্ষ হতে অনুসন্ধানকারী (ফেরেশতা) নিযুক্ত রয়েছে।ইবনু মাজাহ হা/৪২৪৩; মিশকাত হা/৫৩৫৬

৫. সর্বদা কবর ও জাহান্নামের কথা স্মরণ করা :

৬।  সর্বদা আখেরাতকে স্মরণ করা

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সাথে ছিলাম। এমন সময় আনছারদের জনৈক ব্যক্তি এসে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল! কোন মুমিন সর্বোত্তম? তিনি বললেন, أَحْسَنُهُمْ خُلُقًا সর্বাধিক চরিত্রবান ব্যক্তি। অতঃপর জিজ্ঞেস করল, কোন ব্যক্তি সবচেয়ে বিচক্ষণ? তিনি বললেন,أَكْثَرُهُمْ لِلْمَوْتِ ذِكْرًا وَأَحْسَنُهُمْ لِمَا بَعْدَهُ اسْتِعْدَادًا أُولَئِكَ الأَكْيَاسُ ‘মৃত্যুকে সর্বাধিক স্মরণকারী এবং মৃত্যু পরবর্তী জীবনের জন্য সুন্দরতম প্রস্ত্ততি গ্রহণকারী। মূলতঃ তারাই হ’ল বিচক্ষণ ব্যক্তি’। ইবনু মাজাহ হা/৪২৫৯; ছহীহাহ হা/১৩৮৪।

৭। অন্তরের পবিত্রতার জন্য দোয়া করাঃ

অন্তরের পবিত্রতা ও পরিশুদ্ধির জন্য এবং আল্লাহর বিধান পালনে তার দৃঢ়তার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করা আবশ্যক। রাসুলুল্লাহ (সা.) দোয়া করতেন, ‘হে অন্তর পরিবর্তনকারী! আমার অন্তরকে আপনার আনুগত্যে দৃঢ় করে দেন।’ (মুসনাদে আহমদঃ ৯৪২০)

৮। অন্তরের ব্যাধির ব্যাপারে উদাসীন না হওয়াঃ

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই মানুষের অন্তর আল্লাহর দুই আঙুলের মধ্যে অবস্থিত, তিনি তা যেমন ইচ্ছা পরিবর্তন করেন।’ (সহিহ মুসলিমঃ ৬৯২১)

৯। অসহায় মানুষের পাশে থাকাঃ

হাদিস শরিফে এসেছে, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে তার অন্তরের কঠোরতা সম্পর্কে অভিযোগ করল। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে বললেন, ‘যখন তুমি তোমার অন্তরকে নরম করার ইচ্ছা করবে তখন এতিমের মাথায় হাত বোলাবে এবং মিসকিনকে খানা খাওয়াবে।’ (মুসনাদ আহমদঃ ৯০১৮)

১০। কলুষিত আত্মার পরিণতি স্মরণ রাখাঃ

রাসুলুল্লাহ (সা.) কলুষিত আত্মার পরিণতির ব্যাপারে সতর্ক করে বলেছেন, ‘সাবধান! নিশ্চয়ই মানবদেহে একখণ্ড গোশতের টুকরো আছে, যখন তা সুস্থ হয়ে যায় গোটা শরীরটাই সুস্থ হয়ে যায় এবং যখন তা অসুস্থ হয়ে যায় গোটা শরীরই অসুস্থ হয়ে যায়। জেনে রেখো! এটাই হচ্ছে কলব।’ (সহিহ মুসলিমঃ ৪১৭৮)

উপরোক্ত উপায় সমূহ অবলম্বন করলে মুমিনগণ তাদের অন্তরজগতকে কলুষমুক্ত রাখতে পারবেন বলে আশা করা যায়।

৭ : ৩৬ وَ الَّذِیۡنَ كَذَّبُوۡا بِاٰیٰتِنَا وَ اسۡتَكۡبَرُوۡا عَنۡهَاۤ اُولٰٓئِكَ اَصۡحٰبُ النَّارِ ۚ هُمۡ فِیۡهَا خٰلِدُوۡنَ ﴿۳۶﴾

(৩৬) আর যারা আমার নিদর্শনসমূহকে মিথ্যা মনে করেছে এবং অহংকারে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, তারাই দোযখবাসী; সেখানে তারা চিরকাল থাকবে।

এতে ঈমানদারদের বিপরীত সেই লোকদের মন্দ পরিণামের কথা বর্ণনা করা হয়েছে, যারা আল্লাহর বিধানসমূহকে মিথ্যাজ্ঞান করে এবং তার সামনে অহংকার প্রদর্শন করে। ঈমানদার ও কাফের উভয়ের পরিণাম বর্ণনা করার উদ্দেশ্য হল, যাতে মানুষ এমন আচরণকে অবলম্বন করে, যার পরিণাম সুন্দর এবং এমন আচরণ থেকে বেঁচে থাকে, যার পরিণাম মন্দ।

আর যে আমার উপদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবন হবে বড় সংকটময়। আর কিয়ামতের দিন আমি তাকে অন্ধ করে উঠাব। সে বলবে, হে রব্ব! তুমি আমাকে অন্ধ করে উঠালে কেন? আমি তো চক্ষুষ্মান ছিলাম! আল্লাহ বলবেন, এভাবেই তোমার কাছে আমার আয়াতসমূহ এসেছিল, কিন্তু তুমি তা ভুলে গিয়েছিলে। আজ সেভাবেই তোমাকে ভুলে যাওয়া হবে।যে ব্যক্তি সীমালঙ্ঘন করে ও নিজ প্রতিপালকের নিদর্শনাবলিতে ঈমান আনে না, তাকে আমি এভাবেই শাস্তি দেই। আর আখেরাতের আযাব বাস্তবিকই বেশি কঠিন ও অধিকতর স্থায়ী। -সূরা ত্বহা : ১২৪-১২৭

আর কেউ তার প্রতিপালকের স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে আল্লাহ তাকে ক্রমবর্ধমান শাস্তিতে গেঁথে দেবেন। -সূরা জিন : ১৭

৭ فَمَنۡ اَظۡلَمُ مِمَّنِ افۡتَرٰی عَلَی اللّٰهِ كَذِبًا اَوۡ كَذَّبَ بِاٰیٰتِهٖ ؕ اُولٰٓئِكَ یَنَالُهُمۡ نَصِیۡبُهُمۡ مِّنَ الۡكِتٰبِ ؕ حَتّٰۤی اِذَا جَآءَتۡهُمۡ رُسُلُنَا یَتَوَفَّوۡنَهُمۡ ۙ قَالُوۡۤا اَیۡنَ مَا كُنۡتُمۡ تَدۡعُوۡنَ مِنۡ دُوۡنِ اللّٰهِ ؕ قَالُوۡا ضَلُّوۡا عَنَّا وَ شَهِدُوۡا عَلٰۤی اَنۡفُسِهِمۡ اَنَّهُمۡ كَانُوۡا كٰفِرِیۡنَ ﴿۳۷﴾

(৩৭) যে ব্যক্তি আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা রচনা করে, কিংবা তাঁর নিদর্শনসমূহকে মিথ্যা মনে করে, তার অপেক্ষা বড় অত্যাচারী আর কে? তাদের ভাগ্যলিপিতে লিখিত নির্ধারিত অংশ তাদের নিকট পৌঁছবে। পরিশেষে যখন আমার প্রেরিত (ফিরিশতা)রা প্রাণ হরণের জন্য তাদের নিকট আসবে ও জিজ্ঞাসা করবে, ‘আল্লাহ ছাড়া যাদেরকে তোমরা ডাকতে তারা কোথায়?’ তারা বলবে, ‘তারা উধাও হয়েছে।’ এবং তারা স্বীকার করবে যে, তারা অবিশ্বাসী ছিল।

এর বিভিন্ন অর্থ বর্ণনা করা হয়েছে। একটি অর্থ আমল, রুযী এবং বয়স করা হয়েছে। অর্থাৎ, তাদের ভাগ্যে যে রুযী নির্ধারিত আছে তা পরিপূর্ণ করে নেওয়ার এবং যত বয়স নির্ধারিত আছে তা সম্পূর্ণ করার পর অবশেষে মৃত্যু বরণ করতেই হবে। প্রায় এই অর্থেরই আয়াত এটাও,

{إِنَّ الَّذِينَ يَفْتَرُونَ عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ لا يُفْلِحُونَ، مَتَاعٌ فِي الدُّنْيَا ثُمَّ إِلَيْنَا مَرْجِعُهُمْ} অর্থাৎ,

তুমি বলে দাও, যারা আল্লাহর উপর মিথ্যা রচনা করে, তারা সফলকাম হবে না। (ওদের জন্য) দুনিয়ায় কিছু সুখ-সম্ভোগ রয়েছে। তারপর আমারই দিকে তাদেরকে ফিরে আসতে হবে। (সূরা ইউনুসঃ ৬৯-৭০)

তাদের শাস্তির যে পরিমাণ লেখা আছে তা তাদের কাছে পৌছবেই। [তাবারী] কাতাদা বলেন, দুনিয়াতে তারা যে আমল করেছে সেটার ফলাফল আখেরাতে তাদের কাছে পৌছবেই। [আত-তাফসীরুস সহীহ]

 অর্থাৎ আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদেরকে তোমরা ডাকতে, যাদের তোমরা ইবাদত করতে এখন তারা কোথায়? তারা কি তোমাদেরকে এখন সাহায্য করতে পারে না? তারা কি তোমাদেরকে এ বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারে না? তখন তারা স্বীকার করবে যে, আল্লাহ ছাড়া যাদেরকে তারা আহবান করত, যাদের ইবাদত করত, তারা সবাই তাদের কাছ থেকে হারিয়ে গেছে। এভাবে তারা তাদের নিজেদের বিপক্ষে সাক্ষী দিল যে, তারা মুশরিক ছিল, তাওহীদবাদী ছিল না। [মুয়াসসার]

৭ : ৩৮ قَالَ ادۡخُلُوۡا فِیۡۤ اُمَمٍ قَدۡ خَلَتۡ مِنۡ قَبۡلِكُمۡ مِّنَ الۡجِنِّ وَ الۡاِنۡسِ فِی النَّارِ ؕ كُلَّمَا دَخَلَتۡ اُمَّۃٌ لَّعَنَتۡ اُخۡتَهَا ؕ حَتّٰۤی اِذَا ادَّارَكُوۡا فِیۡهَا جَمِیۡعًا ۙ قَالَتۡ اُخۡرٰىهُمۡ لِاُوۡلٰىهُمۡ رَبَّنَا هٰۤؤُلَآءِ اَضَلُّوۡنَا فَاٰتِهِمۡ عَذَابًا ضِعۡفًا مِّنَ النَّارِ ۬ؕ قَالَ لِكُلٍّ ضِعۡفٌ وَّ لٰكِنۡ لَّا تَعۡلَمُوۡنَ ﴿۳۸

৩৮. আল্লাহ্ বলবেন, তোমাদের আগে যে জিন ও মানবদল গত হয়েছে তাদের সাথে তোমরা আগুনে প্রবেশ কর। যখনই কোন দল তাতে প্রবেশ করবে তখনই অন্য দলকে তারা অভিসম্পাত করবে। অবশেষে যখন সবাই তাতে একত্র হবে তখন তাদের পরবর্তীরা পূর্ববর্তীদের সম্পর্কে বলবে, হে আমাদের রব! এরাই আমাদেরকে বিভ্রান্ত করেছিল; কাজেই এদেরকে দ্বিগুণ আগুনের শাস্তি দিন। আল্লাহ বলবেন, প্রত্যেকের জন্য দ্বিগুণ রয়েছে, কিন্তু তোমরা জান না।

أُمَمٌ হল أُمَّةٌ এর বহুবচন। উদ্দেশ্য এমন ফির্ক্বা ও দলসমূহ, যারা কুফরী, বিরোধিতা, শিরক ও মিথ্যাজ্ঞান করার ব্যাপারে একই রকম হবে। فِيْ অর্থ مَعَ ও হতে পারে। অর্থাৎ, তোমাদের পূর্বে মানুষ ও জ্বিনদের দল তোমাদের মতই এখানে এসেছে তাদের সাথে জাহান্নামে প্রবেশ করে যাও অথবা তাদের মধ্যে শামিল হয়ে যাও।

لَعَنَتْ أُخْتَهَا} তার অনুরূপ দলকে অভিশাপ করবে। أُخْتٌ বোনকে বলা হয়। একটি দল (উম্মত)-কে অপর দলের (উম্মতের) দ্বীনের দিক দিয়ে অথবা ভ্রষ্টতার দিক দিয়ে অনুরূপ হওয়ার কারণে বোন বলা হয়েছে। অর্থাৎ, উভয়েই একটি ভুল মতাদর্শের অনুসারী অথবা ভ্রষ্ট ছিল। কিংবা জাহান্নামের সাথী হওয়ার কারণে তাদেরকে একে অপরের বোন গণ্য করা হয়েছে।

ادَّارَكُوْا এর অর্থ হল, تَدَارَكُوْا যখন পরস্পর মিলিত হবে এবং পরস্পর একত্রিত হবে।

 أُخْرَى (পরবর্তী দল) বলতে যারা পরে প্রবেশ করবে। আর أُوْلَى (পূর্ববর্তী দল) বলতে তাদের আগে যারা প্রবেশ করবে। অথবা أُخْرَى বলতে أَتْبَاعٌ (অনুসারীগণ) এবং أُوْلَى বলতে مَتْبُوْعٌ অনুসৃত নেতা ও সর্দারদেরকে বুঝানো হয়েছে। এদের অপরাধ যেহেতু অনেক বেশী, কারণ তারা নিজেরা সত্য পথ থেকে তো সরে ছিলই, অপরকেও প্রচেষ্টা করে দূরে রেখেছিল, তাই এরা অনুসারীদের পূর্বেই জাহান্নামে প্রবেশ করবে। যেমন অন্য এক স্থানে বলা হয়েছে,

জাহান্নামীরা বলবে, {رَبَّنَا إِنَّا أَطَعْنَا سَادَتَنَا وَكُبَرَاءَنَا فَأَضَلُّونَا السَّبِيلا، رَبَّنَا آتِهِمْ ضِعْفَيْنِ مِنَ الْعَذَابِ وَالْعَنْهُمْ لَعْنًا كَبِيرًا} অর্থাৎ, হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আমাদের নেতা ও বড়দের কথা মেনেছিলাম, অতঃপর তারা আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল। হে আমাদের পালনকর্তা! তাদেরকে তুমি দ্বিগুণ শাস্তি দাও এবং মহা অভিসম্পাত কর।’’ (সূরা আহযাবঃ ৬৭-৬৮)

 অর্থাৎ, এখন আর একে অপরকে দোষারোপ করে এবং একে অপরের উপর অপবাদ দিয়ে কোন লাভ হবে না। তোমরা সকলেই বড় অপরাধী এবং তোমরা সকলেই দ্বিগুণ শাস্তি পাওয়ার যোগ্য।

অনুসারী ও অনুসৃতদের পারস্পরিক এ কথোপকথন সূরা সাবার ৩১-৩২নং আয়াতেও বর্ণিত হয়েছে।

আমরা এ কুরআনের ওপর কখনো ঈমান আনবনা এবং এর আগে যা আছে তাতেও না। আর হায়! আপনি যদি দেখতেন যালিমদেরকে, যখন তাদের রবের সামনে দাঁড় করানো হবে, তখন তারা পরস্পর বাদ-প্রতিবাদ করতে থাকবে, যাদেরকে দুর্বল মনে করা হত, তারা অহংকারীদেরকে বলবে, তোমরা না থাকলে আমরা অবশ্যই মুমিন হতাম।

. যারা অহংকারী ছিল তারা, যাদেরকে দুর্বল করে রাখা হয়েছিল তাদেরকে বলবে, তোমাদের কাছে সৎপথের দিশা আসার পর আমরা কি তোমাদেরকে তা থেকে নিবৃত্ত করেছিলাম? বরং তোমরাই ছিলে অপরাধী। সাবাঃ৩১-৩২

এবং সমস্ত মানুষ আল্লাহর সামনে উপস্থিত হবে। যারা (দুনিয়ায়) দুর্বল ছিল, তারা বড়ত্ব প্রদর্শনকারীদেরকে বলবে, আমরা তো তোমাদেরই অনুগামী ছিলাম। এখন কি তোমরা আমাদেরকে আল্লাহর আযাব থেকে একটু বাঁচাবে? তারা বলবে, আল্লাহ যদি আমাদেরকে হিদায়াত দান করে থাকতেন, তবে আমরাও তোমাদেরকে হিদায়াত দিতাম। এখন আমরা চিৎকার করি বা সবর করি উভয় অবস্থাই আমাদের জন্য সমান। আমাদের নিষ্কৃতি লাভের কোন উপায় নেই। সূরা ইবরাহীমঃ ২১

“আর যখন তারা জাহান্নামে পরস্পর বিতর্কে লিপ্ত হবে তখন দুর্বলেরা যারা অহংকার করেছিল তাদেরকে বলবে, আমরা তো তোমাদের অনুসরণ করেছিলাম সুতরাং তোমরা কি আমাদের থেকে জাহান্নামের আগুনের কিছু অংশ গ্রহণ করবে? অহংকারীরা বলবে, নিশ্চয় আমরা সকলেই এতে রয়েছি, নিশ্চয় আল্লাহ বান্দাদের বিচার করে ফেলেছেন [সূরা গাফিরঃ ৪৭–৪৮]

সর্বাবস্থায় তোমাদের প্রত্যেকটি দল কোন না কোন দলের পূর্ববর্তী বা পরবর্তী দল ছিল। কোন দলের পূর্ববর্তী দল উত্তরাধিকার হিসেবে যদি তার জন্য ভুল ও বিপথগামী চিন্তা ও কর্ম রেখে গিয়ে থাকে, তাহলে সে নিজেও তো তার পরবর্তীদের জন্য একই ধরনের উত্তরাধীকার রেখে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে। যদি একটি দলের পথভ্রষ্ট হবার কিছুটা দায়-দায়িত্ব তার পূর্ববর্তীদের ওপর বর্তায়, তাহলে তার পরবর্তীদের পথভ্রষ্ট হবার বেশ কিছু দায়-দায়িত্ব তার নিজের ওপরও বর্তায়। তাই বলা হয়েছে প্রত্যেকের জন্য দ্বিগুণ শাস্তিই রয়েছে। একটি শাস্তি হচ্ছে, নিজের ভুল পথ অবলম্বনের এবং অন্য শাস্তিটি অন্যদেরকে ভুল পথ দেখাবার। একটি শাস্তি নিজের অপরাধের এবং অন্য শাস্তিটি অন্যদের জন্য পূর্বাহ্নের অপরাধের উত্তরাধিকার রেখে আসার।

এ বিষয়বস্তুটিকে হাদীসে নিম্নোক্তভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছেঃ

وَمَنِ ابْتَدَعَ بِدْعَةَ ضَلاَلَةٍ لاَ يَرْضَاهَا اللَّهُ وَرَسُولُهُ كَانَعَلَيْهِ مِنَ الاثمِ مِثْلُ آثَامِ مَنْ عَمِلَ بِهَا لاَ يَنْقُصُ ذَلِكَ مِنْ أَوْزَارِهِم شَيْئًا-

“যে ব্যক্তি আল্লাহ‌ ও তাঁর রসূল অপছন্দ করেন এমন কোন নতুন বিভ্রান্তিকর কাজের সূচনা করে, তার ঘাড়ে সেই সমস্ত লোকের পথভ্রষ্টতার গোনাহও চেপে বসবে, যারা তার উদ্ভাবিত পথে চলেছে। তবে এ জন্য ঐ লোকেদের নিজেদের দায়-দায়িত্ব মোটেই লাঘব হবে না।” অন্য একটি হাদীসে বলা হয়েছেঃ

لاَ تُقْتَلُ نَفْسٌ ظُلْمًا إِلاَّ كَانَ عَلَى ابْنِ آدَمَ الأَوَّلِ كِفْلٌ مِنْ دَمِهَا لأَنَّهُ أَوَّلُ مَنْ سَنَّ الْقَتْلَ-

“এই দুনিয়ায় যে ব্যক্তিকেই অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয়, সেই অন্যায় হত্যাকাণ্ডের পাপের একটি অংশ হযরত আদমের সেই প্রথম সন্তানটির আমলনামায় লিখিত হয়, যে তার ভাইকে হত্যা করেছিল। কারণ মানুষ হত্যার পথ সে-ই সর্বপ্রথম উন্মুক্ত করেছিল।” এ থেকে জানা যায়, যে ব্যক্তি বা দল কোন ভুল চিন্তা বা কর্মনীতির ভিত্ রচনা করে সে কেবল নিজের ভুলের ও গোনাহের জন্য দায়ী হয় না বরং দুনিয়ায় যতগুলো লোক তার দ্বারা প্রভাবিত হয় তাদের সবার গোনাহের দায়িত্বের একটি অংশও তার আমলনামায় লিখিত হতে থাকে। যতদিন তার এ গোনাহের প্রভাব বিস্তৃত হতে থাকে, ততদিন তার আমলনামায় গোনাহ লিখিত হতে থাকে। তাছাড়া এ থেকে একথাও জানা যায় যে, প্রত্যেক ব্যক্তির নেকী বা গোনাহের দায়-দায়িত্ব কেবল তার নিজের ওপরই বর্তায় না বরং অন্যান্য লোকদের জীবনে তার নেকী ও গোনাহের কি প্রভাব পড়ে সেজন্য ও তাকে জবাবদিহি করতে হবে।

যে ব্যক্তি ইসলাম ধর্মে কোন গুনাহের প্রচলন ঘটালো তাহলে সেই প্রবর্তক ব্যক্তি এর জন্য গুনাহগার হবে, এমনিভাবে তারপরে যে সেটার উপর আমল করবে এর জন্য সেই প্রবর্ত্তক ব্যক্তিও গুনাহগার হবে, আর এজন্য সে বদআমল কারীর আমলনামা থেকে সামান্য গুনাহও কম হবে না। (মুসলিম শরীফ,হাদীস নং-২২৪১)

তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে একে অন্যকে সহযোগিতা করবে। গুনাহ ও জুলুমের কাজে একে অন্যের সহযোগিতা করবে না।(সূরা মায়েদা, আয়াত নং-২)

“আর যে ব্যক্তি ইসলামে কোন কুরীতির (মন্দ কাজের) প্রচলন করবে এবং তারপরে সে অনুযায়ী আমল করা হয় তাহলে ঐ আমলকারীর মন্দ ফলের সমপরিমাণ গুনাহ তার জন্য লিপিবদ্ধ করা হবে। এতে তাদের গুনাহ কিছুমাত্র হ্রাস হবে না।” [সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) ৪৯/ ইলম (كتاب العلم),

৭ : ৩৯ وَ قَالَتۡ اُوۡلٰىهُمۡ لِاُخۡرٰىهُمۡ فَمَا كَانَ لَكُمۡ عَلَیۡنَا مِنۡ فَضۡلٍ فَذُوۡقُوا الۡعَذَابَ بِمَا كُنۡتُمۡ تَكۡسِبُوۡنَ ﴿۳۹﴾

(৩৯) আর তাদের পূর্ববর্তীরা তাদের পরবর্তীদেরকে বলবে, ‘আমাদের উপর তোমাদের কোন শ্রেষ্ঠত্ব নেই, সুতরাং তোমরা নিজেদের কৃতকর্মের ফল ভোগ করতে থাক।’

জাহান্নামবাসীদের এ পারস্পরিক সংলাপ ও তর্ক-বিতর্ক কুরআন মজীদের আরো কয়েকটি স্থানে বর্ণিত হয়েছে। যেমন সূরা সাবা’র ৪ রুকূ’তে বলা হয়েছেঃ হায়! তোমরা যদি সেই সময়টি দেখতে পেতে যখন এ জালেমরা নিজেদের রবের সামনে দাঁড়াবে এবং পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনতে থাকবে। যাদেরকে দুনিয়ায় দুর্বল করে রাখা হয়েছিল তারা বড় ও শক্তিশালীর আসনে যারা বসেছিল তাদেরকে বলবেঃ তোমরা না থাকলে আমরা মু’মিন হতাম। বড় ও শক্তিশালীর আসনে যারা বসেছিল, তারা দুর্বল করে রাখা লোকদেরকে জবাব দেবেঃ তোমাদের কাছে যখন হেদায়াত এসেছিল তখন আমরা কি তা গ্রহণ করতে তোমাদেরকে বাধা দিয়েছিলাম? না, তা নয়, বরং তোমরা নিজেরাই অপরাধী ছিলে। এর অর্থ হচ্ছে, তোমরা আবার কবে হেদায়াতের প্রত্যাশী ছিলে? আমরা যদি তোমাদেরকে দুনিয়ার লোভ দেখিয়ে নিজেদের দাসে পরিণত করে থাকি, তাহলে তোমরা লোভী ছিলে বলেই তো আমাদের ফাঁদে পা দিয়েছিলে। যদি আমরা তোমাদেরকে কিনে নিয়ে থাকি, তাহলে তোমরা নিজেরাই তো বিকোবার জন্য তৈরী ছিলে, তবেই না আমরা কিনতে পেরেছিলাম। যদি আমরা তোমাদেরকে বস্তুবাদ, বৈষয়িক লালসা, জাতিপূজা এবং এ ধরনের আরো বিভিন্ন প্রকার গোমরাহী ও অসৎকাজে লিপ্ত করে থাকি, তাহলে তোমরা নিজেরাই তো আল্লাহর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে দুনিয়ার পূজারী সেজেছিলে, তবেই না তোমরা আল্লাহর আনুগত্য ও আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বানকারীদেরকে ত্যাগ করে আমাদের ডাকে সাড়া দিয়েছিলে। যদি আমরা তোমাদের ধর্মের আবরণে প্রতারিত করে থাকি, তাহলে যে জিনিসগুলো আমরা পেশ করছিলাম এবং তোমরা লুফে নিচ্ছিলে, সেগুলোর চাহিদা তো তোমাদের নিজেদের মধ্যেই ছিল। তোমরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে এমন সব প্রয়োজন পূরণকারী খুঁজে বেড়াচ্ছিলে, যারা তোমাদের কাছে কোন নৈতিক বিধানের আনুগত্যের দাবী না করেই কেবলমাত্র তোমাদের ইস্পিত কাজই করে যেতে থাকতো। আমরা সেই সব প্রয়োজন পুরণকারী তৈরী করে তোমাদেরকে দিয়েছিলাম। তোমরা আল্লাহর আদেশ নিষেধ থেকে বেপরোয়া হয়ে দুনিয়ার কুকুর হয়ে গিয়েছিলে এবং তোমাদের পাপ মোচনের জন্য এমন এক ধরনের সুপারিশকারী খুঁজে বেড়াচ্ছিলে যারা তোমাদের গোনাহ মাফ করিয়ে দেয়ার সমস্ত দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে নিয়ে নেবে। আমরা সেই সব সুপারিশকারী তৈরী করে তোমাদের কাছে সরবরাহ করেছিলাম। তোমরা নিরস ও স্বাদ-গন্ধহীন দ্বীনদারী, পরহেজগারী, কুরবানী এবং প্রচেষ্টা ও সাধনার পরিবর্তে নাজাত লাভের জন্য অন্য কোন পথের সন্ধান চাচ্ছিলে। তোমরা চাচ্ছিলে এ পথে তোমাদের প্রবৃত্তি ও লালসা চরিতার্থ করতে, নানা প্রকার স্বাদ আহরণ করতে কোন বাধা না থাকে এবং প্রবৃত্তি ও লালসা যেন সব রকমের বিধি-নিষেধের আওতামুক্ত থাকে। আমরা এ ধরনের সুদৃশ্য ধর্ম উদ্ভাবন করে তোমাদের সামনে রেখেছিলাম। মোটকথা দায়-দায়িত্ব কেবল আমাদের একার নয়। তোমরাও এতে সমান অংশীদার। আমরা যদি গোমরাহী সরবরাহ করে থাকি, তাহলে তোমরা ছিলে তার খরিদ্দার।

আর কাফিররা বলবে, ‘হে আমাদের রব, জিন ও মানুষের মধ্যে যারা আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছে তাদেরকে আমাদের দেখিয়ে দিন। আমরা তাদের উভয়কে আমাদের পায়ের নীচে রাখব, যাতে তারা নিকৃষ্টদের অন্তর্ভুক্ত হয়। সূরা ফুসসিলাত (হামীম আস সাজদাহ); আয়াত-২৯