সূরা যুখরুফঃ ৬ষ্ঠ রুকু (৫৭-৬৭)আয়াত

পৌত্তলিকতা ও শিরকের খন্ডন এবং মিথ্যা উপাস্যগুলোর অসহায়তার কথা পষ্কিারভাবে তুলে ধরার জন্য মক্কার মুশরিকদেরকে বলা হত যে, তোমাদের সাথে তোমাদের উপাস্যগুলোও জাহান্নামে প্রবেশ করবে। আর লক্ষ্য হত, পাথরের সেই মূর্তিগুলো, যার তারা পূজা করত। এ থেকে লক্ষ্য কিন্তু সেই সৎলোক (নবী-অলী)গণ নন, যাঁরা তাঁদের জীবদ্দশায় মানুষদেরকে তাওহীদের দাওয়াত দিয়েছেন। অতঃপর তাঁদের মৃত্যুর পর ভক্তরা তাঁদেরকেও উপাস্য বানিয়ে নিয়েছে। তাঁদের ব্যাপারে কুরআন কারীমে এ কথা পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে যে, তাঁরা জাহান্নাম থেকে দূরে থাকবে। {إِنَّ الَّذِيْنَ سَبَقَتْ لَهُمْ مِّنَّا الْحُسْنَى اُولَئِكَ عَنْهَا مُبْعَدُوْنَ} (الأنبياء: ১০১) কারণ, এতে তাঁদের কোন দোষ নেই। আর এই জন্যই কুরআন এই মূর্তিগুলোর ব্যাপারে مَا শব্দ ব্যবহার করেছে; যা জ্ঞানহীন প্রাণী বা বস্তুর জন্য ব্যবহার হয়। সুতরাং এ থেকে আম্বিয়া ও সৎলোকেরা বের হয়ে যান; যাঁদেরকে লোকেরা নিজে থেকেই উপাস্য বানিয়ে রেখেছিল। অর্থাৎ, এটা হতে পারে যে, অন্যান্য মূর্তিদের সাথে তাঁদের আকৃতিতে বানানো মূর্তিগুলোকেও আল্লাহ জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন, কিন্তু এ লোকগুলো তো অবশ্যই জাহান্নাম থেকে দূরে থাকবেন। মুশরিকরা নবী (সাঃ)-এর পবিত্র জবানে ঈসা (আঃ)-এর সুনাম শুনে এই অসার তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হত যে, যদি ঈসা প্রশংসার যোগ্য হন অথচ খ্রিষ্টানরা তাঁকে উপাস্য বানিয়েছে, তবে আবার আমাদের উপাস্যগুলো নিন্দিত হল কিভাবে? এরাও কি উত্তম নয়? কিংবা আমাদের উপাস্যগুলো যদি জাহান্নামে যায়, তাহলে ঈসা ও উযায়েরও জাহান্নামে যাবেন। মহান আল্লাহ এখানে বললেন, আনন্দে তাদের শোরগোল করা তাদের বিতর্ক বৈ কিছুই নয়। তাছাড়া তর্কের অর্থই এই হয় যে, বিতর্ককারীর কাছে কোন দলীল থাকে না। কিন্তু নিজের মত বহাল রাখার জন্য অযথা কথা কাটাকাটি করে।

এটা নাসারাদের সে বিভ্রান্তির জওয়াব, যার ভিত্তিতে তারা ঈসা আলাইহিস সালামকে উপাস্য স্থির করেছিল। পিতা ব্যতীত জন্ম গ্রহণের বিষয়টিকে তারা তার ইলাহ হওয়ার প্রমাণস্বরূপ পেশ করেছিল। আল্লাহ তা’আলা এর খণ্ডনে বলেন, এটা তো নিছক আমার কুদরতের এক প্রদর্শনী ছিল। আমি স্বভাবাতীত কাজ করারও ক্ষমতা রাখি। পিতা ব্যতীত জন্মগ্রহণ করা খুব বেশি স্বভাবাতীত কাজ নয়। কেননা, আদমকে পিতা-মাতা ব্যতীত সৃষ্টি করা হয়েছে। তাছাড়া আল্লাহ্ তা’আলা ঈসা আলাইহিস সালামকে তাঁর অসীম ক্ষমতার নমুনা বানানোর অন্য অর্থ, তাকে এমন মু’জিযা দান করা যা না তার পূর্বে কাউকে দেয়া হয়েছিলো না তার পরে। তিনি মাটি দিয়ে পাখি তৈরী করে তাতে ফুঁ দিতেন আর অমনি তা জীবন্ত পাখি হয়ে যেতো। তিনি জন্মান্ধকে দৃষ্টিশক্তি দান করতেন এবং কুষ্ঠ রোগীকে সুস্থ করতেন। এমনকি মৃত মানুষকে পর্যন্ত জীবিত করতেন। আল্লাহর বাণীর তাৎপর্য হচ্ছে, শুধু অসাধারণ জন্ম এবং এসব বড় বড় মু’জিযার কারণে তাকে আল্লাহর দাসত্বের ঊর্ধ্বে মনে করা এবং আল্লাহর পুত্র বলে আখ্যায়িত করে তার উপাসনা করা নিতান্তই ভ্ৰান্তি। একজন বান্দা হওয়ার চেয়ে অধিক কোন মর্যাদা তার ছিল না। তাকে নিয়ামতসমূহ দিয়ে অভিসিক্ত করে আল্লাহ তাঁর অসীম ক্ষমতার নমুনা বানিয়ে দিয়েছিলেন। [দেখুন: তাবারী] মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন-

যখন ফেরেশতারা বললঃ “হে মারয়াম! আল্লাহ‌ তোমাকে তাঁর একটি ফরমানের সুসংবাদ দান করেছেন। তার নাম হবে মসীহ ঈসা ইবনে মারয়াম। সে দুনিয়ায় ও আখেরাতে সম্মানিত হবে। আল্লাহ‌র নৈকট্যলাভকারী বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হবে।দোলনায় থাকা অবস্থায় ও পরিণত বয়সেও মানুষের সাথে কথা বলবে এবং সে হবে সৎব্যক্তিদের অন্যতম।একথা শুনে মারয়াম বললোঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমার সন্তান কেমন করে হবে? আমাকে তো কোন পুরুষ স্পর্শও করেনি।” জবাব এলোঃ “এমনটিই হবে। আল্লাহ্‌ যা চান সৃষ্টি করেন। তিনি যখন কোন কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন তখন কেবল এতটুকুই বলেন, হয়ে যাও, তাহলেই তা হয়ে যায়।”

কোন পুরুষ তোমাকে স্পর্শ না করলেও তোমার সন্তান হবে। এখানে যে ‘এমনটি হবে’ (كذلك) শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, হযরত যাকারিয়া আলাইহিস সালামের জবাবেও এই একই শব্দ ব্যবহার করা হয়েছিল। সেখানে এর যে অর্থ ছিল এখানেও সেই একই অর্থ হওয়াই উচিত। তা ছাড়া পরবর্তী বাক্য বরং পূর্বাপর সমস্ত বর্ণনাই এই অর্থ সমর্থন করে যে, কোনো প্রকার যৌন সংযোগ ছাড়াই হযরত মারয়ামকে সন্তান জন্মের সুসংবাদ দেয়া হয়েছিল। আর আসলে এভাবেই হযরত ঈসার (আঃ) জন্ম হয়েছিল। নয়তো দুনিয়ার আর দশটি স্ত্রীলোক যেভাবে সন্তান জন্ম দেয় সেভাবে পরিচিত স্বাভাবিক পদ্ধতিতে যদি হযরত মারয়ামের গর্ভে সন্তান জন্ম নেবার ব্যাপারটি ঘটে থাকতো এবং যদি প্রকৃতপক্ষে হযরত ঈসা (আঃ) ঐভাবেই জন্মগ্রহণ করে থাকতেন, তাহলে ৪ রুকূ’ থেকে ৬ রুকূ’ পর্যন্ত যে বর্ণনা চলে আসছে তা পুরোপুরি অর্থহীন হয়ে যায় এবং ঈসা আলাইহিস সালামের জন্ম সংক্রান্ত আর যে সমস্ত বর্ণনা আমরা কুরআনের আরো বিভিন্ন স্থানে পাই তাও নিরর্থক হয়ে পড়ে। পিতার ঔরস ছাড়াই অস্বাভাবিক পদ্ধতিতে হযরত ঈসার (আঃ) জন্ম হয়েছিল বলেই না খৃস্টানরা তাঁকে ‘আল্লাহ্‌র পুত্র’ ও ইলাহ মনে করেছিল। আর একজন কুমারী মেয়ে সন্তান প্রসব করেছে, এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করেই তো ইহুদীরা তাঁর প্রতি দোষারোপ করেছিল। যদি এটা আদতে কোন সত্য ঘটনাই না হয়ে থাকে, তাহলে ঐ দু’টি দলের চিন্তার প্রতিবাদ প্রসঙ্গে কেবল এতটুকু বলে দেয়াই যথেষ্ট হতো যে, তোমরা ভুল বলছো, সে মেয়েটি ছিল বিবাহিতা, অমুক ব্যক্তি ছিল তার স্বামী এবং তারই ঔরসে ঈসার জন্ম হয়েছিল। এই সংক্ষিপ্ত চুম্বক কথা ক’টি বলার পরিবর্তে এতো দীর্ঘ ভূমিকা ফাঁদার, পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে কথা বলার এবং সোজাসুজি উমুক ব্যক্তির পুত্র ঈসা বলার পরিবর্তে মারয়ামের পুত্র ঈসা বলার কি প্রয়োজন ছিল? এর ফলে তো বিষয়টি সহজে মীমাংসা হওয়ার পরিবর্তে আরো জটিল হয়ে পড়েছে। কাজেই যারা কুরআনকে আল্লাহ‌র কালাম বলে মানে এবং এরপর ঈসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে একথা প্রমাণ করার চেষ্টা করে যে, স্বাভাবিকভাবে মাতা পিতার মিলনের ফলে তাঁর জন্ম হয়েছিল, তারা আসলে একথা প্রমাণ করেন যে, মনের কথা প্রকাশ করা ও নিজের বক্তব্য সুস্পষ্ট করে তুলে ধরার যতটুকু ক্ষমতা তাদের আছে, আল্লাহ‌র ততটুকু নেই (মা’আযাল্লাহ)।

তোমাদেরকে শেষ করে তোমাদের স্থানে ফিরিশতাদেরকে আবাদ করতাম। তারা তোমাদেরই মত পরস্পরের প্রতিনিধিত্ব করত। অর্থাৎ, ফিরিশতাদের আসমানে থাকা এমন কোন মর্যাদার ব্যাপার নয় যে, তাদের ইবাদত করা হবে। এটা কেবল আমি আমার ইচ্ছা ও ফায়সালায় ফিরিশতাদেরকে আসমানে এবং মানুষদেরকে যমীনে আবাদ করেছি। আমি ইচ্ছা করলে ফিরিশতাদেরকেও যমীনে আবাদ করতে পারি।

অধিকাংশ তাফসীরবিদ এখানে منكم শব্দটির অর্থ করেছেন, بدلاً منكم বা তোমাদের পরিবর্তে। কেউ কেউ এর অর্থ করেছেন, আমি ইচ্ছা করলে এমন কাজও করতে পারি, যার নযীর এপর্যন্ত কায়েম হয়নি। অর্থাৎ মানুষের ঔরসে ফেরেশতাও সৃষ্টি করতে পারি। [ফাতহুল কাদীর]

আয়াতের শেষে বলা হয়েছে, يخلفون। এর অর্থ তারা যমীনের খলীফা বা প্রতিনিধির মর্যাদা লাভ করত। অথবা তোমাদের স্থলাভিষিক্ত হতো। আয়াতের আরেক অর্থ হচ্ছে, তারা তোমাদের মত বংশবিস্তার করত। ফেরেশতারা উত্তরাধিকার রেখে যেত। [ইবনে কাসীর, বাগভী]

عِلْمٌ এর অর্থ নিদর্শন। অধিকাংশ মুফাসসেরের নিকট এর অর্থ হল, কিয়ামতের নিকটতম সময়ে তাঁর আসমান থেকে অবতরণ হবে। এ কথা অনেক সহীহ ও বহুধা সূত্রে বর্ণিত হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। আর এই অবতরণ এ কথার নিদর্শন হবে যে, কিয়ামত অতি নিকটে। এই জন্যই কেউ কেউ এটাকে আ’য়ন এবং লামে যবর দিয়ে (عَلَمٌ) পড়েছেন। যার অর্থ হয়, নিদর্শন।

অন্য সব তাফসীরকারগণ প্রায় সর্বসম্মতভাবে এ মত পোষণ করেন যে, এর অর্থ হযরত ঈসা ইবনে মারয়াম এবং পূর্বাপর প্রসঙ্গের মধ্যে এটাই সঠিক। এরপর প্রশ্ন আসে, তাঁকে কোন অর্থে কিয়ামতের নিদর্শন অথবা কিয়ামত সম্পর্কিত জ্ঞানের মাধ্যম বলা হয়েছে? ইবনে আব্বাস, মুজাহিদ, ইকরিমা, কাতাদা, সুদ্দী, দাহহাক, আবুল আলিয়া ও আবু মালেক বলেন, এর অর্থ হয়রত ঈসা আলাইহিস সালামের দ্বিতীয় আগমন, যে সম্পর্কে বহু হাদীসে বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে আয়াতের অর্থ হচ্ছে, তিনি দ্বিতীয় বার যখন পৃথিবীতে আগমন করবেন তখন বুঝা যাবে কিয়ামত নিকটবর্তী হয়েছে। কিন্তু এসব সম্মানিত ব্যক্তিবর্গের মহাসম্মান সত্ত্বেও একথা মেনে নেয়া কঠিন যে, এ আয়াতে হযরত ঈসার পুনরাগমনকে কিয়ামতের নিদর্শন অথবা সে সম্পর্কে জ্ঞান লাভের মাধ্যম বলা হয়েছে। কেননা, পরের বাক্যই এ অর্থ গ্রহণের পথে প্রতিবন্ধক। তাঁর পুনরাগমন কিয়ামত সম্পর্কিত জ্ঞানের মাধ্যমে শুধু তাদের জন্য হতে পারে যারা সেই যুগে বর্তমান থাকবে অথবা সেই যুগের পরে জন্ম লাভ করবে। মক্কার কাফেরদের জন্য তিনি কিভাবে কিয়ামত সম্পর্কিত জ্ঞানের মাধ্যম হতে পারেন যার কারণে তাদেরকে সম্বোধন করে একথা বলা সঠিক হবে যে, ‘অতএব তোমরা সে ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করো না’। অতএব, অন্য কয়েকজন মুফাসসির এ আয়াতের যে ব্যাখ্যা পেশ করেছেন আমাদের মতে সেটিই সঠিক ব্যাখ্যা। তাঁদের মতে এখানে হযরত ঈসার বিনা বাপে জন্ম লাভ, মাটি দিয়ে জীবন্ত পাখি তৈরী করা এবং মৃতকে জীবিত করাকে কিয়ামতের সম্ভাবনার একটি প্রমাণ হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আল্লাহর বাণীর তাৎপর্য এই যে, যে আল্লাহ‌ বিনা বাপে সন্তান সৃষ্টি করতে পারেন এবং যে আল্লাহর এক বান্দা মাটির একটি কাঠামোর মধ্যে জীবন সঞ্চার করতে ও মৃতদের জীবিত করতে পারেন তিনি মৃত্যুর পর তোমাদের ও সমস্ত মানুষকে পুনরায় জীবিত করবেন তা তোমরা অসম্ভব মনে করো কেন?

অর্থাৎ কিয়ামতের প্রতি বিশ্বাস পোষণ করা থেকে যেন বিরত না রাখে।

৩৬ : ৬০ اَلَمۡ اَعۡهَدۡ اِلَیۡكُمۡ یٰبَنِیۡۤ اٰدَمَ اَنۡ لَّا تَعۡبُدُوا الشَّیۡطٰنَ ۚ اِنَّهٗ لَكُمۡ عَدُوٌّ مُّبِیۡنٌ

হে বনী আদম! আমি কি তোমাদেরকে নির্দেশ দেইনি যে, তোমরা শয়তানের ইবাদাত করো না, কারণ সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু? সূরা ইয়াসীনঃ ৬০

হে মানুষ! তোমরা খাও যমীনে যা কিছু বৈধ ও পবিত্র খাদ্যবস্তু রয়েছে তা থেকে। আর তোমরা শয়তানের পদাংক(২) অনুসরণ করো না। নিশ্চয় সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। বাকারাঃ১৬৮

হাদীসে রাসূল (সাঃ) বলেন, মহান আল্লাহ বলেছেন, আমি আমার সমস্ত বান্দাদেরকে একনিষ্ঠ (মুসলিম) হিসেবে সৃষ্টি করেছি। তারপর তাদের নিকট শয়তান এসে তাদেরকে দ্বীন থেকে বিচ্যুত করে দেয়। আমি যে সমস্ত জিনিস তাদের জন্য হালাল করেছিলাম, সেসব জিনিস তাদের উপর হারাম করে দেয়। (সহীহ মুসলিম ২৮৬৫নং)

হে মানব জাতি! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর এবং ভয় কর এমন এক দিবসকে, যখন পিতা পুত্রের কোন কাজে আসবে না এবং পুত্রও তার পিতার কোন উপকার করতে পারবে না। নিঃসন্দেহে আল্লাহর ওয়াদা সত্য। অতএব, পার্থিব জীবন যেন তোমাদেরকে ধোঁকা না দেয় এবং আল্লাহ সম্পর্কে প্রতারক শয়তানও যেন তোমাদেরকে প্রতারিত না করে। [সূরা লুকমানঃ ৩৩]

অর্থাৎ ঈসা আলাইহিস সালাম একথা কখনো বলেননি যে, আমি আল্লাহ‌ অথবা আল্লাহর পুত্র। তোমরা আমার উপাসনা করো। অন্য সব নবী-রসূল যে দাওয়াত দিয়েছিলেন এবং এখন মুহাম্মাদ ﷺ তোমাদের যে দাওয়াত দিচ্ছেন তাঁর দাওয়াত তাই ছিল। (ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল ইমরান, টীকা ৪৫ থেকে ৪৮; আন নিসা, টীকা ২১৩, ২১৭ ও ২১৮; আল মায়েদা, টীকা ১০০, ১৩০; মারয়াম, টীকা ২১ থেকে ২৩)।

৩৬ : ৬১ وَّ اَنِ اعۡبُدُوۡنِیۡ ؕؔ هٰذَا صِرَاطٌ مُّسۡتَقِیۡمٌ

আর আমারই ইবাদাত কর, এটাই সরল পথ। সূরা ইয়াসীনঃ৬১

এ থেকে ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদের বুঝানো হয়েছে। ইয়াহুদীরা তো ঈসা (আঃ)-এর মর্যাদা ক্ষুন্ন করে তাঁকে –নাউযুবিল্লাহ — জারজ সন্তান গণ্য করে। আর খ্রিষ্টানরা তাঁর ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করে তাঁকে উপাস্য বানিয়ে নেয়। অথবা এ থেকে খ্রিষ্টানদেরই বিভিন্ন দলকে বুঝানো হয়েছে। এরা আপোসে ঈসা (আঃ)-এর ব্যাপারে কঠোর পরস্পর-বিরোধী মত পোষণ করে। একদল তাঁকে আল্লাহর পুত্র, অন্যদল তাঁকে আল্লাহ ও তিনের মধ্যে একজন মনে করে এবং আর একদল তাঁকে মুসলিমদের মত আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রসূল গণ্য করে।

কেননা, কাফেরদের বন্ধুত্ব কেবল কুফরী ও পাপাচারের ভিত্তিতে হয় এবং এই কুফরী ও পাপাচারই তাদের আযাবের কারণ হবে। আর এরই কারণে তারা একে অপরকে দোষারোপ করবে এবং পরস্পরের শত্রু হয়ে যাবে। পক্ষান্তরে ঈমানদার ও আল্লাহভীরু লোকদের পারস্পরিক বন্ধুত্ব ও ভালবাসা যেহেতু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের ভিত্তিতে হয়, আর এই দ্বীন ও ঈমানই হল কল্যাণ ও সওয়াব লাভের মাধ্যম, সেহেতু তাঁদের এই বন্ধুত্বে কোন বিচ্ছেদ ঘটবে না। আখেরাতেও তাঁদের এই বন্ধুত্ব অটুট থাকবে, যেমন দুনিয়াতে ছিল।

৪৫ : ১৯ اِنَّهُمۡ لَنۡ یُّغۡنُوۡا عَنۡكَ مِنَ اللّٰهِ شَیۡئًا ؕ وَ اِنَّ الظّٰلِمِیۡنَ بَعۡضُهُمۡ اَوۡلِیَآءُ بَعۡضٍ ۚ وَ اللّٰهُ وَلِیُّ الۡمُتَّقِیۡنَ

 নিশ্চয় তারা আল্লাহ্‌র মুকাবেলায় আপনার কোনই কাজে আসবে না; আর নিশ্চয় যালিমরা একে অন্যের বন্ধু; এবং আল্লাহ মুত্তাকীদের বন্ধু। জাসিয়াঃ১৯

হায় আমার দুর্ভোগ, আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম’।(সূরা ফুরকান:২৮)

তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করো, যারা সকাল সন্ধ্যা আল্লাহর পথে মানুষকে ডাকে।(সূরা ক্বাহাফ- ২৮)

🔹 বন্ধু নির্বাচনে অসতর্কতা মানে নিজের দ্বীন, চরিত্র ও পরকাল ধ্বংসের পথে ঠেলে দেওয়া।

🔹 এক-দুইজন বিশ্বস্ত, নেক, তাকওয়াবান বন্ধু-ই যথেষ্ট, যারা ফেতনার যুগে তোমাকে ধরে রাখবে।

১০ : ৬২ اَلَاۤ اِنَّ اَوۡلِیَآءَ اللّٰهِ لَا خَوۡفٌ عَلَیۡهِمۡ وَ لَا هُمۡ یَحۡزَنُوۡنَ

৬২. জেনে রাখা আল্লাহর বন্ধুদের কোন ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না।

১০ : ৬৩ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَ كَانُوۡا یَتَّقُوۡنَ

যারা ঈমান এনেছে এবং তাকওয়া অবলম্বন করত

১০ : ৬৪ لَهُمُ الۡبُشۡرٰی فِی الۡحَیٰوۃِ الدُّنۡیَا وَ فِی الۡاٰخِرَۃِ ؕ لَا تَبۡدِیۡلَ لِكَلِمٰتِ اللّٰهِ ؕ ذٰلِكَ هُوَ الۡفَوۡزُ الۡعَظِیۡمُ

তাদের জন্যই আছে সুসংবাদ দুনিয়ার জীবনে ও আখিরাতে, আল্লাহর বাণীর কোন পরিবর্তন নেই; সেটাই মহাসাফল্য। সূরা ইউনুসঃ ৬২-৬৪

আল্লাহর অলী হওয়ার জন্য একটিই উপায় রয়েছে, আর তা হচ্ছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর রঙে রঞ্জিত হওয়া, তার সুন্নাতের হুবহু অনুসরণ করা। যারা এ ধরনের অনুসরণ করতে পেরেছেন তাদের মর্যাদাই আলাদা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “আল্লাহর এমন কিছু বান্দা রয়েছে যাদেরকে শহীদরাও ঈর্ষা করবে। বলা হলোঃ হে আল্লাহর রাসূল! তারা কারা? হয়ত তাদের আমরা ভালবাসবো। রাসূল বললেনঃ “তারা কোন সম্পদ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ব্যতীতই একে অপরকে একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে ভালবেসেছে। নূরের মিম্বরের উপর তাদের চেহারা হবে নূরের। মানুষ যখন ভীত হয় তখন তারা ভীত হয় না। মানুষ যখন পেরেশান ও অস্থির হয় তখন তারা অস্থির হয় না।” তারপর তিনি এ আয়াত পাঠ করলেন। [ইবনে হিব্বানঃ ৫৭৩, আবু দাউদঃ ৩৫২৭]