সূরা আত তাওবা

সূরা আত তাওবাঃ ১ম রুকুঃ  আয়াত (১-৬)

সূরা আত তাওবাঃ  রুকুঃ ১ম  আয়াত সংখ্যাঃ (১-৬)

أَعُوذُُ بِاللَُِّ مِنَُ الشّيْطَانُِ الرّجِيمُِ

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ

মূল আয়াতের তাফসীরে যাওয়ার পূর্বে রাসূল সা এর তখনকার পরিস্থিতি আবার একটু সংক্ষেপে উল্লেখ করা হলো।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে এক রাতে স্বপ্ন দেখানো হ’ল যে, তিনি স্বীয় ছাহাবীদের সাথে নিয়ে মাসজিদুল হারামে প্রবেশ করছেন এবং ওমরাহ করছেন। এ স্বপ্ন দেখার পরে তিনি ওমরাহ করার সিদ্ধান্ত নেন এবং ছাহাবীদের প্রস্ত্তত হ’তে বলেন। ইতিপূর্বে খন্দক যুদ্ধে বিজয় লাভের পর সমগ্র আরবে মুসলিম শক্তিকে অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হিসাবে গণ্য করা হ’তে থাকে। তাই রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কিছুটা স্বস্তির মধ্যে ছিলেন।

৬ষ্ঠ হিজরীর ১লা যুলক্বা‘দাহ সোমবার তিনি ১৪০০ (মতান্তরে ১৫০০) সাথী নিয়ে মদীনা হ’তে রওয়ানা হন (বুখারী হা/৪১৫৩)। কিছুদূর অগ্রসর হ’তেই জানা গেল যে, মক্কার মহা সড়কে ‘কোরাউল গামীম’(كُرَاعُ الْغَمِيمِ) নামক স্থানে খালেদ বিন অলীদ ২০০ অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে প্রস্ত্তত হয়ে আছেন মুসলিম কাফেলার উপরে হামলা করার জন্য।

মিসওয়ার বিন মাখরামাহ (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) যুদ্ধ এড়ানোর জন্য মহাসড়ক ছেড়ে ডান দিকে পাহাড়ী পথ ধরে অগ্রসর হ’তে থাকেন এবং মক্কার নিম্নাঞ্চলে হোদায়বিয়ার শেষ প্রান্তে একটি ঝর্ণার নিকটে গিয়ে অবতরণ করেন। ঐ সময় রাসূল (ছাঃ)-এর উষ্ট্রী ‘ক্বাছওয়া’ বসে পড়ে।

আপোষ চেষ্টায় মক্কায় প্রতিনিধি প্রেরণ(إرسال المندوب إلى مكة للمصالحة) : অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কুরায়েশদের নিকটে এমন একজন দূত প্রেরণের চিন্তা করলেন, যিনি তাদের নিকটে গিয়ে বর্তমান সফরের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে জোরালোভাবে বক্তব্য উপস্থাপন করতে পারেন এবং অহেতুক যুদ্ধ এড়িয়ে যেতে পারেন। এজন্য তিনি প্রথমে খারাশ বিন উমাইয়া আল-খুযাঈকে পাঠান। কিন্তু কুরায়েশরা তাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়। যদি না বেদুঈনরা বাধা দিত (আহমাদ হা/১৮৯৩০)। অতঃপর ওমর (রাঃ)-কে নির্বাচন করলেন। কিন্তু তিনি বললেন যে, মক্কায় বনু ‘আদী গোত্রের একজন লোকও নেই যে আমার সাহায্যে এগিয়ে আসবে যদি আমি আক্রান্ত হই’। তাছাড়া আমার প্রতি তাদের আক্রোশ আপনি জানেন। তার চাইতে আপনি এমন একজনকে পাঠান, যিনি আমার চাইতে তাদের নিকট অধিক সম্মানিত। আপনি ওছমানকে প্রেরণ করুন। কেননা সেখানে তার গোত্রীয় লোকজন রয়েছে। তিনি আপনার বার্তা তাদের নিকটে ভালভাবে পৌঁছাতে পারবেন’।

অতঃপর রাসূল (ছাঃ) ওছমানকে ডাকলেন এবং তাকে কুরায়েশ নেতাদের কাছে পাঠালেন এই বলে যে,أَنَّا لَمْ نَأْتِ لِقِتَالٍ وَإِنَّمَا جِئْنَا عُمَّارًا ‘আমরা লড়াই করতে আসিনি বরং আমরা এসেছি ওমরাহকারী হিসাবে’। তিনি তাদেরকে ইসলামের প্রতি দাওয়াত দিতে বললেন। এছাড়াও মক্কার গোপন মুমিন নর-নারীদের কাছে সত্বর বিজয়ের সুসংবাদ শুনাতে বললেন এবং বলতে বললেন যে, আললাহ শীঘ্র তাঁর দ্বীনকে মক্কায় বিজয়ী করবেন। তখন আর কাউকে তার ঈমান লুকিয়ে রাখার প্রয়োজন হবে না’।

আদেশ পাওয়ার পর ওছমান (রাঃ) মক্কাভিমুখে রওয়ানা হ’লেন। বালদাহ (بَلْدَح) নামক স্থানে পৌঁছলে কুরায়েশদের কিছু লোক তাঁকে জিজ্ঞেস করল, কোথায় যাচ্ছেন? জবাবে তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাকে অমুক অমুক কাজে পাঠিয়েছেন। তারা বলল,قَدْ سَمِعْنَا مَا تَقُولُ ‘আমরা শুনেছি যা আপনি বলবেন’। এ সময় আবান বিন সাঈদ ইবনুল ‘আছ এসে তাঁকে স্বাগত জানিয়ে নিজ ঘোড়ায় বসিয়ে নিলেন। অতঃপর মক্কায় উপস্থিত হয়ে ওছমান (রাঃ) রাসূল (ছাঃ)-এর নির্দেশ মোতাবেক নেতৃবৃন্দের কাছে বার্তা পৌঁছে দিলেন ও তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। বার্তা পৌঁছানোর কাজ শেষ হ’লে নেতারা তাঁকে বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করার অনুরোধ জানালেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর পূর্বে তিনি তাওয়াফ করতে অস্বীকার করলেন। আহমাদ হা/১৮৯৩০; যাদুল মা‘আদ ৩/২৫৯; ইবনু হিশাম ২/৩১৫-১৬।

মক্কায় কাজ মিটাতে বেশ দেরী হয়ে যায়। তাতে মুসলমানরা ধারণা করেন যে, মক্কাবাসীরা ওছমানকে হত্যা করেছে। তখন রাসূল (ছাঃ) ‘সামুরাহ’ বৃক্ষের(شَجَرَةُ السَّمُرَةِ) নীচে সবাইকে বায়‘আতের জন্য আহবান করলেন। যেখানে সবাই ওছমান হত্যার প্রতিশোধ না নেয়া পর্যন্ত ফিরে যাবে না বলে আল্লাহর নামে প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করেন। ইতিহাসে এটাই বায়‘আতুর রিযওয়ান(بَيْعَةُ الرِّضْوَانِ) বলে পরিচিত। এদিন বায়‘আত করার জন্য প্রথমে এগিয়ে আসেন আবু সিনান আব্দুল্লাহ বিন ওয়াহাব আল-আসাদী’ (মুছান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ হা/৩৩১৭৫)। অতঃপর সকলে বায়‘আত করেন একজন ব্যতীত। যার নাম জাদ বিন ক্বায়েস আনছারী(جَدُّ بنُ قَيْسٍ)। সে মুনাফিক ছিল। অতঃপর রাসূল (ছাঃ) তাঁর ডান হাত দেখিয়ে বলেন,هَذِهِ يَدُ عُثْمَانَ ‘এটি ওছমানের হাত’। অতঃপর সেটি দিয়ে অন্য হাতে মারেন এবং বলেন,هَذِهِ لِعُثْمَانَ ‘এটি ওছমানের জন্য’ (বুখারী হা/৩৬৯৮)। এরপর যথারীতি বায়‘আত অনুষ্ঠিত হয়।

 এদিন বায়‘আতকারীদের উদ্দেশ্যে রাসূল (ছাঃ) বলেন,أَنْتُمُ الْيَوْمَ خَيْرُ أَهْلِ الأَرْضِ ‘আজ তোমরা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ’ (বুখারী হা/৪১৫৪)। বায়‘আত শেষ হওয়ার পরপরই ওছমান (রাঃ) ফিরে আসেন।

সুহায়েল বিন আমর(سُهَيلُ بنُ عَمْرو) এসে উপস্থিত হন। তাকে দেখে রাসূল (ছাঃ) মন্তব্য করলেন,قَدْ سَهَّلَ اللهُ لَكُمْ أَمْرَكُمْ ‘নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের বিষয়টি সহজ করে দিবেন’। বুখারী হা/২৭৩১; ছহীহ ইবনু হিববান হা/৪৮৭২। অতঃপর সুহায়েল ও রাসূল (ছাঃ)-এর মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনা হয়। অবশেষে তাঁরা একটি আপোষ প্রস্তাবে সম্মত হন। যা ‘হোদায়বিয়ার সন্ধি’ নামে পরিচিত। তার দফা সমূহ——–

১। মুহাম্মাদ এ বছর মক্কায় প্রবেশ না করেই সঙ্গী-সাথীসহ মদীনায় ফিরে যাবেন। আগামী বছর ওমরাহ করবেন এবং মক্কায় তিনদিন অবস্থান করবেন। সঙ্গে সফরের প্রয়োজনীয় অস্ত্র থাকবে এবং তরবারি কোষবদ্ধ থাকবে। কুরায়েশরা তাদের প্রতি কোনরূপ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে না’। এই শর্তের ব্যাপারে রাসূল (ছাঃ) আপত্তি জানালে সুহায়েল বলেন, যাতে আরবরা একথা বলার সুযোগ না পায় যে, মুসলমানেরা আমাদের উপরে যবরদস্তি প্রবেশ করেছে। বরং ওটা আগামী বছর’। অতঃপর তিনি মেনে নেন’ (বুখারী হা/৩১৮৪; ২৭৩১)।

২। কুরায়েশদের কোন লোক পালিয়ে মুহাম্মাদের দলে যোগ দিলে তাকে ফেরৎ দিতে হবে। পক্ষান্তরে মুসলমানদের কেউ কুরায়েশদের নিকটে গেলে তাকে ফেরৎ দেওয়া হবে না’। বুখারী হা/২৭৩১-৩২; আহমাদ হা/১৮৯৩০।

৩। দু’পক্ষের মধ্যে আগামী ১০ বছর যাবৎ যুদ্ধ বন্ধ থাকবে। এই সময় লোকেরা নিরাপদ থাকবে। কেউ কারু উপরে হস্তক্ষেপ করবে না’। আহমাদ হা/১৮৯৩০; আবুদাঊদ হা/২৭৬৬; মিশকাত হা/৪০৪৬।

৪। যারা মুহাম্মাদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হবে, তারা তার দলে এবং যারা কুরায়েশদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হবে, তারা তাদের দলে গণ্য হবে। এমতাবস্থায় তাদের কারু উপরে অত্যাচার করা হ’লে সেটা সংশ্লিষ্ট দলের উপরে অত্যাচার বলে ধরে নেয়া হবে’ (আহমাদ হা/১৮৯৩০)।

চুক্তি সম্পাদনের পর বনু খোযা‘আহ রাসূল (ছাঃ)-এর সাথে এবং বনু বকর কুরায়েশদের সাথে অঙ্গীকারাবদ্ধ হ’ল’ (আহমাদ হা/১৮৯৩০, সনদ হাসান)। অবশ্য বনু খোযা‘আহ আব্দুল মুত্ত্বালিবের সময় থেকেই বনু হাশেমের মিত্র ছিল, যা বংশ পরম্পরায় চলে আসছিল।

চুক্তি সম্পাদনের পর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সবাইকে হালাল হওয়ার জন্য স্ব স্ব পশু কুরবানী করতে বললেন।

এভাবে ৪৫২ কিঃ মিঃ দূর থেকে ইহরাম বেঁধে এসে মাত্র ২২ কিঃ মিঃ দূরে থাকতে ফিরে যেতে হ’ল। অথচ কা‘বাগৃহ এমন একটি স্থান যেখানে পিতৃহন্তা আশ্রয় নিলেও তাকে নিরাপত্তা দেওয়া হয়। কিন্তু আড়াই হাযার বছর থেকে চলে আসা এই রেওয়াজ রাসূল (ছাঃ) ও তাঁর সাথী মুসলমানদের জন্য ভঙ্গ করা হ’ল এবং তাঁদেরকে কা‘বাগৃহ যেয়ারতে বাধা দেওয়া হ’ল। শান্তির বৃহত্তর স্বার্থে রাসূল (ছাঃ) তা মেনে নিলেন। যদিও সাথীরা প্রায় সবাই তাতে নারায ছিলেন। এর মধ্যে নেতৃত্বের দৃঢ়তা ও তার প্রতি কর্মীদের অটুট আনুগত্যের অনন্য দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। চুক্তি শেষে রাসূল (ছাঃ) যখন মদীনায় ফিরে আসেন

আবু জান্দাল, আবু বাছীর, সুহায়েল বিন আমর প্রমুখের ঈমানী জাযবাকে এই চুক্তি দিয়ে আটকে রাখা যায়নি। তারা সিরিয়ার নিকটবর্তী সমুদ্রোপকূলে ঈছ (العِيْص) পাহাড়ী এলাকায় গিয়ে অন্যান্য মুসলমানদের নিয়ে দল গঠন করে ও কুরায়েশদের বাণিজ্য কাফেলার জন্য কঠিন হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। এক বছরের মধ্যে সেখানে প্রায় তিনশ মুসলমান জমা হয়ে যায়। ফলে এই ধারাটি অবশেষে কুরায়েশদের বিপক্ষে চলে যায় এবং তারা মদীনায় গিয়ে উক্ত ধারা বাতিলের আবেদন জানায় (সীরাহ ছহীহাহ ২/৪৫১)। এভাবে কার্যতঃ চুক্তির ৪র্থ ধারাটি বাতিল গণ্য হয়।

পরের বছর অর্থাৎ ৭ম হিজরীর প্রথম দিকে ওছমান বিন ত্বালহা, খালেদ বিন অলীদ ও আমর ইবনুল ‘আছ-এর মত সেরা ব্যক্তিগণ মদীনায় গিয়ে ইসলাম কবুল করেন। আর-রাহীক্ব ৩৪৭-৪৮ পৃঃ। এছাড়াও গোপনে ঈমান আনয়নকারীর সংখ্যা ছিল অগণিত। যারা মক্কা বিজয়ের পরে নিজেদের প্রকাশ করেন। ফলে দেখা যাচ্ছে যে, ফলাফলের বিচারে পুরা চুক্তিটাই মুসলমানদের পক্ষে চলে গেছে। এর মাধ্যমে রাসূল (ছাঃ)-এর গভীর দূরদৃষ্টির পরিচয় ফুটে ওঠে। হোদায়বিয়ার সন্ধি তাই নিঃসন্দেহে ছিল ‘ফাৎহুম মুবীন’ বা স্পষ্ট বিজয়। যা শুরুতে ওমরের মত দূরদর্শী ছাহাবীরও বুঝতে ভুল হয়েছিল।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ও তাঁর সাথীগণ হোদায়বিয়াতে ২০ দিন অবস্থান করেন। অতঃপর মদীনায় ফিরে যান। যাতায়াতসহ সর্বমোট দেড় মাস তাঁরা এই সফরে অতিবাহিত করেন (সীরাহ ছহীহাহ ২/৪৪৭)।

বলা আবশ্যক যে, হোদায়বিয়ার সন্ধিচুক্তি ১৭ কিংবা ১৮ মাস অব্যাহত ছিল। অতঃপর কুরায়েশরা তা ভঙ্গ করে। ফলে সেটি মক্কা বিজয়ের প্রত্যক্ষ কারণ হিসাবে গণ্য হয়।

খায়বর যুদ্ধ (غزوة خيبر) (৭ম হিজরীর মুহাররম মাস)

কুরায়েশদের সঙ্গে সন্ধিচুক্তির পর সকল ষড়যন্ত্রের মূল ঘাঁটি খায়বরের ইহূদীদের প্রতি এই অভিযান পরিচালিত হয়। হুদায়বিয়ার সন্ধি ও বায়‘আতে রিযওয়ানে উপস্থিত ১৪০০ ছাহাবীকে নিয়ে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) স্বয়ং এই অভিযান পরিচালনা করেন। তিনি কোন মুনাফিককে এ যুদ্ধে নেননি। এই যুদ্ধে মুসলিম পক্ষে ১৬ জন শহীদ এবং ইহূদী পক্ষে ৯৩ জন নিহত হয়। ইহূদীদের বিতাড়িত করার সিদ্ধান্ত হয়। তবে তাদের আবেদন মতে উৎপন্ন ফসলের অর্ধেক ভাগ দেবার শর্তে তাদেরকে সেখানে বসবাস করার সাময়িক অনুমতি দেওয়া হয় (বুখারী হা/৪২৩৫)।

যুদ্ধে বিপুল পরিমাণ গণীমত হস্তগত হয়। যাতে মুসলমানদের অভাব দূর হয়ে যায়।

ক্বাযা ওমরাহ (عمرة القضاء) (৭ম হিজরীর যুলক্বা‘দাহ মাস)

ইবনু ইসহাক বলেন, খায়বর যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে রবীউল আউয়াল থেকে শাওয়াল পর্যন্ত (৬ মাস) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মদীনায় অবস্থান করেন। এই সময়ের মধ্যে তিনি কয়েকটি ছোট ছোট সেনাদল বিভিন্ন স্থানে প্রেরণ করেন। অতঃপর গত বছরে কৃত হুদায়বিয়া সন্ধির শর্তানুযায়ী তিনি এ বছর যুলক্বা‘দাহ মাসে ওমরাহ করার জন্য প্রস্ত্ততি নেন (ইবনু হিশাম ২/৩৭০)। গত বছরে যারা হোদায়বিয়ায় হাযির ছিলেন, তাদের মধ্যে যারা জীবিত আছেন তারা ছাড়াও অন্যান্যগণ মিলে মোট দু’হাযার ব্যক্তি রাসূল (ছাঃ)-এর সঙ্গে বের হন। মহিলা ও শিশুরা ছিল এই সংখ্যার বাইরে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মক্কায় তিনদিন অবস্থান করেন। চতুর্থ দিন সকালে মুশরিক নেতারা এসে আলী (রাঃ)-কে বলেন, সন্ধিচুক্তি অনুযায়ী তিনদিনের মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছে। এবার তোমাদের নেতাকে যেতে বল। বুখারী হা/৪২৫১; মিশকাত হা/৪০৪৯।

 তখন রাসূল (ছাঃ) মক্কা থেকে ৬ কি.মি. উত্তরে তান‘ঈম-এর নিকটবর্তী ‘সারিফ’ (السَرِف) নামক স্থানে অবতরণ করেন। অতঃপর সেখানে চাচা আববাস-এর ব্যবস্থাপনায় মায়মূনাহ বিনতুল হারেছ-এর সাথে বিবাহ হয় ও সেখানে বাসর যাপন করেন’ (বুখারী হা/৪২৫৮)।

** ক্বাযা ওমরাহ পরবর্তী যুদ্ধসমূহ —-

সারিইয়া ইবনু আবিল ‘আওজা, সারিইয়া গালিব বিন আব্দুল্লাহ লায়ছী, সারিইয়া যাতু আত্বলাহ, সারিইয়া যাতু ইরক্ব

** মুতার যুদ্ধ (سرية مؤتة) ৮ম হিজরীর জুমাদাল ঊলা (আগষ্ট অথবা সেপ্টেম্বর ৬২৯ খৃ.)

ওমরাতুল ক্বাযা থেকে ফিরে এসে যিলহাজ্জ মাসের শেষ দিনগুলিসহ পরবর্তী চার মাস রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মদীনায় অবস্থান করেন। অতঃপর মদীনার নিরাপত্তা বিধান ও শাম অঞ্চলে মুসলমানদের উপর খ্রিষ্টান শাসকদের অব্যাহত অত্যাচার দমনের উদ্দেশ্যে জুমাদাল ঊলা মাসে এই অভিযান প্রেরণ করেন। এটিই ছিল খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম যুদ্ধাভিযান (সীরাহ ছহীহাহ ২/৪৭০)।

** মুতা পরবর্তী যুদ্ধসমূহ— সারিইয়া যাতুস সালাসে, সারিইয়া আবু ক্বাতাদাহ

****  মক্কা বিজয় (غزوة فةح مكة) (৮ম হিজরীর ১৭ই রামাযান সোমবার মোতাবেক ৮ই জানুয়ারী ৬৩০ খৃ.) এক প্রকার বিনা যুদ্ধে মক্কা বিজয় সম্পন্ন হয়। মুসলিম পক্ষে দলছুট ২ জন শহীদ ও কাফের পক্ষে অতি উৎসাহী হয়ে অগ্রবর্তী ১২ জন নিহত হয়। এ সময় মদীনার দায়িত্বে ছিলেন আবু রুহুম কুলছূম(أبو رُهْمٍ كُلثومُ بنُ حُصَينِ) বিন হোছায়েন আল-গেফারী। ইবনু হিশাম ২/৩৯৯; আর-রাউযুল উনুফ ৪/১৫৩।

 এটি ছিল একটি সিদ্ধান্তকারী যুদ্ধ। অভিযানের কারণ (سبب الغزوة)

প্রায় দু’বছর পূর্বে ৬ষ্ঠ হিজরীর যুলক্বা‘দাহ মাসে সম্পাদিত হোদায়বিয়ার চার দফা সন্ধিচুক্তির তৃতীয় দফায় বর্ণিত ছিল যে, ‘যে সকল গোত্র মুসলমান বা কুরায়েশ পক্ষের সাথে চুক্তিবদ্ধ হবে, তারা তাদের দলভুক্ত বলে গণ্য হবে এবং তাদের কারু উপরে অত্যাচার করা হ’লে সংশ্লিষ্ট দলের উপরে অত্যাচার বলে ধরে নেওয়া হবে’। উক্ত শর্তের আওতায় মক্কার নিকটবর্তী গোত্র বনু খোযা‘আহ(بَنُو خُزَاعَة) মুসলমানদের সাথে এবং বনু বকর(بَنُو بَكْرٍ) কুরায়েশদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে সংশ্লিষ্ট দলের মিত্রপক্ষ হিসাবে গণ্য হয়।

দু’বছর পুরা না হ’তেই বনু বকর উক্ত চুক্তি ভঙ্গ করল এবং ৮ম হিজরীর শা‘বান মাসে রাত্রির অন্ধকারে বনু খোযা‘আহর উপরে অতর্কিতে হামলা চালিয়ে বহু লোককে হতাহত করল। ঐসময় বনু খোযা‘আহ গোত্র ‘ওয়াতীর’ (الْوَتِيرُ) নামক প্রস্রবণের ধারে বসবাস করত, যা ছিল মক্কার নিম্নভূমিতে অবস্থিত (মু‘জামুল বুলদান) বনু বকরের এই অন্যায় আক্রমণে কুরায়েশদের ইন্ধন ছিল। তারা অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহ করেছিল। এমনকি কুরায়েশ নেতা ইকরিমা বিন আবু জাহ্ল, ছাফওয়ান বিন উমাইয়া এবং খোদ হোদায়বিয়া সন্ধিচুক্তিতে কুরায়েশ পক্ষের আলোচক ও স্বাক্ষর দানকারী সোহায়েল বিন ‘আমর সশরীরে উক্ত হামলায় অংশগ্রহণ করেন।

 এই যুদ্ধের পর রাসূল (ছাঃ)-এর সত্যতার ব্যাপারে সমগ্র আরব বিশ্বে সকল দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দূর হয়ে যায়। জন্মভূমি মক্কা হ’তে হিজরত করার ৭ বছর ৩ মাস ২৭ দিন পর বিজয়ীর বেশে পুনরায় মক্কায় ফিরে এলেন মক্কার শ্রেষ্ঠ সন্তান বিশ্ব মানবতার মুক্তিদূত, নবীকুল শিরোমণি শেষনবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। বিনা যুদ্ধেই মক্কার নেতারা তাঁর নিকটে আত্মসমর্পণ করলেন। এতদিন যারা ছিলেন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ও মুসলমানদের যাবতীয় দুঃখ-কষ্টের মূল। বিজয়ী রাসূল (ছাঃ) তাদের কারু প্রতি কোনরূপ প্রতিশোধ নিলেন না। জি‘ইর্রানাহতে গণীমত বণ্টন সম্পন্ন হওয়ার পর আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) ওমরাহ পালনের জন্য ইহরাম বাঁধেন (যা মক্কা থেকে ২০ কি.মি. উত্তর-পূর্বে অবস্থিত)। অতঃপর মক্কা গমন করে ওমরাহ পালন করেন। অতঃপর আত্তাব বিন আসীদকে মক্কার প্রশাসক হিসাবে বহাল রেখে তিনি মদীনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। এ সময় ছাক্বীফ নেতা ওরওয়া বিন মাসঊদ পথিমধ্যে রাসূল (ছাঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করে ইসলাম কবুল করেন’ (সীরাহ ছহীহাহ ২/৫১৭)।

৮ম হিজরীর ১০ই রামাযান মদীনা থেকে মক্কা বিজয়ের উদ্দেশ্যে বের হয়ে মক্কা, হোনায়েন ও ত্বায়েফ বিজয় শেষে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) দীর্ঘ ২ মাস ১৪ দিন পর ২৪শে যুলক্বা‘দাহ মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন।

এই সম্মানিত সূরাটি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওপর শেষ দিকে অবতীর্ণ হওয়া সূরাগুলোর অন্যতম একটি সূরা। ইমাম বুখারী বর্ণনা করেন, বারা‘ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: সর্বশেষ যে আয়াত অবতীর্ণ হয় তা হচ্ছে:

﴿يَسۡتَفۡتُونَكَ قُلِ ٱللَّهُ يُفۡتِيكُمۡ فِي ٱلۡكَلَٰلَةِۚ ١٧٦﴾] النساء : ١٧٦[

“লোকেরা তোমার কাছে ফতওয়া জিজ্ঞেস করছে; বল, আল্লাহ তোমাদেরকে পিতা-মাতাহীন নিঃসন্তান ব্যক্তি সম্পর্কে ফতওয়া দিচ্ছেন।” [সূরা আন-নিসা: ১৭৬]

আর সর্বশেষ যে সূরা অবতীর্ণ হয় তা হচ্ছে সূরা ‌আল-বারা’আহ (অর্থাৎ সূরা তাওবাহ)। এ সূরার প্রথমে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রহীম’ বলা হয় নি। কেননা, সাহাবীগণ সংগৃহীত কুরআনের পূর্ণাঙ্গ কপিতে তাঁরা এটা লিপিবদ্ধ করেন নি। এক্ষেত্রে তাঁরা উসমান ইবনু আফ্ফান রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর অনুসরণ করেন। এই সম্মানিত সূরার প্রথম দিকের অংশ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওপরে এমন সময় অবতীর্ণ হয় যখন তিনি তাবুকের অভিযান থেকে ফিরছিলেন। আর তাঁরা হজের মওসুমে ছিলেন, যে হজ পালন করতে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মনস্থ হন। কিন্তু তাঁকে জানানো হয় যে, মুশরিকরা তাদের অভ্যাসবশত এই বছরও হজে হাজির হবে আর উলঙ্গ হয়ে বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করবে। ফলে তিনি তাদের সাথে মিশে যাওয়াকে অপছন্দ করেন। তাই এ বৎসর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে হজের নেতা নিযুক্ত করে মক্কায় প্রেরণ করেন। যাতে তিনি হজের আচারানুষ্ঠানগুলো লোকদেরকে দেখিয়ে দেন আর মুশরিদেরকে জানিয়ে দেন যে, তারা এ বৎসরের পরে আর হজ করবে না এবং লোকদের মাঝে এ কথার ঘোষণা দেন- بَرَاءَةٌ مِنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ “আল্লাহ ও তাঁর রসূলের পক্ষ হতে সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা দেওয়া হল।”

মুহাম্মদ ইবনু ইসহাক রহ. আবু জা‘ফার মুহাম্মদ ইবনু আলী ইবনুল হুসাইন ইবনু আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন: তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওপরে যখন সূরা আত- তাওবাহ অবতীর্ণ হয়, ইতোপূর্বে তিনি আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু হজের অনুষ্ঠানাদির তত্ত্বাবধান করার জন্য প্রেরণ করেন। তখন বলা হয়: ইয়া রাসূলাল্লাহ, এ সংবাদ যদি আবু বকরের নিকট প্রেরণ করতেন! তখন তিনি বলেন: ‘এটা আমার পক্ষ থেকে কেবল আমার গৃহের কোনো লোক আদায় করবে।’ এরপর তিনি আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে ডেকে বলেন: সূরা আল-বারা’আতের এই প্রথম ভাগটি নিয়ে বের হয়ে পড় আর কুরবানির দিন লোকদের নিকট তা প্রচার করে দাও, যখন তারা মিনায় একত্রিত হয়। ‘কোনো কাফির জান্নাতে প্রবেশ করবে না, এই বৎসরের পরে কোনো মুশরিক হজ করবে না, উলঙ্গ হয়ে বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করবে না, যার সাথে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চুক্তি রয়েছে তার মেয়াদ হচ্ছে এর নির্ধারিত সময় পর্যন্ত।’ আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদ্ববা নামক উটের পিঠে চড়ে বের হয়ে পড়েন, এমনকি পথে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে পেয়ে যান। যখন আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে দেখেন তখন তিনি বলেন: আপনাকে কি নেতা করে পাঠানো হয়েছে নাকি অধীনস্থ করে? তিনি বলেন: বরং অধীনস্থ করে। এরপর তাঁরা চলতে থাকেন। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু হজে লোকদের নেতৃত্ব দান করেন, সে বছর আরবরা তাদের সাধারণ স্থানগুলোতে অবস্থান করেছিল যাতে তারা জাহেলী যুগে অবস্থান করত। অবশেষে কুরবানির দিন আসলে আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু উঠে দাঁড়ান আর লোকদের মাঝে সেই ঘোষণা প্রদান করেন যা তাকে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি বলেন: হে লোক সকল, জান্নাতে কোনো কাফির প্রবেশ করবে না, এ বৎসরের পরে কোনো মুশরিক হজ করবে না, উলঙ্গ হয়ে কেউ বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করবে না। আর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকটে যার কোনো চুক্তি রয়েছে এর মেয়াদ হচ্ছে তার নির্ধারিত সময় পর্যন্ত। ফলে সে বৎসরের পরে কোনো মুশরিক হজ করে নি, উলঙ্গ হয়ে বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করে নি। এরপর তাঁরা (দু’জন) রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট ফিরে আসে। এই হচ্ছে দায়মুক্তির ঘোষণা তাদের থেকে যারা অনির্ধারিত সময়ের চুক্তির অধিকারী মুশরিক এবং যে সমস্ত মুশরিক নির্ধারিত সময় পর্যন্ত চুক্তি করেছিল।

এ সূরার ভূমিকায়, ৫ রুকূ’র শেষ পর্যন্ত বিস্তৃত এ ভাষণটি ৯ হিজরীতে এমন এক সময় নাযিল হয় যখন নবী (সা.) হযরত আবু বকরকে (রা.) হজ্জের জন্য রওয়ানা করে দিয়েছিলেন। তাঁর চলে যাওয়ার পর এটি নাযিল হলে সাহাবায়ে কেরাম নবী (সা.) এর কাছে আবেদন করেনঃ এটি হযরত আবু বকর (রা.) এর কাছে পাঠিয়ে দিন, তিনি হজ্জের সময় লোকদের এটি শুনিয়ে দেবেন। কিন্তু তিনি বলেন, এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির ঘোষণা আমার পক্ষ থেকে আমারই ঘরের একজনের করা উচিত। কাজেই তিনি হযরত আলীকে (রা.) এ কাজে নিযুক্ত করেন। এ সঙ্গে তাঁকে নির্দেশ দেন, হাজীদের সাধারণ সামাবেশে আল্লাহর এ বাণী শুনিয়ে দেবার পর নিম্নলিখিত চারটি কথাও যেন ঘোষণা করে দেন।

 এক, দ্বীন ইসলাম গ্রহণ করতে অস্বীকার করে এমন কোন ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না।

 দুই, এ বছরের পরে আর কোন মুশরিক হজ্জ করতে আসতে পারবে না।

 তিন, বাইতুল্লাহর চারদিকে উলঙ্গ অবস্থায় তাওয়াফ করা নিষিদ্ধ।

 চার, যাদের আল্লাহর রসূলের চুক্তি অক্ষুন্ন আছে অর্থাৎ যারা চুক্তি ভঙ্গ করেনি, চুক্তির সময়সীমা পর্যন্ত তা পূর্ণ করা হবে।

** এ প্রসঙ্গে জানা থাকা দরকার, মক্কা বিজয়ের পর ইসলামী যুগে প্রথম হজ্জ অনুষ্ঠিত হয় ৮ হিজরীতে প্রাচীন পদ্ধতিতে। ৯ হিজরীতে মুসলমানরা এ দ্বিতীয় হজ্জটি সম্পন্ন করে নিজস্ব পদ্ধতিতে এবং অন্যদিকে মুশরিকরা করে তাদের নিজস্ব পদ্ধতিতে। এরপর ১০ হিজরীতে তৃতীয় হজ্জ অনুষ্ঠিত হয় খালেস ইসলামী পদ্ধতিতে। এটিই বিখ্যাত বিদায় হজ্জ। নবী ﷺ প্রথম দু’বছর হজ্জ করতে যাননি। তৃতীয় বছর শিরকের পুরোপুরি অবসান ঘটার পর তিনি হজ্জ আদায় করেন।

মক্কা বিজয়ের পর ৯ হিজরীতে রসূল (সাঃ) আবু বাকর, আলী এবং অন্যান্য সাহাবা (রাঃ)গণকে কুরআনের এই আয়াতসমূহ ও বিধান দিয়ে মক্কা পাঠালেন, যাতে তাঁরা তা প্রকাশ্যভাবে ঘোষণা করে দেন। তাঁরা নবীর আদেশ মোতাবেক ঘোষণা করলেন যে, কোন ব্যক্তি উলঙ্গ হয়ে কা’বা ঘরের তাওয়াফ করবে না। বরং আগামী বছর থেকে কোন মুশরিককে বাইতুল্লাহর হজ্জের জন্য অনুমতি দেওয়া হবে না। (বুখারীঃ নামায ও হজ্জ অধ্যায়, মুসলিমঃ হজ্জ অধ্যায়)

—সূরা আনফালের ৫৮ আয়াতে একথা আলোচনা করা হয়েছে যে, কোন জাতির পক্ষ থেকে যখন তোমাদের খেয়ানত করার তথা অঙ্গীকার ভঙ্গ ও বিশ্বাসঘাতকতা করার আশঙ্কা দেখা দেয় তখন প্রকাশ্যে তার চুক্তি মুখের ওপর ছুঁড়ে দাও এবং তাকে এ মর্মে সতর্ক করে দাও যে, এখন তোমাদের সাথে আমাদের আর কোন চুক্তি নেই। এরূপ ঘোষণা ও বিজ্ঞপ্তি না দিয়ে কোন চুক্তিবদ্ধ জাতির বিরুদ্ধে সামরিক কার্যক্রম শুরু করে দেয়া মূলত বিশ্বাসঘাতক তারই নামান্তর। এ নৈতিক বিধি অনুযায়ী চুক্তি বাতিল করার এ সাধারণ ঘোষণা এমনসব গোত্রের বিরুদ্ধে করা হয়েছে যারা অঙ্গীকার করা ও চুক্তিবদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও সমসময় ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র পাকাতে এবং সুযোগ পেলেই সকল অঙ্গীকার ও চুক্তি শিকেয় তুলে রেখে শত্রুতায় লিপ্ত হতো। সে সময় যেসব গোত্র শিরকের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল তাদের মধ্য থেকে কিনানাহ ও বনী দ্বামরাহ এবং হয়তো আরো এক আধাটি গোত্র ছাড়া বাদবাকি সকল গোত্রের অবস্থা এ রকমই ছিল।

এ এ দায়িত্ব মুক্তি ও স্পর্কচ্ছেদ সংক্রান্ত ঘোষণার ফলে আরবে শিরক ও মুশরিকদের অস্তিত্বই যেন কার্যত আইন বিরোধী (Out of Law) হয়ে গেলো। এখন আর তাদের জন্য সারাদেশে কোন আশ্রয়স্থল রইল না। কারণ দেশের বেশীরভাগ এলাকা ইসলামী শাসন কর্তৃত্বের আওতাধীন হয়ে গিয়েছিল। এরা নিজেদের জায়গায় বসে অপেক্ষা করছিল, রোম ও পারস্যের পক্ষ থেকেই ইসলামী সালতানাত কখন বিপদের সম্মুখীন হবে অথবা নবী (সা.) কখন ইন্তেকাল করবেন। তখনই এরা অকস্মাৎ চুক্তি ভঙ্গ করে দেশে গৃহযুদ্ধ শুরু করে দেবে। কিন্তু আল্লাহ‌ তার ও তার রসূল ﷺ তাদের প্রতীক্ষিত সময় আসার আগেই তাদের পরিকল্পনার ছক উল্টে দিলেন এবং তাদের থেকে দায়িত্ব মুক্তির কথা ঘোষণা করে তাদেরকে তিনটি পথের একটিকে বেছে নিতে বাধ্য করলেন।

 এক, তাদের যুদ্ধ করার জন্য তৈরী হতে হবে এবং ইসলামী শক্তির সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে দুনিয়ার বুক থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে হবে।

দুই, তাদের দেশ ছেড়ে চলে যেতে হবে।

 তিন, তাদের ইসলাম গ্রহণ করতে হবে এবং দেশের বৃহত্তর অংশ আগেই যে শাসন ব্যবস্থার আওতাধীন চলে এসেছে তারই আয়ত্বে নিজেদেরকে ও নিজেদের এলাকাকে সোপর্দ করে দিতে হবে।

এ গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের প্রকৃত ও যথার্থ যৌক্তিকতা অনুধাবন করার জন্য আমাদেরকে পরবর্তীকালে উদ্ভূত ইসলাম বর্জন আন্দোলনের দিকে ফেরাতে হবে। আলোচ্য ঘটনার দেড় বছর পরে নবী (সা.) ইন্তেকালের পরই দেশের বিভিন্ন এলাকায় এ অশুভ তৎপরতা ও গোলযোগ মাথাচাড়া দিয়ে উঠার ফলে ইসলামের নব নির্মিত প্রাসাদটি আকস্মিকভাবে নড়ে ওঠে। ৯ হিজরীর এ সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণার মাধ্যমে যদি শিরকের সংগঠিত শক্তিকে খতম করে না দেয়া হতো এবং সারাদেশে ইতিমধ্যেই ইসলামের নিয়ন্ত্রণে ক্ষমতা প্রধান্য বিস্তার না করতো, তাহলে হযরত আবু বকর (রা.) খিলাফত আমলের শুরুতেই মুরতাদ হওয়ার যে হিড়িক লেগে গিয়েছিল তার চেয়ে অনন্ত দশগুণ বেশী শক্তি নিয়ে বিদ্রোহ ও গৃহযুদ্ধের ভয়াবহ তাণ্ডব শুরু হয়ে যেতো। এ অবস্থায় ইসলামের ইতিহাসের চেহারাই হয়তো সম্পূর্ণ পাল্টে যেতো।

এ ঘোষণাটি হয়েছিল ৯ হিজরীর যিলহজ্জ মাসের ১০ তারিখে। নিজেদের ভূমিকা সম্পর্কে ভালভাবে চিন্তা-ভাবনা করার জন্য এ সময় থেকে ১০ হিজরী ১০ রবিউল সানী পর্যন্ত ৪ মাসের অবকাশ তাদেরকে দেয়া হয়।   

  • তারা যুদ্ধ করতে চাইলে যুদ্ধ করার জন্য তৈরী হোক।
  • দেশ ত্যাগ করতে চাইলে এ সময়ের মধ্যে নিজেদের আশ্রয়স্থল খুঁজে নিক।
  • আর যদি ইসলাম গ্রহণ করতে চায় তাহলে স্থির মস্তিস্কে ভেবে-চিন্তে তা গ্রহণ করুক।

এই অবকাশ এই জন্য দেওয়া হয়নি যে, এখন তোমাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাগ্রহণ স‎ম্ভব নয়; বরং এতে তোমাদের কল্যাণই উদ্দেশ্য। যে ব্যক্তি এর মধ্যে তাওবাহ করে মুসলিম হতে চাইবে, সে মুসলিম হয়ে যাবে। নতুবা জেনে রাখ তোমাদের ব্যাপারে আল্লাহর যে সিদ্ধান্ত ও ইচ্ছা রয়েছে তা তোমরা কোনক্রমেই ব্যর্থ করতে পারবে না এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে অবধারিত লাঞ্ছনা ও অপমান থেকে পরিত্রাণ পেতে পারবে না।

এখানে মহান হজের দিনে বলতে কি বুঝানো হয়েছে তা নিয়ে মুফাসসিরগণের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।

আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস, উমর, আবদুল্লাহ ইবন ওমর এবং আবদুল্লাহ ইবন যুবায়ের রাদিয়াল্লাহু আনহুম প্রমুখ সাহাবা বলেনঃ এর অর্থ আরাফাতের দিন। [ইবন কাসীর] কারণ, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদীস শরীফে এরশাদ করেছেন “হজ হল আরাফাতের দিন”। [তিরমিযী: ৮৮৯]

পক্ষান্তরে আলী, আবদুল্লাহ ইবন আবি আওফা, মুগীরা ইবন শুবাহ, ইবন আব্বাসসহ সাহাবায়ে কিরামের এক বড় দল এবং অনেক মুফাসসির বলেন, এর অর্থ কোরবানীর দিন বা দশই যিলহজ।

সহীহায়ন (বুখারী, মুসলিম) ও অন্যান্য হাদীসগ্রন্থে প্রমাণিত যে, মহান বা বড় হজ্জ বলতে কুরবানীর (১০ই যিলহজ্জ) দিনকে বোঝানো হয়েছে। (বুখারী ৪৬৫৫, মুসলিম ৯৮২, তিরমিযী ৯৫৭নং) এই দিনে মিনাতে সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা শুনানো হয়। ১০ই যুলহজ্জকে বড় হজ্জের দিন এই জন্য বলা হয় যে, এই দিনে হজ্জের সব থেকে অধিক ও গুরুত্বপূর্ণ কার্যাবলী আদায় করা হয়ে থাকে। আর সাধারণতঃ লোকেরা উমরাহকে ‘হাজ্জে আসগার’ (ছোট হজ্জ) বলত। এই জন্য উমরাহ থেকে পৃথক করার জন্য হজ্জকে ‘হাজ্জে আকবার’ (বড় হজ্জ) বলা হয়। পক্ষান্তরে জনসাধারণের মাঝে এই কথা প্রসিদ্ধ আছে যে, জুমআর দিনে হজ্জের (আরাফাতের) দিন পড়লে তা বড় হজ্জ (বা আকবরী হজ্জ) হয়। কিন্তু এ কথার কোন দলীল নেই, এ হল ভিত্তিহীন কথা।

ইমাম বুখারী বর্ণনা করেন, আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু আমাকে সে হজে সে সমস্ত ঘোষকদের অন্যতম করে প্রেরণ করেন, যাদেরকে তিনি কুরবানির দিন প্রেরণ করেন। তারা মিনায় এ ঘোষণা দেয়: এই বৎসরের পরে কোনো মুশরিক হজ করবে না এবং উলঙ্গ হয়ে বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করবে না। হুমাইদ বলেন: তারপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলী ইবনু আবু তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে বারা’আতের ঘোষণা দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে প্রেরণ করেন। আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: আলী আমাদের সাথে কুরবানির দিন মিনায় অবস্থানকারীদের মাঝে মুশরিকদের থেকে দায়মুক্তির ঘোষণা দেন। আর এ ঘোষণাও দেন যে, এ বৎসরের পরে কোনো মুশরিক হজ করবে না আর উলঙ্গ হয়ে তাওয়াফ করবে না।

এটা হল মুশরিকদের চতুর্থ দল। তাদের সাথে যত দিনের চুক্তি ছিল সেই সময় পর্যন্ত তাদেরকে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। কেননা, তারা চুক্তি পালন করেছিল এবং তার পরিপন্থী কোন আচরণ প্রদর্শন করেনি। এই জন্য মুসলিমদের পক্ষেও চুক্তি পালনকে জরুরী করা হয়েছিল।

কাতাদা বলেন, এরা হচ্ছে কুরাইশ মুশরিক, যাদের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হুদায়বিয়ার সন্ধি করেছিলেন। ঐ বছর কুরবানীর দিনের পর তাদের সুনির্দিষ্ট মেয়াদের তখনও চারমাস বাকী ছিল। তাই আল্লাহ তার নবীকে এ সময়টুকু পূর্ণ করার নির্দেশ দিলেন। আর যাদের সাথে কোন চুক্তি ছিল না তাদেরকে অবকাশ দিলেন মুহাররাম মাস শেষ হওয়া পর্যন্ত। আর যাদের সাথে চুক্তি ছিল সে চুক্তি শেষ হওয়ার পর আর কোন চুক্তি করা হবে না ঘোষণা দিলেন, সুতরাং তারা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ও মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ সাক্ষ্য দেয়া পর্যন্ত তাদের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। তাদের কাছ থেকে অন্য কিছু গ্রহণ করা হবে না। [তাবারী]

এ আয়াত দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, মুশরিকরা যদি অঙ্গীকার ভঙ্গ করে তবে তাদেরকে হত্যা করা জায়েয। [আদওয়াউল বায়ান] অন্য আয়াতেও অনুরূপ বলা হয়েছে। যেমন, “যতক্ষন তারা তোমাদের চুক্তিতে স্থির থাকবে তোমরাও তাদের চুক্তিতে স্থির থাকবে।” [সূরা আত-তাওবাহ: ৭] অন্য আয়াতে আরও স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, “আর যদি তারা তাদের চুক্তির পর তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে এবং তোমাদের দ্বীন সম্বন্ধে কটুক্তি করে, তবে কুফরের নেতাদের সাথে যুদ্ধ কর; এরা এমন লোক যাদের কোন প্রতিশ্রুতি নেই; যেন তারা নিবৃত্ত হয়।” [সূরা আত-তাওবাহঃ ১২] তবে এর বিপরীত কাউকে হত্যা করা জায়েয নেই। হাদীসে এসেছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যে কেউ কোন অঙ্গীকারবদ্ধ অমুসলিমকে হত্যা করবে সে জান্নাতের গন্ধও পাবে না। অথচ এর গন্ধ চল্লিশ বছরের পথের দুরত্ব থেকেও পাওয়া যায়।” [বুখারী ৬৯১৪]

সেই ‘নিষিদ্ধ মাসগুলি’ বলতে কোন্ কোন্ মাস উদ্দেশ্য তাতে মতভেদ রয়েছে। একটি রায় হল যে, তা থেকে উদ্দেশ্য হল ঐ চার মাস, যা হারাম (বা নিষিদ্ধ) বলে প্রসিদ্ধ; অর্থাৎ, রজব, যুলক্বাদ্, যুলহাজ্জ ও মুহাররাম মাস। আর সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা ১০ই যুলহজ্জ তারীখে করা হয়েছিল। এই হিসাবে তাদেরকে ঘোষণার পর ৫০ দিন অবকাশ দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ, নিষিদ্ধ মাসগুলি অতিবাহিত হওয়ার পর মুশরিকদেরকে গ্রেপ্তার ও হত্যা করার আদেশ জারী করা হয়।

কিন্তু ইমাম ইবনে কাসীর বলেছেন যে, এখানে ‘নিষিদ্ধ মাসগুলি’ বলতে হারামকৃত ঐ চার মাস নয়; বরং এখানে ১০ই যিলহজ্জ থেকে ১০ই রবীউস সানী পর্যন্ত চার মাসকে বুঝানো হয়েছে। আর এই চার মাসকে নিষিদ্ধ মাস এই জন্য বলা হয়েছে যে, সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা হিসাবে এই চার মাসে সেই সব মুশরিকদের সাথে লড়াই ও তাদের বিরুদ্ধে কোন প্রকারের ব্যবস্থা গ্রহণ করার অনুমতি ছিল না। সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা হিসাবে এই ব্যাখ্যা যথোপযুক্ত বলে মনে হয়। আর এ ব্যাপারে আল্লাহই অধিক জানেন।

সুফইয়ান ইবন উয়াইনাহ রহিমাহুল্লাহ বলেন, আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহ্ তা’আলা চার তরবারী নিয়ে পাঠিয়েছেন।

তন্মধ্যে একটি কাফের মুশরিকদের বিরুদ্ধে। যার প্রমাণ আলোচ্য আয়াত।

 দ্বিতীয়টি আহলে কিতাবদের বিরুদ্ধে। তার প্রমাণ সূরা আত-তাওবার ২৯ নং আয়াত।

৯ : ২৯ قَـٰتِلُواْ ٱلَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِٱللَّهِ وَلَا بِٱلْيَوْمِ ٱلْأَخِرِ وَلَا يُحَرِّمُونَ مَا حَرَّمَ ٱللَّهُ وَرَسُولُهُۥ وَلَا يَدِينُونَ دِينَ ٱلْحَقِّ مِنَ ٱلَّذِينَ أُوتُواْ ٱلْكِتَـٰبَ حَتَّىٰ يُعْطُواْ ٱلْجِزْيَةَ عَن يَدٍ وَهُمْ صَـٰغِرُونَ

২৯. যাদেরকে কিতাব প্রদান করা হয়েছে তাদের মধ্যে যারা আল্লাহতে ঈমান আনে না এবং শেষ দিনেও নয় এবং আল্লাহ ও তার রাসূল যা হারাম করেছেন তা হারাম গণ্য করে না, আর সত্য দ্বীন অনুসরণ করে না; তাদের সাথে যুদ্ধ কর, যে পর্যন্ত না তারা নত হয়ে নিজ হাতে জিযইয়া দেয়।

 তৃতীয়টি মুনাফিকদের বিরুদ্ধে যা সূরা আত-তাওবার ৭৩ ও সূরা আত-তাহরীমের ৯ নং আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে।

৯ : ৭৩ يَـٰٓأَيُّهَا ٱلنَّبِىُّ جَـٰهِدِ ٱلْكُفَّارَ وَٱلْمُنَـٰفِقِينَ وَٱغْلُظْ عَلَيْهِمْ‌ۚ وَمَأْوَٮٰهُمْ جَهَنَّمُ‌ۖ وَبِئْسَ ٱلْمَصِي

 হে নবী কাফের ও মুনাফেকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করুন, তাদের প্রতি কঠোর হোন; এবং তাদের আবাসস্থল জাহান্নাম, আর তা কত নিকৃষ্ট প্রত্যাবর্তন স্থল! তাওবাঃ৭৩

يَـٰٓأَيُّهَا ٱلنَّبِىُّ جَـٰهِدِ ٱلْكُفَّارَ وَٱلْمُنَـٰفِقِينَ وَٱغْلُظْ عَلَيْهِمْ‌ۚ وَمَأْوَٮٰهُمْ جَهَنَّمُ‌ۖ وَبِئْسَ ٱلْمَصِيرُ

 হে নবী! কাফির ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করুন এবং তাদের প্রতি কঠোর হোন। আর তাদের আশ্রয়স্থল জাহান্নাম এবং তা কত নিকৃষ্ট ফিরে যাওয়ার স্থান! আত তাহরীমঃ ৯

 চতুর্থটি বিদ্রোহী, সীমালংঘনকারীদের বিরুদ্ধে। যার আলোচনা সূরা আল-হুজুরাত এর ৯ নং আয়াতে এসেছে। [ইবন কাসীর]

 আর মুমিনদের দু’দল দ্বন্দ্বে লিপ্ত হলে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও; অতঃপর তাদের একদল অন্য দলের বিরুদ্ধে বাড়াবাড়ি করলে, যারা বাড়াবাড়ি করে তাদের বিরুদ্ধে তোমরা যুদ্ধ কর, যতক্ষন না তারা আল্লাহ্‌র নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। তারপর যদি তারা ফিরে আসে, তবে তাদের মধ্যে ইনসাফের সাথে আপোষ মীমাংসা করে দাও এবং ন্যায়বিচার কর। নিশ্চয় আল্লাহ্‌ ন্যায়বিচারকদেরকে ভালবাসেন। সূরা হুজুরাতঃ৯

— চাই তা হত্যার মাধ্যমে হোক বা বন্দী করার মাধ্যমে হোক, যে প্রকারেই হোক তাদের পাকড়াও করবে। তবে বন্দীকেই أخِيْذ বলা হয়। তাই এর অর্থ হচ্ছে, তাদের বন্দী কর। [ইবন কাসীর; ফাতহুল কাদীর] ইবন কাসীর আরও বলেন, এ আয়াতে যেখানে পাও পাকড়াও করার সাধারণ কথা বলা হলেও তা অন্য আয়াত দ্বারা বিশেষিত। অন্য আয়াতে হারাম এলাকায় হত্যা করতে নিষেধ করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, “আর মসজিদুল হারামের কাছে তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করবে না যে পর্যন্ত না তারা সেখানে তোমাদের সাথে যুদ্ধ করে।” [সূরা আল-বাকারাহঃ ১৯১]

— ইবন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আমাকে ততক্ষণ পর্যন্ত যুদ্ধের নির্দেশ দেয়া হয়েছে যতক্ষণ না তারা বলবে, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ও মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল এবং সালাত কায়েম করবে আর যাকাত প্রদান করবে। অতঃপর যদি তারা তা করে, তবে তাদের জান ও মাল আমার হাত থেকে নিরাপদ হবে, কিন্তু যদি ইসলামের অধিকার আদায় করতে হয়, তবে তা ভিন্ন কথা। আর তাদের হিসাব নেয়ার ভার তো আল্লাহর উপর।” [বুখারী: ২৫; মুসলিম: ২২]

— আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহু এ আয়াত দ্বারা যাকাত প্রদানে অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার পক্ষে দলীল পেশ করেছেন। [দেখুন, বুখারীঃ ২৫; মুসলিমঃ ২২] কেননা এখানে কুফরী ও শির্কী থেকে মুক্তির আলামত হিসাবে সালাত আদায়ের সাথে সাথে যাকাত প্রদানের কথাও বলা হয়েছে। [ইবন কাসীর] বর্তমানেও যারা যাকাত দিতে অস্বীকার করবে তাদের ব্যাপারে একই বিধান প্রযোজ্য হবে। [সা’দী] কাতাদা বলেন, আল্লাহ যাদেরকে ছেড়ে দেয়ার কথা বলেছেন তাদেরকে ছেড়ে দাও।

আবু বাকর সিদ্দীক (রাঃ) এই আয়াত থেকে দলীল গ্রহণ করে যাকাত আদায়ে অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেছিলেন। আর বলেছিলেন যে, ‘আল্লাহর কসম! আমি সেই সব লোকদের বিরুদ্ধে অবশ্যই লড়ব, যারা নামায ও যাকাতের মাঝে পার্থক্য করবে।’ (বুখারী, মুসলিম) অর্থাৎ, নামায তো পড়ে; কিন্তু যাকাত প্রদান করে না।

 মানুষ তো তিন ধরনের।

এক. মুসলিম, যার উপর যাকাত ফরয।

 দুই. মুশরিক, তার উপর জিযইয়া ধার্য।

তিন. কাফের যোদ্ধা যে মুসলিমদের সাথে ব্যবসা করতে চায়, তার উপর কর ধার্য। [তাবারী]

— সুতরাং তিনি যারা তাওবাহ করবে তাদের শির্কসহ যাবতীয় গোনাহ ক্ষমা করবেন। তাদেরকে তাওফীক দেয়ার মাধ্যমে দয়া করবেন। তারপর তাদের থেকে তা কবুল করবেন। [সা’দী] সূরা তাওবাহর প্রথম পাঁচ আয়াতে মক্কাবিজয়ের পর মক্কা ও তার আশ-পাশের সকল কাফের-মুশরিকের জান মালের সার্বিক নিরাপত্তা দানের বিষয়টি উল্লেখিত হয়। তবে তাদের চুক্তিভঙ্গ ও বিশ্বাসঘাতকতার তিক্ত অভিজ্ঞতার প্রেক্ষিতে ভবিষ্যতে তাদের সাথে আর কোন চুক্তি না করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এ সত্বেও ইতিপূর্বে যাদের সাথে চুক্তি করা হয় এবং যারা চুক্তিভঙ্গ করেনি, তাদের মেয়াদ পূর্ণ হওয়া অবধি চুক্তি রক্ষার জন্য এ আয়াতসমূহে মুসলিমদের আদেশ দেয়া হয়।

আর যাদের সাথে কোন চুক্তি হয়নি, কিংবা যাদের সাথে কোন মেয়াদী চুক্তি হয়নি, তাদের প্রতি এই অনুকম্পা করা হয় যে, তড়িৎ মক্কা ত্যাগের আদেশের স্থলে চার মাসের সময় দেয়া হয়। যাতে এ অবসরে যেদিকে সুবিধা চলে যেতে পারে, অথবা এ সময়ে ইসলামের সত্যতা উপলব্ধি করে মুসলিম হতে পারে। আল্লাহর এ সকল আদেশের উদ্দেশ্য হল, আগামী সাল নাগাদ যেন মক্কা শরীফ সকল বিশ্বাসঘাতক মুশরিকদের থেকে পবিত্র হয়ে যায়। অধিকাংশ আলেম এ সর্বশেষ আয়াতকে আয়াতুস সাইফ বা তরবারীর আয়াত আখ্যা দিয়েছেন। এর অর্থ হলো, এর মাধ্যমে যাবতীয় চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে। এখন হয় ইসলাম না হয় তরবারীই তাদের মধ্যে মীমাংসা করতে পারে। [বাগভী; ইবন কাসীর; ফাতহুল কাদীর]

আয়াত থেকে প্রমাণিত হয় যে, কোন বিধর্মী যদি ইসলামের সত্যতার দলীল জানতে চায়, তবে প্রমাণপঞ্জী সহকারে তার সামনে ইসলামকে পেশ করা মুসলিমদের কর্তব্য। অনুরূপভাবে কোন বিধর্মী ইসলামের সম্যক তথ্য ও তত্ত্বাবলী হাসিলের জন্যে যদি আমাদের কাছে আসে, তবে এর অনুমতি দান ও তার নিরাপত্তা বিধান আমাদের পক্ষে ওয়াজিব। তাকে বিব্রত করা বা তার ক্ষতিসাধন অবৈধ। তারপর তাকে তার নিরাপদ স্থান যেখান থেকে সে এসেছে সেখানে পৌছে দেয়াও মুসলিমের দায়িত্ব। [তাবারী] এ আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, কুরআন আল্লাহর কালাম, তিনি স্বয়ং এ বাণীর প্রবক্তা। সুতরাং কুরআন সৃষ্ট নয়, যেমনটি কোনও কোনও বিদআতপন্থীরা মনে করে থাকে।

— এ সহনশীলতা প্রদর্শনের কারণ হলো, কাফের মুশরিকদেরকে আল্লাহর কালাম শুনে এবং মুসলিমদের বাস্তব অবস্থা দেখে সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ দেয়া। হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় মুশরিকগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যাবতীয় কর্মকাণ্ড ও রাসূলের প্রতি সাহাবাদের ভালবাসা দেখার পরে তাদের মধ্যে প্রচণ্ড ভাবান্তর সৃষ্টি হয়েছিল যা তাদের ঈমান গ্রহণে সহযোগিতা করেছিল। [ইবন কাসীর] তাছাড়া এমনও হতে পারে যে, তারা মূর্খতা বা অজ্ঞতা বশত: বিরোধিতায় লিপ্ত। আল্লাহর কালাম শোনার পর তাদের মধ্যে ভাবান্তর হবে এবং ইসলাম গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ হবে। [সা’দী]